ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’: অবদমনের অন্তর্বাস খুলে অভ্যন্তরে যাত্রা

0
1304
বাড়িওয়ালা

লিখেছেন । নাফিস সাদিক

বাড়িওয়ালি
The Lady of the House
ফিল্মমেকার, স্ক্রিনরাইটার । ঋতুপর্ণ ঘোষ
প্রডিউসার । অনুপম খের
সিনেমাটোগ্রাফার । বিবেক শাহ
মিউজিক । দেবজ্যোতি মিশ্র
এডিটর । অর্ঘ্যকমল মিত্র
কাস্ট [ক্যারেকটার] । কিরন খের [বনলতা]; চিরঞ্জিত চক্রবর্তী [দীপংকর]; রূপা গাঙ্গুলী [সুদেষ্ণা মিত্র]; সুদীপা চক্রবর্তী [মালতী]; সূর্য চ্যাটার্জী [প্রসন্ন]
রানিংটাইম । ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । ভারত
রিলিজ । ২০০০


জমিদারদের কেউ আর এখন বেঁচে নেই। শুধু থেকে গেছে একটি ক্ষয়িষ্ণু জমিদারবাড়ি এবং বাড়িটির একমাত্র উত্তরাধিকারী– একজন মধ্যবয়সী অবিবাহিতা নারী। নাম তার বনলতা। এই মধ্যবয়সী নারীর একাকীত্ব, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, যৌন অবদমন এবং লিঙ্গতাত্ত্বিক আচরণের বৈচিত্র্য নিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ ২০০০ সালে নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র বাড়িওয়ালি

বাংলা চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি স্রষ্টা ঋতুপর্ণ ঘোষ। ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে তিনি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন উনিশটি চলচ্চিত্র। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর প্রতিটিতেই মৌলিকত্ব এবং স্বাতন্ত্র্যের ছাপ এতটাই স্পষ্ট যে, নিজের সময়ে তো বটেই, বর্তমান সময়ের দর্শকদের কাছেও তাঁর চলচ্চিত্রের আবেদন পূর্ণমাত্রায় অক্ষুণ্ন রয়েছে। ঘটনার ঘনঘটায় নয়, বরং অনুভবের গভীরতায় প্রবেশ করার প্রবল শক্তি ছিল তাঁর। এজন্যই হয়তো তাঁর চলচ্চিত্র দেখার সময় চরিত্রগুলোর সঙ্গে অন্য রকম একাত্মতা অনুভব হয় দর্শকের।

একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর প্রথম ছবি হিরের আংটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯২ সালে। ঐ একই সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র উনিশে এপ্রিলের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এরপর একে একে নির্মিত উনিশটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বারোটি চলচ্চিত্র পুরস্কার।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
৩১ আগস্ট ১৯৬৩–৩০ মে ২০১৩

বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অন্ধকার সময়ের ত্রাণকর্তারূপে তিনি হাজির হয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর তখন ‘ভালো চলচ্চিত্র’ এবং ‘বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে’র মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। মধ্যবিত্ত দর্শকেরা সিনেমা-হল থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে নতুন ধারার চলচ্চিত্র নিয়ে আবির্ভাব ঘটে ঋতুপর্ণ ঘোষের। যদিও একই সময়ে মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ এবং অপর্ণা সেনের মতো স্বাধীন নির্মাতারা বাংলা চলচ্চিত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন, তবে ঋতুপর্ণ ঘোষ এই বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ধারার সফল সম্মিলন ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে যে মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শকেরা বাণিজ্যিক ধারার সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে ক্রমেই সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, তাদেরকে হলমুখী করতে ঋতুপর্ণ ঘোষের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তাঁর চলচ্চিত্রে তিনি সমাজ এবং মানবচরিত্রের এমন অনেক দিকের অবতারণা করেছেন, যেগুলোকে আগে কেউ চিত্ররূপ দেয়নি। সমকামী প্রেম [চিত্রাঙ্গদা, ২০১২], স্ত্রীর অসম্মতিতে স্বামীর জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা ম্যারিটাল রেপ [দহন, ১৯৯৭], কিংবা বিধবা নারীর বা যৌনাকাঙ্ক্ষার [চোখের বালি, ২০০৪] মতো বিষয়গুলোতে নির্দ্বিধায় আলো ফেলেছেন তিনি।


নারীর
মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার
ও উন্মোচনে বিশেষ আগ্রহ
এবং দক্ষতার পরিচয়
দিয়েছেন ঋতুপর্ণ
ঘোষ

পুরো চলচ্চিত্রযাত্রায় নারীর মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার ও উন্মোচনে বিশেষ আগ্রহ এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাড়িওয়ালি চলচ্চিত্রটি ওই ধারায় তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য নির্মাণ বলে বিবেচিত হবে।

এখন আমরা বাড়িওয়ালি থেকে ঋতুপর্ণকে আবিষ্কারের চেষ্টা করব।

১.

প্রথমেই আসি বাড়িওয়ালির গল্পে। বিশাল জমিদার বাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকারী মধ্যবয়সী নারী বনলতা। বিয়ের দু’দিন আগে তাঁর হবুবরের সাপে কাটায় মৃত্যু ঘটে। ‘অমঙ্গল বহনকারী’ বিবেচনায় আর বিয়ে হয়নি বনলতার। তার সঙ্গে ওই বাড়িতে বাস করে মালতী নামের একটি বাকপটু তরুণী গৃহকর্মী এবং প্রসন্ন নামের একজন প্রৌঢ় ভৃত্য।

বনলতার স্থির নিস্তরঙ্গ জীবনে অকস্মাৎ আসে চঞ্চলতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রের শুটিং করার জন্য জমিদারবাড়ির একাংশ একটি ফিল্ম ইউনিটের কাছে ভাড়া দিতে সম্মত হয় সে। চলচ্চিত্রের পরিচালক দীপংকর সেনগুপ্তের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই তার মাঝে একটা মুগ্ধতা কাজ করেছিল। সেই ভালোলাগা থেকেই বাড়িটির একাংশ কিছুদিনের জন্য ফিল্ম ইউনিটকে ভাড়া দিয়েছিল বনলতা। চঞ্চল হয়ে ওঠে বহুদিনের পুরনো জমিদারবাড়িটি।

বাড়িওয়ালি

চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালীন বনলতার সঙ্গে দীপংকরের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। জমিদারবাড়ির পুরনো আসবাবপত্রসহ চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে বিভিন্ন জিনিস ব্যবহারের অনুমতিও মেলে তার কাছ থেকে। চোখের বালির বিনোদিনী চরিত্রের অভিনয়শিল্পী সুদেষ্ণা মিত্রের সঙ্গে পূর্বে দীপংকরের সম্পর্ক ছিল জানতে পেরে তার প্রতি ঈর্ষাবোধও কাজ করে বনলতার। তবে দীপংকরের প্রতি বনলতার দুর্বলতা যে একপেশে এবং পরিণতিহীন, তা বুঝতে পুরোপুরি অক্ষম সে।

অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র সেটে আরেক অভিনেত্রীর অনুপস্থতিতে শুটিং আটকে গেলে তার চরিত্রে অভিনয় করে সে। চলচ্চিত্র নির্মাণের শেষের দিকে আর্থিক টান পড়তে পারে, এই ভাবনা থেকে বাড়িভাড়া পর্যন্ত নিতে সে অস্বীকার করে। অথচ চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষে দীপংকর বনলতার চিঠির উত্তরটি পর্যন্ত দেওয়ার তাগিদ অনুভব করে না।


প্রত্যাখ্যানের
বেদনা প্রবলভাবে
আলেড়িত করে বনলতাকে

চলচ্চিত্র মুক্তির দিনে পাওয়া চিঠিতে সে জানতে পারে, চলচ্চিত্রে তার অভিনীত অংশটি কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং একইসঙ্গে বাড়িভাড়ার একটা চেক পাঠিয়ে যেন সবকিছুই মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রত্যাখ্যানের বেদনা প্রবলভাবে আলেড়িত করে বনলতাকে। দিনশেষে কারও হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না; তার পরিচয় সীমাবদ্ধ রয়ে যায় ‘বাড়িওয়ালি’তেই।

গল্পের থেকে এই চলচ্চিত্রের ভাষা, নির্মাণকৌশল এবং অন্তর্গত গভীরতাই মুখ্য। একজন মধ্যবয়সী নারীর মনস্তত্ত্ব এবং লৈঙ্গিক ও যৌনতার রাজনীতি ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো কেউ এমনভাবে আগে ভেঙে দেখাননি।

বাড়িওয়ালির চরিত্র এবং গল্পের নির্মাণে সাহিত্য ও লোককথার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নামকরণে তিনি নির্ভর করেছেন জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। বাংলা কবিতার সবচেয়ে রহস্যময়ী নারীটির নামে নামকরণ করা হয়েছে বনলতার।

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”

১৯৩৪ সালে লেখা জীবনানন্দ দাশের লেখা কবিতার চরিত্রের মতো বাড়িওয়ালির এই বনলতাও রহস্যময়। তাকে ধীরে ধীরে উন্মোচন এবং আবিষ্কার করা হয়েছে পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে। চেষ্টা চলেছে তার চেতন-অবচেতন– বিভিন্ন স্তরে পরিভ্রমণের।


নৈঃসঙ্গে
ভরা জীবনে
তার তেমন কোনো
উত্তেজনা নেই, আগ্রহ নেই

জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে নামটি এলেও বনলতার জীবনে উদ্ভুত পরিস্থিতির আদি কারণটি এসেছে মধ্যযুগীয় বাংলা মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গল থেকে। বিয়ের দু’দিন আগে সাপের কামড়ে মারা গেছে তার হবু বর। বেহুলার পক্ষে লখিন্দরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও তার পক্ষে এমন কিছু সম্ভব হয়নি। কাজেই সেই ঘটনার ভার তাকে জীবনভর বহন করতে হচ্ছে। কোনো পুরুষ সদস্যবিহীন পরিবারে একাকী জীবন পার করতে হচ্ছে তাকে। নৈঃসঙ্গে ভরা জীবনে তার তেমন কোনো উত্তেজনা নেই, আগ্রহ নেই। এ যেন কেবল বাঁচার জন্যই বেঁচে থাকা।

বনলতার জীবনের একাকীত্ব এবং পরিণতিকে মূর্ত করতে চলচ্চিত্রে বারবার বেজে চলেছে একাধিক স্বরে গাওয়া একটি গান,

“হলো মধু মাসে বিয়া
বাসর সাজাই মধু করশ দিয়া।
হলুদ চন্দন দিয়া
চাঁদের নন্দন বরণ করি গিয়া।
ধনবতী কইন্যা যে সোন্দর
চান্দের নন্দন জামাই লখিন্দর।
চোখের জলে ভাসায় বাপে মায়
পতির সাথে চাঁদের পুরী যায়।

মধু মাসে মধুর অমিলন
কলস কলস মধুর আয়োজন।

বাপের সোহাগ মায়ের আদর বাড়ে
ভাঙা কপাল কেমনে জুড়িবারে।”

চলচ্চিত্রের সূচনা এবং সমাপ্তির পাশাপাশি বিভিন্ন দৃশ্যে বারবার বেজে চলা এই গান যেন বনলতার বিরহের চিরকালীনতাকেই নির্দেশ করেছে।

বিয়ে না হওয়া সত্ত্বেও বৈধব্যের জ্বালা বহন করে চলেছে বনলতা। তবে তার ভিতরেও কাজ করে প্রেম ও যৌনতার আকাঙ্ক্ষা। তার চরিত্রের এই দিকটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস চোখের বালির। মহেন্দ্রের প্রতি বিধবা বিনোদিনী যেমন টান অনুভব করে, একইভাবে দীপংকর বিবাহিত জেনেও তার প্রতি অনিবার্য আকর্ষণ অনুভব করে বনলতা। আবার এই ‘চোখের বালি’র শুটিংয়ের জন্য বাড়ি ভাড়া করতে গিয়েই তাদের দুজনের যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

এভাবে চরিত্র নির্মাণ এবং প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে ঋতুপর্ণ ঘোষ একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ এবং মনসামঙ্গল-এর সম্মিলন ঘটিয়েছেন সুনিপুণভাবে।

২.

বাড়িওয়ালির পুরো গল্পটি বলার জন্য প্রয়োজন হয়েছে আটটি চরিত্রের। এর মধ্যে পাঁচটি মুখ্যচরিত্র এবং বাকি তিনটি কাহিনির প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়েছে। গৌণ চরিত্রগুলোর একজন চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যের সেটেলমেন্টের অফিসার। জমিদার বাড়ির মন্দিরের মূর্তি এবং দেয়ালের চিত্র তার কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গুরুত্ব পায়। বাড়ির পুরনো ভৃত্য প্রসন্নের সঙ্গে তার যে কথা হয়, তা থেকে এ স্পষ্ট হয় যে, বর্তমানে টিকে থাকলেও এই জমিদারবাড়ি এবং এর মানুষেরা যেন হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতিনিধি। এদের কেবল একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে; তার বাইরে এদের নিয়ে মানুষের বিশেষ আগ্রহ নেই।

বাকি দুই গৌণ চরিত্র– দেবাশিস ও অভিজিৎ ফিল্ম ইউনিটের সদস্য। এদের মধ্যে দেবাশিস পরিচালক দীপংকরের অ্যাসিস্টেন্ট আর্ট ডিরেক্টর। দেবাশিসের কাছ থেকেই বনলতা জানতে পারে দীপংকরের অসুখী দাম্পত্যের কথা, সুদেষ্ণার সঙ্গে পূর্ব সম্পর্কের কথা। বনলতা ও দেবাশিসের ভেতর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাই-বোনের মতো একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তৃতীয় গৌণ চরিত্র অভিজিৎ চোখের বালি চলচ্চিত্রের একজন অভিনেতা। কিছুটা উদ্ধত স্বভাবের এবং নৈতিকভাবে দুর্বল চরিত্র রূপে তাকে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বনলতা এ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে ঘিরেই বাড়িওয়ালির পুরো গল্পটির আবর্তন ঘটেছে। দুজন গৃহকর্মী– মালতী ও প্রসন্ন ছাড়া তার কোনো সঙ্গী নেই। তার নিস্তরঙ্গ জীবনে নাড়া দিয়েছে দীপংকর। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি সংযোগ সেতু হিসেবে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়েছে। শুধু ভাড়ার জন্যেই বাড়িতে শুটিং করতে দেয়নি বনলতা। দীপংকরকে দেখে তার মনে হয়েছিল, ‘একে দেওয়া যায়।’ দীপংকরের আগমনে তার দীর্ঘ কুমারী জীবনের চেতন ও অবচেতন স্তরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তা সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলাতেই ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়িওয়ালির মূল সাফল্য।

ছাদে বসে চুলের বেনী বাঁধতে বাঁধতে মালতীকে রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি পড়ে শোনায় সে। এ সময় মালতী বলে ওঠে, “ধুর! এ বই তোমার একদিনও চলবে না। নাচ নেই, গান নেই, ঝাড়পিট নেই। খালি বিধবার একাদশী করার গল্প।”

মালতীর কাছে বিধবা বিনোদিনী কোনো ধরনের সহমর্মিতা লাভ না করলেও তার বেদনা বনলতাকে ঠিকই স্পর্শ করে। এজন্য মালতীর মতো এক কথায় বিনোদিনীকে সে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে না। হয়তো বিনোদিনীর মাঝেই সে নিজেকে খুঁজে পায়।

অন্যদিকে, দীপংকর চরিত্রটি বেশ বলিষ্ঠ, পুরুষালী এবং সাবলীল। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে তার সদ্ভাব নেই; দুজন পৃথক স্থানে বাস করে। তবে তার মোহনীয় ব্যক্তিত্ব সহজেই নারীদের আকর্ষণ করে। ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে ব্যবহার করে সে তার কাজ সুসম্পন্ন করে।

বনলতার আগে সুদেষ্ণার সঙ্গে দীপংকরের সম্পর্কে আসা যাক। মার্জিত, রুচিশীল ও তরুণী অভিনেত্রী সুদেষ্ণার সঙ্গে এক সময় দীপংকরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর এক সময় সম্পর্কের সেই উষ্ণতা নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও রাত বারোটায় ফোন করে দীপংকর যখন সুদেষ্ণাকে বলে, “আমি ‘চোখের বালি’ করছি। তোমায় বিনোদিনী ভাবছি। ডেটের কী অবস্থা?”

সুদেষ্ণা দ্বিধাহীনভাবে অভিনয় করতে রাজি হয়ে যায়। আর দীপংকরের প্রশ্নের ধরন দেখেও মনে হয়, তার যেন আগেই জানা আছে, সুদেষ্ণা তার কথা উপেক্ষা করতে পারবে না। এদিক থেকে দীপংকরকে বরং কিছুটা আত্মনিমগ্ন এবং পুরুষসুলভ প্রভাব আরোপকারী চরিত্র মনে হয়। বনলতা ও সুদেষ্ণা– দুজনের আবেগকেই সময়ের প্রয়োজনে ব্যবহার করে সে।

তার প্রতি বনলতার যে বিমুগ্ধতা কাজ করছে তাকে কাজে লাগিয়ে সে জমিদারবাড়ির সবকিছু ব্যবহার করার স্বাধীনতা লাভ করে। শুধু বাড়ির অংশ বিশেষের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ফিল্ম ইউনিটের প্রয়োজনে জমিদারবাড়ির নানাবিধ আসবাবপত্র, নিজস্ব বাসনকোসন, এমনকি তার বাবার ছবি পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেয় বনলতা।

একজন অভিনেত্রীর অনুপস্থিতিতে যখন ফিল্ম ইউনিটের কাজ আটকে যায়, তখনই বাড়িওয়ালির গল্প চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে। অভিনয়ে একেবারেই অপারগ হওয়া সত্ত্বেও দীপংকরের জোরাজুরিতে রাজি হয়ে যায় বনলতা। একইসঙ্গে ভীতি ও উত্তেজনা নিয়ে সে প্রাণপণে সংলাপ মুখস্ত করতে থাকে, “এই দুনিয়াটা বড় কঠিন ঠাঁই রে বিনি… এই দুনিয়াটা বড় কঠিন ঠাঁই রে বিনি…।”

লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে সিঁদুর মাথায় দিয়ে ফিল্ম ইউনিটের সবার সামনে সংলাপ বলার সময় তাকে ভীতি ও আড়ষ্টতা পেয়ে বসে। দীপংকর সাহস দিয়ে সবার সামনেই বলে, ;…আপনি আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলবেন। আমার দিকে। আর কারও দিকে নয়। ঠিক আছে?’ দীপংকরের চোখের দিকে তাকিয়ে গড়গড় করে মুখস্ত সংলাপটা পাঠ করে সে। এভাবেই বিমোহিত বনলতাকে সময়ের প্রয়োজনে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগায় দীপংকর। চলচ্চিত্রে বনলতার মন ছোঁয়ার জন্য সে নিজেই দু’বার হাত বাড়িয়ে দেয়।


দীপংকরের স্পর্শ সেই
শাল থেকে সে
অনুভব
করতে
চায়

অন্যদিকে, সুদেষ্ণার দুর্বলতাও প্রায় একই রকম। যখন শুটিংয়ে একজন অভিনেতাকে নিয়ে বিপত্তি ঘটে, তখন সেই পুরুষ অভিনেতাকে বুঝিয়ে ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। শীতল সম্পর্ক সত্ত্বেও দীপংকরের সেই আদেশ উপেক্ষা করতে সক্ষম হয় না সে। এমনকি শুটিং চলাকালীনও সে দীপংকরের একটি কালো শাল পরতে চায়। দীপংকরের স্পর্শ সেই শাল থেকে সে অনুভব করতে চায়। দীপংকরের প্রতি তার কামনার বহিঃপ্রকাশ এই শাল পরতে চাওয়ার অনুরোধ থেকে সুস্পষ্ট হয়।

অবিবাহিত বনলতার মাঝে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রেমাকাঙ্ক্ষা এবং অবদমিত বাসনা-কামনা সুপ্ত ছিল, তা দীপংকরের সংস্পর্শে এসে জেগে ওঠে। সেই দুর্বলতা থেকেই সুদেষ্ণার প্রতি তার নারীসুলভ ঈর্ষাবোধ জন্ম নেয় এবং বিভিন্ন সময়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দীপংকরের জন্মদিনের কথা আগে জানতে পেরে বনলতা তাকে নিজে রান্না করে খাওয়ায় এবং এই খাওয়ানোর কথাটিও সুদেষ্ণাকে সুকৌশলে জানিয়ে ঈর্ষান্বিত করতে চায় সে। তারপর সুদেষ্ণা যখন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য রাতে বাড়ির বাইরে যেতে চায়, তখন ‘বাড়ির গেট বন্ধ হয়ে যাওয়া’র কথা তুলে তাকে সে বাইরে যেতে দেয় না। আবার শুটিং শেষে বেনারস থেকে একটা শাড়ি উপহার পেয়ে শাড়িটি শুধুমাত্র তার জন্য কেনা হয়েছে কি না– দেবাশিসের কাছে তা সুকৌশলে জানার চেষ্টা করে।

বনলতার মাঝে কামনা থেকে জন্ম নেওয়া ঈর্ষাবোধ এবং আকাঙ্ক্ষাকে খুব পরিপাটি রূপে চিত্রিত করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে।

নারীর হৃদয়ের আবেগ, অনুভূতি এবং দৌর্বল্যের জায়গাগুলোকে খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এই চলচ্চিত্রেও বনলতা ও সুদেষ্ণা– দুই চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ, আবেগ ও দমিত বাসনাকে নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। দীপংকরের প্রতি বনলতার দুর্বলতা অনুভব– কিছু সময়ে খুব খোলামেলাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তবে সুদেষ্ণা এই জিনিসটি টের পেয়েও উপেক্ষা করেছে। বনলতার অবচেতন স্তরের কল্পনা এবং অবদমিত বাসনা-কামনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার স্বপ্নদৃশ্যগুলোতে। একটু পরেই এটা নিয়ে আলাপ করছি।

এখন আসা যাক বনলতার দুই গৃহকর্মী– মালতী এবং প্রসন্নের প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রের একটি বড় অংশজুড়ে উপস্থিতি থাকলেও মালতী একটি অগভীর চরিত্র। একজন বাকপটু গৃহকর্মী হিসেবে সে অনেকটা বনলতার নিত্যসঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। তবে তার ওপর বনলতার নির্ভরতা তৈরি হলেও বনলতার ওপর তার নির্ভরতা সৃষ্টি হয়নি।

মালতীকে রেখে বরং কথা বলা যাক প্রসন্নকে নিয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় নির্মিত সবচেয়ে অদ্ভুত অথচ কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্রগুলোর মধ্যে অবশ্যই সে একটি।

বনলতাদের বাড়ির প্রাচীন গৃহকর্মী প্রসন্ন। কথায় কথায় জানা যায়, খুব ছোটবেলায় তারা যখন ‘ডাকাত! ডাকাত!’ খেলত, তখন ডাকাতের ভূমিকা পালন করত প্রসন্ন। অর্থাৎ প্রসন্নের পুরো জীবনটাই কেটেছে এই জমিদারবাড়িতে। বনলতা তাকে নাম ধরে ডাকলেও প্রসন্ন তাকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করে। বাড়ির সব কাজের সে তত্ত্বাবধান করে এবং বনলতার শোবার ঘরেও সে যখন-তখন প্রবেশ করার অধিকার রাখে। অন্য পুরুষের সামনে বনলতার যে কুণ্ঠাবোধ কাজ করে, প্রসন্নের সামনে তার তিলমাত্র কাজ করে না। এমনকি মেয়েলি সব ব্যাপারেও প্রসন্ন কথা বলে, যেমন– পাখা চালিয়ে শাড়ি পরতে অসুবিধে হবে… পাখা বন্ধ থাকুক ইত্যাদি। অর্থাৎ, দেখা যায় সময়ের সঙ্গে প্রসন্নের ‘পুরুষ’ পরিচয়টি বিলীন হয়ে গেছে।

দীপংকরের প্রবল পৌরুষের বিপরীতে প্রসন্নের ‘পুরুষ’ অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমে মনে হয় তার দাসত্ব। প্রসন্নের জীবনভর দাসত্ব বনলতার মন থেকেই তার ‘পুরুষ’ পরিচয়টি বিলীন করে দিয়েছে। এমনকি সে নিজেও হয়তো বনলতার একজন ‘প্রহরী’ হিসেবেই ভাবছে। তাই বলে প্রসন্নের এই পৌরুষহীনতা অন্য গৃহকর্মী মালতী সহ্য করতে পারছে না। মেয়েলি ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করায় ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি প্রবীণ গৃহকর্মী হিসেবে তাকে সাধারণ সম্মানটুকু দেওয়ার অনুষঙ্গকেও সে অস্বীকার করছে। কাজেই, পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও ‘পুরুষ’ পরিচয় বিপন্ন হওয়ার লৈঙ্গিক বিপর্যয়টি উপস্থাপিত হয়েছে প্রসন্ন চরিত্রের মাধ্যমে।

৩.

বাড়িওয়ালি চলচ্চিত্রে বনলতার অবচেতন স্তরের ভীতি-আতঙ্ক, বেদনা এবং অবদমিত বাসনা-কামনার চিত্রায়ন ঘটেছে তিনটি স্বপ্নদৃশ্যে। আলাদাভাবে স্বপ্নদৃশ্য তিনটির কথা উল্লেখ করছি এ কারণে, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এতটা নিখুঁত এবং বাস্তব স্বপ্নদৃশ্য আর কেউ নির্মাণ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

স্বপ্নের উৎপত্তি ঘটে মস্তিষ্কের অবচেতন স্তর থেকে। যেসব চিন্তা-ভাবনা, ভীতি-আতঙ্ক, কল্পনাকে মানব মন অবদমনের চেষ্টা চালায়, সেগুলোরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্বপ্নদৃশ্যে। অবচেতন স্তরের এই বিচিত্র রূপকে শিল্পকলায় স্থান দিতে বিংশ শতকে জন্ম নিয়েছিল নতুন এক ধারা– সাররিয়েলিজম (Surrealism) বা পরাবাস্তববাদ। চিত্রকলা ও সাহিত্যের পথ ধরে একসময় চলচ্চিত্রেও স্থান করে নিয়েছে স্বপ্নের মতো পরাবাস্তব অংশ। কাজেই, চলচ্চিত্রে দেখানো স্বপ্নদৃশ্যেরও উৎপত্তি হওয়া উচিত অবচেতন স্তর থেকে। কিন্তু বাংলা ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রে যেসব স্বপ্নদৃশ্য আমরা দেখি, তাদের বেশিরভাগেরই উৎপত্তি ঘটেছে চেতন স্তর থেকে। এগুলো অনেকটা যেন জেগে জেগে দেখা স্বপ্ন: ঠিক মানব মন যেমনটা চায়, তেমন। এমনকি দীক্ষিত নির্মাতারাও হেঁটেছেন একই পথে।

এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের কাছে যাওয়া যেতে পারে।

নায়ক [১৯৬৬] চলচ্চিত্রে নায়ক অরিন্দমের ভীতি এবং আতঙ্কের দৃশ্যায়ন ঘটাতে সত্যজিৎ রায় দুটো স্বপ্নদৃশ্যের সাহায্য নিয়েছিলেন। একটি দৃশ্যে অরিন্দম ডুবে যেতে থাকে টাকার চোরাবালিতে, অর্থাৎ সমাজ এবং পরিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টাকার মোহে আটকা পড়ার যে আতঙ্ক নায়ককে সব সময় তাড়া করে ফেরে, তার দৃশ্যায়ন ঘটেছে এখানে। অন্য স্বপ্নদৃশ্যে একজন অভিনেত্রীর সঙ্গে স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার দুশ্চিন্তার দৃশ্যায়ন ঘটেছে। উল্লেখ্য যে, এ দুটো স্বপ্নদৃশ্যই অনেকটা আরোপিত এবং পরিকল্পিত। প্রকৃত স্বপ্নদৃশ্যের সঙ্গে এগুলোর সাদৃশ্য নেই। অবচেতন স্তর থেকে জন্ম নেওয়া স্বপ্নগুলো হয় এলোমেলো– বর্তমান-অতীত একাকার হয়ে মিশে গিয়ে অদ্ভুত সব পরিস্থিতির জন্ম হয় সেখানে।

বাড়িওয়ালি চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মিত স্বপ্নদৃশ্য তিনটি এই ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থেই স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। এখন আমরা এই স্বপ্নদৃশ্যগুলোর মধ্য দিয়ে বনলতার অবচেতন এবং অবদমিত স্তরকে আবিষ্কারের চেষ্টা করব।

হতে গিয়েও যে বিয়ে হয়নি, তার বেদনা প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় বনলতাকে। হবু বরকে সাপে কাটার ঘটনা তার জীবনের বর্তমান পরিণতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই সে কল্পনা করে। তার জীবনের ওই অংশটি এসেছে প্রথম স্বপ্নদৃশ্যে।

অতীত-বর্তমান মিলেমিশে একাকার হওয়ার দিকটি এখানে নিখুঁতভাবে এসেছে। দেখা যায়, বর্তমান বনলতা [তরুণী নয়] গায়ে হলুদ মেখে কপালে সিঁদুর মাখা মালতীকে [অথচ মালতী অবিবাহিত এবং বনলতার বিয়ের সময় সে কোনোভাবেই জমিদারবাড়িতে উপস্থিত ছিল না] বলছে, ‘এই মালতী, নিচে যা। বরযাত্রী সব না খেয়ে বসে আছে।’

মালতী উত্তর দেয়, ‘ওরা খাবে না। …লুচি রাবড়িতে বেড়ালে মুখ দিয়েছে। ওরা খাবে না।’ অথচ লুচি রাবড়িতে বিড়ালে মুখ দেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে স্বপ্ন দেখার রাতের কিছুক্ষণ আগে, সন্ধ্যায়।

এরপর দেখা যায়, ঘোমটা দেওয়া কয়েকজন নারী কলাগাছের চারদিকে ঘুরে ঘুরে হিন্দু-বিয়ের স্ত্রী-আচার পালন করছে। বনলতা তাদের দিকে তাকিয়ে জানালা দিয়ে বলে ওঠে, ‘প্রসন্ন! তাড়াতাড়ি করে কলাপাতাগুলো দাও, প্রসন্ন। নিচে ওরা বসে আছে।’

তখন সেই নারীদের মধ্যে লালশাড়ি সিঁদুর পরা প্রসন্নকে ঘোমটা সরিয়ে বলতে দেখা যায়, ‘এ কলাগাছ তো দেওয়া যাবে না, দিদি। …ভেলা তৈরি হবে যে! সাপে কাটা বর তো! কলার ভেলায় ভাসিয়ে দিতে হবে।’

একটু আগেই বলেছিলাম, পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও বনলতার কাছে প্রসন্নের পুরুষ অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার কথা। অর্থাৎ, বনলতা অবচেতনে প্রসন্নকে যে নারীর মতোই ভাবে, সেই দিকটির সুনিপুণ উপস্থাপন ঘটেছে এই স্বপ্নদৃশ্যে।


স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে
বইয়ের পাতা
খুলে দেয়

এবার আসা যাক দ্বিতীয় স্বপ্নদৃশ্যে। ইতোমধ্যে দীপংকরের সঙ্গে বনলতার পরিচয় ঘটেছে। বনলতার দ্বিতীয় স্বপ্নদৃশ্যটির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ছাদ থেকে দেখা মালতীর সঙ্গে তার প্রেমিক নারায়ণের অন্তরঙ্গ দৃশ্য। এই দৃশ্য মূলত তার অবদমিত কামনাকে জাগিয়ে তুলেছে। বাসনার অবদমিত রূপটিকে দেখাতে ঋতুপর্ণ ঘোষ এখানে কিছু রূপকের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। দীপংকরকে লাল রঙে ঘরের দেয়াল রঙিন করতে দেখা যায় এখানে। বনলতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রঙের পাত্র নিচে পড়ে রঙ ছড়িয়ে পড়ে। এরপরেই বনলতা আঠা লাগানো একটি বইয়ের পৃষ্ঠা খুলতে অক্ষম হয়ে বইটি বাড়িয়ে দেয় দীপংকরের দিকে। স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে বইয়ের পাতা খুলে দেয় দীপংকর।

পাতা খোলা মাত্রই রক্তের কণা ছিটকে লাগে বনলতার মুখে। মূলত বনলতার মনে প্রথমবারের মতো কোনো পুরুষের অনুপ্রবেশ এবং পুরুষটিকে শরীর নিবেদনের জন্য তার মন যে প্রস্তুত, তা ফুটে উঠেছে দ্বিতীয় স্বপ্নদৃশ্যটিতে। এখানে বইয়ের বদ্ধ পৃষ্ঠা বনলতার কুমারী মনের প্রতীক এবং স্ক্রু ড্রাইভার দীপংকরের প্রবল পৌরুষের ইঙ্গিত বহন করে।

বনলতার তৃতীয় স্বপ্নদৃশ্যটি বরং আরও কিছুটা খোলামেলা এবং সরাসরি নির্দেশক। এতদিনে দীপংকরের সঙ্গে বনলতার পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। অবচেতন স্তরে জন্ম নেওয়া শারীরিক আকাঙ্ক্ষার চিত্রায়ন ঘটেছে এই স্বপ্নদৃশ্যে। দীপংকরের জন্মদিন জানতে পেরে পরদিন কী করবে, কিছুটা পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে সেদিন ঘুমিয়েছিল সে। এরপর স্বপ্নে দেখতে পেল, সুদেষ্ণার আকর্ষণীয় অন্তর্বাস এবং লেইসফিতা লাগানো একটি সায়া পরিহিত অবস্থায় নকশি কাঁথা গায়ে দিয়ে সে শুয়ে আছে। সেই নকশি কাঁথাটা টানতে টানতে দীপংকর বলে, ‘বাহ! সুন্দর হাতের কাজ তো আপনার।’

বনলতা বলে, ‘এটা আমি বানাইনি। তিন পুরুষ ধরে বানানো হয়েছে।’

নকশি কাঁথা সরে গেলে আলতা দেওয়া পা লজ্জায় ও উত্তেজনায় কুঞ্চিত হতে দেখা যায়। তিন পুরুষ ধরে বানানো নকশি কাঁথা মূলত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক অবস্থানের সীমানাকে নির্দেশ করেছে। প্রয়োজনবোধে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দেয়াল টপকে সে যে দীপংকরকে শরীর দান করতে আকাঙ্ক্ষী ও সক্ষম, তা দৃশ্যমান হয়েছে এই স্বপ্নদৃশ্যে। এছাড়া সুদেষ্ণার অন্তর্বাসে নিজেকে আবিষ্কারের পিছনে কাজ করেছে যৌনচেতনা থেকে জন্ম নেওয়া ঈর্ষাবোধ।

এই তিন স্বপ্নদৃশ্যে বনলতার অবচেতন স্তরের চিন্তা-ভাবনা এবং অবদমিত কামনা-বাসনার নিখুঁত দৃশ্যায়ন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের শক্তিমত্তার পরিচয় আলাদাভাবে নির্দেশ করে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এতটা সুনিপুণ ভঙ্গিতে স্বপ্নদৃশ্য অন্য কোনো পরিচালক নির্মাণ করতে সক্ষম হননি বলে ধারণা করি।

৪.

যে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষিতে বনলতা ও দীপংকরের মাঝে যোগ ঘটেছিল– তা রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি। বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে সুবিস্তীর্ণ প্রভাব, তা থেকে ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। বাড়িওয়ালিতে দীপংকরকে দিয়ে নির্মাণ করালেও ২০০৩ সালে তিনি নিজে চোখের বালি নির্মাণ করেন। অর্থাৎ তাঁর নিজের পরিচালক সত্তার ছায়া কিছু ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হছেন দীপংকর চরিত্রে।

একজন মধ্যবয়সী নারীর একাকী অস্তিত্ব, পুরুষের সংস্পর্শে এসে তার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং তার অবচেতন স্তরের অবদমিত বাসনা কামনার নিখুঁত চিত্রায়নেই বাড়িওয়ালির মূল সাফল্য নিহিত। যে স্বতন্ত্র ভঙ্গি ও ভাষায় ঋতুপর্ণ ঘোষ এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বাড়িওয়ালি চলচ্চিত্রে বেশ কয়েকবার জোর শব্দে তুলো ধুনো করার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সময়ে সময়ে বনলতার মনে যে চঞ্চলতা ও উত্তেজনার জন্ম হয়েছে, তা ‘তুলো ধুনো’ করার দৃশ্যের রূপকে ঋতুপর্ণ ঘোষ দেখিয়েছেন। এই তুলো ধুনোর মতো অজস্র রূপকের সাহায্যে নিজস্ব ভঙ্গিতে তিনি দেখিয়েছেন বনলতার অধীরতা এবং অবচেতনে জন্ম নেওয়া কামনা-বাসনার অবরুদ্ধ ভুবন।


চলচ্চিত্রের
শেষ দৃশ্যের খালি
বিছানাটা মানুষের সেই
চিরকালীন একাকীত্বকেই
যেন নির্দেশ
করে

মানব মন অবিরাম আশ্রয় খুঁজতে থাকে, তবে দিনশেষে একান্ত আপন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বনলতাও আশ্রয় খুঁজেছে, দীপংকরের পুরুষালি বলিষ্ঠ প্রকৃতির ভ্রমজালে আটকা পড়েছে। তারপর একটা সময়ে যেয়ে একাকীত্বের নিরেট কঠিন সত্যটি অনুভব করেছে। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের খালি বিছানাটা মানুষের সেই চিরকালীন একাকীত্বকেই যেন নির্দেশ করে। বনলতার নিজস্ব ভুবন আবিষ্কারে ঋতুপর্ণের এই যাত্রা চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীদের সাবলীল অভিনয় অনেকাংশেই সহজ করেছে।

এই চলচ্চিত্রে বনলতা চরিত্রে অভিনয় করে কিরন খের ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী’ এবং মালতী চরিত্রের জন্য সুদীপা চক্রবর্তী ‘শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী’ হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ অর্জন করেন। পাশাপাশি ২০০০ সালের বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নেটপ্যাক [The Network for the Promotion of Asian Cinema] অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়িওয়ালি

সাধারণ দর্শকদের চেয়ে মূলত জীবন অনুসন্ধানী ও দীক্ষিত দর্শকদের পক্ষে বাড়িওয়ালির প্রকৃত রস আস্বাদন করা সহজ হয়, তবু বাংলা চলচ্চিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ধারায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ হিসেবে এর আবেদন অক্ষুণ্ণ থাকবে।


ঋণস্বীকার:
Rohit K. Dasgupta, Tanmayee Banerjee; Exploitation, Victimhood, and Gendered Performance in Rituparno Ghosh’s Bariwali. Film Quarterly 1 June 2016; 69 (4): 35–46.

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সাহিত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র অনুরাগী। শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন