হাত ধরাধরি করে বেড়ে ওঠা ইরানি সিনেমা ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি [২/৬]

0
187
কিয়ারোস্তামি, ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে

মূল । হামিদ দাবাশি
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

প্রথম কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

কিস্তি-২


১৯৬০ দশক

১৯৬০ দশকে কিয়ারোস্তামি যখন কৌশোর ছেড়ে তারুণ্যের জীবন শুরু করলেন, তখনো ইরানি সিনেমা তার জন্য কিংবা তার প্রজন্মের অন্য কারও জন্য তেমন কিছুই তৈরি রাখতে পারেনি। প্রতি বছর গড়ে ২৫টির মতো সিনেমা নির্মিত হলেও, বস্তাপচা ইমেজ ও আইডিয়ায় ভরা এই সিনেমাগুলো ছিল একটির তুলনায় অন্যটি আরও বাজে। প্রচলিত পন্থায় স্ক্রিপ্ট লেখা ও সিনেমা বানানোর মাধ্যমে ইরানি থ্রিলারের মাস্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিলেন সামুয়েল খাচিকিয়ান।

এ দশকের ফিল্মমেকিংয়ের মূলধারা ছিল দুটি– থ্রিলার ও মেলোড্রামা। ইরানি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল, আর শিশুমৃত্যুহার কমে আসায় জনসংখ্যার বড় অংশটিই ছিল বয়সে তরুণ। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে বড় বড় মহানগরের কেন্দ্রে চলে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল হু-হু করে। এই অভিবাসী কর্মজীবীদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল– পেটি বুর্জোয়া শ্রেণিতে ঢুকে পড়তে পারা; যদিও অন্যদিকে, রাজধানীর শহরতলিতে গড়ে ওঠা বস্তিগুলোতে থাকা মানুষের সংখ্যাও ছিল প্রচুর।

পেটি বুর্জোয়া শ্রেণির সংখ্যা এমন হু-হু করে বাড়ার ফলে, ইরানি মেলোড্রামাটিক সিনেমায় উপার্জনের একটি নিয়মিত উৎসের অবতারণা ঘটে।

অন্যদিকে, সমাজ তখন পৌঁছে গিয়েছিল বিরাট এক আন্দোলনের কিনারে। ১৯৬১ সালে আয়াতোল্লাহ বরুজেরদির মৃত্যু শিয়াধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতায় ক্ষমতার একটি বিরাট শূন্যস্থান তৈরি করে দেয়। তার মৃত্যুর পরপরই আয়োজিত এক সমাবেশে, একটি ক্রমবর্ধমান জটিল ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে কে থাকবেন– সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা ও কর্তৃপক্ষবর্গ।


দুনিয়ায় ইরানকে আমেরিকার
পাশে নিয়ে যাওয়ার
নির্দেশগুলো
বিশেষত
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে

১৯৬০ সালে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে পাহলাভি রাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলে, ধর্মীয় নেতারা সেটির বিরোধিতা করেছিলেন; আর এ বিষয়টিই রাষ্ট্র ও আয়াতোল্লাহদের [ধর্মীয় শীর্ষ নেতৃত্ব] সম্পর্কের ভীষণ বৈরিতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ১৯৬২ সালে রাজশাসক ভূখণ্ডটির বড় অংশে সংস্কার চালান, এবং ধর্মীয় নেতাদের ঠেলে দেন কিনারায়। দুনিয়ায় ইরানকে আমেরিকার পাশে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশগুলো বিশেষত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি যে সকল ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী এর বাইরে ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্টার্ন ইউরোপের সঙ্গে ইরানের একাত্মতার বিষয়টি তাদেরকেও গুরুতর চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়।

১৯৬২ সালে প্রকাশিত জালাল আল-ই-আহমাদের ওয়েস্টস্ট্রাকনেস [Gharbzadegi] গ্রন্থটি সম্ভবত এই অসন্তোষের সবচেয়ে সেরা ইঙ্গিত। যদিও এ ধরনের অসন্তোষ, এবং কেনেডি প্রশাসন থেকে আসা নির্দেশনার মধ্যেই, ১৯৬৩ সালে নিজের হোয়াইট রেভুলেশন [Enghelab-e Sefid] শিরোনামের সংস্কার প্রকল্প চালু করেন শাহ। ফলে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা হুমকির মুখে পড়ে।

আয়াতোল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে একত্রীভূত হয়ে, রাজতন্ত্রের বিপক্ষে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ১৯৬৩ সালের জুনের বিদ্রোহটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং অপেক্ষাকৃত ব্যাপক আকার ধারণ করলেও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে খোমেইনিকে নির্বাসনে যেতে, এবং বিদ্রোহ দমনে বাধ্য করা হয়।

নাইট অব দ্য হাঞ্চব্যাক
ফিল্মমেকার । ফারোখ ঘাফফারির

এ সব বিষয়ে ইরানি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ছিলেন ক্ষুব্ধ; একটি নবজীবনপ্রাপ্ত, অথচ চাপা প্রত্যাশা ভেসে বেড়াতে থাকে হাওয়ায়। অবশেষে এইসব পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দিতে শুরু করে ইরানি সিনেমা। ১৯৫০ দশকের বাণিজ্যিক সিনেমার দুঃস্বপ্ন থেকে একটি সংস্কারমূলক প্রস্থানের প্রথম সংকেতটির দেখা মেলে ফারোখ ঘাফফারির নাইট অব দ্য হাঞ্চব্যাক [Shab-e Guzi; ১৯৬৪] ফিল্মটিতে। সমকালীন সমালোচক হাজির দারিউশ প্রবল উচ্ছ্বাসে দাবি করেন, দ্য থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস বা আরব্য রজনীর কাহিনির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সিনেমাটির মধ্য দিয়েই ইরানি সিনেমার সিরিয়াস সূচনা ঘটেছিল।

দ্য হাউস ইজ ব্ল্যাক
ফিল্মমেকার । ফরুঘ ফাররোখজাদ

এই ফিল্মটি এবং আরও দুটি মেজর ফিল্ম– ফরুঘ ফাররোখজাদের দ্য হাউস ইজ ব্ল্যাক [khaneh siah ast; ১৯৬২] ও এবরাহিম গোলেস্তানের অ্যাডোব অ্যান্ড মিরর [Khesht va Ayeneh; ১৯৬৫] বস্ততপক্ষে ফিল্মমেকিংয়ে একেবারেই নতুন একটি সিনেমাটিক ট্র্যাডিশন প্রবর্তন করে। তবে সেই একই বছরে, ইরানি সিনেমার ইতিহাসের তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সিনেমা ক্রোজাস’ ট্রিজার [Ganj-e Qarun; সিয়ামাক ইয়াসেমি; ১৯৬৫] ইরানি গণ-দর্শকের মধ্যে লাম্পট্যের মেলোড্রামাডিক সেলিব্রেশনের স্বাদ ছড়ানো অব্যাহত রেখে নির্মিত হয়– যে মহামারিটি [লাম্পট্য] ইরানি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বাজে বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হিসেবে স্থায়ী হয়ে যাওয়াকে প্রভাবিত করার ও অব্যাহত থাকার ক্ষমতা কখনোই হারায়নি!

ক্রোজাস’ ট্রিজার
ফিল্মমেকার । সিয়ামাক ইয়াসেমি

ক্রোজাস’ ট্রিজার-এর বাণিজ্যিক সাফল্য সে বছরে বছরপ্রতি ইরানি ফিল্মের প্রোডাকশন সংখ্যা ৩৯ থেকে ৫২টিতে উত্তীর্ণ করে– যেগুলোর বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছিল এই ফিল্মটির ফর্মুলাকে অনুসরণ করে; আর এ কারণে সামগ্রিকভাবে ক্রোজাস’ ট্রিজারধর্মী সিনেধারার উত্থান ঘটে।

এই ফিল্মগুলোর সর্বনাশা পরিণতির জন্য আরও অধিকতর বিকাশ লাভ করা সাহিত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠা ১৯৬০ দশকের সিনেমাগুলোকে খেসারত দিতে হয়। ১৯৬০ সালে মারা যান নিমা ইউশিজ; তবে তার কাব্যিক উত্তরাধিকারী– আহমাদ শামলু, মেহদি আখাভান-সালেস, ফরুঘ ফাররোখজাদ ও সোহরাব সেপেহরির মধ্যে সে যুগের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ খুঁজে পাওয়া যায়।


মর্মান্তিক
অকালপ্রয়াণের
আগে, ফাররোখজাদ
কাব্য-বিন্যাসের এমন আমূল
পরিবর্তন এনে দিয়ে
গেছেন– যা
তার
সংস্কৃতি এর আগে
কখনোই অর্জনকরতে পারেনি

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ফাররোখজাদের অ্যানাদার বার্থ [Tavalodi Digar] কাব্যগ্রন্থটি এ ভাষার আধুনিক সাহিত্যের সৃজনশীলতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৬৭ সালে মর্মান্তিক অকালপ্রয়াণের আগে, ফাররোখজাদ কাব্য-বিন্যাসের এমন আমূল পরিবর্তন এনে দিয়ে গেছেন– যা তার সংস্কৃতি এর আগে কখনোই অর্জন করতে পারেনি। ফিকশনের রাজত্বে, কম গুরুত্বপূর্ণ কোনোকিছুই আর জায়গা করে নিতে পারেনি।

১৯৬২ সালে প্রকাশিত আলী মোহাম্মদ আফগানির লেডি আহু’স হাসবেন্ড [Shohare Ahu Khanoom] উপন্যাসটি পারস্য সাহিত্যের একটি মাইলস্টোন হিসেবে সার্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করে। সাদেক চুবাকের দ্য প্যাসেন্ট স্টোন [Sang-e Sabur] উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে।

১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় হৌশাং গোলশিরির প্রিন্স এহতেজাব [Shazdeh ehtejab] ও সিমিন দানেশভারের সাভুশুন [Savushun] উপন্যাস দুটি। সিনেমা, কথাসাহিত্য ও কবিতায় ১৯৬০ দশকে ইরানিদের অর্জন এমনই গৌরবের ছিল, যা নিয়ে কিয়ারোস্তামির অনুতাপ করার কোনো সুযোগ ছিল না।

লেডি আহু’স হাসবেন্ড
ফিল্মমেকার । দাভুদ মোল্লাপুর

সিরিয়াস ফিল্মমেকারদের একটি নতুনধারার উত্থান ঘটছিল এ সময়ে। ঘাফফারি, ফাররোখজাদ ও গোলেস্তানের সাফল্যের পরপরই, দাভুদ মোল্লাপুর নির্মাণ করেন লেডি আহু’স হাসবেন্ড [Shohare Ahu Khanoom; ১৯৬৮]। আলী মোহাম্মদ আফগানির লেখা একই শিরোনামের উপন্যাসটির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সিনেমাটি ইরানি জনপ্রিয়ধারার সিনেমার সকল ক্লিশেপনাকে এক ঝটকায় বাতিল করে দিয়ে, শহুরে জীবনের একটি বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতির সন্ধান দিয়েছে। সমালোচক মহলে বিরাট প্রশংসা অর্জন করা এই সিনেমাটি জানান দিয়েছে, গণমানুষের নিকৃষ্ট প্রবৃত্তিগুলোকে ফাঁদে আটকানোর প্রবণতা থেকে ইরানি সিনেমা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবেই।

এর পরের বছরই, শীর্ষস্থানীয় ইরানি নাট্যকার গোলাম-হোসেইন সায়েদির লেখা গল্প অবলম্বনে দারিউস মেহরজুই নির্মাণ করেন দ্য কাউ [Gav; ১৯৬৯]। আর এই সিনেমাটিই হয়ে ওঠে ইরানি সিনেমার প্রকৃত পরিচয়ের সূচনাবিন্দু। নিজের পালিত গাভীর প্রতি গভীর মমতায় মগ্ন একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত যে আমৃত্যু পাগল হয়ে রইল– সেই লোকটির চরিত্রে এজ্জাতোলাহ এনতেজামির অবিস্মরণীয় অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই সিনেমাটি ইরানি সিনেমায় একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়ে দেয়। ফিল্মমেকার হিসেবে মেহরজুই এমন কিছু অর্জন করেন– যা তার আগে ইরানি সিনেমায় আর কেউ অর্জন করতে পারেননি : বৈশিষ্ট্য ও নির্দেশনা দিয়ে, সক্ষমতাকে সুস্পষ্ট করে, ইরানি সিনেমাকে বৈশ্বিক মনোযোগে পৌঁছে দেন তিনি।

দ্য কাউ
ফিল্মমেকার । দারিউস মেহরজুই

মাসুদ কিমিয়াইয়ের কায়সার [Qeysar; ১৯৬৯] যদিও দ্য কাউ-এর তুলনায় ছিল হালকা মেজাজের, তবু এটিও যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। তবে টেকনিক্যাল ও ডিরেক্টোরিয়াল প্রতিভা সত্ত্বেও, কায়সার আসলে ১৯৫০ ও ১৯৬০ দশকের প্রসারণমান লাম্পট্যবৃত্তিকে আরেকটু খ্যাতিমান করে তোলা ছাড়া ইরানি সিনেমায় তেমন কোনো ভূমিকাই রাখেনি। কায়সার-এর কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ফিল্ম জাহেলি’ ধারার সেই লাম্পট্যময় পৌরুষত্ব রয়ে গিয়েছিল– যেটি নারীদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের শুদ্ধতার প্রশ্নে পুরুষতন্ত্রকে ‘সম্মানিত’ করেছে!

১৯৬০ দশকে ফরুঘ ফাররোখজাদ, সোহরাব সেপেহরি, আহমাদ শামলু ও মেহদি আখাভান-সালেস কবিতায় যে বিশিষ্টতা অর্জন করেন, আধুনিকতাবাদী কবিতার সেই সবচেয়ে বর্ণাঢ্য মুহূর্তগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইরানি সিনেমা তার শ্রেষ্ঠত্বের সিদ্ধিলাভ করে। ফরুঘ ফাররোখজাদ হয়ে ওঠেন তার প্রজন্মের সবচেয়ে কাব্যবাগীশ কণ্ঠস্বর। তিনি শুধুমাত্র নিপীড়িত নারীবাদের কথাই বলেননি, বরং নিষিদ্ধ ভাবনাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে গেছেন।


সন্দেহ হয়ে উঠেছিল
এ যুগের
থিম

দুনিয়ায় বিস্ময়ের একটি আদিম মুহূর্তকে উপলব্ধি করতে, নিজের যুগের গভীর রাজনীতিকরণের ভেতর ছুরি চালিয়েছেন সোহরাব সেপেহরি। একেবারেই ‘মানুষ’ হিসেবে একটি বৈপ্লবিক অহংবোধের জয়গান গেয়ে গেছে শামলুর কবিতা। একটি সমগ্র জাতির অবদমিত ক্রোধ আর মর্যাদার অনুসন্ধানের উদীয়মান ঐকতান প্রকাশ করেছেন আখাভান-সালেস। ইরানি আধুনিকত্বের ইতিহাসে আর কোনো সময়কাল বন্ধনমুক্তির রূপকধর্মী শিহরণে এতটা ঋদ্ধ ছিল না কখনোই। সন্দেহ হয়ে উঠেছিল এ যুগের থিম।

সারা দুনিয়া ছিল অস্থিতিশীল, মানুষ ছিল শিকড়বিহীন, বাস্তবতা ছিল নিরাকার, সম্পর্কগুলো যাচ্ছিল বদলে, আর আদর্শগুলো হয়ে পড়েছিল বোবা। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতার এ সকল অস্থিরতার মধ্যেই, বাতাসে একটি নিশ্চিত ঐক্য ভেসে বেড়াচ্ছিল : ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ কবিরা যা যা প্রচার করে গেছেন আর তাদের পাঠকেরা যে সকল স্বপ্ন দেখেছেন– এ দুটির মধ্যে একটি সামঞ্জস্যতা। বিশেষ করে জগতে একজন ব্যক্তিমানুষের উপস্থিতির আত্ম-স্বচ্ছতাকে অধীরভাবে উপলব্ধি করার সম্ভাব্যতা জাহির করে গিয়েছিলেন নিমা– তার দেখানো পথেই ফরুঘ ফারোখজাদ ও সোহরাব সেপেহরির কবিতায় মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এনে দেওয়ার এমন ক্ষমতা ছিল।

ক্ল্যাসিকেল কবিতার সকল প্রতিনিধিত্বশীল মেটাফিজিকগুলো নিমাধর্মী বিপ্লবে পদচিহ্ন রেখে গেছে; নান্দনিকভাবে আপত্তিকর হয়ে ওঠা কবিতাকে আমূল খারিজ করে দেওয়ার কাজটি সাহসিকতার সঙ্গে করে গেছেন সেপেহরি ও ফাররোখজাদ। তাদের কবিতা সেই আপত্তিকর অবস্থার প্রতি একটি সক্রিয় বৈশিষ্ট্য– যা এটির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার অগ্রভাগে, পৃথিবীর একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে অর্জন করেছে।

পৃথিবী যেখানে পৃথিবীচ্যূত, জীবন যেখানে অনভিজ্ঞতা, বাস্তবতার যেখানে নেই কোনো আত্ম-স্পষ্টতা, এবং জীবনের আত্ম-স্বচ্ছতা যেখানে আর অনধিগম্য নেই– সেই পৃথিবীতে এই ফর্মটির অকপটতা ও গুণমানের মধ্যে একটি বাদ্যযন্ত্রতুল্য অনধিকারপ্রবেশ ঘটিয়েছেন তারা।

১৯৭০ দশক

১৯৭০ দশকে, ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ং অ্যাডাল্টস [Kanun-e Parvaresh-e Fekri Kudakan va Noja-vanan] বা কানুন ইনস্টিটিউটের ফিল্ম ডিভিশন হয়ে ওঠে ইরানি সিনেমার অগ্রগতির একটি মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু। আব্বাস কিয়ারোস্তামি এবং তরুণ ফিল্মমেকারদের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্ম ছিলেন এর অগ্রপথিক। ইরানি তারুণ্যকে রাজনৈতিকভাবে অহিংস বিনোদনে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশে পাহলাভি রাজতন্ত্র পরিচালিত সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি জেনারেল প্যাটার্নের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কানুন। তবে স্বভাবতই কানুন হয়ে ওঠে সরকারের জন্য এক দুঃসাহসী যোদ্ধার ঘোড়া! আহমাদ শামলুর কবিতা থেকে শুরু করে সামাদ বেহরাঙ্গির ফিকশন পর্যন্ত– সাহিত্যের সবচেয়ে বিধ্বংসী কাজগুলোর কয়েকটিকে সিনেমায় রূপান্তরিত করার পেছনে অর্থলগ্নি, এবং সেগুলো ব্যাপক পরিসরে ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব পালন করে কানুন।

অন্যদিকে, রাজশাসক বা শাহের জন্য অবশ্য নিজের নাকের ডগায় চর্চিত হওয়া প্রতীকধর্মী বিধ্বংসী কাউন্টারকালচার সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়েও অনেক বড় বড় বিষয় ছিল মাথা ঘামানোর। অপেক-এ [অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস] ইরানের অবস্থান ১৯৭০ দশকের শুরুতে বেশ শক্তিধর হয়ে ওঠে; এবং তেল থেকে উপার্জিত রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় অভূতপূর্ব। ইরানের উত্তরাঞ্চলে সিয়াকাল বিদ্রোহ [সিয়াকাল : ইরানি শহর] এবং এ ধরনের বেশকিছু গেরিলা আন্দোলনকে নৃশংসভাবে দমন করা হয়। আয়াতোল্লাহ খোমেইনিকে নির্বাসনে পাঠানো হয় ইরাকে; আর দেশের ভেতরে থাকা তার সমর্থকদের হতে হয় ভয়াবহ হত্যার শিকার। রাজ্যশাসন সম্পূর্ণভাবে শাহের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ইরানি অর্থনীতিতে তেল রপ্তানি থেকে আসা অর্থের পরিমাণ সকল অনুমান ছাড়িয়ে যায়, এবং বাকি সবকিছুই আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে : যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, পাকিস্তান থেকে আলু, থাইল্যান্ড থেকে চাল, ভারত থেকে পেঁয়াজ, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কমলা, ডেনমার্ক থেকে পনির, নেদারল্যান্ডস থেকে মুরগী, ইসরায়েল থেকে ডিম, তুরস্ক থেকে ভেড়া, এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বরফজাত মাংস।


অগভীর
বুদ্ধিজীবীদের
নিয়ে গড়ে উঠেছিল
রাজনৈতিকভাবে বিমূঢ়
একটি পুরো
প্রজন্ম

এই সর্বনাশা অর্থনৈতিক কাউন্টারডেভেলপমেন্টের অর্থ ছিল, রাজপরিবারের অপরিমেয় সম্পদ-ভাণ্ডার; আর এর [রাজপরিবার] প্রভুত্ব মেনে নিয়ে, ইরানি পেটি বুর্জিয়া শ্রেণির আকার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল, বেনিয়ান বুর্জোয়ার স্বতঃস্ফূর্ত সমৃদ্ধি ঘটছিল, জাতীয় অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অবস্থা হয়ে পড়েছিল একেবারেই ধ্বংসোন্মুখ, কর্মজীবী শ্রেণির বৃদ্ধি গিয়েছিল আটকে, নাগরিক সমাজের ঘটে গিয়েছিল সম্পূর্ণ বিনাশ, সকল ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়ে গিয়েছিল ছেদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলোকে করা হয়েছিল দমন। ফলে অগভীর বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিকভাবে বিমূঢ় একটি পুরো প্রজন্ম।

১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে, নিজের ক্ষমতা-অন্ধত্বের প্রবণতার ফল হিসেবে, শাহ অবশেষে গণতন্ত্রের যে কোনো ধরনের উপস্থিতিকে পরিত্যাগ করে, রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে রাসতাখিজ [রিকারেকশন] পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। রাজশাসক সবাইকে নির্দেশ দেন– হয় এই পার্টিতে যোগ দিতে হবে, নয়তো ছাড়তে হবে দেশ।

এইসব নৃশংস বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের বিপরীতে, আব্বাস কিয়ারোস্তামি নিখুঁতভাবে নিজেকে জড়িয়ে নেন একেবারেই আলাদা এক দুনিয়ায়। দুনিয়াকে কীভাবে আলাদা চোখে দেখা সম্ভব– সেই শিক্ষা আমাদের দেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। নিজের বন্ধুতুল্য সত্তা– সোহরাব সেপেহরির মতো, কিয়ারোস্তামি আওয়াজ তোলেন– একটি অলিখিত ফলক থেকে বাস্তবতাকে যেন নতুনভাবে পাঠ করা হয়, যেন দুনিয়া আবারও হয়ে ওঠতে পারে অর্থবহ ও বিশ্বাসযোগ্য।


কিয়ারোস্তামির সিনেমা সবসময়ই
সাদামাটা দৃষ্টিশক্তির ভেতর
গুপ্ত থাকা অন্যতর
দৃষ্টির প্রকাশ
ঘটায়

কিয়ারোস্তামির সিনেমা সবসময়ই সাদামাটা দৃষ্টিশক্তির ভেতর গুপ্ত থাকা অন্যতর দৃষ্টির প্রকাশ ঘটায়। দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি ফিল্মে আমরা দেখা পাই তার ফিল্মি সংবেদনশীলতাসমূহের সবচেয়ে প্রথম গঠন। মাত্রই টাটকা একটি পাউরুটি কিনে, বাচ্চা ছেলেটি যখন বাড়ির পথ ধরেছে, একটি বেওয়ারিশ কুকুরের সামনে পড়ে যায় সে।

দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি
ফিল্মমেকার । আব্বাস কিয়ারোস্তামি

প্রথমে ভীষণ আতঙ্ক, উদ্বেগ আর হতভম্ব অবস্থায় পড়ে যায় ছেলেটি। পরে সে চেষ্টা করে সাবালকত্ব দেখানোর; আর তা তাকে দিকভ্রান্ত করে নিয়ে যায় একটি অপরিচিত ও উদ্দেশ্যহীন যাত্রায়। তারপর বাড়ি ফিরে যেতে, উপস্থিতবুদ্ধির ব্যবহার ঘটিয়ে, কুকুরটির দিকে এক টুকরো রুটি ছুড়ে দেয় সে।

এই ফিল্মটির মেথড এটির যথাযোগ্যতা ও স্পষ্টতার বিচারে একটি টিপিক্যাল কিয়ারোস্তামিধর্মিতাকে জাহির করেছে। এখানে ক্যামেরাওয়ার্কটি অল্পবয়সী বালক ও পথ-কুকুর সহকারে একেবারেই স্বাচ্ছন্দ ও উপলব্ধিক্ষম হয়ে উঠেছে [যদিও কখনো কখনো এটির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা হয়ে উঠেছে ত্রুটিপূর্ণ]। এই গল্পটির যে কোনো ‘নীতিবোধ’ই অনেকটা নজরে না পড়ার মতো ভীষণরকম অকথিত। এই শর্টফিল্মটি থেকে নেওয়ার মতো যদি কোনো ‘শিক্ষা’ থেকে থাকে, তাহলে তা অনেকটাই তাৎক্ষণিকভাবে উল্টোধর্মী– যেখানে আমরা দেখি, ছেলেটি নিরাপদে বাড়ি পৌঁছুতে পেরেছে, এবং তার দরজার সামনে পথ-কুকুরটি আয়েশেই বসে আছে, যেন অপেক্ষা করছে আরেক বালকের– যার হাতভর্তি মুদিদ্রব্য।

প্রথম বালকটির হতভম্ব অবস্থাটি এখন দ্বিতীয় বালকটির মধ্যে ফুটে ওঠে; অথচ, এই আতঙ্ক-জাগানিয়া কুকুরটিকে পাশ কাটানোর জন্য এক টুকরো রুটি ছুড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় সে কিছুতেই নেই।

সাংস্কৃতিক সীমানার উর্ধ্বে উঠে শিশুদের জগতের ওপর গবেষণা করা এবং পরিহাসের প্রতি ঝোঁক থেকে কিয়ারোস্তামি খুঁজে পেয়েছেন সেই গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষগুলো– যেগুলোর মধ্যে দ্বিমুখী বৈপরীত্যগুলো ভেঙ্গে পড়েছে; উদাহরণস্বরূপ, যেখানে শাস্তি পরিণত হতে পারে আনন্দে।

ব্রেকটাইম
ফিল্মমেকার । আব্বাস কিয়ারোস্তামি

ব্রেকটাইম ফিল্মে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এমন এক অল্পবয়সী বালকের কাহিনি, যে তার বল মেরে একটি জানালার কাচ ভেঙ্গে ফেলে, আর তার শাস্তি হিসেবে ক্লাসের বাইরে বের করিয়ে দিয়ে, দাঁড় করিয়ে রাখা হয় তাকে। বাড়ি ফেরার পথে সে দেখতে পায় একটি ফুটবল ম্যাচ চলছে; তারপর সে উদ্ভ্রান্তের মতো শহরটির উপকণ্ঠে ঘুরে বেড়ায়। স্কুলজীবনের একঘেয়ে রুটিনের বাইরে, এই অভিযাত্রিক দিনটিতে সে শান্তভাবে বিদ্রোহী সম্ভাবনাগুলোর ইঙ্গিত দেয়। খেলতে খেলতে জানালার কাচ ভেঙ্গে দেওয়া থেকে শুরু করে, ফুটবল খেলার উল্লাসমুখর খেলা-পাগল মানসিকতাকে ফুটিয়ে তুলে, শেষ পর্যন্ত একটি সংরক্ষিত শহুরে জীবনের উপকণ্ঠে অনির্ণিতভাবে এগিয়ে যাওয়া– এই ন্যারেটিভটি ছেলেটির এই ‘ব্রেকটাইমের’ প্রাথমিক অতিক্রমকে রঙিন করে তোলে।

ব্রেকটাইম বা ছুটির সময়ে, আমরা অশান্তিকর সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রথমদিকের এক্সপেরিমেন্টেশনের কিছু দেখা পাই, যা কিয়ারোস্তামি চাতুর্যের সঙ্গে সারল্যমাখা ক্যামেরায় দৃশ্যবন্দি করেছেন। তার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় এমনটাই চলতে থাকে। অবশেষে দ্য কোকের ট্রিলজি [ওরফে, রোস্তাম-আবাদ ট্রিলজি] বানাতে এসে, বিশেষ করে এ ট্রিলজির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফিল্ম লাইফ, অ্যান্ড নাথিং মোর…-এ কিয়ারোস্তামির সিনেমার এই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যটি পূর্ণাঙ্গভাবে চাঙ্গা ও বিকশিত হয়।

দ্য এক্সপেরিয়েন্স
ফিল্মমেকার । আব্বাস কিয়ারোস্তামি

দ্য এক্সপেরিয়েন্স ফিল্মের মধ্য দিয়ে, কিয়ারোস্তামি তরুণদের ভালোবাসার প্রতি নিজের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নৈঃশব্দ অথচ অসহনীয়-রকমের মুভিং ট্রিটমেন্ট চালু করেন। একটি অল্পবয়সী, খেটে খাওয়া কিশোর, একটি ফটোগ্রাফি শপে কাজ করে আর সেখানেই ঘুমোয়। পার্শ্ববর্তী এলাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরী মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় সে। একদিন মনে আশা নিয়ে মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়, এবং নিজেই সেখানে চাকরের কাজ নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেখানে কাজ করতে পারার কিছু প্রত্যাশা তার মনে ডালা মেলে ঠিকই, কিন্তু তাকে সরাসরি মানা করে দেওয়া হলে, সেই সন্ধ্যায় তার সকল আশা উবে যায়।


বিদ্বেষ– বৈশিষ্ট্যটি বস্তুতপক্ষে
কিয়ারোস্তামির সিনেমায়
কখনোই জায়গা
পায়নি

ষাট মিনিটেরও কম রানিংটাইমের এই সিনেমাটি দিয়ে, কিয়ারোস্তামি ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় বিরক্তিকর মহামারি আকার ধারণ করা ‘ধনীর-দুলালির-সঙ্গে-গরিবের-ছেলের-দেখা’ ধারাটিকে পরাভূত করতে সক্ষম হন। তবে নিশ্চিতভাবেই, দ্য এক্সপেরিয়েন্স-এ বিদ্বেষ কিংবা প্যারোডির কোনো লেশমাত্র নেই। বিদ্বেষ– বৈশিষ্ট্যটি বস্তুতপক্ষে কিয়ারোস্তামির সিনেমায় কখনোই জায়গা পায়নি। তার ক্যামেরা একটি তুমুল আবেগপ্রবণ ভালোবাসার বিকিরণ ঘটিয়েছে, আর এতে [ক্যামেরায়] দেখা সবকিছুকে করে নিয়েছে আলিঙ্গন।

ন্যারেটিভের সিম্পলিসিটি, এবং নির্দোষ অবস্থার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বসবাসের সাহসের মধ্য দিয়ে, কিয়ারোস্তামি তার সমকালীন সোহরাব শহিদ-সালেসের গুরুত্বপূর্ণ রকমের সমতুল্য হয়ে উঠেছেন। ১৯৯৮ সালে, শিকাগোতে [যুক্তরাষ্ট্র] স্বেচ্ছা-নির্বাসনজীবনে মৃত্যুবরণকারী শহিদ-সালেসের ইরানি সিনেমায় আবির্ভাব ঘটেছিল হুট করেই। তার অ্যা সিম্পল ইভেন্ট [Yek Etefagh sadeh; ১৯৭৪] ফিল্মটিকে অনেকেই ইরানি সিনেমার টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গণ্য করে থাকেন।

অ্যা সিম্পল ইভেন্ট
ফিল্মমেকার । শহিদ-সালেস

অ্যা সিম্পল ইভেন্ট-এ শহিদ-সালেস তার ক্যামেরাকে শান্ত ও প্রশান্তিময় রেখেছেন– ইরানের উত্তরাঞ্চলের একটি দরিদ্র বালকের জীবনকে পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশে; আর তাতে একটি পবিত্র বিন্যাসের নিরুদ্বেগ ও নিবৃত্তির আবির্ভাব ঘটেছে [ইরানি সিনেমায়]। খুব সহসাই এ ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সিম্পল ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করার যে মুন্সিয়ানা শহিদ-সালেস দেখিয়েছেন, সেটি দিয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী বাজি ধরা সম্ভব। তার কাজের প্রবঞ্চনাপূর্ণ সারল্য খুবই ধৈর্যের সঙ্গে বাস্তবতাকে নিজের [বাস্তবতার] মেটাফিজিক্যালি বা আধ্যাত্মবাদী মধ্যস্থতাকারী মর্মার্থ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, এর [বাস্তবতা] স্বাভাবিকত্বের রহস্যভেদ করতে শুরু করে দেয়।

স্টিল লাইফ [Tabiate Bijan; ১৯৭৪] সিনেমায় শহিদ-সালেস এমন একজন রেলওয়েকর্মীর জীবনের অসহনীয় একঘেয়েমিতাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যার একমাত্র কাজ হলো– সারা বছরে প্রতিদিন একই সময়ে পতাকা নেড়ে একটি ট্রেনকে চলার জন্য সিগন্যাল দেখানো। এখানে আমরা যা দেখি, সেগুলো হয়তো অনুভবযোগ্যও নয়; তবু সেগুলো নিজেদের রূপকাশ্রয়ী অনুভবনীয়তার ‘সামনে’, সেগুলোকে হৃদয়ঙ্গম করা, উপলব্ধি করা, বিশ্লেষণ করা, বিচার করার ‘সামনে’ এসে দাঁড়িয়ে যায়। নিখাদ বস্তুগতের অংশ হয়ে, তাৎপর্য ও দ্যোতনার যে কোনো আরোপকে গুরুত্ব দেওয়াই তার সিনেমার আবরণ হয়ে উঠতে শুরু করে।

এর পরপরই দেশত্যাগ করে জার্মানিতে পাড়ি জমান শহিদ-সালেস, সেখানে নির্মাণ করেন ফার ফ্রম হোম [Dar Ghorbat; ১৯৭৫]। এরপর প্রথমদিকে ইউরোপে, এবং ১৯৯৮ সালে অকালপ্রয়াণের মুহূর্তটি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান। ইরানি সিনেমার ন্যারেটিভ টেকনিকে একটি অমোচনীয় চিহ্ন রেখে গেছেন তিনি।


হামিদ দাবাশি
১৯৫১–। ইরানি-আমেরিকান সিনে-গবেষক ও বহু সিনে-গ্রন্থের রচয়িতা; প্রফেসর, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
[এই গদ্য তার ‘ক্লোজ-আপ : ইরানিয়ান সিনেমা পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ বই থেকে নেওয়া]

গ্রন্থসূত্র

কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা
[ইরানি ফিল্মমেকার আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে নিয়ে গদ্য, তার সাক্ষাৎকার ও সব ফিল্মের রিভিউ]
গ্রন্থনা ও অনুবাদ । রুদ্র আরিফ
পৃষ্ঠাসংখ্যা । ৪৩২
বাংলাদেশি সংস্করণের প্রকাশক । ভাষাচিত্র
প্রথম প্রকাশ । ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মূল্য । ৬৭৫ টাকা
ভারতীয় সংস্করণের প্রকাশক । প্রতিভাস
প্রথম প্রকাশ । জুলাই ২০১৭
মূল্য । ৫০০ রুপি


তৃতীয় কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন