গোদার পাঠ: ৩ [পিয়ের লো ফ্যু]

0
494

লিখেছেন । লাবণ্য দে

আগের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন


নিউ ওয়েভের ছবিগুলো তৎকালীন ফ্রান্সের তারুণ্যের ডকুমেন্টেশান। তাই ছবিগুলো জুড়ে তারুণ্যের স্বভাবগত উছ্বাস, খামখেয়ালিপনা, হঠকারিতা, রাজনীতি এবং অবশ্যই প্রেম। নিউ ওয়েভ এবং তৎকালীন ফ্রান্সের তরুন পরিচালকদের ছবিতে প্রেম বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। জ্যঁ-লুক গোদার প্রেমিক মানুষ, তাঁর ছবি এই প্রেম বিষয়টিকেই এক আইকনিক মাত্রা দিয়ে ফেলে। নিউ ওয়েভের কাপেল বলতেই আমরা দেখতে পাই শঁজেলিজের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসা যুবক যুবতীকে। যুবতী, হাতে করে বিলি করছে ‘নিউইয়র্ক হেরলড ট্রিবিউন’ নামের পত্রিকা– যুবকটি উদ্দেশ্যহীন, ঠোঁটের একপাশে চেপে রেখেছে জ্বলন্ত চুরুট। এই ব্রেথলেস দিয়ে যে নতুন প্রেমের শুরু, তা যেন পিয়ের লো ফ্যুতে এসে পূর্ণ মাত্রা পায়। নিয়মমাফিক প্রেমের ধারণা ছেড়ে বেরিয়ে আসে গোদারের প্রেমিক-প্রেমিকারা। বিবাহ বা একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং মুহূর্তে বাঁচার গান হয়ে আসে প্রেম। প্রেম– যেখানে উচ্ছ্বল, প্রেম– যেখানে মুক্ত, সেইখানে দেখা হয় মিশেল পোকার ও প্যাট্রিসিয়ার, সেইখানে মিলন হয় ফার্দিনান্দ ও মারিয়ানের।

ব্রেথলেস
পিয়ের লো ফ্যু

আমার গোদারের এই তৃতীয় পাঠটি গোদারের নিউ ওয়েভ পর্বের শেষের দিকের ছবি পিয়ের লো ফ্যুর প্রতি নিবেদন– নিবেদন ফার্দিনান্দ ও মারিয়ানের প্রতি, যারা মৃত্যুর ওপার থেকে ফিরে আসে বারবার। পিয়ের লো ফ্যু প্রেমের ছবি। পিয়ের লো ফ্যু বিষাদের ছবি। পিয়ের লো ফ্যু জীবনের ছবি। পিয়ের লো ফ্যু মৃত্যুর ছবি।

ছবির শুরুতেই ফার্দিনান্দের (জ্যঁ-পল বেলমদোঁ অভিনীত) সঙ্গে এক পার্টিতে দেখা হয়ে যায় স্যামুয়েল ফুলারের। স্যামুয়েল ফুলার হলিউডের বি মুভিজের জনপ্রিয় পরিচালক, গোদারের অন্যতম পছন্দের একজন। বি মুভিজ এবং স্বল্প বাজেট ছবির প্রতি নিউ ওয়েভের রাজনৈতিক সমর্থন ও ব্যক্তিগত সখ্যতা শুরুর দিন থেকেই। ব্রেথলেস তাই মনোগ্রাম পিকচারকে উৎসর্গ করে শুরু হয়। পিয়ের লো ফ্যুর শুরুতেও গোদার ছবির প্রধান চরিত্রকে দিয়ে হলিউডের স্বল্প বাজেট জঁর ছবির পরিচালক ফুলারকে জিজ্ঞেস করিয়ে নেন, সিনেমা বলতে কী বোঝেন তিনি।

স্যামুয়েল ফুলার জানান– “Film is like a battleground. Love, Hate, Action, Violence, Death– in one word Emotion”।


প্রেম-ঘৃণা-অ্যাকশান-হিংস্রতা-মৃত্যু,
তার সঙ্গে মিশে
যায় জীবন

গোদার প্রিয় পরিচালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে শুরু করেন নিজের ছবি। পিয়ের লো ফ্যু তাই যেন ফুলারের সিনেমার সংজ্ঞা অনুযায়ী চলতে থাকে। প্রেম-ঘৃণা-অ্যাকশান-হিংস্রতা-মৃত্যু, তার সঙ্গে মিশে যায় জীবন। গোদার ছবির টাইটেলের একনলেজমেন্টে [acknowledgement] স্যামুয়েল ফুলারের নাম দিতে পারতেন। তা না করে, জ্যঁ-লুক ছবির দৃশ্যের মধ্যেই অন্তর্গত করে নেন ফুলারকে, ছবির হৃদয়ের মধ্যে অন্তর্গত করে নেন তাঁর ছবির ভাবনা।

পিয়ের লো ফ্যু

এই ভাবনাকে ছবির ভাষার মধ্যে আত্মীকরণ গোদারের ভীষণ প্রিয় একটি বিষয়। আলেক্সান্দ্রে আস্ট্রুক ‘La Camera Stylo’ প্রবন্ধে প্রথম ক্যামেরাকে কলম আর সিনেমাকে কলমে লেখা কাব্যের সঙ্গে তুলনা করে সিনেমা মাধ্যমের এক বৈপ্লবিক সম্ভাবনাকে সোচ্চারে ঘোষণা করেছিলেন। নিউ ওয়েভ যখন এই আস্ত্রুকের স্বপ্নকে চরিতার্থ করছে, গোদার তাঁর শরিক হয়েই ফিল্ম টেক্সটের মধ্যে গেঁথে রাখছেন এই ভাবনার পরিবর্ধিত রূপ। ক্যামেরাকে পেন আর সিনেমাকে পরিচালকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন হওয়ার কথা বলে যে ব্যক্তিগত সিনেমার ডাক দেন আস্ত্রুক, গোদার তাকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলেন নিজের হাতের লেখার ছবিতে ক্যামেরা তাক করে রেখে।

প্রথম ভিভরা সা ভিতে দীর্ঘ সময় নিয়ে ক্যামেরা দেখতে থাকে আনা কারিনার হাতের লেখা চিঠি, পিয়ের লো ফ্যুতে এ এসে গোদারের নিজের হাতের লেখা অক্ষরের ওপরেই বারবার ফিরে আসে ক্যামেরা। আস্ত্রুকের সিনেমা যা কি না পরিচালকের হাতের লেখার মতো ব্যক্তিগত হয়ে ওঠার ডাক দিয়েছিল, গোদার আক্ষরিক অর্থেই নিজের এবং অভিনেতাদের হাতের লেখা শব্দমালার ওপর ক্যামেরা বসিয়ে রেখে সেই ভাবনাকেই ট্রিবিউট জানিয়ে যান যেন।

ভিভরা সা ভি
পিয়ের লো ফ্যু

অক্ষর, শব্দ এবং ফন্টের প্রতি জ্যঁ-লুকের এক অদ্ভুত অবসেশান। ছবির টাইটলে অক্ষর নিয়ে খেলা করেন তিনি। আবার ছবির মাঝে মাঝে চরিত্র এবং ঘটনা থেকে বেরিয়ে দেওয়াললিখন বা কমিক স্ট্রিপের পাতায় ক্যামেরা স্থির হয়ে যায়। জ্যঁ-লুকের ছবি পড়তে চাইলে তাই এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হবে, কারণ ছবির মূল ন্যারেটিভের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না থেকেও বহু বিষয় তাঁর ছবিতে আসবে যা শুধুমাত্রই ছবি মাধ্যমে কী কী করা যেতে পারে– তার প্রতি জ্যঁ-লুকের এক অনন্ত অভীপ্সা।

পিয়ের লো ফ্যু গোদারের তৃতীয় রঙিন ছবি। ১৯৬৫ সালে গোদার যখন এই ছবি বানাচ্ছেন, তখন ডিজিটাল যুগের মতো সিনেমায় রঙ এতো সহজলভ্য ছিল না। নিউ ওয়েভ ফ্রান্সের ছোটো প্রযোজকদের ছবি, তাতে হলিউডের মতো নিখুঁত রঙ করবার পুঁজি নেই। অথচ এই ‘নতুন ছবি’ সিনেমায় রঙ আসার নতুন উদ্ভাবনীকে ব্যবহার না করেও থাকতে পারে না। সুতরাং গোদার যখন ছবিতে রঙের ব্যবহার করলেন, তখন রঙিন ছবির ভাবনার প্যারাডাইমকে বদলে নিলেন নিজের মতো করে। ইনডোর শটে আলো-আঁধারিতে রঙের শেড বদলে বদলে যায়, তাই রিয়েলিস্টিক লাইটিংয়ের ইনডোরের বিপ্রতীপে তিনি গড়ে তুললেন সাদা ফ্যাটফ্যাটে দেওয়াল। গোটা ঘরজুড়ে এমন আলো করলেন যাতে চরিত্র আর ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্রের আলোর মধ্যে কোনো তারতম্য না থাকে।

ঘরজুড়ে রাখলেন স্বল্প আসবাব, বাসনপত্র– যার প্রত্যেকটিই প্রাইমারি সলিড কালার। চরিত্রদের পোশাকও রাখলেন তেমন, যাতে খুব বেশি রঙের বৈচিত্র্য নেই। পিয়ের লো ফ্যু, কনটেম্পট, ওম্যান ইজ আ ওম্যান, লা শিনোয়াজ— গোদারের সমস্ত কালার ছবির ইনডোর তাই প্রায় একইরকম দেখতে। সাদা দেওয়ালের সামনে চড়া লাল রঙের সোফা বা টেবিল ল্যাম্প, ফাঁকা দেওয়ালে অল্প কিছু পোস্টার, একই আলোয় ব্যাকগ্রাউন্ড আর ফোরগ্রাউন্ডের শ্যুট– প্রতিটা ছবির ইনডোর সেটেই ফিরে ফিরে আসবে।


আলোর
শেডের
ব্যবহারে ঘরের সামগ্রিক
স্পেসকে যথেষ্ট বাস্তবোচিত না
করে মিজ-অন-সিনের প্রতিটা
অবজেক্টের ওপর সমান
আলো ফেলে মডার্ন
পেন্টিংয়ের
সঙ্গে কথোপকথন গড়ে তোলেন

পারস্পেকটিভ পেন্টিংয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড, মিডগ্রাউন্ড, ফোরগ্রাউন্ডের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে মডার্ন পেন্টিং এক নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। ছবির ডেপথ এবং বাস্তবতার ইলিউশানকে ভেঙে ফেলে শিল্পীর ব্যক্তিগত আঙ্গিকই গুরুত্ব পায় সেখানে। গোদারের ছবির দৃশ্যপটও এই ডেপথের ধারণার বিপ্রতীপে। আলোর শেডের ব্যবহারে ঘরের সামগ্রিক স্পেসকে যথেষ্ট বাস্তবোচিত না করে মিজ-অন-সিনের প্রতিটা অবজেক্টের ওপর সমান আলো ফেলে মডার্ন পেন্টিংয়ের সঙ্গে কথোপকথন গড়ে তোলেন তিনি।

আইজেনস্টাইনের কথামতো ছবির রঙ ‘concept’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকতে গোদারের ফিল্মজুড়ে।

কনটেম্পট
পিয়ের লো ফ্যু
ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান

সিনেমা বাস্তব নাকি বাস্তবের পুননির্মাণ– এই দ্বান্দ্বিকতা চিরকালীন। হলিউডের সিনেমা বহুযুগ ধরে চেষ্টা করে এসেছে, কত নিখুঁতভাবে বাস্তবকে রিপ্রেজেন্ট করা যায়। রিয়েলিস্টিক পেন্টিংয়ের উদ্দেশ্যও প্রায় তাই। অর্থাৎ একটি ছবি বাস্তবের কত কাছাকাছি হবে, তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা। একটি মেয়ের ফ্রকের প্রতিটা ভাঁজ নিখুঁত করে আঁকা, চুলের প্রতিটা বাঁক নিখুঁত করে আঁকা, মুখের প্রতিটা দাগ নিখুঁত করে আঁকা, টেবিলক্লথের প্রতিটা নকশাকে নিখুঁত করে আঁকা। বাস্তবের যত নিপুণ প্রতিরূপায়ণ করা যায়– রিয়েলিস্টিক পেন্টিংয়ের সার্থকতা সেখানেই। অর্থাৎ একটি মানুষের পোর্ট্রেট হবে সেই মানুষটিরই অবিকল।

আধুনিক পেন্টিং রিয়েলিজমের এই ঘরানা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। পিকাসোর পোর্ট্রেটগুলি কোনো অংশেই বাস্তবোচিত কোনো মানুষের মুখের মতো নয়। থ্রি ডাইমেনশানাল স্পেস, রিয়েলিস্টিক লাইট অ্যান্ড শেডের রঙ ছেড়ে পিকাসো এমন রঙের, এমন আকারের পোর্ট্রেট আঁকা শুরু করলেন, তা যেন বাস্তববাদী ঘরানার ছবির প্রতি এক বিদ্রোহ ঘোষণা করল।

রিয়েলিস্টিক পোর্ট্রেট [ফ্রান্সেসকো ফ্রান্সিয়া]
মডার্ন পোর্ট্রেট [পিকাসো]

এখন হলিউডকে যদি রিয়েলিস্টিক পেন্টিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়, গোদারের ফিল্ম সেক্ষেত্রে মডার্ন পেন্টিং। সিনেমা একটি তৈরি করা বাস্তব জেনেও সেই বাস্তবের ইলিউশানকে নিপুণ থেকে নিপুণতর করে গড়ে তোলবার চেষ্টা করে হলিউড। যাতে সিনেমার পর্দায় চোখ রেখে একটুও বিচ্যূতি না ঘটে আমাদের; যাতে আমরা নিজেদের অস্তিত্বের বাস্তবতা ভুলেই পর্দার বাস্তবতায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারি।

গোদারের কাছে এই বাস্তবের ইলিউশান তৈরি করা অপ্রয়োজনীয়। বরং তিনি বারবার মনে করিয়ে দিতে চান– হ্যাঁ দর্শক, আপনারা সিনেমা দেখছেন, এটি একটি নির্মাণ, এটির প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখার প্রয়োজন নেই। একটি ছবি যে আসলে নির্মাণ, এবং এই নির্মাণের রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত সচেতন এই পরিচালক নির্মাণ পদ্ধতিটিকেই দর্শকদের সামনে উন্মুক্ত করে দেন। গাড়িতে প্রেম করতে করতে হঠাৎই ফার্দিনান্দ গাড়ির পিছনে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে, তার প্রেমিকা মজা করতে চাইলে আর কিচ্ছু বোঝে না। মারিয়ান [আনা কারিনা অভিনীত] তাকে জিজ্ঞেস করে, সে কার সঙ্গে কথা বলছে; ফার্দিনান্দ উত্তর দেয়, দর্শকের সঙ্গে। মারিয়ান তাতে একটুও বিস্মিত না হয়ে নিজেও অল্প করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নিয়ে আবার তাদের নিজস্ব প্রেমালাপে ঢুকে যায়।


দর্শক না থাকলে
এই প্রেমিক-প্রেমিকাও মৃত,
মৃত এই সিনেমাও

ব্রেশটিয়ান কায়দায় দর্শকদের মনে করিয়ে দেন গোদার, সিনেমা আসলে একটি তৈরি করা বিষয় যা কেবল বাস্তবের প্রতিরূপায়ণ করতে চায়। দর্শক আছে বলেই অভিনেতারা আছে, দর্শক আছে বলেই ফার্দিনান্দ-মারিয়ানের এই প্রেম; দর্শক না থাকলে এই প্রেমিক-প্রেমিকাও মৃত, মৃত এই সিনেমাও।

পিয়ের লো ফ্যু

বাস্তব ও সিনেমায় তার প্রতিরূপায়নের [representation] বিষয়টি নিয়ে পিয়ের লো ফ্যু ফিল্মের চরিত্র দুটিকেও কথা বলিয়ে নিয়েছেন গোদার। ফার্দিনান্দ ও মারিয়ান তাদের চুরি করা গাড়িটিকে রাস্তার ধারে পুড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে– যাতে পুলিশ মনে করে দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। মারিয়ান ফার্দিনান্দকে বলে, যেন তাদের এই তৈরি করা দুর্ঘটনা যথেষ্ট ‘রিয়েল’ দেখতে লাগে, কারণ এটা সিনেমা নয়।

তাদের এই সংলাপ ও নিজেদের গাড়ি পোড়ানোর প্রস্তুতি চলাকালীন স্ক্রিনের বাঁ দিকের স্পেসে দেখা যায়, আগে থেকেই একটি গাড়ি গাছে ধাক্কা লেগে চুরমার হয়ে পড়ে আছে এবং তার মধ্যে রয়েছে একটি রক্তমাখা শরীর। বেশি খুঁটিয়ে না দেখলেও স্পষ্টই বোঝা যায়, গাড়িটি একটি খেলনাগাড়ির অংশবিশেষ এবং মৃত শরীরটি একটি প্লাস্টিকের পুতুলের। সবমিলিয়ে আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটিকে বাস্তবের মতো তো লাগেই না, উলটে কৃত্রিম মনে হয়।

জ্যঁ-লুক ঠিক এই কাজটিই করতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন একটি গাড়ি দুর্ঘটনা তাঁর ফিল্মে দেখাতে, কিন্তু তিনি চাননি বাস্তববাদী ঘরানার ছবির মতো করে তার নিখুঁত প্রতিরূপায়ণ তৈরি করতে। ফিল্মে বাস্তবের নিখুঁত ইলিউশান তৈরি করবার দীর্ঘদিনের অভ্যেস ও তার পিছনে থাকা দর্শনকে প্রশ্ন করেছেন তিনি। তিনি জানেন সিনেমা বাস্তব নয়– এবং এই কথাটি সোচ্চারে দর্শকদেরও জানিয়ে দিতে চান। সুতরাং একটি ফিল্মে যা দেখানো হচ্ছে তা কতটা বাস্তবোচিত দেখতে লাগছে, তার থেকেও বেশি জরুরি সেই বিষয়টা দেখিয়ে পরিচালক কী বলতে চাইছেন এবং বাস্তবের পারফেক্ট ইলিউশান তৈরি না করেও তা বোঝাতে পারছেন কি না।

প্রস্থেটিক মেকাপ করা মানুষের পরিবর্তে একটি পুতুলের শরীরে লাল রঙ মাখিয়ে রাখায় বুঝতে অসুবিধে হয় না অ্যাক্সিডেন্টের প্রসঙ্গটি, বরং ফার্দিনান্দ আর মারিয়ান যে আরেকটি অ্যাক্সিডেন্ট ‘ফেক’ [fake] করতে চলেছে, তার সঙ্গে আগে থেকেই ঘটে থাকা এই মেকি অ্যাক্সিডেন্টের সেটটি এক সংযোগ স্থাপন করে ফেলে যেন। কেননা, সিনেমায় পুরোটাই fake, সবটাই মেকি। তাই রক্তের রঙও ব্যতিক্রমী রকমের লাল গোদারের ছবিগুলি জুড়ে। গুলি লাগার পর আনার মুখের পাশ দিয়ে যে রক্ত ঝরে পড়ে, তাকে কোনো অংশেই রক্তের মতো লাগে না।

আসলে, সত্যিকারের রক্তের মতো ইলিউশান তৈরি করা জ্যঁ-লুকের উদ্দেশ্য নয়; বরং সেই ইলিউশানকে ভেঙে জ্যঁ-লুক দর্শকদের কাছে পৌঁছে যেতে চান বাস্তবের প্রতিরূপায়নের রাজনীতি নিয়ে। ওনার ছবির চরিত্রেরাও তাই সিনেমার বাস্তবকে নিয়ে ঠাট্টা করে চলে। বাস্তবকে নিখুঁত থেকে নিখুঁততর করে দেখানো যে পরিমাণ পুঁজিনির্ভর, তার বিপ্রতীপ অবস্থানে থাকা গোদারকে তৃতীয় বিশ্বের আমাদের কাছে খুব আপন লাগে; চিরাচরিত পদ্ধতির বাইরে অপার সম্ভাবনার দ্বার মুক্ত করে দেন তিনি, সহজেই।

পিয়ের লো ফ্যু

পিয়ের লো ফ্যু প্রেমের ছবি, পিয়ের লো ফ্যু জীবনের ছবি। এই প্রেম মুক্ত, এই জীবন মুক্ত। মুক্তি বা অপার স্বাধীনতা বা ‘liberation’ নিউ ওয়েভের ভীষণ জরুরি একটি বিষয়। নিউ ওয়েভ মুক্ত ছবি; হলিউডের ধ্রুপদী গঠনরীতি, ফ্রান্সের পুরোনো ছবি বা কোনো চলে আসা ট্র্যাডিশানের অনুসারী এরা নয়। ষাটের দশকের প্রাক্কালে একদল নব্য যুবার হাতে এই নতুন ছবির পথ চলা শুরু। এই ছবির ভাবনা মুক্ত, পরিচালকেরা মুক্ত; তাই ছবিগুলিও স্বভাবতই তারুণ্য ও ব্যক্তিমানুষের মুক্তিকে উদযাপন করতে থাকে।

ইতিহাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ষাটের দশকের ফ্রান্স নতুন ছবির হাত ধরে যে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল, সেই মুক্তি আর সেই তারুণ্যই যেন আটষট্টিতে সরবোনসহ পারি শহরের রাস্তায় নেমে আসে। নবতরঙ্গজুড়ে যে মুক্তির উল্লাস, তা দুটি মানুষের প্রেমেও প্রকাশ পায়। গোদারের ছবির প্রেমিক-প্রেমিকারা তাই কখনোই বিয়ে করে না, চিরকালীন দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতিতেও আটকে ফেলে না নিজেদের। বরং তাদের প্রেম বাঁধনহীন, আগলছাড়া, মুহূর্তকামী।


অথচ
তাদের প্রেম
সাংঘাতিক– কারণ
তারা মুক্ত– নদীর মতো,
বাতাসের মতো, সমুদ্রের স্রোতের মতো

গোদারের ছবিতে বিবাহিত কাপেলদের সেভাবে প্রেম করতে দেখা যায় না; তারা যখনই এসেছে, তাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন গোদার। অ্যা ম্যারিড ওম্যান বা লা মেপ্রি বিবাহ মাধ্যমটির প্রতিই ক্রিটিকাল হয়ে যায়। দুটি মানুষের প্রেমের জন্য বিবাহ যে সবথেকে অনাবশ্যক এবং সমস্যাজনক একটি কাঠামো, তা গোদার বারবার দেখিয়েছেন। তাই পিয়ের লো ফ্যু ওনার আদর্শ প্রেমের ছবি। যেন ব্রেথলেস-এর মিশেল-প্যাট্রিসিয়ারই পরিবর্ধিত স্বরূপ এই ফার্দিনান্দ-মারিয়ান। যারা ভীষণভাবে প্রেমে পড়ে এবং সেই প্রেমে থেকেই গান গেয়ে জানায়, সারাজীবন একইভাবে থাকার একঘেয়েমিতে তারা বিশ্বাসী নয়। তারা বিশ্বাসী নয় সারাজীবন ভালোবাসার আশ্বাস দিয়ে প্রেম শুরু করতে। অথচ তাদের প্রেম সাংঘাতিক– কারণ তারা মুক্ত– নদীর মতো, বাতাসের মতো, সমুদ্রের স্রোতের মতো।

ব্রেথলেস-এর সেই আইকনিক যুবক-যুবতীই যেন পারি শহরের হোটেলের ঘর ছেড়ে পৌঁছে যায় ফ্রান্সের সমুদ্রের ধারের নির্জনে, মারিয়ান আর ফার্দিনান্দ নাম নিয়ে।

পিয়ের লো ফ্যু

‘নিউ ওয়েভ’ চরিত্রদের ওপর কখনোই স্টারের বোঝা চাপিয়ে দেয় না। বরং নিউ ওয়েভ যদি পরবর্তীকালে আনা কারিনা, জ্যঁ-পল বেলমদোঁ বা জ্যঁ-পিয়ের লিও’র মতো স্টার পারসোনা তৈরি করেও থাকে, তবে সেই স্টারের ধারণা অনেক সহজ, সাবলীল। আনা কারিনাকে দেখে পারি শহরের আরেকটা উচ্ছ্বল মেয়ের মতোই মনে হয়; বেলমদোঁকে দেখে মনে হয় যেকোনো স্মার্ট প্রেমিক। এত সহজ, এত জীবনমুখী অভিনয় দর্শককে বিস্মিত করে না; বরং অভিনেতাদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে। অভিনেতাদের দেখে মনে হয়, আমাদেরই একজন।

গোদার যখন ১৯৬৫-তে পিয়ের লো ফ্যু বানাচ্ছেন, সেই সময়টা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। ওনার চরিত্ররা প্রেম করবে, অথচ রাজনীতি নিয়ে কথা বলবে না– এমনটা তো সচরাচর হয় না। তাই উনি সাধারণ কথোপকথন, প্রেমালাপের মধ্যেই অন্তর্গত করে নেন যুদ্ধের ভয়াবহতার ইঙ্গিত।

ছবির শুরুতে গাড়ির মধ্যে রেডিও চালালে তাতে যুদ্ধের খবর আসে। জার্নালিস্টিক স্টাইলে রেডিও থেকে ঘোষণা হয় যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা। এই যে যুদ্ধে, গণহত্যায় মানুষ সংখ্যায় পরিণত হয়ে যায় অছিলায়, তার প্রতি বিদ্বেষ জানান গোদার– মারিয়ানের সংলাপের মধ্যে দিয়ে। আনা কারিনা বলেন, গেরিলা বাহিনীর একশো পনেরজন মারা গেছেন; শুনে আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। এদের প্রত্যেকের আলাদা জীবন ছিল, প্রত্যেকের হয়তো প্রেমিকা বা সন্তান ছিল, এদের মধ্যে কেউ হয়তো সিনেমা, কেউবা থিয়েটারকে ভালোবাসত। এখন এরা কেবল সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। এদের সম্বন্ধে আর কখনোই জানা যাবে না।


সাধারণ দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার
কথোপকথনেও কেমন
চোরাস্রোতের মতো
যুদ্ধের হিংস্রতা
এসে ধাক্কা
খাচ্ছে

বোঝা যায়, সাধারণ দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথনেও কেমন চোরাস্রোতের মতো যুদ্ধের হিংস্রতা এসে ধাক্কা খাচ্ছে। গোদারের প্রেমের ছবিও এই বিষয়গুলি এড়িয়ে থাকতে পারে না কোনোদিনই। সাবলীল সংলাপ, জীবনের অবতল দিয়ে বইতে থাকে যুদ্ধের রাজনীতির প্রতি তীব্র দ্বেষ।

পিয়ের লো ফ্যু

মারিয়ান-ফার্দিনান্দের নির্জনতা যাপনেও এই প্রসঙ্গ ফিরে আসে, যখন তারা আমেরিকান ট্যুরিস্টদের সামনে পয়সার বিনিময়ে ভিয়েতনাম আমেরিকার যুদ্ধ অভিনয় করে দেখান। ভিয়েতনামের যুদ্ধ যে আমেরিকার কাছে বিনোদনতুল্য, এই দৃশ্যের গঠনের মাধ্যমেই তা নিয়ে স্পষ্ট করে বলে দেন গোদার। দেশলাই কাঠি দিয়ে আগুন জ্বেলে, বোম ফাটা, গুলি ছোড়ার শব্দ করে ওরা যুদ্ধকে নকল করে– আর এক পাশে গা এলানো আমেরিকানরা হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। একবার যুদ্ধের প্রসঙ্গ আসে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা হয়ে, আরেকবার সরাসরি আমেরিকানদের চোখ দিয়ে– যারা সবকিছুর মতোই যুদ্ধকেও বিনোদন আর পণ্য বানিয়ে ফেলেছে।

দুইবারই তীব্র ঘৃণা আর ঠাট্টা ছুঁড়ে দেন জ্যঁ-লুক।

পিয়ের লো ফ্যু

জ্যঁ-লুকের ছবিতে রাজনীতি, প্রেম, জীবন সমস্তই আসে সহজ সাবলীলভাবে। মৃত্যুও তাই সহজ, জীবনের মতোই। প্রেম, অ্যাডভেঞ্চার, আনন্দের মধ্যেও কী এক গভীর বিষাদ লুকিয়ে থাকে জ্যঁ-লুকের, চাইলেই তার তল পাওয়া যায় না।

তার ছবির প্রেমিক-প্রেমিকারা অসুখী নয়; জীবনের মুহূর্তগুলোকে তারা জাপটে বেঁচে নেয়, তারুণ্যকে আলিঙ্গন করে আপসেই। তাও, মৃত্যু আসে। আকস্মিক, অনাবশ্যক কারণেই। বারবার এমনি এমনিই যেন মরে যায় তারা– আবারো ফিরে ফিরে আসে।

ব্রেথলেস-এর শেষে পালানোর সমস্তরকম সুযোগ পেয়েও কি অছিলায় পারির রাস্তায় মৃত্যুকে গ্রহণ করে মিশেল পোকার! মাস্কুলা ফেমিনার পলেরও ঘটে আকস্মিক মৃত্যু; প্রেমিকার নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে পড়ে যায় সে। আর পিয়ের লো ফ্যুর প্রেমিক-প্রেমিকা মারা যায় যেন তাদের অন্য জগতে দেখা হবে বলেই। তাই তাদের মৃত্যুর পর সমুদ্রের ওপর অনেকক্ষণ ধরে ক্যামেরা প্যান করতে থাকে– তারপর হঠাৎই ফিসফিসিয়ে ফিরে আসে তাদের কণ্ঠস্বর। এপারে তাদের মৃত্যু হয়; আবার তারা জেগে ওঠে অপারে।

যেইখানে এই ছবি আমাদের পর্দায় শেষ হয়– ঠিক সেইখান থেকেই অপারে এক নতুন ছবির জন্ম। ফার্দিনান্দ-মারিয়ান অমরতা পায়– অমরতা পায় মিশেল-প্যাট্রিশিয়া।

পিয়ের লো ফ্যু

পরের কিস্তি আসছে…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনেমা ও সাহিত্য প্রেমী; বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতক ।। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

মন্তব্য লিখুন