টু লিভ: বেঁচে থাকার গল্প

0
107
জাং ইমৌ

লিখেছেন । রাফিয়া মাহমুদ প্রাত

টু লিভ
Huo zhe
ফিল্মমেকার । জাং ইমৌ
উৎস-উপন্যাস । টু লিভ/ ইয়ু হুয়া
স্ক্রিনরাইটার । লু ওয়েই
প্রডিউসার । চিউ ফু-শেং; ফুনহং কো; ক্রিস্টফ সেং
সিনেমাটোগ্রাফার । লু ইয়ুয়ে
এডিটর । দু ইয়ুয়ান
মিউজিক । জাও জিপিং
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । গে ইউ [শু ফুগুই]; গং লি [জিয়াজেন]; ফেই দেং [শু ইয়ুকিং]; জিয়াং য়ু [ওয়ান এর্শি]; লিও তিয়াঞ্চি [শু ফ্লেনশিয়া]
রানিংটাইম । ১৩৩ মিনিট
ভাষা । মান্দারিয়ান
দেশ । চীন
রিলিজ । ১৯৯৪
অ্যাওয়ার্ড । গ্র্যান্ড প্রিক্স; প্রাইস অব ইকুমেনিক্যাল জুরি; বেস্ট অ্যাকটর [কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফ্রান্স, ১৯৯৪]


আমাদের প্রত্যেকের গল্পই তো একেকটি বেঁচে থাকার গল্প। দিন শেষে আমরা বেঁচে থাকার জন্যই লড়াই করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। এরই মাঝে মিশে আছে আমাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা। টু লিভ চলচ্চিত্রটি যেন তেমনি একটি দম্পতির বেঁচে থাকার গল্প বলে।

বিখ্যাত চীনা চলচ্চিত্র পরিচালক জাং ইমৌর ষষ্ঠ সিনেমা টু লিভ। পরিচালক তার বাকি সব সিনেমার মতো এখানেও সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীরব সমালোচনা করে গেছেন। মাও সেতুংয়ের সময়ে চীনে যে অশান্ত, অনিশ্চিত এবং ‘স্বৈরতন্ত্র’ বিরাজ করছিল, তা তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণের জীবনের মধ্য দিয়ে। জুয়া খেলার ভয়াবহ পরিণাম [১৯৪০-১৯৬০ দশক পর্যন্ত ] থেকে শুরু করে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উগ্রতার শিকার হওয়া সাধারণ এক দম্পতির ( স্বামী শু ফুগুই এবং স্ত্রী জিয়াজেন] বেঁচে থাকার গল্প এই টু লিভ

সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সাহসিকতার একটি কাজ। চলচ্চিত্রে সাম্যবাদের সমালোচনা [কমিউনিজম] তুলে ধরায় এর ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল। এজন্য চলচ্চিত্রটি প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং পরিচালক জাং ইমৌ ও অভিনেতা গং লির ওপর দুই বছর সিনেমা তৈরি ও অভিনয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

চীনা এই সিনেমা একই নামের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। তবে সিনেমাটি উপন্যাসের হুবহু দৃশ্য তুলে ধরেনি। কিছুটা পার্থক্য আনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সিনেমা স্কুল-কলেজগুলোতে দেখানো হয়েছে চীনা ইতিহাসের পাঠ্যবস্তু হিসেবে। কান চলচ্চিত্র উৎসব ছাড়াও সেরা বিদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে বহু পুরস্কার জিতে নিয়েছে টু লিভ

গল্পটি মূলত ১৯৪০-১৯৭০ সালের চীনের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আরোহণ এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ের সাধারণ মানুষগুলোর চালচিত্রগুলো এখানে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর তা দর্শকের সামনে যেন সেই সময়ের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে।


জুয়োর
নেশা তাকে
গৃহহীন করে দেয়

সিনেমার প্রথমে শু ফুগুইয়ের ভুলের কারণেই পুরো পরিবারকে মাশুল দিতে হয়। জুয়োর নেশা তাকে গৃহহীন করে দেয়। এক পর্যায়ে সে রাস্তায় সুতো বিক্রি শুরু করে। এরপর মোটামুটি সচ্ছলভাবেই জীবন চলছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং চীনে কমিউনিস্ট শাসনের ঘোষণা দিলে তাদের জীবনে একে একে নেমে আসতে থাকে দুঃখ-দুর্দশা।

বিপ্লবের জন্য তখন লিবেরেশন আর্মি বা রেড আর্মিরা গ্রাম থেকে পুরুষদের ধরে ধরে নিয়ে যেত। এভাবে শু ফুগুইকেও একদিন ধরে নিয়ে যায় এবং সেখানে সে লিবারেশন আর্মিতে অবদান রাখে। এরপর বাড়িতে ফিরে এলে জানতে পারে তার মা মারা গেছেন এবং তা মেয়েটি [ফ্লেনশিয়া] প্রবল জ্বরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এবং সরকার থেকেই তার স্ত্রীকে বাসায় বাসায় পানি বিতরণের কাজ দেওয়া হয়েছে।

যেহেতু, মাও সেতুং চীনে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি কমিউনিজম প্রতিষ্ঠায় চীনের তরুণ-যুবকদের টার্গেট করেন। তরুণ প্রজন্ম গ্রেট লিপের ব্যর্থতা বুঝতে পারবে না। তাদের এই বিশ্বাসকে মাও কাজে লাগান। তিনি পুরোনো প্রথা ভেঙ্গে দিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঘোষণা দেন। এতে বিপুল সাড়া দেয় তরুণ সমাজ। যাদের নিয়ে তৈরি হয় ‘লাল বাহিনী বা রেড গার্ড’। সিনেমায় ফ্লেনশিয়ার স্বামী ওয়ান এর্শিকে দেখা যায় এই লাল বাহিনীর নেতা হিসেবে। তখনকার সময়ে লাল বাহিনীকে খুব সম্মানের চোখে দেখা হতো। যার কারণে ওয়ান এর্ক্সিকে তারা নিজের মেয়ের জামাই হিসেবে বরণ করে নেয়। শুধু তাই নয়, তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান আচার-ব্যবস্থা সবকিছুতে রাজনৈতিক আদর্শকে মেনে চলা হতো। মাও সেতুং যে তখন চীনের জনগণের কাছে ঈশ্বরস্বরূপ, তার প্রতিচ্ছায়া দেখা যায় ফ্লেনশিয়ার বিয়ের সময়। কিন্তু মাও বিপ্লবী নেতা হিসেবে যতটা সফল ছিলেন, একজন শাসক হিসেবে তা ছিলেন না। তার গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব এতটাই ব্যর্থ হয়েছিল যে, তার পরিণাম ভুগতে হয়েছে যথাক্রমে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং সাধারণের দুর্গতির মধ্য দিয়ে।

কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার জন্য মাও’র লাল বাহিনী তখন প্রাচীন শিল্পকর্ম, ছবি, লেখা ধ্বংস করছে। কেউ পুঁজিবাদী মনোভাব দেখালেই তাকে হত্যা বা অপমানিত করা হতো। সিনেমাটিতে, লঙ্গারকে [যার কাছে শু ফুগুই জুয়ো খেলায় হেরে গিয়ে বাড়ি দিয়ে দেয়] ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যার দৃশ্য তখনকার সমাজে পুঁজিবাদীদের অবস্থান প্রকাশ করে। এর পরের দৃশ্যেই দেখা যায়, ফুগুই ভয়ে দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটছে। বাড়িতে ঢুকেই তারা কোন শ্রেণির জনগণ, তা জানতে চায় স্ত্রীর কাছে। কারণ সে সময়ে ভালো শ্রেণি বলতে শ্রমিক শ্রেণি এবং খারাপ শ্রেণি বলতে পুঁজিপতিদের বোঝানো হতো।

এমনকি হাসপাতালের প্রফেসর, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীদেরও অপমান করা হতো। তার একটি উদাহরণ দেখা যায় ফ্লেনশিয়ার বাচ্চা প্রসবের সময়। কারণ ক্লিনিকে আনা হলে সেখানে কোনো প্রফেসর না থাকায় নার্সদের অনভিজ্ঞতার কারণে ফ্লেনশিয়ার মৃত্যু হয়।

সিনেমটিকে যদি একটু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করি গল্পটিকে একজন নারীর হার না মানার গল্প হিসেবেও বলা যায়। গতানুগতিক চলচ্চিত্রের মতো নারীকে কোমলমতি হিসেবে তুলে না ধরে এখানে নারীকে তুলে ধরা হয়েছে শক্ত ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের পরিচয়ে। যে হাজারও বিপদ, কষ্টে ও ভাগ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছে। সয়ে গেছে সব বাধা-বিপত্তি। ধন-সম্পদ, সামাজিক অবস্থান ও সন্তান হারানোর কষ্ট– কোনোকিছুই তাকে পরাজয় এনে দিতে পারেনি। বরং জীবনের সঙ্গে প্রতিটি লড়াই যেন তার সাহসিকতা আর নির্ভিকতারই পরিচয় দিয়েছে ক্রমাগত। গল্পটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এই দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে প্রকটভাবে। সিনেমায় স্ত্রীর চরিত্রটি এমন একটি চরিত্র যে সব সময় অন্ধভাবে মাওকেই ঈশ্বর হিসেবে না নিয়ে বরং তারা যে মাও’র ব্যর্থতার শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। যেমনটা আমরা দেখি ছেলেটির মৃত্যুর সময়। এমনকি শেষ দিকে দেখা যায়, ফুগুই তার নাতিকে [মান্তো] কমিউনিজমের বুলি আওড়িয়ে নয়, বরং স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই বলে, ‘লাইফ উইল বি বেটার অ্যান্ড বেটার’।


সিনেমার
শেষ প্রান্তে তাকে
নায়করূপে নয়, বরং একজন
ভালো মানুষ হিসেবে
দেখা যায়

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়, তা হলো, প্রথম দিকে শু ফুগুইকে যে রকম দায়িত্বহীন, স্বার্থপর হিসেবে দেখা যায়। ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। সে পরিবারের জন্য ভাবতে শুরু করে। লিবারেশন আর্মি যখন ধরে নিয়ে যায়, তখন সে বারবারই তার পরিবার, সন্তান, মা, স্ত্রীর কথা ভাবছিল। সিনেমার শেষ প্রান্তে তাকে নায়করূপে নয়, বরং একজন ভালো মানুষ হিসেবে দেখা যায়।

সিনেমার এই দম্পতিকে নির্মম ভাগ্যের কাছে বলি হতে হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রতিবারই তারা ভেঙ্গে না পড়ে, একে অপরকে আগলে রেখে লড়াই করে গেছে। লড়াই করে গেছে শুধু একসঙ্গে একটু বেঁচে থাকার জন্য। আর তাই জিয়াজেন বারবারই বলে এসেছেন, ‘অল আই আস্ক অ্যা কোয়াইট লাইফ টুগেদার’।

প্রতিবার ভাগ্যের করুণ চেহারা দেখেও একটিবারের জন্যও আশা ছাড়েনি এই দম্পতি। সিনেমার শেষ প্রান্তে এসেও দেখা যায়, দুই সন্তানকে হারিয়ে এই যুগলের নতুন পরিবার গড়ে উঠেছে। যেখানে তারা বেঁচে আছে তাদের নাতি আর মেয়ের জামাইকে নিয়ে। বেঁচে আছে সুন্দর, সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি জীবনের আশায়– যে আশায় নিজেদের বেঁধে রাখত সেই সময়ের চীনের প্রতিটি সাধারণ পরিবার।

‘টু লিভ’, যার সরল অর্থ, ‘বাঁচার জন্য’। শব্দ দুটি খুব ছোট এবং সাধারণ মনে হলেও এর গভীরতা অনেক। চাইনিজ এই চলচ্চিত্র যেন জীবনের গভীর বাস্তবতারই প্রতিফলন। পুরো সিনেমাটি একইসঙ্গে সুখ ও দুঃখের স্বাদ দেবে দর্শককে। সিনেমাটোগ্রাফার এত সূক্ষ্মতার সঙ্গে কাহিনিগুলো তুলে ধরেছেন দর্শকের কাছে, তা বাস্তব কোনো কাহিনি বৈ অন্য কিছু মনে হবে না। তাছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে এমনভাবে, যেখানে দর্শকের মন আন্দোলিত হবেই। কখনো সুখে, কখনো-বা দুঃখে।

চীনা বিপ্লবী নেতা মাও সেতুংয়ের শাসনামলের একটি বাস্তবচিত্রের খণ্ড যেন এই টু লিভ। আর যা-ই হোক, দর্শককে সব কষ্ট ভুলিয়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগাবে এটি। দিবে সাহস, শক্তি ও ধৈর্য।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
শিল্প,সাহিত্য ও চলচ্চিত্রপ্রেমী; লেখক; বেহালাবাদক। শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢা্কা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য লিখুন