হাত ধরাধরি করে বেড়ে ওঠা ইরানি সিনেমা ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি [১/৬]

0
328
আব্বাস কিয়ারোস্তারমি
আলেক্সান্ডার হং-এর আর্টওয়ার্ক অবলম্বনে

মূল । হামিদ দাবাশি
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

আব্বাস কিয়ারোস্তামি
আব্বাস কিয়ারোস্তামি, শৈশবে

১৯৪০ সালের ২২ জুন আব্বাস কিয়ারোস্তামি জন্ম নেওয়ার প্রায় এক বছর আগে [১৮ অক্টোবর ১৯৩৯], রেজা শাহের একটি কারাগারে নৃশংসভাবে খুন হন ইরানের বিশিষ্ট কবি ফারোখি ইয়াজদি। পাষাণ হৃদয়ের শাসক রেজা শাহ সিংহাসনে বসেন ১৯২৬ সালে; এবং এর পরপরই রাষ্ট্র পরিচালিত ‘আধুনিকায়নের’ একটি নৃশংস প্রচারণার প্রবর্তন করেন– যেখানে উদারতা, মুক্তচিন্তা ও ভিন্নমতাদর্শের কোনো জায়গা ছিল না। কিয়ারোস্তামি জন্মের ঠিক এক বছর পরে, নাৎসিদের [হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান রাজনৈতিক শক্তি] সঙ্গে পুরনো গোষ্ঠীপ্রধানের ভনিতার ব্যাপারে সতর্ক– অ্যালিয়েড শক্তিগুলো ইরান আক্রমণ ও দখল করে ফেলে। নিজের তরুণ পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহের কাছে, ১৯৪১ সালে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন রেজা শাহ; এবং অ্যালিয়েড ফোর্সের দখলদারিত্বের বিশৃঙ্খলার মধ্যে, ‘তুদেহ’ [কমিউনিস্ট] পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়, আর ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক দশকের নজিরপূর্ব স্বাধীনতার সূচনা ঘটে।

এই ভূখণ্ডটি ছিল বিদেশি শক্তির দখলে, পুরনো রাষ্ট্রশাসককে করা হয়েছিল পরিত্যাগ, অতি-তরুণ শাহ বা সম্রাট ছিলেন ক্ষমতাহীন ও অনভিজ্ঞ; আর দেশটিতে ছিল না কোনো কার্যকর সরকার। কিয়ারোস্তামির জন্মের এক বছর আগে, সাদেক হেদায়াতের সেই দ্য ব্লাইন্ড ঔল [Boof-e koor] গ্রন্থটিও প্রকাশিত হয়েছিল– যেটিকে পারস্য সাহিত্যে আধুনিকতার সত্যিকারের প্রবর্তনের সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আধুনিকতাবাদী পারস্য কবিতার গৌরবান্বিত যুগে জন্ম নিয়েছিলেন কিয়ারোস্তামি; আর বেড়ে উঠেছেন সেই কবিতাকে ইরানি সিনেমার সঙ্গে সবচেয়ে চমৎকারভাবে যুগলবন্দি করানোর জন্য। এই ইরানি ফিল্মমেকারের ফিল্মি ক্যারিয়ারটি কবিতায় উদ্দীপনা ও কর্মশক্তি জোগানো শৈল্পিক আধুনিকতার, এবং পারস্য কাব্যিক চিত্রকল্পের ধারা-বিবরণী থেকে আসা বাস্তবতার একটি দৃশ্যকল্পের উপস্থিতির উত্থানের এক উৎসবমুখর উদযাপনের ইতিহাস হয়ে আছে।

যে ইরান সাময়িকভাবে ছিল অ্যালিয়েড ফোর্সের দখলে, যে ইরানকে পরিত্যাগ করেছিলেন একজন পুরনো স্বৈরশাসক, অথচ যার উত্তরাধিকারী তখনো শাসনকর্মে দক্ষ হয়ে ওঠতে পারেননি, যে ইরানে তুদেহ পার্টি নামে জন্ম নিয়েছে নতুন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ– এর ফলে একটি নতুন উদ্বেগ ও প্রত্যাশা সঙ্গী করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রাত্যহিক ডিটেইলস ছিল জর্জরিত– বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই ইরানে কেটেছে কিয়ারোস্তামির শৈশব। তিনি ছিলেন মোসাদ্দেক যুগের শিশু– যে সময়টি ছিল স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের আতঙ্কজাগানিয়া শ্যেনদৃষ্টি থেকে সাময়িকভাবে মুক্তিলাভের; যে যুগটিতে ১৯০৬-১১ সাল সময়কালে ঘটে যাওয়া সাংবিধানিক বিপ্লবের স্মৃতি সক্রিয় হয়ে একটি সহনশীল সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য জিইয়ে রাখা আশাকে আরও একবার রঙিন করে তুলেছিল।

কিয়ারোস্তামি যখন জন্মান, তার পিতা-মাতা ও তার শিক্ষকদের প্রজন্মটি তখনো বৈপ্লবিক প্রাণচাঞ্চল্যের নানাদিক স্মরণ করতে সক্ষম ছিলেন; কেননা, একটি প্রাগৈতিহাসিক ভূখণ্ডকে সেটির ঔপনিবেশিকভাবে শক্তিসম্পন্ন আধুনিকতার বাস্তবতা থেকে জাগিয়ে তুলতে আবেগ-অনুভূতি, ক্ষমতা ও আদর্শের এক প্রবল ঐকতানের সচলিকরণ ঘটেছিল শতাব্দীর বাঁক-বদলের সেই দিনগুলোতে।


রাজতন্ত্রের
কোনো প্রজা বা ‘সাবজেক্ট’
নয়, বরং নিজেদের একটি আধুনিক
জাতি-রাষ্ট্রের ‘নাগরিক’ হিসেবে
চিহ্নিত করতে পারা ইরানের
প্রথম প্রজন্মের মানুষ
ছিলেন
কিয়ারোস্তামির বাবা-মা

১৯০৬-১১ সময়কালের বিপ্লবটির রেজাল্ট অন্তত পড়েছিল স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রে নাটকীয়ভাবে রূপান্তর ঘটানোর মধ্যে। নিজেদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও ইউরোপিয়ান শিক্ষা– উভয়ের ওপর আন্তরিকভাবে ভিত্তি করে সংবিধানটির খসড়া রচনা করেছিলেন একটি ইরানি উদার মানতবতাবাদী প্রজন্ম। আইন পাস করার অবাধ ক্ষমতা রাখা একটি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করে, রাজনৈতিক দলগুলো গঠন করার মাধ্যমে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে রেখে, আর আইনি দিক সামলানোর জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত বিচার-ব্যবস্থা তৈরি করে– রাজতন্ত্রের অবাধ ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিল এটি। রাজতন্ত্রের কোনো প্রজা বা ‘সাবজেক্ট’ নয়, বরং নিজেদের একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ‘নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারা ইরানের প্রথম প্রজন্মের মানুষ ছিলেন কিয়ারোস্তামির বাবা-মা।

দেশটির উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে তেল আবিষ্কারের পরপরই রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে ঔপনিবেশিক বিদ্বেষ প্রকট হয়ে ওঠে; এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের [১৯১৪-১৮] প্রকোপে বিকাশমান এই জাতি-রাষ্ট্রটির উদারমনা গণতান্ত্রিক সুপ্তাবস্থার প্রতিটি চিত্রকে ধুয়ে-মুছে দেয়। নতুন এই দেশটির বেসামরিক ও রাজনৈতিক পরিপক্কতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯২১ সালে, ইরানিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে; এ বছরই প্রকাশিত মোহাম্মদ-আলী জামালজাদের ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম [Yeki Bud Yeki Nabud] গল্পগ্রন্থটিকে আধুনিক পারস্য ফিকশনের জন্মবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।


সর্বনাশা ও দুর্বলকারী ঔপনিবেশিকতার
একগুচ্ছ হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে
যে জাতি-রাষ্ট্রটি নিজের
রাজনৈতিক ও
সাংস্কৃতিক
আত্মপরিচয়ের
ব্যাপারে সচেতন
হয়ে ওঠছিল– তার মধ্যেই
জন্ম নিয়েছিলেন কিয়ারোস্তামি

১৯২২ সালে দ্য মিথ [Afsaneb] শিরোনামে নিমা ইউশিজ যে দীর্ঘ আখ্যানমূলক কাব্যটি প্রকাশ করেন, সেটি পারস্য কাব্যিকতা ও নন্দনতত্ত্বের বিপ্লব ঘটায়। ফলে, নিজের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক শতাব্দী দীর্ঘ ধর্মনিরপেক্ষতার একটি প্রক্রিয়া, একটি সেমি-বুর্জোয়া বিপ্লব, একটি বিদেশি দখলদারিত্ব, সাহিত্য ও কাব্যিকতার মধ্যে আত্মসচেতনার পরিস্ফূটন, এবং সর্বনাশা ও দুর্বলকারী ঔপনিবেশিকতার একগুচ্ছ হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে সে জাতি-রাষ্ট্রটি নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠছিল– তার মধ্যেই জন্ম নিয়েছিলেন কিয়ারোস্তামি।

রেজা শাহ ক্ষমতায় আসার দুই বছর আগে, ইউরোপিয়ান ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যনীতির অন্যতম সেরা অর্জন, ই. জি. ব্রাউনির লেখা শাসন-সংক্রান্ত গ্রন্থ অ্যা লিটারারি হিস্টোরি অব পার্সিয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হই আমরা। ন্যাশনাল বিল্ডিংয়ের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো সম্পর্কে রেজা শাহর ধারণায় যত ঘাটতি থাকুক না কেন, ব্রাউনি তার গ্রন্থে সেটির পরিপূর্ণ বিশদ বর্ণনা জাহির করেছে। তুরস্কের মুস্তাফা কামালের [পরবর্তীকালে হিটলারের] প্রতি মুগ্ধ রেজা শাহ ‘মডার্নাইজেশন’ বা ‘আধুনিকীকরণ’ নামের একটি ব্যাপকবিস্তারী ও নৃশংস কর্মসূচি কার্যকর করেছিলেন। কিন্তু ১৯৩০ দশকের শেষভাগে অ্যালিয়েড দখলদারিত্বের কারণে তার এই প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হয়, এবং নিজেকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে, সেখানে নিজের ছেলেকে বসাতে বাধ্য হন তিনি।

নিমা ইউশিজ
কবি, ইরান । ১৮৯৭–১৯৬০

যুদ্ধের সময়ে ইরানে এই দখলদারিত্বটি রেজা শাহের একনায়কতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। এ সময়েই তুদেহ পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং প্রচুরসংখ্যক ইরানি বুদ্ধিজীবী যোগ দেন প্রগতিশীল আন্দোলনে। ১৯৪১ সালে ইরানের রাজশাসকের পদে অধিষ্ঠিত হন মোহাম্মদ রেজা শাহ; আর ১৯৪০ দশক জুড়ে দেশটিকে একটি স্রেফ নামমাত্র শাসন জারি রাখেন তিনি। ১৯৪০ দশকে সংগঠিত হওয়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের বিরোধিতা করার মতো অবস্থা রাজতন্ত্রের ছিল না।


কিয়ারোস্তামির শৈশবে, বলার
মতো কোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি
ইরানে ছিল
না

কিয়ারোস্তামির শৈশবে, বলার মতো কোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ইরানে ছিল না। যুদ্ধের দিনগুলোতে, ফিল্ম প্রোডাকশনের বিলাসিতা দেখানোর অবস্থা ছিল না ইরানের। নামেমাত্র যা পাওয়া যেত, সেগুলো ছিল অ্যালিয়েড ফোর্সের প্রোপাগান্ডা ডকুমেন্টারি। ১৯৪৫ সালের পর থেকে, ইরানি সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ– ইসমাইল কুশান ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান সিনেমার সঙ্গে ইরানের পরিচয় ঘটিয়ে দিতে শুরু করেন। সেই ফিল্মগুলোর ডাবিং তিনি তুরস্ক ও মিসর থেকে করিয়ে এনে, ইরানে প্রদর্শন করতেন। তেহরানে এগুলোকে সাদরে গ্রহণ করা হয়।

এই সাফল্যে ভর দিয়ে, কুশান তার প্রথম সিনেমা দ্য টেমপেস্ট অব লাইফ [১৯৪৮] নির্মাণে হাত দেন; যদিও সিনেমাটি ব্যবসা-সফল হয়নি। কুশানের পরবর্তী দুই ফিল্মের একটি, রাজতন্ত্র-পূর্ববর্তী থিম নিয়ে নির্মিত দ্য প্রিন্স’স প্রিজনার ওরফে প্রিজনার অব দ্য আমির [Zendani Amir; ১৯৪৮] বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।

অ্যা পার্টি ইন হেল
ফিল্মমেকার । মুশেগ সারভারিয়ান; সামুয়েল খাচিকিয়ান

কিয়ারোস্তামির শৈশবে ইরানি সিনেমা যতটাই হতদরিদ্র ও আদিম পর্যায়ে ছিল, সে সময়কার কবিতা ছিল ততই ঋদ্ধ ও বৈপ্লবিক। নিজ সংস্কৃতির প্রাগৈতিহাসিক ঐতিহ্যে প্রোথিত হয়ে, সাংস্কৃতিক আধুনিকতার প্রতি দ্রুততর ও কার্যকরি সাড়া দিতে, আধুনিকতাবাদী কবিতার পথচলা শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৯০৬-১১ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের একেবারেই গোড়ার দিকে। তবে নিমা ইউশিজের দ্য স্টোরি অব পেলড কালার [Qesseh-ye Rang-e Parideh; ১৯২০] গ্রন্থের প্রকাশনাটি শিল্পের একেবারেই নতুন একটি মতবাদের উত্থানের ঘোষণা দিয়ে দেয়। প্রায় ৫০০ পঙক্তির এই সুদীর্ঘ কবিতাটি বজ্রধ্বনির মতো বিস্ফোরণ, এবং আধুনিকতার সকল উৎকণ্ঠার সাদৃশ্যস্বরূপ একটি বিস্ময়কর রকমের ঋদ্ধ ভাষার আবিষ্কার ঘটায়।

এর দুই বছর পর নিমা তার দ্য মিথ ওহ নাইট [Ay Shab; ১৯২২] গ্রন্থ দুটি প্রকাশের মাধ্যমে পারস্য কবিতায় একটি নতুন আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নিজের মর্যাদা সুদৃঢ় করেন। ১৯৩৭ সালে নিমা যখন দ্য ফিনক্স [Quqnus] গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি সতর্কতার সঙ্গে পারস্য কাব্যিক রচনাশৈলীর একেবারেই নতুন একটি ফর্মের বিকাশ ঘটান। দ্য ফিনক্স-এর ভাষা একইসঙ্গে কাব্যিক ও রাজনৈতিক, ইকোনোক্ল্যাস্টিক ও বৈপ্লবিক। শুধুমাত্র ঋদ্ধ পারস্য কাব্যিক উত্তরাধিকারের প্রতিই নয়, বরং ইউরোপিয়ান রোমান্টিসিজম, রিয়েলিজম ও সিম্বলিজমের ওপরও পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল নিমার।

১৯৩৯ সালে, পণ্ডিতবর্গের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সদস্য পারভিজ-নাতেল খানলারি ফার্সি ভাষায় রিলকের চিঠি অনুবাদ করেন, এবং সেগুলোর ওপর নতুন একটি ভূমিকা লিখেন। এই অসাধারণ কাব্য-ইশতেহারটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কবিদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। খানলারির নিজের কাব্যগ্রন্থ দ্য ঈগল-এ [Oqab; ১৯৪২] ছিল পারস্য কবিতার ভাষা ও রচনাশৈলীকে আধুনিকীকরণের একটি সাহসী প্রচেষ্টা; যদিও নিমার কাজের মতো অতটা তাৎপর্য এটি কখনোই অর্জন করতে পারেনি।

১৯৪৩ সালে কবিতার আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের একজন প্রধান তাত্ত্বিক ও প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন খানলারি। তার জার্নাল– লোগোস [Sokhan] হয়ে ওঠে তরুণ কবিদের একটি ফোরাম। যদিও খানলারির পাণ্ডিত্য ছিল তার প্রজন্মের কাব্য শিক্ষার প্রতিভূ; পাহলাভি রাজশাসনের প্রতি তার রাজনৈতিক রক্ষণশীলতা ও একাত্মতা তাকে স্রেফ একজন টিপিক্যাল শিক্ষিত পণ্ডিতের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠতে দেয়নি। অন্যদিকে, নিমা ছিলেন একটি পুরো প্রজন্মের আশাবাদ ও প্রেরণার কণ্ঠস্বর।

আমির আরসালান
ফিল্মমেকার । শাপুর ইয়াসামি

কিয়ারোস্তামির শৈশবের প্রথমদিকের বেশিরভাগ জনপ্রিয় কবিতাই তার বেড়ে ওঠার সংস্কৃতির তথ্য জানান দেয় : রেজা শাহের স্বৈরশাসনের রাজত্বে, সাহস ও কল্পনাশক্তি খুইয়ে ফেলা সাংবিধানকতাবাদী জাতীয়তাবাদের একটি অবদমিত পদ-রচনা ছিল সেগুলো। তবে ফারোখি ইয়াজদি ও আবোলকাসেম লাহুতির কবিতায়, সাংবিধানিকতাবাদী জাতীয়তাবাদ আলিঙ্গন করেছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে; এ কারণে ফারোখি ইয়াজদির মতো কবিদের বরণ করতে হয়েছে কারাবাস, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড।

রেজা শাহ যে ধরনের জাতীয়তাবাদকে সহ্য করতেন এবং প্রেরণা জোগাতেন– সেটি ছিল সেই বর্ণবাদী উগ্রবাদ, যা প্রবলভাবে দমন করত ‘আরব’ বলে ঘৃণাভরে ক্যাটাগরিভুক্ত করা মানুষদের; অথচ ‘তুর্কি’ নামে পরিচিতরাও এই নৃশংস ঘৃণাচর্চা থেকে রেহাই পায়নি। এ সময়ে কাব্যিক কল্পনাশক্তি সম্পর্কে বলতে গেলে একেবারেই অবচেতন থাকা একটি দুর্বল থেকে দুর্বলতর কর্মজীবী শ্রেণি পর্যবসিত হয় সর্বহারায়। আর সেটির কাউন্টারপার্ট হিসেবে উত্থান ঘটা পেটি বুর্জোয়ারা ছিলেন ‘রোমান্টিসিজমের’ বিনোদনে মাতোয়ারা– যা কিনা গোপনীয় রোমান্সের প্রতি ধাবিত করত এই একাকিত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতায় মগ্ন মানুষগুলোকে।


ইরানি
রাজনৈতিক
ও কাব্যিক সংস্কৃতিকে
বৈপ্লবিকভাবে বদলে দেওয়ার
সময়কালটিতেই কিয়ারোস্তামি বেড়ে উঠেছেন

রেজা শাহ-পরবর্তী সময়কালে এই পরিস্থিতি দ্রুততার সঙ্গে পাল্টে যায়। ইরানি রাজনৈতিক ও কাব্যিক সংস্কৃতিকে বৈপ্লবিকভাবে বদলে দেওয়ার এই সময়কালটিতেই কিয়ারোস্তামি বেড়ে উঠেছেন। সংস্কারবাদী আইডিয়া, সোশ্যাল রিয়েলিজম বা সামাজিক বাস্তবতাবাদ, ও উপনিবেশবিরোধী আবেগের বানে সৃজনশীল ইমাজিনেশন তরঙ্গায়িত হওয়ার এই সময়টিতে সবচেয়ে বৈপ্লবিক কবিতায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন নিমা। চিরায়ত ছন্দশাস্ত্রের কাছ থেকে একটি সংস্কারবাদী প্রস্থান ও সবচেয়ে প্রগতিশীল আইডিয়া– এ দুটির মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে তার কাজ। তিনি নিজেই একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন।

নিমাধর্মী কাব্যিকতা সাবজেক্টিভিটির এমন একটি মেজাজের অঙ্কুর ঘটিয়েছিল– যার ভেতরে ঔপনিবেশতার কাছ থেকে পাওয়া সকল রীতিনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়ে, ইরানি আধুনিকতার সকল গঠনের দিকে পুনঃমনোযোগ দেওয়ার রসদ ছিল বর্তমান। নিজ সময়কালের বস্তুগত বাস্তবতার মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হওয়া নিমার কবিতা এইসব ‘সত্য’কে বন্ধনমুক্তির নান্দনিক সম্ভাবনাগুলোর ভেতর রূপান্তরিত করেছে। আডর্নো যেটিকে বলেছেন, ‘প্রায়োগিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের মধ্যে শিল্পকর্মগুলো সেই থিওলোগামেননের [প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদের বদলে বরং ব্যক্তিমানুষের মন্তব্যকে ধারণ করার কোনো তাত্ত্বিক বিবৃতি কিংবা ধারণা] কথা মনে করিয়ে দেয়, যেটি কিনা পুনরুদ্ধারকৃত পৃথিবীতে সবকিছুকে নিজের মধ্যে এবং তবুও সম্পূর্ণভাবে অন্যদের মধ্যেও’ ধারণ করে।

নিমার কবিতা হয়ে উঠেছিল সেই ‘পুনরুদ্ধারকৃত পৃথিবী’– যেটির মধ্যে ইরানিরা আশা করতে পারত নিজেদের ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভেতর আরও একবার প্রোথিত হওয়ার এবং তবুও ‘সম্পূর্ণভাবে অন্যদের’ হওয়ার সক্ষমতা।

সাউথ অব দ্য সিটি
ফিল্মমেকার । ফারোখ ঘাফফারি

১৯৫০ দশক

কিয়ারোস্তামির জীবনের প্রথম তেরটি বছর ইরানে ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাধীনতার একটি পিরিয়ড। সমাজতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী, ইসলামি প্রভৃতি মতবাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান ঘটছিল এ সময়ে। ১৯৫৩ সালে এসে, তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক পরিস্ফুটন ঘটা এই সময়কালটিতে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটিয়ে ‘শাহ’কে আবারও ক্ষমতায় নিয়ে আসার ষড়যন্ত্রে সিআইএ [সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি; যুক্তরাষ্ট্র] সফল হলে; এর ফলে বড় সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, এবং নৃশংস নিপীড়ক রাজত্বের বিধানগুলো আবারও শিকড় গেড়ে বসে।

১৯৫০ দশকে ইরানি সিনেমার বলতে গেলে কোনো অবস্থানই ছিল না। এ সময়টিতে একটুও আন্দাজ করা যায়নি– পরের দশকেই এই সেক্টরে কী সুদূরপ্রসারী বিকাশ ঘটতে যাচ্ছে। এ সময়ে অল্প কয়েকজন বাণিজ্যিক ফিল্মমেকার মিলে ফিল্ম স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং থিয়েটার থেকে অভিনেতা ভাড়া করে এনে, একেবারেই তুচ্ছ ধরনের সিনেমা বানাতেন। সিনেমার সংস্কৃতিটি এ দেশের গভীরে কম-বেশি ভালোভাবেই প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। ততদিনে সকল বড় শহরেই বেশকিছু সিনেমা-হল প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পপুলার এন্টারটেইনমেন্ট বা জনপ্রিয়ধারার বিনোদনের শ্রেষ্ঠ কাঠামো হিসেবে উত্থান ঘটে যায় সিনেমার।

টেলিভিশন তখনো আসেনি। অবশ্য, শহুরে বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে জমিনের কৃষক– সমাজের সকল স্তরেই দাপুটে উপস্থিতি ছিল রেডিওর। কিন্তু সিনেমা এমন এক মন্ত্রজাদুর বিস্তার ঘটায়– যে অভিজ্ঞতা এর আগে কখনোই হয়নি। এটির ভগ্নিতুল্য শিল্প মাধ্যম– থিয়েটার ছিল গণমানুষের আয়ত্বের বিচারে একেবারেই ভীষণ সীমাবদ্ধ। ‘নাকালি’ [জনসমক্ষে কিচ্ছা শোনানো], ‘রো-হোজি’ [পপুলার থিয়েটার], ‘শামায়েল-গার্দানি’ [জনসমক্ষে অলংকৃত কিচ্ছা শোনানো], ‘তাজিয়ে’ [আবেগধর্মী নাটিকা] ইত্যাদি ধরনের ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয়ধারার বিনোদন মাধ্যমগুলো তখনো তেহরান ও দেশটির অন্যান্য জায়গায় বর্তমান ছিল। কিন্তু ইরানের দ্রুততার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি বিনোদনের এই নতুন মাধ্যমটির [সিনেমা] প্রতি সুনির্দিষ্টভাবে আকৃষ্ট হয়।

১৯৫০ দশকে কিয়ারোস্তামি ছিলেন বয়সে কিশোর; ভারত, হলিউড ও মাঝে মধ্যে ইউরোপ থেকে আমদানি করে আনা কিংবা স্থানীয়ভাবে নির্মিত সিনেমাগুলো তার হাতের নাগালেই ছিল। অধ্যবসায়ী ইসমাইল কুশান তখনো ইরানি সিনেমায় কর্তৃত্ব করছিলেন, এবং একটি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার সম্ভাবনাগুলো আবিষ্কারের প্রতি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। গ্রামীণ থেকে শহুরে পরিবেশে সক্রিয়ভাবে রূপান্তরিত হওয়া ইরানি সমাজের থিমগুলোকে নিয়ে নির্মিত তার কনট্রিট [Contrite; ১৯৫০] ফিল্মটি হয়ে ওঠে পরবর্তী সময়ের ইরানি মেলোড্রামার একটি পথপ্রদর্শক; বাণিজ্যিক সাফল্যও পায় ফিল্মটি।

মাদার
ফিল্মমেকার । ইসমাইল কুশান

কুশানের মেলোড্রামাটিক ফিল্মগুলোর একটি বড় ধরনের বিকাশ ঘটে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নারীদের কাস্টিং করার মাধ্যমে। কুশানের মাদার [Madar; ১৯৫২] সিনেমায় ইরানের দুজন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী কামার-উল-মলুক ভাজিরি ও দেলকাশের অভিনয় ফিল্মটির বাণিজ্যিক সাফল্য সুনিশ্চিত করে দেয়। ভাজিরি এবং পরবর্তী সময়ে দেলকাশ ছিলেন, সে সময়ে সাংস্কৃতিকভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, জনসমক্ষে গান গেয়ে ইরানি মিউজিকে বিপ্লব ঘটানো নারীদের অগ্রদূত। এটি ছিল ইরানি সিনেমায় ক্রমাগত কারিগরি ও নন্দনতাত্ত্বিক অগ্রগতির এবং সমন্বয় ঘটানোর একটি পিরিয়ড। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনেকেই এসেছিলেন ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু শ্রেণি, বিশেষ করে আর্মেনিয় গোত্র থেকে। তারাই সিনেমার প্রতি সবিশেষ আকৃষ্ট হতে থাকেন। হেজাজির মতো বিখ্যাত সাহিত্যিকরা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে শুরু করেন। ভাজিরি কিংবা রুহবাখশের মতো জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা করতে থাকেন অভিনয়।

এ দেশে ১৬ মিলিমিটারে প্রথম সিনেমা নির্মিত হয় ১৯৫১ সালে : পারভিজ খাতিবির দ্য হোয়াইট গ্লাভস [Dastkeshe Sefid]। খাতিবির সিনেমাটি দেখানোর জন্য আরও বেশি শক্তিশালী সব প্রজেক্টর কিনে আনা হয়।


কানের
চেয়ে চোখের
মাধ্যমে একজন
মানুষ অনেক বেশি
আনন্দ পেতে
সক্ষম

এ সময়কালটির আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– একটি মিডিয়াম হিসেবে সিনেমা সম্পর্কে সমালোচনামূলক জাগরণ ঘটা। জনৈক সমকালীন সমালোচক এ সম্পর্কে লিখেন, ‘কানের চেয়ে চোখের মাধ্যমে একজন মানুষ অনেক বেশি আনন্দ পেতে সক্ষম।’ এইসব কারিগরি উন্নতিসাধনের লক্ষ্যটি অবশ্য ছিল, সীমিত রুচি ও প্রত্যাশার সঙ্গে পেটি বুর্জোয়া দর্শকের আকর্ষণ মূলত ধরে রাখা। গান ও নাচের একটি বৈশিষ্ট্যধর্মী দৃশ্য, বছরের পর বছর ধরে সবচেয়ে বিখ্যাত পারফরমার হিসেবে খ্যাতিমান করে রাখে মাহভাশকে; আর সেটি হয়ে ওঠে ১৯৫০ দশকের সকল ইরানি সিনেমার একটি মুখ্য তাৎপর্য। দর্শকরা এসব দৃশ্যের সঙ্গে এতটাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সন্নিবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন যে, এমনকি বিদেশি সিনেমা, যেমন আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান– সেগুলো দেখানোর সময়ও, মাঝপথে বিরতি টেনে মাহভাশের একটা গান ও নাচের দৃশ্য জুড়ে দেওয়া হতো।

১৯৫০ দশকের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ ছিল– পেশাদারি অভিনয়ের সিরিয়াস উন্নতিসাধন। জামশিদ শেইবানি একটি অ্যাক্টিং-স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন– যেখানে বয়ান, অভিনয়, নন্দনতত্ত্বের তত্ত্বসমূহ, থিয়েটার ও সিনেমার ইতিহাস, মেক-আপ, এবং মিউজিকের ওপর পাঠ দেওয়া হতো। ১৯৫০ দশকের শেষভাগে নির্মিত সিনেমাগুলোতে অভিনয়ের প্রতি এই ব্যাপক মনোযোগের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশিরভাগ জনপ্রিয় সিনেমাতেই মুখ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী শেষ পর্যন্ত বরং মেধাহীন মেনিকিনই রয়ে গেছেন!

শাপুর ইয়াসামির আমির আরসালান [Amir Arsalan-e namdar; ১৯৫৫] ছিল এ পিরিয়ডের একটি অবিশ্বাস্যরকমের বাণিজ্যসফল সিনেমা। তবু মুশেগ সারভারিয়ান ও সামুয়েল খাচিকিয়ানের যৌথ নির্মাণ অ্যা পার্টি ইন হেল-এর [Shab-neshini dar Jahannam‎‎; ১৯৫৬] সাফল্যের ধারে-কাছেও পৌঁছুতে পারেনি কোনোটা। এ সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইসফাহান রাজ্যের অধিবাসী, তুখোড় কমেডিয়ান– আরহাম সাদর। বলা হয়ে থাকে, ইরানে বিনোদন মাধ্যম হিসেবে সিনেমার কর্তৃত্বকে জনপ্রিয় করার নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এ দুটি সিনেমা।

দ্য ভ্যালিয়েন্ট ভ্যাগাবন্ড
ফিল্মমেকার । মাজিদ মোহসেনি

এই জনপ্রিয়তা দ্রুতই একটি নোংরাদিকে বাঁক নেয়– কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে এক লম্পটের জয়জয়কার দেখিয়ে মাজিদ মোহসেনি নির্মিত দ্য ভ্যালিয়েন্ট ভ্যাগাবন্ড ওরফে দ্য জেনারাস পপার [Lat-e Javanmard; ১৯৫৮] সিনেমাটির মাধ্যমে। অভিনেতা হিসেবে নাসের মালেক মতির আবির্ভাব ঘটে ১৯৫০ দশকের শেষভাগে; এবং পরের দশক পর্যন্ত ইরানি সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘লাত’ হিসেবে রাজত্ব করেন তিনি। ‘লাত’, মানে লম্পট চরিত্রটি বীরত্বের একটি অধঃপতিত সংস্করণের কপটতাকে প্রকাশ করে; আর এটি জনপ্রিয়ধারার সিনেমায় একটি মেজর ফিগার হয়ে ওঠে।

মাঝারি মানের সিনেমার এই বিস্তৃত সমুদ্রে, ফারোখ ঘাফফারির সাউথ অব দ্য সিটি [Jonube shahr; ১৯৫৮] ফিল্মটিকে একটি বিনম্র ঢেউ হিসেবে গণ্য করা যায়। এই ফিল্মটি পরের দশকে ঘটে যাওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-বদলের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে।


নিমার
স্বপ্নের ‘শিশুরা’
তখন বেড়ে ওঠার
অপেক্ষায়
ছিলেন

ইরানি সিনেমার এইসব ক্রমবিকাশের কোনোটিকেই অবশ্য গুরুত্বের বিচারে সে সময়কালটির কবিতার সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। নিমার স্বপ্নের ‘শিশুরা’ তখন বেড়ে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। নিমার নিজের প্রথমদিকের রোমান্টিসিজম তখন ফেরেইদুন তাভাল্লালির কবিতায় ডানা মেলতে শুরু করেছিল, এবং নাদের নাদেরপুরের কবিতায় সেটির প্রভাব পড়ে। কিন্তু ততদিনে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ– সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে নিজের বিকাশ ঘটিয়ে ফেলা নিমা শুধুমাত্র নিজের কাব্যচর্চাই অব্যাহত রাখেননি, বরং তার সৃজনশীলতার প্রভাব পড়ে মেহদি আখাভান-সালেস ও আহমাদ শামলুর কবিতায়ও।

যদিও এই সময়কালে লেখা ফরুঘ ফাররোখজাদের কবিতায় ১৯৬০ দশকের বৈপ্লবিক উদ্ভাসনের আভাস তেমন একটা ছিল না; তবে তিনি নিঃসন্দেহে ছিলেন সে সময়ের অন্যতম মহিয়সী কণ্ঠস্বর। ইরানি ইন্ডিভিজুয়াল সাবজেক্টিভিটির ফরমেশনে একটি মুখ্যশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ফরুঘের কাব্যিক ভঙ্গিমা।

ইরানের বিশিষ্ট সাহিত্য-ইতিহাসবেত্তা ও সমালোচক মোহাম্মদ-রেজা শাফিয়েই কাদকানির মতে–

  • আমাদের ক্ল্যাসিকেল কবিতার একটি আঞ্চলিক রোগ হয়ে ওঠা গীতিময় কবিতার প্রতি ভালোবাসার সার্বজনীনতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। এ সময়কালটিতে ভালোবাসার বৈশিষ্ট্যগুলো আরও বেশি স্পষ্ট ও আরও বেশি সুনির্দিষ্ট হয়ে ওঠে। ভালোবাসার নিরাকার প্রতিমাতে পরিত্যাগ করে, দুজন মানুষের মধ্যকার প্রেম ও সম্পর্কসমূহের ব্যাপারে আরও বেশি অধিগম্য বিষয়-আশয়ের দিকে নজর দেন কবিরা।

    আপনি যখন এ সময়কালের কবিতাগুলো পড়বেন, খেয়াল করে দেখবেন, যখনই কোনো নারী [ফরুঘ] তার প্রেমিকের কথা বলছেন, কিংবা কোনো পুরুষ [শামলু] তার প্রেমিকার কথা বলছেন– এ ভালোবাসা আর মোটেও ক্ল্যাসিকেল পিরিয়ডের কাল্পনিক ও বিমূর্ত রূপে নেই। প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যকার সম্পর্কগুলো অভ্যস্ত বুর্জোয়া জীবনের বিচারে আরও বেশি বাস্তব এবং সচেতন [হয়ে উঠেছে]। পারস্য কবিতার রাজ্যে সামন্ততান্ত্রিক ভালোবাসাকে করা হয়েছে পরিত্যাগ; আর বিশ্বজনীনতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা-উর্ধ্ব এই পরিস্থিতিতে আগের সময়কালের গীতিময় কাব্যের মধ্যে থাকা ভালোবাসাটি গেছে উবে।

    এই সময়কালের গীতিময় কবিতা আসলে এ যুগের বাস্তবতারই প্রতিফলন।

হামিদ দাবাশি
১৯৫১–। ইরানি-আমেরিকান সিনে-গবেষক ও বহু সিনে-গ্রন্থের রচয়িতা; প্রফেসর, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
[এই গদ্য তার ‘ক্লোজ-আপ : ইরানিয়ান সিনেমা পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ বই থেকে নেওয়া]

গ্রন্থসূত্র

কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা
[ইরানি ফিল্মমেকার আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে নিয়ে গদ্য, তার সাক্ষাৎকার ও সব ফিল্মের রিভিউ]
গ্রন্থনা ও অনুবাদ । রুদ্র আরিফ
পৃষ্ঠাসংখ্যা । ৪৩২
বাংলাদেশি সংস্করণের প্রকাশক । ভাষাচিত্র
প্রথম প্রকাশ । ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মূল্য । ৬৭৫ টাকা
ভারতীয় সংস্করণের প্রকাশক । প্রতিভাস
প্রথম প্রকাশ । জুলাই ২০১৭
মূল্য । ৫০০ রুপি


পরের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন