ঘটক-চিন্তা থেকে রায়-রবীন্দ্রনাথ

4
464
ঋত্বিক ঘটক
মূল পোর্ট্রেট: মনদ্বীপ পাল

লিখেছেন । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

[ঋত্বিক আমার ধ্রুবতারা, তাঁর প্রয়াণের পর শ্রদ্ধেয় গিরিশ কারনাড আমাকে ডেকে বললেন: স্মরণসভার মূল লেখা তুমি লিখবে, বোম্বে থেকেও অনেকে আসবেন। লিখে ফেললাম. ইংরেজিতে ছিল। কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে বাংলা করে কবি রফিক আজাদ ভাইকে দিয়েছিলাম, পুনা থেকে আসার পর, টিপসই-এর জন্য। ছেপেছিলেন অনেক অনেক বছর আগে]

ঋত্বিক কুমার ঘটক
ঘটক।
ঘটক-কে নিয়ে আলোচনা।
ঘটক-কে নিয়ে আলোচনা সত্যিই কঠিন।

কারণ সব আলোচনাই বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা তাড়িত। সব আলোচনার পেছনে ইন্টেলেকচুয়াল উদ্ভমনের প্রবণতা অত্যন্ত প্রবলভাবে বিরাজ করে।

কিন্তু ঘটকের মতো শিল্পীর জন্য ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রেম তৈরী করা এবং সেই ফ্রেমের মধ্যে তাঁর শিল্পকর্মকে ধ’রে রাখা– আমার মনে হয় পরোক্ষভাবে তাঁকে মৃত ঘোষণা করারই সামিল। কারণ ঘটকের মতো শিল্পীদের শৈল্পিক প্রকাশ সাজানো বুক শেলফ নয়– নয় হাল্কা হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো সখের বা সুখের পায়রা।

ঘটকের শিল্প-কর্মের শিকড় মৃত্তিকায়-কাদায়-ধূলায়।
আপাত দৃষ্টিতে অগোছালো।
কিন্তু এ শিকড়ে রস ওঠে-বিচিত্র-তীব্র জীবনস্পন্দনের রস। জীবনস্পন্দন কি কখনও চাবি দেওয়া পেন্ডুলামের মতো কিংবা ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে বলি’ জাতীয় সুবোধ বালকের মতো সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে? –না।

মেঘে ঢাকা তারার সেই মেয়েটি পর্যন্ত সুতীব্র চিৎকারে এই ফ্রেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।



চেতনার
চাবুক স্বপ্নগন্ধময়
নয়

এটা ঘটকের প্রতিবাদ।
একজন প্যাশনেট শিল্পীর প্রতিবাদ।
ঘটক প্যাশনেট চেতনার শিল্পী।
এ চেতনা একটি চাবুক। এ চেতনার চাবুক স্বপ্নগন্ধময় নয়।

এ চেতনা পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের বুকে বোটে বসে ‘ফুলের মালা, দীপের আলো, ধূপের ধোঁয়ার পেছন হতে’ লেখা ধোঁয়া নয়। এ চেতনা কয়লার ধোঁয়া। চোখে জ্বালা ধরায়।

সমকালীন সমাজ, রাজনীতি-অর্থনীতি কয়লার কার্বন মিশ্রিত ধোঁয়া।
ঘটক আমাদের চেতনার চাবুক। His films are not extensions of Aristocratic extravaganza? না! Never ever!

ঋত্বিক ঘটক
৪ নভেম্বর ১৯২৫; ঢাকা, বাংলাদেশ–৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬; কলকাতা, ভারত

দুই.

আমি সত্যজিৎ রায়ের মতো শুরু করতে চাই না…“A man died…etc…etc”।* আমি ঘটককে মৃত ঘোষণা করে এগুতে চাই না।

রায়ের নিশ্চয়ই কারণ ছিল বিসমিল্লাহতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মৃত ঘোষণা করবার। হয়তো এ ঘোষণা ইচ্ছাকৃত নয়।

মজার ব্যাপার রায়ের এ ছবির শেষে প্রচলিত প্রথায় ‘দ্য এন্ড’ লেখা নেই– এটা নাকি কর্তৃপক্ষের নিয়মের বিরুদ্ধে রায়ের ‘বিদ্রোহ’। হাসি পায়। কারণ ছবির শুরুতেই তো The End। অন্যদিকে ঘটক তাঁর জ্বালা নাটকে ঘোষণা করছেন (গ্যেটের মতো কিংবা বিংশ শতাব্দীর যেকোনো বিজ্ঞানীর মতো)– “In the beginning there was action” ক্রিয়া… প্রতিক্রিয়া… সচল সৃষ্টি…
এবং সকল সচল সৃষ্টির মূলে action।

সময় নিরপেক্ষ ঘটকেরা এটা জানেন। কিন্তু সময় নিরপেক্ষ স্কেলে অ্যাকশনের শিল্পীর চাইতে চেতনাহীন হারিয়ে যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি।

তিন.

আসুন আমরা এখন ইতিহাসের পাতা থেকে কয়েকটি সন-তারিখ স্মরণ করি:

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে।
রোমাঁ রোলাঁ জন্মেছেন ১৮৬৬ [রোমাঁ রোলাঁকে স্মরণ করছি বিশেষ কারণে– তার মধ্যে একটি হ’ল– রোলাঁর প্রতি ঘটকের শ্রদ্ধাবোধ…]।
লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় চলচ্চিত্র দেখালেন ১৮৯৫ সালে।
রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ পেলেন ১৯১৩ সালে।
রোমাঁ রোলাঁ ১৯১৫-তে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দামামা বেজে উঠছে ইউরোপে।
সোভিয়েত বিপ্লব ঘটছে ১৯১৭’র দিকে।
আইজেনস্টিন পটেমকিন বানাচ্ছেন ১৯২৪-২৫।
এমনি কোনো এক সময়ে ঘটক জন্মাচ্ছেন।
ব্রেখট তাঁর এপিক থিয়েটার এপিক ক্যানভাস উন্মোচন শুরু করেছেন।
সিনেমায় শব্দ আসছে ১৯২৯।
লিন্ডবার্গ আটলান্টিক পার হচ্ছেন হাওয়ায় ভর ক’রে ১৯৩৮।
ফ্যাসিস্টরা দাঁত-নখে ধার দিচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১। ‘‘মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে…”

ইউরোপের হাওয়ায় তখন হাজার লিন্ডবার্গের পাখার ক্ষুধার্ত ছায়া মৃত্যু বমন করছে– মানুষের মাংসের পোড়া গন্ধ-শেয়াল-কুকুর-শকুনও পলাতক–

এরপর ১৯৪৭।
অস্বচ্ছ ঘোলাটে দিন।
কিছুটা সময় চোখ বন্ধ করে থাকা যাক।
রায় পথের পাঁচালী বানাচ্ছেন মধ্য পঞ্চাশে।
তারপর ষাটের দশকের কোলকাতা। আগুন।
রায় বানাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী। আশ্চর্য। রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘দ্বন্দ্বে’ ভুগছে। অথবা রায় নিজেই ভুগছেন?
তাই প্রতিদ্বন্দ্বীর নায়ক পালিয়ে পাখির গান শোনে।
শোনে অবক্ষয়ের মন্ত্রধ্বনি– “রামনাম সত্য হ্যায়…”

আজকের বোম্বেতে হৃষিকেশ মুখার্জী নামে একব্যক্তি– একদা যিনি ঘটকের কাছে সুস্থতার অঙ্গীকারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন– তিনি মত্ত-নেশাগ্রস্ত অন্ধের মতো নেশার খোরাক যোগাতে?

আপাতত পটভূমি নির্মাণ এই পর্যন্ত থাক।
এট পটভূমির স্কেলে রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক নয়।
আমরা পরবর্তী আলোচনা থেকে বুঝতে পারব।

আমি ‘সময়’ এবং সময়ের সাক্ষী শিল্পীর মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করছি মাত্র। রবীন্দ্রনাথ কি সময়ের সাক্ষী?
কিংবা রায়?

সময়ই উত্তর দেবে। কিংবা দিচ্ছে।

চার.

চলচ্চিত্রের জন্ম বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। যাদের শুধুমাত্র কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কতগুলো যন্ত্রগত আবিস্কার আর উন্নয়নের জন্য। এবং ঘটনা ঘটল ঊনবিংশ শতাব্দীর একদম প্রান্তসীমায় এসে।

যে কোনো টেকনোলজি বা কারিগরি কৌশল ধীরে ধীরে নতুন পরিমণ্ডল তৈরী করে। অন্যদিকে আবার এই পরিবেশ বা পরিমণ্ডল অকর্মক নিষ্ক্রিয় মোড়ক নয়– বরং এর একটি সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তাই আমরা প্রাচীন গোত্রভূক্ত সামাজিক পরিমণ্ডলের পরিবর্তন লক্ষ্য করি– দেখি কেমন উত্তরণ ঘটেছে লিপির আবিস্কার আর ব্যবহারের মাধ্যমে। এমনি ধাপে ধাপে উত্তরণ ঘটতে ঘটতে আজকে আমরা ইলেকট্রনিক পরিমণ্ডলে বাস করছি। আবার হয়তো নতুন কোনো কারিগরি বিদ্যার আর্বিভাবের সঙ্গে সঙ্গে এই ইলেকট্রনিক পরিমণ্ডলেরও পরিবর্তন ঘটবে– নতুন টেকনোলজি জন্ম দেবে নতুন পরিবেশের। এরই সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হবে শৈল্পিক প্রকাশ– শিল্পীর মানসিকতা। না হ’লে জড়তায় স্থবির হয়ে যাওয়ায় ভয়।


অন্ধ-ভালোবাসা
জড়তার জন্ম
দেয়–
স্থবিরতার
দিকে ঠেলে দেয়
সমাজকে-শিল্পীকে

ঘটকদের অবশ্য এই ভয় নেই। তাই বোধহয় কয়েক বছর আগে ঘটক তাঁর স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিমায় বলেছিলেন– আমি আগামীকাল এই শৈল্পিক প্রকাশের মাধ্যমকে অস্বীকার করে লাথি মারব– যে মুহূর্তে আমি এরচেয়ে শক্তিশালী কোনো মাধ্যমের সন্ধান পাব। এই লাথি মারার কথাটা ঘটক কিন্তু চলচ্চিত্র মাধ্যমকে অবমাননা করবার জন্য বলেননি– তুচ্ছ করবার জন্য বলেননি– বরং এই উক্তি এমন একজন শিল্পী-সৈনিকের যিনি কি না যে কোনো রকম বাতিল বা সময়ের মাপকাঠিতে অপ্রয়োজনীয় মরচেধরা অস্ত্র তুলে নিতে নারাজ– প্রেমে পড়তে নারাজ। অন্ধ-ভালোবাসা জড়তার জন্ম দেয়– স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয় সমাজকে-শিল্পীকে। অবসেশন একটি রোগ। স্থবিরতার আরেক নাম মৃত্যু। শিল্পীর একটিই দায়িত্ব আছে। একটি মাত্র দায়িত্ব।
সামাজিক দায়িত্ব।

যে কোনো শিল্প-মাধ্যম তার জন্য শুধুমাত্র একটি অস্ত্র। তাই উন্নতর প্রকাশ মাধ্যম নিঃসন্দেহে উন্নতর অস্ত্র। ভোঁতা অস্ত্র ব্যবহার করে বিপদ ডেকে আনা চূড়ান্ত হঠকারিতা।

আজকের টেলিভিশনের ইলেকট্রনিক পরিবেশ রেডিওকে মনে হতে পারে ট্রাইবাল ড্রাম। এবং মনে হ’লে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই।

পাঁচ.

ঘটক বলছেন– শিল্পী পুতুল নয়– কিংবা অভিজাত দোকানে সুসজ্জিত শোকেসে দাঁড়ানো নিখুঁত ডামি কিংবা মডেল নয়। শিল্পী এ সমাজেরই একজন– সমাজের সমস্ত সমস্যার আবরণে ঢাকা একজন মানুষ। ১৯৭৩-এ পুনা ইনসটিটিউটে ঘটক তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন– শিল্পী সম্পর্কে আমরা একটা ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছি– যেন সে একটি আজব জীব– বহির্বিশ্ব এসেছে– চারদিকে কি ঘটছে তার জানবার প্রয়োজন নেই– মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নেই– ফ্যান্টাসির নিরপেক্ষ জগতে যেন তার নেশাগ্রস্ত ভেসে বেড়ানো। এমনকি সে সকালের খবরের কাগজটিও পড়ে না– পড়বার প্রয়োজন বোধ করে না। He does not even go to TOILET! STAR? Ha ha ha! এ যেন সেই ধোঁয়ার আড়ালে দেবতার ভূমিকায় অবতীর্ণ কেউ। কিন্তু শিল্পী ক্লীব নয়। যেকোনো ভূমন্ডলীয় শক্তির মতো একটি শক্তি। শক্তি যেমন ভূপৃষ্ঠে নিত্য পরিবর্তন ঘটাচ্ছে– যেমন নতুন রূপ দিচ্ছে– তেমনি শৈল্পিক শক্তি সক্রিয় পরিবর্তন ঘটায় ক্রিয়া-বিক্রিয়ায়– আর এই শক্তি আহরিত হয় সমাজ থেকেই– সমাজের মানুষ থেকে– মাটির রস থেকে। শিল্পীর এটাই প্রথম এবং শেষ দায়িত্ব। যেহেতু ফ্যান্টাসিতে মদের মতো নেশা ধরে– তাই শৈল্পিক দায়িত্বকে সামাজিক দায়িত্ব থেকে আলাদা করে দেখবার একটা মিথা প্রবণতা আমরা পোষণ করি। শৈল্পিক দায়িত্ব সালাদ-সিরকায় সাজানো চিকেন টিক্কা নয়।

আসলে আমরা শিল্প সম্পর্কে সংকীর্ণ বুর্জোয়া ধারণার, বুর্জোয়া চিন্তার শিকার। এ ধরনের চিন্তা পচা ডোবার জন্ম দেয়– এ ধারণা প্রগতিবিরোধী– এ ধরনের শিল্পীর যে কোনো উচ্চারণ অর্থহীন অবক্ষয়ের উচ্চারণ– এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অবক্ষয়ের দৃষ্টিভঙ্গি। অসার। ফ্যান্টাসির কাঠামো সুন্দর হতে পারে– কিন্তু ভেতরটা অসার। ইমপোটেন্ট। আমরা তাই দেখি বাস্তবতা থেকে বুর্জোয়া চিন্তার পলায়ন। কিছু শব্দে ভর করে– কতিপয় শব্দকে অবলম্বন করে– বেঁচে থাকা। শব্দগুলো হ’ল– মিসটিসিজম, ফর্মালিজম, ন্যাচারালিজম ইত্যাদি ইত্যাদি । “ ism’ ‘ism’ every where, nor ‘any’ ism to pick!!” Shadows of Albatross over the Mariner, not the Ancient one only, though, any more. They are all over!

বাস্তবতার প্রতি চোখ বন্ধ রেখে পলিথিনের সুন্দর মোড়কে সুন্দর কথার উপহার Art for Art’s sake। এবং দ্বিতীয় ধাপেই পরিণতি দেখি Art for money’s sake। এবং আজকে আমরা সবাই এ ধারণার শিকার।

ছয়.

যুগে-যুগে শিল্প-সাহিত্যের উত্তরণ বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ ক’রে ঘ’টে যাওয়া ঘটনা নয়। এর দিকচিহ্ন নির্ণীত হয়েছে কোনো বিশেষ সময়ে বিশেষ সমাজে নতুন শ্রেণীর আবির্ভাবে– তার চাহিদায়– প্রয়োজনে। অর্থাৎ শ্রেণী-সংগ্রামের রূপরেখায়। তাই যে কোনো সমাজে শিল্প-সম্ভাবনার মৃত্যু অনিবার্য– যখনই দেখব– যে শ্রেণী সেই সমাজে আধিপত্য বিস্তার করছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে– কিন্তু প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারছে না– প্রগতিশীল ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে চির স্থায়িত্ব বা পারপেচুয়েশনের নেশায় নেশাগ্রস্ত– তখনই। শিল্পকে, শিল্প সম্ভাবনাকে তখনই আমরা প্রগতিশীল বলব– যখন তা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে– এবং এই প্রতিফলন ঘটিয়ে সেই বিশেষ সময়ে সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে– এবং ব্যাপকতর আদর্শগত যোগাযোগ– Ideological Communication ঘটাতে পারে মানুষে-মানুষে। আজকের দিনে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী– কোন শ্রেণী?
১৯৭৬-এর শেষ সীমায় এসে– মনে হয়– বলে দিতে হবে না।

ঘটক ঠিকই চিনেছিলেন।
কারণ তাঁকে চিনতে হয়েছিল। কারণ জন্মলগ্নেই তিনি দেখেছেন “ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভূমি”। গানটি তাই কোমল গান্ধার-এ ভেসে আসে।

ঘটক হয়তো চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলেন–

Time is out of joint– Oh cursed spite–
That I was ever born to set it right.

ঘটকের প্রত্যেকটি ছবিই তাই একটি চিৎকার। All that I have is a ‘voice,’ a voice to undo the unjust!

এ চিৎকার সফল কি অসফল– আজ তা আলোচনা করব না।
পরবর্তী কোনো সংখ্যায় করব।
তবে সাফল্য-অসাফল্য ইত্যাদি সবকিছু ছাপিয়ে রোমাঁ রোলাঁর মতো ঘটকের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর শুনতে পাই– I will not rest.

ঘটকেরা তাই মরেন না।
তাঁদের মৃত্যু নেই।
সত্যজিৎ রায়ের মতো আমাকেও তাই শুরুতে বা শেষে বলতে হ’ল না :
“a man died etc. etc.”
এবং আমি বললাম কি বললাম না– তাতে ঘটকদের কিছু আসে যায় না।

একটি আবেদন

জাগরণের নামে ঘুমপাড়ানি গান শুনতে চাই না। বরং চাই ঘটককে। প্রয়োজন একজন মাত্র ঘটকের।
একটি চাবুকের। সুবর্ণরেখা ঐতো মামা এসো এসো বুড়িয়ে গেলে কেন? এসো এসো চরৈবতি চরৈবতি এগিয়ে চলো, ঐতো সুবর্ণরেখা ঐতো–

  • * [সমস্ত দায়-দায়িত্ব লেখকের। “a man died”– এটা সত্যজিৎ রায়ের রবীন্দ্রনাথ ছবির ধারা বর্ণনা থেকে : লেখক]

সুবর্ণরেখা? *আমি আজ একটি কথা সংযোজন করছি, আমার স্কুলজীবনের প্রারম্ভে, আমি সৌভাগ্যবান, শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম, আজীবন সাইকেলে প্রগতির বাহক, প্রবর্তক, মোঃ সুলতান, লেখক, সাংবাদিক শহীদ শহীদ সাবের, ভুলবো না ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারির স্রষ্টা গাজিউল হক! তাঁরা ডেডিকেট করতেন জীবন স্কুলে।আশ্চর্য! আমার স্মৃতিতে আছে সাবের স্যার ক্লাসে বলতেন পড়াবার ফাঁকেঃ ঐ যে বিশাল পাহাড়, গাছ-পালা নেই, রুক্ষ, ওটা পার হতে পারলেই সুন্দর একটি নদী, সবুজ–! সুবর্ণরেখা? খুঁজে ফিরছি।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
প্রখ্যাত ফিল্মমেকার; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ ।। জন্ম : ২৬ আগস্ট ১৯৪৬ ।। ফিচার ফিল্ম : ঘুড্ডি ; লাল বেনারসী; আয়না বিবির পালা ।। শর্টফিল্ম : দেয়াল, তামাশা, গল্পদাদুর গল্পকথা, অংকুর ইত্যাদি ।। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন [১৯৯৬-২০০১] ।। অপারেশন ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন [১৯৮১-১৯৯৪] ।। শিক্ষার্থী, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া [(পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট); ১৯৭২-১৯৭৭]

4 মন্তব্যগুলো

  1. খুব ভালো লাগলো পড়ে। তথ্য বহুল এবং বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা। ধন্যবাদ সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী ভাই কে।

  2. এমন ক্ষুরধার চলচ্চিত্র-ভাবনার মানুষ এক ঘুড্ডি উড়িয়ে কোথায় চলে গেলেন?
    লেখায় কিছু বানান প্রমাদ রয়েছে। ঠিক করে দেবেন।

  3. প্রচন্ড বায়াসড একটি লেখা। নির্মাতাদের নামের বানান ভুল, সিনেমা দর্শন তো পুরোটাই ভুল, কথার মাঝে ইংরেজি ঢুকিয়ে দেয়ার মনোভাব আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়তা হচ্ছে তাত সিনেমা কম দেখা হয়েছে বলেই নিজের মনের মতো করে একগাদা কথা বলে ফেলেছেন যার কোন এনালাইসিস নেই, শুধুই আবেগ। কোনো ফ্যাকচুয়াল কথা নেই। সম্পূর্ণআবেগ নির্ভরশীল কথা বার্তা অবহেলা করাই উচিৎ ছিল। তবে সত্যজিৎ নিয়ে লেখার পর নিজেকে সামলানো গেলো না। লেখককে সামনে পেলে তার চোখের দিকে বিনীত হয়ে বলতে চাই ‘কোনো মহারথীর সাথে অন্য মহারথীর তুলনা করা ঠিক না, এতে আপনি দু’জনকেই অপমান করছেন’

মন্তব্য লিখুন