ত্রুফো থেকে ফেলিনি: জীবন থেকে নেয়া

0
240
সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

লিখেছেন। সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

[হিচককভক্ত ফ্রঁসোয়া ত্রুফো, ১৯৩২-১৯৮৪/ ফ্রেঞ্চ নবতরঙ্গের নাইয়া,  Truffaut’s THE 400 Blows সেই স্রোতে অনন্য (১৯৫৯); ১৯৭৪-এ Day for Night, অনেক ছবির মাঝে অনন্য, ভাবায়। আমার লেখা ঠিক ফিল্মোগ্রাফি নয়, বিদগ্ধ আলোচনাও নয়, কিছুটা ভাবনার প্রতিচ্ছবি টুকরো দৃশ্য বেছে নিয়ে আর ছবি দেখার আহবান, ওকালতি! মূল ছবি দেখুন, প্লিজ, প্লিজ! আমরা অনেক অনেক কষ্ট করে ছবি দেখতাম, এখন সহজ।]

[ফেলিনি ১৯২০-১৯৯৩, ইতালি, Neorealism-এর আবহের নাইয়া, La Dolce Vita, La Strada, — এবং Eight and Half  (১৯৬৩); আমার কিছু কথা Eight and Half নিয়ে, শেষ দিক]


দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ-এর শেষ দৃশ্য

Truffaut’s THE 400 Blows. The final sequence:  ফুটবল মাঠ! কিশোর খেলোয়াড়রা খেলছে, কখোনো এলোপাথাড়ি লাথি, কখোনো এ-মাথা থেকে ও-মাথা গোলাকার বলটিকে লাথি মারছে! বলটি অসহায়! নিয়মে হোক অনিয়মে হোক লাথি তাকে খেতেই হচ্ছে, এটাই ফুটবল খেলার ‘সামাজিক’ নিয়ম। পরাধীন!

এই ‘লাইথ্যা-লাথ্যির’ খবরদারী করার জন্য রয়েছেন একজন, রক্তচোখ! হঠাৎ একটি ছেলে, অবাধ্য, সামাজিক নিয়মে বাঁধা স্বরগ্রামে বেসুরো (Jean Pierre Leaud) ফুটন্ত ফুটবল মাঠ থেকে বের হয়ে দৌড়! কিন্তু ওকে তো খেলতেই হবে, ওটাই নিয়ম! ছাড় নেই, তাই নিয়ন্ত্রণকারী মধ্য-মাঠ থেকে ত্রস্ত বের হয়ে এলেন, ওকে ধরতেই হবে!

দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

প্রথমে ঝোপ-ঝাড়ে লুকোচুরি, গাছ-গাছালির ফাঁকে ফাঁকে। ওরা ওর সবুজ বন্ধু, তাই আড়াল দিতে জানে, “এদিক দিয়ে, না না, ঐ দিকে নয়, আমার আড়ালে যাও!!” ঝোঁপ-ঝাড় ডালপালাও তাই বলছে যেন! পেছনে সেই একচক্ষু রক্তচোখ। ধাওয়া করছে যেন ওকে খেলাতেই হবে নিয়মের বেড়াজালে!

প্রগতিশীল বন্ধুর কবিতা মনে পড়ে গেল:

খেলছি, খেলতে হচ্ছে, খেলতে হবে 
দাবার ছকের গুটিগুলো এদিক সেদিক চাল দিতেই হবে,
কখোনো কোণাকুণি চাল, কখোনো এক ঘর,
সম্মুখ সমর, কখোনো ঘোড়ার আড়াই চাল 
লম্ফ-ঝম্প! খেতে হবে প্রতিপক্ষের সব,
শান্তির সংসার,  কৃষকের
গোলা ঘর বধ করে সব,
পৌঁছে যেতে হবে  আকাশ চুম্বনের   মনযিল-মসনদে।।

* (বন্ধুটি ইদানিং আর কবিতা লেখে না, ৪০+ চ্যানেলে টক-শো করে, যখনি যাহার তখনি তাহার। তার চামচে মধু, চাক ভাঙা নয়, দর্শনার বস্তাপচা চিনির। ‘টক’ শো টক, ঝাল মিষ্টি আর নেই! প্রগতির পরাজয়?)

দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

এক সময় সবুজের আড়ালে পিছু নেয়া একচক্ষু ধাবমান কিশোরকে হারিয়ে ফেলে! বাহ! বদলে গেল দৃশ্যপট, এলোমেলো ছন্দ! হয়ে গেল লিরিকাল, কাব্যময় দৌড়, প্যানিক নেই, শঙ্কা নেই, কেউ হয়তো বাংলার এক কবির দুটো ছত্র ছুড়ে দেবেন : ‘পালাতে পালাতে কতদূর?’

না! পালাচ্ছে না, ওরা মানে ত্রুফোরা পালায় না, সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার প্রস্তুতি, এটা তার prelude। আসলে স্রষ্টা ত্রুফোই সেই ‘অবাধ্য’! তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন! কিশোর ত্রুফো দৌড়াচ্ছে, এবার এলোমেলো নয়, rhythm-এ, ছন্দে, যেমন ম্যারাথন দৌড়াতো গ্রীকরা, বারতা হাতে বারতা পৌঁছে দেবার দৌড়। কি সেই বারতা??

Long tracking shots, pararell! শটগুলো চলচ্চিত্রের ভাষায় কথা বলে কবিতা বা গানের লিরিকের মতো! আবহ সংগীতে সেই ছন্দ! সাউন্ডট্র্যাকে এক সময় আবছা আলোছায়ার মতো ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাই, সৈকতে ঢেউ আছড়ে পড়ছে, ছন্দে ছন্দে! তাহলে সম্মুখে সমুদ্র অপার! তারপর?


অনাদিকালের অনন্ত
প্রশ্নের মতো শটটি
কথা
বলে

প্রশ্ন! ‘তার আর পর নেই?’– তাই কি? ছেলেটি সৈকতের শেষ সীমায় ঢেউ যেখানে মাথাকুটে ফিরে যায় সমুদ্রেরই বুকে অনন্তকাল, নিঃসীম সাগরে! ছেলেটি ঘুরে দাঁড়ালো সেইদিকে যেদিক থেকে সে তথাকথিত ‘সামাজিক’ খেলা ফেলে ছিটকে বের হয়ে এসেছে সে! যেন সে সাগরের ঢেউ, নবতরঙ্গের কবিতার অংশ! ছেলেটি ঘুরে দাঁড়াল সৈকতের সুবর্ণরেখায়! একটি মিড-ক্লোজ ধরনের শট থেকে ক্লোজ শট বলা যায়, ফ্রিজ! যেন একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। A ‘freeze’ shot, আমরা বলে থাকি। চলচ্চিত্রের ভাষায় শৈল্পিক সংযোজন, not a frozen shot, নয় জমাটবাঁধা ফ্রোজেন হিমাগারের লাশ বা শত-শতাব্দির মমি! সর্বকালের ব্যাঞ্জনাময় শট, অনাদিকালের অনন্ত প্রশ্নের মতো শটটি কথা বলে! শুনতে পাচ্ছি কি? একটি ‘ভাষা’ সংযোজিত হলো বিশ্বচলচ্চিত্রের ভান্ডারে! কিশোরকে দিয়ে emotional expression or ‘acting’ করানো হয়নি; অথচ কি গভীর অনুভূতি আর প্রশ্নের অবতারণা ‘নবতরঙ্গের’ (Nouvelle Vague) culmination, বলতে দ্বিধা নেই!

দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

সার্থক শিল্পীর কাজ প্রশ্ন করা,  Prescription দেয়া নয়! শিল্পীর মতো প্রশ্ন! এ বিশ্বের সকল প্রকার শিল্প-প্রকাশ মাধ্যমে শিল্পী আর দর্শক-শ্রোতার মাঝে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে ধরা শিল্পীর কাজ যা প্রেরণা দেয় এগিয়ে যাওয়ার  উত্তরের সন্ধানে!

Nouvelle Vague? ফ্রেঞ্চ তরঙ্গ, সন্দেহ নেই, তবে পিছিয়ে যেয়েও দেখা পাব নব্যবাস্তবতায় ইতালির ডিসিকার ‘উম্বারতো ডি’, বা ‘বাইসাইকেল থিভস’-এ এ বীজ রোপিত হয়েছিল বাথটাব আর সাদা টেলিফোনের cliché পরিহার করে! বাইসাইকেল থিভস? সেই যে শেষ দৃশ্য–  ফুটবল খেলা-ভাঙা দর্শকের ভীড়ে অসহায় ‘পরাজিত’ পিতার হাত ধরছে নবপ্রজন্মের সন্তান, তখন ছবিটি (১৯৪৮) ‘পরাজিত দর্শনের’ না হয়ে হয়ে যায় ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’র (১৯৬৫) ছেলেটি। ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি’ এগিয়ে চল, এগিয়ে চল, উপনিষদের hymn সর্বকালের!

এইট অ্যান্ড হাফ

০২

ইতালির ফেলিনির 8 1/2 (Eight and Half) নিয়ে এবারের বয়ান:  ফেলিনি মিলিয়ন ডলার খরচ করে কিম্ভুত স্ট্রাকচারের ‘সেট’ (?) বানিয়েছেন! বানানো হয়েছে, তাঁরই নির্দেশে। ছবিটি সমাপ্ত হ’লে হবে পরিচালকের নবম ছবি। কিন্তু পরিচালক, যিনি একজন স্রষ্টা তাঁর চেতনায় বিভ্রান্তি! শেষ মুহূর্তে বললেন: ভেঙ্গে ফেলো! অর্থহীন স্ট্রাকচার, ভেঙ্গে ফেলো।

French কবি Mallarme’র Homage To a White  Page-এর allusion দিচ্ছেন ফেলিনি।নিরেট সাদা পাতা নিয়ে বসে আছেন Mallarme! লিখবেন না, কারণ কলমে সৃষ্টিশীল কালি নেই, তাই! ফেলিনির ভাষায়: A Producer or a Financier’s main function is to lose or to gain ‘money’–nothing more. বলছেন: কিন্তু একজন শিল্পী তার চেতনাহীন মানসের বিকৃত পদচিহ্ন  রেখে যেতে পারে না অনাগত কালের ‘সৃষ্টির’ সাগর সৈকতে–  a creative person cannot leave behind his noncreative ‘ugly’ (কিম্ভুত)  footprint on the eternal shores of the artistic expressions! বাহ!!

০৩

ইতালির ফেলিনি ধারার (ফেলিনিয়ান) ‘লা স্ত্রাডা’ (La Strada) থেকে ‘এইট অ্যান্ড হাফ’ (Eight and Half) মুক্ত-ইমেজের স্রোতধারায় continuity আছে, মুভিং ইমেজেস isolated, disjointed প্রবাহ নয়! শিল্প-প্রবাহে অদৃশ্য সূতোর কন্টিনুয়িটি থাকে! শৈল্পিক প্রকাশ আর বিজ্ঞানের ধারাবাহিকতায় মিল আছে। James Joyce-এর (Portrait of an Artist) ‘stream of consciousness’ আর ইলেক্ট্রন প্রবাহে সাদৃশ্য আছে! টুকরো টুকরো চিত্রগাঁথা থেকে স্বপ্নগাঁথার কন্টিনুয়িটি তৈরিতে কোয়ান্টাম থিওরির আভাস পাওয়া যায়?

দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

ত্রুফোর ‘৪০০ ব্লোজ’-এর শেষ দৃশ্যের বর্ণনা একটু দীর্ঘ করেই দিলাম, কারণ অনেক দিন হয়তো ছবিটি দেখা হয় না বা অনেকেরই দেখার সুযোগ হয়নি, এখন ইউটিউবে সহজ, ইচ্ছে থাকলে! দেখে ফেলুন, চমকে যাবেন! আমাদের নিয়ে যায় উত্তরের সন্ধানে নিরবে, নিঃশব্দে। কখনো সচেতন active মানসিক participation-এ, কখনো অবচেতন মানসে! শৈল্পিক চেতনার চক্রান্ত এটিই!

০৪. আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা

আমরা কোথায়? ত্রুফোর ‘400 Blows’ (১৯৫৯) থেকে ভূমিকা দিয়ে ফেলিনির ‘এইট অ্যান্ড হাফ’-এর ইঙ্গিত দিয়ে এখন relevant, প্রাসঙ্গিক ‘প্রশ্ন’ আমাদের: হালভাঙ্গা, পালছেঁড়া ব্যথায়? সমাজ বা জাতিকেই প্রশ্ন করি, কারণ চলচ্চিত্র সমাজ বা জাতির সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দর্পণ, সামাজিক যোদ্ধার সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী অস্ত্র আর চলচ্চিত্র বলতে আমি সর্বপ্রকার moving images-এর কথাই বলছি, টেলিভিশনসহ? প্রায় ৪০টি চ্যানেল, উড়ে যেয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার বিনোদন থাকবে কিন্তু? তাহলে? প্রশ্ন!!


কি গাঁথছি,
সেটাই আসল

জীবন থেকে নেয়া  টুকরো টুকরো ইমেজ গ্রন্থনায় উত্তর খুঁজি সেটা সেলুলয়েড না ডিজিটাল, বিশাল পর্দায় না টেলিভিশনে, মুঠোফোনে, নেটে বা টিউবে কিচ্ছু এসে যায় না! কি গাঁথছি, সেটাই আসল। অবক্ষয়ের অশুভ সংকেত নাকি জীবনের জয়গান।

রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন: “এসো যুগান্তের কবি, দাঁড়াও তোমার ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে, বলো ক্ষমা কর! হিংস্র প্রলাপের মধ্যে সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পূণ্যবাণী!” চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের ভাষাই পারে সেই পূণ্যবাণী রচনা করতে! 

তাই গান করি:
(আমার সেই পথভ্রষ্ট টক শো’র বন্ধুকে দিয়ে লিখিয়েছি, বেচারা! করোনার ধাক্কায় তার চাপা বন্দী!! সে নাকি আর টক সেবন করবে না! কেন যেন অনেক দিন পর হতাশার বাণী  শোনালো না, করোনার জয়)?

তবু বলি, ভাবনার কিছু নেই, তোমরা নক্ষত্র 
হাজার সূর্যে তৈরি তড়িত প্রবাহ!
আম্র-কুঞ্জে বৈশাখি বেবহা সমস্ত বোল
বোলতার মতো তীক্ষ্ণ হবে, কর্ণফুলি ভেঙ্গে দেবে বাঁধ, 
পুনর্বার শিকড় পৌঁছে যাবে আদিম গভীরে,
ঘটে যাবে অগ্নির প্রচন্ড প্রবাহ
লাল রক্ত-লাভা, পুড়িয়ে করবে খাক
সকল অহংকার, ভাওতার বীজ
যেমন  কৃষক পোড়ায় খড়
হেমন্তের শেষে উর্বর মৃত্তিকার আশে! 
আমাদের উষ্ণ হৃদয় আছে মেঘ-ভাঙ্গা রোদ্দুরে!

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
প্রখ্যাত ফিল্মমেকার; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ ।। জন্ম : ২৬ আগস্ট ১৯৪৬ ।। ফিচার ফিল্ম : ঘুড্ডি ; লাল বেনারসী; আয়না বিবির পালা ।। শর্টফিল্ম : দেয়াল, তামাশা, গল্পদাদুর গল্পকথা, অংকুর ইত্যাদি ।। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন [১৯৯৬-২০০১] ।। অপারেশন ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন [১৯৮১-১৯৯৪] ।। শিক্ষার্থী, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া [(পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট); ১৯৭২-১৯৭৭]

মন্তব্য লিখুন