গোদার পাঠ : ১/ লাবণ্য দে

0
467

লিখেছেন । লাবণ্য দে

জ্যঁ-লুক গোদার যখন ছবি বানান, চলচ্চিত্র মাধ্যমটার প্রতি অগাধ ভালোবাসা সেখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। এখন, সাহিত্যিক বা কবি বা নাট্যকার যেকোনো মাধ্যমের শিল্পীর কাছেই নিজের মাধ্যমের প্রতি প্রেম এক রকম আবশ্যিক। এই আবশ্যিক চাপিয়ে দেওয়ার অর্থে নয়, বরং এই প্রেম বা আকুতি না থাকলে সেই মাধ্যমে পড়েই বা থাকবেন কি করে শিল্পী?

ফরাসী নবতরঙ্গের সময় কাহিয়ে দু সিনেমা পত্রিকাটিকে ঘিরে যে সদ্য কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলেরা সিনেমা নিয়ে ভাবতে ও লিখতে শুরু করলো, তাদের মধ্যে এই চলচ্চিত্র মাধ্যমটির প্রতি ভালোবাসা শুরুর দিন থেকেই গভীরভাবে প্রোথিত ছিলো। যদিও ফরাসি নবতরঙ্গ মানেই শুধুমাত্র কাহিয়ে গ্রুপ নয়, বহু পত্রপত্রিকা, সেই সময়ের ফ্রান্সের নতুন দার্শনিক ভাবনাস্রোত, লেফট ব্যাংক ছবি করিইয়ের দল সমস্তটা নিয়েই নিউ ওয়েভ।

নিউ ওয়েভের এই বিস্তারের দিকে আপাতত না গিয়ে বিষয় যখন জ্যঁ-লুক গোদার, কাহিয়ে গ্রুপেই আলোচনা সীমাবদ্ধ করে আনি। গোদারের একটি ইন্টারভিউ এর অংশ এখানে কোট করা প্রয়োজন। “All of us at the Cahiers considered ourselves to be future directors. Writing was already a way of participating in film-making because between writing and shooting there is a quantitative not a qualitative difference”। অর্থাৎ, হাতেনাতে ফিল্ম বানানোর আগে থেকেই এই একদল উত্তেজিত সদ্য তরুণ ফিল্ম নিয়ে লেখা শুরু করে দিয়েছে, শুরু করে দিয়েছে ফিল্ম নিয়ে ভাবনা। তাদের কাজ তখন নতুন পুরোনো ছবি দেখা, ভাবা আর লেখা। এই পদ্ধতি আসলে ছবি বানাবার মতোই ছবির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে রাখা, ছবির প্রতি প্রেম যাপন। জ্যঁ-লুক গোদার যখন ছবি বানাচ্ছেন, তখন ছবি বানানোর অ্যাকশানটাই কেবল এই প্রেম যাপনের পথ হচ্ছে না; বরং ছবির পর ছবির টেক্সটের মধ্যেই রেখে দিয়ে যাচ্ছেন সিনেমা বিষয়টির প্রতি, সিনেমার ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা, ট্রিবিউট বা একগুচ্ছ লাল গোলাপ।


ছবির পর ছবির টেক্সটের
মধ্যেই রেখে দিয়ে
যাচ্ছেন সিনেমা
বিষয়টির
প্রতি,
সিনেমার
ইতিহাসের
প্রতি ভালোবাসা,
ট্রিবিউট বা একগুচ্ছ লাল গোলাপ

গোদারের পঞ্চম ফুল লেন্থ ছবি দ্য ক্যারাবিনিয়ার্স-এ যুদ্ধের জন্য গ্রাম থেকে ভুল বুঝিয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় দুইজন পুরুষকে। তাদের মধ্যে মাইকেলএঞ্জেলো নামের যুবক যুদ্ধকালীন শহরে সিনেমাহলে ফিল্ম দেখতে যায়। জানানো হয়, এর আগে সে কখনো ছবি দেখেনি; অর্থাৎ, ছবি দেখবার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম ওই হলটিতে বসে হতে চলেছে।

প্রথম ছবি দেখবার অভিজ্ঞতার কথা বললেই আর্লি সিনেমার কথা মনে পড়ে। উনিশ শতকের একদম শেষের দিক– সবে সবে ইমেজের চলন সম্ভব হয়েছে। ইমেজ যে নড়াচড়া করতে পারে, অনেক্ষণ ধরে হেঁটে আসা বা প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢোকার দৃশ্যকে যে চলমান অবস্থায় দেখতে পারে– এই ধারণাই ছিলো না তার আগে। গোদার যখন ৬০-এর দশকের প্যারিসে বসে ছবি বানাচ্ছেন, তখন সেই গতিময় ইমেজের ইতিহাসের প্রায় ষাটের অধিক বর্ষ অতিক্রম হয়ে গেছে। সেই সময় মাইকেলএঞ্জেলো নামের ছেলেটি গ্রাম থেকে শহরে এসে পড়ে প্রথম সিনেমার অন্ধকার হলের সাদা পর্দার সামনে এসে বসে।

সিনেমাহলে সে ছাড়া আর গুটিকতক মানুষ। সিনেমা শুরু হয়। পর্দায় দেখা যায় স্টেশান, দূর থেকে একটা ট্রেন ঢুকছে। ট্রেনের আওয়াজ শোনা যায়, ইঞ্জিনের ঘন সাদা ধোঁয়া এগিয়ে আসতে থাকে। ট্রেন আরো কাছে এগিয়ে আসে, ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পর্দা। এদিকে মাইকেলএঞ্জেলো হতবাক হয়ে নাকেমুখে চাপা দিয়ে ফেলে, চোখ বন্ধ করে নেয়, যেন পর্দার ধোঁয়া আর ট্রেন ভেদ করে চলে আসবে অন্ধকার হলের ভিতর। আমাদের মতো সিনেমার ছাত্রী বা যেকোনো সিনেপ্রেমীরই এই সময় লুমিয়ের ব্রাদার্সের প্রথম ছবির কথা মনে পড়তে বাধ্য, যেখানে স্টেশানে ট্রেন ঢোকার সময়টুকু চলমান ইমেজ হিসেবে ধরে রেখেছিলেন তারা। জানা যায়, সেই ১৮৯৫-এর ফ্রান্সে মানুষ প্রথম পর্দায় এই গতিময় ট্রেন দেখে ভয় পেয়ে যায়, কারণ চলমান কোনোকিছু পর্দায় দেখা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতায় ছিলো না।

মাইকেলএঞ্জেলো স্ক্রিনের সামনে বসে খানিক পর চোখ চাপা দেওয়া হাতের আড়াল সরিয়ে দেখে নেয় সব ঠিক আছে কি না। ১৯৬৩-এর ফ্রান্সে গোদারের ছবির ছেলেটির এই প্রথম চলচ্চিত্র দেখবার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া সিনেমার ইতিহাসের প্রতি অভিবাদন জানিয়ে যায়।

লাবণ্য দে
দ্য ক্যারাবিনায়ার্স
ফিল্মমেকার । জ্যঁ-লুক গোদার

দ্য ক্যারাবিনায়ার্স ফিল্মটির মধ্যে মাইকেলএঞ্জেলোর সিনেমাহলে যে ফিল্মটি চলতে থাকে তার দ্বিতীয় পর্যায় দেখা যায় বাবা মা তার বাচ্চাকে খাওয়াতে যাচ্ছে, এবং বাচ্চাটি খাবার উলটে যায়। আবার লুমিয়ের ব্রাদার্সের ফিডিং দ্য বেবিকে কোট করে যান গোদার। এর পরের অংশটি সবথেকে বেশি মজাদার। একজন অল্পবয়সী তরুণী সফট পর্নের মতো করে জামাকাপড় খুলতে থাকে এমনভাবেই, যাতে তার ফ্রন্টাল নুডিটি আড়াল হয়। সে অন্তর্বাস খুলে ফেলে ফ্রেমের বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, সিনেমাহলে বসা পারভার্ট মাইকেলএঞ্জেলো সেই নগ্ন শরীর দেখতে ক্রমশ তার বাঁদিকের সিটে সরে যেতে থাকে। তার সিনেমা দেখার নতুন অভিজ্ঞতা বুঝতে পারে না অনস্ক্রিন স্পেসের ধারণা; সে যতই বাঁদিকে সরে, কিছুতেই মেয়েটিকে দেখা যায় না এবং সে ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ে।


সে
স্ক্রিন
ছুঁয়ে ছুঁয়ে
শরীরে হাত
বোলাতে থাকে–
বুঝতে পারে না কেন
সে ছুঁতে পারছে না ঠিক

অভিনেত্রী এরপর বাথটবের জলে শুয়ে পড়েন। আদ্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচারী সৈনিক মাইকেলএঞ্জোলো ভাবে, স্ক্রিনের কাছে চলে গেলেই অভিনেত্রীর শরীর স্পর্শ করা যাবে। সে স্ক্রিন ছুঁয়ে ছুঁয়ে শরীরে হাত বোলাতে থাকে– বুঝতে পারে না কেন সে ছুঁতে পারছে না ঠিক। মাইকেলএঞ্জেলো স্ক্রিনের ভিতর ঢুকে পড়তে চায়, এভাবে খানিক পর তার শরীরের ভারে স্ক্রিনটি ছিঁড়ে পড়ে। সিনেমা বন্ধ হয় না, পিছনের ফাটা দেওয়ালের ওপর চলতে থাকে একইভাবে। এই যে একটা ফিল্ম ও সেই ফিল্মের স্পেস, তার ধারণা সম্পর্কে মজাচ্ছ্বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যান গোদার।

নতুন মাধ্যম হিসেবে সিনেমা আসবার পর তার প্রতি দর্শকের নতুনত্বের বিস্ময় আর কৌতূহল ছাড়াও আরেকটা বিষয় নিয়ে বক্তব্য রেখে যান তিনি। আসলে অনস্ক্রিন এই স্পেসে আমরা ক্যামেরার সামনে যা দেখে চলি, তা যেন সেই অনস্ক্রিনের লোকগুলিকে না জানিয়েই। তাদের প্রেম, তাদের অফিস, তাদের রান্নাঘর থেকে বেডরুম অবধি ঢুকে পড়ে ক্যামেরা ও দর্শকের গেজ [gaze]।

এই যে লুকিয়ে দেখা– এই যে ভয়ারিজমের আনন্দ, যে আনন্দ একপ্রকার সেক্সুয়াল আনন্দ– তাকে অসীম হাসিমুখে ক্রিটিক করে যান গোদার। সেইজন্যই তার পরের পর ছবিতে হঠাৎ হঠাৎ করে ছবির চরিত্রেরা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ফেলে, কখনো প্রেম করতে করতে কখনো বা গাড়ি চালাতে চালাতে, কখনো-বা ক্যাফেতে বসে। ছবির চরিত্রেরাই সচেতনভাবে জানান দিয়ে যায় অনস্ক্রিন স্পেসের ধারণাকে।


আর্লি
সিনেমার
প্রিমিটিভ মোড
অব রিপ্রেজেন্টেশানকে
তার ছবির মধ্যে ফিরিয়ে
আনেন গোদার, মজাচ্ছলে
আদি সিনেমার ট্যাবলো
ফর্মের ইতিহাসকে ও
সিনেমার প্রথম
দর্শকদের
নতুনত্বের বিস্ময়কে মনে করিয়ে দেন

গোদারের ছবি দেখবার মজা এখানেই। আর্লি সিনেমার প্রিমিটিভ মোড অব রিপ্রেজেন্টেশানকে [PMR] তার ছবির মধ্যে ফিরিয়ে আনেন গোদার, মজাচ্ছলে আদি সিনেমার ট্যাবলো ফর্মের ইতিহাসকে ও সিনেমার প্রথম দর্শকদের নতুনত্বের বিস্ময়কে মনে করিয়ে দেন। নিউ ওয়েভের গোদারের [নিউ ওয়েভের পরের গোদারের ছবিতে গল্পকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়] ছবিগুলোতে শুধু গল্প আর চরিত্রদের ভঙ্গিমা দেখা ছাড়াও তাই অনেকটাই পড়ে থাকে।

সেই অনেকটা শুধুই সিনেমার প্রতি প্রেম আর সেই প্রেমিকের প্রতি ভালোবাসার উদযাপন। যেন সিনেমাহলের অন্ধকারে প্রিয়তমাকে অভিবাদন, ঠোঁটে গোলাপের ডাঁটি চেপে রেখে।


পরের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনেমা ও সাহিত্য প্রেমী; বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতক ।। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

মন্তব্য লিখুন