লুক্রেশিয়া মার্তেল : স্মৃতি ও বিস্মরণের সংলাপ; জ্বলন্ত সিগার ও ট্রমার অঙ্গার/ অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

0
106
লুক্রেশিয়া মার্তেল

লিখেছেন । অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়


লুক্রেশিয়া মার্তেল
জন্ম । ১৪ ডিসেম্বর ১৯৬৬; সালতা, আর্হেন্তিনা


১৯৬৬ সালে আর্হেন্তিনার সালতা শহরে ভূমিষ্ঠা হলেন সাত ভাইবোনের সংসারে। বাবা ছিলেন এক ছোট রঙ-দোকানের মালিক। মা সংসার সামলাতেন।

প্রথম মোশান ক্যামেরা হাতে পান পনেরো-ষোল বছর বয়েসে। যেটি তার ভাষায়– ‘বেশ কষ্ট কিরেই কিনতে পেরেছিলেন বাবা।’ ‘কষ্ট করে কিনতে পারলেও, বাড়িতে কেউ এটি সেভাবে ব্যবহার করছিলেন না। আমি হাতে তুলে নিলাম সেটিকে। রাত-দিন, সময়-অসময়ে তুলে যেতে থাকলাম পরিবারের ভেতর ঘটে চলা ঘটনাবলির মুহূর্তগুলিকে। একরকম নেশায় পড়ে গেলাম।’

কিন্তু নেশায় পড়ে গেলেও এই-ই যে তার ভবিষ্যৎ জীবনের পরিচিতি হবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবছিলেন না তিনি। তা ঘটল আরও কিছু বছর বাদে। তখন তিনি সতেরো বা আঠেরো। বাবার সাথে গেলেন বুয়েনোস আইরেসে। মারিয়া লুইসা বেম্বার্গের কামিলা চলচিত্রটির প্রদর্শনী দেখতে। ছবিটির প্রযোজক ছিলেন লিটা স্টান্টিক। নারী পরিচালকের নির্মিত সিনেমায়, নারীর লগ্নী করা অর্থে নির্মিত চলচ্চিত্রে নারী কলাকুশলীদের এত বাড়াবাড়ি রকমের উপস্থিতি দেখে তিনি নাকি ভেবছিলেন– সিনেমা আসলে মেয়েদের কাজ। এবং দীর্ঘদিন তার নাকি ধারণা ছিল– সিনেমাটা মেয়েরাই পারেন।

‘আমি নিজেকে ফিল্মমেকার বলতে মোটেই পছন্দ করি না। আমার ধারণা আমি সিনেমা সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না’। –সিনেমা কেন করতে এলেন, কিউবান সাংবাদিকের এ প্রশ্নের উত্তরে বলে উঠলেন– ক্যাট-আই চশমাটা অল্প, ঠেলে লুক্রেশিয়া মার্তেল। এ মুহূর্তে সিরিয়াস সিনেমায় আর্হেন্তিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, খোদ সিনেমার অন্যতম জীবিত ঈশ্বরী লুক্রেশিয়া মার্তেল।

পরিবারের সবাই ছিলেন গল্প-বলিয়ে। গল্প বলার সেই প্রবণতা তার চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে থেকে যাবে। সাহিত্য ভালবাসেন। তার প্রথম ছবির স্ক্রিপ্টের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ২০০। দু’শ পাতা! অবশ্যই দু’শ পাতার স্ক্রিপ্টকে চিত্রদান করা হয়নি, শুটিঙের সময়।


আমেরিকার
বেশির ভাগ ফিল্ম
ইশকুলে চিত্রনাট্য লেখার
যেসব ক্লাস করানো হয়,
তার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে
দাঁড়িয়ে চিত্রনাট্য
লেখেন
মার্তেল

তার চিত্রনাট্য বেশ জটিল। আমেরিকার বেশির ভাগ ফিল্ম ইশকুলে চিত্রনাট্য লেখার যেসব ক্লাস করানো হয়, তার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে চিত্রনাট্য লেখেন মার্তেল।যেমন গোদার কথিত একদা সেই আপ্ত উক্তি, আজ যা মুখে মুখে ফেরে– ‘A story should have a beginning, a middle and an end, but not necessarily in that order.’ শব্দ তাকে প্রাণিত করে প্রথম থেকেই। তাই তার চিত্রনাট্য হয়ে উঠতে থাকে শব্দের অনুগামী। ‘শুরু থেকেই’– বলছেন মার্তেল। ‘এমনকি যখন আমি সবেমাত্র চিত্রনাট্য লেখার কাজ করি, তখন থেকেই আমি শব্দ নিয়ে ভাবি, সম্পূর্ণ সাউন্ডট্র্যাক আমি ছবি তৈরির আগে থেকেই শুনতে পাই। আমার অনেক ছবিই ওরাল ট্র্যাডিশন, মুখে মুখে ফেরা গল্পগাথা থেকে অনুপ্রাণিত।’

সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে ছবির সম্পাদনা করেন, তার সম্পাদনার ক্রাফট নিয়ে বলা হয়– সিকোয়েন্সের কখন যে তিনি কাটটি রাখবেন, এমন কোন অকল্পনীয় ফ্রেমে, তা আগে থেকে বলা যায় না।

ছোট বড় মিলিয়ে ছবি করেছেন অনেক। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্যের সময় মেনে এযাবৎ তার চলচ্চিত্রের সংখ্যা মোট ৪টি। তার মধ্যে রয়েছে– লা শিনিয়েগা, দ্য হোলি গার্ল, দ্য হেডলেস ওম্যান ও সর্বশেষ সামা

লুক্রেশিয়া মার্তেল
লা শিনিয়েগা

২০০১ সালে আত্মপ্রকাশ করলেন লা শিনিয়েগা চলচ্চিত্রে। এ ছবি সম্পর্কে বলা হয়– এ ছবি ঘুরিয়ে দিলো আর্হেন্তিনার নতুন সিনেমার অভিমুখ। হ্যাঁচকা এক হাতল ঘুরিয়ে। টাইটেল দৃশ্য থেকেই খুলে দ্যায় শব্দের ভুল্ভুলাইয়া। ধ্বনি ও শব্দের ব্যবহার হয়ে ওঠে তার ছবিতে স্পর্শসম– ইংরেজিতে যাকে বলে হ্যাপটিক [haptic]। যেমন কখনো বজ্রপাত এবং পর্দার কাটঅ্যাওয়ের পুনঃব্যবহার করে গড়ে তোলেন যে দৃশ্য, তাকেই ছাপিয়ে যেতে আবার প্রক্ষেপ করেন বহুস্তরিক ধ্বনি সম্ভার। কখনো ফুটপাথের ওপর ক্রমাগত শব্দ করে চলা ধাতব টুকরো, কখনও সবুজ লনের ওপর নিঃসঙ্গ একটি চেয়ারকে টেনে নিয়ে যাওয়ার লংটেকের দৃশ্যে শব্দই হয়ে ওঠে ব্রহ্ম– নয়েজ ও আপাত অবাঞ্ছিত শব্দাঞ্চলের বিশুদ্ধ ইনারশিয়া।

ঠিক এধারাতেই এগোয় লা শিনিয়েগা। শব্দ ও কাট-অ্যাওয়ের খেলার মধ্যবর্তীতে বলতে থাকেন গল্প। নিঃস্পৃহ স্বরে। আর্হেন্তিনার মধ্যবিত্তের ইতিহাস বিস্মরণের গল্প। মায়োপিক এক প্রজন্মের কথা। যেখানে তার চলচ্চিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকের মনে হয় কি চূড়ান্ত স্থির সবকিছু, কি নিদারুণ এই কর্মহীনতা। কারুর আর যেন কিচ্ছু করার নেই আর। সময় ও স্মৃতি থমকে আছে, কাউকে নড়ানো যায় না। এবং চলচ্চিত্রটি শেষ করেন তিনি। তখনই, মোমি, ছবির সবথেকে চিন্তক চরিত্রটি বলে ওঠে– ‘আমি কিছুই দেখতে পাইনি’।

মোমি যেখানে এ কথা বলে শেষ করেন, ঠিক তার সূত্র ধরেই শুরু হয় মার্তেলের পরের ছবি দ্য হোলি গার্ল। ২০০৪ সালে। মার্তেলের অন্য ছবিগুলির মতই কাম, যৌনতা এখানেও বেপরোয়া, উন্মত্ত। মধ্যবিত্ত, শহুরে সভ্যতার কোডগুলিকে ধ্বংস তার এরোটিক ভাবালুতা। লা শিনিয়েগার বা জলাভূমির মতোই চলচ্চিত্রটি শেষ হয় অস্পষ্টতার সান্ধ্যলিপিতে। যার জন্য লুক্রেশিয়া বেছে নেবেন তার প্রিয় মেটাফর সুইমিং পুলের লোকেল। ছবির দুই মুখ্য চরিত্র আমেলিয়া ও জোসেফিনাকে ডুব দিতে দেখব সাঁতারের কৃত্রিম জলাশয়ে, আর আমরা অস্থির অসহিষ্ণুভাবে অপেক্ষা করব– যতক্ষণ না জসেফিনা আবার উঠে আসেন।

লুক্রেশিয়া মার্তেল
দ্য হোলি গার্ল

মার্তেল সংলাপ রচনা করবেন–
জসেফিনা বলে– ‘গন্ধ পাচ্ছ না?’
আমেলিয়া উত্তর দেয়– ‘কমলাফলের মুকুল।’
জসেফিনা আমেলিয়াকে প্রতিশ্রুতি দ্যায়, যথার্থ বোনের মতোই সে তার খেয়াল রাখবে।

এই বলে দুই কন্যা আবার ডুব দ্যায় জলে কৃত্রিম জলাশয়ে। তারা আবার ভেসে চলে। এক অজানা আগন্তুক নারী এগিয়ে আসেন। ভাসমান দুই কন্যাদের চোখে চোখ রেখে বলে ওঠেন– ‘শুনতে পাচ্ছ? শুনতে কি পাও?’

ব্যস। এ পর্যন্তই। এই মুহূর্তে সিনেমাকে, দর্শককে পরিত্যাগ করবেন মার্তেল। পর্দায় ঝুলিয়ে দেবেন টাইটেল কার্ড। অ-পরিতৃপ্ত রাখবেন আমাদের। ভাসিয়ে দেবেন সিনেমাকে। অপেক্ষায় রাখবেন– দূর, অলিখিত, এক জন্মান্তরে। লুপ্ত করবেন চেনা যাবতীয় কারুবাসনা। অচেনার আনন্দ ও বেদনা এই দুইয়েই ক্রমে গ্রাস করাবেন আমাদের।

এই তিনি।
লুক্রেশিয়া মার্তেল।

লুক্রেশিয়া মার্তেল
দ্য হেডলেস ওম্যান

এর চার বছর বাদ দ্য হেডলেস ওম্যান। এই সব প্রিয় বারবার ফিরে আসা মেটাফর ও মার্তেল্যিয় শৈলীগুলিই যেন আরও সমৃদ্ধ হয়ে হাজির হলো। ঘনিয়ে উঠল হিচককিয় এক অ্যান্টি-থ্রিলার। ছবির মুখ্য চরিত্র মারিয়া ওনেত্তা, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সোনালী চুলের নারী। যিনি ছবির শুরুতেই একটি গাড়ি দুর্ঘটনা করেন। তারপর থেকে সারা ছবি জুড়ে তার সন্মোহের কাহিনি বলে যাবেন লুক্রেশিয়া। দর্শককে বহু সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়ে, মার্তেল মনস্তত্ত্বেরর জটিল খেলায় মাতাবেন, এই প্রশ্নে ঝুলিয়ে রেখে– সেদিন কি হয়েছিল? সত্যিই কি মারিয়া কাউকে গাড়ি চাপা দিয়েছিলেন? সারা ছবিতে এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কখনই না।

তার সাম্প্রতিকতম চলচ্চিত্র সামা [Zama] মুক্তি পেয়েছে ২০১৭ সালে। নিঃসন্দেহে মার্তেলের সিনেমা ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায়ের শুরু করেছে।আর গত দশ বছরের (২০০৯ – ২০১৯) বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সারা আর্হেন্তিনা জুড়েই জ্যর-সিনেমার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। থ্রিলার, নয়ার, ব্ল্যাক কমেডি। নব্বইয়ের দশকে আর্হেন্তিনীয় সিনেমায় দেখা গিয়েছিল আশির সিনেমার আ্যলিগরিমূলক ও নীতি-বাগীশ সিনেমার প্রতি ঝোঁক। শূন্য দশকে তা কাটতে শুরু করে। ইদানিং অনেককেই আবার ফের সত্তরের দিকে ঝুঁকে যেতে দেখা যাচ্ছে। যদিও সেক্ষেত্রে তাড়নাটা হলো– জ্যঁর সিনেমা। জ্যর-এর নিয়ম মেনেই। কোনো অন্য স্তরে কিছু বলার চেষ্টা নেই।

সেসব পরিচালকরা কখনই চাইছেন না সমষ্টিগতভাবে দর্শক প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠুন, সমালোচনা করুন। এটি তাদের কাছে কেবলমাত্র সরাসরি একটি জ্যঁর সিনেমা। এখানেই স্বতন্ত্র মার্তেল। তার প্রতিপাদ্য কেবল জ্যঁর নির্মাণ নয়। হোক না সে তার নিজস্ব নির্মিতি। জ্যঁর-এর বাইরে, ইতিহাসের সত্য উন্মোচনে, বেকেটিয়ান রহস্যে স্তরে স্তরে সেজে ওঠে তার চিত্রনাট্য, ক্যামেরা।

লুক্রেশিয়া মার্তেল
সামা

দি বেনেদিত্তো’র উপন্যাসের আ্যডাপ্টেশন।কলোনিয়াল সময়ের স্বরূপ উন্মোচন, অভিজাত ও অনভিজাতের সংঘাত, মধ্যবিত্তর বঞ্চনা– এসবই আখ্যানগতভাবে সামা’র বিষয় আশয়। দি বেনেদিত্তো, দস্তয়েভস্কি’র অনুরক্ত শিষ্য। তার আখ্যানে প্রায়শই গাঢ় ছায়া ফেলে রাখেন কাফকা ও সামুয়েল বেকেট। এই আবহ বজায় রেখেই যাত্রা করে মার্তেলের সামা। সারা ছবিজুড়ে হয়ে চলে ভূতগ্রস্ত এক বেকেটিয়ান হিউমারের ধারা। নিঁখুত এক সুপ্ত নিস্তব্ধতায় নিজের জ্যঁর-টি রচনা করেছেন তিনি। ধারাবাহিকভাবে। হরর ও তাড়া করার এক ধীরগতির রহস্যময় আবহ গড়ে তোলার জ্যঁর।

মুখ্য চরিত্র– দোন দিয়েগো সামা, ইওরোপীয় বংশোদ্ভূত এক অভিজাত। ১৯৫৬ সালের পটভূমি। ছবিতে তাকে প্রথম আমরা যখন দেখি, তখন তিনি অপেক্ষারত। অপেক্ষা করছেন– স্ত্রীর চিঠির। মার্তেলের মিজ-অন-সিন সাক্ষী থাকে কলোনিয়াল সময়-স্থাপত্যের। এরপর শুরু হয় মার্তেলের হরর ও ফ্যান্টাসি আবহের নিজস্ব জ্যঁরের বিস্তার। মনস্তত্ত্বের জটিল বিশ্লেষণে। সারা ছবি জুড়েই ক্যামেরা অসম্ভব মন্থর। প্রায় স্থির।কখনও ট্যাবলো’র ধাঁচায় তিনি সাজান কম্পোজিশন। তার অভিনব কম্পোজিশন, এক্সপ্রেশনিজম ধাঁচের ক্যামেরা চলন আমাদের নিয়ে যায় সামা’র মস্তিস্কের লেবাইরিন্থের অন্দরে। মার্তেলের এক্সিসটেন্সিয়াল সিনে-ভাষায় আমাদের মননে দোন দিয়েগো সামা রূপান্তরিত হন এক মাছে।


রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ
ছাড়া লাতিন আমেরিকার
সিনেমার ইতিহাস
অবোধ্য,
অসম্ভব
এক
চর্চা

লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বারবারই বলেছি, বলতে চাইছি– রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ ছাড়া লাতিন আমেরিকার সিনেমার ইতিহাস অবোধ্য, অসম্ভব এক চর্চা।একটি জাতির শতাব্দী পুরাতন সমষ্টিগত ট্রমা, অন্য জাতির উপনিবেশ রচনা ও প্রভুত্ব, ইতিহাসের বিস্মরণ ও বিস্মরণের ইতিহাস, থেমে থাকা স্মৃতি, অপেক্ষা, জাতি সত্তার খোঁজ; তার মাঝে কিভাবে হানা দিয়ে যায় পিতৃতন্ত্রের ছড়ি, এসবই প্রেতাত্মার মতো ঘুরে ফিরে বেড়ায় লুক্রেশিয়ার ভুবনে। তার নির্মাণ করা চলচ্চিত্রগুলির অলিন্দে অলিন্দে।

মাত্র চারটি পূর্ণদৈর্ঘের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন গত বিশ বছরে। লুক্রেশিয়া বালিকার মতো হেসে ফেলেন– বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন, যখন ভাবেন কী করে তবে আর সবাই পারেন, এত-এত সংখ্যায়, এত ঘনঘন শিল্প প্রসব করতে। সামার স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন চার বছর ধরে। হাসেন রহস্যময়ী। বিড়ালিনীর মতো ঝিলিক তুলে চোখে। যখন বলেন– এই চার বছর আসলে তিনি ভেসে বেড়িয়েছেন নদী বুকে। একটি ডিঙ্গা কিনেছিলেন। চিত্রনাট্য লিখবেন বলে, নদীর বুকে ভেসে। সঙ্গে নিয়েছিলেন দুই বান্ধবীকে। আর অনিবার্য ছিল তা নেওয়া– চার খানি বড় পেটি ভরতি– বই শুধু বই।

স্লো ক্যামেরা, এপিক্যাল প্লট, দার্শনিকের কথামালা, এসবের জের টেনে তার তুলনা ওঠে টেরেন্স মালিকের সাথে। আর্হেন্তিনার টেরেন্স মালিক তিনি, একথা উত্তর আমেরিকার সংবাদপত্রে লেখা হয়। এ কলমচীর বোধ আপত্তি করে ওঠে। এভাবেই আর্থিক সঙ্গতিতে এগিয়ে থাকা বিশ্ব, অ্যাংলোফোনিক পশ্চিমা বিশ্ব চাপিয়ে দেবে আর্থিক অনুন্নত দেশের ওপর, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মিহি ফেনা।

এই যে উত্তর আমেরিকার বরফ ঢাকা পশ্চিম পাহাড়ে বসে বঙ্গ কলমচী আমি ভাবছি। লেখক হিসেবে তীব্র আপত্তি করেছি। লুক্রেশিয়া তো জানেন না সে কথা।

না জানুন। তার প্রতি এই কলমচীর পক্ষপাত বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক কারেক্টনেসকে জাহান্নামে যেতে বলুক। আপাতত তার জোরালো ঠোঁটজোড়া থেকে ঝুলে থাকা জলন্ত সিগারের মতোই জ্বালাময়ী প্রতিভা নিয়ে সিনে-মননে ধারালো বিভা ছড়াচ্ছেন তিনি। আমাদের লুক্রেশিয়া মার্তেল। সিনেমার বেঁচে থাকা জীবিত এক ঈশ্বরী। আপনাকে ভালোবাসি, সেনিওরা মার্তেল।


লুক্রেশিয়া মার্তেল
লুক্রেশিয়া মার্তেল

লুক্রেশিয়া মার্তেলের ফিল্মোগ্রাফি [ফিচার ফিল্ম]

২০০১ । লা শিনিয়েগা [La Ciénaga]
২০০৪ । দ্য হোলি গার্ল [La niña santa]
২০০৮ । দ্য হেডলেস ওম্যান [La mujer sin cabeza]
২০১৭ । সামা [Zama]

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
চলচ্চিত্রকার, লেখক, টেকনিশিয়ান,হিউম্যান রাইটস কর্মী; ভারত ।। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের অধ্যাপনা করছেন ।। ফেমিনিস্ট ও বর্ণবিদ্বেষী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ।। প্রকাশিত গ্রন্থ : টালমাটাল; উসিমুসি করে বুক; সিনেমার স্পেন; সিনেমার আর্জেন্তিনা ইত্যাদি ।। চলচ্চিত্র : রেড; ১৭০০ কেলভিন; দ্য থার্ড ব্রেস্ট; টেক কেয়ার; টেইলার মেড ইত্যাদি

মন্তব্য লিখুন