ব্ল্যাকআউট: অ্যান আনরিলিজড ড্রিম

642

লিখেছেন । তাহুয়া তুরা

ব্ল্যাকআউট
স্ক্রিপ্টরাইটার ও ফিল্মমেকার • টোকন ঠাকুর
সিনেমাটোগ্রাফি ও এডিটিং • সামির আহমেদ
মিউজিক • অর্ণব
আর্ট ডিরেক্টর • আব্দুল হালিম চঞ্চল
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান • আস্তাবল
অভিনয় • তানভীর হাসান, রাহুল আনন্দ, তিনা, ধ্রুব এষ, কফিল আহমেদ
স্টিল ফটোগ্রাফি • রিচার্ড রোজারিও
ফরম্যাট • ভিডিও ফরম্যাট
রানিংটাইম • ৯৭ মিনিট
ভাষা • বাংলা
দেশ • বাংলাদেশ
নির্মাণকাল • ২০০৬
•• ফিল্মটি এখনো বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়নি


ব্ল্যাকআউট
ফিল্মমেকার । টোকন ঠাকুর

ভোরের কুয়াশা মাখা দিগন্ত জোড়া মাঠ, মাঠের মধ্যে ফুল ছড়ানো বিছানায় ফুলের পাপড়ি সমাহারে শুয়ে আছে এক তরুণী, দূর থেকে এক তরুণ দৌড়ে এসে তার কাছে এসে বসে, তাকে বিস্ময় নিয়ে দেখে, মনের মধ্যে সাজিয়ে রাখা ভালোবাসা খুঁজে পেলে যেমন হয়, তেমন। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ ঢিপঢিপ। মেয়েটাকে ছুঁতে চায় ছেলেটা, খুব কাছাকাছি, যেন-বা চুমু খেতে চায়, যখন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়– হঠাৎ করেই ভেঙে যায় তার স্বপ্ন। আমরা দেখতে পাই, সেই তরুণ শুয়ে আছে শহরের কোনো এক বাড়ির চিলেকোঠার বিছানায়, তার বন্ধুর পাশে জড়াজড়ি করে।

এমন স্বপ্নদৃশ্য আমরা প্রাসঙ্গিকভাবেই দেখতে পাই ব্ল্যাকআউট সিনেমার বাঁকে বাঁকে।

ব্ল্যাকআউট
আর্টিস্ট রাফি, কবি মাদল ও তাদের চিলেকোঠার ঘর
ফিল্ম । ব্ল্যাকআউট

শহরের দুই যুবক, যারা বন্ধু, একজন আর্টিস্ট, যার নাম রাফি; একজন কবি, নাম মাদল। তাদের যাপিত জীবন, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা-অনুভূতি এবং এর বহিঃপ্রকাশ, সেক্সুয়াল ডিপ্রেশন, স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নভঙ্গ, সমাজের মধ্যে থেকেই আবার সমাজে না থাকা কিংবা ধারণ না করা কিংবা করা এইসব নানান বৈচিত্র্যময়তা নিয়েই  সিনেমা ব্ল্যাকআউট

২০০৬ সালে নির্মিত এবং অদ্যাবধি  আন-রিলিজড ডিজিটাল ফরম্যাটে শুট করা সিনেমা ব্ল্যাকআউট। ২০১৯ সালে বসে ব্ল্যাকআউট দেখার পর মনে হলো, পরিচালক সময়ের অনেক আগেই বানিয়ে ফেলেছেন ছবিটা। এটা বলা হয়তো ঠিক হবে কি-না জানি না, কিন্তু এখনো এরকম সিনেমা কেউ বানায়নি এদেশে। ছবিতে দুই বন্ধু রাফি ও মাদলকে দেখার পর মনে হয়েছে প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দিয়েছে কিংবা স্বশিক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে এমন কিছু ছেলে এই সময়ে এই সমাজে আমরা দেখতেই পাই। তাদের এমন কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে যা আমরা ব্ল্যাকআউট-এ দেখতে পাই এবং বাস্তবেও দেখতে পাই। কিন্তু বাংলাদেশি অন্য কোনো সিনেমায় এরকম আমার কোনোদিন চোখে পড়েনি।

ব্ল্যাকআউট
ব্ল্যাকআউট-এর ডিরেক্টর ও ক্রু

একটা তথ্য উল্লেখ্য যে, ২০০৬ সাল তো বটেই, ২০০৯ সাল পর্যন্ত  এদেশে ৩৫ মি.মি. মাধ্যমে না করা হলে শুধু মাধ্যমগত কারণেই এদেশে তাকে সিনেমা বলা হতো না। যদিও, ২০০৯ সালের পর  থেকে ডিজিটাল ফরম্যাটই সিনেমা নির্মাণের একচ্ছত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বলতেই হয়, ব্ল্যাকআউট-এর নির্মাতা টোকন ঠাকুর মাধ্যম হিসেবে ডিজিটালি ছবি বানিয়ে মাধ্যমগতভাবেও এগিয়েই ছিলেন, যদিও সেসময় অফিসিয়ালি রিলিজ না করতে পারার কারণে  ঢাকা-সিলেট মিলিয়ে ছবিটির বেশ কিছু প্রদর্শনী হয়েছিল প্রজেক্টরের মাধমে। রাশিয়ান কালচারাল অডিটরিয়ামে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে প্রিমিয়ার শো, এরপর চারুকলার রঙ মিস্তিরি ফিল্ম ফেস্টিভালে ২টি শো, মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের তৎকালীন ইসফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে ৪টি প্রদর্শনী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে একটি শো, চোখ ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ১টি প্রদর্শনী, দেশের লিজেন্ডারি আলোকচিত্রী কাম সিনেমাটোগ্রাফার অধুনা প্রয়াত আনোয়ার হোসেনের উদ্যোগে অ্যামেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বনানী ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে ১টি প্রদর্শনী এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে দুই দশকের  নির্বাচিত ২০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১টি চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শনী ও একটি কাষ্ঠ ক্রেস্ট অর্জন এবং পুনরায় ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে একাডেমিরই নাট্যশালা ভবনের সেমিনার-হলে চলচ্চিত্র অ্যাপ্রেসিয়েশন কোর্সের শিক্ষার্থীদের জন্যে ৪ বার… সব মিলিয়ে এই হচ্ছে ব্ল্যাকআউট-এর পাবলিক প্রদর্শনী, এটুকুই ছবিটির কপালে জুটেছে। এ ধরনের চূড়ান্ত ও তুলনারহিত নিরীক্ষাধর্মী একটি ছবির জন্যে এটি একটি হতাশারও ঘটনা বটে, এই দেশে।


ডায়লগগুলো জোড়া
দিলে মনে হবে
কবিতা
পড়ছি

ব্ল্যাকআউট-এ জড়িয়ে আছেন শিল্পী কফিল আহমেদ, ধ্রুব এষ, ফুটপাতের বংশীবাদক লাবু ভাই, চারুকলার মডেল ও নন-কনভেনশনাল ক্রাফট আর্টিস্ট শতবর্ষী  দাদু… এমন সবাই। এজন্য অনেকটা ডকুও মনে হতে পারে ছবিটিকে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ব্ল্যাকআউট-এ ব্যবহৃত অংসখ্য সিলেক্টিভ পেইন্টিং এবং এর স্ক্রিপ্ট। ডায়লগগুলো জোড়া দিলে মনে হবে কবিতা পড়ছি। আর অর্ণবের করা মিউজিক ও গান ‘সময় সবুজ ডাইনি’ কী দারুণ, অনবদ্য! ব্ল্যাকআউটই অর্ণবের প্রথম করা সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

ব্ল্যাকআউট
ব্ল্যাকআউট-এর প্রমোশনাল তাস

এই সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই বন্ধুর গল্প; তারা বাইসেক্সুয়াল নন। পৃথিবীতে কোনো ছেলেই পুরোপুরি ছেলে নয়, আবার কোনো মেয়েই পুরোপুরি মেয়ে নয়। অর্থাৎ বাই না হলেও কিছু অংশ তরল থাকে। খুব রেয়ার হলেও সেইম সেক্সের প্রতি আকর্ষণ অনুভূত হয়। যখন প্রেমিকাহীন কিংবা খুঁজে না পাওয়া প্রেমিকা এবং প্রেমিকা-প্রত্যাখ্যাত দুই তরুণ একসাথে থাকে, তারা একজন আরেকজনকে বুঝতে পারে, সেক্সুয়াল অবদমনে ভোগে তখন নিঃসঙ্গতার কোনো মুহূর্তে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে কিস করতে চায়, পরক্ষণেই তাদের মনে পড়ে সামাজিক পরিস্থিতি– ‘দিস ইজ বাংলাদেশ’।

দু’বন্ধুর মধ্যে কেমিস্ট্রিটা খুব দারুণ জমেছে। তারা চাকরি করে চাকর হতে চায় না। গৎবাঁধা কোনোকিছুই তারা করে না। তাই তরুণ কবি এবং শিল্পী বন্ধুকে বেশ ভালো রকমের স্ট্রাগলের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়। পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রেমিকা– কেউই হয়তো তাদের এই অবস্থানকে মেনে নিতে পারে না। সৃজনশীল মষ্কিকের কেউ স্বাধীনভাবে যেভাবে থাকতে চায়, রাফি ও মাদল তার বাইরে নয়।


তারা এনার্কি করতে
ভালোবাসে,
করেও

ছবিতে দেখা যায়, দুজনের কথাবার্তায় কোনো বিষয়বস্তু নেই। তারা ‘মাঝরাতে ইভা ব্রাউনের স্তন শাসন করত হিটলারকে’ বলে সেটা নিয়ে যেমন আলোচনা করে, আবার রাফির ভালোবাসতে চাওয়া মিটিকে নিয়েও কথা বলে। মিটি অনেক ছোট, এটা নিয়েও রাফি ক্ষণিকের জন্যে চিন্তিত হয়। একজন আকাশের দিকে দুই পা তুলে বলে, ‘এক্সারসাইজ করা দরকার।’ অন্যজন বলে ‘সেক্সারসাইজ দরকার না?’ নিজেদের জীবন ও স্বপ্ন নিয়ে বলাই যায়, তারা এনার্কি করতে ভালোবাসে, করেও। ছবিতে ঘোড়া, হ্রেষা, ঘোড়ার লিঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে নানান মাত্রায়।

ব্ল্যাকআউট
রাফি ও মিটি
ফিল্ম । ব্ল্যাকআউট
[সিনেমাটি মুক্তি পায়নি; তবু কি এক অভিমানে জীবন থেকে চিরমুক্তি নিয়েছেন রাফি চরিত্রের অভিনেতা তানভীর হাসান! তার অকালপ্রয়াণে জানাই শোক…]

রাফির কাম-আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়ে ক্যানভাসে, পেইন্টিংসে; মাদল প্রেমিকার জন্যে জমে থাকা ভালোবাসার কথা কোলবালিশকেই জড়িয়ে ধরে বলে, বলতে থাকে– ‘তুমি মেঘ, রাতে যখন বাসায় ফিরি, কুয়াশার ছদ্মবেশে তুমি পথের উপর এসে দাঁড়াও, সর্বনাশী, তুমি আমার পথ আগলাতে চাও, তাই না?’  ঝুঁকে গিয়ে নিজের নাকটা কোলবালিশে ঘষে স্বগোতোক্তি করে, যেন-বা তার নাকের কাছেই রয়েছে তার মনোনীতা– ‘নাকছাবিটা চিকচিক করছে… চিকচিক চিকচিক চিক চিক করছে, চিক চিক…!’

মিটি চরিত্রে অভিনয় করেছে তিনা। অপরিণত অভিনয়। কিন্তু ওর দুর্বল অভিনয়ও চরিত্রের গঠন অনুযায়ী কিছুটা খাপ খাইয়ে গেছে। মিটি, রাফির ভালোবাসা। একজন আর্টিস্টের বৈচিত্র্যময় জীবন কাছ থেকে দেখার জন্যে মিটি রাফির কাছের আসে৷ পোর্ট্রেট করাতে চায়। মিটি মডেল হতে চায়। সিকিউরড লাইফ লিড করতে চায়। তাই একজন আর্টিস্টের সঙ্গে তার আর আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা হয় না। আর শাল্মলি… স্মৃতির মধ্যে থাকা একটি মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে মাদল। কিন্তু সেই মেয়ে তার বাস্তবে ধরা দেয় না। উড়ে বেড়ায় স্বপ্নে স্বপ্নে।

ব্ল্যাকআউট

একটা সময় দুই বন্ধু রাফি ও মাদল সব ভুলে যায়। কোনোকিছুই ঠিক করে তাদের মনে পড়ে না। হয়তো তারা মনে করতে চায়ও না। ব্ল্যাকআউট হয়। সময় সত্যিই সবুজ ডাইনি। দুই বন্ধু এক মদ্যপ রাতে রাতে নাচে; নাচতে নাচতে কথোপকথন করে– ঘোড়ায় পাড়ে ডিম/ সেই ডিমের আইসক্রিম/ যে খায় তার মাথা ধরে/ এরেই বলে ঝিম। অন্য বন্ধু মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘উঁহু, ড্রিম।’ এক বন্ধু বলে, ‘ঝিম’; অন্য বন্ধু বলে, ‘ড্রিম’। ব্যাপারটা চলতে থাকে নাচের ছন্দে ছন্দে। নির্মাতা ব্ল্যাকআউট-এর বাংলা করেছেন, ‘মনে নেই’। কী মনে নেই? যা মনে নেই। যা যা কী? তা কি আর মনে আছে? যা মনে নেই, কিন্তু আবছা আবছা মনেও আসে বা মনেও পড়ে, তাই হলো ব্ল্যাকআউট। এরকমই একটা অর্থবোধকতার  মধ্যে পরিচালক ঠেসে ধরতে চেয়েছেন দর্শককে।

ছবিটি নির্মাণ করেছেন টোকন ঠাকুর। ব্ল্যাকআউট তার ফার্স্ট চাইল্ড। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ছবির স্ট্রেন্টাল ক্যারেক্টার দুজনের মধ্যে একজন কবি, একজন আর্টিস্ট। পরিচালক নিজেও পড়াশোনা করেছেন চারুকলায় আর প্রবল প্রতিভার গুণে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে হুবহু না মিললেও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জার্নি করে তিনি প্রথম সিনেমাটি বানিয়েছেন। 

ব্ল্যাকআউট দেখে কিছুক্ষণের জন্যে আমি অনেকটাই ব্ল্যাকআউট হয়ে গেছি। ব্ল্যাকআউট-এ কবি রণজিৎ দাশের একটি কবিতা ছবির মিউজিক ডিরেক্টর অর্ণবের কণ্ঠে গান হয়ে উঠেছে– ‘সময়, সবুজ ডাইনি, পৃথিবীর উপকণ্ঠে থাকো, নাবিকের হাড় দিয়ে, সন্ধ্যার উঠোনে তুমি, ভাঙা জাহাজের ছবি  আঁকো।’ এ ছবিতে এমনসব দুর্দান্ত ডায়লগ রয়েছে, যা একইসঙ্গে ডেপথফুল এবং চরিত্রের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। ধারাবাহিকতা নেই ছবিতে। একটা দৃশ্যের পর নতুন দৃশ্য কি হবে– তা কোনোভাবেই আঁচ করা যায় না। কিন্তু এক মুর্হূতের জন্যেও মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না ছবি থেকে। ব্ল্যাকআউট-এ এমন অনেক দৃশ্য আছে যা বাস্তবে দেখে থাকলেও কোনোদিন কোনো বাংলাদেশি সিনেমায় আমার দেখা হয়নি। এটি এমন একটি ছবি, যে ছবি সবসময় নতুন থাকবে।

দুভার্গ্য, ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি। মুক্তির প্রতীক্ষায় থেকে আপাতত বিদায়….

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯
মুম্বাই, ভারত
Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here