দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন: যুদ্ধ, বর্ণবাদ আর শ্বেতঃঅহংবোধের প্রেতপত্র

1
160

লিখেছেন । মুনতাসির রশিদ খান

দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন
The Birth of a Nation
ফিল্মমেকার ও ফিল্ম-এডিটর । ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ
উৎস-রচনা । দ্য ক্ল্যান্সম্যানদ্য লিওপার্ড’স স্পোর্টস/ টি. এফ. ডিক্সন জুনিয়র
স্ক্রিপ্টরাইটার । ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ, ফ্র্যাঙ্ক ই. উডস
প্রডিউসার । ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ, হ্যারি অ্যাইটকেন
সিনেমাটোগ্রাফার । জি. ডব্লিউ. বিটজার
মিউজিক স্কোর । জোসেফ কার্ল ব্রেইল
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । লিলিয়ান গিস [এলজি স্টোনম্যান], মায়ে মার্শ [ফ্লোরা ক্যামেরন], হেনরি বি. ওয়াল্টহল [কর্নেল বেঞ্জামিন ক্যামেরন], মারিয়াম কুপার [মার্গারেট ক্যামেরন], ম্যারি অ্যালডেন [লিডিয়া ক্যামেরন]
প্রোডাকশন কোম্পানি । ডেভিড ডব্লিউ. গ্রিফিথ করপোরেশন
কালার । সাদাকালো
ভাষা । নির্বাক [ইন্টারটাইটেল : ইংরেজি]
রানিংটাইম । ১৩৩-১৯৩ মিনিট
দেশ । যুক্তরাষ্ট্র
রিলিজ । ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫


সালটা ১৯১৫। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শৈশবকালের হলিউড আমেরিকার সমাজ এক শ্রেণির মানুষের উগ্র জাতীয়তাবোধ আর শ্বেতাঙ্গ-অহংবোধের দোষে কিছুটা হলেও দুষ্ট ছিল। তার প্রতিফলন ডি. ডব্লিঊ. গ্রিফিথের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন। নির্বাকযুগে চলচ্চিত্রগুলোর বিষয় ছিল মূলতঃ ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, অভিযান আর কমেডি। এদিক থেকে দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন অনেকটাই এগিয়ে; কারণ এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক মতাদর্শ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের [১৮৬১-৬৫] স্মৃতি তখনো তাজা। এক শ্রেণির মানুষ তখনো সমাজে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থান মেনে নিতে পারেনি। এদের মদ্যে সবচেয়ে উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ছিল কেকেকে [ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান]। দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন ছবিটি গৃহযুদ্ধের পর কেকেকে’কে পুনঃর্জীবন দান করেছে; পেয়েছে বাণিজ্যিক সাফল্যও।

দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন
দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন

এই ছবিটির মূলতঃ থমাস ডিক্সনের দ্য ক্ল্যান্সম্যান উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন। সে ময়ের হিসেবে ৩ ঘন্টা ১৩ মিনিটের এ ছবির বাজেট ছিল ১ লক্ষ ডলারের উপর। আজকের দিনের হিসেবে এটি দুঃসাহসী এর ব্যাপ্তি ও বাজেটের জন্য। প্রযোজক ও পরিচালক ডি. ডব্লিঊ. গ্রিফিথ ছিলেন আমেরিকার গৃহযুদ্ধে দাসপ্রথার পক্ষে যুদ্ধ করা রক্ষণশীল কনফেডারেট এক কর্নেলের ছেলে। নিঃসন্দেহে পরিবার থেকেই কৃষ্ণাঙ্গদের নির্বোধ আর সহিংস হিসেবে দেখার শিক্ষা পেয়েছিলেন গ্রিফিথ। ছবিটির গল্প মূলতঃ ক্যামেরন আর স্টোনসম্যান নামের দুটি শেতাঙ্গ পরিবারের গৃহযুদ্ধের আগেকার আর পরের সময় ও অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে। শুরুতেই দেখা যায়, দক্ষিণ ক্যারোলিনার পিডমন্টে ক্যামেরনদের তুলা চাষের শ্রমিক কৃষ্ণাঙ্গরা কাজের মাধামে ক্যামেরনদের উচ্চবিত্তসুলভ জীবনের অর্থের যোগান দিচ্ছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নাচ-গানে নিজেদের দাসত্বের পরিচয় ভুলে তারা করছে শান্ত জীবনযাপন।

এক সময় ক্যামেরন পরিবারের মেয়ে মার্গারেটের প্রেমে পড়ে যায় স্টোনসম্যান পরিবারের বড় ছেলে। আবার শুধু ছবি দেখেই স্টোনসম্যান পরিবারের মেয়ে এলসির প্রেমে পড়ে যায় ক্যামেরন পরিবারের ছোট ছেলে বেন। এরপর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দুই পরিবারের ছেলেরা যুদ্ধে চলে যায়। এরই মাঝে ক্যামেরনদের পিডমন্ট শহরে হামলা চালায় একদল কৃষ্ণাঙ্গের ইউনিয়ন আর্মির একটি রেজিমেন্ট– যাদের হারিয়ে শ্বেতাঙ্গদের রক্ষা করে কনফেডারেটরা। যুদ্ধের দুই পরিবাবেররই ছেলেরাই হতাহত হয়। যুদ্ধের শেষদিকে পিডমন্টে কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষমতা বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদের হাতে শ্বেতাঙ্গরা নিগৃহীত হতে থাকে। ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে কৃষ্ণাঙ্গরা কাজ করার বদলে আমোদ ফুর্তিতে মেতে ওঠে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেড়ে গেলে তারা আলাদা অধিবেশন করে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সব নিগ্রো অফিসারকে শ্বেতাঙ্গরা স্যালুট করবে। দেওয়া হয় দুই বর্ণের মধ্যে বিয়ের বৈধতাও।

দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন
দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন

এক সময় ক্যামেরনদের ছোট মেয়েকে এক লম্পট কৃষ্ণাঙ্গ ধর্ষণের চেষ্টা করলে সে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনায় কাহিনিটি নাটকীয় মোড় নেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় শ্বেতাঙ্গ এলসি স্টোনস্ম্যানকে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ সাইলাস লিঞ্চের বিয়ে করার প্রচেষ্টা। কৃষ্ণাঙ্গদের এমন বাড়াবাড়ি সহ্য করতে না পেরে একদল তরুণ শ্বেতাঙ্গ সাদা আলখেল্লা আর ত্রিকোণা মুখোশের প্রতীকী পোশাকে গঠন করে কেকেকে। তাদের হাতেই রক্ষা পায় শ্বেতাঙ্গ নারীর সম্মান, আর প্রতিষ্ঠিত হয় শ্বেত-শ্রেষ্ঠত্ব। নির্বাচনের সময় কেকেকে’র সৈন্যসামন্ত দেখে কৃষ্ণাঙ্গদের পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। এভাবেই জন্ম হয় একটি নতুন দেশের– যেখানে জাতিগতভাবে শ্বেতাঙ্গরা ধারণ করে উচ্চতর মর্যাদা। এরইসাথে ক্যামেরন আর স্টোনসম্যান পরিবারের দুই জোড়া বিয়ে ইঙ্গিত দেয় যুদ্ধশেষে শান্তির প্রতিষ্ঠার।


একটি
চরিত্রেও
কৃষ্ণাঙ্গদের
প্রতি মানবিকতা
উঠে আসেনি; অন্যদিকে,
প্রায় সব কৃষ্ণাঙ্গের চরিত্রেই
কালি মেখে অভিনয়
করেছেন স্বয়ং
শেতাঙ্গরা

আজকের দিনে হাস্যকর শোনালেও এই ছবির ব্যাপক সাড়া সমাজে কেকেকে’র গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে ছবিটির শেষদৃশ্যের অসাধারণ এডিটিং আর ইফেক্টের মধ্য দিয়ে কেকেকে’র সৈন্যদের বীরত্ব যেন দর্শকদেরকেও উজ্জীবিত করে, এবং তাদের কাছে যেন মনে হয় কৃষ্ণাঙ্গমাত্রই নিতান্ত প্রভুভক্ত দাস অথবা পাশবিক লম্পট এক জনগোষ্ঠী–সেই অপপ্রয়াস গ্রিফিথ সফলভাবেই করেছেন। ছবিটির একটি চরিত্রেও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি মানবিকতা উঠে আসেনি; অন্যদিকে, প্রায় সব কৃষ্ণাঙ্গের চরিত্রেই কালি মেখে অভিনয় করেছেন স্বয়ং শেতাঙ্গরা । ছবিটির প্রিমিয়ার শোর সঙ্গে সঙ্গেই হোয়াইট হাউসে প্রথমবারের মতো কোনো ছবির স্ক্রিনিং নিয়ে তখনকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এ যেন আলোয় লেখা ইতিহাস, আর আমার একটাই আক্ষেপ যে– এর সবটাই সত্য’।

দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন
দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন

গ্রিফিথ দাবি করতেন, এটি তার মাস্টারপিস সিনেমা, আর তার আসল উদ্দেশ্য ছিল নিজ চোখে দেখা আমেরিকান গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতার দৃশ্যায়ন করা; তবে কৃষ্ণাঙ্গদের হেয় করার কোনো চেষ্টাই না কি এখানে তিনি করেননি! ছবিটির অফিশিয়াল রেকর্ড থেকে জানা যায়, কেকেকে’র মিছিলের দৃশ্যে ১৮ হাজার মানুষ আর ৩ হাজার ঘোড়া অংশ নিয়েছিল। কেকেকে’র ইউনিফর্ম বানাতে লেগেছিল ২৫ হাজার গজ সাদা কাপড়, এবং সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ফুট ফিল্মের রিল খরচ হয়েছিল এই সিনেমায়– এডিটিংয়ের পর মূল দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১২ হাজার ফুট।

বিংশ শতকের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ তখনো তেমন পোক্ত হয়ে ওঠেনি। সেই সময়েই দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন ছবিটিতে ক্লোজআপ, ক্রস-কাটিং, র‍্যাপিড ফায়ার এডিটিং, ক্যামেরার আইরিশ আর বিভক্ত পর্দার মতো অভিনব সব কলাকৌশলের দেখা মেলে। ছিল আলোর অসাধারণ ব্যবহার দিয়ে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে দর্শকের আবেগকে প্রভাবিত করার সফল চেষ্টা। বিভিন্ন দেশের সে-সময়ের চলচ্চিত্রে এই কৌশলগুলোর কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত ব্যবহার থাকলেও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনের জন্য আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘১০০ বছরের ১০০ চলচ্চিত্র’র তালিকায় ৪৪ নম্বর অবস্থান ধরে রেখেছে বর্ণবাদসহ নানা বিতর্কের জন্ম দেওয়া দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন

দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন
দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন

জনৈক চলচ্চিত্র বিশ্লেষক বলেছিলেন, দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন-এর সবচেয়ে খারাপ দিক এর অসাধারণ নির্মাণকৌলন এবং সহিংসতার মোড়কে বর্ণবাদের বিষাক্ত উপস্থাপন। গ্রিফিথের এই ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে স্টেরিওটাইপ বা টাইপকাস্ট ধারণার সূচনা হয়; বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গরা পরের ৬০-৭০ বছরের চলচ্চিত্রে প্রতীয়মান হয়েছে হয় প্রভুভক্ত দাস নয়তো পিয়ানোবাদক বা জোকার  অথবা ধর্ষকামী হিসেবে। তবে ১০৮ বছর পরে সম্ভবত এ বছরই কৃষ্ণাঙ্গরা সবচেয়ে শৈল্পিক প্রতিশোধ নিতে পেরেছে ২০১৯ সালের অস্কারে : সেরা চলচ্চিত্র হয়েছে গ্রিন বুক, আর সেরা স্ক্রিনপ্লে ব্ল্যাক ক্ল্যান্সম্যান। দুটি ছবিই গ্রিফিথের রাজনৈতিক দর্শনের মূলে কুঠারাঘাত করেছে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্পের আমেরিকাতে কেকেকে আবারও সংঘবদ্ধ হচ্ছে। অস্কারের পুরস্কার নিতে গিয়ে ব্ল্যাক ক্ল্যান্সম্যান পরিচালক স্পাইক লি উগ্র শ্বেতাঙ্গ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হবার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে বলা যেতে পারে, পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি সিনেমা বানিয়েও, বর্ণবাদের দোষে দুষ্ট গ্রিফিথকে শতবর্ষ পরও দাঁড়াতে হয়েছে প্রজন্মের কাঠগড়ায়; ভবিষ্যতেও দাঁড়াতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কি-বোর্ডিস্ট; বেজিস্ট; ড্রামার; ব্যাংকার; সিনে-প্রেমী । ঢাকা, বাংলাদেশ

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন