বেলায়াত হোসেন মামুনের কাছে খোলা চিঠি

0
530
সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

লিখেছেন । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী


Art is difficult, hence ‘fashion’ : শিল্প ও শিল্পচর্চা কঠিন, তাই সহজতম পথ হ’ল ‘ফ্যাশন’! আর ফ্যাশনের আরাম কেদারার বাহন হ’ল : উন্নাসিকতা, যা শিল্পবোধের অভাবকে আড়াল করে, superfluous মানসিকতার supercilious তৈরি করে– এটি চিরন্তন সত্য!! চলচ্চিত্র সংসদের মাধ্যমে [আন্দোলন শব্দটি এখন ব্যবহার করললাম না] বিশ্বচলচ্চিত্র ভাণ্ডার বা চলচ্চিত্র ভাষায় রচিত ভিন্নমাত্রার কন্টেন্ট, ভিন্নমাত্রার অনুভূতির জগতকে পিপাসু দর্শকের চোখের পর্দায় প্রক্ষেপন করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য! ভিসুয়াল ভাষা গোষ্ঠীনির্ভর নয়, ‘ইউনিভার্সাল’, তাই ইউনিভার্সাল ‘ভ্রাতৃত্বের’ বন্ধন রচনায় এর চেয়ে শক্তিশালী কিছুই নাই! অবশ্য আজকের ডিজিটাল হাইটেক মুঠো ডিভাইস বা সমশক্তির সহজলভ্য অন্য ডিভাইসের যুগে “সোসাইটি” করে চলচ্চিত্রচর্চা করার কতটুকু অবকাশ আছে তা ভেবে দেখবার বিষয়! ভিন্ন ইসু!

ঘুড্ডি
ঘুড্ডি
ফিল্মমেকার । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

বেলায়াত ভালো লেখে, ভালো লিখেছে এবং অনেক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছে, এক কথায় he is professionally curious–  যা অত্যন্ত  স্বাভাবিক। সে কমিটেড ভিজুয়াল ইমেজিং-এর সহযোদ্ধা।  ফ্যাশন নয়, প্যাশন থেকে তার কর্ম আর এই প্যাশন ভাবাবেগ থেকে নয়।  নিশ্চিত জানি!

আমি শুধু আজ একটি প্রসঙ্গে আলোকপাত করব। ফেডারেশন দু নামে ভাগ হওয়া। কেন? দিবসের শেষ সূর্যের শেষ সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে রবি ঠাকুর  গেয়েছিলেন শেষ প্রশ্ন, তবুও “মেলেনি উত্তর”; আমিও দেশে ফিরে এসে পাইনি উত্তর! শ্রদ্ধেয় মাহবুব জামিল আছেন, তাঁর অভিমত জানতে চাইতে অসুবিধা নেই!!

 ঘুড্ডি
ঘুড্ডি
ফিল্মমেকার । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

বাঙালির তিনটি হাত [মা দূর্গার অবশ্য দশটি বাহু] ১. ডান হাত, ২. বাম হাত, ৩. অজুহাত। তিন নম্বর হাতটি সবচেয়ে শক্তিশালী! সুতরাং হাতটি তো খুঁজে পাওয়া যাবে, প্রশ্ন করলেই!


আমরা
ধারণ করি
সেইসব ছবির
অনুভূতি যা মনের
পর্দায় “শো” শেষে
সমুদ্র-শংখের
বুকের ভিতর
বেজে
চলা
অনন্ত
সংগীতের
মতো বেজে চলে

সহজ, সরল শৈল্পিক চেতনা থেকে সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমে সোসাইটির ছাতার নিচে নীরব আঁধারে নিরেট রূপালী পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠা জীবনেরই বহুমাত্রায় আঁকা ‘ইমেজ” যখন বাঙময় হয়ে ওঠে আর সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেমে [কনভেনশনাল ৩৫ মিমি] ‘সত্য’ বলে আর তৈরি করে “images sufficiently powerful to deny our nothingness”, তখনি আমরা আমাদের অসহায়ত্ব থেকে ‘মুক্তি’ পাই, ক্ষণিকের জন্য হলেও! এইতো উদ্দেশ্য! আঁতেল, উন্নাসিক ফ্যাশনেবল শিকড় ছাড়া এলিট তৈরি করে উদ্ভট “সোসাইটি” গড়ে তোলা নয়, নীল ছবি দেখা নয়, নিশ্চিত আমরা! আমরা ধারণ করি সেইসব ছবির অনুভূতি যা মনের পর্দায় “শো” শেষে সমুদ্র-শংখের বুকের ভিতর বেজে চলা অনন্ত সংগীতের মতো বেজে চলে, নয় কি? পথের পাঁচালি বেজেই চলেছে! কিংবা জীবন থেকে নেয়া, বা আক্রোশ!! বাইসাইকেল থিভস? লাস্ট ইয়ার ইন মারিয়েনবাদ, মেঘে ঢাকা তারা… বেঁচে থাকার আর্তনাদ!! গেরিলার গ্রেনেড, হাতের মুঠোয় চড়ুই পাখির মতো, হুংকারে ফেটে পরবে ‘মুক্তি’র আনন্দে…।

মেঘে ঢাকা তারা
কোমল গান্ধার
ফিল্মমেকার । ঋত্বিক ঘটক

আমরা স্কুলজীবনে দল বেঁধে চকবাজারের একটি হলে ছবি দেখতে যেতাম, “হট’ ছবি যেমন নীলো’র খাইবার মেল, মহম্মদ আলীর ‘নাচে নাগিন বাজে বীণ’! আমাদের এক সহপাঠির নাম ছিল মহম্মদ আলী ওরফে ‘বাইট্টা’ আলী! ছবি দেখে ফেরার সময় সে হয়ে যেত লম্বু মহম্মদ আলী, সামনে হাঁটতো আর উচ্চস্বরে সংলাপ বলত, বেসুরে গান গাইতো ভুল উর্দু ভাষায়। আমরা হৈচৈ করে মজা করতাম! একটু দূরের একটা হলে চলছে মেঘে ঢাকা তারা [ঋত্বিক কে– তখনো জানি না]। দল বেঁধে সেই হলে সবাই। ছবি শেষ, ফিরছি হেঁটে, সবাই চুপ ।মনের ভিতর ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে’, haunting চাবুকের শব্দ, সুপ্রিয়ার বাঁচতে চাওয়ার আর্তনাদ…।

মহম্মদ আলী কোথায়? কোথায়? সামনে নয়, একদম পিছনে, নিরব, নিশ্চুপ, নির্বাক! বাইট্টা মহম্মদ আলীর চোখ দুটো ছলছল করছিল কি?

সংসদের উদ্দেশ্য তো তাই! কিন্তু বাস্তবে কি ঘটছিল?

দ্য ডেইজ অফ ম্যাথুজ ওরফে ম্যাথু’স ডেজ
ফিল্মমেকার । ভিতলদ লেসজিন্সকি

‘ভাত দে হারাজাদা’র কবি রফিক আজাদ চলচ্চিত্রকে তৃতীয় শ্রেণীর বা খুব নিম্নমানের মাধ্যম মনে করতেন, ছবি দেখতেন না! আমি তক্কে তক্কে ছিলাম, তাঁকে ধরব, ছবি দেখাতে নিয়ে যাব আমাদের সিনে আর্ট সার্কেলে! শরিফ মিয়ার ক্যন্টিনের আড্ডা থেকে জোর করেই ধরে নিয়ে গেলাম দ্য ডেইজ অফ ম্যাথুজ— সাদাকালো ছবি দেখাতে! অনিচ্ছাসত্বেও গেলেন। ছবি শেষ! রফিক ভাইয়ের শুরু? চুপ করে সাদা নিরেট পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন, তিনি তখনো দু’মাত্রার ক্যানভাসের পর্দায় অসীম মাত্রার জগত দেখছেন! এরপর রফিক ভাই আমদের রেগুলার সদস্য হয়েছিলেন, আজীবন! বলতেন, কবিতা আর একটি ভালো ছবি সমার্থক, synonym । তাঁর এই উপলব্ধির জানালা খুলে দিয়েছিল ফিল্ম সোসাইটি এবং একটি মননশীল ছবি! সংসদের মূল উদ্দেশ্য ছিল initiate করা, যা যেকোনো শিল্প মাধ্যমের জন্য প্রয়োজন, নবাগত চলচ্চিত্রের জন্য তো বটেই! সংবেদনশীল কবির মন তো আরো গভীরে যেতে পারে, নয় কি? আমাদের সার্থকতা সেইখানে। আর ব্যার্থতা? আছে! একটি হলো উন্নাসিকতা, ভূয়া নাক! এই উন্নাসিকতা segregation-এর ভয়ানক বীজ বপন করতে সহায়তা করেছিল, তা racist মনোভাবের চেয়ে কম কি? একদল আয়োজক বুঝিয়ে সদস্য করতেন, “আপনি সদস্য হলে ‘এলিট’ দর্শক হবেন, কিছু ক্ষেত্রে ‘জাতে’ উঠবেন [স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘জাতে” ওঠার ব্যপারটি প্রবল ছিল; এখন কম, কারণ দুর্নীতি করেই-তো সহজেই পাতের উচ্চতায় ওঠা যায়, “সংস্কৃতি”র প্রয়োজন কি? টাকা আছে, টাকা কথা বলে; জাতে ওঠায়, অঢেল ব্যাংক আছে!! এমন কি বাংলাদেশ ব্যাংকও!]


ফিল্ম
সোসাইটির
মূল উদ্দেশ্য গণহারে
চলচ্চিত্র নির্মাতা তৈরি করা নয়

আরেকটি কথা, ফিল্ম সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য গণহারে চলচ্চিত্র নির্মাতা তৈরি করা নয়, সহজেই আনুমেয়! হ্যাঁ তবে চোখ খুলে দিতে পারে, যার ভিতর সৃষ্টির উন্মাদনা আছে, সে ক্যামেরার চোখ বেছে নেবে, ঝাঁপিয়ে পড়বে যুদ্ধে, চিত্র-শব্দ-সংগীতে সৃষ্ট হবে আসীম মাত্রার ভূবন! আমাদের সংসদ-ইতিহাসে তাই হয়েছে, আলমগীর কবির, বাদল রহমান, শাকের-নিয়ামত আলী, আনোয়ার-টুটুল-স্বপন-জাঁনেসার-মতিন রহমান, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ এবং আরো অনেককে নির্মাণের পথ দেখিয়েছে– যা পজিটিভ, ক্ষেত্র তৈরি করেছে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার, তৈরি করেছে একজন অনুপম হায়াৎ, একজন জাকির হোসেন রাজুর, একজন ফাহমিদুল হকের, তৈরি করেছে সংগঠক, একজন বেলায়াত হোসেন মামুন! সংখ্যায় কম হলেও শক্তিতে কম নয়!

ফিল্ম সোসাইটি “আন্দোলনের” [এখানে আমি আন্দোলন শব্দটি ব্যবহার করছি, সঙ্গত কারণেই] সরাসরি সু-ফসল হলো ফিল্ম-আর্কাইভ এবং আর্কাইভকে কেন্দ্র করে ফিল্ম ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমিতেও স্থান পেয়েছে চলচ্চিত্র! ম্যুভিয়ানার প্রয়াস তার-ই ফসল! আমি হাল্কা ঠাট্টা করে প্রায়শঃই বলি আর গাই, ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে…’; কিন্তু না, প্রেম বহুবার এসেছে সরবে, কিন্তু হায়! চলচ্চিত্র প্রথম প্রেম বলে সব ছুটে গেছে! হায়? না! আফসোস নেই, হলফ করে বলতে পারি!

মুক্তির গান
ফিল্মমেকার : তারেক মাসুদ, ক্যাথরিন মাসুদ

চলচ্চিত্র-ভাষা টেকনলজি নির্ভর, আর এই টেকনলজি দ্রুত ধাবমান রকেটের মতো [সায়েন্টিফিক কারণে এবং ব্যবসার কারণে], তাই ট্র্যাক রাখা কঠিন! তাই পদ্ধতিগত শিক্ষা, ট্রেইনিং-এর প্রয়োজন, স্রোতের ধারা সম্যক উপলব্ধি করতে না পারলে অন্ধের মতো ‘লগ্নি’ ঠেলে এগুনো প্রায় অসম্ভব! আমাদের দেশে দেরিতে হলেও আর্কাইভকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রশিক্ষণ কোর্স জন্ম দিয়েছে মুক্তচিন্তার চলচ্চিত্রধারার, তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতার, আগামীর মোরশেদ, হুলিয়ার তানভীর, মুক্তির গান-এর তারেক মাসুদ পথিকৃৎ! নেগেটিভ চিত্রও তৈরি হয়েছিল, ঐ যে প্রথমেই বলেছি, ঝোলা কাঁধে তথাকথিত আঁতেল মুখে খিস্তি-খেউড়, মুখে চলচ্চিত্র পরিচালকের নাম, অনেক সময় ছবি না দেখেই মন্তব্য, কেতাবি তোতাপাখির মতো বুলি! Intellectual? সবকিছু বুঝে ফেলার স্বঘোষিত “বর্গা” অমুক কি বুঝে, তমুক কি জানে, উনি ক’টা ছবি দেখেছেন? তৈরি হয়েছে distancing, দূরত্ব, বিভ্রান্তি। ফল : দলাদলি, নেতৃত্বের বাসনায় বিভাজন, দুটি হাস্যকর ফেডারেশন! সেই সুযোগে সামরিক জান্তার “কালাকানুন”! আমি ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগী, সে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য কথা! আমরা অনেকেই প্রতিবাদে কালাকানুন না মেনে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিলাম! আর কিছু ফ্যাশন র‌্যাম্প হাঁটুরেরা চালু রেখেছিল উন্মুক্ত নাভির র‌্যাম্প ওয়াক!! সামরিক ছাউনি কালচারে যা স্বাভাবিক!কিন্তু আমাদের স্পৃহা কমেনি, চেতনা অবদমিত হয়নি! জনগণের সরকার আসার পর সোসাইটির সদস্যদের চাপেই কালাকানুন রোধ হয়েছিল! ‘আঁতেল’ কতিপয়কে তখন সম্মুখে দেখিনি! আঁতেল-ভিজানো কাঠে আগুণ ধরে না, ধোঁয়া তৈরি হয়! ধুম্রজাল নেগেটিভ!

মুহম্মদ খসরু
ফটোগ্রাফার । কামরুল মিথুন

বেলায়াত, তুমি খসরুর কথা লিখেছ, মহান সে, দীর্ঘ চুল-দাড়ির ফাঁকে তার মুখায়বব বিছানায় শুয়ে মনে পড়ছে, অসুস্থ আমি দেখতে যেতে পারিনি, আমিও অসুস্থ! আমাদের স্থান পরলোকে তথাকথিত মোল্লাদের ভাষায় “নরকে”, দেখা হবে খসরুর সাথে! সে গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলবে সত্যজিতের সঙ্গে, ঋত্বিকের সঙ্গে, জহির রায়হানের সঙ্গে, ফেলিনি, ত্রুফো, ওজু, শ্যাব্রল, গদারের সাথে, মন্দ কি? বেলায়াত, লিখতে থাক, তোমাদের প্রয়োজন অনাগত কালের জন্য!

ইতি,
জাকী
১৫ মার্চ ২০১৯


পুনশ্চ :
অনুজ স্নেহভাজন বেলায়াত হোসেন মামুনের লেখা মুহম্মদ খসরু : যিনি সময়ের চিহ্ন হয়ে ওঠেন প্রবন্ধটি পড়ে বেলায়াতকে আমার খোলা চিঠি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
প্রখ্যাত ফিল্মমেকার; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ ।। জন্ম : ২৬ আগস্ট ১৯৪৬ ।। ফিচার ফিল্ম : ঘুড্ডি ; লাল বেনারসী; আয়না বিবির পালা ।। শর্টফিল্ম : দেয়াল, তামাশা, গল্পদাদুর গল্পকথা, অংকুর ইত্যাদি ।। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন [১৯৯৬-২০০১] ।। অপারেশন ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন [১৯৮১-১৯৯৪] ।। শিক্ষার্থী, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া [(পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট); ১৯৭২-১৯৭৭]

মন্তব্য লিখুন