কুস্তুরিৎসার ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ : হারিয়ে যাওয়া দেশের জন্য হাহাকার

0
397
emir kusturica

আন্ডারগ্রাউন্ড
Podzemlje
ফিল্মমেকার । এমির কুস্তুরিৎসা
মূল গল্প । দুসান কোভাচেভিচ
স্ক্রিনপ্লে । দুসান কোভাচেভিচ; এমির কুস্তুরিৎসা
সিনেমাটোগ্রাফার । ভিলকো ফিলাক
মিউজিক । গোরান ব্রেগোভিচ
অভিনয় [চরিত্র] । মিকি মানোইলোভিচ [মার্কো ড্রেন]; লাজার রিস্তোভস্কি [পিটার ব্ল্যাকি পপোরা]; মিরজানা জকোভিচ [নাতালিয়া জভকভ]; স্লাভকো স্তিমাক [ইভান ড্রেন]
রানিংটাইম । ১৭০ মিনিট
ভাষা । সার্বিয়ান
দেশ । বুলগেরিয়া; চেক রিপাবলিক; ফ্রান্স; জার্মানি; হাঙ্গেরি; যুগোস্লাভিয়া [সার্বিয়া]
মুক্তি । ১ এপ্রিল ১৯৯৫
অ্যাওয়ার্ড । পাম দি'অর [কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফ্রান্স]

লিখেছেন তানভীর পিয়াল


আন্ডারগ্রাউন্ড

য়ান্স আপোন অ্যা টাইম দেয়ার ওয়াজ অ্যা কান্ট্রি

রূপকথার গল্পগুলো যেখান থেকে শুরু হয়, ঠিক সেখানটাতে এসেই শেষ হলো সিনেমাটি। তাহলে, যেখানে এসে থামে বাস্তবতা, সেখান থেকেই রূপকথার শুরু? আন্ডারগ্রাউন্ড কি তবে রূপকথার সূচনা? নাকি বাস্তবতার উপসংহার? কিংবা কঠিন বাস্তব এক রূপকথা?

১৯৯৫ সাল, কান ফেস্টিভালের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ পদক পাম দি’অর দখল করে নিলো সদ্য ভূমিষ্ট দেশ সার্বিয়ার চল্লিশ বছর বয়সী এক শিশু, এমির কুস্তুরিৎসা। সিনেমার নাম আন্ডারগ্রাউন্ড। যদিও কুস্তুরিৎসার জন্য এ পদক নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে যুগোস্লাভিয়ার এমির কুস্তুরিৎসা তার হোয়েন ফাদার ওয়াজ অ্যাওয়ে অন বিজনেস [Otac na službenom putu] সিনেমার জন্য কান-সেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য একদিক থেকে এই আন্ডারগ্রাউন্ড ও ৯৫-এর পাম দি’অর তার জন্য নতুনই। কেননা, নতুন দেশ, নতুন জাতীয়তা, সর্বোপরি কুস্তুরিৎসার নতুন পরিচয়ের নতুন পদক এই পাম দি’অর। যদিও এই নতুন পরিচয়ে পরিচিত হতে কখনোই চাননি কুস্তুরিৎসা। চেয়েছিলেন যুগোস্লাভিয়ার এমির হয়েই থাকতে। কিন্তু, যুগোস্লাভিয়াই তো নেই হয়ে গেল, সেখানে ছ’ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার ক্ষুদ্র একজন যুগোস্লাভের এই চাওয়া তো নস্যি!

আন্ডারগ্রাউন্ড এমিরের যুগোস্লাভ থেকে সার্বিয়ান হয়ে যাওয়ারই গল্প। আন্ডারগ্রাউন্ড বিশ শতকে বিশ্ব মানচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ যুগোস্লাভিয়ার মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাওয়ার গল্প। আন্ডারগ্রাউন্ড বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, গুরুত্বপূর্ণ সময়ের গল্প। এই গল্প বন্ধুত্বের। মার্কো আর ব্ল্যাকি নামের দুই কমিউনিস্ট হুলিগান হল্লাবাজ বন্ধুর গল্প। এই গল্প প্রেমের। থিয়েটার অভিনেত্রী নাতালিয়ার প্রেমে মার্কো আর ব্ল্যাকির হাবুডুবু খাওয়ার গল্প। দুই ভাই মার্কো আর ইভানের গল্প। আন্ডারগ্রাউন্ড পিতা-পুত্রের গল্প। যুদ্ধের এবং যুদ্ধ-বিরোধিতার গল্প। রক্ষকের ভক্ষক হয়ে ওঠার গল্প। আন্ডারগ্রাউন্ড বন্ধুর সাথে বন্ধুর, প্রেমিকের সাথে প্রেমিকার, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, স্ত্রীর সাথে স্বামীর, নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। তারচেয়েও বড় কথা, এই গল্প দেশপ্রেমের। হারিয়ে যাওয়া দেশের জন্য হাহাকার এই আন্ডারগ্রাউন্ড

আন্ডারগ্রাউন্ড আসলে শুধুমাত্র গল্প নয়। এই গল্প ইতিহাস থেকে উঠে আসা। কিংবা এটা ইতিহাসের গল্প। অথবা ইতিহাসই। কেননা, যুগোস্লাভিয়ার আদ্যোপান্ত ইতিহাসকে চূড়ান্ত স্যাটায়ার ও মেটাফোরের মধ্য দিয়ে তুলে আনা হয়েছে এই সিনেমায়। প্রেসিডেন্ট টিটো কখনো কখনো হয়ে যায় এই সিনেমারই একজন চরিত্র। মার্কো তার সঙ্গে মোলাকাত করে, বউকে নিয়ে নাচতে নাচতে ধাক্কা খায় একই ফ্লোরে নাচতে থাকা টিটোর সঙ্গে। জনগণের উদ্দেশে হাত নাড়তে থাকা টিটোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মার্কো। নকল টিটো নয়, একেবারে সত্যিকারের, বাস্তব টিটো।

এমনকি মার্কো-ব্ল্যাকিও নয় পুরোপুরি কাল্পনিক চরিত্র। টিটোর দুই সহযোগী মিলান রাঙ্কোভিচ [Milan Rankovic] এব স্রেতেন জুয়োভিকই [Sreten Zujovic] মার্কো এবং ব্ল্যাকি, তাদের ডাকনামও তা-ই। মিলান রাঙ্কোভিচের মতোই মার্কো একজন ম্যানিপুলেটর। আর স্রেতেন জুয়োভিকের মতোই গৃহযুদ্ধে টিটোপন্থী কমান্ডোদের নেতা হয়ে উঠলো কমরেড ব্ল্যাকি। আপনি দেখবেন, ঐতিহাসিক নিউজ ফুটেজের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড-এর চরিত্রেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বোমায় বিধ্বস্ত নগরীর মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছে ব্ল্যাকি। যুদ্ধ শেষে সেনাবাহিনীর বিজয় র‌্যালির পাশেই নেচে বেড়াচ্ছে নাতালিয়া। এসবের কোনো দৃশ্যই সিনেমার জন্য নতুন করে শ্যুট করা দৃশ্য নয়। একেবারে ঐতিহাসিক ফুটেজগুলোর ওপর এভাবেই নাশকতা চালিয়েছেন কুস্তুরিৎসা। ইতিহাসের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে সিনেমা আন্ডারগ্রাউন্ড। আসলে ঢুকে যাচ্ছে না, ইতিহাসকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ইতিহাস-নির্ভর নয়, বরং ইতিহাসের সিনেমা এই আন্ডারগ্রাউন্ড

আন্ডারগ্রাউন্ড

হোয়েন ইট’স নট দ্য জার্মান’স, অ্যালিয়েস বোম্বস আস

১৯৪১ সালের ৬ এপ্রিল মধ্যরাতে সরকারি অস্ত্রবোঝাই ট্রেন লুট করবার পর অগণিত টাকা ওড়াতে ওড়াতে আর জিপসি মিউজিক সঙ্গে নিয়ে শহরে ঢোকে লুটেরাদের নেতা কমরেড মার্কো আর ব্ল্যাকি। সকালে জার্মান বোমা এসে পড়ে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রাদে। দেশটির অন্য দুই শহর মারিবোর [স্লোভেনিয়ার শহর] ও জাগরেব-এ [ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী] গুলি-ট্যাংক নিয়ে প্রবেশ করতে থাকে জার্মান বাহিনী। এবং সাধারণ নাগরিকরা স্বস্তিকা চিহ্নিত পতাকা নিয়ে তাদেরকে স্বাগতও জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুগোস্লাভিয়া। আন্ডারগ্রাউন্ডে [গোপনে] চলছে টিটোর নেতৃত্বে মার্কো-ব্ল্যাকির, অর্থাৎ কমিউনিস্টদের জার্মান ও সরকারবিরোধী কার্যক্রম। এবং ততক্ষণে আপনিও ঢুকে পড়েছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে।

জার্মান বোমায় শহরের অন্যান্য স্থাপনার মতোই গুঁড়িয়ে যায় একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন চিড়িয়াখানা। যা ছিলো মার্কোর ভাই ইভানের। চিড়িয়াখানা ভেঙে যাওয়ায় রাস্তায় নেমে আসে বন্য পশুরা। এইখানে এসে আপনি দেখবেন– মানুষের পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে সিংহ, হাতি, জেব্রা। এই দৃশ্য আর কিছু নয়, যুদ্ধে অরাজকতার প্রতীক, জীবনের বিপন্নতার প্রতীক। যে যুদ্ধ মানুষের হিংস্রতা, নৃশংসতা, কু-প্রবৃত্তির প্রকাশ, তারও প্রতীক।

ততদিনে, রাস্তাঘাটে জার্মান সৈন্যরা যাকে-তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, যাকে যখন খুশি মেরে ফেলছে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্বিদিক ছুটছে। অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছে মাটির নিচের বাঙ্কারে। ওদিকে, মার্কো-ব্ল্যাকির লুট করে আনা অস্ত্র তাদেরই অন্য কমরেডরা তুলে দিচ্ছে জার্মানদের হাতে। জার্মানদের কাছে কেউ কেউ বলে দিচ্ছে অন্য কমরেডদের নাম। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কে যে কখন বিশ্বাসঘাতকতা করে বসবে, কেউ জানে না।

আন্ডারগ্রাউন্ড

১৯৪১-এ বেলগ্রাদে নাশকতা চালানো জার্মান বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল ফ্রাঞ্জ বোহমে। এই ফ্রাঞ্জও আন্ডারগ্রাউন্ড-এর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মার্কো-ব্ল্যাকির মতো সিনেমার নায়িকা হতে চাওয়া থিয়েটার অভিনেত্রী নাতালিয়ার প্রেমে পড়ে যায় সেও। ব্ল্যাকির প্রেমিকা নাতালিয়াও ঘুরে-বেড়াতে থাকে তার গাড়িতে। নাতালিয়ার নাটকের শো-তে সামনের সারির দর্শক ফ্রাঞ্জ। এ রকমই এক শো-তে হামলা চালালো মার্কো আর ব্ল্যাকি। নাটকের মাঝখানে স্টেজে উঠে গিয়ে অভিনয় করতে করতে ব্ল্যাকি গুলি চালিয়ে দেয় ফ্রাঞ্জের বুকে। অবশ্য ফ্রাঞ্জ ব্ল্যাকির গুলিতে মরে নাই, বুকে লোহার পাত নিয়ে ঘুরতে থাকা ফ্রাঞ্জের মৃত্যু হয় জার্মান বাহিনীর হাসপাতালে মার্কোর স্টেথোস্কোপে।

ব্ল্যাকির হাত থেকে ‘উদ্ধার’ করে নাতালিয়া ও তার ভাইকে ওই হাসপাতালে নিয়ে তুলেছিলো ফ্রাঞ্জ। আলগা দাঁড়ি-টুপি লাগিয়ে মুসলমান সেজে সেখানেই ঢুকে যায় মার্কো। টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করে ব্ল্যাকিকে। কিন্তু স্যুটকেসের ভেতরে করে টর্চার সেল থেকে বাইরে বের করে আনার সময় নিজের হাতে থাকা গ্রেনেডের বিস্ফোরণে নিজেই আহত হয়ে যায় ব্ল্যাকি। চিকিৎসার জন্য ব্ল্যাকিকে নিয়ে গিয়ে তোলা হয় মাটির নিচের এক বাঙ্কারে, যেখানে ৬ এপ্রিলের রাত থেকেই আত্মগোপন করে ছিলো আরো অনেকেই। সেখানেই প্রথমবারের মতন দেখা হয় পিতা ও পুত্রের। ব্ল্যাকির সঙ্গে তার শিশু সন্তান যোভানের। যে সন্তানের জন্ম ১৯৪১ সালের ঐতিহাসিক ৬ এপ্রিল, এই বাঙ্কারেরই ভেতর এবং যে কখনো বাইরের পৃথিবীই দেখেনি। দেখেনি সূর্যের আলো ঝলমল দিন কিংবা রাত। এবং ততক্ষণে আপনি বুঝে যাবেন, এই বাঙ্কার থেকেই সিনেমার নামকরণ– আন্ডারগ্রাউন্ড

অন্যদিকে, বাঙ্কারের বাইরে নাতালিয়াকে বিয়ে করে ফেলে মার্কো। এবং তাদের এক রোম্যান্টিক মুহূর্তে বেলগ্রাদে বোমা ফেলে যাচ্ছিল অ্যালাইড ফোর্স। আন্ডারগ্রাউন্ড তথা যুগোস্লাভিয়ার পটপরিবর্তন হয়ে যাওয়া মুহূর্ত এটাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘না ঘর কা, না ঘাট কা’ যুগোস্লাভিয়া দুই বাহিনীরই ‘নয়নের মণি’ হয়ে ছিল। জার্মান বাহিনী যুগোস্লাভিয়ার যা কিছু অক্ষত রেখেছিল, তাও ধ্বংস করে দিয়ে যায় অ্যালাইডরা। মারা গিয়েছিল, পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপে [?] কমরেড টিটোর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে যুগোস্লাভিয়ার।

আন্ডারগ্রাউন্ড

হোয়াট ইউ অ্যাক্ট ইজ দ্য ট্রুথ, আর্ট ইজ অ্যা লাই

বিশ্বযুদ্ধের শেষে পুরো পৃথিবীর মতোই রাতারাতি বদলে গেল যুগোস্লাভিয়াও। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো হয়ে উঠল দেশটির ভাগ্যবিধাতা, একনায়ক। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত, সর্বত্র সবাই একই সঙ্গীত ‘কমরেড টিটু উই স্যয়্যার টু ইউ’ গাইতে থাকে। জবরদস্তি নয়, বরং ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সমর্পনের অদম্য আবেগ থেকে উঠে আসে এই গান। টিটো যা বলে, তা-ই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে মানুষ। এমনকি টিটো যা বলে না, তাও যখন টিটোর নাম করে বলা হয়, মানুষ তা বিশ্বাস করে। এভাবে একনায়কতন্ত্রের সমস্ত সমস্যা খুঁটি গেড়ে বসেছিল বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগোস্লাভিয়ায়।

তখন স্নায়ুযুদ্ধের কাল। এবং সেই সময়টায় মার্কো হয়ে উঠল টিটোর ঘনিষ্টজন, দেশের জনগণের নেতা। বাঙ্কারের ভেতরের মানুষের কাছে টিটোর প্রতিনিধি। হ্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল বাঙ্কারের ভেতরে, তারা যুদ্ধ শেষেও ওই বাঙ্কারেই রয়ে গেছে। স্বেচ্ছায় নয়, তাদেরকে জানানোই হয়নি যে বাইরের পৃথিবীতে ওই প্রলয়ংকরী যুদ্ধ থেমে গেছে। তাদেরকে বলা হতে লাগল, যুদ্ধ এখনো চলছে এবং কমরেড টিটোর নেতৃত্বে দেশের জনগণ ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছে। যুদ্ধ করতে চাই অস্ত্র। টিটো বাঙ্কারবাসীকে অস্ত্র বানিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বাঙ্কারের সর্দার ব্ল্যাকির কাছে পাঠিয়েছে তার বন্ধু মার্কোকে। সেই অস্ত্র শেষ পর্যন্ত মার্কো টিটোর কাছে পৌঁছে দিয়েছে কিনা, কিংবা আদৌ ওই অস্ত্র বানাবার নির্দেশ টিটো দিয়েছিল কিনা– সেই কথা বাঙ্কারবাসীদের মতো আমরাও জানতে পারি না।

ভুয়া বিশ্বযুদ্ধের বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে কখনো মার্কো নিজে আহত সেজে গিয়ে পৌঁছায় ওই বাঙ্কারে। কখনো মার্কো বাঙ্কারবাসীর কাছে ধর্ষিতা সাজিয়ে পাঠিয়েছে নিজের দ্বিতীয় বউ, ব্ল্যাকির একসময়কার প্রেমিকা নাতালিয়াকে। জার্মান বিমান বাহিনীর হামলার কৃত্রিম শব্দ, বিমানের সাইরেন– সাউন্ড সিস্টেমে নিয়ম করে বাঙ্কারবাসীকে শোনানো হতো, যেন তারা আরো নিচে, কিংবা বাঙ্কারেই বানানো ট্যাঙ্কের ভেতরে আশ্রয় নেয় জীবন বাঁচাতে।

আন্ডারগ্রাউন্ড

এই বাঙ্কার যেমন যুগোস্লাভিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা, তেমনই অনেক বাস্তবতার রূপক হিসেবেও এসেছে আন্ডারগ্রাউন্ড-এ। এই বাঙ্কার যুগোস্লাভিয়া নামক দেশটির প্রতীক। কেননা, যুগোস্লাভিয়ার মতো এখানেও রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন জাতির সহাবস্থান। ভিন্ন লোকজ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মানুষের আবাস। রয়েছে নামাজের স্থান, গির্জা। রয়েছে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, একতাবোধ [!]। এই বাঙ্কার কোল্ড ওয়ারের সময়কার যুগোস্লাভিয়ার সাধারণ মানুষের প্রতীক। যারা জানেই না তারা কি করছে, কেন করছে। টিটোর সরকার যেমন যুগোস্লাভিয়ার জনগণের কাছে মিথ্যার ফুলঝুরি সাজিয়ে সারাবিশ্ব থেকে আলাদা করে, মানুষকে অন্ধকারে রেখে নিজের যা প্রয়োজন তা করিয়ে নিয়েছে, বাঙ্কারবাসীর সঙ্গে ঠিক একই কাজই করেছে মার্কো।

আন্ডারগ্রাউন্ডে, অর্থাৎ মাটির নিচে শুধুমাত্র যে বাঙ্কার রয়েছে তা নয়, বরং সেখানে তৈরি হয়ে গেছে হাইওয়ে। যার একদিকে ভিয়েনা, অন্যদিকে বার্লিন। এই হাইওয়ে ধরে চলে যাওয়া যাবে ইউরোপের বড় শহরগুলির যেকোনোটায়। সেই রাস্তায় বাস চলে, ট্রাক চলে, চলে প্রাইভেট কার। এবং এই হাইওয়ে যারা ব্যবহার করে, তাদের সঠিক পরিচয়, তারা রিফিউজি। কোল্ড ওয়ারের সময় ইউরোপ জুড়ে যে অস্থিরতা, লোভ-সংগ্রাম, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, জীবন রক্ষার যুদ্ধ, তারও প্রতীক এই আন্ডারগ্রাউন্ড। মানুষ দলে দলে নিজের সমাজতান্ত্রিক দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছে প্রতিবেশি পুঁজিবাদী দেশে।

শুধুমাত্র যুগোস্লাভিয়ার নাতালিয়া নয়, সেই সময়কার ইউরোপের অর্ধেক মানুষের ভাষ্য তুলে ধরে এই সিনেমা– ‘আই হ্যাভ বিন ডেড ফর টুয়েন্টি ইয়ারস’; আর এইখানে এসে সিনেমা আন্ডারগ্রাউন্ড শুধু যুগোস্লাভিয়ার নয়, হয়ে ওঠে ইউরোপের, হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক।

আন্ডারগ্রাউন্ড

নো ওয়ার ইজ অ্যা ওয়ার আনটিল অ্যা ব্রাদার কিলস হিজ ব্রাদার

যে যুগোস্লাভিয়াকে নিয়ে এতকিছু, ভেবে দেখুন, ১৯২৯ সালের আগে এই নামে কোনো দেশই ছিল না। যে দেশের জন্মই মাত্র কয়েক বছর আগে, সেই যুগোস্লাভিয়াকে নিয়ে কেন এত আবেগ? আর জন্মের কয়েক বছর পরে দেশটা ভাঙলই-বা কেন?

আসলে, যুগোস্লাভিয়া হলো বলকানদের সেই ইউটোপিয়া, যা একদিন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝখানে পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা বলকান অঞ্চলের মানুষেরা বহুবছর ধরে পরাধীন ছিল রোমান, অটোমান ও অন্য শক্তিশালী রাজ্যের কাছে। সার্ব, ক্রোয়েট, স্লোভেন তথা দক্ষিণী স্লাভরা এই পরাধীনতার গ্লানি থেকে বের হবার একমাত্র পথ হিসেবে আবিষ্কার করেছিল সমস্ত বলকানদের এক দেশে জোটবদ্ধ হওয়া। সেই দেশের স্বপ্ন তারা ১৭-শতক থেকেই দেখে আসছিল। পরবর্তীকালে বলকান অঞ্চলের কিছু স্টেট [সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো] স্বাধীন হলেও, অন্য অনেক অঞ্চলই ছিল পরাধীন এবং রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অ্যালাইড বাহিনীর খাতায় নাম লেখানো সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো যুদ্ধশেষের ভাগবাটোয়ারায় নিজেদের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করল। এরই সূত্র ধরে এবং ‘যুগোস্লাভ কমিটি’র তৎপরতায় ১৯১৮ সালে হাবসবার্গ-অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ভেঙে সমগ্র বলকান অঞ্চল নিয়ে গঠিত হলো কিংডম অব সার্বস, ক্রোয়েটস অ্যান্ড স্লাভেনস। ১৯২৯ সালে আরো কিছু সায়ত্বশাসিত স্টেট নিয়ে কিংডম অব সার্বস, ক্রোয়েটস অ্যান্ড স্লাভেনস হয়ে উঠল যুগোস্লাভিয়া। বলকানদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের যুগোস্লাভিয়া অবশেষে সত্যি হয়ে উঠল।

স্বপ্নের সার্থক হয়ে ওঠার নাম যদি হয় যুগোস্লাভিয়া, তেমনই স্বপ্ন সত্যি হয়ে ওঠার পর তা যে আর স্বপ্নের মতো থাকে না, তার প্রমাণও এই যুগোস্লাভিয়া।

বলকান শব্দের অর্থ পাহাড়। আর এই অঞ্চলটার বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অনতিক্রম্য পাহাড়ি এলাকা। যার ফলে এখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মানসিক ও যোগাযোগের দূরত্ব রয়েই গিয়েছিল। অবশ্য দূরত্বের এটাই একমাত্র কারণ নয়। অঞ্চলটির একেক অংশ একেক সময় নানান জাতি ও দেশ দ্বারা শাসিত হওয়াটাও অন্যতম কারণ বটে। যার ফলে, আবহমানকাল ধরে রেষারেষি খুব বেশি না থাকলেও, ভালো সম্পর্কও যে ছিল– তা বলা যায় না। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো এক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের নিচে এলেও, সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অবিশ্বাসও। সেই অবিশ্বাস ১৯৯০ সালে এসে ঘটাল বিস্ফোরণ। যুদ্ধ লেগে গেল গোটা যুগোস্লাভিয়ায়।

৯০-এর দশক গোটা ইউরোপেরই পটপরিবর্তনের কাল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো একে একে ভেঙে যাচ্ছিল। বার্লিন দেয়াল ভেঙে দুই জার্মানি মিলিত হয়ে গেল। সমাজতন্ত্রের রক্ষাকর্তা সোভিয়েত ইউনিয়নও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেই ভাঙন ও পটপরিবর্তনের প্রবল ঢেউ এসে পড়েছিল যুগোস্লাভিয়াতেও। দেশটির রাজধানী সার্বিয়ার বেলগ্রাদে হওয়ায় সার্বরা সবসময়ই ছিল ক্ষমতার খুব কাছাকাছি এবং সুবিধাভোগী। সার্বরা নিজেদের অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর শাসক ভাবা শুরু করাটাও তাই অস্বাভাবিক ছিল না। ফলে অন্যরা সার্বদের ওপর ক্ষেপে উঠছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এরই জের ধরে, ক্রোয়েট জাতির আবাস ক্রোয়েশিয়া নিজেদের সেনাবাহিনী গঠন করে ক্রোয়েটদের জন্য স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার ঘোষণা দিল ৯১-এ। এরপরই সেখানকার সার্বদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। ঘটতে থাকে গণহত্যা। বসনিয়াও একইভাবে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাইলে সেখানে নেমে আসে সার্বিয়ান সেনাবাহিনী, প্রেসিডেন্ট মিলোশেভিকের নির্দেশে। এভাবে পুরো যুগোস্লাভিয়ায় স্বাধীনতাকামী জাতি ও সার্বদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেল। ফলশ্রুতিতে শুরু হয়ে গেল জাতিগত সহিংসতা, গৃহযুদ্ধ, ভ্রাতৃহত্যা।

সেই সময়টায় মার্কো আর যুগোস্লাভ নেই। সে সার্ব কিংবা ক্রোয়েটও নয়। সে তখন স্রেফ একজন অস্ত্রব্যবসায়ী। যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে থাকে মার্কো। এবং হুইল চেয়ারে বসে থাকা মার্কোকে শেল্টার দিচ্ছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী। আর ঠিক একই সময়েই অনতিদূরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে সন্তান হারানো ব্ল্যাকি। সে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার পুত্র যোভানকে। এবং জেনে রাখুন, এইখানে যোভান শুধুমাত্র যোভান নয়, এইখানে যোভান আসলে যুগোস্লাভিয়া। যে যুগোস্লাভিয়া হারিয়ে গেছে। যে যুগোস্লাভিয়ার কোনো চিহ্ন ওই যুগোস্লাভিয়ায় আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই যুদ্ধে ব্ল্যাকি সার্ব, ক্রোয়েট কিংবা স্বাধীনতাকামী কোনো দলের নেতা নয়। সে অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত নিজের সেনাবাহিনীর অধিপতি।

আন্ডারগ্রাউন্ড

অস্ত্রের দাম নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় মার্কো যখন ফিরে যাচ্ছিল, তখন নিজের ভাই, সদ্য মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া ইভানের সামনে গিয়ে পড়ে সে। সারাজীবন ধরে ইভানের সাথে, বাঙ্কারবাসীর সাথে, দেশের মানুষের সাথে যত অন্যায় মার্কো করেছিল, তার শাস্তি দিতে ইভান নিজের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাল আপন ভাই মার্কোকে। মার্কোকে খুঁজতে এসে নাতালিয়াও পড়ে বিপদের মধ্যে। ব্ল্যাকির সেনাবাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরা পড়ে নাতালিয়া ও মার্কো। এবং ফোনে এই দুই যুদ্ধবন্দীকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয় ব্ল্যাকি। তারা হুইলচেয়ারে মার্কো এবং তার কোলে বসা নাতালিয়ার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে দুই যুদ্ধবন্দীর পাসপোর্ট দেখে মার্কো ও নাতালিয়াকে চিনতে পারে ব্ল্যাকি। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। মার্কো-নাতালিয়ার লাশ নিয়ে যীশুর ভাঙা মূর্তির চারপাশে ঘুরতে থাকা জ্বলন্ত হুইলচেয়ারের পেছন পেছন নিজের ওভারকোট খুলে ধরে ঘুরতে থাকে ক্রন্দনরত ব্ল্যাকিও। চোখের জলে ভেজা ব্ল্যাকির ওই আর্তনাদে আবারো উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া যোভান, হারিয়ে যাওয়া যুগোস্লাভিয়া।

শেষ পর্যন্ত ইভানের মৃত্যু হয় আত্মহননেই। যে বাঙ্কার থেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডের যাত্রা শুরু, সেখানে ফিরে আসে ব্ল্যাকি এবং সনি। ব্ল্যাকির আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড-এর প্রত্যেক চরিত্রই মৃত্যুবরণ করে, শুধুমাত্র সনি ছাড়া। সনি, সেই ওড়াংওটাং’টাই আন্ডারগ্রাউন্ড-এর একমাত্র চরিত্র, যে বেঁচে থাকে। তাই পরকালে যোভানের বিবাহোৎসবে সে ছাড়া প্রত্যেকে উপস্থিত। ব্ল্যাকি, মার্কো, নাতালিয়া, ব্ল্যাকির বউ ভেরা, নাতালিয়ার ভাই বাটো– প্রত্যেকে উৎসবে মেতে ওঠে মৃত্যুর পরের পৃথিবীটায়। সেখানে, নদীর তীর ভেঙে মানচিত্রের মতন একটি টুকরো নৃত্যরত মানুষগুলোকে নিয়ে ভেসে যেতে থাকে দ্রিনা নদে। এ আর কিছু নয়, যুগোস্লাভিয়ার ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়ারই অবিশ্বাস্য প্রকাশ।

প্রচণ্ড কৌতুক, আবেগ ও কষ্টকে সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ পাওয়া এই আন্ডারগ্রাউন্ড এমির কুস্তুরিৎসার মতন অনেক যুগোস্লাভেরই স্বপ্নভঙ্গ ও রক্তক্ষরণের ইতিহাস। এই ইতিহাস শুধুমাত্র যুদ্ধের সালতামামি নয়, বরং আন্ডারগ্রাউন্ড ইতিহাসের পেছনের ইতিহাসকে তুলে আনে। একই সঙ্গে নিজে কাঁদে, কাঁদায়ও। এই কষ্টে কেঁদেছেন এমির কুস্তুরিৎসা, ঋত্বিক ঘটক। প্রিয়জন হারানোর কষ্টের চেয়েও দেশ হারানোর কষ্ট, মানচিত্র হারানোর কষ্ট হয়তো বেশি।


প্রথম প্রকাশ • জুম ইন । লিটলম্যাগ ।  দ্বিতীয় সংখ্যা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লিটলম্যাগ সম্পাদক; সিনে-প্রেমি । চট্টগ্রাম

মন্তব্য লিখুন