স্মৃতির বুনুয়েল

6
451

ভূমিকা ও গ্রন্থনা : ড্যান জাকির ।। অনুবাদ : রুদ্র আরিফ


‘শতাব্দীর সমান বয়সী’– স্প্যানিশ এই বুলির সঙ্গে লুই বুনুয়েল বেশ মানিয়ে যান; কেননা, তার জন্ম ১৯০০ সালে; আর ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া ফিল্মটির জন্য ১৯৭২ সালে অস্কার জয়ের আগেভাগেই, সিনে-দুনিয়ায় তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন পুরষ্কারটি পাবার ব্যাপারে ভবিদ্বাণী করে; এবং এই বলে যে, এই সম্মানের জন্য ২৫ হাজার ডলার খরচ করতে হয়েছে তাকে! পরে তিনি সোজাসাপ্টা ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছি, আমেরিকানরা ব্যবসায়ী হিসেবে সৎ!’

ইমাজিনেশনের নিখাঁদ নিষ্কলুষতার দোহাইয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পথ বর্জন করেছিলেন বুনুয়েল; আর তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল– তার বিখ্যাত নিরীশ্বরবাদের প্রতি সর্বাত্মকভাবে মর্মভেদী। ১৯৮১ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর পর, তার প্রিয় ও নিত্যনৈমত্তিক সহযোগী জ্যঁ-ক্লদ চারিয়ার [ফরাসি স্ক্রিনরাইটার; ১৯৩১-] ১৯৮১ সালে লা মালিন ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন : “তিনিই একমাত্র জীবিত ফিল্মমেকার, যিনি মধ্যযুগ থেকেই পরিচিত মুখ… আর তিনি এখনো স্পেনের প্রান্তিক জীবনে কাটানো শৈশবের শান্ত-সুনিবিড় সেই কল্পনার প্রতি স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন। বুনুয়েল বলেছেন, সে সময়ে মানুষের ছিল একটি অন্তর্জাগতিক জীবন।”

লুই বুনুয়েল

জীবনের শেষ দশকে পৌঁছে, প্রতিটি সিনেমা বানানোর সময়ই তিনি ধরে নিতেন, শেষ সিনেমাটি বানাচ্ছেন। দ্যাট অবসকিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার বানানোর পর তিনি এমন একটি সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, যেটিকে চারিয়ার অভিহিত করেছেন “তার নিজের যুগের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির একটি আশ্রম” হিসেবে। ফিল্মটি তিনি বানাতে পারেননি। মেক্সিকো, ফ্রান্স ও স্পেন– তিন দেশের তিনটি ক্যারিয়ারজুড়ে তার কাজগুলোর মধ্যে কোনো সিনেপ্রেমী চাইলে সান্ত্বনা খুঁজে পেতে পারেন, এবং এই অনুতাপেও ভুগতে পারেন, হলিউড কখনোই তাকে নিজের চতুর্থ ক্যারিয়ারটি শুরু করতে দেয়নি বলে। ১৯৮১ সালে ফ্রান্স স্যোই ম্যাগাজিন-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুনুয়েল স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছেন, দ্য গোল্ডেন এজ-এর তেজ দেখে, ১৯৩০ সালে এমজিএম [প্রোডাকশন কোম্পানি] যখন তাকে হলিউডে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল, গ্রেটা গার্বোকে [আমেরিকান অভিনেত্রী; ১৯০৫-১৯৯০] কাছ থেকে দেখার ইচ্ছেতে একটি সেটে হাজির হয়েছিলেন তিনি। বুনুয়েল জানান, “তিনি [গ্রেটা] আমাকে দেখে এ.ডি.কে [অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর] ডাকলেন, আর সে [এ.ডি.] এসে আমাকে পাজাকোলে করে তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দিলো! আমি আর কোনোদিনই সেখানে ফিরতে চাইনি। হলিউডে এটিই ছিল আমার শিক্ষানবিশির কাল।”

বুনুয়েলের পছন্দের অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সের মিশেল পিকোলি, জুলিয়াঁ বার্থু [১৯১০-১৯৯৫], দেলফিন স্যেরিগ [১৯৩২-১৯৯০] ও জ্যান ম্যরো [১৯২৮-]। স্পেনে তার ভালো লাগত ফ্রান্সিস্কো রাবালের [১৯২৬-২০০১] অভিনয়; তবে তার বেশকিছু সিনেমায় তারই অল্টার-ইগো হিসেবে অভিনয় করে সুপরিচিত হওয়া ফের্নান্দো রে’কে [১৯১৭-১৯৯৪] তিনি পছন্দ করতেন না! চলুন, বুনুয়েলের সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রীর কাছ থেকে জানা যাক তার স্মৃতিচারণ…

ΘΘΘΘΘ

স্মৃতির বুনুয়েল

ΘΘΘΘΘ

বেলে দ্যু জ্যুর-এর সেটে ক্যাথরিন ও বুনুয়েল
ক্যাথরিন দানুয়্যেভ  

বুনুয়েল খুব একটা কথা বলতেন না। কথা বলতে হয়তো শারীরিকভাবে ক্লান্তিবোধ করতেন তিনি। তবে এই বিমূঢ়তার ভেতর দিয়েই বোঝাপড়া ঘটে যেত আমাদের। বেলে দ্যু জ্যুর-এর চেয়ে বরং ত্রিস্তানার শুটিংকালটিই বেশি ভালো ছিল; কেননা, সেটির প্রডিউসার ছিলেন যথেষ্ট ভালো মানুষ; তবে এর সবচেয়ে বড় কারণ, বুনুয়েল নিজে সেই বিরিদিয়ানার পর এই প্রথমবারের মতো আবারও স্পেনে শুটিং করছেন বলে এ বেলা ভীষণ উৎফুল্ল ছিলেন। ফূর্তিবাজ লোক ছিলেন তিনি। তুখোড় রসবোধ ছিল তার। একটা কথা তিনি জোরের সঙ্গে বলতেন– “সবচেয়ে বড় কথা হলো, মনস্তত্ত্বের কোনো জায়গা নেই!” কথাটি আমি মন থেকে মেনে নিয়েছি; কেননা, এ কথাটি যে তার বলা!

ক্যাথরিন দানুয়্যেভ। জন্ম : ২২ অক্টোবর ১৯৪৩। ফরাসি অভিনেত্রী
বুনুয়েল নির্মিত ফিল্মে অভিনয় : বেলে দ্যু জ্যুর [১৯৬৭]। ত্রিস্তানা [১৯৭০]

ΘΘΘΘΘ

ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেইড-এর সেটে বুনুয়েল ও ম্যরো
জ্যান ম্যরো

তাকে আমি আমার “স্প্যানিশ বাবা” হিসেবে গণ্য করতাম; তাকে আমি তা [বাবা বলে] ডাকতামও। স্রেফ বক্স-অফিসের হিসেবেই সাক্ষাৎ হয়েছিল আমাদের : ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেইড ফিল্মটির জন্য কোন অভিনেত্রীকে চান– ঠিক করতে পারছিলেন না তিনি। তখন প্রডিউসার আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। মধ্যাহ্নভোজের অজুহাতে স্যঁ-ত্রুপের একটি অ্যাপার্টমেন্টে দেখা হয়েছিল আমাদের; সময়টা খুব দারুণ কেটেছে, ফলে নৈশভোজও একসঙ্গেই সেরেছিলাম। চমৎকার এক মানুষ ছিলেন তিনি। আমার জানাশোনার মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ফিল্মমেকার– যিনি কোনো শট কখনোই হেলায় ছেড়ে দিতেন না। ফিল্ম তার মাথার মধ্যেই থাকত। যখন তিনি ‘অ্যাকশন’ ও ‘কাট’ বলতেন, বোঝা হয়ে যেত, এ দুটি শব্দ তাৎপর্যময়ভাবে গেথে গেছে। আমার সঙ্গে কাজের বেশিরভাগ সময় তিনি শারীরিকভাষাতেই কথা বলতেন। চরিত্রটি সম্পর্কে মুখে তেমন কিছু বলতেন না। কিন্তু [প্রসঙ্গ চরিত্রটির বদলে] অন্য কোনোকিছু নিয়ে কথা বলেই বরং কখনো কখনো অভিনেতার পক্ষে নিজেকে অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম– এ বিশ্বাস ছিল তার।

জ্যান ম্যরো। জন্ম : ২৩ জানুয়ারি ১৯২৮। ফরাসি অভিনেত্রী
বুনুয়েল নির্মিত ফিল্মে অভিনয় : ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেইড [১৯৬৪]

ΘΘΘΘΘ

ত্রিস্তানা’র সেটে বুনুয়েল, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, ক্যাথরিন দানুয়্যেভ ও ফ্রাঙ্কো নিরো
ফ্রাঙ্কো নিরো

বুনুয়েল আমাকে সবসময়ই বলতেন, সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো দর্শককে কোনোকিছুই না দেখিয়ে বরং তাদের কল্পনাশক্তির ওপর ট্রিগার চাপা। ত্রিস্তানায় ক্যাথরিন দানুয়্যেভের একটি ন্যুড-সিন ছিল– জানালায় বসা : গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে থেকে তার নগ্ন-শরীর এক পলক দেখতে পাবার আকাঙ্ক্ষা রাখা বালকটির দিতে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। ক্যামেরা থিতু হয়ে ছিল ক্যাথরিনের মুখের ওপর। নগ্নতাকে প্রকাশ না করেই, এভাবে, এ দৃশ্যটি অধিকতর আবেদনময় হয়ে উঠেছিল।

আমার ধারণা, প্রতিভাবান মানুষমাত্রই শিশুর মতো। ইতালিয়ান কবি জ্যুভান্নি পাসকোলি বলেছেন, ‘প্রত্যেক মানুষের আত্মায় একটি করে শিশু লুকিয়ে থাকে; সেটি যখন তাকে ত্যাগ করে চলে যায়, তখন সে পর্যবসিত হয় অসারতায়।’ একদিন সকালে সেটে এসে বুনুয়েল তার ব্যাগটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সব ত্রক্রু এদিক-সেদিক খুঁজতে শুরু করে দিলো; কেননা, তিনি গোঁ ধরে বসলেন, ব্যাগ না পেলে শুটিংই করবেন না! তিনি হাহাকার করছিলেন, “হায় আমার ব্যাগ! আমার ব্যাগ!” ঠিক যেন ছোট্ট বালকের মতো। অবশেষে ব্যাগটি পাওয়া গেলে তিনি সেটি আঁকড়ে ধরে, এক কোণায় লুকিয়ে রাখলেন। আমি তার পিছু নিয়ে দেখলাম, ব্যাগ থেকে একটা হ্যাম-স্যান্ডোইচ বের করে তিনি খাচ্ছেন। তিনি স্রেফ খেতে চেয়েছিলেন। আমাকে দেখামাত্রই লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘তুমি এখানে কী করছো, শুনি? প্লিজ কাউকে বলো না! ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে আমার।… তারা যদি আমাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলে, ব্যাপারটা একটা বাজে উদাহরণ হয়ে উঠবে; কারণ, তারা সবাই-ই খেতে চাইবে। কিন্তু আমি তো ক্ষুধার্ত।…’

আরেকদিন তিনি বললেন, তিনি আর কানে শোনেন না; কিন্তু আমার সন্দেহ হলো। তিনি একজন বোবা লোককে থামিয়ে বললেন, “তুমি কি বোবা? আমি বধির!” তারপর টানা আধঘণ্টা ধরে হাসতে থাকলেন।

ফ্রাঙ্কো নিরো। জন্ম : ২৩ নভেম্বর ১৯৪১। ইতালিয়ান অভিনেতা
বুনুয়েল নির্মিত ফিল্মে অভিনয় : ত্রিস্তানা [১৯৭০]

ΘΘΘΘΘ

ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া ফিল্মে সহশিল্পীর সঙ্গে ব্যুলা অগিয়্যে
ব্যুলা অগিয়্যে

অভিনেতারা হলেন ফিল্মমেকারের আইডিয়াগুলো বয়ে বেড়ানো একেকটি ইনস্ট্রুমেন্ট; আর এ কারণেই নিজের কাজকে আমার এত বেশি কঠিন লাগে : আমি আমার ফিল্মমেকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়ায় অবশ্য আমাকে এত বেশি জটিলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। অভিনেতাদের একেকজন মানুষ গণ্য করেই ভালোবাসতেন বুনুয়েল; তাদের সঙ্গে খুব নম্র ব্যবহার করতেন; তবে কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে– সেই হিসেবে কোনো অভিনেতার মধ্যে কখনোই পার্থক্য টানতেন না তিনি। ফিল্মটি স্ক্রিপ্টের কতটুকু প্রতিফলন ঘটাতে পারল– এ ব্যাপারটিই গুরুত্ব পেত তার কাছে; কেননা, তিনি সবসময়ই চেয়েছিলেন লেখক হতে। তিনি যা লিখেছেন, তা যথাযথভাবে অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতেই হতো। ফাঁকিবাজি দেওয়ার কোনো রাস্তা তিনি খোলা রাখতেন না।

ব্যুলা অগিয়্যে। জন্ম : ৯ আগস্ট ১৯৩৯। ফরাসি অভিনেত্রী
বুনুয়েল নির্মিত ফিল্মে অভিনয় : দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া [১৯৭২]

ΘΘΘΘΘ

দ্য ফ্যানটম অব লিবার্টি’র সেটে বুনুয়েল, জুলিয়াঁ বার্থু ও মিশেল পিকোলি
মিশেল পিকোলি

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে কিংবা প্রণোদনা বিষয়ক আলোচনা করতে তিনি কখনোই পছন্দ করতেন না। ভীষণ ভদ্র ও আদুরে, মানুষের সঙ্গে ভীষণ মিশুক ছিলেন তিনি; আর ছিলেন তুখোড় রসবোধের অধিকারী। ভয়ানক এক অনুভবক্ষম নজর ছিল তার। কেউ যদি কোনো ভুল করত, কিংবা কোনো বিশ্রী জোক শোনাত কিংবা কাউকে আঘাত দিত– মুহূর্তেই তার বিচার করে বসতেন। অন্যথায় তিনি ছিলেন খুব মিষ্টি এক মানুষ; তবে তার সেই বিনম্র অবয়বের ভেতর কর্তৃত্বায়নের গভীর এক সক্ষমতাও ছিল।

অভিনেতাদের প্রতি ভীষণ দরদ ছিল তার; সবকিছু খুব নম্রভাবে বোঝাতেন; আর অভিনেতারাও বুঝে যেত, তিনি যা বলছেন, ঠিকই বলছেন। তারা বুঝে যেত, নিজের কাজের প্রতি কোনো দ্বিধা, কোনো সন্দেহ নেই তার। বেলে দ্যু জ্যুর-এর একটি দৃশ্যে, জর্জ মার্শালকে [১৯২০-১৯৯৭; ফরাসি অভিনেতা] সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে, মাস্টারবেশনের কল্পনা করার দরকার পড়েছিল। ক্লোজ-আপ শট ছিল সেটি। ব্যাপারটি সহজ ছিল না। বুনুয়েল তাকে বললেন, “সূর্যাস্তের কথা ভাবো”। চমৎকার ব্যাপার ছিল সেটি : এ কথা ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা তিনি দেননি; স্রেফ বলেছেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে। বস্তুতপক্ষে অভিনেতাকে তিনি সূর্যের সঙ্গেই তুলনা করেছেন।

জীবনে কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন তিনি; তাকে সন্তুষ্ট করা সহজ ছিল না। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন একজন তুখোড় স্প্যানিশ বুর্জোয়া; এবং ভীষণ সুশৃঙ্খল জীবনের অধিকারী। বাজেটের মধ্যে কাজ শেষ করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার; কেননা, খুব অল্প বয়সেই অর্থনৈতিক সঙ্কটের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো দিনগুলোতে। জীবনকে খুব বিনম্রভাবে কাটিয়ে গেছেন তিনি।

তিনি খুব মজা করতেন। শিশুদের মতো কৌতুক শোনাতেন; বারবার একই কৌতুক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতেন। একান্তই প্রয়োজন না পড়লে কখনোই চিঠি লিখতেন না। আর চিঠির শেষাংশে সবসময়ই লিখতেন, “আপনার একান্তই অবাধ্য” কথাটি। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে খুব বিদ্রূপ করতাম; বলতাম, “আমি আর ক্যাথরিন দানুয়্যেভ মিলেই আপনাকে তৈরি করেছি”। বলতাম, “আপনি বেলে দ্যু জ্যুর বানানোর আগপর্যন্ত, বহুকাল ধরে শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীরা ছাড়া আর কেউই আপনার কোনো সিনেমা দেখেনি।” এ কথা শুনে তিনি ভীষণ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠতেন; মেনে নিতেন আমার কথা; আর বলতেন, “ঠিক বলেছ। ধন্যবাদ তোমাকে।” আমরা সারাক্ষণই হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকতাম। ভয়ানক মনস্তাপে ভরা এক অবিরাম অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন তিনি।

একবার তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ফরাসি একটি টিভি চ্যানেল দুই ট্রাকভর্তি যন্ত্রপাতিসহ একদল ত্রক্রু পাঠিয়েছিল স্পেনে। তাদের তিনি বলেছিলেন, “এসব জিনিস এখানে আনতে আপনাদের যা খরচ হয়েছে, সেই টাকায় আমি একটা আস্ত সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারতাম।” তাদের তিনি জানিয়েছিলেন, তলেদো শহরে [স্পেন] সাক্ষাৎকার দিতেই স্বস্তিবোধ করবেন। এ শহরটি পছন্দ করার বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা– তাদের এ প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “না। শহরটা আমি ঘৃণা করি। মাছিতে ভরা এটি।” তারা যখন জানতে চাইল, ইল সিনেমায় সাদের [মার্কু দ্যু সাদ; ফরাসি সাহিত্যিক; ১৭৪০-১৮১৪] কোনো প্রভাব রয়েছে কিনা। তিনি “না” বলেছিলেন। সাক্ষাৎকারক তখন জোরের সঙ্গে বলেছিল : “ফিল্মটিতে পুরুষটি নারীটির যৌণাঙ্গ সেলাই করে দেয়।” জবাবে বুনুয়েল বলেছিলেন, “আপনার স্ত্রী যখন আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, আপনি তখন মাতাল হয়ে যাবেন। আমি স্রেফ তাকে [নারীচরিত্রটির] সেলাই করে দিয়েছি। এরমধ্যে স্যাডিস্টিক বা ধর্ষকামী কিছু নেই।”

অপরকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। দ্যু রিশ্যু [অঁদ্রে দ্যু রিশ্যু; ফরাসি কবি; ১৯০৭-১৯৬৮] মারা যাওয়ার পর, এক রেডিওতে তার স্মৃতিচারণ করেছিলাম আমি। তিনিও তা করতে চান কিনা– জানতে চাইলে বুনুয়েল বলেছিলেন, “না। মৃত বন্ধুদের সম্পর্কে কখনোই কথা বলতে চাই না আমি। রেস্টুরেন্টের মতো, তাদেরকেও আমি স্রেফ তারকাচিহ্ন দিয়ে রাখতে পারে : জর্জ সাদুল [ফরাসি সাহিত্যিক; ১৯০৪-১৯৬৭] ফাইভ-স্টার; দ্যু রিশ্যু ফোর-স্টার।”

আমরা যখন বেলে দ্যু জ্যুরএর শুটিং করছিলাম, লুই ম্যাগাজিনের [ফ্রান্স] জন্য কয়েকটি পাবলিসিটি-ফটোতে পোজ দিয়েছিলাম আমি; সেগুলো দেখে বুনুয়েল বলেছিলেন, “আপনি একে অভিনেতা বলেন? এ তো সাক্ষাৎ পাপেট! তুখোড় অভিনেতা পিকোলির পক্ষে কী করে এসব কাজ করা সম্ভব! কী বিশ্রী ব্যাপার!” ম্যাগাজিনটি ভাঁজ করে নিজের বগলের নিচে রেখে দিয়েছিলেন তিনি; আর পুরো শুটিংয়ের সময়, সময়ে-সময়ে বের করে, এটিকে একটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাকে ভীষণ ভালোবাসতাম আমি।

মিশেল পিকোলি। জন্ম : ২৭ ডিসেম্বর ১৯২৫। ফরাসি অভিনেতা
বুনুয়েল নির্মিত ফিল্মে অভিনয় : ডেথ ইন দ্য গার্ডেন [১৯৫৬]। ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেইড [১৯৬৪]। বেলে দ্যু জ্যুর [১৯৬৭]। দ্য মিল্কি ওয়ে [১৯৬৯]। দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুর্জোয়া [১৯৭২]। দ্য ফ্যানটম অব লিবার্টি [১৯৭৪]

সূত্র । ফিল্ম কমেন্ট । ফিল্ম-ম্যাগাজিন; যুক্তরাষ্ট্র । সেপ্টেম্বর/অক্টোবর ১৯৮৩ সংখ্যা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

6 মন্তব্যগুলো

  1. […] কাজই আমাকে মুগ্ধ করে। এদের মধ্যে আছেন লুই বুনুয়েল, ইঙ্গমার বার্গম্যান, পিয়ের পাওলো […]

  2. […] হালের কিম কি-দুক অথবা সেকালের বুনুয়েলও হতে পারেন আজকের কারও কারও ব্যর্থতার, […]

মন্তব্য লিখুন