জ্যঁ ভিগো: ফরাসি সিনেমার অভিশপ্ত কবি

280
জ্যঁ ভিগো
জন্ম  ২৬ এপ্রিল ১৯০৫ । প্যারিস, ফ্রান্স
মৃত্যু ৫ অক্টোবর ১৯৩৪ । প্যারিস, ফ্রান্স

মূল • ম্যাক্সিমিলিয়ান লা কেইন । অনুবাদ • রুদ্র আরিফ


সিনে-জগতের সকল প্রসিদ্ধ প্রয়াতের মধ্যে, ১৯৩০ দশকের ফরাসি সিনেমার ‘অভিশপ্ত’ কবি জ্যঁ ভিগোর মতো এত রোমান্টিক আর কেউই নন– যিনি ২৯ বছর বয়সেই মারা গেছেন দীর্ঘদিন যক্ষায় ভুগে, রেখে গেছেন এমন ফিল্মোগ্রাফি– যা কিনা স্রেফ তিন ঘণ্টাতেই দেখে ফেলা সম্ভব, আর যা কিনা তার জীবদ্দশাতেই বিস্মরণে হারিয়ে যাওয়ার প্রত্যেকটি ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তার মাস্টারপিস ফিল্ম জিরো ফর কনডাক্ট ও লা’আতলান্তে যে ভয়াবহ সৌন্দর্য ও পার্থিব অরাজকতার সূক্ষ্মপ্রভা ছড়িয়ে দিয়েছে, তা এখনো দর্শকদেরকে তাদের বর্তমানের সম্মোহক পরিবেশের মোড়কে মুড়িয়ে ফেলে এবং তাদের মধ্যে এই জানাটুকু জানান দেয় যে– ভিগো ছিলেন স্রেফ একজন ফিল্মমেকারের চেয়েও বেশি কিছু, এবং ফিল্মের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এমন একটি মুহূর্ত– যেটি আর কখনো ফিরে আসবে না।

১৯১৭ সালে সন্দেহভাজন ঘটনার জন্য কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা প্রখ্যাত সংগ্রামী বিদ্রোহী মিগুয়েল আলমেরেইদা, ও এমিলি ক্লেরোর পুত্র ভিগো জন্মেছেন এমন একটি চিলেকোঠায়– যেটি ছিল বিড়ালে ভরা; ঠিক যেন তার ফিল্ম লা’আতলান্তে সিনেমার একই শিরোনামধারী বজরাটির মতোই। তার স্বল্পায়ুর জীবনজুড়ে অসুস্থতার যে আনাগোনা, সেটি শৈশবেই স্পষ্ট ছিল। তার বাবার বিদ্রোহ তার শৈল্পিক অনুভূতির জগতে বেশ দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বাবার নাম-ডাকের কারণে তিনি অবশ্য বড় হয়ে ওঠার পথে ‘জ্যঁ সেলেস’ ছদ্মনামের আশ্রয় মিশেছেন পারিবারিক বন্ধুদের সঙ্গে, এবং বোর্ডিং স্কুলে কাটিয়েছেন সময়। ১৯২২ সালে আবার মায়ের কাছে, প্যারিসে ফিরে আসেন তিনি; ভর্তি হন সার্তরের লিসি মাখসুতে। পরে আসল নাম নিয়ে ভর্তি হন স্যোবনে। ১৯২৬ লোজ্যের অধিবাসী জনৈক ব্যবসায়ীর কন্যা এলিজাবেথ ‘লাইদু’ লুজিনস্কার সঙ্গে পরিচয় হয় তার; পরে তারা বিয়েও করেন।

ফিল্মি উচ্চাকাঙ্ক্ষা মাথায় নিয়ে ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে অল্প সময়ের জন্য ফ্রাঙ্কো ফিল্ম স্টুডিওতে চাকরি নেন ভিগো। শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া একটি উপহার এই সহায়-সম্বলহীন ফিল্মমেকারের জন্য একটি সেকেণ্ড-হ্যান্ড ক্যামেরা কেনার এবং স্যাটেয়ারধর্মী ফিল্মি প্রবন্ধ আ প্রোপোজ দু নিস নির্মাণ শুরু করার সুযোগ এনে দেয়। এ সময়ে তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, রাশিয়ান সিনেমাটোগ্রাফার বরিস কাফমানের সঙ্গে পরিচিত হন। যে ক্যামেরাম্যান মিখাইল কাফমান ও ফিল্মমেকার জিগা ভের্তভের [আসল নাম– ডেনিস কাফমান] মাস্টারপিস ফিল্ম ম্যান উইথ অ্যা মুভি ক্যামেরা [১৯২৮] আ প্রোপোজ দু নিসকে প্রভাবিত করেছে, তাদেরই আরেক ভাই বরিস কাফমান পরে হলিউডে তার সম্মানজনক ক্যারিয়ারকে উপভোগ করেছেন। হলিউডে তিনি এলিয়া কাজানের অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট [১৯৫৪] এবং সিডনি লুম্যের শুরুর দিকের কয়েকটি ফিল্মে ক্যামেরা চালিয়েছেন।

আ প্রোপোজ দু নিস
আ প্রোপোজ দু নিস

আ প্রোপোজ দু নিস গড়ে উঠেছে পচনশীল অবস্থার মধ্যে একটি সমাজের অগভীরতায় একটি নিষ্ঠুর ও উন্মত্ত দূরদর্শনের আনন্দোৎসবের কেন্দ্রীয় মোটিফকে ঘিরে। নোংরামির প্রতি উাল্লাসময় রুগণ মুগ্ধতার মতোই জোরালো এটির নিয়মনিষ্ঠ নিরীক্ষা; উৎসবকারীদের প্রতিকৃতি এখানে যে রকম ভয়ঙ্কর হাস্যরসের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, তা ঝাঁক বেঁধে বয়ে গেছে প্রমোনাদে দেস আংলের উপর দিয়ে [এখানে মাঝে মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রাণীদের শট ইন্টারকাট করে ব্যবহার করা হয়েছে!] তাতে আন্ডারকাট হিসেবে নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে দুঃসহনীয় দারিদ্রের ইমেজ। আলস্য ও বিরক্তির অস্বস্তিকর পরিবেশ অসৎ উন্মত্ততার মধ্যে ফুটিয়ে তোলার, এবং মৃত্যু ও অবক্ষয়ের সীমালঙ্ঘনকারী বোধকে ইচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়ার ফলে এটি হয়ে উঠেছে ভিগোর সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ফিল্মজিরো ফর কনডাক্ট-এর স্যাটেয়ার যেখানে বিপ্লব ও নতুনত্বের শক্তির একটি গীতিকাব্যিক উদযাপনের ভারসাম্য রক্ষা করেছে, সেখানে আ প্রোপোস দু নিস নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে ক্যারিকেচারের মৃত্যু-নাচে– হিডেন ক্যামেরা দিয়ে জীবন থেকে চুরি করে নেওয়া হয়েছে বলে এই ক্যারিকেচারগুলো এত বেশি চমকে দিয়েছে। এই ফিল্ম নিয়ে ভিগোর মন্তব্য ছিল,
ফিল্মটি একটি শহরের নির্দিষ্ট মৌলিক দিকগুলো দেখিয়ে, জীবনের একটি পথ যাচাই করে নেয়। এখানে নিজের পলায়নপরতার মধ্যে ভীষণভাবে হারিয়ে গিয়ে একটি সমাজ যেভাবে শেষ নিঃশ্বাস তোলে– যা কিনা আপনাকে ক্লান্ত করবে এবং আপনার সমবেদনা জাগাবে একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতির প্রতি।

আ প্রোপোজ দু নিস-এ ইতোমধ্যে যা উপস্থিত হয়েছে, তা হলো– একটি বাস্তব, নান-স্টুডি সেটিংয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধারণ, ইমপ্রেশনের ওপর স্বতঃস্ফূর্ততার বিস্তরণ, এবং একটি সাদামাটা জিনিসকে জাদুকরি পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে ভিগোর ক্ষমতা। পরিবেশ ও ডিটেইলের প্রতি তার দৃষ্টির প্রসার ফিল্ম থেকে ফিল্মে বাড়ন্ত থেকেছে ঠিকই; তবে শুরু থেকে এর শেকড় প্রোথিত ছিল ডকুমেন্টারি চর্চার মধ্যে– যা কিনা দুর্দান্তভাবে অতিক্রম করে গেছে ডকুমেন্টারিধর্মিতাকেই।

ভিগোর পরের ফিল্মটিও ছিল ডকুমেন্টারি; আ প্রোপোজ দু নিস-এর শক্তির বিচারে এটি ছিল একটি শর্ট কমিশনড ফিল্ম; নাম তারি। ফিল্মটিতে অ্যাভাঁ-গার্দের কয়েকটি টেকনিক ব্যবহার করা হয়েছে সাঁতার চ্যাম্পিয়ন জ্যঁ তারির পারফরমেন্সের পরিপ্রেক্ষিতে। সাঁতারের প্রতি ভিগোর কোনো আগ্রহ ছিল না; এবং ফিল্মটি শেষ করার ক্ষেত্রে তার অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে সামান্যই। একটি অধিকতর সুঠাম কাজ সৃষ্টির সুযোগ শিগগিরই ধরা দেয় তার কাছে, সমব্যথী স্বাধীন প্রডিউসার ও সিনে-পাগল জ্যাক-লুই ননেজের মাধ্যমে– যিনি কিনা আগ্রহী ছিলেন একগুচ্ছ লো-বাজেট ও মিডিয়াম লেন্থের ফিল্মে অর্থলগ্নির জন্য। বাবার কারাবন্দি অভিজ্ঞতা ও নিজের স্কুল জীবনের উপর ভিত্তি করে ভিগো জিরো ফর কনডাক্ট-এ এ বেলা এমন একটি সাবজেক্ট নিয়ে কাজ করেন– যেটির অবস্থান ছিল তার হৃদয়ের কাছাকাছি। সাবজেক্টটি হলো, বড়দের হাতে শৈশব নিগৃহীত হওয়ার প্রতিচ্ছবি। ছেলেদের বোর্র্ডিং স্কুলের একটি বিদ্রোহকে ঘিরে কাহিনী দাঁড়ায় ফিল্মটির।

ফিল্মটি বানাতে গিয়ে চুক্তিবদ্ধ রানিং টাইমের মাত্রা ছাড়িয়ে যান ভিগো; পরে বাধ্য হন এটিকে আবারও গোছাতে। এই যন্ত্রণাদায়ক কাজটির ক্ষেত্রে তার সামনে অপশন ছিল দুটি। এক– কাহিনীবিন্যাসের প্রাঞ্জলতার প্রতি সম্মান দেখানো; এবং দুই– সবচেয়ে কাব্যিক মুহূর্তগুলোর পক্ষগ্রহণ। দ্বিতীয় অপশনটিই বেছে নিয়েছিলেন তিনি; আর তা জিরো ফর কনডাক্টকে দিয়েছে এমন একটি ফর্ম– যা ফিল্মটিকে এখনো সমান উত্তেজক করে রেখেছে। এর প্রত্যেকটি ইমেজ ও দৃশ্যই একেকটি বিস্ময়; এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তটির দৃশ্যত হাফ-ফর্ম ফিল্মটির মনোভাবকে অজ্ঞাতসারে শুনিয়ে দেয় কিংবা বলা চলে, দর্শকদেরকে সরাসরি উদ্দেশ্য না করে বরং তাদের উপর গোয়েন্দাগিরি চালায়। এটি দর্শকদের মনে একটি বিরল সতর্কতা, যৎসামান্য দ্বিধা সৃষ্টি করে– যেন দর্শকটি অন্যকারও স্বপ্ন নিজে দেখে ফেলেছে– এমনটা ভেবে চমকে যায়। চক্রান্তকারী শিশুদের একটি দলের এ কাহিনীটির পূর্বসূত্র ধরে শিশুদেরকে এমন একটি জগতে প্রবেশের গতিশীল উজ্জ্বল সংবেদনকে ইঙ্গিত করে, যে জগত তাদের কাছে গোপন ও অনন্য। এই শিশুতোষ ব্রহ্মাণ্ড মেনে চলে নিজস্ব সব যুক্তি– যার সবটুকু বুঝে ওঠার আশা আমরা করতে পারি না ঠিকই, তবে ভিগো যে নিশ্চিতভাবেই সেটির প্রতি একমত প্রকাশ করেছেন– তা তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার বিশেষাধিকার দেয় এগুলো।

জিরো ফর কনডাক্ট
জিরো ফর কনডাক্ট

তবে নিশ্চিতভাবেই এগুলো কোনো কাজেই লাগত না, যদি দৃশ্য ও ইমেজগুলো যতটা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে, ততটুকু ক্ষমতাবান এরা না হতো। ওপেনিং সিক্যুয়েন্সে, স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রেনে দুই বালকের পরস্পর সাক্ষাৎ হওয়া এবং অনেকটা ধর্মীয় অনুশাসনের দৃষ্টিতে খেলনাগুলোকে তুলনা করার মধ্য দিয়েই তারা ছুটির দিনকে অধিকার করে নিয়ে গেছে তাদের উত্থানের বিখ্যাত শেষ দৃশ্যে– যেটিতে তারা স্কুলের ছাদের উপর থেকে নানা ধরনের ‘জিনিসপত্র’ জোরসে ছুড়ে মারে একটি বিরল-রকম অন্যমনস্ক স্মৃতিচারণ উৎসব উপযাপনে হাজির হওয়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ডামিগুলোর প্রতি। এই তারুণ্যময় বিদ্রোহের উদাযাপনকে নিজের মধ্যে জিরো ফর কনডাক্ট যেভাবে ধারণ করেছে, তা সিনেমার জগতে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তের একটির অবতারণা করে। শিশুগুলোর প্রতি নিজের সমবেদনা নিয়োজিত থাকলেও শিক্ষকদের যে অসাধারণ ক্যারিকেচার ভিগো করেছেন, তা-ই সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর– দাঁড়িঅলা বামন হেডমাস্টার, লেইজার পিরিয়ডে ছাত্রদের জিনিসপত্র চুরি করা হিংসুটে কীট– সুপারভাইজার, মোটাসোটা সায়েন্স মাস্টার, ঘুমানোর সময় নিজের বিছানা খাড়া করে রাখার মাধ্যমে ‘ক্রুশবিদ্ধ’ হয়ে মরে যাওয়া হাউস-মাস্টার, চ্যাপলিনকে অনুকরণ করা সমব্যথী তরুণ নতুন টিচার– এইসব চরিত্র সৃষ্টি ভিগো এমন জাদুকরীভাবে করেছেন, সেগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শিশুদের চোখে যদি দেখা হয়ে থাকে, তাহলে শেষদৃশ্যে কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিদের ডামিগুলোর অদলবদল বাস্তবতার যে কোনো দাবিকে বড়দের বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে বালকগুলোর বিজয়কেই সত্যায়িত করে; তবে তাতে উপলব্ধ হয় শুধুমাত্র অল্পবয়সী বিদ্রোহীদের আবেগিক উপলব্ধি– যা কিনা তাদের ওপর অত্যাচারকারীদের একেবারেই ছোট করে তুলেছিল; তবু তার অস্তিত্ব বিদ্যমান।

এই উপলব্ধির সবচেয়ে উড়ুক্কু সুস্পষ্টতার দেখা মিলেছে জিরো ফর কনডাক্ট-এর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটিতে। ছাত্রদের ডর্মিটরির সেই মহাকাব্যিক, বালিশ নিয়ে মারামারি খেলার দৃশ্যটি হুট করেই রূপ নেয় একটি মেকি ধর্মীয়-শোভাযাত্রায়; ছবি চলতে থাকে স্লো-মোশনে, সাউন্ডট্র্যাকে উল্টোভাবে বাজতে থাকে মরিস জবার্টের অবিস্মরণীয় স্কোর, বালিশের তুলোগুলো তুষারের মতো উড়তে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে। এমনতর দৃশ্য নিয়ে জিরো ফর কনডাক্ট যে অনেকের বিরাগের কারণ হয়েছিল, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জ্যঁ ভিগোর এই প্রথম মাস্টারপিস ফিল্মটি ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত।

নানেজ তবু আস্থা রেখেছিলেন ভিগোর উপর; রেখেছিলেন আরেকটি ফিল্মে অর্থলগ্নির প্রস্তাব। অবশ্য, এ বেলা তিনি ম্যাটেরিয়াল বাছাইয়ের বিষয়টি ফিল্মমেকারের উপর ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন না। তার তরফ থেকে ভিগোকে যে সস্তা প্রেমকাহিনীটি দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে দিয়ে এই ফিল্মমেকার ভ্যাম্পায়ার [কার্ল থিয়েডোর ড্রেয়ার; ১৯৩২], মরোক্কো [জোসেফ ভন স্টেনবার্গ; ১৯৩০] ও অ্যা ডে ইন দ্য কান্ট্রির [জ্যঁ রেনোয়া; ১৯৩৬] সমমর্যাদার একটি ঝরঝরে ও টাস্কিমারা সৌন্দর্য সৃষ্টি করলেন সেই ‘৩০ দশকে, লা আতলান্তে শিরোনামে– যার দৃষ্টি এই বর্তমানে বিস্তৃত। ফ্রান্সের সেইন নদীতে কাজ করা একটি বজরার নাম ‘লা আতলান্তে’। এটির ক্যাপ্টেন [জ্যঁ দাস্তে অভিনীত] বিয়ে করে এক গ্রাম্য-বালিকাকে [দিতা পার্লো অভিনীত]। বিয়ের পর মেয়েটি বাস করতে চলে আসে বিড়াল-অধ্যুষিত এই বজরায়। কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ক্যাপ্টেনটি স্ত্রীকে প্যারিস দেখাতে নিয়ে যেতে রাজি না হলে মেয়েটি জোরাজুরি করে। এক পর্যায়ে সে ক্ষোভে ফেটে পড়লে, স্বামীটি তাকে ফেলে রেখেই চলে যায়; তবে কিছুদিন পর তারা উপলব্ধি করতে পারে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার গভীরতাকে। স্বামীটি কুঁড়েমিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, এবং তার সহকর্মী পেরে জুলস [মাইকেল সিমন অভিনীত] বেড়িয়ে পড়ে মেয়েটিকে খুঁজতে। শেষ পর্যন্ত এই দম্পতির আনন্দময় পুনর্মিলন ঘটে।

লা আতলান্তে
লা আতলান্তে

নিখুত সৌন্দর্যের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আত্মিক দর্শনের কিছুটা সহকারে ডকুমেন্টারির রাফনেস ইমেজের দৃঢ় ঝাঁকুনি ধারণ করা এই সিনেমাটি এমন এক আবেগপ্রবণ নৈপুণ্য-ভরা স্বতঃস্ফূর্ততার সৃষ্টি করেছে– যা ফিল্মটির প্রত্যেকটি বাস্তব পরিস্থিতি থেকে উদ্ভুত অবিরাম বিস্ময়কর ঘটনাবলির সঙ্গে আদর্শগতভাবে মানিয়ে গেছে। ফিল্মটিতে প্রভাব বিস্তার করেছে দুজন বিপরীতমুখী আইকনিক ব্যক্তিত্ব : একদিকে গোলমালবাজ, বাচাল, বাস্তববাদী, অনুগত পেরে জুলস– যে কিনা বাস্তব নাবিকের চেয়েও বেশি কিছু, যে কিনা সারা পৃথিবী ঘুরে এসেছে এবং সুভেনিয়রের একটি মনোমুগ্ধকর সংগ্রহশালা করেছে– যার মধ্যে একটি বয়ামে নিজের শ্রেষ্ঠ বন্ধুর হাতও জমিয়ে রেখেছে; অন্যদিকে, তরুণী বধু জুলিয়েতে। অবিস্মরণীয় প্রথম দৃশ্যে বজরাটি তাদের গ্রামকে পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছে, সে বসে আছে ডেকে, তার বিয়ের পোশাক পরাবাস্তবরূপে ফুটিয়ে তুলছে চারপাশকে। তার চেহারায় সন্দেহের একটি শীতল মুখোশ। এ বেলা রোমান্টিক প্রেমের ক্ষেত্রে সিনে-জগতের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও গীতিকাব্যিক প্রার্থনা সঙ্গীতে ভেসে যায় মেয়েটি; তবে এটি মুরন্যুর [এফ. ডব্লিউ. মুরন্যু : ১৮৮৮-১৯৩১; জার্মান ফিল্মমেকার] সানরাইজ : অ্যা সং অব টু হিউম্যানস [১৯২৭] কিংবা হ্যাথঅ্যাওয়ের পিটার ইবসেন-এর [১৯৩৫] মতো কোনো দম্পতির বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির উপর দাঁড়ায়নি– যারা কিনা অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে সবিশেষভাবে আদর্শবদ্ধ কিংবা আদর্শবাদী নয়, এমনটা যে কেউ বলতেই পারে। বিয়ের ফলে জুলিয়েতেকে নতুন একটি জীবনধারার উপযুক্ত করার ধাক্কাটিকে যেভাবে বাস্তবসম্মতভাবে বিকশিত করা হয়েছে এখানে, তেমনিভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রঙচঙা ট্রাভেলিং সেলসম্যানের প্রতি তার আকর্ষণে ক্যাপ্টেনটির ঈর্ষা ও হতাশাকেও। যখন তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে, শুধুমাত্র তখনই মেয়েটি একটি অলক্ষুনে শহুরে পরিবেশে বিমর্ষ হয়ে ওঠে, ক্যাপ্টেনটি ডুবে যায় নিজের হতাশার মধ্যে; আর তা পরস্পরের প্রতি তাদের আত্মিক ও যৌন অনুভূতিকে পলাতক করে– সবচেয়ে উল্লে­খযোগ্যভাবে, দুটি বিখ্যাত মুহূর্তের মধ্যে। প্রথমটিতে ক্যাপ্টেন আর তার স্ত্রী অনেক মাইল দূরের দুটি আলাদা বিছানায় শুয়েও নিজেদের এক হওয়াকে আলিঙ্গন করে। দ্বিতীয়টি ভিগোর সিনেমার একটি কাব্যিক শীর্ষবিন্দু, যেখানে ক্যাপ্টেনটি জেনে যায়, যে পুরুষ গভীর-জলদেশক ভালোবাসে, সে পেতে পারে নারীটির দেখা। নদীতে ঝাঁপ দেয় সে [তারির শুটিং থেকে গভীর জলদেশের ইমেজের অনুপ্রেরণা এসেছে] এবং কল্পনা করে, বিয়ের পোশাক পরে হাশিখুশি জুলিয়েতে ভেসে যাচ্ছে।

জঘণ্য ডিস্ট্রিবিউটররা লা আতলান্তেকে কেটে টুকরো টুকরো করেছিলেন; এবং জনপ্রিয় গানের সূত্র ধরে শিরোনাম দিয়েছিলেন লা চাল্যান্ড কুই পাসে। ফলশ্রুতিতে গানটিকে জুড়ে দিয়েছিলেন সাউন্ডট্র্যাকে। এই অনিষ্ট সম্পর্কে কিচ্ছু করার ছিল না ভিগোর। কেননা, এটির বাণিজ্যিকভাবে নিরানন্দ প্রথম মুক্তির কয়েকদিনের মধ্যে মারা যান তিনি।

যে কোনো ফিল্মি প্রথার বাইরে দাঁড়ানো ভিগো ছিলেন একজন রাজনৈতিক ও শৈল্পিক বিদ্রোহী– যিনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কিনারায় দারিদ্রের মধ্যে বসবাস ও কাজ করে গেছেন। তার ক্যারিয়ারের এমন সংক্ষিপ্ততা নিয়ে বিলাপ করার মধ্যেও এ কথা মনে রাখা উচিত, বেশিরভাগ ফিল্মমেকার যারা ভিগোর ফিল্মের চেয়ে পাঁচ, দশ কিংবা বারো গুণ সময় ধরে ফিল্ম বানিয়েছেন, তারা জিরো ফর কনডাক্ট কিংবা লা আতলান্তের মতো উত্তেজনাকর কিংবা অনন্য ফ্রেম কখনোই সৃষ্টি করতে পারেননি। তার ফিল্ম তখনকার টেকনোলজির কারণে রাফ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক মেজাজকে সুন্দর ও কখনো কখনো ঝামেলাপূর্ণ ডিটেইলে তার মেধার ভেতর দিয়ে হাজির করেছেন; এই দুর্লভ উপহারটিকে পৃথিবীর কোনো পরিপাটি প্রোডাকশন ভ্যালুর মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়, এবং তা অনুকরণের কথা ভাবাও যায় না!

এ সব কারণে, ১৯৫০ দশকের শেষদিকে ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ-এর গ্রেট ফিল্মমেকারেরা যে বৈপ্লবিক সর্বশ্রেষ্ঠতার প্রস্তাব রেখেছেন, তাতে যে ভিগো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন– সেটি যৌক্তিক। ক্লুদ শ্যাব্রলের লা বো সার্জ [১৯৫৮] ও জ্যঁ-লুক গোদারের ব্রেথলেস [১৯৫৯]– এই দুটি নিউ ওয়েভ ফিল্ম ব্যতিক্রমধর্মী প্রথম ফিল্ম হিসেবে ১৯৫১ সালে ক্লুদ অ্যাভেলিন প্রবর্তিত প্রিক্স জ্যঁ ভিগো অ্যাওয়ার্ড জয় করে নেয়। ‘নিউ ওয়েভ’-এর অল্পকাল পর আর যে দুজন ফিল্মমেকার ভিগোর দ্বারা গুরুত্বপূর্ণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, তাদের একজন হলেন বের্নার্দো বের্তোলুচ্চি– যিনি বিফোর দ্য রেভোল্যুশন [১৯৬৪] ও লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস-এ [১৯৭৩] লা আতলান্তে থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন। আর দ্বিতীয়জন লিন্ডসে এন্ডারসন; তার ইফ [১৯৬৮] ফিল্মটি জিরো ফর কনডাক্ট-এর থিম ও স্ট্রাকচারের একটি লুজ-অ্যাডাপটেশন।

তারি
তারি

১৯৯০ সালে লা আতলান্তে ফিল্মটির পূর্ণাঙ্গ রূপ পুনরুদ্ধার করা হয়, আর ১৯৯২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনের সৌজন্যে আন্তর্জাতিক সিনে-সমালোচকদের ভোটে সেরা দশ ফিল্মের তালিকায় পঞ্চম স্থান অর্জন করে এটি। সম্প্রতি আ প্রোপোজ দু নিস অনুসরণ করে আ প্রোপোজ দু নিস, লা সুইত [১৯৯৫] নামে নির্মিত শর্টফিল্মগুলো নির্দেশনা দেন সাতজন ফিল্মমেকার। এর মধ্যে ছিলেন রাউল রুইস, ক্যাথরিন ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি। আর ব্রিটিশ ফিল্মমেকার জুলিয়েন টেম্পল ইংরেজি ভাষায় নির্মাণ করেছেন ভিগোর সবচেয়ে সমালোচিত বায়োপিকটি; নাম– ভিগো : প্যাশন ফর লাইফ [১৯৯৮]।

সমকালীন ফরাসি ফিল্মমেকারদের মধ্যে লিওস ক্যারাক্স তার দ্য লাভারস অন দ্য ব্রিজ-এর [১৯৯১] শেষাংশে শিরোনামটিতে সিয়েন নদীতে এক বজরায় নিমজ্জিত বয়স্ক দম্পতির দেখা মেলে– যার ক্যাপ্টেন ও তার স্ত্রীকে দেখে লা আতলান্তের সেই দম্পতিটিই বুড়ো হয়ে গেছে বলে মনে হয়। এখানে তাদের মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করার মধ্য দিয়ে ভিগোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন লিওস। ভিগোর প্রতি তিনি আরেকটি শ্রদ্ধাঞ্জলি দেখিয়েছেন সমকালীন আরেক ফিল্মমেকারের কাজে। থমাস লেসকিউরের আন ক্যামেরা আ লা প্লেস দু কোয়ের [১৯৯২] গ্রন্থের মুখবন্ধে তিনি কোনো অক্ষর না লিখে বরং ভিগো ও তার স্ত্রী লাইদোর একটি ছবি ছেপে দেন। ক্যারাক্সের অভিমত অনুসারে বইটির বিষয়বস্তু ফিলিপ্পে গ্যারেল সম্ভবত আধুনিক ফরাসি সিনেমার ক্ষেত্রে ভিগোর বিদ্রোহী কবি আত্মার শুদ্ধতম প্রতিমূর্তি।

তবে সাম্প্রতিক সিনেমায় ভিগোর সবচেয়ে প্রাণবন্ত আহবানের দেখা সম্ভবত মেলে গোদারের ইন প্রেইজ অব লাভ-এ [২০০১]। এখানে ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণার বিষণ্ন আবিষ্কার ঘটে সেইন নদীর পাশে সাদাকালোতে ছায়ার মতো কালো এক হতভাগ্য দম্পতির দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে। লোকটি বর্ণনা করে, কীভাবে একটি ল্যান্ডস্কেপ কারও কাছে ‘নতুন’ হয়ে উঠতে পারে– যদি সে তার আগে দেখা ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে মনে মনে সেটিকে তুলনা করতে পারে। তার বর্ণনার সূত্র ধরে, লা আতলান্তে-এ ব্যবহৃত মরিস জবার্টের থিমটি সাউন্ডট্র্যাকে ব্যবহৃত হয়। এই আইডিয়াটির উপর এটি একটি অসাধারণ আক্ষরিকায়ন; গোদারের নতুন সিনেমাটিক ‘ল্যান্ডস্কেপের’ বিষণ্নতার এই সুপার-ইমপোজিংটি ভিগোর আনন্দময় ‘ইন প্রেইজ অব লাভ’, ‘লা আতলান্তে’, একটি ‘ল্যান্ডস্কেপের’ সতৃষ্ণ স্মৃতিচারণ– যার অভিজ্ঞতা আমরা আগেই পেয়েছি। স্মৃতির গুরুত্ব নিয়ে একটি ফিল্মের মধ্যে এটি সেই হতাশার স্রেফ প্রতিতুলনার চেয়েও বেশি কিছু– যেটি [হতাশা] ভিগোর প্রেমিক-জুটির চরম আনন্দের সহকারে এই দম্পতিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এটি ফিল্ম ইতিহাসের একটি বিশেষ মুহূর্তের স্মৃতিচারণও বটে। এই মুহূর্তটি ফিল্মের ইতিহাসে আর কখনোই পুনরাবৃত্ত হবে না।



জ্যঁ ভিগোজ্যঁ ভিগোর ফিল্মোগ্রাফি

১৯৩০ • আ প্রোপোজ দু নিস [À propos de Nice]
১৯৩১ • জ্যঁ তারি, সুইমিং চ্যাম্পিয়ন [Taris, roi de l'eau]
১৯৩৩ • জিরো ফর কনডাক্ট [Zéro de conduite]
১৯৩৪ • লা'আতলান্তে [L'Atalante]


ম্যাক্সিমিলিয়ান লা কেইন
জন্ম • ১৯৭৮ । আইরিশ ফিল্মমেকার, সিনে-সমালোচক

সূত্র • সেন্সেস অব সিনেমা । ফিল্ম জার্নাল, অস্ট্রেলিয়া। ১৯ জুলাই ২০০২

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here