নিউজিল্যান্ডের সমকালীন সিনেমা । প্রথম পাঠ

0
168
হেভেনলি ক্রিয়েচারস

মূল • ইয়ান কনরিচ স্টুয়ার্ট মারি অনুবাদ • রুদ্র আরিফ


য়া গ্লোবাল ফিল্ম মার্কেটে সমকালীন ন্যাশনাল সিনেমা হিসেবে প্রতিযোগিতা করার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সিনেমার উত্থান খুব দ্রুত ঘটছে। ১৯৯০ দশকের প্রথম পর্যায় থেকে কাল্ট-হরর ধারার ব্রেনডেড [পিটার জ্যাকসন; ১৯৯২], স্যোসাল ড্রামা ধারার ওয়ানস ওয়্যার ওয়ারিয়রস [লি ট্যামাহোরি; ১৯৯৪] ও হেভেনলি ক্রিয়েচারস [পিটার জ্যাকসন; ১৯৯৪], ফ্যামিলি ধারার হোয়েল রাইডার [নিকি ক্যারো; ২০০২] ও দ্য ওয়ার্ল্ড’স ফাস্টেস্ট ইন্ডিয়ান [রজার ডোনাল্ডসন; ২০০৫] এবং কমেডি ধারার সিয়ন’স ওয়েডিংয়ের [ক্রিস গ্রাহাম; ২০০৬] মতো বোদ্ধামহলে প্রশংসিত ও বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করা বেশ কিছু সিনেমা নির্মাণ করেছে নিউজিল্যান্ড। দ্য পিয়ানো [জেন ক্যাম্পিয়ন; ১৯৯৩], দ্য লর্ড অব দ্য রিংস ট্রিলোজি [পিটার জ্যাকসন; ২০০১-০৩] ও কিং কং-এর [পিটার জ্যাকসন; ২০০৫] মতো বহুবিধ পুরষ্কারজয়ী সিনেমাগুলোর প্রোডাকশনে একটি মুখ্য উপাদান হিসেবে, এবং দ্য লাস্ট সামুরাই [এডওয়ার্ড জিক; ২০০৩] ও দ্য ক্রনিকেলস অব নারনিয়া : দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ড্রব-এর [অ্যান্ড্রু অ্যাডামসন; ২০০৫] মতো সিনেমা প্রোডাকশনগুলোকে সহজতর করে দেওয়ার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশটির ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

নিউজিল্যান্ডের সমকালীন ফিল্ম প্রোডাকশনের পদচিহ্ন যে ১৯৯০ দশকের প্রথম পর্যায়েই সৃষ্টি হয়েছে, এমন দাবী করা যাবে না। বস্তুতপক্ষে, সমকালীন নিউজিল্যান্ডার সিনেমার এই পিরিয়ডটির পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৭০ দশকের মধ্য পর্যায়ে; একটি ফিল্মি নবজন্মের প্রথম লক্ষণ সে সময়েই টের পাওয়া যায়। এর পরের দশকে দেশটির বেশ কিছু সিনেমা বিদেশে বেশ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সুনাম অর্জন করতে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রাইম ড্রামা ধারার বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট [জন লেইং; ১৯৮০], অ্যানার্কিক রোড মুভি ধারার গুডবাই পর্ক পাই [জিওফ মার্ফি; ১৯৮০; এটি যুক্তরাজ্যে ব্যাপক পরিসরে মুক্তি পাওয়া নিউজিল্যান্ডের প্রথম সিনেমা], মেলোড্রামা ধারার স্ম্যাশ প্যালেস [রজার ডোনাল্ডসন; ১৯৮১], উটু [জিওফ মার্ফি; ১৯৮৩; উনবিংশ শতকের মাওরি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব ওয়েস্টার্ন ধারার এ সিনেমাটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনে-সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল] ও ভিজিল [ভিনসেন্ট ওয়ার্ড; ১৯৮৪; এটি মর্যাদাপূর্ণ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রতিযোগিতা বিভাগের জন্য মনোনীত নিউজিল্যান্ডের প্রথম সিনেমা]। তাছাড়া, নিউজিল্যান্ডের সমকালীন সিনেমাগুলো [যার বেশিরভাগই বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত] আর্ট-হাউস সিনেমার অমসৃণ বিন্যাসের চেয়ে বরং প্রচলিত ধারার সাফল্য, ও একগুচ্ছ ব্লকবাস্টার আর এপিক প্রোডাকশনের উপাদানকে ধারণ করে আছে।

হোয়েল রাইডার
হোয়েল রাইডার

১৯৭৭ সালের পর থেকে ২০০০ দশকের মধ্য পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ২৬০টি সিনেমা নির্মিত হয়েছে দেশটিতে। এগুলোর বেশিরভাগই বিদেশের সিনেমা-হলগুলোতে বেশ সাফল্য পেয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। বিদেশি ক্যাবল চ্যানেলগুলোতে এবং ভিডিও ফরমেটে প্রায়ই হাজির থেকেছে এই সিনেমাগুলো।

১৯৭৭ সালটিকে সমকালীন নিউজিল্যান্ডার সিনেমার সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ বছরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ফিল্ম-কমিশন প্রতিষ্ঠার কারণে, পরে যেটির নামকরণ করা হয়– নিউজিল্যান্ড ফিল্ম কমিশন [সংক্ষেপে– এনজেডএফসি]। স্থানীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিকাশে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, আরও একটি কারণে ১৯৭৭ সালটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ বছরই মুক্তি পাওয়া দুটি ফিল্ম– ওয়াইল্ড ম্যান স্লিপিং ডগস নিউজিল্যান্ডে ফিল্ম প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতার বিষয়টিকে সবিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হিসেবে বড় করে তোলে। কমেডি ফিল্ম ওয়াইল্ড ম্যান নির্মাণ করেন জিওফ মার্ফি; আর ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সি. কে. স্টিডের লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস স্মিথ’স ড্রিম অবলম্বনে স্লিপিং ডগস ফিল্মটি নির্মাণ করেন রজার ডোনাল্ডসন। ওয়াইল্ড ম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেন ব্রুনো লরেন্স; অন্যদিকে স্মিথের চরিত্রে ছিলেন স্যাম নেইল। এই ফিল্ম দুটি ছিল মার্ফি, ডোনাল্ডসন, লরেন্স ও নেইলের জন্য ফিচার ফিল্মে অভিষেক; এই চার ফিল্মমেকারই সমকালীন নিউজিল্যান্ডার সিনেমার বিকাশের প্রথম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

স্লিপিং ডগস
স্লিপিং ডগস

বস্তুত পক্ষে, ১৯৭০ সালে যখন নিউজিল্যান্ড আর্টস কাউন্সিল দ্য রোল অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন স্টাবলিশিং অ্যা নেশন’স আইডেনটিটি শিরোনামের একটি সিম্পোজিয়াম স্পন্সর করে, তখনই নিউজিল্যান্ড ফিল্ম কমিশন প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু হয়। একই বছরে দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন [পরবর্তী নাম, দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম কমিশন] প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং লোকাল ফিল্ম প্রোডাকশনে একটি নতুন প্রবাহ এনে দিতে ভূমিকা রাখে এটির কারিগরি সহায়তা। ১৯৬০ দশকের শেষের দিকে, অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ে; যদিও নিউজিল্যান্ডের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ান সিনেমা বরাবরই ছিল যথেষ্ট শক্তিমান। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালের আগে, ত্রিশ বছরে মাত্র পাঁচটি ফিচার ফিল্ম নির্মিত হয়েছিল নিউজিল্যান্ডে; এ সময়ে কাজ করা ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকারদের মধ্যে জন ও’সেরা ও রুডাল হেওয়ার্ডের নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০ দশকের মধ্যভাগে, নিউ অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মডেল নিয়ে কাজ করার সময়, নিউজিল্যান্ডের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা জিম বুথ প্রোপোজাল টু স্টাবলিশ অ্যা নিউজিল্যান্ড ফিল্ম প্রোডাকশন কমিশন নামে একটি ডকুমেন্ট লিখেন; আর সেটিই এনজেডএফসি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

১৯৭০ সালের মধ্যভাগে নিউজিল্যান্ডের ফিল্মের পুনরুত্থান ঘটে দ্য ন্যাশনাল ফিল্ম উইনিট [এনএফইউ], প্যাসিফিক ফিল্মস, দ্য অ্যাকমি সসেজ কোম্পানি/ব্লের্টা গ্রুপ অব আর্টিস্ট, পারফরমারস, অ্যান্ড প্র্যাকটিশনারস এবং অল্টারনেটিভ সিনেমা গ্রুপ অব ফিল্মমেকারস— কালচারাল প্রোডাকশনের এই চারটি প্রতিভু প্রান্তের সমন্বয়ে। পঞ্চম উপাদান হিসেবে জড়ো হয় প্রডিউসার হাউস আর্ডভার্ক ফিল্মস; যদিও ফিচার ফিল্মমেকিংয়ে এটির অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ১৯৪০ সালে স্কটল্যান্ডের ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার জন গ্রায়ারসন নিউজিল্যান্ড সফরে আসার পর, তার পরামর্শে পরের বছর প্রতিষ্ঠিত এনএফইউ প্রডিউস করত ডকুমেন্টারি, নিউজরিল ও সরকারি প্রোপাগান্ডা ফিল্ম। ১৯৪৮ সালে রজার মিরামস ও অ্যালুন ফ্যালকোনার প্রতিষ্ঠিত প্যাসিফিক ফিল্মস নিউজিল্যান্ডে হয়ে ওঠে, এনএফইউর পর দ্বিতীয় ফিল্ম প্রোডাকশন হাউস। এনএফইউর তুলনায় এই হাউসের কাজ ছিল অধিকতর শৈল্পিক; জন ও’সেরা নির্মিত ব্রোকেন ব্যারিয়ার [১৯৫২], রানঅ্যাওয়ে [১৯৬৪] ও ডোন্ট লেট ইট গেট ইউর [১৯৬৬] মতো বাণিজ্যিক ফিচার ফিল্ম থেকে শুরু করে নানাবিধ ডকুমেন্টারি, করপোরেট কিংবা ইন্ডাস্ট্রি স্পন্সরকৃত ইনস্ট্রাকশনাল ফিল্ম, স্পোর্টস আইটেম কাভারেজসহ আরও বহু ধরনের কাজ করত এটি। এর মধ্যে ব্যারি বারক্লে পরিচালিত ছয় পর্বের টেলিভিশন সিরিজ ট্যাঙ্গাটা হোয়েনুয়াও [১৯৭৪] প্রডিউস করে হাউসটি।

বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট
বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট

১৯৮৭ সালে বারক্লে নির্মাণ করেন তার প্রথম ফিচার ফিল্ম গ্যাটি; বলা বাহুল্য, ‘দেশি’ ফিল্মমেকারের বানানো প্রথম ফিকশন ফিচার ফিল্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এটি। অবশ্য, এর মাত্র দু’বছর আগে প্যাসিফিক ফিল্মস হাউসের ফিল্মমেকার গেলিন প্রিস্টন নির্মাণ করেন তার প্রথম ফিচার ফিল্ম মি. রং; আর এটিই নিউজিল্যান্ডের কোনো নারী ফিল্মমেকারের বানানো প্রথম সিনেমা হিসেবে পরিচিত। পল মান্ডার [ল্যান্ডফল; ১৯৭৫], জন লেইং [বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট; ১৯৮০] ও স্যাম পিলসবুরির [দ্য স্কেয়ারক্রো; ১৯৮২] সঙ্গে প্রিস্টন এনএফইউতে বেশ দাপটের সঙ্গে কাজ করতেন। আর তারা ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ দশকে নিজেদের প্রথম ফিচার ফিল্মটি বানিয়ে ফেলার পর ফিল্মমেকার হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন।

১৯৭০ দশকের মধ্যভাগ থেকে বেশ কিছু সিনেমার [বিশেষ করে, ১৯৯০ দশকের পর থেকে নির্মিত সিনেমাগুলোর] সাফল্য সত্ত্বেও, এই জাতিটির দিকে যদি বারবার ফিরে ফিরে তাকান, তবে দেখতে পাবেন, নিউজিল্যান্ডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখনো সিনেমা-বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে গোপন বা অনাবিষ্কৃত একটি অধ্যায় হয়ে রয়েছে।


গ্রন্থসূত্র • কনটেম্পোরারি নিউজিল্যান্ড সিনেমা : ফ্রম নিউ ওয়েভ টু ব্লকবাস্টার/ ইয়ান কনরিচ ও স্টুয়ার্ট মারি
আই.বি. টারিস অ্যান্ড কোং লিমিটেড । লন্ডন-নিউইয়র্ক । ২০০৮
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন