সাক্ষাৎকারে আফ্রিকান সিনেমার জনক উসমান সেমবেন । উপনিবেশবাদ টিকে থাকে বুর্জোয়াদের দালালির কারণে

0
384

সাক্ষাৎকার গ্রহণ নুরদ্দিন গলি  ভূমিকা ও তর্জমা বিধান রিবেরু


ভূ মি কা

সমান সেমবেনকে [১৯২৩-২০০৭] বলা হয় আধুনিক আফ্রিকার সিনেমার জনক। এতবড় উপাধি দিয়েও তাঁর গোটা কাজকে ধরা অসম্ভব। তিনি উপন্যাস রচনা করেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার– তিনি সারাজীবন গণমানুষের রাজনীতিতে আস্থা রেখেছেন। সেমবেন সকল কাজ দিয়েই বলা যায় রাজনৈতিক লড়াই করেছেন– শ্রমিক সংগঠন করার সময়, আবার শিল্প সৃষ্টির সময়েও তিনি নিজের রাজনৈতিক ভাবাদর্শ থেকে সরে যাননি। কারণ শিল্পকে রাজনীতির হাতিয়ার বলেই মনে করতেন তিনি, নয়তো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গণমানুষের কাছে পৌঁছানোর চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসত না। মহাত্মা সেমবেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালের পয়লা জানুয়ারি, সেনেগালের জিগুয়িনেচর গ্রামে এক জেলে পরিবারে। তাঁর কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে ২০০৭ সালের ১০ জুন, তখন সেমবেনের বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে ওঠা মানুষটির একটি সাক্ষাৎকার নিচে দেওয়া হলো। নুরদ্দিন গলির নেয়া সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশ হয় সিনেমা ৭৬ পত্রিকায়, ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে। পরে ডি এইচ ডাউনিংয়ের করা ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ হয় ডাউনিংয়েরই সম্পাদিত ফিল্ম অ্যান্ড পলিটিকস ইন দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড [নিউইয়র্ক: প্রেইজার, ১৯৮৭] বইতে। বাংলায় ভাষান্তরের জন্য সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে আনেত বুশ ও ম্যাক্স আনাস সম্পাদিত উসমান সেমবেন : ইন্টারভিউজ [যুক্তরাষ্ট্র : ইউনির্ভাসিটি প্রেস অব মিসিসিপি, ২০০৮] বই থেকে। সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ইন্টারভিউ উইথ উসমান সেমবেন, তবে এখানে শিরোনামটি পরিবর্তন করা হয়েছে।

সা ক্ষা ৎ কা র

এমিতাই
এমিতাই

Θ এমিতাই [Emitaï] ছবিতে যে গ্রাম দেখা যায় সেটির অস্তিত্ব কি আসলেই আছে?

 উসমান সেমবেন 
ওটা সেনেগালের একটি গ্রাম ছিল, ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনী পুরো গ্রামটাই ধ্বংস করে দিয়েছিল, তারপরও কিন্তু গ্রামটা টিকে আছে। ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন রাখার মতোই আমরা এসব গ্রাম আমাদের চলচ্চিত্রে রেখেছি। ১৯৪২ সালে আমি আরো তরুণ ছিলাম, তখনো সেনাবাহিনীতে যোগ দেইনি, দায়োলা [Diola] গণহত্যা ঘটল সেসময়। পরে যখন চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করি, ইতিহাসের অনেক কিছু নজরে আসতে থাকে, প্রাত্যহিক জীবনের লড়াইটা লক্ষ্য করি, আমি ভাবি সমসাময়িক কিছুর উপর ভিত্তি করে কিছু একটা শুরু করা দরকার।

এটা ঠিক, মানুষ সবসময় মহান আফ্রিকার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিয়ে কথা বলে; কিন্তু প্রায় লোকেই জানে না আসলে এই যোদ্ধারা দেখতে কেমন, নির্দিষ্ট কয়টি দেশ বা কয়টি গোষ্ঠী [tribe] এই প্রতিরোধে অংশ নিয়েছিল। স্বাধীনতার আন্দোলন কিন্তু এমনি এমনি তৈরি হয়ে যায়নি; এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এর জন্ম হয়েছিল। যদি এই আন্দোলন তথাকথিত ‘নেগ্রিচিউড’ ভাবাদর্শ থেকে জন্ম নিয়ে থাকে, তাহলে আমি বলব, আমি এ ব্যাপারে অজ্ঞ; কারণ, আমি তখন আমার লোকজনদের সঙ্গেই বসবাস করছিলাম, ওদের মতো পরিস্থিতিতেই।

আমি বহুবার দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, নেগ্রিচিউড আন্দোলন যদি কিছু জন্ম দিয়ে থাকে, তো সেটা কেবল সংখ্যালঘুর কর্মকাণ্ডই; কিন্তু দেখুন, এর আগেই মানুষ মুক্ত হওয়ার লড়াই শুরু করে দিয়েছিল। এমিতাই-এর গল্পটা সেরকমই, গিনি-বিসাউয়ের পাশে দায়োলা গ্রামকে ভিত্তি করে। একই গোষ্ঠী সেনেগালের দক্ষিণে ও গিনি-বিসাউয়ের পশ্চিমে বাস করে। যখন এই ছবির শুটিং হচ্ছে, তখন গিনি-বিসাউ থেকেও লোকজন [এক্সট্রা] এসেছিল, সে সময়ের যোদ্ধা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা গ্রামবাসীরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছিল।

কাসামাসেঁ [সেনেগালের দক্ষিণে একটি অঞ্চল] যখন ফিল্মটির প্রিমিয়ার হয়, তখন প্রেসিডেন্ট কাব্রাল [গিনি বিসাউয়ের প্রথম প্রেসিডেন্ট লুই কাব্রাল] কয়েকজন যোদ্ধাসহ এসেছিলেন ছবিটি দেখতে; সবাই যখন চলে যাচ্ছিলেন, তারা সবাই তখন আমাদের এসে বললেন, এই ছবি তাদের জন্যও বানানো হয়েছে, শুধু একক গোষ্ঠীর জন্য নয়, কারণ এই লড়াইটা তারাও করেছেন।

আমি এটা বললাম, কারণ, ইউরোপের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী আছেন, তাঁরা যখন আফ্রিকার স্বাধীনতা নিয়ে ভাবেন, তখন আফ্রিকার ভেতরের প্রতিরোধের বিষয়টি উপেক্ষা করেন। নয়া উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এসব বিচ্ছিন্ন ও ছোট ছোট সংঘাতগুলোকে সংগঠিত করা অসম্ভব নয়।

Θ হালা  [Xala] ছবিতে আমিলকার কাব্রালের [গিনি বিসাউয়ের লেখক, জাতীয় চিন্তক ও উপনিবেশবাদ বিরোধী রাজনীতিবিদ] স্থিরচিত্র দেখা যায়, আলহাজ আবদু কাদেরের মেয়ের শোয়ার ঘরে।

 উসমান সেমবেন  
হ্যাঁ, এমিতাই ছবিতে সংগ্রামটা ছিল উপনিবেশবিরোধী। কিন্তু সেখানে শ্রেণি-সংগ্রাম উপস্থিত ছিল না। হালা হলো এক ধরনের রূপক, অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে, একটি রূপকথা। এই ছবি বুঝের নানা মাত্রায় কাজ করে আমার জনগণের কাছাকাছি পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে। এমিতাইহালার মধ্যে আমরা দু’ধরনের সংগ্রাম দেখতে পাই : প্রথমটিতে সশস্ত্র সংগ্রাম উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে, এরপর, হালা ছবিতে দেখি আফ্রিকায় শ্রেণি-সংগ্রামের সূচনা।

হালা
হালা

Θ হালাতে শ্রেণি-সংগ্রামের তো অনেকগুলো চেহারা দেখা যায়। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো ভাষার ভূমিকা : নিম্নবিত্ত শ্রেণির মুখের ভাষা হলো উলোফ আর ফরাসি ভাষা ব্যবহার করেন আলহাজ ও তাঁর মতো যারা উঁচু শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা।

 উসমান সেমবেন 
আমার মনে হয়, এখনো আমাদের অনেক শাসকদের মধ্যে এই সঙ্কট আছে। আমি হয়তো একটু উপদেশ দেয়ার মতো করেই কথা বলছি, আমাকে মাফ করবেন, আমার কাজকে ব্যাখ্যা করছি– যেহেতু আমি চেয়েছি আমার ছবিটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অবদান রাখুক, সেজন্য। সাহারার দক্ষিণে ফরাসি ভাষা চালু আছে– এমন দেশগুলোতে অনেক বুর্জোয়ারই কর্মক্ষেত্রের ভাষা ফরাসি। তারা শুদ্ধ পশ্চিম ও পশ্চিমা বুর্জোয়া সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে। অথচ খোদ পশ্চিমে বুর্জোয়া মূল্যবোধকে অস্বীকার করার ঝোঁক দেখা যায়। কিন্তু আফ্রিকার বুর্জোয়ারা কথায় কথায় টেনে আনেন পশ্চিমা প্রসঙ্গ। ডাকার, আবিদজান, লিবখভিল অথবা ইয়াউন্দ– এগুলো স্রেফ ফরাসি প্রদেশের রাজধানী। এসব জায়গা হচ্ছে নয়া উপনিবেশবাদের প্রান্তিক সীমানা, সেখান থেকেই বিপদের উৎপত্তি। এসব জায়গার লোকেরাই যখন সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হন, তখন দেখা যায় তারা দেশের জাতীয় ভাষাটাই জানেন না, তারা এক ধরনের বিচ্ছিন্নই বলা যান, ভেতরে ভেতরে তারা পরাধীন বা কলোনাইজড। তারাই কিন্তু বুলি আওড়ান– মানুষের মনকে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে; আসলে অন্যদের নয়, তাদের নিজের মানসিকতারই মুক্তি দরকার।

যেমন ধরা যাক, আলহাজ, বিপ্লবের উত্থানের সময় তিনি যখন নিজের ভাষায় বিতর্ক করার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাকে বলা হয়– ফরাসি হলো কেজো বা অফিশিয়াল ভাষা, তিনি সেটা তখন মেনেও নেন। অন্যদিকে তাঁরই মেয়ে, ঠিক বা ভুল যেমন করেই হোক, নিজের মধ্যে একটা সমন্বয় সাধন করে এবং নিজের ভাব প্রকাশে নিজের ভাষাকেই ব্যবহার করে। মেয়েটির ঘরে কাব্রালের মতো বীরের ছবি আছে, হয়তো সেই ছবিটা শুধু ফ্যাশনের জন্যই সে টাঙিয়েছিল, তারপরও কাব্রালদের সঙ্গে এই মেয়ের সংহতিবোধ তো ছিল।

জাতীয় ভাষায় নিজেকে প্রকাশের জন্য জনগণের কাছে একটিই ভাষা : উলোফ ভাষা। কিন্তু আমাদের আফ্রিকার বুর্জোয়াদের আর কোনো লক্ষ্য নেই– পশ্চিমা বুর্জোয়াদের নকল করা ছাড়া। আপনি এটা খুঁজে পাবেন স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে, তাদের আদবকেতায়, তাদের কথাবার্তায়– গরিব কৃষকদের সঙ্গেও তারা ফরাসিতে কথা বলে। শতকরা আশিভাগ নিরক্ষর জনগণের দেশে যেখানে কথা বলা উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষায়, সেখানে বুর্জোয়ারা এমন ভাষায় কথা বলে যা এই আশিভাগের মাথার উপর দিয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, যখন এই বুর্জোয়ারা এসব নিদারুণ ভুল করে, তখন পুরো জনগোষ্ঠীকেই নিজেদের পেছনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নগর উন্নয়ন ও এর স্থাপত্য কাঠামোর সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না, মানিয়েও নিতে পারছে না। এই বুর্জোয়ারা কেবল ইউরোপিয় স্থপতিদের দ্বারস্থ হন, এরাও ইউরোপিয় মডেল দিয়ে কাঠামো দাঁড় করাচ্ছেন আফ্রিকায়– এখানকার জীবনধারা, পরিবারের ধরন, আফ্রিকার সভ্যতা– এসব বিবেচনা না করেই। ইউরোপিয় মডেলের বাড়িগুলো দেখবেন নকশা করা হয়েছে একক দম্পতির জন্য, অথচ আফ্রিকার সমাজে বসতবাড়িগুলো দেখবেন অনেক ছড়ানো, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা থাকে। তারা আমাদের জন্য এমন বাড়ি বানায়, যেন আমাদের পরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র কিনতে হয়…।

এই হালা চলচ্চিত্রেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রসহ আরো ছোটখাট যেসব জিনিস চিহ্ন আকারে রয়েছে, আমরা জানি এসব ব্যক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আর এখানকার সব ব্যবসায়ী হলো ঠিকাদার। অর্থনৈতিকভাবে, তাদের নিজের বড় শিল্প গড়ে তোলার মুরদ নেই, আর সেটা তারা পারবেও না; কারণ আমরা এরইমধ্যে শিল্পায়নের সূচনাকাল পেরিয়ে এসেছি। আমরা এখন বাস করি একচেটিয়া ব্যবসা, অছিব্যবস্থা [ট্রাস্ট] ও বহুজাতিক সংস্থার যুগে।

Θ মূল চরিত্রের [আলহাজ] কাজ মনে হয় খুব সতর্কভাবে বাছাই করা হয়েছে : উনি শুধু মধ্যস্থতাকারী, বাম হাতে গ্রহণ করে ডান হাতে প্রদান করেন…।

 উসমান সেমবেন 
তিনি ভোগ্যপণ্য পান আর সেটা স্রেফ পরিবেশন করেন। তিনি একজন ঠিকাদার মাত্র। এই লোক নিজে কোনো কিছু কেনেন না, কোনো কিছু আমদানি করেন না, ব্যাংককেও ঋণ দেন না তিনি। এই লোক শুধু ভর্তুকি পান, এই ভর্তুকি আসে জনগণের কাছ থেকেই। আমাদের জন্য এটা দেখানো জরুরি ছিল– যখন এই ধরনের লোক সবকিছুতে বিরক্ত– তখন তারা ফিরে আসে, জনগণকে পুনর্বার আবিষ্কারের জন্য। যখন তারা সমাজের উচ্চ স্তরে আসীন, তখন তারা বলে ভিক্ষাবৃত্তি চলুক, কারণ ভিক্ষুকরা হলো জঞ্জাল। আবার এই উঁচু স্তরের মানুষেরাই যখন শ্রেণিচ্যুত হয়, তখন তারা ‘বিপ্লবী’ বনে যায়। এই বিষয়টি প্রতীকী, আবার একইসাথে সত্যও। একই জিনিস আপনি আফ্রিকা, এমনকি এশিয়ার দেশগুলোতেও খুঁজে পাবেন। যখনই কোনো অগ্রণী বুর্জোয়া নিজের ধরনের জন্য পতিত হন, তখন তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে যান এবং একভাবে নিজের অতীতকে বিশোধন করার চেষ্টা করেন…।

গেল জানুয়ারিতে [১৯৭৬] ভারতের বোম্বে উৎসবে হালা চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়, সেখানে ভারতীয়রা আমাকে বলেছেন, ছবির বিষয়বস্তু নাকি ভারতের সমাজের জন্যও প্রযোজ্য। তাদেরও ভিক্ষুক ও বুর্জোয়া আছে এমন, আর এজন্যই সেনেগাল থেকে নিজেদের দোরগাড়ায় এমন একটি ছবি আনতে হয়েছে, যেখানে অনেক অভিন্ন জিনিস রয়েছে।

দরিদ্র কৃষকের অর্থ যে পকেটমার চুরি করে, সে আসলে প্রতীকী অর্থে ওই লোকটাই, যে পরে ব্যবসায়ী হয়, এবং আচমকা নিজেকে আবিষ্কার করে সমাজের উঁচু আসনে। একটা গরিব মানুষ বড়লোক হয়ে গেল। যদিও এখানে বহু অসঙ্গতি রয়েছে, তারপরও আমাদের সমাজের উন্নয়নের দিকে যদি তাকাই, দেখব এমনটাই ঘটে। হাঙ্গর মাছের মতো কিছু মানুষ আছে, তারা সবসময় মৃতের শরীরের উপরই জীবন ধারণ করে। আমরা তাদের ডাকতে পারি– দ্রোণকাক… সমস্যাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এই সমস্যা কি করে ক্রিয়াশীল, সেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আপনি শুধু জনগণকে সূত্রগুলো ধরিয়ে দিতে পারবেন, বিশেষ করে যারা চলচ্চিত্র দেখতে যান। আর হালা চলচ্চিত্রটি, কর্তিত হওয়া সত্ত্বেও, সেনেগালে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

হালা
হালা

Θ সম্ভবত দশটি জায়গায় কর্তন করা হয়েছিল। নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলছি– ফ্রান্সে যে সংস্করণটি পাঠানো হয়, সেটি তো অকর্তিত ছিল। আপনি কি বাদ দেওয়া দৃশ্যগুলো সম্পর্কে কিছু বলবেন? আপনি কি এর কারণ জানতেন?

 উসমান সেমবেন 
আমি জানি না। কারণ, এই সমস্যা আসলে সেন্সরশিপে আবদ্ধ ছিল না। সেটাই তদন্ত করা দরকার। ছবির শুরুতে [অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের রানি] মারি আঁতোয়ানেতের আবক্ষমূর্তি সরিয়ে ফেলার দৃশ্য আছে। আমি বুঝি না, এই দৃশ্য কি করে কারো অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে। কিন্তু এই দৃশ্য কর্তন করা হলো– ঐ যে একই গুরুত্বপূর্ণ কারণ– ফরাসি ভাইবেরাদরদের মনে দুঃখ দেয়া যাবে না!

ছবিতে আরো একটা দৃশ্য আছে, যেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্রিফকেস খুলছে আর ব্যাংক বিল বার করছে। এটাও অনেককে আহত করেছে। চ্যাম্বার অব কমার্সের সামনে পুলিশ প্রধান ও একজন ইউরোপিয়র একটি দৃশ্য ছিল, সেটিও কাটা গেছে। এগুলো হতেই পারে; আপনি জানেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন শেতাঙ্গ সেনেগলি, তিনি ফরাসি ছিলেন, এখন তিনি সেনেগালেই থিতু হয়েছেন।

কর্তনের কারণ আমি জিজ্ঞেস করিনি, আমি আত্মপক্ষ সমর্থনও করতে যাইনি। আমি জানি, যারা আমার মুখোমুখি রয়েছেন, তারা কর্তনের হাতিয়ার ব্যবহার করবেন আমার মুখ বন্ধ করার জন্য। ওরা ওই দৃশ্যটাও কেটে দিয়েছে– যেখানে ভিক্ষুকরা আলহাজের স্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনে বলছে, কারাগারে বন্দীরা শ্রমিক ও কৃষকদের চেয়ে সুখি; কারণ তারা খাবার পায়, যেমনই হোক– মাথার উপর ছাদ আছে, এমনকি প্রয়োজনে চিকিৎসাও পায়।

দশ জায়গায় কর্তনের পরও ছবিটি সেনেগালে চলেছে এবং মানুষ সেটা দেখতে গিয়েছে, বাদ দেওয়া জায়গাগুলো নিজেরাই পূরণ করে নিয়েছে। আমি ফ্লাইয়ার ছাপিয়ে বিলিয়েছিলাম। সেখানে বাদ পড়া দৃশ্যগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত ছিল, কাজেই মানুষ কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছেন বাদ যাওয়া দৃশ্যগুলো সম্পর্কে।

Θ ইউজিসি [ফ্রান্সের সিনেমা অপারেটর ইয়ুনিয়োঁ জেনেখাল সিনেমাতোগ্রাফিক] তো সেনেগালে চলচ্চিত্র পাওয়ার জন্য চুক্তি করেছে। হালার অবস্থান কি এর থেকে বিপরীত নয়?

 উসমান সেমবেন 
পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করেই ইউজিসির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, গত দুই বছর আগে আমরা পাঁচটি কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেছি, যেগুলো পরিবেশনের দায়িত্ব ছিল ইউজিসির। ইউজিসি হালাকে দেখেছে একটি পরীক্ষামূলক ঘটনা হিসেবে। যদি ছবি ভালো করে, তাহলে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। আর ছবি না চললে, এটি স্বল্প পরিসরে শুধু সেনেগলি ছবি পরিবেশন করে যাবে। সম্প্রতি আমরা ইউজিসির সঙ্গে চুক্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছি জোরালোভাবে, সেনেগলি চলচ্চিত্র দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। কমবেশি যাই হোক, আমরা সহযোগিতামূলক তহবিল পেয়েছি আর এখানে অর্থ আসবে– সেনেগালে ছবি পরিবেশনের জন্য ইউজিসি যে কর দেবে, সেখান থেকে। এখন শুধু আইন পাশ হওয়ার জন্য অপেক্ষা। সেটাও দ্রুত হয়ে যাবে বা করে ফেলা যায়। কিন্তু আবার ওই একই ব্যাপার, ইউজিসির সঙ্গে সমস্যা।

Θ কিন্তু এই সহযোগিতামূলক তহবিল কি সেনেগলি সিনেমার সব সমস্যা দূর করতে পারবে কিংবা আংশিক সমস্যা?

 উসমান সেমবেন 
আমাদের কোনো মোহ নেই। সেনেগলি সিনেমার সমস্যা এখানকার সাংস্কৃতিক নীতির কারণেই, আর এটা সেনেগাল এখনো বিষয়টা ধরতে পারে নাই। আমরা এটাও জানি, এদেশে সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে অজ্ঞতা নিয়ে চলচ্চিত্রের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। এর পাশাপাশি ইউজিসির সঙ্গে সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাও আমাদের অজানা নয়।

দশ বছর ধরেই সেনেগালের অবস্থা চলচ্চিত্র নির্মাতা থেকে শুরু করে আমাদের জনগণকে বোঝাচ্ছি। দুই বছর আগে, সেনেগাল সরকার সব প্রেক্ষাগৃহ কিনে নিলো, এরপর গঠন করল মিশ্র পুঁজির কোম্পানি। এতে ইউজিসিকে ভাগ দেওয়া হয় কুড়ি শতাংশ। এই কুড়ি ভাগ পাওয়ার পরও ইউজিসি পেটুকের মতো সমস্ত গ্রাস করতে চাইল, পুরো সিনেমাকেই সে গিলে ফেলতে চায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র নির্মাতারা সরকারী কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন, সরকার তো প্রেক্ষাগৃহের সব বেচা-বিক্রি ইউজিসির হাতে তুলে দিয়েছে। এখন এটা নিয়েই আমরা একটা আলোচনা করছি।

হালা যে এক ধরনের নিশ্চয়তা তৈরি করেছে, এ ব্যাপারে আমরা ওয়াকিবহাল আছি; কিন্তু তাই বলে ইউজিসিকে বাতিল করতে পারি না। এখন ইউজিসি কিভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে– সেটা দেখার বিষয়। যৌথভাবেই এটা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবশ্য এই দেখার কাজটা আমাদের কাছে যে খুব স্পষ্ট বা সততার সঙ্গে হচ্ছে, তা নয়; তারপরও পরস্পরের সুবিধা দেখার চেষ্টাটা আছে। নয়তো সকল প্রেক্ষাগৃহ হাতছাড়া হওয়ার ভেতর দিয়ে আমাদের সিনেমার সমস্যা সমাধান হবে! আফ্রিকার অন্য দেশগুলোও হয়তো একদিন একই পথে হাঁটবে। আমরা আলজেরিয়ার মতো করতে চাই, আমরা আমাদের প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণ করব, পরিবেশনা আমাদের হাতে থাকবে, এবং ব্যবস্থাপনাও; মোদ্দা কথা পুরো সিনেমা, শুরু থেকে শেষ– সবটাই নিয়ন্ত্রণ করতে চাই আমরা। এখনো পর্যন্ত, যদিও পুঁজির উপর কুড়ি শতাংশ ইউজিসির, তারপরও তারা নিজেদের নতুন কার্যক্রম চাপিয়ে দিচ্ছে। এখন আমরা নিজেরা ঠিক করতে চাই, কোন ছবি প্রদর্শিত হবে আমাদের দেশে।

Θ হালাতে আলহাজের দুই স্ত্রী। এরা দু’জন দুই মেরুর বাসিন্দা: প্রথমজন ঐতিহ্যবাহী, অন্যজন ইউরোপ ঘেষা।

 উসমান সেমবেন 
আলহাজ কিছু হয়ে ওঠার আগে প্রথমজনকে বিয়ে করেছেন। অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি আলহাজ দ্বিতীয় বিয়ে করেন, এটাকে বলতে পারেন ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্যায়। আর তৃতীয় স্ত্রী, যার বয়স আলহাজের মেয়ের সমান, তার সাথে আলহাজের মনের কোনো লেনাদেনা নেই, আছে শুধু ভোগ। এই তৃতীয় স্ত্রী বেশ বাধ্য, আলহাজের মেয়ের বিপরীত, এবং পুরো ছবিতে দুই একবার তাকে দেখা যায়। এই স্ত্রী হচ্ছে অনেকটা ‘সুন্দরী সেজে থাকো আর মুখ বন্ধ রাখো’ ধরনের।

বহুগামিতায়, বিশেষ করে বুর্জোয়া অথবা শহুরে মানসিকতায়, স্ত্রী হলো কেবল মাংসপিণ্ড, তাকে মূল্যায়িত করা হয় পণ্যের মতো। এই বুর্জোয়া ও তার স্ত্রীদের বুদ্ধিতেই কিন্তু আন্তর্জাতিক নারী বার্ষিকীর জন্য দরজা খোলা হয়। কর্মজীবী নারী নয়, এখানে সুযোগ পান সমাজের সুবিধা প্রাপ্ত নারীরা, খ্রিস্টধর্ম তাদের কোনো তৃপ্তি দিতে পারেনি, এই নারীদেরকেই আমরা কথা বলতে দেখি নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে। কিন্তু এখানে সন্দেহাতীতভাবে একটি অনস্বীকার্য সমস্যা আছে : বহুগামিতা– যেটার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করছি। এখানে সমস্যা আছে, সমস্যাটা দৃশ্যমান, দেখাই যাচ্ছে নারীদের অধস্তন অবস্থা। এই সমস্যার সমাধান আমরা ইউরোপে যে পরিবারের ধারণা, সেখানে খুঁজে পাইনি। ইউরোপের সমাজ কাঠামো মানবসত্ত্বাকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। বাস্তবে এই সমস্যার সমাধান লিঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে খুঁজলে চলবে না, খুঁজতে হবে শ্রেণি প্রশ্নে।

হালা
হালা

Θ একাধারে আপনি লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, সেনেগালি সিনেমার বাইরে কোন পরিচয়টি আপনাকে স্বাচ্ছন্দ দেয়? বিষয়ভিত্তিক কাজ বা নিজস্ব ঢং তৈরিতে কি আপনার লেখালেখি আপনাকে সাহায্য করেছে?

 উসমান সেমবেন 
এটা আসলে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। আমার মতে, সিনেমার শুরু সাহিত্য দিয়ে। কিন্তু যখন আমি লিখি, তখন এর শেষ পরিণতি চলচ্চিত্র হবে বলেই আশা রাখি। আমি এমন শব্দ খুঁজি যা প্রতিচ্ছায়া হতে পারে, এমন প্রতিচ্ছায়া খুঁজি যেন তা শব্দে রূপ নিতে পারে; এমনটা করি, যেন যে কেউ চলচ্চিত্র পাঠ করতে পারে আর দেখতে পারে বই। কিন্তু আমি সিনেমার প্রতি আগ্রহী হয়েছি, কারণ, সিনেমা বইকে অতিক্রম করতে পারে, এমনকি কবিতা কিংবা মঞ্চনাটককেও। যখন হালা মুক্তি পেল, তখন প্রত্যেক সন্ধ্যায় কমপক্ষে তিনশ মানুষ ছবিটি দেখতে এসেছেন, তাদের সঙ্গে ছোট ছোট দলে আমি তর্কে মেতে উঠতাম।

চলচ্চিত্র আমাদের সামনে ক্যানভাসের মতোই হাজির হয়, এতে প্রতিফলিত হই আমরা পরস্পর। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিনেমা হয়ে গিয়েছে চোখ, আয়না এবং সচেতনতা। চলচ্চিত্র নির্মাতা এমন একজন, যে তার নিজের জনগণের দিকে তাকায়, পর্যবেক্ষণ করে, এরপর তাদের ভেতর থেকে বেগ ও আবেগ বের করে এনে নিজের ভেতর জারিত করে ফিরিয়ে দেয় বা পরিবেশন করে ওই জনগণের সামনেই। শ্রমিক বা কৃষকের নিজেদের জীবনের সূক্ষ্ম দিকগুলোতে তাকানোর ফুরসত নেই; তারা তাদের মতো জীবনযাপন করে, কিন্তু সেই জীবনকে পেড়ে মুঠোবন্দী করে দেখার মতো সময় নেই তাদের। তবে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা কিন্তু সূক্ষ্ম বিষয়গুলো একের পর এক গেঁথে গল্প তৈরি করতে পারে। ঐতিহ্যবাহী গল্পকথক আর নেই আজকাল; আমার মনে হয় তাদের জায়গা পূরণ করতে পারে চলচ্চিত্র নির্মাতারা।

লেখায় কিন্তু আমাকে পটভূমির ভেতর থাকতে হয়, ধারণাকে সমৃদ্ধ করার জন্য, যেন আমরা আরো সামনে এগুতে পারি। আমি বিষয়ের উপর আলোকপাত করি, জনগণের অবস্থাকে তাদের সামনেই আবার ফিরিয়ে আনতে চাই, যেন তারা আমার ফিরিয়ে আনা অবস্থায় নিজেদের আবিষ্কার করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে। জনগণকে তাক লাগিয়ে দেওয়া তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্রকারের কর্ম নয়, কারণ প্রযুক্তির পরাক্রম দেখানো সহজই বৈকি। আর যাই হোক, যখন আপনি সিনেমাকে জানবেন, তখন এটা খুবই সহজ বিষয়। প্রশ্নটা হলো, আপনি আপনার জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজের ইতিহাসে প্রবেশ করাতে পারছেন কি না, ইতিহাসে তারা নিজেদের চিহ্নিত করতে পারছে কি না, সেটাই। মানুষকে অবশ্যই চলচ্চিত্রে যা আছে, সেটা আমলে নিতে হবে, এবং তা নিয়ে কথা বলতে হবে। আর এই জায়গাতেই ভাষা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে : এই কারণেই আমি জাতীয় ভাষা উলোফ ব্যবহার করেছি; এ ভাষা আমার মানুষের ভাষা।

Θ কিছু দৃশ্য গভীরভাবে প্রতীকী, ছবিটি দেখলে এমন ধারণাই হয়। ছবির শেষে আলহাজ যখন বাধ্য হলেন জামা-কাপড় খুলতে, তখন মনে হয় তার কৃত কুকর্ম উন্মোচিত হলো এবং বিবস্ত্র করা হলো…।

 উসমান সেমবেন 
একই কথা, আপনাকে বুঝতে হবে, এই দৃশ্য বিপ্লবের আহ্বান। যদি ওইসব লোকদের হাতে তখন আগ্নেয়াস্ত্র থাকত, তো আলহাজকে তারা তখন মেরেই ফেলত। উপনিবেশবাদ একমাত্র টিকে থাকে এসব বুর্জোয়াদের দালালির কারণে। উদাহরণ স্বরূপ বলছি, আমরা তো জানি অ্যাঙ্গোলার যুদ্ধে সাভিমবি ও হোল্ডেনকে [জোনাস সাভিমবি ও হোলডেন রোবের্তো– দু’জনই অ্যাঙ্গোলার রাজনীতিবিদ] সমর্থন দিয়েছিলেন আফ্রিকার কয়েকজন ভালো রাষ্ট্রপ্রধান। তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় আটক ছিলেন। আমরা দেখেছি যে, রাষ্ট্রপ্রধানরা অ্যাঙ্গোলার ইউনাতাকে [ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য টোটাল ইন্ডেপেন্ডেন্স অব অ্যাঙ্গোলা] সমর্থন করেছিলেন, ওই দেশের জনগণ বা শ্রমিকরা নিজেদের বুর্জোয়াদের গায়ে থুথু দেওয়ার জন্য বা গুলি করার জন্য মরিয়া হয়েছিল।

হালা
হালা

Θ এই ছবিতে অনেকগুলো গান ব্যবহৃত হয়েছে। সেগুলো অনুবাদ বা সাবটাইটেল করে দেওয়া হয়নি। গানে কী কথা ছিল?

 উসমান সেমবেন 
উলোফ ভাষায় আমার লেখা একটা গান ছিল, একটু জনপ্রিয় ধাচের। একটি দৃশ্যে এই গান ব্যবহার করা হয়, সেখানে বিপ্লবের আহ্বান আছে, অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেছি, ক্ষমতার বিরুদ্ধে, আজকালের যে নেতা তাদের বিরুদ্ধে, নয়তো এরাই একদিন গাছপাথর হয়ে জেঁকে বসবে, এদেরকে ছেটে ফেলতে হবে। গানগুলো পরিস্থিতি মোতাবেক রচনা করেছি; রূপকথা থেকে নয়। প্রথমে আমি অনুবাদ করে দেওয়ার কথাই ভেবেছিলাম। পরে এই চিন্তা বাদ দিয়েছি, কারণ ইউরোপের দর্শকের জন্য ওটার দরকার নাই।

একটি গানের মধ্যে টিকটিকির রূপক এসেছে– টিকটিকির মধ্যে ভালো নেতার কোনো গুণ নাই। যখন এটি সামনে হাঁটে, আর ধরুন আপনি পেছনে, তখন সে আপনাকে কতল করবে এটা বলে যে, আপনি তাকে খুন করতে চান। যখন আপনি পাশাপাশি হাঁটবেন, তখন এটি আপনাকে বলবে, আপনি ওটার সমান বড় হতে চান। তখনও সে আপনাকে খুন করবে। আবার যখন আপনি ওটার সামনে হাঁটবেন, তাও আপনি খুন হবেন, সে সময় অভিযোগ হবে : ‘তুমি আমার সৌভাগ্যে ভাগ বসাতে চাও।’ এই গানে বলা হয়েছে, এ ধরনের নেতৃত্ব নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। যেসব নেতার এই টিকটিকির গুণাবলী আছে, তাদের হাত থেকে মুক্ত হতে হবে। গানটি শেষ হয় এমন কিছু কথা দিয়ে : ‘জয় জনতার, জয় জনতার শাসনের, জয় জনতার সরকারের, এক ব্যক্তি এই সরকারকে পরিচালিত করবে না!’

মানি অর্ডার [Mandabi] চলচ্চিত্রেও কিন্তু আমার লেখা গান ছিল।

Θ মানুষের জীবনকে তো অনেকভাবেই দেখা যায়, এই ছবিতে আমরা ভিক্ষুকদের জীবন দেখেছি, ছবির শেষে তারা সম্মিলিত জনতা হিসেবে আক্রমণে সমর্থ হয়…।

 উসমান সেমবেন 
হ্যাঁ, তাদেরকে প্রথমে নির্বাসিত করা হলেও পরে তারা ফিরে আসে। এই সম্প্রদায়ই একদিন ফিরে আসবে বুর্জোয়াদের শহর পরিষ্কার করতে। ভিক্ষুকরা হয়তো শহরে মানানসই না, তারপরও তাদের নাগরিকত্ব তো অস্বীকার করা যায় না। সাহারার দক্ষিণে অনেক রাষ্ট্রে শ্রমিকরা ভালো নেই। কারণ শ্রমিক এ সব দেশে বেঁচে থাকে না, কোনো রকম টিকে থাকে। শ্রমিকদের চেয়ে কৃষকরা আরো হতভাগা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, জনগণ, হোক অসুস্থ কি পঙ্গু– একদিন এই বুর্জোয়াদের হটাবেই; কারণ এটা করা একদিকে যেমন জরুরি, তেমনি অনিবার্য।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক, সাংবাদিক, সিনে-সমালোচক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সিনে-গ্রন্থ : চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা; চলচ্চিত্র বিচার; বলিউড বাহাস; উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা

মন্তব্য লিখুন