স্তেফান উহারের ‘দ্য সান ইন অ্যা নেট’ : জালবন্দি সূর্যের ছায়া

0
146
দ্য সান ইন অ্যা নেট
অরিজিনাল শিরোনাম  Slnko v sieti
ফিল্মমেকার স্তেফান উহার
মূল গল্প ও স্ক্রিপ্ট আলফঞ্জ বেদ্নার
সিনেমাটোগ্রাফ স্তানিস্লাভ জমোলানি
এডিটর বেদরিখ ভদের্কা
মিউজিক লিয়া জেলেঙ্কা
অভিনয় [চরিত্র] মারিয়ান বেইলিক [ফায়োলো], ইয়ানা বেলাকোভা [বেলা], এলিস্কা নোসালওভা [মা]
দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট
দেশ চেকোস্লোভাকিয়া [বর্তমানে, স্লোভাকিয়া]
ভাষা স্লোভাক
মুক্তি ১৯৬৩
ফিল্ম মুভমেন্ট চেকোস্লোভাক নিউ ওয়েভ

মূল পিটার আরিগ্যান ।। অনুবাদ  রুদ্র আরিফ


স্তেফান উহারের দ্য সান ইন অ্যা নেট সিনেমাটি নানা দিক থেকেই আমাদের সামনে পৃথিবীকে দেখার নানা পথ হাজির করে। সূর্যগ্রহণকালে সূর্যের দিকে তাকানোর সময় আমরা সম্ভবত ঘোলাটে কাঁচ ব্যবহার করি [এবং আমাদের গালে তখন নোংরা দাগ বসে যায়]। এই সিনেমার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, কিশোর ফায়োলো নানান মানুষের হাতের ছবি তোলার আকাঙ্ক্ষা মেটায় ক্যামেরা হাতে নিয়ে। গ্রীষ্মের দিনগুলোতে, ক্ষণে ক্ষণে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের ছাদের উপর দেখা করে কিশোরী বেলা আর সে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যান্টেনাগুলো যেন বনের একেকটি গাছ। আর তা দেখে এইসব অ্যান্টেনার মাধ্যমে নিচের ফ্ল্যাটগুলোতে টিভি সেটে দেখা পৃথিবীর কথা মনে পড়ে যেতেই পারে আমাদের। মাঝে মধ্যে এই পৃথিবীটা আমাদের সামনে প্রতিফলিত হয়ে ওঠে আয়না কিংবা জল কিংবা জানালার ভেতর দিয়ে। হোক রিভার্স কিংবা ইনভার্ট– একেকটি নিখুঁত মিরর-ইমেজের দেখা পেয়ে যাই আমরা। আর নির্দিষ্ট একটা জানালার ভেতর দিয়ে তা তরঙ্গিত ও লীন হয়ে গিয়ে অন্যকোনো অর্থ দাঁড় করিয়ে দেয় হয়তো। সেই জানালায় বসে থাকেন বেলার মা। কেননা, তিনি অন্ধ; পৃথিবীটাকে দেখেন তিনি অন্যদের বিবরণের উপর ভর করে– যা সর্বদাই বিশ্বস্ত নয়।

পোস্টার । দ্য সান ইন অ্যা নেট
পোস্টার । দ্য সান ইন অ্যা নেট

একইভাবে, এই ফিল্মটি নিজেও পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছে নানাবিধ দিক থেকে। এটি যখন নির্মিত হয়, তখনকার সমাজতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক বিভাগের কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কর্তৃপক্ষ চেয়েছিলেন, স্যোসালিস্ট রিয়েলিজম বা সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের আদর্শকে ধারণ করা ফিল্ম হয়ে উঠুক এটি। কিন্তু দেখার পর তাদের মনে হলো, এই ফিল্ম যেন তাদের রাষ্ট্রের একটি সমালোচনা-ভাষ্য। তাছাড়া, দায়বোধহীন বাবা-মার কারণে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা তাদের গ্রীষ্মের ছুটিতে যৌথখামারগুলোতে যায় অনেকটা বাধ্য হয়েই– যা কিনা শহুরে পরিবেশে একেবারেই অনাকর্ষনীয়– তার একটি চিত্র উপস্থাপন করেছে ফিল্মটি। তাছাড়া, শহরের আকাশ চিড়ে ছুটে যাওয়া মিলিটারি জেট-বিমানগুলোর শটের মাধ্যমে কী বুঝাতে চেয়েছিলেন উহার [এই ইমেজগুলো ফিল্মটিতে ক্ষণে ক্ষণে যতিচিহ্ন টেনে দিয়েছে]? এটি স্পষ্টতই স্যোসালিস্ট রিয়েলিজের পক্ষের কোনো কাজ ছিল না।

নির্মাণের পরের বছর উহার ফিল্মটি চেকোস্লোভাকিয়ায় মুক্তি দিতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পাশ্চাত্য জগতসহ বহির্বিশ্বে এটি সুদীর্ঘকাল অনুপস্থিত থেকে গেছে। সম্ভবত ফিল্মটি তার নির্মাণ-সময়ের চেয়ে এক ধাপ এগিয়েই ছিল। তখনকার দিনে পাশ্চাত্যের দর্শকেরা ‘আয়রন কার্টেইন’ আদর্শের নেপথ্য থেকে নিজেদের মতো করে সিনেমা দেখতে চাইতেন। প্রচলিত শাসনতন্ত্রের সমালোচনার মুখোশ পরা নিয়মাবলির দিকে প্রায়শই নজর রাখতেন তারা। কিংবা ফিল্মটি হয়তো সেই শাসনতন্ত্রের মধ্যে একটি বরফ-গলা-বোধকেই ইঙ্গিত করত– যদি না এটি যুদ্ধের শয়তানি নিয়ে বানানো কোনো নাটকীয় রকম ট্রাজিক ফিল্ম হয়ে ওঠত। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে একই বছর [১৯৬২] নির্মিত অন্য দুটি ফিল্মের নাম দেওয়া যায়– রোমান পোলানস্কির নাইফ ইন দ্য ওয়াটার ও আন্দ্রেই তারকোভস্কির ইভান’স চাইল্ডহুড

তবে দ্য সান ইন অ্যা নেট ১৯৬০ দশকের শুরুতে পাশ্চাত্যে নিজেকে প্রকাশ করতে না পারলেও, নিজ দেশে সিনেমার শক্ত কাঠামো নির্মাণের পথে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে ঠিকই সক্ষম হয়েছে। এর প্রমাণ, এর কয়েক বছর পর মিলোস ফরমান ও ইভান পাছারের মতো কিংবদন্তি চেক ফিল্মমেকারেরা ব্ল্যাক পিটার [ফরমান, ১৯৬৪], লাভস অব অ্যা ব্লন্ড [ফরমান, ১৯৬৫], ইন্টিমেট লাইটিং-এর [পাছার, ১৯৬৫] মতো তাদের প্রথমদিককার সিনেমাগুলো নির্মাণ করার প্রেরণা পেয়েছেন; আর সেগুলো দেশ-বিদেশে শুধু তুমুল প্রশংসিতই হয়নি, বরং চেক নিউ ওয়েভ নামের একটি শক্তিমান সিনে-আন্দোলনের অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাহিনী নিয়ে, তবে ভীষণ আন্তরিকতা, কোমলতা, হাস্যরস ও অনুরাগ সমৃদ্ধ হয়ে নির্মিত হয়েছে এইসব সিনেমা। অবশ্য ব্রাসিস্লাভা [স্লোভাকিয়ার রাজধানী] ছাড়া আর কোথায়ও দ্য সান ইন দ্য নেটকে আসলে সেই নিউ ওয়েভের প্রথম সিনেমা হিসেবে সনাক্ত করেনি কেউ তখন; আর পরবর্তীকালে স্লোভাকিয়া সবসময়ই চেক ও স্লোভাক জাতির অস্বস্তিকর সংযোগের অংশকে এড়িয়ে গেছে।

দ্য সান ইন অ্যা নেট
দ্য সান ইন অ্যা নেট । ফায়োলো ও বেলা

এই ফিল্মে আগের নভেম্বরেই ১৫ বছরে পা রেখেছে বেলা; আর ফায়োলোও সম্ভবত তার সমবয়সী। স্কুলের একটি পাঠবর্ষ শেষে এক উদ্রান্ত সময়ে তারা অনেকটা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু তাদের সম্পর্কটি সম্ভবত তার চেয়েও নৈকট্যের ব্যাপার; আর তা নিয়ে তারা বসবাস করে ফ্ল্যাটগুলোর একই ব্লকে। সিনেমাটির এপিসোডগুলোতে আমরা কোনো স্টিফ ন্যারেটিভের দেখা না পেলেও, বেলা আর ফায়োলো বছরের এ সময়টিতে এবং জীবনের এই পর্যায়টিতে যে স্রোতে নিজেদের ভাসিয়েছে– সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে বেগ পেতে হয় না আমাদের।

গ্রীষ্মকালীন ওয়ার্ক-ক্যাম্পে ফায়োলোকে যেতেই হয়। এই বিচ্ছেদে তারা দুজনই খুঁজে নেয় নতুন সম্পর্ক। এলাকায় থেকে যাওয়া বেলাকে তখন আমরা বেশ চিন্তিত দেখি। তার মা অন্ধ; আর এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে– তিনি কেন এই যন্ত্রণা ভোগ করছেন, সে সম্পর্কে না-বলা কোনো কাহিনী রয়ে গেছে এই পরিবারে। গ্রীষ্মের এই দিনগুলোতে বেলা আর ফায়োলোর বসবাস যোজন যোজন মাইল দূরত্বে; ওদের জীবনের প্রবেশ করেছে ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গী। ফার্মটিতে একইসঙ্গে কাজ করতে আসা স্টুডেন্ট-ভলান্টিয়ার ইয়ানার প্রতি কি অবিশ্বস্ত হয়ে ওঠে ফায়োলো? নদীতে এক সঙ্গে সাঁতার কাটার সময় যে পন্টুনের উপর ওরা [বেলা ও ফায়োলো] দুজন বিশ্রাম নিতো, সেখানে পিটারকে নিয়ে গিয়ে বেলা কি ফায়োলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল? ওদের সম্পর্ক কি তাহলে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে– যেটিকে বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা আস্থাহীনতা বলাই শ্রেয়?

তবে এর একটা ভিন্ন চেহারাও আছে– সম্ভবত ফায়োলোর জন্য; এবং অন্যদিকে, ফিল্মটিরও। গ্রামে, যুগের পর যুগ ধরে কাজ করা পুরুষগুলোর উস্কুখুস্কো, তবে বলিয়ান ও তেজি চেহারার বিপরীতে ফায়োলোর চেহারা টাটকা ও তারুণ্যদীপ্ত। তাছাড়া, সিনেমাটিতে বলা না হলেও বোঝা যায়, এই পুরুষেরা যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের ধকলের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে আসছে। ফায়োলো যেমন হাতের ছবি তুলতে ভালোবাসে, ফিল্মটি দেখলে মনে হয়, উহারও তেমনি ভালোবাসেন মুখের ছবি ধারণ করতে। ফলে এ সিনেমায় একটি বিমুগ্ধকর টু-শটের দেখা পাই আমরা : ফ্রেমের এক প্রান্তে ফায়োলের তরুণ ও অনেকটা কদাকার মুখ, অন্য প্রান্তে নিজের বেরেট-টুপি মাথায় কৃষকটির মুখ– যাতে তার সারাটা জীবনের প্রত্যেকটি নকশা যেন গভীরভাবে খোঁদাই করা রয়েছে।

নদীতে থাকা পন্টুনটি একটি ঋদ্ধ লোকেশন। মনে হয়, এটি একজন একহাতি জেলের মালকানাধীন। তরুণরা তার কাছে অনুমতি নিয়ে সাঁতার কাটে এখানে। ন্যারেটিভের মধ্যে কোনো রকম কার্য-কারণের ভূমিকা পালন করার মতো কোনো ‘প্লট ক্যারেক্টার’ নয় লোকটি। তবু, ফিল্মটির বুননিতে তার ভূমিকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ফিল্মটি যখন আমরা দেখি, তখন তার সঙ্গেও একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয় আমাদের; আর তার সঙ্গে করা আচরণের উপর ভিত্তি করেও অন্য চরিত্রগুলোকে আমরা বিচার করতে সক্ষম হই।

দ্য সান ইন দ্য নেট । বেলা, সূর্যগ্রহণ ও অন্ধ-মায়ের হাত
দ্য সান ইন দ্য নেট বেলা, সূর্যগ্রহণ ও অন্ধ-মায়ের হাত

সময় থেকে সময়ে চরিত্রগুলো পৃথিবীর যেখানে যেখানে চলে যায়, তার সঙ্গে একটি লোকেশনের সম্পর্ক কেমন হতে পারে– এই পন্টুনটি তার একটি উদাহরণও; তবে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে এটি একটি শক্তিমান ও মেটাফোরিক্যাল প্রভাবও ফেলতে পেরেছে। বিনষ্টকারীকে যদিও এড়িয়ে যাওয়া কঠিন, তবু যে কোনো দর্শকই ফিল্মটির সর্বশেষ দৃশ্যের আগেরটিকে প্রতি একটু বেশিমাত্রায়ই অনুভব করতে পারবেন : এখানে বেলা আর তার মা বসে আছেন পন্টুনে; মা বলছেন, ‘চুপচাপ বসে থাকো। কথা বলো না, নড়ো না। তা না হলে ছিটকে আসবে পানি।’ [অথচ, মরে গেছে নদীটা। মরে গেছে সেই জেলে।] এরপরই ‘কাট’ করে পর্দায় চলে আসে ফায়োলোর দৃশ্য। উইন্টার কোট পরা এই ছেলেটি টেলিভিশনের এরিয়ালে ভরা ছাদের দিকে পেছন ফিরে রয়েছে। আরেকটি কালো-সূর্য [সূর্যগ্রহণ] দেখার জন্য ১২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে– এ কথা সে ভাবছে ঠিকই, কিন্তু এ সব কথার গুরুত্ব আসলেই কম। বরং পর্দায় যেসব ভিজুয়াল আমরা দেখি– এই যে এরিয়েলগুলোর এত এত মেকানিক্যাল শেপ, এই যে ফায়োলোর দিকে কাঁত হয়ে থাকা নিঃসঙ্গ দেয়াল, এই যে [ফায়োলো নিজে ছাড়া] প্রকৃতির কোনো লক্ষণেরই দেখা নেই এখানে– এইসব হয়ে ওঠে গুরুত্ববাহী। জীবনকে ভবিষ্যত কোথায় নিয়ে যাবে– সে সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া ১৫ বছর বয়সী কিশোরের বোধকে ধারণ করেনি এই কথাগুলো। এসবকে বাক্যে রূপ দেওয়া সম্ভবও নয়; আর আমরা তো কেবলই পারি বেলার মায়ের সঙ্গে সমব্যথি হয়ে ওঠতে : ‘চুপচাপ বসে থাকো। কথা বলো না, নড়ো না। তা না হলে ছিটকে আসবে পানি।’


পিটার আরিগ্যান । সিনে-সমালোচক, অস্ট্রেলিয়া
সূত্র । সেন্সেস অব সিনেমা । অনলাইন ফিল্ম জার্নাল, অস্ট্রেলিয়া ।  মার্চ ২০১৩

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন