হারবার্ট : সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভিটি, দুর্বোধ্যতা ও রাজনৈতিক বক্তব্য

1
539
হারবার্ট
স্ক্রিনরাইটার ও ফিল্মমেকার । সুমন মুখোপাধ্যায়
উৎস-উপন্যাস । হারবার্ট/ নবারুণ ভট্টাচার্য
সিনেমাটোগ্রাফি । সোমক মুখোপাধ্যায়
এডিটিং । অর্ঘ্যকমল মিত্র
মিউজিক । ময়ূখ ভৌমিক
সাউন্ড মিক্সিং । অনুপ মুখোপাধ্যায়
আর্ট ডিরেক্টর । সুদীপ ভট্টাচার্য
প্রডিউসার । কাজল ভট্টাচার্য
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । শুভাশিস মুখোপাধ্যায় [হারবার্ট সরকার]; নীল মুখোপাধ্যায় [বিনু]; লিলি চক্রবর্তী [জ্যাঠিমা]; দেবশংকর হালদার [ললিত]; সব্যসাচী চক্রবর্তী [পুলিশ অফিসার]
ভাষা । বাংলা 
দেশ । ভারত
মুক্তি । ২০০৫
অ্যাওয়ার্ড । অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড; ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল [২০০৬]

লিখেছেন নাদির জুনাইদ


বারুণ ভট্টাচার্যের ১৯৯৭ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পাওয়া উপন্যাস হারবার্ট অবলম্বনে একই নামে ২০০৫ সালে কলকাতার প্রখ্যাত থিয়েটার নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র। বক্তব্যের দিক থেকে সুমন মুখোপাধ্যায়ের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি হয়ে ওঠে ঝাঁঝালো এবং নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে আকর্ষণীয়। বিভিন্ন জটিল ও উদ্ভাবনী চলচ্চিত্র কৌশল ব্যবহারের কারণে ফর্মের দিক থেকে হারবার্ট হয়ে ওঠে অনেক ভারতীয় ছবি থেকেই ভিন্ন। ছবিটিতে হারবার্ট নামক চরিত্রটির মধ্য দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন, দুর্বোধ্য এবং আবোল-তাবোল কথা বার বার শোনানো হলেও ছবিতে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা হয় তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য। কখনো একই রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয় সরাসরিভাবে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি পরিচালকের স্পষ্ট অবস্থানও চোখে পড়ে। হারবার্ট দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিপীড়িত মানুষের দুঃখের প্রতি। পরিচালকের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে সমাজের সুবিধাভোগকারী ও ক্ষমতাশীল শ্রেণির মানুষদের অনুভূতিহীন ও সংকীর্ণ মানসিকতা। অত্যাচারিতের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থার নেতিবাচক দিকের সমালোচনার কারণে হারবার্ট তাই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। প্রচলিত চলচ্চিত্রের সহজ এবং গতানুগতিক ফর্মকে পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে পরিচালক তার ছবির রাজনৈতিক রূপকে আরও কার্যকর করে তোলেন

১৯৪৭-এ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে শুরু করে বিশ্বায়ন-নিয়ন্ত্রিত বর্তমান সময়ের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে হারবার্ট ছবিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহা বিক্রী করে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া কলকাতার অবস্থাপন্ন পরিবারের ললিত সরকার এবং তার ইংরেজি-না-জানা স্ত্রী শোভার একমাত্র সন্তান হারবার্ট সরকার। অনেক অর্থের মালিক ললিতের জীবনযাপনে ছিল সাহেবিয়ানা। ভারতীয়দের প্রাক্তন শাসক ইংরেজদের মতো ললিত সবসময় পশ্চিমা পোশাক পরে। ছেলের নাম হারবার্ট রাখাতেও প্রকাশ পায় তার পশ্চিমা চিন্তা-প্রীতি। অর্থশালী ললিত যুক্ত হয় চলচ্চিত্র পরিচালনার সাথে। কলকাতায় ললিতদের পুরনো আমলের বিশাল বাড়িতে দেখা যায় সাবেকি সামন্ততান্ত্রিক আচরণের ছাপ। ললিতের বড় ভাই এমনকি নিজের ভাইপোর জন্মদিনের উৎসবের সন্ধ্যায়ও বাইজী-বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে না। একইভাবে নিজের মেয়েবন্ধুর টেলিফোনে সাড়া দিয়ে ললিতও নিজের ছেলের জন্মদিনের দিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এই মেয়েবন্ধুর সাথে একদিন কলকাতা থেকে দূরে শুটিং শেষে ফেরার সময়ই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ললিত সরকার। ললিতের স্ত্রী শোভা একদিন ছাদে ভেজা কাপড় মেলে দেওয়ার সময় বিদ্যুতের খোলা তারে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। ধনী বাবার একমাত্র সন্তান হারবার্টের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে যায় শিশু বয়সেই। সে বড় হয় সেই বাড়িতেই, কিন্তু অবহেলা আর অনাদরে। কেবল তার জ্যাঠাইমার কাছ থেকেই স্নেহ পেতো হারবার্ট। স্কুলে ক্লাস এইটের পর আর পড়া হয় না হারবার্টের। বাড়িতে ফাইফরমায়েশ খেটে বড় হয় হারবার্ট।

আত্মহত্যার আগমুহূর্তে, আপমানে রক্তাভ রবির চোখ; পেছনে হারবার্ট
আত্মহত্যার আগমুহূর্তে, আপমানে রক্তাভ রবির চোখ; পেছনে হারবার্ট

মনোযন্ত্রণার এই জীবনে একের পর এক মানসিক আঘাত আরো অশান্ত করে তোলে হারবার্টের জীবন। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রবি একটি মেয়েকে ভালোবাসার জন্য সেই পাড়ার মাস্তানদের হাতে অপমানিত হয়ে আত্মহত্যা করে। হারবার্টের ছোট বয়সের মেয়েবন্ধু বুকি তার বাবার বদলির কারণে কলকাতা ছেড়ে চলে যায়। হারবার্টের বড় চাচার বড় ছেলে কৃষ্ণ একজন কলেজ শিক্ষক এবং মার্কসবাদী। ধীর-স্থির, রূচিশীল, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কৃষ্ণ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। কৃষ্ণের একমাত্র ছেলে বিনু বয়সে হারবার্টের চেয়ে অল্প ছোট। বিনু আর হারবার্ট তাদের ছেলেবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয়েছে। বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বিনু যুক্ত হয় নকশালবাদী আন্দোলনের সঙ্গে। সরকার কর্তৃক নকশালবাদী আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করার দিনগুলিতে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে ধরা পড়ে বিনু। গুলিবিদ্ধ বিনু পুলিশের অমানবিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাণ হারায়। একের পর এক এমন আঘাত হারবার্টকে করে তোলে মানসিকভাবে অস্বাভাবিক। জীবত মানুষদের সান্নিধ্য তাকে শান্তি দেয় না, আর যে মানুষেরা তার কাছে ছিল তারা সবাই একে একে তার থেকে চিরতরে দূরে সরে গিয়েছে। নিঃসঙ্গ, হতাশ হারবার্ট ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে পরলোকসংক্রান্ত লেখাপড়ার দিকে। পরলোক আর মৃত মানুষদের নিয়ে ক্রমাগত ভাবনার কারণে তার স্বপ্নেও দেখা দিতে থাকে মৃত মানুষেরা। একসময় পাড়ার কিছু ছেলেদের উৎসাহে হারবার্ট শুরু করে ‘মৃতের সাথে কথোপকথন’-এর কাজ। যখন বহু মানুষ হারবার্টের কাছে এসে তার অদ্ভুত, দুর্বোধ্য কথাবার্তা শুনতে থাকে নিজেদের মৃত প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য, হারবার্টের ভালো রোজগারের পথ খুলে যায়। একজন ব্যবসায়ী এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা অর্জনের জন্য হারবার্টকে নিয়ে সংবাদপত্রে ফিচার প্রকাশ করে। ফলে হারবার্ট আরো প্রচার পায়, কিন্তু সেই প্রচার যুক্তিবাদী সমিতির মানুষদেরও নিয়ে আসে হারবার্টের কাছে। যুক্তিবাদী সমিতির লোকরা হারবার্টকে ভণ্ড সাব্যস্ত করে। এই অপমানের বিরুদ্ধে হারবার্ট প্রতিক্রিয়া দেখায় তীব্রভাবে। কিন্তু সে পরলোক নিয়ে আর কাজ করতে চায় না। মানসিকভাবে আহত, ক্ষুব্ধ হারবার্ট এক রাতে আত্মহত্যা করে। তার মৃত্যুর পর ঘটে যায় এক অদ্ভুত ঘটনা। তার মৃতদেহ যখন দাহ করার জন্য শব-চুল্লির মধ্যে ঢোকানো হয়, তখন প্রচণ্ড শব্দে সবাইকে হতবাক, বিমূঢ়, ভীত করে দিয়ে ঘটে যায় বিকট বিস্ফোরণ। শক্তিশালী সেই বিস্ফোরণে শ্মশানে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে যায়। এমন ঘটনা কখনো দেখা যায়নি। প্রেস এবং প্রশাসন তাই উদ্বিগ্ন ও ব্যস্ত হয়ে ওঠে এই ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন নিয়ে। কিন্তু তাদের পক্ষে এই রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হয় না।

হারবার্টকে সব-সময় অনুসরণ করা স্বর্গীয় পিতা-মাতা, ও মুভি-ক্যামেরা
হারবার্টকে সব-সময় অনুসরণ করা স্বর্গীয় পিতা-মাতা, ও মুভি-ক্যামেরা

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছবিতে পরিচালক ব্যবহার করেন বিভিন্ন জটিল চলচ্চিত্র কৌশল। ছবির বিষয়বস্তু কলকাতার পরিচিত সামাজিক পরিমণ্ডল এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হলেও, ছবির ফর্ম হয়ে ওঠে ইউরোপীয় আর্ট সিনেমা ধারার বিভিন্ন ছবির অনুরূপ। ছবি শুরু হয় বর্তমান সময় দেখানোর মধ্য দিয়ে। ছবিতে হারবার্টকে দেখা যাওয়ার আগে আমরা দেখতে পাই, হারবার্টের ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের গলির দৃশ্য। দেয়ালে আঁকা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির চিহ্ন। আর গলিতে দেখা যায় যুক্তবাদী সংঘের সদস্যরা হারবার্টকে নিয়ে বিভিন্ন তামাশামূলক মন্তব্য করে হেঁটে যাচ্ছে। এর পরই খোলা জানালার সামনে বিশাল এক মুভি ক্যামেরা ট্রলিতে করে এগিয়ে আসে আর ক্যামেরার পেছনে দেখা যায় হারবার্টের চিত্রপরিচালক পিতা ললিত সরকার আর মা শোভাকে। ললিত বলে ওঠে, ‘অ্যাকশন’। তারপরই জানালার সামনে যুক্তিবাদী সংঘের মানুষদের উদ্দেশ্যে উন্মাদের মতো চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসে হারবার্ট। মনে হয় ললিতের নির্দেশেই হারবার্ট এই অভিনয় করছে। এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াকে উন্মোচিত করার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠে সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ এবং একই সাথে তা ছবিতে দর্শকের মগ্ন হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে তা ছবিতে ব্রেখটীয় এলিয়েনেশন কৌশলের প্রভাবও তৈরি করে। পুরো ছবি জুড়েই বিভিন্ন সিকোয়েন্সে কোনো ঘটনা ঘটার পর ক্যামেরা ধীরে ধীরে প্যান করে, একটি বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শোনা যায় এবং আমরা দেখি ললিত সরকার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে, আবার কখনো নিজে ক্যামেরা চালিয়ে দৃশ্যটি ধারণ করছে। এমনকি ললিতের দুর্ঘটনার দৃশ্যটি দেখা যাবার পরেও দূর থেকে দেখা যায়, ক্যামেরার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে [হয়তো ললিত নিজেই] দৃশ্যটি ধারণ করছে। বেশির ভাগ সময়ই তার পাশে দেখা যায় তার স্ত্রী, হারবার্টের মা শোভাকে।

বিনুর কথা শুনে হারবার্টের পৃথিবী নড়ে-চড়ে ওঠে
বিনুর কথা শুনে হারবার্টের পৃথিবী নড়ে-চড়ে ওঠে

ললিত আর শোভাকে হারবার্টের ব্যাপারে বিভিন্ন মন্তব্যও করতে দেখা যায়। বোঝা যায়, পুরো চলচ্চিত্রটি মূলত ললিত পরিচালনা করছে। মাঝে মাঝে ললিত মন্তব্য করে, ‘এই ছবিটা আবার ফ্লপ করবে না তো’। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার মতো একটি বাস্তব দিকে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পাশাপাশি ছবির বিভিন্ন সিকোয়েন্সে ললিত আর শোভা– এই দুই মৃত মানুষের উপস্থিতি হারবার্টের মৃত মানুষদের সাথে যোগাযোগের মতো অবাস্তব দিকের প্রতিও দর্শকের মনোযোগ আকৃষ্ট করে। বাস্তব আর অবাস্তবের মধ্যে তৈরি হয় একটি সংঘর্ষ। হারবার্টের জীবনেও দেখা যায় বাস্তব আর অবাস্তবের পাশাপাশি উপস্থিতি। হারবার্ট বর্তমান সময় সম্পর্কে সচেতন। এই কারণে বর্তমান সময়ের মানুষের নেতিবাচক আচরণ তাকে ক্ষুব্ধ করে। অন্যদিকে, হারবার্ট বিভিন্ন সময় যেভাবে কথা বলে, তার সাথে বাস্তব জীবনের কোনো সরাসরি যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া যায় না; যেমন, তাকে একা একাই বলতে শোনা যায়– ‘ক্যাট, ব্যাট, ওয়াটার, ডগ, ফিশ। দোবরের চ্যাঙ দেখবি, দোবরের চ্যাঙ?’ এই অসংলগ্ন কথাগুলো হয়তো হারবার্টের কাছে অর্থবহ; কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষের কাছে এই কথাগুলো পাগলের প্রলাপের মতো শোনায়। হারবার্টের জীবনে অতীতও একটি গুরুত্বপূণ দিক; কারণ, অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি আর ঘটনাই তার বর্তমান আচরণকে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন সিকোয়েন্সে ললিত আর শোভার উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় অতীতকেও।

চিলেকোঠার ছাদে, নিজস্ব পৃথিবীতে, বইপাঠে মগ্ন হারবার্ট
চিলেকোঠার ছাদে, নিজস্ব পৃথিবীতে, বইপাঠে মগ্ন হারবার্ট

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হারবার্ট-এর ন্যারেটিভ ক্রমাগত চলাচল করে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে। ছবিতে বারবার ব্যবহার করা হয় ফ্ল্যাশব্যাক। ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্য থেকে হঠাৎ জাম্প কাটের মাধ্যমে ছবি আবার ফিরে আসে বর্তমান সময়ে। ফিরে আসার আগে কোনো কোনো ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যের মধ্যেই শোনা যায় বর্তমান সময়ের কথাবার্তা; তারপর দৃশ্য ফিরে আসে বর্তমান সময়ে। কখনো কখনো ব্যবহার করা হয় হারবার্টের দেখা কোনো স্বপ্ন দৃশ্য বা কোনো কল্পনা দৃশ্য। ছবির ন্যারেটিভে তাই ধারাবাহিকতা থাকে না। অতীত আর বর্তমানের যুগপৎ উপস্থাপন আর বিভিন্ন জটিল চলচ্চিত্র ভাষার ব্যবহারের কারণে ছবি দেখার সময় দর্শক বারবার বিভিন্ন ব্যাঘাতের সম্মুখীন হয়। ফলশ্রুতিতে দর্শক আর নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। ছবিকে সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ করে তোলার জন্য বারবার ছবিতে চলচ্চিত্রের উল্লেখ দেখা যায়। ললিতকে দেখানো হয় পুরনো মার্কিন ছবির পোস্টারের সামনে, কৃষ্ণ তার ছেলে বিনা আর হারবার্টকে তাদের ছেলেবেলায় এক বিকেলে নিয়ে যায় ছবি দেখাতে। আমরা দেখি, ছবিটি হলো দ্য ব্যাটলশিপ পোটেমকিন, জার-বিরোধী আন্দোলনের ওপর রাশিয়ান পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইনের ১৯২৫ সালে নির্মিত বিখ্যাত চলচ্চিত্র। ‘হারবার্ট’ ছবির দৃশ্যে এবার দেখা যায়, ওডেসা সিঁড়িতে পলায়নরত সাধারণ মানুষের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে যান্ত্রিক পদক্ষেপে জারের সৈনিকদের এগিয়ে আসার সেই বিখ্যাত মন্টাজ দৃশ্য। সাউন্ডট্র্যাকে শোনা যায় সেই দৃশ্যের উত্তেজনায় ভরা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। ব্যাটলশিপ পোটেমকিন-এর দৃশ্য দেখানোর সময় কাট করে কয়েকবার দেখানো হয় কিশোর হারবার্টের মুখ। আমরা দেখতে পাই সেই কিশোরের মুখে পর্দায় জারের সৈনিকদের বর্বর হামলার দৃশ্য দেখে তৈরি হওয়া আতঙ্ক আর উত্তেজনা। ছোটবেলা থেকেই বামপন্থী বাবার দেখাদেখি বিনুও কমিউনিস্ট পার্টির ভক্ত হয়ে উঠেছিল। বিনুর সাথে থেকে হারবার্টও জানতে থাকে সমাজতন্ত্রের কথা। সে পড়ে রাশিয়াতে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের ওপর লেখা জন রীড-এর বিখ্যাত বই, দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন। বিনু আর হারবার্ট দুই কিশোর হাতে লাল পতাকা নিয়ে বাড়ির বারান্দায় লেনিন, স্ট্যালিন, মাও-এর নামে স্লোগান দেয়। বড় হয়ে বিনু ভর্তি হয় কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। বিনুর কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন হারবার্টও বিনু আর তার বাবার সাথে সেখানে যায়। যখন কৃষ্ণ হারবার্টকে প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির নিচে রেখে বিনুকে নিয়ে ওপরে যায়, প্রেসিডেন্সির দীর্ঘ সিঁড়ির নিচে একাকী দাঁড়ানো হারবার্টের মনে পড়ে যায় কৈশোরে দেখা ওডেসা সিঁড়ির সেই দৃশ্য। হারবার্টের দৃষ্টি থেকে লো-অ্যাঙ্গেল শটে দেখানো হয় সেই সিঁড়ি। পর্দায় আবার দেখানো হয় ওডেসা সিঁড়িতে সৈনিকদের পায়ের সেই বহুল-পরিচিত দৃশ্য। এবার হাই-অ্যাঙ্গেল থেকে সিঁড়ির নিচে দাঁড়ানো হারবার্টকে ওডেসা সিঁড়ির দৃশ্যগুলোর সাথে বার বার কাট করে দেখানে হয়। প্রথমে তাকে দেখা যায় এক্সট্রিম লং শটে, এরপর লং শটে, তারপর একটি মিড শটে স্পষ্ট করে তোলা হয় সিঁড়ির দিকে হারবার্টের একদৃষ্টিতে তাকিয়ে পুরনো স্মৃতি মনে করার দৃশ্য।

প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির নিচে, অবাক বিস্ময়ে হারবার্টের দাঁড়িয়ে থাকা
প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়ির নিচে, অবাক বিস্ময়ে হারবার্টের দাঁড়িয়ে থাকা

প্রেসিডেন্সি কলেজে বিনুর ভর্তি হওয়ার দিন হারবার্টের স্মৃতির মাধ্যমে ব্যাটলশিপ পোটেমকিন-এর মতো বামপন্থী বিপ্লবের পক্ষের ছবির দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে বিনু আর হারবার্টের বামপন্থী আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগাম ধারণা দেওয়া হয়। কলকাতার বহু মেধাবী ছাত্রের মতো বিনুও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে মাও সে তুং-এর বিপ্লবী তত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগ দেয় নকশালবাদী আন্দোলনে। বিনুর নকশালবাদী এক বন্ধু এক রাতে বিনুকে বিপ্লবের জন্য শহরে গেরিলা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর ব্রাজিলের মার্কসবাদী বিপ্লবী কার্লোস মারিঘেল্লার লেখা মিনিম্যানুয়াল অফ দি আরবার গেরিলা বইটি দিয়ে যায়। পরের একটি সিকোয়েন্সে দেখানো হয়, হারবার্ট হারিকেনের আলোয় একটি বই পড়ছে। হারবার্টের ভয়েস-ওভারে বইয়ের কথাগুলো শোনা যায় : ‘কম্পিত হৃদয়ে স্পন্দিত বক্ষে গবাক্ষের দিকে অগ্রসর হইলাম। সবেমাত্র শয্যাত্যাগ করিয়াছি এমন সময় কক্ষতলে আমার দৃষ্টি পতিত হইলো। আমি সবিস্ময়ে দেখিলাম পাঁচ সাতটা সদ্যচ্ছিন্ন নরমুণ্ডু কক্ষতলে গড়াইয়া বেড়াইতেছে। সেই মুণ্ডুর লকলকে রসনা আমার হৃদয়ে মহাআতঙ্কের সঞ্চার করিলো। আমি পুত্তলিকাবৎ স্থির হইয়া দাঁড়াইলাম। পদমাত্র অগ্রসর হইতে সাহস করিলাম না। পরক্ষণে আবার গগণভেদী চিৎকার’ –এই ভয়েস-ওভারের সময় সাউন্ডট্র্যাকে আরও শোনা যায় শঙ্কা ও উত্তেজনা জাগানো সুর। হারবার্টের বই পড়ার দৃশ্যটি কাট করে চলে যায় একটি দৃশ্যে, যেখানে দেখা যায় বিনুর নকশালবাদী বন্ধুটিকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর তাকে আবার পালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। ছেলেটি ছুটতে শুরু করতেই পুলিশ পেছন থেকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে সেই নকশালবাদী তরুণকে। এই দৃশ্যের সাউন্ডট্র্যাকে আতঙ্ক আর অস্বস্তি জাগানো এই কথাগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র-কর্তৃক বিনা বিচারে নকশালবাদীদের হত্যা করাকে পরিচালক তুলনা করেন নারকীয়তার সাথে। অবশ্য একটি দৃশ্যে একজন পুলিশ সদস্যের ওপর নকশালপন্থীদের হামলা এবং তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার দৃশ্যও ছবিতে দেখানো হয়।

দুঃস্বপ্নে, হাত-বাঁধা হারবার্ট
দুঃস্বপ্নে, হাত-বাঁধা হারবার্ট

তার কৈশোরে হারবার্ট তাদের বাড়ির পুরনো এক ঘরে একদিন এক বাক্সে খুঁজে পায় একটি নরমুণ্ডুসহ মানুষের হাড়গোড়। হয়তো এই পুরনো বাড়ির কোনো পূর্বপুরুষের সম্পত্তি ছিল কাপালিক বা তান্ত্রিকের প্রয়োজনে আসা এই জিনিসগুলো। হারবার্ট তার বন্ধুদের সাথে খেলা করে এই নরমুণ্ডু দিয়ে। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রবি নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার পর এবং তার প্রেমিকা বুকি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এক রাতে দুঃস্বপ্নে হারবার্ট দেখে, সে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে আর রবি তার নরমুণ্ডুটা নিয়ে খেলা করছে। হারবার্ট বারবার রবির কাছে তার নরমুণ্ডুটা ফেরত চায়। এক সময় দূর থেকে কপালকুণ্ডুলার বেশে ছুটে আসে বুকি; সে হারবার্টের হাতের বাঁধন কেটে দেয়। তার নরমুণ্ডুটি উদ্ধারের জন্য রবির পিছু পিছু হারবার্ট নদীর জলে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু রবির বদলে জলের নিচ থেকে উঠে আসে কেবল নরমুণ্ডুটি। মনকে তীব্রভাবে অশান্ত আর বিপর্যস্ত করে দেওয়া এই স্বপ্ন দেখার পর হারবার্ট নরমুণ্ডুটি নদীর জলে ফেলে দেয়। কিন্তু দুঃস্বপ্ন দেখা থেকে সহজে তার মুক্তি মেলে না। জীবনের আরেক পর্যায়ে আরেকটি দুঃস্বপ্নেও হারবার্ট দ্যাখে, সে তার পিতামহের সামনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। আর তার পিতামহ হারবার্টকে এবং তাদের পরিবারের অন্য পূর্বপুরুষদের তাদের কার্যকলাপের জন্য গালমন্দ করছে।

বুকির কাছে নিজের গোপন পৃথিবী খুলে দিচ্ছে কিশোর হারবার্ট
বুকির কাছে নিজের গোপন পৃথিবী খুলে দিচ্ছে কিশোর হারবার্ট

হারবার্ট ছবির এইসব স্বপ্নদৃশ্য লুই বুনুয়েলের চলচ্চিত্রে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষদের দেখতে পাওয়া ভীতিকর স্বপ্নগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। বারবার স্বপ্নে নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাওয়া নিজের অবস্থা সম্পর্কে হারবার্টের মনের অসহায় ভাবকেই ইঙ্গিত করে। মা-বাবার সান্নিধ্য ছাড়া বড় হওয়া হারবার্ট নিজের পছন্দের মানুষদের হারানোর পাশাপাশি বাড়িতে তার চাচাতো ভাই ধন্নার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ছোটবেলা থেকেই। নিজের অস্থির, শান্তহীন জীবনের একটু স্বস্তির সময় কাটানোর জন্য কিশোর বয়স থেকেই হারবার্ট বেছে নিয়েছিল তাদের বাড়ির চিলেকোঠার ছাদ। সেখানে বসে হারবার্ট তার পোষা পায়রাদের দ্যাখে, দ্যাখে আকাশে উড়ে যাওয়া ঘুড়ি, অন্য ছাদে তার বন্ধুর করা বাগান, রাস্তা দিয়ে চলাচলরত মানুষ। বারবার ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে লং শটে উড়ে যাওয়া ঘুড়ি আর উড়ন্ত পায়রাদের দেখানোর মধ্য দিয়ে পরিচালক নির্দেশ করেন মুক্তি আর বাধাহীনতা। কিন্তু এই দৃশ্যগুলো ছবিতে আসে সাংঘর্ষিক দৃশ্য হিসেবে; কারণ, স্পষ্ট হয়ে ওঠে হারবার্টের জীবনের সাথে এই দৃশ্যগুলোর বৈপরীত্য। হারবার্টের কষ্টের জীবনে কিছুটা স্বস্তি আর আনন্দ এনে দেওয়া নিজের একমাত্র প্রিয় স্থানটিও বিশ্বায়ন-পরবর্তী সময়ের আগ্রাসনে হাতছাড়া হয়ে যায়। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, হারবার্টের প্রিয় চিল-ছাদে ধন্নার নেতৃত্বে অন্যরা এসে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বিশাল ডিশ অ্যান্টেনা বসাচ্ছে। হারবার্টের পোষা পায়রাদের বসার কাঠামোটি পায়রা-সহ ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। যান্ত্রিকতা আর ভোগবাদিতার প্রভাবে বর্তমান সময়ে সূক্ষ্মঅনুভূতি হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতাই নির্দেশ করা হয় এই দৃশ্যে। বর্তমান সময় হারবার্টকে তাই স্বস্তি দেয় না। সে নিজের শান্তি খুঁজে নিতে নির্ভর করে অতীত স্মৃতির ওপর, তার প্রিয় মানুষদের আত্মার সাথে সে যোগাযোগ করতে চায়। সাধারণ মানুষের কাছে যা অবাস্তব, হারবার্টের কাছে তা-ই বাস্তব হয়ে উঠতে শুরু করে।

'কমরেড' হারবার্ট, ছাদে নকশালবাদী পোস্টার লেখায় মগ্ন
‘কমরেড’ হারবার্ট, ছাদে নকশালবাদী পোস্টার লেখায় মগ্ন

এক দুপুরে অতিপ্রাকৃত, অলৌকিক ব্যাপারে হারবার্টের বিশ্বাসকে বাস্তববাদী, সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বে বিশ্বাসী বিনু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। হারবার্ট যখন অলৌকিক বিষয় সম্ভব বলে বিনুর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, বিনু হারবার্টের সেই মত খণ্ডনের চেষ্টা করে। তারপর সে মাও সে তুং-এর রেড বুক থেকে পড়ে শোনায় কিছু কথা : ‘আমাদের চোখের সামনে হাজার হাজার শহীদ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের কথা মনে পড়লেই আমাদের প্রতিটি জীবিত লোকের হৃদয় বেদনায় ভরে ওঠে। এমন কী স্বার্থ আছে, যা আমরা ত্যাগ করতে পারব না? অথবা, এমন কী ভুল আছে, যা আমরা শুধরে নিতে পারব না?’ বিনু যখন উচ্চস্বরে কথাগুলো পড়ছিল, ক্যামেরা ট্র্যাক করে চলে আসে হারবার্টের সামনে; লো-অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা যায় তার মুখ। তার স্থির এবং অচঞ্চল মুখভঙ্গি নির্দেশ করে– এই কথাগুলো হারবার্টকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। পৃথিবীতে হয়তো অনেক কিছু ঘটে– যা সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; কিন্তু এই দৃশ্যে মাও-এর কথাগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে এই বক্তব্যটিও উঠে আসে যে, মানুষের পক্ষেই সম্ভব অসাধ্যকে সাধন করা; যা অর্জন করা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় অসম্ভব, মানুষ নিজের গভীর ইচ্ছা আর মনের জোরের সাহায্যে তা-ই অর্জন করতে পারে। মনের জোর আর সাহসকে সম্বল করে সমাজ বদলের জন্যই বিনুর মতো অনেক তরুণ যুক্ত হয়েছিল নকশালবাদীদের সঙ্গে। সে বিপ্লবীদের জন্য খবর আনা-নেওয়ার কাজ করে, ছাদে নিজের প্রিয় জায়গায় বসে সে নকশালবাদী আন্দোলনের জন্য পোস্টার লেখে; বিনু যখন বাড়ি ছেড়ে বিপ্লবে যোগ দেওয়ার জন্য চলে যায়, তখন বিনুর গোপন বইপত্র হারবার্ট ছাদে নিয়েই পুড়িয়ে ফেলে। তার নিজের প্রিয় স্থানটি কেবল আর তার নিরিবিল ভাবনার জন্য নয়; তা ব্যবহৃত হয় সশস্ত্র বামপন্থী বিপ্লবের প্রয়োজনে। ছাদে বসে হারবার্টের পোস্টার লেখার সময় আবার ক্যামেরার পাশে ললিত আর শোভাকে দেখা যায়। ললিত যখন নিজে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোভ রেখে ছেলের দিকে তাকায়, তখন ললিতের ক্যামেরায় সাদা-কালোতে দেখা যায় কমিউনিস্ট চিহ্ন দেওয়া সামারিক ইউনিফর্ম পরে হারবার্ট স্টেনগান হাতে চারদিকে গুলি চালাচ্ছে। এই কল্পনা দৃশ্যটি হারবার্টের নয়, তা ললিতের এবং ফলশ্রুতিতে এই ছবির পরিচালকের। পরিচালকের এই কল্পনা দৃশ্য ছবিতে দেখে আমরা ধারণা করতে পারি, তিনি তার ছবির প্রধান চরিত্রকে একজন রাজনৈতিক বিপ্লবী হিসেবেই দেখতে চান। ফলে দৃশ্যটি সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে পরিচালক তার রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করেন।

হারবার্ট কাকুকে, মৃত্যুর আগমুহূর্তে গোপন ডায়েরির কথা বলে যায় বিনু
হারবার্ট কাকুকে, মৃত্যুর আগমুহূর্তে গোপন ডায়েরির কথা বলে যায় বিনু

এক রাতে বিনু আর তার এক বন্ধু হঠাৎ বাড়িতে আসে। হারবার্টকে বাড়ির বাইরে পাহারায় রেখে ঘরে বসে তারা নিজেদের কিছু কাজ গুছিয়ে নেয়। সেদিন ছিল হারবার্টের জন্মদিন। জ্যাঠাইমার কাছ থেকে হারবার্ট দুই পেয়ালা পায়েস নিয়ে এসে বিনু আর তার বন্ধুকে দেয়। হারবার্টের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও বিনু সেই রাতটি বাড়িতে না থেকে বেরিয়ে পড়ে এবং দেয়ালে নকশালবাদী স্লোগান লেখার সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে ধরা পড়ে। গুরুতর আহত বিনুকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখা যায়; খাটের লোহার হাতলের সাথে শিকল দিয়ে তার পা বাঁধা থাকে। এই অবস্থায় তাকে নিষ্ঠুরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে এক পুলিশ অফিসার। পুলিশের এই নিষ্ঠুরতার কারণেই মারা যায় বিনু। মারা যাওয়ার আগে হারবার্টের সাথে শেষ কথার সময় সে হারবার্টকে জানায় বাড়িতে মা কালীর ছবির পেছনে লুকিয়ে রাখা তার ডায়েরির কথা। বিনুর মৃত্যুর পর একদিন স্বপ্নে হারবার্ট দেখতে পায় বিনুকে। বিনুকে স্বপ্নে দেখে তার মনে হয়, বিনু স্বপ্নেই তাকে ডায়েরির কথা জানিয়েছে। ডায়েরিটি সত্যি পাওয়া যাওয়ার পর বাড়ির লোকেরাও মনে করতে থাকে, হারবার্ট অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়েছে। হারবার্টের সঙ্গী, পাড়ার কিছু তরুণ এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করতে চায়। হারবার্ট মৃত আত্মার সাথে কথা বলতে সক্ষম– এমন সাইনবোর্ড তারা তৈরি করে আনে। অনেক মানুষ আসতে থাকে হারবার্টের কাছে। হারবার্টের অপ্রকৃতিস্থ ভাব ততদিনে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সে মানুষদের যেসব কথা বলে, তার বেশির ভাগই হয়ে ওঠে হারবার্টের অস্থির মনের নানা সংলাপ; তার কাছে আসা মানুষরা সেই সব কথা বুঝতে পারে না। তবুও অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট মানুষরা তার কাছে আসতে থাকে। আরেকজন ব্যবসায়ী প্রচারের মাধ্যমে হারবার্টকে আরো পরিচিত করে তুলতে চায়। সেই ব্যবসায়ীর উদ্যোগে সংবাদপত্রে হারবার্টের ওপর ফিচার ছাপা হয়– ‘ডেড স্পিকস ইন আ ডিভাইন সুপারমার্কেট’নিজের ইচ্ছে আর উদ্যোগ না থাকার পরও কেবল তার চারপাশের মানুষদের আয়োজনে হারবার্ট জড়িয়ে পড়ে মৃতের সাথে কথা বলার এই তথাকথিত ব্যবসায়। ভোগবাদিতার এই সমাজে হারবার্টের মতো সহজ-সরল মানুষ এই কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে মুনাফালোভী মানুষদের চাপে।

কৈশোরে, লুকিয়ে বুকিকে দেখা
কৈশোরে, লুকিয়ে বুকিকে দেখা

হারবার্টের কাছে আসা মানুষদের সাথে কথাবার্তা বলার সময় ললিত আর শোভাকে আবার দেখা যায়। ললিত শোভাকে মন্তব্য করে– ‘তোমার ছেলের সাধারণ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। সে টাকার লোভে যা খুশি তাই বলছে।’ কিন্তু টাকার লোভ বা জীবনে প্রথমবারের মতো ভালোভাবে অর্থ উপার্জনের পরও হারবার্টের মন অনুভূতিহীন হয়ে যায়নি, তার বোঝা যায় যখন প্রায়ই পথ চলার সময় হারবার্ট দাঁড়িয়ে পড়ে একটি দোকানের সামনে। দোকানের কাচ ঘেরা জানালা দিয়ে ভেতরে দেখা যায় একটি মর্মরের নারীমূর্তি। নারীটির শরীরে ডানা লাগানো; অর্থাৎ, মূর্তিটি দেখতে মর্ত্যের কোনো মানবীর মতো নয়। প্রতিবার পথ চলার সময় হারবার্ট চলে আসে এই দোকানের সামনে; দোকানের জানালার কাচে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে চায় নারীমূর্তিটিকে। ক্লোজ-আপের মাধ্যমে দেখানো হয় মর্মরের তৈরি সেই নারীর মুখ। সেই মুখে কোনো কালিমা নেই, কষ্টের ছাপ নেই, কৌলুষ নেই। হারবার্ট নির্নিমেষ চেয়ে থাকে সেই অপূর্ব সুন্দর মুখের দিকে। সেই মুখটি কি তাকে তার মায়ের মুখের কথা মনে করিয়ে দেয়? নাকি বহু বছর আগে শেষ দেখা তার কৌশোরের প্রেমিকা বুকির কথা তার মনে পড়ে যায় মূর্তিটি দেখে? মনোযন্ত্রণায় ক্রমাগত পিষ্ট আর নির্মল আনন্দবিহীন এক সময়ে এই মূর্তিটির মুখ হয়তো হারবার্টের জন্য শান্তির স্পর্শ নিয়ে আসে কিছুক্ষণের জন্য।

কাচ-ঘেরা নারীমূর্তি ছুঁইয়ে দেখার চেষ্টা
কাচ-ঘেরা নারীমূর্তি ছুঁইয়ে দেখার চেষ্টা

মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকা নির্দেশ করে শান্তির জন্য হারবার্টের ভেতরের হাহাকার, আর তার মনের অনুভূতিশীলতা। কিন্তু যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা হারবার্টের অনুভূতিশীল মনকে বা তার দুঃখকে বোঝার চেষ্টা করেনি। তাদের কাছে হারবার্ট হয়ে ওঠে প্রতারক। তার অবান্তর কথাগুলো হয়ে ওঠে পাগলের প্রলাপ। হারবার্টের বাড়িতে এসে তারা তীব্রভাবে অপমান করে হারবার্টকে। যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা হারবার্টের অস্থির আচরণ যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে না। এই মানুষটির এমন অস্বাভাবিক কথাবার্তার জন্য এই সমাজ আর রাজনীতির দায় কতটা– তা বিশ্লেষণ করতেও তারা ব্যর্থ হয়। তারা একতরফাভাবে কেবল দোষারোপ করে হারবার্টকেই। যুক্তিবাদী সমিতির সভ্যদের কাছে হারবার্ট একজন অস্বাভাবিক মানুষ, একজন ভণ্ড। আর যুক্তিবাদী মানুষরা নিজেদের স্বভাবতই মনে করে, তারা স্বাভাবিক। তাদের আচরণ দেখে মনে পড়ে আলফ্রেড হিচককের স্যাবোটার [১৯৪২] ছবিতে সমাজের নিম্নশ্রেণির এক চরিত্রের করা একটি মন্তব্য– ‘নরমালস আর নরমালি কোল্ডহার্টেড’

যুক্তিবাদী সংস্থার রোষানলে হারবার্ট
যুক্তিবাদী সংস্থার রোষানলে হারবার্ট

এই যুক্তিবাদী, উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির মানুষরা কিন্তু তাদের যুক্তি এবং স্বাভাবিক আচরণ দিয়ে হারবার্ট এবং তার মতো আরো বহু মানুষের ওপর যে অস্বাভাবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চলে আসছে– তা বন্ধ করতে পারে না। তাদের অপমানজনক আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ে হারবার্ট, আর তার এই প্রতিবাদ হয়ে ওঠে তথাকথিত যুক্তিবাদী মানুষদের শীতল আচরণ আর বৃহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই মানুষদের শক্ত অবস্থান গ্রহণের ব্যর্থতার সমালোচনা। যুক্তিবাদী সমিতির সভ্যদের উদ্দেশ্যে হারবার্ট চিৎকার বলে– ‘পুলিশ বিনুকে গুলি করে মেরেছে।’ হারবার্টের এই চিৎকারকে বোঝার চেষ্টা করে না উপস্থিত যুক্তিবাদী মানুষরা। তাদের নির্লিপ্ততা কোনো কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই সমাজের অগ্রসর এবং প্রগতিশীল মানুষদের প্রতিবাদ না করাকেই নির্দেশ করে। হারবার্ট মারা যাবার পর তার পরিবারের সদস্যদের পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশের কর্মকর্তা যখন কৃষ্ণকে হারবার্ট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, কৃষ্ণ জবাব দেয়, হারবার্টের মতো নিরীহ ছেলে সে দেখেনি। যখন পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করে, তার নিজের ছেলে বিনুকেও কৃষ্ণ নিরীহ মনে করে কিনা, কৃষ্ণ জবাব দেয়, বিনুকে সে নিরীহ মনে না করলেও টেররিস্ট মনে করে না; কারণ, নকশাল আন্দোলন চলাকালীন সময়ে রাষ্ট্রের টেররও কোনো অংশে কম ছিল না।

অপমানিত হয়ে, আত্মহত্যার আগমুহূর্তে, ক্ষুব্ধ হারবার্ট
অপমানিত হয়ে, আত্মহত্যার আগমুহূর্তে, ক্ষুব্ধ হারবার্ট

হারবার্টের শেষকৃত্যের সময় ঘটে যাওয়া শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের কারণ পুলিশ বের করতে পারে না। এই বিষয় নিয়ে তদন্ত শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে হারবার্ট একজন অপ্রকৃতিস্থ মানুষ ছিল, সেই মতই প্রকাশ করা হয়। একজন অফিসার পোস্টমডার্ন মনস্তত্ত্ব উল্লেখ করে বলে, সব অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তিই রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বী। কিন্তু ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বের হয়ে আসে এই ঘটনার মূল তদন্তকারী অফিসারের মুখ থেকে– ‘সরকার বলুন, রাষ্ট্র বলুন, পুলিশ বলুন–কখন কোথায় কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তা কে ঘটাবে, সেটা জানতে আমাদের এখনো অনেক বাকি আছে।’ প্রতিবাদ কখনো থেকে যাবে না। কোনো না কোনোভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়াবে, আর এই প্রতিবাদ যুগ যুগ ধরে মানুষ মনে রাখবে এবং অনুপ্রাণিত হবে– হারবার্ট এই বক্তব্যই তুলে ধরে। ছবির শেষে পুলিশের কর্তাদের মতো দর্শকও যখন হারবার্টের শেষকৃত্যের সময় ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের কারণ বুঝতে পারে না, তখন একটি ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যের মাধ্যমে ছবিতে আবার ফিরে আসে পূর্বে দেখানো হারবার্টের জন্মদিনের রাতের সেই দৃশ্য। হারবার্ট যখন বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বিনু আর তার বন্ধুকে পাহারা দিচ্ছিল, তখন বিনু আর তার বন্ধু তাদের বিপ্লবের কাজে ব্যবহারের জন্য সম্ভবত আলবেনিয়া থেকে আনা শক্তিশালী এবং উন্নতমানের ডিনামাইট একটি তোশকের মধ্যে সেলাই করে লুকিয়ে রাখে। সেই রাতেই ধরা পড়ে বিনু। সেই তোশক থেকে ডিনামাইট আর বের করা হয় না। সেই তোশকের ওপর হারবার্টের মৃতদেহ রেখেই তাকে শব-চুল্লির মধ্যে ঢোকানো হয়। হারবার্টের জন্মদিনের রাতে তোশকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ডিনামাইট তার মৃত্যুর পর তাকে দাহ করার দিকে সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বিস্ফোরিত হয়। উদ্ভট এবং খাপছাড়া কথাবার্তা বলা একজন মানুষের মৃতদেহ দাহ করার সময় এই বিস্ফোরণের অর্থ তথাকথিত যুক্তিবাদীরা কোনো যুক্তি দিয়েই ব্যাখ্যা করতে পারে না। তেমনি, মানুষের ক্রোধ কখন কীভাবে কেন বিস্ফোরিত হবে– সেই কথাও এই মানুষদের পক্ষে ধারণা করা সম্ভব হয় না অনেক সময়ই


গ্রন্থ-সূত্র : দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র-- বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী/ নাদির জুনাইদ । জনান্তিক, ২০১৪

লেখকের অনুমতিক্রমে রিপ্রিন্ট করা হলো– ফিল্মফ্রি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; সমালোচক; সিনে-তাত্ত্বিক; শিক্ষক। অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। পিএইচডি থিসিস : বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।। সিনে-গ্রন্থ : দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র-- বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী [২০১৪]; বাংলা রাজনৈতিক চলচ্চিত্র-- সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের প্রতিবাদী ছবি [২০১৫]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন