ফেরা: তারেক মাসুদ ফিরে গিয়েছেন

0
213
ফেরা
সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও নির্মাণ । প্রসূন রহমান
নির্বাহী প্রযোজক । ক্যাথরিন মাসুদ
সিনেমাটোগ্রাফি । বায়েজিদ কামাল
সাউন্ড রেকর্ডিং । মাসরুর রহমান মাসুদ 
টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর । গাজিউল হক মানিক
রানিংটাইম । ৩৮ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । বাংলাদেশ 
মুক্তি । ২০১২

লিখেছেন ফাহমিদুল হক


 

মানুষের শেকড় অনেক জায়গায় প্রোথিত হয়… পথটাই আসল শেকড়… আমরা কোথাও না কোথাও যাচ্ছি, কোথাও না কোথাও ফিরছি…
–চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের মুখে উচ্চারিত এই কথাগুলোকে অমোঘ বাণী বলে মনে হয়। তারেক মাসুদের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর আগে ধারণকৃত সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ফেরা। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন তারেক মাসুদেরই সহকারি পরিচালক প্রসূন রহমান। চলচ্চিত্রটিতে আমরা দেখতে পাই তারেক মাসুদ মাইক্রোবাসে করে তার নিজের বাড়ি ফরিদপুরে যাচ্ছেন, বাড়িতে বাবা-মা, ভাতিঝিদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এবং আবার ঢাকায় ফিরে আসছেন। এই আসা-যাওয়ার সময় তিনি কথা বলছেন নিজের মাদ্রাসাজীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি নিয়ে এবং অবশ্যই চলচ্চিত্র নিয়ে। ৩৮ মিনিটের চলচ্চিত্রটিতে আমরা তারেক মাসুদের মুখে যা শুনতে পাই, তাতে তার আত্মজীবনীর পুরোটা বর্ণিত হয়নি, তেমনি তার সমগ্র চলচ্চিত্রভাবনাও উঠে আসেনি। কিন্তু যা পাওয়া গিয়েছে, তাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের অকালমৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট।

এরপরও আমি বলবো যে তারেক মাসুদই বাংলাদেশের সবচেয়ে ওয়েল-ডকুমেন্টেড চলচ্চিত্রকার। কারণ, তার মৃত্যুর পর সহধর্মিনী চলচ্চিত্রকার ক্যাথরিন মাসুদের উদ্যোগে তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে তার লেখালেখির সংকলন, চিত্রনাট্যের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তারেক মাসুদ তার জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশ করেছেন, অবশ্য নানান প্রতীকীকরণের মধ্য দিয়ে, চালচ্চিত্রিক ভাষার মধ্য দিয়ে। কিন্তু নানান জনকে দেয়া তার অসংখ্য সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি অনেক বিষয় আলোচনা করে গেছেন। প্রকাশিত হবে সেইসব সাক্ষাৎকারের সংকলনগ্রন্থও। প্রসূন রহমানের ফেরা তেমনই এক সাক্ষাৎকার, চলচ্চিত্ররূপে যা প্রকাশলাভ করেছে। এই প্রামাণ্যচিত্রটির নির্বাহী প্রযোজক ক্যাথরিন মাসুদ, পরিবেশিত হয়েছে তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে।

প্রামাণ্যচিত্রের শুরুতে আমরা দেখতে পাই মাইক্রোবাসটি কাকরাইল মসজিদ এলাকা অতিক্রম করছে, এবং তারেক মাসুদ বলছেন এখানকার মাদ্রাসায় তিনি শৈশবে পড়েছেন। আরও পড়েছেন ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায়। তবে ঢাকার মাদ্রাসা থেকে তার চাচারা তাকে নিয়ে চলে যেতেন, এটা তার বাবার পছন্দ হয়নি। তাই চাচাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল যশোরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মাদ্রাসায়। এভাবে ছোটবেলাতেই তাকে অনেক জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, অনেক স্থানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এবং এভাবে ভিন্ন ধরনের মানুষ বা প্রকৃতির প্রতি তার সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন এই জার্নি তিনি সবসময় এনজয় করেছেন। তিনি তার শৈশবে লঞ্চে করে পরাক্রমশালী পদ্মা কী রকম করে অতিক্রম করতেন তার বর্ণনা দিয়েছেন, ভয়ঙ্কর এক লঞ্চ-দুর্ঘটনা থেকে কীভাবে বেঁচে গিয়েছেন তারও বর্ণনা করেছেন।

পোস্টার । ফেরা
পোস্টার ফেরা

তিনি এও বলেন যে, এইসব যাওয়া-আসার মধ্যে তিনি শহরের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি শহরকে ২৪ ঘণ্টা খোলা, এক আড়ঙের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে সারাক্ষণ উৎসব চলেছে। গ্রামের ছেলে হয়েও গ্রামকে পুনঃআবিষ্কার করেন তিনি তরুণ বয়সে আদম সুরত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে এসে, চিত্রকর এস এম সুলতানের সান্নিধ্যে এসে। সুলতানের চোখে তিনি গ্রামের শক্তি ও সৌন্দর্যকে চিনেছেন। নানান মেলা দেখতে, বাউল-কীর্তন গান শুনতে তিনি সুলতানের সঙ্গে চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। তারেক মাসুদের মানসগঠনে সুলতানের প্রভাবের কথা তিনি সবসময়ই স্বীকার করে এসেছেন।

ঢাকায় ফেরার পথে তারেক মাসুদ কথা বলেছেন চলচ্চিত্র নিয়ে। বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র-চর্চার দুই প্রবণতা মাল্টিপ্লেক্স ও ডিজিটাল ফরম্যাট নিয়ে। তারেক মাসুদ ব্যাখ্যা করেছেন ১৫০০ আসনের একক প্রেক্ষাগৃহের পরিবর্তে ২০০-৩০০ আসনের মাল্টিপ্লেক্স কীভাবে কলকাতার চলচ্চিত্রকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এবং পাকিস্তানের চলচ্চিত্র এর মাধ্যমেই কীভাবে ফেরার চেষ্টা করছে। আমেরিকাতে কীভাবে মাল্টিপ্লেক্সগুলোই সিরিয়াস প্রামাণ্যচিত্রকে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনছে তাও বলেছেন। তিনি এই আলোচনা করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কথাকে মাথায় রেখেই। পাশাপাশি তিনি জোর দিয়েছেন ডিজিটাল চলচ্চিত্রকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রতি। তার ভাষায়,
আমার ইদানীংকার আশঙ্কা, আমরা দ্রুত দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছি।
তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ডিজিটাল ফরম্যাট চলচ্চিত্র নির্মাণকে সহজ করে দিয়েছে, অনেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু সত্যিকারের চলচ্চিত্রকার হবার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, তাতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ক্রিকেটের উপমা দিয়ে তিনি বলেছেন যে আমাদের টি-টোয়েন্টি খেললে চলবে না, টেস্ট ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নিতে হবে।

আবার নিজের ও তার প্রজন্মের সীমাবদ্ধতার কথা তিনি স্বীকার করেছেন তার সাক্ষাৎকারে। তার ভাষায়, নিজেদের প্রস্তুত করতে করতে, চলচ্চিত্র বানানোর পরিবেশ তৈরি করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, ছবি হয়তো ভালো করা হয়নি। কিন্তু তিনি আশাবাদী যে, আমরা যে জমি তৈরি করলাম, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো সেই জমিতে বীজ বপন করবে। তার এই আশাবাদ দিয়েই চলচ্চিত্রটি শেষ হয়।

ফেরা । বাবা-মার কাছে তারেক মাসুদ
ফেরাবাবা-মার কাছে তারেক মাসুদ

কেবলই সাক্ষাৎকার এবং কথামালা থাকলে প্রামাণ্যচিত্রের নান্দনিক রসে টান পড়তো। প্রসূন রহমান তাই ছোট ছোট কিছু ঘটনাবলীকে যুক্ত করে ন্যারেটিভে কিছু ব্রেক বা ছেদ দেবার চেষ্টা করেছেন। যেমন ফেরি ঘাটে তারেক মাসুদ নেমে স্পিডবোট খুঁজছেন, স্পিডবোট থেকে ক্যাথরিনের সঙ্গে তিনি নদী ও প্রকৃতির বর্ণনা করছেন, বাড়ি পৌঁছে বাবা-মার শরীর-স্বাস্থ্যের খবর নিচ্ছেন, ভাতিঝিদের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন ইত্যাদি। এইসব টুকরো টুকরো ঘটনা প্রামাণ্যচিত্রে প্রাণ সঞ্চার করেছে। আবার যাওয়া এবং আসা বা কেবলই মাইক্রোবাস ভ্রমণ যে ছিল না সেটা, তা বোঝাতে পারিবারিক মুহূর্তগুলো দেখানো জরুরি ছিল।

প্রসূন রহমানের এই প্রামাণ্যচিত্রটি সমগ্র তারেক মাসুদকে হয়তো ধারণ করে না। তবে সমগ্র তারেক মাসুদের কাছে পৌঁছাতে এ চলচ্চিত্রটি আবশ্যিক টেক্সট হয়ে উঠেছে।


রচনাকাল । ০৬.০৮.১৪
প্রথম প্রকাশ । সমকাল; ১৩ আগস্ট ২০১৪

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক ও চলচ্চিত্র গবেষক; অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা, বাংলাদেশ। সিনে-গ্রন্থ : বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র-- নতুন সিনেমার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ [২০১২]; চলচ্চিত্র সমালোচনা [২০১৩]; তারেক মাসুদ-- জাতীয়তাবাদ ও চলচ্চিত্র [২০১৪]; চলচ্চিত্রের সময়, সময়ের চলচ্চিত্র [২০০৬]*; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প-- সংকটে জনসংস্কৃতি [২০০৮]*। অন্যান্য গ্রন্থ : মিডিয়া ও নারী [২০০৬]; বেড়ালের দেশে ইঁদুর হয়ে [২০০৯]; অসম্মতি উৎপাদন-- গণমাধ্যম-বিষয়ক প্রতিভাবনা [২০১১]; মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি [২০১৩]*; শিপ্রার শহরে কয়েকজন এজেন্ট [২০১২]; সে ও তার ছায়া [১৯৯৭]; এ শহর আমার নয় [২০০৫]; কর্পোরেট মিডিয়ার যুদ্ধ ও তথ্য বাণিজ্য-- ইরাক-আফগানিস্তান-প্যালেস্টাইন [২০০৪]*। [[* যৌথ-রচনা/সম্পাদনা]]

মন্তব্য লিখুন