গ্রীক ফিল্মমেকার থিও অ্যাঙ্গেলোপোলোসের নোট : সময়ের ছাই কিংবা শুরু ও শেষের খসড়া

1
297

অনুবাদ  রুদ্র আরিফ

  অনুবাদকের নোট
থিও অ্যাঙ্গেলোপোলোস [২৭ এপ্রিল ১৯৩৫-২৪ জানুয়ারি ২০১২]। গ্রীসের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ফিল্মমেকার। ‘দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ারস’ [১৯৭৫], ‘দ্য বি-কিপার’ [১৯৮৬], ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’ [১৯৮৮]-এর মতো ফিল্ম বানিয়ে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে আমৃত্যু গ্রীক ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিকে দেখিয়েছেন কাব্যিক স্বপ্ন, এবং বিশ্বব্যাপী অর্জন করেছেন অনন্য খ্যাতি। ‘ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’র [১৯৯৮] জন্য কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সর্বোচ্চ পদক “পাম দি’অর”জয়ী এই ফিল্মমেকারের ফিল্ম বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাকর ফেস্টিভ্যালগুলোতে দেখানো ও ফিল্মস্কুলগুলোতে পাঠ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মুক্তিপ্রাপ্ত ও সম্পন্ন করা সর্বশেষ ফিল্ম ‘দ্য ডাস্ট অব টাইম’ [২০০৮]-এর অফিসিয়াল ওয়েব সাইট থেকে এই নোটটি হাজির করা হলো…

সিনেমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু হয়েছে অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। সালটা ১৯৪৬ নাকি ’৪৭– ঠিক মনে পড়ছে না। যুদ্ধোত্তোর সেই সময়ে ফিল্ম দেখার হিড়িক পড়েছিল। আর আমরা, মানে বাচ্চারা বক্স অফিসের লাইনে গাঁদাগাদি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বড়দের ভিড়ে চুপিসারে মিশে যেতাম– ব্যালকনির জাদুকরি অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্যে।

প্রচুর ফিল্ম দেখেছি তখন; তবে তার মধ্যে প্রথমটি ছিল [হাঙ্গেরিয়ান-আমেরিকান ফিল্মমেকার] মাইকেল কার্টিজের অ্যাঞ্জেলস উইথ ডার্টি ফেইসেস [১৯৩৮]। ফিল্মটির এক দৃশ্যে নায়ক একটি ইলেক্ট্রিক চেয়ারে বসে থাকে; তার পাশে দুজন গার্ড। তারা যখন হাঁটে, তখন দেয়ালে তাদের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এরপর হঠাৎ কান্না শোনা যায়– ‘আমি মরতে চাই না। আমি মরতে চাই না।’ এটি দেখার পর অনেক অনেক রাত এই কান্নাটি আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আর সিনেমা আমার জীবনে ঢুকে গেছে একটি ছায়া হয়ে; এরপর বড় হয়ে উঠেছে একটি দেয়ালে ও একটি কান্নায়

রিকনস্ট্রাকশন
রিকনস্ট্রাকশন

খুব অল্প বয়সেই লেখালেখি শুরু করি আমি; আর একই সময়ে অতীত ইতিহাসের কোলাহল থেকে উঠে আসা হট্টগোল ও আবেগের প্রতি ঘোর সৃষ্টি হয় আমার ভেতরে। ১৯৪০ সালে যুদ্ধের সাইরেন, আক্রান্ত এথেন্সে দখলবাজ জার্মান আর্মির প্রবেশ– এ-ই ছিল আমার প্রথম সাউন্ড, প্রথম ইমেজ। এরপর ১৯৪৪ সালে এলো গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা। আমার বাবা মৃত্যুদণ্ড পেলেন। এরপর আমার হাত ধরে রাখা মায়ের কম্পিত হাত এক খোলা মাঠে আরও অসংখ্য মৃতদেহের ভেতর খুঁজে বেড়ালো বাবার লাশ। বহুদিন পর বহুদূর থেকে একটি বার্তা এলো তার। এক বর্ষণমুখর দিনে ফিরে এলেন তিনি। আমি পেলাম প্রথম গল্প। শব্দাক্ষরের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হলো আমার; এই শব্দেরা করছিল চিত্রকল্পের খোঁজ। এরপর [শব্দগুলোর] কী হলো– জানি না আমি। এর বেশ কিছুদিন পর আমার প্রথম স্ক্রিপ্ট লেখার কালে সেই শব্দগুলো হাজির হলো আবার। শব্দগুলো ছিলো– ‘এখন বৃষ্টি হচ্ছে।’

আমাদের সময়ে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে [গ্রীক মহাকবি] হোমার ও অন্য প্রাচীন ট্রাজিক কবিদের রচনার অংশবিশেষ পাঠ্য ছিল। প্রাচীন মিথগুলোকে সঙ্গী করে জীবন কাটতো আমাদের, আর সেগুলোও বাস করত আমাদের মধ্যে। স্মৃতিকথা, সুপ্রাচীন পাথরসমূহ ও ভাঙা ভাস্কর্যে ভরা এক ভূমিতে আমাদের আবাস। সমকালীন গ্রিক শিল্পের সব শাখাই এই সহাবস্থানের নিশানাকে মেনে চলে। যে পথে চলেছি আমি, যে জীবনধারাকে করেছি গ্রহণ– তাতে এইসব বিষয়ের অন্তঃস্থলে প্রবেশ না করতে চাওয়ার ভাবনা অসম্ভব ছিল। কবি যেমন বলেছেন,
       যে স্বপ্নে আনাগোনা আমার, সেই স্বপ্ন থেকেই আবির্ভাব ঘটেছে এগুলোর। ফলে, পরস্পর মিলেমিশে চলতে থাকে আমাদের জীবন; ফলে, এগুলোকে আলাদা করে দেওয়া দুরূহ ভীষণ।

সাহিত্য ও কবিতার সঙ্গে নিজের একেবারেই শুরুর দিকের সম্পর্ক আমাকে এইসব অনুসন্ধানের কাছে নিয়ে গেছে– হোক তা ভাষাগত কিংবা নান্দনিকতার প্রশ্ন, কিংবা আধুনিকতাবাদের। এরপর ১৯৬০ দশকের শুরুর দিকে, যখন আমি প্যারিসে রাজনৈতিক এক স্বক্রিয়কর্মী, তখন একদিকে ফিরে পেয়েছি [জার্মান কবি ও নাট্যকার বার্টল্ট] ব্রেশটের মহাকাব্যিক থিয়েটারকে, ড্রামাটিক আর্ট নিয়ে [গ্রীক দার্শনিক] এরিস্টটলের ব্যাখ্যাটি হয়ে উঠেছিল রেফারেন্সের আরেকটি দিক। এরিস্টটলের জগতে এবং ট্রাজেডি নিয়ে তার ব্যাখ্যার কাছে আমার ফেরা হয়েছে এরও বহু বছর পরে। ব্যাখ্যাটি এমন :
       ট্রাজেডি হলো কোনো উপযুক্ত কিংবা প্রসিদ্ধ ও নিখুঁত কর্মকাণ্ডের একটি অনুকরণ…।
[আইরিশ সাহিত্যিক] জেমস জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে থাকা মলি চরিত্রটির স্বগতোক্তি যে হোমারের ইলিয়াদ-এ আকিলিসের বাহুর বিস্ময়কর বর্ণনার একটি দূরবর্তী প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছু নয়– সে কথা আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি আরও বহুদিন পরে।

ডেজ অব '৩৬
ডেজ অব ‘৩৬

আমার প্রথম ফিল্ম রিকনস্ট্রাকশন [Anaparastasi; ১৯৭০]-এর জন্ম হয়েছে কর্নেলদের একনায়কতন্ত্রের আমলে– যে একনায়কতন্ত্র উদ্যোগ নিয়েছিল এর টুকরোগুলোর সত্যকে একত্রিত করার। এই রিকনস্ট্রাকশন বা পুনর্গঠন কিন্তু কোনো উদ্দেশ্য নয়; বরং একটি জার্নি থেকে করা। এই ছোট ছোট গল্পগুলো নিজেদের প্রতিফলন ঘটানোর পাশাপাশি বিশাল এক ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধও। প্রতীক হিসেবে বাবা চরিত্রটির উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি এক রূপকধর্মী কনসেপ্টের পাশাপাশি একটি রেফারেন্সও বটে। জার্নি, বর্ডার, নির্বাসন; মানব নিয়তি; শাশ্বত ফেরা– এইসব থিম আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত তখন; এখনো তাড়ায়। নিজের ফিল্মে আমার সকল ঘোরের প্রবেশ ও প্রস্থান ঠিক কোনো এক অর্কেস্ট্রার ভেতর ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর প্রবেশ ও প্রস্থানের মতোই– তারা যেমন [ক্ষণিকের জন্য] চুপ মেরে যায় শুধুমাত্র আবারও বেজে ওঠবে বলে। নিজেদের ঘোরগ্রস্ততার কার্যপ্রক্রিয়া দেখানোটা আমাদের নিয়তিনির্দিষ্ট। আমরা আসলে [সারাজীবন] একটা ফিল্মই বানাই, একটা বইই লিখি। একই থিমের উপর নানা শেপ ও ফিউজ দিই।

আমার কাজ দেখে যারা আমাকে সম্মানিত করেছেন, তাদের অনেকেরই ধারণা, আমার লেখালেখির ধরনটা রাজনৈতিক পছন্দেরই ফল। আসলে কিন্তু তা নয়। হ্যাঁ, একনায়কতন্ত্র নিয়ে বানানো ডেজ অব ‘৩৬ [Meres tou ’36; ১৯৭২] ফিল্মটির শুটিং আমি একনায়কতন্ত্র চলাকালেই করেছি; ফলে প্রত্যক্ষ রেফারেন্স ব্যবহার করা অসম্ভব ছিল বলে একটি গোপন ভাষার আশ্রয় নিয়েছি সেখানে : ইতিহাসের পূর্বসূত্রাবলি, একটি চক্রান্তের ‘মরাকাল’, দমন-পীড়ন, নান্দনিক নীতিকথা হিসেবে ঘোরানো-প্যাঁচানো বয়ান। এই ফিল্মে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়কে দেখানো হয়েছে ক্যামেরা থেকে বেশ দূরত্বে রেখে। তবে লং-শটগুলো আমি কিন্তু এ কারণেই বেছে নিইনি। লং-শট নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক ছিল না। বিষয়টিকে আমি সবসময়ই একটি ন্যাচারাল চয়েস হিসেবে ভাবি। এ হলো স্পেস ও টাইমের ঐক্য হিসেবে স্পেসের সঙ্গে ন্যাচারাল টাইমের মিলিত হওয়ার একটি প্রয়োজনীয়তা। এ হলো অ্যাকশন ও অ্যাকশনের প্রত্যাশার মধ্যে তথাকথিক ‘মরাকালের’ একটি প্রয়োজনীয়তা– যা কিনা সাময়িক বিরতির মতো সুরেলা হওয়ার লক্ষ্যে সাধারণত কাটা পড়ে [ফিল্ম] এডিটরের কাঁচির নিচে। এ হলো শ্বাস নেওয়া, মূল শব্দ ডেলিভারি দেওয়া ও শ্বাস ফেলার কোনো বাসকক্ষের মতো শট নেওয়ার একটি কনসেপ্ট। এই মনোমুগ্ধকর ও বিপজ্জনক চয়েসটি আমি বর্তমানেও অব্যাহত রেখেছি।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সেই একই দলবল নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি আমি। তারা আমাকে বোঝে, তাদেরকেও আমি বুঝি। দিনে দিনে তারা আমার পরিবার হয়ে উঠেছে। কাজের সময় তারা কখনো কখনো আমাকে খেপিয়ে তোলে ঠিকই, তবে তাদেরকে সামনে না দেখলে মিস করি খুব। টিমে যখন কোনো নতুন টেকনিশিয়ান ঢুকে, তখন এতটাই অস্থির লাগে আমার– যেন সবকিছু সেই লোকটির উপরই নির্ভর করছে। আমার পরিকল্পনা ও আমার অস্থিরতা নিয়ে কথা বলি টিমের সঙ্গে। এতগুলো বছর চলে গেল, তবু সেই একই উদ্বেগ, একই অনিশ্চয়তা, সেই একই প্রয়োজনীয়তা– আমাদের আরও ঘনিষ্ঠ থাকা, দম ধরে রাখা, আর শুটিং শেষের অপেক্ষা করা। ভ্রমণ, বিভাজন, অসংলগ্নতা বাড়তেই থাকে।

দ্য ডাস্ট অব টাইম
দ্য ডাস্ট অব টাইম

একটি গাড়ি, একজন ফটোগ্রাফার বন্ধু চালিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে, আর একটি রাস্তা। আমার যে বন্ধুটি গাড়ি চালাচ্ছে, তার পাশে বসে প্রায়ই মনে হয়, এটিই আমার একমাত্র আবাস, একমাত্র জায়গা– যেখানে ভারসাম্য বোধ করি আমি, মনে শান্তি পাই। সামনে খোলা জানালা; ল্যান্ডস্কেপ বদলে বদলে যায়। এইসব ভ্রমণ থেকেই ইমেজগুলোর জন্ম হয়। সেগুলোর নোট রাখার দরকার মনে করি না। এরা জন্মায় নিজেদের ছায়াছবি নিয়ে, নিজেদের রঙ নিয়ে, নিজেদের ধরন নিয়ে, এবং প্রায়শই নিজেদের ক্যামেরা মুভমেন্টও নিয়ে– নিজেদের নান্দনিক ভারসাম্য ও নিজেদের আলো সহকারেই। শত শত ফটোগ্রাফ জমে থাকে স্মৃতিতে। তবে ফিল্মের শুটিং করার আগে এর কোনোটিই শেষ হয়ে যায় না। শুটিংয়ের সময় নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে সবকিছুকে নতুন করে সৃষ্টি করতে হয়। অভিনেতা-অভিনেত্রী, না-দেখা ঘটনা, সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য, হঠাৎ আসা আইডিয়া– এগুলো আগে থেকেই আসতে শুরু করে। অনেক আগে থেকেই। ফিল্মের আইডিয়ার জন্ম আসলে ঘটে কোনো এক নিষ্কর্মা সময়ে।

প্রথম ফিল্মটি বানানোর পর প্রায় ত্রিশ বছর কেটে গেছে। [এইবেলা এসে আমেরিকান কবি টি. এস.] ইলিয়টের মতো আমিও বলতে পারি : দাঁড়িয়ে আছি মাঝপথে। ইতিহাসের উন্মত্ততার ভেতরে মূলত বাতিল হয়ে গেছে দিনগুলি আমার; তবু চিত্রকল্প ব্যবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর আমার প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা একেবারেই একেকটি নতুন সূচনা এবং এক ধরনের ব্যর্থতা; কেননা, যখন আমরা পারি না প্রকাশ করতে নিজেদের– শুধুমাত্র তখনই শিখি। ফলে প্রত্যেকটি ঝুঁকিই হলো অনুভূতির অসারতার ব্যাপক বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি নতুন সূচনা। আবেগের অনিয়ন্ত্রিত স্কোয়াড। অস্পষ্টের পানে একটি আচমকা হানা : যা হারিয়ে গেছে তা ফিরে পেতে; তারপর পাওয়া, এবং আবারো হারানো। ফিরে পেতে…। আমার শেষ মানে হলো আমার শুরু

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন