ছুটির ঘণ্টা : অন্যের আলোয় নিজেকে আলোকিত করার চেষ্টা/ ইলিয়াস কমল

0
184
ছুটির ঘণ্টা
স্ক্রিপ্ট রাইটার ও ফিল্মমেকার আজিজুর রহমান
প্রডিউসার রমলা সাহা
অভিনয় মাস্টার সুমন [খোকন]; সুজাতা [খোকনের মা]; রাজ্জাক [আব্বাস মিয়া]; শাবানা [আঙ্গুরি]; এটিএম শামসুজ্জামান [পণ্ডিত স্যার]
সিনেমাটোগ্রাফার সাধন রায়
মিউজিক সত্য সাহা
এডিটর নুরুন নবী
ডিস্ট্রিবিউটর স্বরলিপি বাণীচিত্র
রঙ সাদা-কালো
রানিংটাইম ২১৩ মিনিট
ভাষা বাংলা
দেশ বাংলাদেশ
মুক্তি ১৯৮০
hHlzWoF

লিখেছেন । ইলিয়াস কমল


সিনেমার সাথে অনেকেরই যেমন শৈশবের গল্প জড়িত, আমারও তেমনি। আমি সেই ছোটবেলা থেকেই হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত। অনেকের কাছ থেকে ছোটবেলায় সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার গল্প শুনেছি। তাতে হলিউডি, উর্দু আর ভারতীয় ছবির গল্পই বেশি শোনা গেছে। এই জায়গায় আমার গল্প একদম বাংলাদেশি বাংলা ছবির। সেই গল্প শুরু হয়েছিলো ‌ছুটির ঘণ্টা দিয়ে। আশির দশকের শেষদিককার প্রেক্ষাপটে একটা মফস্বলের থানা শহর আর কতই বা আধুনিক সিনেমা দেখাবে? সেখানে ছুটির ঘণ্টাই বা কম কিসে।

যে সময় আমি প্রথম ছুটির ঘণ্টা ছবিটি দেখি, তখনকার সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাকে নৃতাত্ত্বিকের ভূমিকায় নামতে হবে। আমি সে পথে যেতে মোটেই আগ্রহী নই। কারণ, যে পথ অচেনা, সেখানে হাঁটতে গিয়ে খেই হারাতে আমি রাজি না। আমি তাই পরিচিত পথেই হাঁটতে আগ্রহী।

সিনেমা হলের দেখা ছবির সাথে তখনকার ভাবনার কোনো প্রশ্ন আসবে না। কারণ ঐ সময় ছবি নিয়ে কোনো ভাবনা ছিলো না। বলা যায়, নিজের আগ্রহেও না, অন্যের আগ্রহেই দেখা হয়েছিলো এই ছবি। কিন্তু একাধিকবার বড় পর্দায় বসে এই ছবি দেখতে দেখতে মস্তিষ্কের ভেতর ছবির গল্পটা গেঁথে গিয়েছিলো। ফলে পরবর্তীকালেও বারবার দেখা হয়েছে। আর এক সময় রূপান্তরিত হয়েছে পছন্দের ছবিতে।

হ্যাঁ, এই সময়ে এসে নকল বা অন্য ছবির অনুকরণে নির্মিত ছবি দেখে বিরক্ত যেমন হই, তেমন বলতেও দ্বিধা থাকে না যে, এই ছবি নকল। কিন্তু এই ছবির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটা বলতে উৎসাহ পাই না। যদিও জানি, এই ছবিটাও তৎকালীন সময়ের একটা বিদেশি ছবি থেকে অনুপ্রাণিত।

ছুটির ঘণ্টা
ছুটির ঘণ্টা

বিদেশি ছবি/গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তা কোথাও স্বীকার করা ছিলো না। আজিজুর রহমান পরিচালিত ছবিটির চিত্রনাট্যকারও পরিচালক নিজেই ছিলেন। ছবির সাথে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশের ঐ সময়কার নামকরা নানান ব্যক্তিত্ব। একজন শিশু কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও বাণিজ্যিক দিক চিন্তা করেই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন রাজ্জাক ও শাবানা জুটি। পাশাপাশি ছিলেন সুজাতা আর এটিএম শামসুজ্জামানও। এত এত তারকা [সে সময় তারা বাংলা সিনেমার তারকাই ছিলেন] ছিলেন ছবিটার কেবলমাত্র বাণিজ্যিকিকরণের লক্ষ্যে। আর সেই লক্ষ্যে ষোলকলা পূর্ণ করেছে অকারণ গেলানো দুটি গান। স্থুল ও কাণ্ডজ্ঞানহীন। এইসব নিয়েই কিন্তু ছবিটা ভালো লেগেছিলো।

ছবির গল্প শুরু বর্তমান থেকে। বর্তমান মানে, যখন ছবি মুক্তি পায় তখনকার সময়, বা ভবিষ্যতের সময় থেকেও হতে পারে। তবে ছবিতে কখনোই এই দুই ঘটনার সময়কাল কোথাও নিশ্চিত করেননি পরিচালক। তা কি চাতুর্য্য না বোকামি– তাও অনেকটা অস্পষ্ট।

গল্পের কেন্দ্রস্থল নীলগীরি বহুমুখি বিদ্যালয়ে আমরা বহুমুখ দেখি না। কেবল ছেলেদেরই দেখি। যে স্কুলের দপ্তরির পাগলা গারদে প্রলাপ দিয়ে শুরু হওয়া ছবি যদি মুক্তির সময়কার ঘটনা মনে করি, তাহলে বাকি ছবি নিশ্চয়ই তার আরও কিছুদিন আগের গল্প। তবে সেগুলোর সময়কাল অস্পষ্টতায় মাখামাখি। ঠিক একই রকম যদি মূল গল্পকে ১৯৮০’র প্রেক্ষাপট হিসেবে ধরি, তাহলে বন্দি উন্মাদ রাজ্জাক ঠিক কতদিন পর পাগলা গারদে চিকিৎসাধীন– তা অস্পষ্ট। কিন্তু মানসিক হাসপাতালের আবহ তৈরি করতে নায়ক রাজ্জাককে আবার ভারি দাড়ি গোঁফসহ মেকআপ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে প্রত্যেক রোগির কেবিন বা গারদ যে পৃথক– তাও খুব একটা পরিস্কার না। মনে হয় কেবল কয়েকটা শিকলের একটা আবহ দিয়েই সেট নির্মাণ করা হয়েছিলো।

গান । একদিন ছুটি হবে...
গান । একদিন ছুটি হবে…

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র যদি ধরি খোকনকে, তাহলে ছবিতে তার ইন্ট্রোটা চমৎকার। স্কুল থেকে ফিরে যে কিনা আগামীকাল জমা দেওয়ার শেষদিন বলে খাওয়া-গোসলের আগেই টিনটিন সিরিজের বই The Crab with the golden Claws পড়ে শেষ করতে চায়। এইটা প্রকৃতই একটা ভালো উদাহরণ যে, আশির দশকে জন্মানোদের অন্যতম প্রধান বিনোদন ছিলো বই। অবশ্য তার আগেও তাই ছিলো। কিন্তু নব্বই দশক থেকে যা ধীরে ধীরে অন্য বিষয়গুলোতে পরিবর্তিত হয়েছে। খোকন যে বই পড়বে, তা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নয়; কারণ, পুরো ছবিতে খোকনকেই ধরা হয় আদর্শিক শিশুচরিত্র হিসেবে। বিদ্যায় সেরা, খেলাধুলায় সেরা, আচরণে ভদ্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সেরা। মানে এখনকার ভাষায় বলতে গেলে অলরাউন্ডার বয়। এই ধরনের ছবির গল্পে প্রোটাগোনিস্ট সবসময় এমন চরিত্ররাই হয়। কেন? আমাদের মস্তিষ্কে কি একটা দুষ্ট ছেলে সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট সারভাইব করার মতো যথেষ্ট মানসিক শক্তি ধারণ করে না? নাকি তাকে যোগ্য হিসেবেই ধরা হয় না? ভালো ছাত্র, ভদ্র ছেলেরা সব ধরনের ঘটনার জন্য প্রস্তুত ভাবতে আমরা অভ্যস্ত। এর পেছনে খুব স্বাভাবিক একটা ভাবনা কাজ করে, তা হলো– তার যোগ্যতা প্রমাণিত। সে সব ক্ষেত্রেই সফল হবে। যদিও গল্পটা সার্ভাইবাল গল্প হিসেবে একটা ব্যর্থ এবং অনুভূতিপ্রবণ গল্প। আরও একটি বিষয় খুব সহজেই বিরাযোগ্য যে, যেহেতু স্কুলের সেরা শিক্ষার্থী এমন একটা দুর্ঘটনার শিকার হতে যাচ্ছে, তাই তার প্রতি মানুষের/দর্শকের আবেগও একটু বেশিই তাড়িত হবে। ফলে ছবি সফল, ব্যবসাও সফল। সামগ্রিক অর্থে এটি একটি রসায়ন হিসেবে কাজ করে। এই রসায়নের সূত্র হিসেবে ছবির চিত্রনাট্যকারকে সফল বলতে দ্বিধা নেই।

ছবির সবচেয়ে ব্যর্থ অংশ হচ্ছে, রাজ্জাক-শাবানা জুটির দুটি গান। কেবলমাত্র দুটি গানই একটা ছবির যে নান্দনিক আবেদন তৈরি হচ্ছিলো– তা হুমকির মুখে পড়ে। অতি বাণিজ্যিকিকরণের ফল এই গান দুটি। ছবিতে মোট গান হলো চারটি। যার মাঝে একটি গান একদম ক্ল্যাসিক শিশুতোষ গানের পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে। অবশ্য সত্য সাহার মতো ব্যক্তিত্ব যখন ছবির সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেন, তখন এটা হওয়া খুব একটা উচ্চাশাপূরণ বলা যাবে না। তবে ‌একদিন ছুটি হবে গানটি কেবল ক্ল্যাসিক শিশুতোষ গানই নয়, বাংলা সিনেমার অন্যতম উল্লেখযোগ্য গানগুলোরই একটি। ছবির সবচেয়ে উপভোগ্য বিষয়গুলোরও একটি। ছবির রূপক চিত্র হিসেবেও দাঁড়ায় এই গান। অথচ কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকনের যে ফ্যান্টাসি, তাও কিন্তু চমৎকার এখানে। শিশুদের কল্পনার যে জগৎ, তাকে বাস্তবায়ন করতে পরিচালক এখানে বর্তমান বাংলাদেশের জাদুকরদের পথিকৃৎ– যিনি কিনা ঐ সময় তরুণ জাদুকর হিসেবে যিনি বেশ উল্লেখযোগ্য ছিলেন, তাকে হাজির করেছেন। জুয়েল আইচের জাদুর জগৎ হিসেবে ছবিতে এসেছে স্বপ্নপুরি— যা বন্ধ স্কুলের বন্ধ বাথরুমে আটকে থাকা খোকনের কল্পনার জগতের উদাহরণ।

স্বপ্নপুরি । বন্ধ বাথরুমে আটকে থাকা খোকনের কল্পনার জগত
স্বপ্নপুরি । বন্ধ বাথরুমে আটকে থাকা খোকনের কল্পনার জগত

আশির দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মাঝে আরও চমৎকার নির্মাণের ছবি আমরা দেখেছি। সেসবের তুলনায় ছুটির ঘণ্টা দুর্বল নির্মাণের ছবি। খোকন যখন বাথরুমে তালাবদ্ধ, যখন পানির জন্য ছটফট করছে, তখন একটা শটে দেখলাম–সিনেমাটোগ্রাফারের ছায়া দেখা যায়! অন্য সময়কার লাইটের প্রসঙ্গ একেবারে বাদ দিলেও এই জায়গায় আসে বিস্মিত না হয়ে পারি না। একটা ছবিতে কি করে এমন একটা শট যোগ হতে পারে? এটাকে দুঃসাহস বলবো না ভুল বলবো– বুঝে উঠতে পারি না। তবে শেষ পর্যন্ত যদি ভুল বলতে চাই, তাতেও অনেক প্রশ্ন থাকে; যার উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে না।

তবে এসব অতিক্রম করে বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণযুগ হিসেবে যদি চিহ্নিত করি, আশির দশককেই করা যায়। সেখানে এই ধরনের সিনেমা হতো। ‘সামাজিক’ ছবি– যা পরিবার পরিজন নিয়ে দেখা যায়। আর এইসব ছবি সে সময়কার চলচ্চিত্রের মুখস্ত প্রেম আর অ্যাকশন ছবির মাঝে একটু বৈচিত্র নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছিলো। তাই বা কম কি? সে কারণেই তো এখনো ছবিটা দেখা হয় মাঝে মাঝে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; সিনে-প্রেমী। ঢাকা, বাংলাদেশ। ফেসবুক পেজ : www.facebook.com/Cinemaghor

মন্তব্য লিখুন