রণ: রাষ্ট্র-মিডিয়ার শ্যামরাজ্যবাদ ও রামগোপাল ভার্মার রাষ্ট্রসাধনা

0
130
রণ
ইংরেজি শিরোনাম  Battle । ফিল্মমেকিং ও স্ক্রিনপ্লে রামগোপাল ভার্মা 
কাহিনী রোহিত বানালিকররামগোপাল ভার্মা । প্রডিউস মধু মন্তেনাশীতল বিনোদ তালওয়ার
সিনেমাটোগ্রাফি অমিত রায়অমল রাথোড় । এডিটিং নিপুণ গুপ্ত । মিউজিক অমর মোহাইল 
অভিনয় অমিতাভ বচ্চন [বিজয় হর্ষবর্ধন মালিক], সুদীপ [জয় মালিক], পরেশ রাওয়েল [মোহন পাণ্ডে], 
মনীষ বেল [অমরেশ কাকার]। রানিং টাইম ১৩৭ মিনিট । ভাষা হিন্দি । দেশ ভারত 
মুক্তি ২৯ জানুয়ারি ২০১০

লিখেছেন জাহেদ সরওয়ার


রাষ্ট্র হলো একটি শ্রেণীর উপর অন্য একটি শ্রেণীর আধিপত্য বজায় রাখার যন্ত্র  –ভ্লাদিমির লেনিন

মানবজাতির জীবন পরিক্রমায় একসময় শোষণমুক্ত সমাজ বা সাম্যবাদী সমাজ ছিল। তখন গোত্রের প্রবীণরাই বলতে গেলে গোত্রের হর্তাকর্তা ছিলেন। অভিজ্ঞতা থেকেই তারা সমাজ বা গোত্র পরিচালনা করতেন, রীতিনীতি, প্রথা, সহনশীল ক্ষমতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। তখনও মানুষের হিংসা মানুষকে আক্রান্ত করে নাই। উৎপাদনের ভিত্তিতে যখন পুঁজির সঞ্চয়ের সম্ভাবনা দেখা দিল, কিছু মানুষ অন্য মানুষের সমস্ত সঞ্চয় নিজেদের কাছে গচ্ছিত করল। এবং শ্রেণীভিত্তিক সমাজ দেখা দিল। দাস ও দাসমালিক দেখা দিল। তখন রাষ্ট্র্রেও দেখা মিলল। সঞ্চিত পুঁজিকে রক্ষা করা, বাড়িয়ে তোলা ও নিরাপদে রাখার জন্য তার দরকার হলো এমন কিছু উপকরণ– যার বিকাশসুলভ আজকে আমরা দেখতে পাই সশস্ত্র সেনাবাহিনী, কারাগার, ও বলপূর্বক ও ছলাকলায় অন্যের ইচ্ছাকে আয়ত্ত্বে আনার অন্যান্য উপায়, এ সবই হলো রাষ্ট্রের আসল সত্তা।

অমরেশ কাকার । মিডিয়াকে দেখেন ব্যবসা হিসাবে
নিউজ চ্যানেলের মালিক অমরেশ কাকার । মিডিয়াকে দেখেন ব্যবসা হিসাবে

দাস বা নিম্নশ্রেণীর মানুষকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত বিশ্লেষণ করে অনেক দিন পর্যন্ত সান্ত্বনা দিয়ে আসছে বুর্জোয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা। রাষ্ট্র ক্রমাগত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তার কাজকর্ম থেকে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখে। এত দূরে, যেখান থেকে রাষ্ট্রকে দেখা যায় না। যেহেতু দেখা না গেলে তার অস্তিত্ব বা অস্তিত্বহীনতা নিয়ে দাসশ্রেণী সন্দিহান হয়ে উঠতে পারে। তার জন্য দরকার বিভিন্ন ইস্যু– যেমন, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, মিডিয়া। জাতীয়তাবাদকে জিইয়ে রেখেও আরো দেদারসে মজার মজার বিষয় দিয়ে জনগণকে নিরন্তর দায়িত্ববোধের অভিনয় ও আত্মবিভ্রান্ত করে রাখা হয়। বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের আগে ধর্মকে এই কাজে লাগিয়েছিল দাসমালিকেরা। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবিস্তারের পিছনে বড় হাত ছিল ধর্মের। পোপই নির্ধারণ করে দিত কোন দেশ জলপথে, কোন দেশ স্থল পথে। কোন দেশ কোনদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারে বের হবে। এমনকি একসময় সমস্ত অসহায় মানুষের আশ্রয় ছিল এই ধর্ম, বিনোদনও। মন্দিরে, গীর্জায়, প্যাকোডায়, মসজিদেই মানুষ তার অপরাধের ক্ষমা চাইতে আসত, স্বীকারোক্তি করতো। ধর্মের নামেও কম হানাহানি ঘটানো হয়নি জগতে। এই সবকিছুর পিছনেও একটা সুবিধাবাদি শ্রেণী কাজ করতো সবসময়। যারা সবকিছু থেকে ধন ও ক্ষমতা লুঠে নেয়। তারাই রাষ্ট্রের মালিক। যেখানেই বৃটিশরা, ইউরোপীয়ানরা ব্যবসার নামে ধন ও ক্ষমতা লুঠ করেছে, বিনাদোষে, কৃত্রিম সমস্যা সৃষ্টির লক্ষে দুর্ভিক্ষে, প্রকাশ্যে কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করেছে, সেখানেই খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে পৌঁছে গেছে পাদ্রিরা। তারা বলেছে, এই বেদনা থেকে উপশমের উপায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ। একদিকে নির্যাতন, লুণ্ঠন, হত্যা, আতঙ্ক; অন্যদিকে ধর্মের সান্ত্বনা। যেখানেই গেছে মধ্য এশিয়ার সাম্রাজ্যবাদিরা, এশিয়ায়, আফ্রিকায়, ইউরোপে রাজ্যজয়ের সাথে সাথে উড়িয়েছে ইসলামের ঝাণ্ডা। সাম্রাজ্যবাদিরা নিজেরা জাতিভিত্তিক জাতীয়বাদি হলেও, শোষণের প্রয়োজনে তারা অধিকৃত এলাকার জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করতো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বা আন্তর্জাতিকতাবাদে।

নিউজ চ্যানেলের মালিকের বিশ্বাস-- সুন্দরী-স্পল্পবসনা প্রেজেন্টারই আসল
নিউজ চ্যানেলের মালিকের বিশ্বাস– সুন্দরী-স্পল্পবসনা প্রেজেন্টারই আসল

ঠিক এর পরের স্তরেই প্রায় প্রত্যেক এলাকার অধিবাসীদের ভেতরই জাতীয়তাবাদের গণজাগরণ দেখা দেয়। যারা এই জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা, অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জন্মদাতারাই শাসক ও শোষক শ্রেণী। এই জাতীয়তাবাদের জন্মদাতারা আবার রাজতন্ত্রেরও জন্মদাতা। জাতীয়তাবাদ খুব উপাদেয়; সম্ভ্রমপূর্ণ শোষণ ও অসহায় জনগণের আত্মবিভ্রান্তির অষুধি

এখনো বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা সৃষ্টি করে, বিভিন্ন শোষক শ্রেণী নীরবে নীভৃতে সম্মতি উৎপাদন করছে জনগণের। নীরবে লুঠে নিচ্ছে জাতীয়তাবাদি রাষ্ট্রের নামে জনগণের অপরিসীম শ্রম। নিজেদের শ্রম বিকিয়ে দিয়ে জনগণ লাভ করছে বোকামির জাতীয়তাবাদি আত্মপ্রসাদ। কিন্তু এই সম্পদের ভোক্তা শ্রেণী সমাজের খুব লঘু এক অংশ, যারা ক্ষমতা ও রাষ্ট্রব্যবসার সাথে জড়িত। বাকি জনগণ জড়িত ধর্মবাদে, বর্ণবাদে, স্বাধীনতাবাদে, জাতীয়তাবাদের ঝকমারি বিনোদনে। যাদের সাথে রাষ্ট্রের দেখা হয়– যখন রাষ্ট্রের শোষণের দরকার হয়। আর জনগণের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সময় জনগণ বুঝতে পারে, রাষ্ট্র কী দুরূহ ব্যাপার।

ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে শোষণ ও বিভ্রান্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনাময় সহোদর– মিডিয়া। যা একই সাথে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদকেও ধারণ করতে পারে।

মিডিয়া এতই সম্ভাবনাময় যে, সে ধারণ করতে পারে না– তেমন বস্তু ও মতবাদের কোনো অস্থিত্বই থাকতে পারে না। যেহেতু রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যেই লুকায়িত আছে মিথ্যাচার, যেহেতু ক্ষমতা বেঁচে থাকেই মিথ্যাচার ও অভিনয়কে ভর করে, সেখানে মিডিয়া হয়ে উঠে একমাত্র ধর্ম ও জাতীয়তাবাদি শক্তি। মিডিয়া এখন সমস্ত মন্দির মসজিদ ও গীর্জার সমষ্ঠি। মানুষের অপরাধ, আনন্দ, বিজয় ও পরাজয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির এখন মিডিয়া। এখন সমস্ত জনগণ মিডিয়ার হাতে বন্দি। মিডিয়ার কাছেই তার ক্ষমাপ্রার্থনা, স্বীকারোক্তি। অন্যদিকে মিডিয়া রাষ্ট্রের সমস্ত মিথ্যাচারের প্রচারক। দুনিয়া এখন রাষ্ট্র ও মিডিয়ার শ্যামরাজ্য। যেহেতু মিডিয়া একটা মাধ্যম, সেহেতু তার চরিত্র খানিকটা বেশ্যার মতো। তার নিজস্বতা বলতে কিছু নাই। ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের দ্বারাই সে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত-সহ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের  মালিক– করপোরেট হাউজ।

মিডিয়ার সবচাইতে প্রসার দেখা যায় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়। মিডিয়া আক্রমণকারীর লক্ষ্যকে প্রস্তুত করে, এবং জনগণকে তার সৃষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লিবিয়া ইত্যাদি যুদ্ধে মিডিয়ার যথেচ্ছ অপপ্রচার আমরা বিশ্বাস করেছি। এ থেকেই একাডেমিক মিডিয়ায় ক্রিয়েটিভ নিউজ নামের ধারাটির সৃষ্টি। একটা জিনিস যা না– তা জনগণকে বানিয়ে দেখানো ও বিশ্বাস করতে বাধ্য করা।

পিতা হর্ষবর্ধন মনে করেন, সংবাদই মূলসূত্র । পুত্র জয় মনে করেন, সংবাদও একধরনের ব্যবসা
পিতা হর্ষবর্ধন মনে করেন, সংবাদই মূলসূত্র । পুত্র জয় মনে করেন, সংবাদও একধরনের ব্যবসা

মিডিয়া এখন রাষ্ট্র ও তার বুর্জোয়াদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র ও তার বুর্জোয়া শোষকরা মিডিয়াকে এখন জনগণের সাথে সবধরণের প্রতারণার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে। জনগণই এখন মিডিয়ার পণ্য তেমনি মিডিয়া পণ্য রাষ্ট্র ও তার শোষক বুর্জোয়া সমাজের। মিডিয়া এখন এমন ক্ষমতাবান, যার সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নিতে বাধ্য। ফলে মিডিয়া এমন ভয়ংকর ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে যেন সে এখন ঈশ্বরের ভূমিকায়। সত্যের সরাসরি প্রতিপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও মিডিয়াকে মিথ্যা বলারও কোনো সুযোগ মিডিয়া রাখেনি জনগণের জন্য। যেন মিডিয়াই এখন দাসরাষ্ট্র আর জনগণ হচ্ছে দাসশ্রেণী। মিডিয়ার শক্তি, প্রতারণা ও রাষ্ট্রকে জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কী অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে, সে বিষয়ে মোম্বাইয়ের বাণিজ্যিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির নাম করা পরিচালক রামগোপাল ভার্মা একটা সিনেমা বানিয়েছেন রণ নামে। যা উস্কে দিয়েছে এই তর্কটাকে।

ভাবার বিষয়, মিডিয়া যে সঙ্কট তৈরি করেছে তা রামগোপালের মতো একজন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীকেও ভাবিয়ে তোলেছে। রামগোপাল কুশলী নির্মাতা। রণ সিনেমায় দেখানো হয় মিডিয়ার সর্বগ্রাসী ভূমিকা। নেতাদের দস্যুবৃত্তি ও পদচারণা এখন মিডিয়া-নির্ভর। আমরাও দেখি, বন্যা বা খরা বা মঙ্গার সময় এদেশের নেতাদের রিলিফ হাতে সেজেগুজে ছবি তুলতে। রামগোপাল এ ছবিতে বেশকিছু প্রতীক নিয়ে খেলা করেন। রাষ্ট্রকে এক অচল বুড়ি হিসাবে দেখান ভার্মা, যাকে নেতারা মা বলে আর্শিবাদ নেয় নিজ উদ্যোগে; কারণ বুড়ি হাতটাও তুলতে পারে না আশির্বাদের জন্য। পুরা ছবিটাই বুর্জোয়া নীতিবাদ ও বুর্জোয়া সুবিধাবাদের লড়াই। বুর্জোয়া নীতিবাদি হর্ষবর্ধন মালিক [অমিতাভ বচ্চন অভিনীত] ইন্ডিয়া ২৪ নামের এক নিউজ চ্যানেলের মালিক। যিনি বিশ্বাস করেন না আধুনিক পাশ্চাত্যনির্ভর মিডিয়াবিজ্ঞানে– যা একমাত্র প্রেজেন্টেশনকেই সংবাদের মূলসূত্র মনে করে। হর্ষবর্ধন মনে করেন, সংবাদই মূলসূত্র। যে রকম ঘটেছে, তাই দেখানোই সংবাদ মাধ্যমের নীতি।

প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা মোহন পান্ডে ।  মিডিয়া হাত করে ক্ষমতা দখলের জাদুকর
প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা মোহন পান্ডে । মিডিয়া হাত করে ক্ষমতা দখলের জাদুকর

তার প্রতিদ্বন্ধী হিসাবে রয়েছেন অমরেশ কাকার [মণিষ বল অভিনীত], যিনি হেডলাইন ২৪ নামের অন্য এক নিউজ চ্যানেলের মালিক। যিনি মিডিয়াকে দেখেন ব্যবসা হিসাবে। যিনি মনে করেন, এটা একধরনের ইনভেস্টমেন্ট। যিনি কোনো নীতির ধার ধারেন না। তারা বিশ্বাস করেন সৃজনশীল সংবাদে। যাদের কাছে প্রেজেন্টেশনটাই আসল। সুন্দরী-স্পল্পবসনা প্রেজেন্টারই আসল। সংবাদ তাদের কাছে ব্যবসা ছাড়া আর কিছু না। এই নীতি দ্রুত চ্যানেলটাকে দেয় একনম্বর নিউজ চ্যানেলের তকমা। কিন্তু আমেরিকা ফেরত হর্ষবর্ধনপুত্র জয় মালিক [সুদীপ অভিনীত] ও হর্ষবর্ধনের ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট জামাতাও [রজত কাপুর অভিনীত] মনে করেন, সংবাদও একধরনের ব্যবসায়। এই নীতিতে না চললে খুব দ্রুত অবনতি ঘটবে। এমনকি চ্যানেল বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

যাইহোক, সিনেমার শুরুতেই দেখানো হয় হিন্দু অধ্যূষিত এলাকা মোজাফফরাবাদে এক বোমা ফাটে, যাতে নিহত হয় অনেক মানুষ। এই বোমা ফাটা নিয়ে সরগরম হয়ে উঠে মিডিয়া। নীতিবাদি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী হিসাবে হর্ষবর্ধন সবসময় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পক্ষে। ঠিক এই সুযোগটাই গ্রহণ করেন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা মোহন পান্ডে [পরেশ রাওয়েল অভিনীত]। তিনি গোপনে হাত করেন হর্ষবর্ধনের ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট জামাতা ও তার মাধ্যমে হর্ষবর্ধনপুত্র জয় মালিককে।

হর্ষবর্ধন পুত্র  জয় মালিক, জামাতা ও মোহন পান্ডে মিলে এমন এক সংবাদ সৃজন করেন, এমন এক ঘটনার চলচ্চিত্রায়ন ও তা মিডিয়ায় উপস্থাপন করেন হর্ষবর্ধনের মতো সর্বজনগ্রাহ্য এক বুদ্ধিজীবীকে দিয়ে, যেখানে হর্ষবর্ধন নিজের অজান্তেই শিকার হন পুত্রের প্রতারণার। যার জন্য প্রধানমন্ত্রী [কে কে রায়না অভিনীত] পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এখানে খানিকটা ফাঁক চোখে পড়ে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও নীরবে সরে দাঁড়ায়। খানিকটা বাস্তবজ্ঞানের অভাবই বলতে হবে রামগোপালের।

জাতি ঘটনার সত্যতার জন্য সম্পূর্ণ মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে এ চ্যানেলটার মালিক একজন কলামিস্ট বজ্রকণ্ঠী সৎ নিউজ প্রেজেন্টার হর্ষবর্ধন। ফলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়। যার ষোলআনা মুনাফা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান মোহন পান্ডে। ব্যক্তি উদ্যোগে এই সব অনুসন্ধান করেন হর্ষবধনেরই এক অনুসারী সাংবাদিক পূরব [রীতেশ দেশমুখ অভিনীত]। পূরব সক্ষম হন জয় মালিকের তৈরি করা চলচ্চিত্রটি খুঁজে বের করতে। যা নিয়ে তিনি চলে যান ‘হেডলাইন ২৪ চ্যানেলের মালিক অমরেশ কাকরের কাছে।

পূরবের দেয়া তথ্য নিয়ে অমরেশ ব্ল্যাকমেইল করেন মোহন পান্ডেকে। যা থেকে ৫০০ কোটি টাকা ফায়দা তোলেন অমরেশ। বিনিময়ে চেপে যান এই নাটিকাটি এবং মোহন পান্ডের গুণগান বৃদ্ধি করেন চ্যানেলে। পূরব একেবারেই ব্যর্থ হয়ে মুখোমুখি হর্ষবর্ধনের। সমস্ত ফুটেজ হর্ষবর্ধনের হাতে তোলে দিয়ে তিনি হার মানেন।

সাংবাদিক পূরব । তবু সত্যের পক্ষে, তবু অনুসন্ধানে...
সাংবাদিক পূরব । তবু সত্যের পক্ষে, তবু অনুসন্ধানে…

হর্ষবর্ধন ফুটেজগুলো দেখেন। এবং বুর্জোয়া নীতিবাদিতা থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্পিত সামাজিক চুক্তি বিষয়ে নিজের চ্যানেলে বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, সরকার উৎপাদন ও জনগণের সুরক্ষার করবে। এতে যদি কোনো গাফিলতি করে সরকার, তাহলে জনগণকে এটা দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব মিডিয়ার। তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করেন; সবকিছু ফাঁস করে দেন। ফলস্বরূপ  মোহন পান্ডের আর শপথ নেওয়া হয় না, ফেঁসে যায় অমরেশ কাকার, জয় মালিক দালান থেকে ঝাপিয়ে আত্মহত্যা করেন, জামাতাকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে আসে হর্ষবর্ধন-কন্যা।

সিনেমাটার নির্মাণগত ও কারিগরি দিক ভাবিয়ে তোলার মতো। রামগোপাল ভার্মা নিজেও থ্রিলার নির্মাণ করেন; সেই নির্মাণ মুন্সিয়ানাটাই তিনি এই মিডিয়া সংক্রান্ত সিনেমাটায় কাজে লাগান। সংলাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তর্কই তিনি তুলে দেন পাত্র পাত্রীদের মুখে। দেখা যাচ্ছে, সামগ্রীকভাবে ছবিটায় নীতিবাদি বুর্জোয়া ও সুবিধাবাদি বুর্জোয়ার দ্বন্ধকেই তিনি ভাবছেন মুল সমস্যা হিসাবে। কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্রসাধক, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী রামগোপাল ভার্মা বুঝেন না– রাষ্ট্রের গোড়ায় আছে পুঁজি। রাষ্ট্র পুঁজিবাদের পাহারাদারমাত্র। রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে পুঁজিবাদ জনগণের রক্ত খায়। আর পুঁজিবাদের অস্তিত্ব মানেই সবকিছু নিয়েই ব্যবসা হবে। সবকিছুকেই পণ্যায়ন করা হবে। মিডিয়া একটা চরিত্রহীন মাধ্যম মাত্র। একে যেকোনো ক্ষমতাই ব্যবহার করতে পারে। পুঁজিবাদের ধর্মই পর-পুঁজির সাথে হাত মেলানো; আর নিরন্তর আধিপত্যবাদই পুঁজিবাদের পথ। রাষ্ট্রকে যতই গণতান্ত্রিক পোষাক-আশাক পরানোর চেষ্টা করা হোক, পুঁজিবাদ ছাড়া তার অস্থিত্ব অসম্ভব। শ্রমিক চাষী সাধারণ জনগণকে শোষণ বা পণ্য করা ছাড়া অন্য কোনো কাজে তার মতি নাই। সার্বজনীন ভোটাধিকার, পার্লামেন্ট, নীতিবাদি বুর্জোয়াদের চীৎকার– সবই শুধু বাইরের ঠাট, একধরনের হুন্ডি; এতে আসল ব্যাপারটার কোনো রদবদল হয় না। সুতরাং, রামগোপালজি যে মিডিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্র হাতে ছবি তোলেন, তা আসলে রাষ্ট্র সিস্টেমের বিরুদ্ধে নয়।

মহাত্মা লেনিন বলেন, রাষ্ট্রে সার্বজনীন সমতা বিষয়ে সব পুরনো সংস্কার আমরা উড়িয়ে দেব, কারণ এ সবই শুধু ভাঁওতা : যতদিন শোষণ চলবে, ততদিন সমতা আসতে পারে না। জমিদার ও মজুর সমান হতে পারে না; ক্ষুধিত মানুষ ও তৃপ্ত মানুষ সমান হতে পারে না। রাষ্ট্র নামে যন্ত্রটাকে লোকে সংস্কার ও শঙ্কামিশ্রিত শ্রদ্ধার সাথে মাথা নিচু করে মেনে নেয়; তারা সেই পুরনো গল্প বিশ্বাস করে যে, এ যন্ত্রের মানে নাকি জনতার শাসন। এই যন্ত্রটিকে পরিত্যাগ করে সর্বহারাশ্রেণী; তারা ঘোষণা করে যে এ হলো বুর্জোয়া মিথ্যাচার।

 এই মিথ্যার অপপ্রচারকারী, রাষ্ট্র ব্যবস্থারই অন্যতম সহযোগী ও সহোদর–  মিডিয়া নাম্নী রূপসী নর্তকী।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি ও সমালোচক। সম্পাদক : ঢাকা রিভিউ। www.Dhakareview.org। জন্ম : ১৯৭৬; মহেশখালী, কক্সবাজার, বাংলাদেশ। কাব্যগ্রন্থ : এই মিছা কবি জীবন; আততায়ী একটি কবর; বিকালের দাসবাজার; আরো একটি কবিতা শোনাও কবি; সূর্যের নিচে শুধু ভয়; নির্বাচিত কবিতা। উপন্যাস : পায়ুবাসনার জনগণ। গল্পগ্রন্থ : দস্তইয়েভস্কির বই ও কোটিপতির সকাল; সম্পর্কের সন্ত্রাস ও অন্যান্য গল্প। প্রবন্ধ গ্রন্থ : রাজ্য ও সাম্রাজ্য [রাজ্যচিন্তার কারখানা-১]; সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ [রাজ্যচিন্তার কারখানা-২]; কবিতা পড়ুয়ার নোটবই। জীবনীগ্রন্থ : ফিদেল কাস্ত্রো; নেলসন ম্যান্ডেলা

মন্তব্য লিখুন