ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার । অ্যা শর্টফিল্ম অ্যাবাউট ডেকালগ

2
800

 

ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি [১৯৪১-১৯৯৬]। পোলিশ ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি ও স্বতন্ত্রধারার ফিল্মমেকার। ১৯৮৯ সালের কথা। এই পোলিশ ফিল্মমেকার বাইবেলের টেন কমান্ডমেন্ট বা দশ ধর্মীও-বাণীর আধুনিক রূপান্তর সৃষ্টি করে জিতে নেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে জাঁদরেল সিনে বোদ্ধাদের মন। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে ‘ডেগালগ’ নামে পরিচিত সেই সিনেমাগুচ্ছের চিরন্তন বার্তা এবং এটির মানসিক গঠনের একটি পরীক্ষণের প্রচেষ্টা হিসেবে। এই সাক্ষাৎকারমূলক ডকুমেন্টারির নাম রাখা হয়– “অ্যা শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট ‘ডেকালগ’ : অ্যান ইন্টারভিউ উইথ ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি”। ইলিন অ্যানিপেয়ার ও জ্যাসন উড নির্মিত এই ডকুমেন্টারির ইংরেজি সাব-টাইটেল ধরে, এই অনুবাদ…

পোস্টার । ডেকালগ
পোস্টার । ডেকালগ

অনুবাদ । রুদ্র আরিফ


কিয়েস্লোফস্কি : [ডেকালগ-১-এর ফুটেজ দেখানোর পর…] এটি সামরিক আইন সম্পর্কিত। মানুষ হয় এ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, নয়তো জড়িয়ে গেছে। জড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো কারণ কিংবা সম্ভাবনা দেখিনি বলে আমি জড়াইনি। রাজনীতির প্রতি [ফিল্মগুলোর] কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর এই যে বিচ্ছিন্নতাবোধ, সেটি সামরিক আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যাপারটিকে এভাবেই দেখতে হবে। রাজনীতিকে একটা বিষয়বস্তু হিসেবে আমরা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছি। এটিকে আমরা বিবেচনা করেছি গুরুত্বহীন কিছু হিসেবে। আমরা জানতাম, এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একে ঘিরে কিছুই করার ছিল না আমাদের। ফলে এটিকে একেবারেই গুরুত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা।

প্রশ্ন : ডেকালগ-এ তাহলে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কোনটি? কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো সম্পর্কে আমার একটা ধারণা হলো, এরা সব মানুষের সমস্যাবলির বিরুদ্ধে একাই লড়ে যায়…

কিয়েস্লোফস্কি : হ্যাঁ; তা তো বটেই। রাজনীতি ছাড়া বাকি সবই গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসঙ্গতা গুরুত্বপূর্ণ। তেমনিভাবে ভালোবাসা, এবং এটির অভাবও; হতাশা… সবকিছুই। [তবে] রাজনীতি নয়; কেননা, এখানে এটির অস্তিত্ব নেই। উদ্ভট ও গুরুত্বহীন পরিস্থিতিতেই কেবল এটি জেগে ওঠে। এ এক কঠিন রাজনীতি; বরং বলা ভালো, রাজনৈতিক অনুপযুক্ততার ফল। এটিতে পানি নেই কোনো; এর জীবন-চাকাও কাজ করে না। [ফলে] জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো পর্যবসিত হয়েছে সমস্যায়। জীবন গড়ে উঠেছে একটি বাজে ও নির্বোধ পন্থায়।

না; মানুষ আলাদা পথ খুঁজে নেওয়া চেষ্টা করে। আমার অনেক সিনেমাই ফিকশন ও ডকুমেন্টারির মধ্যে একটি রেখা এঁকে দিয়ে নির্মিত। এ বিষয়টির প্রতি আমার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। আমি মনে করি, ডেকালগ ফিল্মগুচ্ছে ডকুমেন্টারির কোনো বালাই নেই। ডকুমেন্টারির কথা ভাবলে আমার মাথায় আসে সেই ডকুমেন্টারি ফিল্মগুলোর কথা– পোল্যান্ডে ‘৭০, ‘৬০ ও ‘৫০ দশকে যেগুলো বানানো হয়েছিল। যুদ্ধের আগে, ইংল্যান্ডেও গুরুত্বর্ণ কিছু ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মিত হয়েছিল। যদিও দুটি দেশের সেই ফিল্মগুলোর মধ্যে কোনো মিল নেই। ডকুমেন্টারি হলো প্রকৃত ঘটনাবলির সঙ্গে একজন ফিল্মমেকারের একটি সম্পর্কের নাম; এমনকি সেগুলোকে নাটকীয় রূপ দেওয়া হলেও

প্রশ্ন : আপনি সত্য বা ফ্যাক্টের কথা বলছেন?

কিয়েস্লোফস্কি : না; ইভেন্ট বা ঘটনাবলির কথা বলছি। কেউ যদি কারও প্রেমে পড়ে, তাহলে সেটিকে একটি ফ্যাক্ট বলতে পারেন আপনি। এ কেবলই হয়ে যাওয়ার বিষয়; তাই নয় কি? আমি এটিকে একটি ফ্যাক্ট বলতে পারি না; বরং বলতে পারি, সংগঠিত হওয়া কিছু একটা। একটি ডকুমেন্টারি ঘটনাবলিকে নিছক লিপিবদ্ধ বা রেজিস্ট্রি করে না; কেননা, তাতে বিষয়টা একঘেঁয়ে হয়ে ওঠতে পারে; প্রকৃত ঘটনাবলির সঙ্গে ফিল্মমেকার ঠিক কী সম্পর্ক গড়ে তুলছেন– এটি বরাবরই সেই ব্যাপার। এই হলো ডকুমেন্টারি। ফলে, ডেকালগ-এ ডকুমেন্টারির কোনো উপাদান নেই। কোনো কিছুই বাস্তবে সংগঠিত হয়নি এখানে; বরং তা ঘটানো হয়েছে। ফলে ডকুমেন্টারির সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

অন্যদিকে, পোল্যান্ডে এই ফিল্মগুলো সমালোচিত হয়েছিল বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল না থাকার অভিযোগে। এগুলো কোনোমতেই ডকুমেন্টারি নয়। শুধু তাই নয়; বরং লোকজন ভেবেছে, বাস্তবতার সঙ্গেও এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। এই ফিল্মগুলোতে দেখানো ঘটনাবলি বাস্তবে কখনোই সংগঠিত হয়নি। এগুলোর ধাপ দুটি : এক– কোনোকিছু যদি সত্যিকারেই ঘটে, তাহলে সেটি ডকুমেন্টারি; দ্বিতীয়টি  বিশ্বাসযোগ্যতা : এটা কি ঘটেছে?

ডেকালগ-এর ঘটনাবলি বাস্তবে ঘটতেই পারত। প্রত্যেকটি এপিসোডেই, ক্ষুদ্রতম উপদানটির পক্ষেও সত্য হওয়া সম্ভব। কিন্তু পোল্যান্ডের অনেক লোকই মনে করে, এমনটা হতে পারে না। এটা অসম্ভব ছিল; কেননা, সবকিছুই বানানো হয়েছিল। কিংবা, আপনি যদি আরেকটু মর্যাদাহানিকর শব্দ ব্যবহার করতে চান, সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, অবিশ্বাস্য একটি উদ্ভাবন, এবং এ কারণেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ এক মর্যাদাহানিকর সংজ্ঞা।

তবে এটিকে আপনি একেবারেই ভিন্নচোখেও দেখতে পারেন। বলতে পারেন, এটি একটি ডকুমেন্টারি রেজিস্ট্রেশন। কাহিনীটি ফিকশন হওয়া, এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোতে অভিনেতাদের অভিনয় করা, এবং গ্লিসারিন চোখে দিয়ে কান্না করা সত্ত্বেও, এটি সময় ও সময়ের তাপমাত্রার এক ধরনের নথি : কী করে সেই দিনগুলোতে মানুষ বেঁচে ছিল

দৃশ্য । ডেকালগ-১
দৃশ্য । ডেকালগ-১

প্রশ্ন : ৮০’র দশকের পোল্যান্ডে?

কিয়েস্লোফস্কি : হ্যাঁ। সেই দিক থেকে আপনি বলতে পারেন, ডেকালগ হলো সময়ের একটি নির্দিষ্ট পিরিয়ডের একটি নথি। পোল্যান্ডের সে সময়ের একটি মুহূর্ত। নিঃসন্দেহে এটি আরও অধিকতর শ্বাশত বিষয়; এবং প্রত্যহ ঘটা ঘটনাবলিকে নিয়ে কাজ করেছে– যখন মানুষকে তাদের প্রতিদিনকার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য লড়ে যেতে হয়েছিল।

এই সুনির্দিষ্ট সময়, স্থান ও রাজনৈতিক সিস্টেমের বাস্তবতা এটি। সমাজের প্রাত্যহিক রুটিনের একটি নথি এটি। এ এমনই এক ধরনের নথি, যার দেখা মেলে ইংল্যান্ডে করা কেন লোচের কাজগুলোতে। এক দিক থেকে, ডেকালগও একই প্রভাব জাহির করেছে। এ হলো সময়ের একটি সুনির্দিষ্ট বিন্দুতে কোনো নির্দিষ্ট মানবজীবনের একটি নথি। ঠিক তাই।

এ দিক থেকে ভাবলে, এটি প্রাত্যহিক জীবনের চেয়ে অনেক বেশি দূরবর্তীতে চলে যাওয়া থ্রি কালারস-এর তুলনায় অনেক বেশি ডকুমেন্টারি। [থ্রি কালারস-এর] প্রথম ও তৃতীয় ফিল্মটির ক্ষেত্রে অন্তত এমনটাই বলা যায়। তবে দ্বিতীয়টি অনেকটা ডেকালগ-এর মতো। একটি সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থানে, এবং সুনির্দিষ্ট জনগণের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট মুহূর্তকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃতভাবে অধিকতর বাস্তবধর্মী ফিল্ম হয়ে উঠেছে এটি [দ্বিতীয় ফিল্মটি]।

প্রশ্ন : ডেকালগ সিরিজের কয়েকটি এপিসোডে আপনি ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরাম্যান ব্যবহার করেছেন। এটা কি ইচ্ছেকৃতভাবে করেছেন, নাকি নতুন প্রতিভাকে সুযোগ দিতে করা? নাকি ভিজ্যুয়াল স্টাইলকে প্রভাবিত করার জন্যই ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরাম্যানের ব্যবহার?

কিয়েস্লোফস্কি : নিঃসন্দেহে এটি ইচ্ছেকৃতভাবেই করা; ফিল্মের বেশির ভাগ কাজ এভাবেই হয়ে থাকে। কিছু ব্যাপার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটে, আপনাকে সেগুলো ব্যবহার করতে হয়। তবে কিছু ব্যাপার ঘটে দুর্ঘটনাক্রমে। তাছাড়া, এটি কোনো সিরিজ নয়; বরং এ ছিল একটি ফিল্ম-সাইকেল বা সিনেমা-চক্র। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। সিরিজ আর সাইকেলের ধারণা আলাদা। এই পার্থক্যটি অনেক বেশি জটিল। কোনো সাইকেল যদি অস্তিত্বমান হয়ও, তবু সেটির ভূমিকা নিরূপন করা কঠিন খুব। তবে আমি মনে করি, এগুলোর ভূমিকা আছে। আপনি হয়তো এগুলোকে নিরূপনও করতে পারবেন। নতুন কোনো প্রতিভাবান ক্যামেরাম্যানকে সুযোগ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। এই ক্যামেরাম্যানদের বেশিরভাগের সঙ্গেই হয় আগেও আমি কাজ করেছি, নয়তো তারা বেশ কিছুদিন ধরেই এ কাজে রয়েছেন। বস্তুতপক্ষে, মাত্র দুজন ক্যামেরাম্যান ছিলেন একেবারেই নতুন।

দৃশ্য । ডেকালগ-২
দৃশ্য । ডেকালগ-২

প্রশ্ন : এটি কি ফিল্মগুলোকে প্রভাবিত করেছে?

কিয়েস্লোফস্কি : এটা আমার উদ্দেশ্য ছিল; এবং আমি মনে করি, ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরাম্যান ব্যবহার ডেকালগ-এর ক্ষেত্রে আমার সেরা আইডিয়াগুলোর একটি। প্রত্যেকটি ফিল্মই একেকটি প্রোডাকশন হিসেবে নির্মিত হয়েছে। একটার পর একটা; কখনো আবার একটা ফেলে রেখে আরেকটা। কখনো কখনো আমরা একই দিনে তিনটি আলাদা ফিল্মের শুটিং করেছি। এমনটা করে, নিজেদের একঘেয়েমিতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি আমরা। কেননা, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, ডিরেক্টিং একটি ভীষণ একঘেয়ে কাজ!

নতুন ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে কাজ করা মানে, এ বোধ বদলে ফেলা। একজন নতুন ক্যামেরাম্যানের পুরো প্রক্রিয়াটির প্রতি একটি টাটকা ভঙ্গিমা থাকে। আর, শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সব কলাকুশলীর জন্যই, মাসের পর মাস কোনো প্রজেক্টে কাজ করার পর খানিকটা ইন্টারেস্টিং কিছুর দেখা পাবার দরকার পড়েই। নতুন অভিনেতারা নিঃসন্দেহে একটি ইন্টারেস্টিং উপাদান সংযুক্ত করেন; কেননা, প্রত্যেকটি এডিসোড বানানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে। এবং নতুন ক্যামেরাম্যান নিয়েও। লাইটিং থেকে ক্যামেরা মুভমেন্ট পর্যন্ত– সবকিছু বদলে দেবেন তিনি। ফলে বাকি সবও বদলে যাবে। সাউন্ডম্যানকে সাউন্ড রেকর্ডিং নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

ধরুন, শুরুতে যদি শ্যাডো ছাড়া লাইট করা হয়ে থাকে, তাহলে এখন শ্যাডোর অন্তর্ভুক্তি হবে। তার মানে, নতুন একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন সাউন্ডম্যান। আর, যেখানেই কোনো চ্যালেঞ্জ থাকে, সেখানে কাজ করাটাও হয়ে ওঠে ইন্টারেস্টিং। তা না হলে আপনি সেই প্রভাবের মধ্যে পড়ে যাবেন, যাকে বলে– যদি কোনো ক্যামেরাম্যানকে আপনি ভীষণ ভালোভাবে চেনেন, তাহলে মেঝের ঠিক কোন জায়গাটিতে গর্ত রয়ে গেছে– তা ঠিকঠাক আন্দাজ করে ফেলতে পারবেন; কেননা, গর্ত মাথায় রেখে ঠিক একই স্পটে সবসময় ক্যামেরা বসাবেন তিনি। যেহেতু আমরা ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরাম্যান ব্যবহার করেছি, ফলে মেঝেতে কোনো গর্ত রাখিনি।

প্রত্যেক ক্যামেরাম্যানেরই আলাদা আলাদা স্টাইল ও ভঙ্গিমা রয়েছে। এ বিষয়টির আরেকটি ফলদায়ক বিষয় হলো, এর ফলে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক উপাদানের উপস্থিতি ঘটেছে। তারা প্রত্যেকেই চেয়েছেন আগেরটির চেয়ে ভালো কিছু করতে।

দৃশ্য । ডেকালগ-৩
দৃশ্য । ডেকালগ-৩

প্রশ্ন : সেটি কি কোনোটিতে স্পষ্ট হয়েছে?

কিয়েস্লোফস্কি : না। এটি বরং তাদের মধ্যে চলমান একটি অনুভূতির ব্যাপার ছিল। একেবারেই হাস্যকর ব্যাপার কী ছিল, জানেন? প্রত্যেক ক্যামেরাম্যানেরই মেজাজ-মর্জি ও কাজের অভিজ্ঞতা আলাদা; এবং তারা ফিল্মে একটি কাহিনীকে ফুটিয়ে তোলেন আলাদাভাবেই। প্রত্যেকেই তার নিজের মতো করে কাহিনী দেখান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবগুলো ফিল্মই পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ পন্থায় শ্যুট করা হয়েছে।

তাদের কাজে নাক গলাইনি আমি; এমনকি কোন লেন্স ব্যবহার করতে হবে– সে কথাও বলে দিইনি। লাইটিংয়ের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ দিইনি কোনো; কেননা, এটি তো তাদের কাজ। আমি সচরাচর ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ রাখি না। তবে জানি, ক্যামেরা যদি একটি নির্দিষ্ট পজিশনে রাখা হয়, এবং ধরুন, একটা ফিফটি এম.এম. লেন্স ব্যবহার করা হয়– তাহলে শটটা ঠিক কেমন দেখাবে। আমার বোঝায় হয়তো আধ-সেন্টিমিটার খানেকের গোলমাল থাকতে পারে। সেই একই কাজটি আমি একটা থার্টি ফাইভ এম.এম. লেন্স দিয়েও করতে পারব; আর তাতে আমার খুব একটা ভুল হবে না। এ সবই আমার জানা; তবু ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ রাখি না আমি। ফলে তারা [ক্যামেরাম্যান] নিজেদের মতো করে কাহিনীটি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছেন। আমি তাদের সেই কাজে তাদেরকে চালিত করতে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করেছি কেবল। এটি বরাবরই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। মানে, হতে পারে আরকি; তবে সবসময় নয়!

প্রশ্ন : আপনি বললেন, ডেকালগ-এর ভিন্ন ভিন্ন এপিসোডের মধ্যে একটার সঙ্গে আরেকটার সাদৃশ্য রয়েছে।

কিয়েস্লোফস্কি : এগুলো একই পন্থায় দেখানো হয়েছে। স্ক্রিপ্টে ক্যামেরা পজিশন নির্দেশিত ছিল ঠিকই, তবে তা লিখিত ছিল না। লাইটিং, স্টোরিটেলিংয়ের ইন্ডিক্যাট থাকলেও, স্ক্রিপ্টে আমি সাধারণত কখনোই ‘ক্যামেরা’ শব্দটি ব্যবহার করি না। ক্যামেরা ঠিক কোথায় থাকবে কিংবা এটির কাজ কী হবে– সে কথা আমি কখনোই লিখে রাখি না। এর কোনো দরকার আছে বলে মনে হয় না আমার। স্টোরিলাইন বলতে যা বোঝায়, কিংবা ধরুন, আমেরিকানরা যাকে স্টোরিবোর্ড বলে– সেটিও আমি লিখি না কখনো। এটা আমি কখনোই করিনি; বছরের পর বছর ধরে না করেই আসছি। আমার স্ক্রিপ্টে ‘ক্যামেরা’র দেখা আপনি পাবেন না। তবে ন্যারেটিভ দৃশ্যতই ইন্ডিকেট করে– আপনি ফিল্মে ঠিক কীভাবে কাহিনীটা দেখাবেন। ফলে লিখিত রূপে না থাকলেও, ক্যামেরাম্যানেরা এই বিষয়টিকে নিজের জ্ঞানবোধ থেকেই ধারণ করে নেন।  বৃহদার্থে, ‘ক্যামেরা’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ডেকালগ-এর কোনো স্ক্রিপ্টেই ‘ক্যামেরা’ শব্দটি আপনি খুঁজে পাবেন না; যেমন : ‘ক্যামেরা এটি বা সেটি শুট করবে, কিংবা কাহিনীটিকে এভাবে বা সেভাবে দেখাবে’; ‘রুমে ক্যামেরা ঢুকে পড়বে’– এ ধরনের কিচ্ছু নেই।

তবু, শুটিংয়ের ডিরেকশন ঠিক কোথাও-না-কোথাও সদা-উপস্থিত; কেননা, যেভাবে কাহিনী দেখানো হয়েছে এই এপিসোডগুলোতে, সেগুলো পারস্পরিকভাবে একে অন্যের ভীষণ অনুরূপ। তবুও ক্যামেরাম্যানদের একেকজনের মেজাজ-মর্জি, অভিজ্ঞতা ও রূচিবোধ আলাদা। আর আমি তাদেরকে নিজেদের মতো করে ফিল্মটির শুটিং করার স্বাধীনতা দিয়েছি।

প্রশ্ন : আপনি বললেন, আলাদা আলাদা এপিসোড হলেও এগুলোর মধ্যে ভিজ্যুয়াল দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে। আরেকটা ব্যাপার এ বিষয়টিকে সমর্থন করে; অর্থাৎ, ডেকালগ-এর অন্য এপিসোডগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর প্রসঙ্গেও এ কথা খাটে। এটি এক ধরনের কন্টিউনিটির ব্যাপার।

কিয়েস্লোফস্কি : সে কথা তো মাত্রই বললাম। এই সাইকেলটির মধ্যে এক ধরনের একগুচ্ছ রীতির প্রবাহ ঘটানোর, কিংবা একগুচ্ছ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সাইকেলটিতে নতুন একটি রীতির প্রবর্তন করার চেষ্টা করেছি আমরা

প্রশ্ন : কিন্তু এ কারণেই কি, এই চিন্তার উদ্রেক ঘটে না যে, ডেকালগ যে কোনো স্থান ও কালের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মানানসই?

কিয়েস্লোফস্কি : নিশ্চয়ই।

প্রশ্ন : একজন ব্রিটিশ দর্শকের মনে হওয়ার দরকার নেই– এটি পোল্যান্ডের কাহিনী, এটির মধ্যে পোলিশ মানসিকতার অস্তিত্ব রয়েছে কিংবা এটি বানানো হয়েছে ভারসাভার [ওরফে ওয়ারশো] উরসিনোতে…

কিয়েস্লোফস্কি : আসলে এটা উরসিনো ছিল না; এটা বানানো হয়েছে জিকায়।

দৃশ্য । ডেকালগ-৪
দৃশ্য । ডেকালগ-৪

প্রশ্ন : আমি ভেবেছিলাম…

কিয়েস্লোফস্কি : না; তা নয়। এটি বেছে নেওয়া হয়েছিল ভীষণ সুনির্দিষ্ট ফটোগ্রাফিক কারণে। আপনি হয়তো জানেন, উরসিনো একটা ভীষণ বিস্তৃত এলাকা। এ যেন ভীষণ রকম ছড়ানো প্রান্তর। অসংখ্য খোলা প্রান্তরে ভরা বিরাট এলাকা। এটিকে কোনো ক্লোজড শটে কখনোই ধারণ করা সম্ভব নয়। এ একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এ কারণেই জিকায় পাড়ি জমিয়েছিলাম আমরা। সেটি ছিল আমাদের মূলকেন্দ্র; যদিও সব শুট ওখানেই করিনি। তবে সেটি কোনো ঘটনা নয়। আবহমণ্ডল ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধ পূর্ববর্তীকালের নকশায় গড়ে ওঠেছিল জিকা অঞ্চল। বাড়িগুলো দিগন্ত-বদ্ধ। সেই অঞ্চলটি যদি চেনা থাকে আপনার, জানবেন, এভাবেই বিল্ডিংগুলোর অবস্থান, যেন যেখানেই ক্যামেরা রাখুন না কেন, পেয়ে যাবেন একটা ক্লোজড শট। এই ক্লোজড শটগুলো আপনার মনে জাগিয়ে তুলবে– বেরোনোর কোনো পথ নেই– এমনতরো বোধ। ফলে বেরিয়ে যাওয়া কোনো একটা পথ বরাবরই খুঁজে বেড়াবেন আপনি

আমেরিকানরা এ ধরনের বিরাট উন্মুক্ত প্রান্তরের দৃশ্য শুট করে থাকে রোড-মুভি, কিংবা ওয়েস্টার্ন ও অন্যান্য ধরনের ফিল্মগুলোতে। সেখানে বরাবরই স্বাধীনতার একটা বোধ উপস্থিত থাকে। আপনি যে কোনো সময় বেরিয়ে পড়তে পারবেন; কেননা, এ এতই বিস্তৃত। কিন্তু সেই সুবিশাল প্রান্তরও আপনার জন্য পিপাসার্ত হয়ে কিংবা ঠাণ্ডায় জমে মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠতে পারে সেই মরুভূমিতে। কিন্তু আপনি বেরিয়ে পড়তে পারবেন।

একটি ক্লোজড শট সেখানে থাকার একটি অবশ্যম্ভাবিতার বোধকে সৃষ্টি করতে সক্ষম। সেই অনুভূতি আপনি নিঃসন্দেহে অবচেতনেই পাবেন। এ কারণেই এমনতরো পরিবেশ খুঁজে নিয়েছিলাম আমরা। জিকা; না, জিয়েলনা ছিল তেমন জায়গা। জিকা না জিয়েলনা? কী নাম? আমার এক বন্ধু সেখানে বাস করে; তাই অঞ্চলটির নাম ঠিক কী– আপনাকে জানাতে পারব। [কাগজপত্র ঘেঁটে–] হ্যাঁ; জিকা।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, নিজেকে ভীষণ রকম পোলিশ হিসেবে অনুভব করেন। আপনার কাজে পোল্যান্ড নিশ্চিতভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে থাকে। ডেকালগ কি সত্যিকার অর্থেই আপনার জাতীয়তার কোনো রকম প্রতিফলন?

কিয়েস্লোফস্কি : এটি আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে সত্যিকার অর্থেই মনে করি না। এটিকে আমার কোনো ঘটনা মনে হয় না। আমি পোলিশ কি-না– এ নিয়ে ভাবার মতো কিছু আছে বলে মনে হয় না আমার। নিশ্চয়ই আমি পোলিশ। আমার পক্ষে অন্যকিছু হতে পারা বা হয়ে ওঠা কিছুতেই সম্ভব নয়; তা সে চেষ্টা আমি যতই করি না কেন। আমি একজন পোল। আমি এখানেই জন্মেছি; এখানেই বেড়ে উঠেছি। পোলিশ গ্রন্থ পড়ে বেড়ে ওঠা আমার। নিজ দেশে অনেকগুলো বাজে সময় কাটাতে হয়েছে আমাকে। সেটি নিজের ভেতরেই বয়ে বেড়াই; একে আমি কখনোই হারাব না।

প্রশ্ন : তার মানে, ডেকালগ কি একজন পোলের সৃষ্টি?

কিয়েস্লোফস্কি : এ একেবারেই অবান্তর প্রসঙ্গ। একজন পোল তো একজন পোলই। শব্দটির নেতিবাচক বোধ থেকে, সে ভাবে– সে-ই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল। দুর্ভাগ্যক্রমে, অনেক পোলের ভাবনাই এমন। গর্ব এবং স্বাধীনতার জন্য সুদীর্ঘ প্রতীক্ষা– এ রকম ইতিবাচক উপাদানগুলোকে পাশ কাটিয়ে, এটিতে প্রচুর পরিমাণ নেতিবাচক উপাদানও রয়েছে : সঙ্কীর্ণ-মানসিকতা, আঞ্চলিকতাবাদ, চারপাশের মানুষের কোনো রকমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা। আমরা ভালো কিছু চাই; অথচ সত্য হলো, আমরা অসুখী থাকতে ভালোবাসি! অন্যকোথাও বিষয়টি আরও খারাপ, কিংবা আরও ভালো হয়ে ওঠতে পারে– এটি আমরা মেনে নিতে চাই না। এ ভীষণ রকম আঞ্চলিকতা-দোষ; তবে আমি মনে করি, এ দোষ আমি দীর্ঘদিন আগেই কাটিয়ে ওঠতে পেরেছি।

বহুদিন আগেই বুঝে গিয়েছিলাম, ধর্ম-বর্ণ এবং ধনী-গরিব বা এ রকম আরও অন্যান্য বিষয়আশয় নির্বিশেষে, আমরা আসলে একটি সত্যিকারের সমস্যার বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি। যদি সেটা বুঝতে পারেন, তাহলে ক্যামেরা আপনি কোথায় বসালেন– তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। আসলেই যায়-আসে না। আপনি পোলিশ কিনা– সেটি কোনো বিষয়ই নয়। আপনার অর্থমুদ্রা যদি পোলিশ হয়, তাহলে পোলিশ; আপনি চাইলে এ সব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি এর চেয়েও উঁচুস্তরের কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চান, তাহলে যে সন্তানটি আপনার স্বামীর নয়, তাকে গর্ভে রাখবেন কিনা– ডেকালগ টু-এ দেখা মেলা সেই নারীটির এই দ্বিধার সঙ্গে, নিউইয়র্কের এমন কোনো নারীর এমন পরিস্থিকে মিলিয়ে দেখতে পাবেন : নিউইয়র্কের নারীটি এবং ভারসাভার নারীটি– দুজনই একই রকম উভয়সঙ্কটের সম্মুখীন। টোকিওর কোনো নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই হবে। এতে আসলে কোনো ফারাক নেই।

দৃশ্য । ডেকালগ-৫
দৃশ্য । ডেকালগ-৫

প্রশ্ন : ডেকালগ বানানোর সময় একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানে আপনি ও মিস্টার পিয়েসিভিচ পরস্পরকে অনেকগুলো অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন করেছিলেন : সুখ কী জিনিস? ভালোবাসা কাকে বলে?

কিয়েস্লোফস্কি : ঠিক বলেছেন।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, কোনো চিরন্তন নৈতিকতা আদৌ রয়েছে; নাকি মানুষ ও সময়ের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন নৈতিকতার আবির্ভাব ঘটে?

কিয়েস্লোফস্কি : আমি বিশ্বাস করি, মানুষ ঠিকই জানে– কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ– এটিকে যদি আপনি নৈতিকতা হিসেবে বিবেচনা করেন। বস্তুতপক্ষে নৈতিকতা শব্দটি আমার পছন্দ নয়; সেই সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছি আমি। আমি মনে করি, এই শব্দটিকে যদি আমাকে ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে তা আমাকে এমন একজন নীতিবাদী করে তুলবে– যে কিনা এর অর্থ জানি। অথচ আমি তো এর অর্থ জানি না! সত্যি জানি না। আর এ কারণেই উত্তর দেওয়ার বদলে আমি উল্টো প্রশ্ন করে গেছি।

কোন প্রশ্নটা করা উচিত– তা কম-বেশি জানা আছে আমার। ফলে নীতিবান বদলে বরং বিবেকবোধ-সম্পন্ন হওয়ার প্রতিই আমার মনোযোগ বেশি। এর পরিধি অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত। এবং যেটিকে পোলিশ ভাষায়, এমনকি ইংরেজিতে নীতিবাদ বলে ডাকা হয়, এটি সেটিকে এড়িয়ে যায়।

নীতিবাদ বলতে আমি বোঝাচ্ছি– কী ঠিক, আর কী ভুল– সেটির প্রচারণা, বয়ান ও শিক্ষদান। তবে আমি মনে করি, সত্য ও মিথ্যের মধ্যে, ভালো ও মন্দের মধ্যে যে পার্থক্য– সেটি প্রত্যেকটি মানুষই নিজের ভেতরের একটি ব্যারোমিটার দিয়ে মেপে নিতে জানে। আর, মানুষ পারলে সেই ব্যারোমিটারটি অনুসরণ করতে সক্ষম। সেটি তারা সচরাচর যদিও পারে না, তবে সুযোগ পেলে ঠিকই করে দেখায়।

প্রশ্ন : জবাব খুঁজে পেয়েছেন?

কিয়েস্লোফস্কি : না; কেননা, এ সবের কোনো অস্তিত্ব নেই। আর এ কারণেই এই প্রশ্নগুলো ইন্টারেস্টিং। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির অর্থ আমি জানি না। এটির সঙ্গে ডেকাগল-এর তেমন সম্পর্ক নেই। ফিল্মটি রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিংবা অস্তিত্বগত স্বাধীনতা, কিংবা এমনকি মৌলিক মানবিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গে নয়। প্রত্যেকটি ফিল্মই কোনো-না-কোনোভাবে এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করে; ঠিক যেমন প্রত্যেক ফিল্মেই থাকে ভালোবাসা প্রসঙ্গটি। ভালোবাসা প্রসঙ্গটির অস্তিত্ব নেই– এমন সিনেমা কোথাও খুঁজে পাবেন না আপনি– শুধুমাত্র অ্যান্ডি ওয়ারহোলের সিনেমাগুলোর কথা বাদ দিলে; যদিও সেটি একেবারেই আলাদা একটি ধারা। তার মানে, এ রকম ফিল্মের অস্তিত্ব নেই; আর সেটিই ঘটানো হয়েছে ডেকালগ-এ।

ডেকালগ-এ কোনো ব্যক্তিমানুষই স্বাধীনতা-প্রার্থী নয়। স্বাধীনতা খুঁজে বেড়ায়– এমন কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্রের কথা ভাবতে পারি না আমি। ডেকালগ ওয়ান-এ নিজের ছেলে বরফের ফাঁদে পড়ে গেলে, ছেলেটির মানসিক যন্ত্রণার কথা ভেবে তার মৃত্যু কামনা করে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি। ডেকালগ টু-এ নারীটিকে সিদ্ধান্ত নিতেই হয়– সে গর্ভের সন্তানটিকে রেখে দেবে কিনা, এবং একইসঙ্গে দুজন পুরুষকে ভালোবাসা সম্ভব কিনা। তা-ই যদি হয়, সেই পরিস্থিতি আপনি কীভাবে সামলাবেন? তার চাওয়াটা কি বাড়াবাড়ি? এটি তার সমস্যা। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা করে না সে। বরং উল্টো সে নিজের পুরুষদের উপর নির্ভর করে। সে একজনের সঙ্গে সংসার করে ঠিকই, কিন্তু গর্ভে ধারণ করে আরেকজনের সন্তান। স্বাধীনতা বিষয়টি তার জন্য নয়। অন্যদিকে, ডেকালগ থ্রিতে পুরুষটির সমস্যা হলো, বাড়ি ফিরে যাওয়া এবং সেই বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়া– যেটি একসময় তাকে সুখী করত। সে নারীদের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার বদলে, এমনকি সেই নারীদের মধ্যে তার জন্য বিশেষ কোনো নারী থাকলেও এবং তার নিজের স্ত্রী চেয়ে তারা অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং হলেও, বরং শান্তিতে, বাড়িতেই থাকতে চায়। এটি তার সমস্যা; স্বাধীনতা নয়। অন্য নারীদের যন্ত্রণা না দিয়ে, নিজের স্ত্রীর কাছেই থাকতে চায় সে। এটি তার সমস্যা।

ডেকালগ ফোর-এর কেন্দ্রীয়চরিত্রটি জানে না– তার বাবা আসলেই তার বাবা কিনা। যে পুরুষটিকে সে ভালোবাসে, সে-ই কি তার বাবা? যদি তা-ই হয়, সে কি পারবে ট্যাবু ভাঙতে? কোনো ট্যাবু ভেঙে আপনি কি পারবেন সুখী হতে? নাকি পারবেন না? সেই ট্যাবু কি আপনার সুখকে মেঘাচ্ছন্ন করে দেবে? আর জীবন করে তুলবে তিক্ত ও নৈরশ্যময়? এটি তার সমস্যা। স্বাধীনতা সম্পর্কে কেউই ভাবে না। এমনকি ডেকালগ ফাইভ-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি, যে কিনা একজনকে খুন করে ফেলে; সে তো স্বাধীনতার চেয়ে বরং অনেক বেশি সচেতন– কেন সে এ কাজটি করেছে– সেই ব্যাপারে। নিশ্চয়ই সে ফাঁসিতে ঝুলতে চায় না; কেউই সেটা চায় না। সবাই, কিংবা বেশিরভাগ মানুষই বাঁচতে চায়। কিন্তু তার মানে এই নয়, সে স্বাধীনতা চাচ্ছে। সে স্রেফ বুঝে ওঠতে চাচ্ছে– কাজটা সে কী করেছে এবং কেন করেছে। ফাঁসিতে ঝুলতে সে চায় না ঠিকই, তবে তার মানে এই নয় যে– সে স্বাধীনতা চায়।

এ রকম উদাহরণ আরও দেওয়া সম্ভব। আমি বলি, স্বাধীনতা খুঁজে বেড়ায়– ডেকালগ-এ এমন বিষয়ক কোনো সিনেমা [এপিসোড] খুঁজে পাবেন না আপনি। হোক তা রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিংবা অস্তিত্ববাদী ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এই ফিল্মগুলো স্বাধীনতা-বিষয়ক নয়। এটি হয় ভুলভাবে ভাষান্তর, নয়তো ভুল উদ্ধৃতি করা করা হয়েছে এগুলোর।

দৃশ্য । ডেকালগ-৬
দৃশ্য । ডেকালগ-৬

প্রশ্ন : আপনি কেন লোচের নাম নিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আপনাকে প্রায়শই তার সঙ্গে তুলনা করে থাকে। ভিজুয়ালি ও থিমেটিক্যালি তার কোনো প্রভাব রয়েছে আপনার ওপর?

কিয়েস্লোফস্কি : তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই আমার। ‘৬০ দশকে কেস নামে যে ফিল্মটি তিনি বানিয়েছিলেন, সেটি আমার প্রিয়। ফিল্মটি ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার; কেননা, ফিল্মটিতে এমন কিছু ছিল– যা সে সময়ে আমাকে টেনেছে খুব। এটি দেখতে একটা ডকুমেন্টারি হলেও আসলে ছিল ফিকশনাল ফিল্ম। এ কথা আপনি জানেন কিনা– জানি না; তবে একটি চিল পাখি খুঁজে পাওয়া এক বালককে নিয়ে এটির কাহিনী। আর এই বালকটি, তা আপনি তাকে যেভাবেই দেখুন না কেন, এমনকি এই ফিল্মটিতে সে শেষ পর্যন্ত একটি ফিকশনাল বা কাল্পনিক জগতের অধিবাসী হলেও, এই বালক কিন্তু অভিন্ন রয়ে যায়। তিনিই ছিলেন সেই বালক; কোনো অভিনেতা নয়। ভীষণ ভালো করেছেন তিনি; কেননা, এটি তিনিই ছিলেন। এইসব আবেগ একান্তই তার। বাড়িতে তার বাস্তবে কোনো চিল ছিল না। হয়তো ইঁদুর ছিল! তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না।

ঘটনা হলো, যে জগতে আপনার একদমই কিছু নেই, সেখানে নিজের কিছু একটা থাকা লাগেই। তার [বালকটির] নিজের কিছুই ছিল না। একান্তই তার অধিকার রয়েছে– দাবী করার মতো এমন কোনোকিছু ছিল না তার। স্মৃতিতে ভর দিয়ে যতদূর মনে পড়ে, তার চিলটিকে মেরে ফেলেছিল তার ভাই। সে সেটির কোনো প্রতিশোধ নিতে চায়নি। বাজি ধরেনি কোনো ঘোড়া কিংবা অন্যকিছুর ওপর। ফলে বালকটির নিজের আসলেই কিছু ছিল কি-না– সেটি ব্যাপার নয়; তবে ফিল্মটিতে তার একটা চিল ছিল। তার আবেগ ছিল খাঁটি। কিংবা, কেন লোক এটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেন এ সবই তার নিজেরই আবেগ। নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি এই ফিল্মে ব্যবহার করেছেন তিনি। আমি মনে করি, ভীষণ ভালোভাবেই তিনি তা করতে পেরেছেন।

প্রশ্ন : এই আইডিয়াটি আপনি কখনো ব্যবহার করেছেন?

কিয়েস্লোফস্কি : সে কথা বলা কঠিন। একটা বালক ও একটা চিলকে ঘিরে কোনো ফিল্ম অবশ্য বানাইনি আমি।

প্রশ্ন : নন-অ্যাক্টরদের নিয়ে কাজ করেছেন কখনো?

কিয়েস্লোফস্কি : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই; অনেকবার। এ কথা আম বাজি ধরে বলতে পারি! ডেকালগ-এর প্রথম এপিসোডে একজন তরুণ ছিলেন, তিনি কোনো অভিনেতা নন; তিনি একটা থিয়েটার চালাতেন।

প্রশ্ন : বাবার চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন?

কিয়েস্লোফস্কি : হ্যাঁ। তিনি অভিনেতা নন। বাবার চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন।

প্রশ্ন : এখন আমি কনসেপ্ট-অব-চান্স বা সুযোগের ধারণাটি নিয়ে কিছু শুনতে চাই। ডেকালগ-এর জগৎটি একটি চান্সের জগৎ। ডেকালগ-এর এপিসোড-ফাইভ-এ যদি ফোকাস করি, আমার মতে, এই আইডিয়াটি সেখানে চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফিল্মটির অনেকগুলো পরিস্থিতিই কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোকে এমনটা বেছে নিতে বাধ্য করেছে– ওটা করার চেয়ে বরং এটা করো; আলাদা কিছু করো, অন্য কোথাও যাও। আশপাশ থেকে তরুণ যুগল কিংবা রাস্তা থেকে মাতালকে তুলে নিয়েছে ট্যাক্সি ড্রাইভারটি। এটি কি চান্সের চেয়ে বরং নিয়তির ব্যাপার নয়?

কিয়েস্লোফস্কি : আমি মনে করি, এটি সবকিছুরই ব্যাপার। এটি ভাগ্য কিংবা নিয়তি– যেমনটাই বলুন; এবং একইসঙ্গে এটি চান্সও। আর ব্যাপক পরিসরে ভাবলে, এ হলো আপনার নিজের স্বাধীন ইচ্ছের বাসনা। ট্যাক্সি ড্রাইভারের নিজের একটা চয়েস ছিল; কিন্তু সে মাতালটিকে ট্যাক্সিতে না তুলে, তরুণ যুগলকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। খুনটা সে করেনি; বরং করেছে অন্য এক ড্রাইভার। জাসেক [জনৈক তরুণ] যা কিছুই করেছে, ভীষণ সচেতনভাবে করেছে। সে জানে, সে কী চায়। কিন্তু কেন সে এমনটা করল? তবে সে যা-ই করেছে, নিজের স্বাধীন ইচ্ছেতেই করেছে। কেন তা করেছে– সেটি অন্য প্রসঙ্গ।

আমি মনে করি, সুযোগ, নিয়তি ও স্বাধীন ইচ্ছে– এই তিনটি জিনিস পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। এগুলো আমাদের জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করে। এটি নির্ভর করে প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবন ও সেই ঘটনাটির মুহূর্তকালের ওপর। কখনো এটা ঘটায়, কখনো ওটা। কখনো চান্সের কারণে ঘটে; কখনো স্বাধীন ইচ্ছে চরিতার্থের কারণে; কিংবা ভাগ্যের কারণে। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পথে চালিত হতে থাকি। জানি না– যাব কোথায়; তবে জানি, কোথাও যেতে হবে।

জানি না, আমাকে কেন চান্সের এমন একজন এক্সপার্ট হিসেবে গণ্য করা হয়! এই শিরোনামে একটা সিনেমা বানিয়েছি বলে? কিন্তু অন্য [যেকোনো ফিল্মমেকারের] যেকোনো সিনেমা বেছে নিন, [দেখবেন] সেখানে এটির কোনো বালাই নেই। এমন একটি বেছে নিন– যেটির কথা আপনি-আমি, দুজনেই জানি। দেখবেন, সেগুলোর সবটাতেই চান্সের অনেক ব্যাপার বিদ্যমান। আমার সিনেমাগুলোতেও আছে ঠিকই, তবে আমাকে চান্স স্পেশালিস্ট হিসেবে গণ্য করা হলেও, আমার অন্য সিনেমাগুলোতে এটি কখনোই মেইন ইস্যু নয়।

দৃশ্য । ডেকালগ-৭
দৃশ্য । ডেকালগ-৭

প্রশ্ন : ডেকালগ-এ একটা ক্যারেক্টার আছে, ফিল্মগুচ্ছের বাকি চরিত্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় সেটির আবির্ভাব ঘটে। মনে হয়, সে যেন ভিন্ন কোনো জগতের কেউ। সে সবই জানে; কিন্তু কোনোকিছুতেই যেন তার অংশগ্রহণের ইচ্ছে নেই; যেন সে স্রেফ একজন বার্তাবাহক। কে সে?

কিয়েস্লোফস্কি : বলতে পারেন, সে এখানেই আছে। আর যেখানেই আবির্ভূত হয়, সেটির কারণ বিশ্লেষণ করে। তবে এই ফিল্মগুচ্ছে তার আবির্ভাব বরাবরই ঘটে সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে :  পুরো ফিল্মটিতে কিংবা কোনো দৃশ্যে। প্রত্যেকটি ফিল্মেরই অন্তত দুটি করে টার্নিং পয়েন্ট রয়েছে। সেই বিবেচনায়, ফিল্মটি তিন ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে, প্রত্যেকটি পার্টে দুটি করে টার্নিং পয়েন্ট– প্রত্যেকটি দৃশ্য ও প্রত্যেকটি শটের বিচারে। এইসব মুহূর্তেই তার আবির্ভাব ঘটে। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগেই, কিংবা কেউ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে– তখন দেখা দেয় সে। তার আসল পরিচয় কী– আমি জানি না। সে জবাব পাওয়াও যায়নি। আমি শুধু জানি, সে আমাদের দেখছে। আমরা যা করছি– তার ভালোলাগছে না; তবে এ ব্যাপারে তার কিছুই করার নেই। আমাদের জীবনে তার কোনো প্রভাব নেই। খুব সম্ভবত আমাদের এ জীবনটা তারই দেওয়া; এবং সে চায়– আমরা যেন কোনো-না-কোনোভাবে সামলিয়ে ওঠতে পারি; কিন্তু আমরা তা পারি না। আমরা ভুল করি, করি নোংরা সব কাজকর্ম, আর নিজের এইসব খুঁতগ্রস্ত সৃষ্টির কাজকর্মে সে দুঃখ পায় খুব।

প্রশ্ন : ঈশ্বর?

কিয়েস্লোফস্কি : আমি জানি না! এটা আপনার ব্যাপার। আমি এই ধরনের টার্ম ব্যবহার করতে চাই না। আমি আপনাকে কেবল বলতে পারি, কখন তার আবির্ভাব ঘটে এবং কী তার উদ্দেশ্য। এখন, তার পরিচয় খুঁজে নেওয়াটা আপনার কাজ। কেননা, সে এখানে উপস্থিত শুধুমাত্র আপনার জন্য; আর অন্য কারও জন্য অন্য কোথাও।

প্রশ্ন : আমার মনে হয়েছে, ডেকালগ-এর স্ক্রিপ্ট লেখার সময় আপনি চেয়েছিলেন এমন একটি সার্বজনীন কাজ সৃষ্টি করতে, যেটিকে যে কোনো পশ্চিমা দর্শক খুব সহজেই বুঝে ওঠতে পারে।

কিয়েস্লোফস্কি : না; একেবারেই তা নয়। এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি। আমরা চাইনি… হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন যতবেশি সম্ভব মানুষের কাছে বোধগম্য করে তুলতে। তবে এ ব্যাপারটি মাথায় নিয়ে কাজে বসিনি আমরা।

দৃশ্য । ডেকালগ-৮
দৃশ্য । ডেকালগ-৮

প্রশ্ন : তার মানে, আবারও চান্সের খেলা?

কিয়েস্লোফস্কি : না; এটা চান্সের ব্যাপার নয়। কিছুতেই নয়। তবে আপনি বলতে পারেন, এ ছিল আমার দিক থেকে একটি হিসেবি পদক্ষেপ। আমি যদি এমনটা করি, তাহলে এই প্রতিক্রিয়া পাব– এ হিসেব আমার করা ছিল। অন্যভাবে বললে, আমি যদি এভাবে লিখি, তাহলে তারা বুঝতে পারবে; এবং পশ্চিমা দর্শককে টার্গেট করা যাবে। তবে সত্য ঘটনা হলো, আপনার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত– আমরা স্রেফ এমন একটা সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম; আর তা হলো– রাজনীতিকে যে কোনো মূল্যে এড়িয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারটি নিয়ে তো একটু আগেই বললাম আপনাকে।

আমরা ঠিক করেছিলাম, কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর কাজকর্মের একটি উদ্দেশ্য হিসেবে রাজনীতিকে বাদ দিতে হবে। আর তা আমরা পরিপূর্ণভাবেই করেছি। কিন্তু কী হলো তাতে? রাজনৈতিক উপাদান যদি আপনি বাদ দিয়ে দেন, তাহলে সেটি এই তথাকথিত রাজনৈতিক উপাদানের খোলস থেকে বেড়িয়ে আসবে, আর আপনি পাবেন পোলিশদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার দেখা। আমি বলতে চাচ্ছি, এ সবকিছুই জটিলতা এবং পোলিশ হিসেবে গর্বের ভেতর দিয়ে করতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা বলেছি আমরা। আর এ সবেরই প্রতিফলন আজকের দিনের রাজনীতিতেও দেখা মেলে। বর্তমানের ও অতীতের। ঠিক ১০ বছর আগের রাজনীতির মতোই– যখন আমরা ডেকালগ বানিয়েছিলাম। নয় বছর আগে। ফলে সংক্ষেপে বলতে গেলে, আপনি যদি এটিকে বাদ দিয়ে দেন, যদি যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ড ও চিন্তার পন্থা হিসেবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনীতিকে বাদ দিয়ে দেন, তাহলে ফিল্ম থেকে আপনি আসলে সবকিছুকেই বাদ দিয়ে দিলেন; মানে, আপনি যদি এটিকে একটি বাঁধা-ধরা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, তাহলে দর্শক হিসেবে একজন টিপিক্যাল পোলের [পোল্যান্ডের একটি জাতিসত্ত্বা] সঙ্গে সামঞ্জস্য্পূর্ণ হতে পারবেন– অন্তত ঢালাওভাবে একজন পশ্চিমা দর্শক হিসেবে।

রাজনীতিকে বাদ দিলে, একজন পোলের এই বাঁধাধরা-রূপটিও মুহূর্তেই ও সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ে যায়। তার মানে, পোলের কোনো অস্তিত্ব থাকে না আর। তারা পোল্যান্ডে বাস করলেও, তারা পোলিশ ভাষায় কথা বললেও, এবং তাদের পোলিশ পাসপোর্ট থাকলেও তারা কিন্তু স্রেফ পোলের চেয়েও অধিক কিছু। তারাও মানুষ– যারা চিন্তা করতে পারে, এবং বাকি সবার মতোই তারাও কষ্ট পায়, আনন্দ পায়।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, এ কারণেই পাশ্চাত্যে ডেকালগ এমন সাড়া ফেলে দিতে পেরেছে?

কিয়েস্লোফস্কি : হয়তো তা-ই; আমি এমনটাই বিশ্বাস করি। আমার ধারণা, পোলিশ স্টেরিওটাইপ দেখে দেখে পশ্চিমা দর্শকরা বিরক্ত হয়ে গেছে। পোল-কে অভিযুক্ত করে, রাজনীতিতে শাহাদাতের পতন দেখানো হয়েছে। পোল হলো নিয়তির নির্যাতনের শিকার; কেননা, নিজ দেশের খারাপ লোকেশনে তার অবস্থান– এই ভাবমূর্তি দেখে দেখে পশ্চিমা দর্শকরা বিরক্ত। একইসঙ্গে, পশ্চিমের লোকজন সবকিছুকে বাকি সবার মতোই দেখে; যে মানুষগুলো নিজেদের ফাঁপর শেয়ার করে– দেখে তা। আমাদের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোও এই একই পরিস্থিতির অধিবাসী। তারা চয়েসের নেওয়ার মুখোমুখি। তারা সেইসব সমস্যার মুখোমুখি– যা কিনা যেখানে নিজেদের অবস্থান, সেখানে যে কোনো মানুষ নির্বিশেষে এর মুখোমুখি হয়।

দৃশ্য । ডেকালগ-৯
দৃশ্য । ডেকালগ-৯

প্রশ্ন : আপনি দুটি বিশাল প্রজেক্টের কাজ শুরু করেছিলেন। ডেকালগ : টেন কমান্ডমেন্টসের একটি আধুনিক রূপান্তর-স্বরূপ দশটি ফিল্ম; এবং থ্রি কালারস ট্রিলোজি : প্রতীকের সমধর্মিতা, স্বাধীনতা ও সমতার একটি আধুনিক রূপান্তর। এই বিশাল প্রজেক্টগুলোর উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জই কি আপনাকে আকৃষ্ট করেছিল? নাকি আপনার উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ নিজের স্টাইলিস্টিক আগ্রহ কিংবা সহজলভ্য আর্থিক সংস্থানের প্রতি?

কিয়েস্লোফস্কি : অর্থলগ্নির বিষয়টি প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা। ডেকালগ বানানো হয়েছিল একেবারেই ১ লক্ষ ডলারে। দশটি ফিল্মের মধ্যে হলে মুক্তি পেয়েছিল দুটি। পুরো কর্মযজ্ঞের খরচ ১ লক্ষ ডলার সমপরিমাণ পোলিশ মুদ্রা।

প্রশ্ন : বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে এটি।

কিয়েস্লোফস্কি : ঠিক বলেছেন। ডেকালগ-এ অর্থলগ্নি করেছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ; আর তারা ৩০ লাখেরও বেশি ডলার উপার্জন করেছিল। বিশাল ব্যবসা। তবে এমনটা হবে– আমরা প্রত্যাশা করিনি। আমরা ভেবেছিলাম, পোলিশ টেলিভিশনের জন্য নির্মিত এ সিনেমা স্রেফ আঞ্চলিক সিনেমাই হয়ে থাকবে; এবং আমরা হয়তো আরও অল্প কয়েকটি টিভি স্টেশনে এটি বিক্রি করতে পারব। কিন্তু আমরা হিসেব করিনি– এটি প্রায় সর্বত্র বিক্রি হয়ে যাবে। তবে তা ঘটেছে। এই ফিল্ম-সাইকেলটি সর্বত্র বিক্রি হয়েছে; কিংবা বলা ভালো, ‘প্রায়’ সর্বত্র। আমরা এতটা আশা করিনি।

প্রশ্ন : কিন্তু এমন বিশাল প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী ছিল?

কিয়েস্লোফস্কি : এমনটা সচরাচর ঘটে না। আমি জানি না, এগুলো এতো বড় [মাপের] ফিল্ম ছিল কিনা। তবে এমনতর চিরন্তন, চিরচেনা শব্দ, বিষয়, স্লোগান কিংবা কামান্ডমেন্টসের মতো বিষয়কে পুনর্ব্যক্ত করাটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগুলোর প্রতি আলোকপাত করাটা ছিল চ্যালেঞ্জের জায়গা। কামান্ডমেন্টস নিয়ে অনেক কথাই তো লেখা হয়েছে। শুধুমাত্র ক্রিশ্চিয়ান সাহিত্যেই নয়; জ্যুডেও-ক্রিশ্চিয়ান সাহিত্যেও। তবে এর বাইরেও কিছু আছে। এগুলো ভিন্ন ধরনের দার্শনিক রূপান্তর। এ সম্পর্কে অনেক লেখা হয়েছে– এ নাকি এখনকার সময়ে অচল।

আমরা ভাবলাম, একেবারেই ভিন্নভাবে জাহির করাটা বেশ ইন্টারেস্টিং হবে। কেননা, কামান্ডমেন্টস ও বাইবেলের সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারকে বৈজ্ঞানিক রূপান্তরের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা ঠিক করলাম, প্রত্যেকটি কমান্ডমেন্টকে একটি মানুষের মধ্যে স্থাপন করে একটি চ্যালেঞ্জের ভেতর নিরূপন করে দেখব : মানুষ কি এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে সক্ষম? এমনটা করার মতো সক্ষমতা কি মানুষের রয়েছে? এইসব কমান্ডমেন্টসকে কি মেনে চলা এবং  এগুলোকে সত্যিকার অর্থেই মান্য করা সম্ভব? সম্ভব কি? আধুনিক জীবন কি অতটা জটিল নয়, যে, কমান্ডমেন্টস মেনে চলা বাস্তবিকঅর্থেই অসম্ভব?

রিলেটিভিজম বা অপেক্ষবাদের দ্বারস্থ আমরা হইনি; কেননা, এটি সে রকম ইস্যু নয়। এ হলো আমাদের জীবন, আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বেড়ে ওঠা অভিযোগনামার ব্যাপার। এ শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতিরই নয়; বরং অতীতে, সুদূর অতীতেও সম্ভবত এমনটাই ছিল। কিন্তু মানুষ কি যথেষ্ট শক্তিমান নয়? কোনো মানুষ যদি জানে তার কী করা উচিত, তাহলে কেন সে অন্যকিছু করে দেখে না?

কথাটা রিলেটিভিজমের মতো শোনালেও, আমাদের আশা, আমরা এই এথিকেল রিলেটিভিজমকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

দৃশ্য । ডেকালগ-১০
দৃশ্য । ডেকালগ-১০

প্রশ্ন : আমার শেষ প্রশ্নটি খানিকটা উসকানিমূলক! আমার মনে হয়েছে, নিজের ফিল্মের সমালোচনার প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া তাচ্ছিল্যের।

কিয়েস্লোফস্কি : না; এ কথা ঠিক নয়।

প্রশ্ন : তাই নাকি? সমালোচকদের মন্তব্যের, আমজনতার মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব আছে আপনার কাছে? নাকি আত্মতৃপ্তিই আপনার যথেষ্ট?

কিয়েস্লোফস্কি : দেখুন, আপনি তো জানেনই, আমি আমজনতার মন্তব্যকে নিঃসন্দেহে গুরুত্ব দিই। নিশ্চয়ই দিই।

প্রশ্ন : কিন্তু সমালোচকদেরও কি গুরুত্ব দেন?

কিয়েস্লোফস্কি : নিশ্চয়ই; তারাও তো আমজনতার একটা অংশ। আর তারাও নিজের মত প্রকাশ করেন। তারা যদি ভালো সমালোচক হন, তাহলে তাদের কথায় আমজনতার অনুভূতির একটা অংশ প্রকাশ পাবে। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে আপনি যে বললেন, এটা উসকানিমূলক প্রশ্ন, আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না!

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, আপনাকে কেন শ্রেষ্ঠতম ইউরোপিয়ান ফিল্মমেকারদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়– তা আপনি জানেন না; অথচ আপনি তা-ই।

কিয়েস্লোফস্কি : সেটি আলাদা প্রসঙ্গ। এ ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না। তবে আমার ধারণা, যারা এমনটা লিখেন, তারা হয়তো জানেন। আমি যে বুঝি না– সেটি কোনো ব্যাপার নয়। আমি স্রেফ এমনটা ভাবি, এই তো!

প্রশ্ন : তার মানে, আপনি ভীষণ রকম বিনয়ী মানুষ।

কিয়েস্লোফস্কি : না; আমি একেবারেই সাধারণ মানুষ

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

2 মন্তব্যগুলো

  1. […] তবে এটি নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়ে গেছে। ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কির নতুন সিনেমা, যা কিনা এখনো মুক্তি […]

মন্তব্য লিখুন