কাজী হায়াতের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার । দ্বিতীয় কিস্তি

3
998

কাজী হায়াৎ। জন্মঃ ১৯৪৭; গোপালগঞ্জ। বাংলাদেশি সিনেমার কিংবদন্তি ফিল্মমেকার। ২৮ মে ২০১৬, বৃষ্টিস্নাত দুপুরে, তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে মুখোমুখি হয়েছিলাম পঞ্চাশটি ফিচার ফিল্মের এই রাগি নির্মাতার। একটানা আড়াই ঘণ্টার সেই আলাপের তিন কিস্তির দ্বিতীয়টি মুদ্রিত হলো আজ। বলে রাখি, আলাপের সহজাত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে, ট্রান্সক্রিপ্ট করা হলো অবিকল; ফলে, বাক্যে অসঙ্গতি থাকাই স্বাভাবিক…

আগের কিস্তি

রুদ্র আরিফ : আপনি ধরেন, তারপর আরেকটা অ্যাক্টরকে আমরা দেখলাম, যে, উনি একটা-দুইটা সিনেমায় সাইড-নায়ক– যেটা আমরা বলি চলতি ভাষায়… সাইড-নায়ক হিসেবে অভিনয় করলেও, মানে, একটা-দুইটা সিকোয়েন্সের জন্য, এবং খুবই সিম্পল– ঐ অ্যাক্টরটাকে আপনি একজন ভিলেন হিসেবে নিয়ে আসলেন, যে হচ্ছে ধরেন, ধাক্কা দেওয়া যেটা, নাড়ায়া দেওয়া– ডিপজল নাম দিয়া আপনি নিয়া আসলেন। এই যে আবিষ্কারটা…

কাজী হায়াৎ : এটা আবিষ্কার হলো… ডিপজলের বড়ভাই… ঐ ‘পাগলী’ হলো ডিপজলের বড়ভাইয়ের ছবি।

রুদ্র আরিফ : …উনি প্রডিউসার?

কাজী হায়াৎ : …হুম। সেই হিসাবে ডিপজলকে মাঝে মাঝে দেখতাম। মান্নার সাথে ডিপজলের খুব বন্ধুত্ব ছিল। ডিপজল একবার জেল থেকে বের হলো। দ্যাট ওয়াজ অ্যা ফানি, দ্যাট ওয়াজ অ্যা… ফানি না ঠিক, সেন্টিমেন্টাল স্টোরি। আমি শুনেছি : ডিপজলের মেয়ে ডিপজলকে দেখতে গিয়েছিল ঈদের সময়। মেয়েটা ছোট। কথা বলার সময় তো সে আর জানে না যে, জেল-টেল কী। তারপর তার মেয়ে বলছে যে, ‘চলো আব্বা, যাই। আজকে ঈদ, তুমি এইখানে থাকবা কেন?’ তখন সে কেঁদেছিল। এবং সে ঐবার জেল থেকে বের হয়ে ডিসিশন নিলো, যে, ‘আমি আর এইসবের মধ্যে থাকব না। আমি এমন একটা লাইনে যেতে চাই, যেখানে সার্বক্ষণিক কাজ থাকবে; এবং যেইসব রংবাজ আমার বন্ধু হয়ে গেছে, এদের আমি অ্যাভয়েড করব।’ সে [বাড়ির] সব জায়গায় কলাপসিবল গেট করে দিলো; এবং সেখানে তাদের বলে দিলো যে, ‘আমার যারা পুরানা বন্ধু ছিল, কেউ [বাড়িতে] ঢুকবে না’।
মান্নার সাথে তার একটা বন্ধুত্ব ছিল। মান্নাকে বলল, যে, ‘আমাকে এমন একজন ডিরেক্টর দিবি, যে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে আমার ছবি শেষ করে দিতে পারবে। এবং আমি সব সময় সেটে থাকব। আমি এই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই।’
মান্না নিয়ে গেল মন্তাজুর রহমান আকবরকে। কী… বাবা-মার কী যেন গল্পটা! মন্তাজুর রহমান আকবর সম্ভবত তখন বেশ ছবি করছে। ওর [ডিপজলের] ছবিটা বন্ধ করে দিয়ে ইন্ডিয়া গেল। ইন্ডিয়া ঋতুপর্ণাকে কন্ট্রাক্ট করতে গেল। এবং পনের-বিশদিন শুটিং অফ। এবং মন্তাজুর রহমানকে খুঁজেই পায় না ডিপজল। তখন সে… এমনিই তো রংবাজি টেনডেন্সি আছে… তখন মান্নাকে খুব বকা-ঝকা করল যে, ‘তুই কী ডাইরেক্টর আইনা দিলি, শালার কোনো খোঁজ নাই, কিচ্ছু নাই; আমার ছবি বন্ধ কইরা দিয়া চইলা গেছে! আমার কি টাকার অভাব? তুই আমাকে একটা ডাইরেক্টর আইনা দে, যে আমাকে ছবি একটানা শেষ করে দেবে। এইটা বন্ধ আপাতত। ঐ ডাইরেক্টর দিয়া হবে না।’
তখন সে আমাকে… মান্না আমাকে এসে বলল যে, ‘ওস্তাদ, ডিপজলের একটা ছবি করেন আপনি।’ আমি প্রথমে ‘না’ করেছিলাম।…

রুদ্র আরিফ : …ওনার নাম বোধহয় দীপু ছিল?

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ, দীপু।… মান্না বলল, ‘ওর একটা ছবি করেন। টাকা পয়সা দেবে।’ আমি বললাম, ‘দেখ, আমি তো ওকে রংবাজ হিসেবেই চিনি; আর, ও আমার সামনে সিগারেট খায় না, ওর সাথে পরিচয় আছে, ওর বড়ভাইয়ের থ্রুতে পারিবারিক একটা সম্পর্কও আছে; মদ খায়… আরও শুনেছি, মদ খায় সবসময়! আমাকে এর মধ্যে নিস না; জড়াইস না।’
তখন ও [মান্না] বলে যে, ‘না ওস্তাদ! আপনের যাইতেই হবে।’ জোর করেই নিয়ে গেল। ‘এশিয়া’ সিনেমা-হলে ও [ডিপজল] তখন বসে। আমাকে দেখে… সে মদ খাচ্ছিল, সিগারেট খাচ্ছিল… দেখেই সব ঢেকে-ঢুকে ফেলল। আমি বললাম, ‘খাচ্ছো যখন, খেতে…’
‘না, না, না, বড়ভাই! বড়ভাই বসেন, বড়ভাই বসেন…’
বসে, সে আমাকে বলল যে, ‘আপনি আমাকে একটা সিনেমা বানাইয়া দিবেন। মান্নার সিডিউল আছে। আর, কারে নায়িকা নিবেন– আমি জানি না। তবে ছবির কাজ একদিনও বন্ধ থাকব না। একটানা শেষ কইরা দিবেন। আপনি আসছেন, কাইলকে এইখানে আসবেন, আইসা গল্প বানাইবেন। আমি শুনছি, আপনি বলে স্পটে গল্প লেখেন?’
আমি বললাম, ‘স্পটে গল্প লেখি আমি; কিন্তু একটা লাইন-আপের মতো করে নেই।’
তো, ওর ওখানে লাইন-আপের গল্প হচ্ছিল। তো, ইন-দি-মিন-টাইম ওর মাঝে মাঝে ফোন আসত। ফোন আসলে ও ঢাকাইয়া ভাষায় খুব মিষ্টি করে কথা বলত : ‘অ্যাই, খানকির পোলা… একদম সানডে-মানডে কোজ কইরা দিব… এদিকে আসবি না… হ্যান করবি না… আমি ঐ লাইনে নাই…।’ –এইসব আমাকে খুব ইয়ে করত… ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম এই সময়ে।
আমি আমার ভিলেনের চরিত্রকে ঠিক করলাম– কাবিলা। কাবিলাকে দিয়ে ঐ ডায়লগটাই লিখলাম আমি। [জনৈক অতিথির আগমন। মুহূর্তের বিরতি…] তো, কাবিলার জন্য ড্রেস-ট্রেসও তৈরি করা হলো। কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল যে, ডিপজল যদি করত, তাহলে ভালো করত। আমি ওকে বললাম যে, ‘ডিপজল, তুমি করো’। তখন সে-ই বলল, ‘না; ঐ কাবিলারে দেন’। কাবিলা গেল শুটিং স্পটে। প্রথমদিন শুটিং হলো। কাবিলার শুটিং করলাম না। অনুরোধ করলাম ডিপজলকে, ‘ডিপজল, দেখো, আমি তোমাকে দেখে ভাবছি চরিত্রটা।’
কয়, ‘বড়ভাই, আমি অভিনয় জানি না; আর, আপনার সামনে আমি অভিনয় করতে পারব না। বাদ দেন। মাফ কইরা দেন। আর, শখ ছিল আগে; এখন আর নাই। আমার ছবিডা বানায়া দেন আপনে।’
কাবিলা ড্রেস পরে আসছে। শট। সিকুয়েন্স শুটিং হবে। তখন আমি ডিপজলকে লাস্টবারের মতো বললাম, ‘ডিপজল, আমি ডিরেক্টর হিসাবে আমার একটা চিন্তা থাকে, সেই চিন্তা থেকে কিন্তু এই চরিত্রটায় তোমাকেই দেখেছি। তুমি যদি করো…’
‘অ্যাই! এমনেই সন্ত্রাসী ক্যারেক্টার! আমার এমনেই নাম হইয়া গেছে– সন্ত্রাসী! আর এই [পার্ট] নিলে আমার কি আর ইজ্জত থাকব?’
‘আরে, এইটা তো সিনেমা! তুমি করো।’
‘আমি পারব না। আপনার অই ডায়লগ-ফায়লগ আমি পারব না।’
আমি তখন বললাম, ‘তুমি তাহলে… আমি কী সিস্টেমে কাজ করব, তাহলে শোনো? আমার এই লিখিত কোনো ডায়লগ থাকবে না। তুমি যেইটা বলতে পারবা সিকুয়েন্স অনুযায়ী– সেই ডায়লগই থাকবে।’
‘কীভাবে?’
আমি তখন আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল– মহারাজ; মহারাজকে বললাম যে, ‘মহারাজ, টেপ-রেকর্ডারটা আনো তো! টেপ-রেকর্ডারের রেকর্ডিং চাপো।’ রেকর্ডিং চেপে, তখন আমি বললাম যে, ‘আমি মান্নার ডায়লগ বলতাছি তোমারে; তোমার ল্যাঙ্গুয়েজে তুমি বলবা।’ বলতে লাগলাম; ওর ল্যাঙ্গুয়েজে ও বলতে লাগল। একটু শাইনেস ছিল। তো, রেকর্ড করে ওরে আবার শোনাইলাম : ‘এইটা তো বলতে পারবা?’
কয়, ‘তা পারব’।
আমি তখন কাবিলারে বললাম, ‘কাবিলা, আই অ্যাম স্যরি! তুমি তো আমারই ছেলে’… কাবিলাকেও কিন্তু আমিই এনেছি ফিল্মে… ‘তুমি অন্য একটা ক্যারেক্টার করো; ড্রেসটা খুলে দাও।… ডিপজল, এই ড্রেসটা পরে আসো তো; তোমার লাগে নাকি, দেখি।’
‘কী করেন না বড়ভাই! কী… এইগুলো হয়?’ –এই সে গেল। খুব অনিচ্ছাসত্ত্বে গেল; এবং কাপড়টা পরে আসলো। আমি বললাম, ‘এই তো, গুড!’ এবং তার তো অনেক চামচা ছিল! সবাই খুব প্রশংসা করতে লাগল। সে উৎসাহিত হলো। আমার ক্যামেরাম্যানকে বলে দিলাম এইটা– ‘দেখো, ও কিন্তু অভিনেতা না। ফিফটি লেন্সের নিচে’… আমি বললাম যে, ‘…আমি কম্পোজিট শট নিয়ে, তারপর ম্যাক্সিমাম শট ওর ক্লোজে কাটব। এবং সেই ক্লোজগুলো ফিফটি টু সেভেনটি ফাইভ লেন্সে হবে সব। কোনো ওয়াইড ল্যান্সে হবে না। ওর চেহারাটা আমি রেকর্ড করতে চাই। ওর সবচাইতে প্রমিনেন্ট যে বিষয়টা আছে, ও কালো, কিন্তু ওর দাঁতগুলো সাদা। এর মধ্যে একটা ভয়াবহতা আছে। আই ওয়ান্ট টু রেকর্ড দিস এক্সপ্রেশন। আর, ও যা বলবে– নরমাল। আমি দেখায়া দেবো সেইটা…।’ এবং আমি বললাম যে, ‘তুমি নরমাল ডায়লগ দিবা তোমার।’ হয়ে গেল!
এবং এটা আপনারা জানেন না, দ্যাট ওয়াজ অ্যা রেকর্ড বিজনেস– ‘তেজী’ ছবি।

রুদ্র আরিফ : …আমি মুভিটা দেখছি! আমি তখন স্কুলে পড়ি…

কাজী হায়াৎ : …পাবনায় ছবিটা তিনমাস চলেছিল। ইট ওয়াজ রেকর্ড।

রুদ্র আরিফ : ওনার যে ফার্স্ট অ্যাপেয়ারেন্স ছিল– ‘রবি, তুই আছস! তোরে দেখার বড় শখ ছিল রে!’ –এই টাইপের একটা সংলাপ; এই অ্যাপেয়ারেন্সটা ধরেন আমাদের সিনেমায় দুর্লভ। মানে, তার প্রথম অ্যাপেয়ারেন্সটা…

কাজী হায়াৎ : …তারপর, খুলনায় চলেছিল স্টার সিনেমা-হলে চার মাস। মানে, আমার কোনো ছবি এত চলেনি। কিন্তু ছবিটি [ছবিটিতে ডিপজল] ব্যবসা করতে পারেনি!… হল-মালিকরা গেইনার হয়েছে। সব পারসেন্টিজে চলছে। কারণ হলো, নতুন আর্টিস্ট তো; পারসেন্টিজে চলে সেই টাকাটা পাইছে [ডিপজল]। সেই ধাক্কাটা দিলো ও, তখন বিজনেস বুঝল, ধাক্কাটা দিলো ‘আম্মাজান’-এ এসে। ‘আম্মাজান’-এ ও এক্সিবিউটরদের কষে দিলো। আর এক্সিবিউটররা পাগলা হয়ে গেল!

রুদ্র আরিফ : …[ডিপজল] অলরেডি স্টার…

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ। তখন সে ধাক্কা দিয়ে, রিলিজ ডে’তে ছবির, ইট ওয়াজ অ্যা রেকর্ড অফ মাই লাইফ, এবং ইট ওয়াজ অ্যা রেকর্ড অফ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অলসো, আরও একটা ছবির বেলায় ঘটেছে এটা, সেটি হলো– রিলিজ ডে’তে… এক কোটি দুই লক্ষ টাকা খরচা ছিল ছবিতে, সে এক কোটি চার লক্ষ টাকা বৃহষ্পতিবার-দিন রাতে পাজেরো ভরে নিয়ে গিয়েছিল। মানে, দুই লাখ টাকা রিলিজ ডে’তে প্রফিট ছিল তার। ইট ওয়াজ অ্যা রেকর্ড।

'আম্মাজান' সিনেমার পোস্টার
‘আম্মাজান’ সিনেমার পোস্টার

রুদ্র আরিফ : এই জায়গায় ‘আম্মাজান’-এর কথা যেহেতু আসলো, আমি একটা ব্যাপার বলতে চাই, সেটা হচ্ছে যে, আপনি অনেক সেন্সেটিভ ব্যাপারগুলা ফুটায়া তোলেন : ধরেন, যেমন ‘আম্মাজান’-এ বাচ্চা দেখতেছে– মা রেপড হচ্ছে। এইটা ঘটে। কিন্তু আমরা সিনেমায় সাধারণত এই ব্যাপারটা দেখি না। এবং এইটা খুব, মানে, যেটাকে চপটাঘাত বলেন, বা, চাবুকের বাড়ি বলেন, এই ব্যাপারটা ধরেন দর্শকরে দেয়। এইটা একটা রিস্কের ব্যাপার। এইটা আপনার বেশিরভাগ সিনেমাই দেয়…

কাজী হায়াৎ : …এটা এত রিস্কি ছিল যে, আমি বলি, আমি তখন বেশ কিছুটা নাম করেছি তো? আমাকে একবার ‘যমুনা ফিল্মস’– দেশের বিখ্যাত ফিল্মস– যমুনা কোম্পানি ডাকল একটা ছবি করার জন্যে। তাদের এই ‘আম্মাজান’ গল্পটা শোনালাম। ওনারা আসলেই চলচ্চিত্র বোঝেন। ‘পদ্মা’ সিনেমা-হলের মালিক… ঐ… শফি বিত্রক্রমপুরী– ওরা। ওরা তখন ফিল্মের জায়ান্ট। ঘর বন্ধ করে, ওনারা আমাকে দুপুরের খাবার দিয়ে, গল্পটি শুনলেন। [ফোনের জন্য মুহূর্তের বিরতি…] গল্পটি শুনলেন। শোনার পরে, সিদ্দিক সাহেব– ওনাদের বড়ভাই, তিনি সবচাইতে ফিল্মবোদ্ধা বলে পরিচিত, যে, কোন ছবি চলবে না, কোন ছবি চলবে– এ রকম একটা কিংবদন্তি আছে, মানে, বাজারে শ্রুত আছে যে, সিদ্দিক সাহেব বলে দিতে পারেন। তো, উনি আমাকে চোখ বন্ধ করে বললেন যে, ‘গল্পটা খুবই ভালো; আচ্ছা, ভাবী কিংবা বোন করা যায় না এই চরিত্রটাকে?’
আমি বললাম, ‘না’।
‘কেন?’
‘তাহলে আমার ঐ সেন্টিমেন্টটা থাকবে না। মূল সেন্টিমেন্ট যেটা, সেটা থাকবে না।’
‘আমরা তাহলে করব না ছবিটা।’
আচ্ছা! আমি বললাম, ‘কেন?’
‘করব না এই হেতু, যে, মা রেপড হচ্ছে, ছেলে দেখছে– আমাদের দেশে এটা অ্যাপসেপ্টল্ট করবে না।’
এরপরে একদিন খলীলউল্লাহ সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন এক প্রডিউসার– শিকদার সাহেব– সেও জায়ান্ট; মানে, আমাদের দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ভগ্নিপতি… তখন সে বড় প্রডিউসার। আমাকে খলীলউল্লাহ সাহেব বলতেছে, ‘তুমি তো মাইনষেরে পয়সা বানায়া দিচ্ছো, তুমি নিজে কিছু করো। আমি তোমাকে টাকা দেবো।’… শিকদার সাহেবের ওখানে নিয়ে গেলেন। শিকদার সাহেবকে বললেন যে, ‘ও আর আপনি পার্টনার; ওর পার্টনারশিপের টাকাটা আমি দেবো।’ তো, শিকদার সাহেব বললেন যে, ‘ঠিক আছে! আপনার হাতে কী গল্প আছে?’ আমি ঠিক এই ‘আম্মাজান’-এর গল্পটা বললাম। উনিও চোখ বন্ধ করে শুনে-টুনে বললেন, ‘হায়াৎ সাহেব, আমি এই ছবি করব না।’
‘কেন?’
‘এই ছবি চলবে না।’
আমি– ‘কেন?’
‘মা রেপড হয়েছে, ছেলে দেখেছে, এবং সেই ঘটনাকে নিয়েই সিনেমা– এই সিনেমা চলবে না। আপনিও বানায়েন না!’
আমার আরও জিদ চাপতে লাগল। আর, আমি বুঝলাম না, ওদের… একটা কনসেপশন যদি থাকে মানুষের, তাহলে কি ওরাই বোঝে না? নাকি আমি বুঝি না? মানুষের মধ্যে কাজ করে না– সুপিয়রিটি-ইনফিউরিটি কমপ্লেক্স থাকে না? তো, আমার মধ্যে একটা কমপ্লেক্স এলো। যে, আমি দেখায়া দেবো যে, এই ছবি চলে; এই ছবিই চলবে।
ডিপজল আবার গল্প শোনার লোক না। ডিপজল একদিন ডেকে বলল, ‘কই? ছবি বানান একটা!’ আমি তারে একটু হিন্টস দিলাম ‘আম্মাজান’-এর। মান্নার সাথে তখন তার গণ্ডগোল : ‘মান্নাকে বাদ দিয়ে’!
আমি বললাম, ‘না! মান্নারে বাদ দিতে পারুম না। মান্নাকে চিন্তা করেই আমি এই ছবি করেছি। আর, মান্নাও স্টোরিটা জানে। মান্নাকে বলেছি।’
সে তখন বলল, ‘রুবেলরে নেন।’ রুবেলের সাথে সে আলাপ করল। হুমায়ুন ফরীদির সাথে আলাপ করল : ‘হুমায়ুন ফরীদি করবে’।
আমি বললাম, ‘না! মান্না।’
মান্নাকে তখন আমি বললাম, ‘মান্না, তোর সাথে ডিপজলের কী হয়েছে? যদি গণ্ডগোল থাকে, মিটায়া ফেল। একটা ভালো সাবজেক্ট চলে যাবে কিন্তু!’
‘কী ওস্তাদ?’
“‘আম্মাজান’ চলে যাবে! ডিপজল কিন্তু বানাবে; এবং ডিপজল কিন্তু খুঁজতেছে– বিকল্প।”
ও খুব চালাক ছেলে ছিল– মান্না। পরের দিন দেখি, সব ঠিকঠাক! এবং আমাকে ডিপজল ডেকে বলল যে, ‘হ, মান্নাই!’
ও [মান্না] রাত্রে গিয়ে ডিপজলকে কনভেন্স করে ফেলছে। মানে, সে ‘এশিয়া’ হলে গেছে; যাইয়া বলছে, ‘দোস্ত, কী হইছে? অমুক… তমুক…! ছবি বানাচ্ছ ওস্তাদরে দিয়া। আমি বাদ কেন?’ –এই-টেই বইলা…
এরও আবার হিস্ট্রি আছে! ও তো গল্প-টল্প জানে না– ডিপজল। ডিপজল আবার ছবি দেখত : রাশ। জামিন-টামিন হওয়ার পরে।

রুদ্র আরিফ : …রাশপ্রিন্ট?

কাজী হায়াৎ : …রাশপ্রিন্ট।… ওর একটা, পেট্রোল পাম্পের পিছনে একটা স্টুডিও ছিল। সেই স্টুডিওতে চালাইয়া দেখত। ওর লোকজন নিয়ে, বহর-টহর সব মিলিয়ে, ও মদ-টদ খাইয়া দেখত। খাইয়া রাত দুইটার সময় শেষ হইল ছবি দেখা। আমারে কয়, ‘বড়ভাই, ছবি তো চলবে না!’
আমি বললাম, ‘কেন?’
কয়, ‘ফাইট নাই! অ্যাকশন নাই!’
আমি তখন বললাম যে, ‘অ্যাকশন বলতে কী বুঝো? মারামারি? ইজ ইট অ্যাকশন? এইটাই কি অ্যাকশন? যদি এইটা অ্যাকশন হয়, তাইলে অ্যাকশন নাই। নাহলে, অ্যাকশন যদি, মানে– জোশ ফিল করার ব্যাপার থাকে, তাহলে কিন্তু প্রচুর জায়গা আছে।’
‘কী কী জায়গা আছে?’
তখন আমি বললাম যে, “মান্না যে একটা ছেলেকে রেপ করার দায়ে কিল করল, কিল করার পরে তুমি আইসা তোমার মামাতো ভাই… তুমি আইসা তোমার খালুকে… অ… খালাতো ভাই… তোমার খালুকে জিজ্ঞেস করলা যে, ‘কে মারছে মনে হয়?’; কয়, ‘বাবা, বুঝতে তো পারতেছি না– কে মারছে!’; তখন যে খাটিয়া ধরে উঁচু করে [মান্না] বলল, ‘দোস্ত, আমি মারছি! মরা লাশ বেশি সময় রাখতে নাই। চল যাই; দাফন করা ঠিক। আমি মারছি।’… তুমি যে তাকাইলা, আর মান্না যে তাকাইল– এটা কি অ্যাকশন না? এটা বিগ-অ্যাকশন। এটা চারটি ফাইটের সমান।… যে ডিপজলকে আমি এনেছি অনেক ইয়ে করে… স্ক্রিনে আনলাম, স্টাবলিশ করলাম, হি ইজ অ্যা বিগ-শট; তার সামনে অকপটে মান্না বলে দিলো যে, ‘আমি খুন করছি। দোস্ত, আমি খুন করছি।’… তারপর, মান্না যে মৌসুমীকে বিয়ে করার জন্য পাগল-পাগল-পাগল, এবং তুমি যে মিজুর লোক, মিজু তোমাকে কমপ্লেইন করল তার সম্পর্কে; তারপর তুমি তাকে বলতে আসলে, যে, ‘দোস্ত, তুই অই মাইয়ার পিছনে ঘুরিস না’। তখন মান্না যে বলল, ‘না; আমি বিয়া করব!’ তখন বললে যে, ‘তাইলে তুই আমার কথা মানবি না?’ বলল, ‘না, মানব না।’ ‘তাইলে আমাদের দোস্তি?’ তখন সে যে পকেট থেকে… নবাবরে বলল, ‘নবাব, ছুরিটা দে তো!’… আর পকেট থেকে রুমালটা নিয়ে ঝাড়া দিলো, [ডিপজলকে] বলল যে, ‘ঐ কোণা ধর’; এবং এক পোঁচে কাইটা বলল যে, ‘তাইলে কাটাকাটি হইয়া গেল আইজকা থেকে’ –এটা কি বিগ-অ্যাকশন না? দিস ইজ অ্যাকশন।”
ও তখন কিছুটা বুঝতে পারল; তারপরেও সে বুঝে নাই। তারপরেও আমাকে একটা ফাইট জোর করে শুট করতে হয়েছিল, যে, ‘এই জায়গায় একটা ফাইট দেওয়া যায় না?’ তখন আমি শুট করলাম।

রুদ্র আরিফ : এ জায়গা থেকে বলি; ধরুন প্রডিউসার আপনাকে কোনো কোনো জায়গায় হয়তো কনভেন্স করতেছে, ‘বাধ্য’ না বলি, কনভেন্স করতেছে, তখন ঐ শুটগুলা করার পর, যে এক্সট্রা শুটগুলা বা আপনার রি-এডিটটা বা রি-কারেকশনটা করার পর ঐ জায়গাগুলা কি খারাপ লাগে? নাকি মনে হয় যে, ঠিকই আছে?

কাজী হায়াৎ : আমি কম্প্রোমাইজ করি না কখনো। ইফ নেসেসারি, আমি আপনার সাজেশনও নেব। ইফ আই ফিল ইট, রিয়েলি, ওয়ান ম্যান ইজ নেভার ওয়ান হানড্রেড। আমার পেছনটা কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না। কখনোই দেখতে পারি না, আয়না ছাড়া। আপনি কিন্তু আপনার নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন না। আমিও বিলিভ করি যে, আমার যে দোষ-ত্রুটি, সেটা আমি কতটুকু দোষ, কতটুকু ত্রুটি আছে– এটা দর্শকের সামনে না যাওয়া পর্যন্ত আমি বুঝতে পারি না। এর আগে যদি কেউ ধরিয়ে দেয়, যদি সেটা যুক্তিসঙ্গত হয়, গ্রহণযোগ্য হয়, হোয়াই আই উইল নট অ্যাকসেপ্ট ইট? আমি এ রকম অ্যাকসেপ্ট করেছি অনেক। আমি ‘ঘাওড়া’ মেকার না যে, আমি যেটা মনে করেছি সেইটাই হতে হবে; তা না।

রুদ্র আরিফ : আপনার স্ক্রিপ্ট তো মূলত আপনিই লিখেন। আপনি কি অন্য কারও স্ক্রিপ্টে কখনো কাজ করেছেন?

কাজী হায়াৎ : আমি কখনো কাজ করিনি; পারিনি। মানে, আমি চেষ্টা করেছি; তারপরও পারিনি।

'ধর'-এর টাইটেল সিকুয়েন্সে সেই পাগলি
‘ধর’-এর টাইটেল সিকুয়েন্সে সেই পাগলি

রুদ্র আরিফ : মান্না ভাইয়ের প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে চাই। সেটা হচ্ছে যে, আরেকটা সিনেমা আছে, যেটা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব পছন্দের, ওটা হচ্ছে, ‘ধর’। এবং এটা সবচেয়ে সমালোচিত সিনেমার একটা। এই গালিগালাজ-হাজিজাবি, যেগুলাকে কোট-আনকোট করা হয়; ‘ধর’-এ আমার মনে হয়েছে মান্না ভাই তার ওয়ান অব দ্য বেস্ট অ্যাক্টিং [করেছেন]… এটা সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার ধারণা। ‘ধর’-এর যে প্লট সিলেকশন, এটার নেপথ্যের কাহিনীটা কী?

কাজী হায়াৎ : এখনো মগবাজারের ঐ পাগলিটা আছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়। বুড়ো হয়ে গেছে। ওর কোলে একটা বাচ্চা দেখতাম আমি যাওয়া-আসার পথে। আমি মনে মনে ভাবতাম, এই বাচ্চাটার কী হবে? কিছুদিন আগে দেখেছিলাম তাকে প্রেগন্যান্ট। তারপর তার কোলে বাচ্চা। আমি নিজে মনে মনে যাওয়ার সময় ভাবতাম, চিন্তা করতাম যে, বিয়ে হয়েছে এর? এ বাচ্চাটা কার? আর এ বাচ্চাটার ভবিষ্যৎ কী? ও তো একটা রুটলেস বাচ্চা হবে। ওর তো কোনো রেসপন্সিবিলিটি থাকবে না সোসাইটির ওপর। ও লেখাপড়া শিখবে না। কী হবে? কেউ কি এগিয়ে আসবে ওর এ বাচ্চা নিতে? না! তাহলে কী? আর এভাবেই আমার স্টোরিটা মাথায় আসলো যে, ইট মিনস দ্য স্টোরি। যার ফলে আজও বিতর্কিত হয় আমার ছবিটি– ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে; মানে, কথা নিয়ে।
আমাদের দেশে সেমিনারে যান, বক্তব্যে যান, অনেকে বলবে যে, রিয়ালিস্টিক ছবি তৈরি করা লাগবে। রিয়ালিস্টিক ছবি যদি তৈরি করতে হয়, তাহলে আপনি রাস্তা দিয়া আসার সময়, রিক্সায় যদি আসেন, অন্তত এক মাইল চললে দুই থেকে তিনবার আপনি শুনতে পাবেন, ‘এই খানকির পোলা, তোর মায়রে চুদি!’ দিস ইজ আওয়ার কমন ল্যাঙ্গুয়েজ। গ্রাসরুটের পিপলরা এ-ই বলে। তো, এটি… যদি পাত্র-পাত্রী অনুযায়ী তার সংলাপ না দেওয়া হয়, আমার মনে হয় সেটা অযৌক্তিক; এবং এটাই রিয়ালিটি। আমি সেই রিয়ালিটির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। যার ফলে ঐসব সংলাপ দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী মহলে এটি ভালোলাগেনি।

রুদ্র আরিফ : এ জায়গায় একটা টপিক অ্যাড করতে চাই। আপনি রিয়ালিস্টিক বা রিয়ালিটির বা রিয়ালিজমের সাথে ফ্যান্টাসির একটা মিশ্রণ ঘটান। যেমন ‘ধর’টায় যদি বলি, এটা কোনোভাবেই রিয়ালিস্টিক না যে, মন্ত্রী ঐ বিয়েতে কোনো ধরনের গার্ড ছাড়া যাবে, এবং সে খুন হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের চিন্তায় থাকে, ফ্যান্টাসিতে থাকে– ওকে ফাইন, এই ক্রাইমটা হচ্ছে, আমি হলে এটা করতাম; কিংবা আমাকে একটা গালি দিছে, আমি মনে মনে ভাবি যে, ওকে মেরে ফেলতাম হয়তো। এই যে [মোবাইল বেজে ওঠল তার। ফোন রিসিভ করলেন। ১১ মিনিটের বিরতি। তারপর…] রিয়েলিটি আর ফ্যান্টাসির একটা মিশ্রণ ঘটান, যে আসলে শেষ পর্যন্ত আশাবাদী করে তোলে আমাদের, এই ফ্যান্টাসিটা আপনি কোন চিন্তা থেকে ধারণ করেন?

কাজী হায়াৎ : আসলে ফ্যান্টাসি না ঠিক; রিয়ালিটি আর ফ্যান্টাসি সিনেমায়… জীবনের সব ঘটনা কিন্তু সিনেমা হয় না। আর, ডিটেইলড ওয়ার্ক বাণিজ্যিক সিনেমাতে খুব কম থাকে। তো, বাণিজ্যিক সিনেমাতে যদি ডিটেইলড ওয়ার্ক করা হয়, জীবনের সবটুকু যদি দেখানো হয়, তাহলে সেটা বাণিজ্যিক ছবি হবে না। অনেক সময় বোরিং হয়ে যেতে পারে। এই জায়গা থেকে; আর কিছুই না!

রুদ্র আরিফ : মান্না ভাইয়ের প্রসঙ্গে একটু আসি। মান্না ভাই মান্না হয়ে ওঠছে কাজী হায়াতের সিনেমা করে, এবং এর মাঝখানে আরেকটা টপিক আমি ঢুকাইতে চাই, সেটা হচ্ছে যে, মানে, আমরা যেটা বিদেশে শুনি যে– ‘অথর ফিল্ম’; যে, ডিরেক্টরের পরিচয়ে সিনেমা চলা– ঐটা আমাদের এখানে মেইনস্ট্রিমে, বা, মেইনের বাইরে তো আমাদের এখানে ঐ অর্থে খুব বেশি সিনেমা হয় নাই যে, ঐটা আনা যাবে উদাহরণ হিসেবে; ঐ জায়গায় প্রথম নামটা আপনার থাকে যে, এটা মান্নার সিনেমা না, বরং কাজী হায়াতের সিনেমা। মান্নার মতো একটা সুপারস্টার, বা মারুফ হোক বা যে-ই হোক অ্যাক্টর-অ্যাকট্রেস, কাজী হায়াতের সিনেমা হিসাবে চলে। এই জায়গাটা আপনি স্টাবলিশ কীভাবে করলেন? এই জার্নিটা…

কাজী হায়াৎ : এই জার্নিটা চলে আসছে হলো, আমি… সম্ভবত আপনার ক্যালকুলেশন করলে বের করতে পারবেন, যেহেতু আমি স্টার নিয়ে করিনি, সেহেতু প্রথম নাম এসেছে– ‘কী জন্যে ছবিটা চলতেছে?’
‘আরে, কাজী হায়াতের ছবি; অফট্র্যাক। অন্য জিনিস! জিনিসই ভিন্ন!’
এইভাবে আস্তে আস্তে গ্রো করেছে যে, কাজী হায়াতের সিনেমা মানেই আলাদা একটা কিছু। এভাবেই কাজী হায়াতের, আমার মনে হয়, দর্শক তৈরি হয়েছে; এবং সেই হিসাবে একটি জায়গায় চলে এসেছি। এটা আমার ক্যালকুলেশন যে, স্টার কাস্ট নিয়ে যদি করতাম আমি, মনে করেন, শাবানা, রাজ্জাক নিয়ে করতাম, তাহলে নাম হতো– শাবানা-রাজ্জাকের জন্যে ছবিটা চলছে। যার ফলে অনেক ডিরেক্টর সাইফার হয়ে গেছে। এরা [স্টার কাস্ট] যে উঁচুতে আছে, সেই উঁচু জায়গায় ঐ ডিরেক্টর যেতে পারেনি। ছবি হিট হয়েছে; বেশি হিট হয়েছে; কিন্তু ডিরেক্টর যেতে পারেনি। ডিরেক্টরের নাম কেউ মনেও রাখেনি। রাজ্জাক-শাবানার নাম মনে রেখেছে। তো, আর এ জায়গায় কাস্টিং বলতে কিছুই দেখে নাই। ‘কে?’
‘আরে, কাজী হায়াৎ। কাজী হায়াৎ মানেই তো আলাদা।’
–এই জায়গাটায় বোধ হয় আমি [নিজেকে নিতে পেরেছি]।

রুদ্র আরিফ : আপনি মান্না ভাইকে আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

কাজী হায়াৎ : মান্না… সেও এক অপূর্বই! ‘পাগলি’ ছবিতে হঠাৎ ডিপজলের আরেক বড়ভাই, প্রডিউসার বাদশা ভাই, শাহাদাৎ নাম ছিল, সে আমাকে খুঁজে বার করল, সে কার সাথে জিদ করছে যে, ‘আমি এক মাসের মধ্যে একটা সিনেমা বানাব’। জিদ করে চলে আসছে এক ম্যানেজারকে নিয়ে। ম্যানেজাররে জিজ্ঞেস করছে, ‘এই দেশে তাড়াতাড়ি ছবি বানাইতে পারে কে? একমাসে একটা সিনেমা বানাইতে হইব।’ রাত দশটার সময় আমার বাসায় ও এসে হাজির; এবং ম্যানেজার পরিচয় [করিয়ে] দিলো– ‘এশিয়া’ হলের মালিক। টার্গেট দিলো, কালকে থেকে সিনেমাটা শুরু হইতে হবে। এবং একমাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। পড়লাম বিপদে!
তখন আমি আমার মিউজিক ডিরেক্টর বুলবুলকে ডাকলাম; ঐ রাত্রেই। বুলবুলের বাসায় গেলাম, বুলবুলকে তুললাম, বুলবুলকে তুলে নিয়ে বেলাল আহমেদের বাসায় গেলাম– গান লিখবে ওরা দুইজনে। গানটা রেকর্ড হবে। বুলবুলকে বললাম যে, ‘বুলবুল, তুই লেট করিস না। গানটা তাড়াতাড়ি দিয়া দিস।’ গানটা রেকর্ড হলে গানটা পিকচারাইজ করতে করতে আমি অন্তত গল্পটার স্ট্রাকচার তৈরি করে ফেলতে পারব। আর ম্যানেজারকে বললাম, “ম্যানেজার, আমি ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ একটি ছেলেকে দেখেছিলাম– মিঠুনের মতো নাচে। ভালো নাচে।” ও তখন খুঁজে পাচ্ছিল না। কী নাম-টাম– তখন ও বলল, অমুক-তমুক…। আমি বললাম, ‘অমুক হইতে পারে; ইয়েস! তুমি তাকে যেখানে আছে, খুঁজে বের করো। ও হবে হিরো।’
আমি রাত তিনটা পর্যন্ত গান রেকর্ডিংয়ে, গানের কথা-টথা দিয়ে, বসিয়ে… অলরেডি গান হয়ে গেছে কম্পোজ; মানে রেকর্ড হবে পরদিন; ওকে যোগাড় করলাম। সকাল দশটার সময় ওর বাসায় গেলাম। ডাক দিলাম; মোহাম্মদপুরের একটা বাসা থেকে বের হলো : ‘আপনি কে?’
আমি বললাম, ‘আমি সিনেমার পরিচালক কাজী হায়াৎ।’
‘ও, আপনার নাম শুনেছি। ছবি বানাইছেন।’
কারণ ওর সিনেমার প্রতি উইকনেস ছিল; আর ‘নতুন মুখে’ সিলেক্ট হয়েছে। ‘আমি আপনাকে একটা ছবিতে হিরো নিচ্ছি। এবং ছবিটির আজকে থেকে শুটিং, এখন থেকে শুরু।’
ও প্রথম বিশ্বাস করেনি। ‘এটা কেমনে হয়! কী গল্প, কী ড্রেস?…’
আমি বললাম, ‘তুমি প্যান্ট-শার্ট নিয়া আসো। কিংবা এ অবস্থায়ই যেতে পারো।’
ও আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। কারণ, তখন ও একটি খারাপ সংঘের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিল। মোহাম্মদপুরের একটি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। ও কিছুটা দোনা-মনা, অস্বীকৃতি। তারপর আমি বললাম, ‘তুমি আমাকে বিলিভ করো। আজকেই ছবির শুটিং শুরু। তুমি আমার সাথে চলো।’
ও আসলো। আর ‘নতুন মুখে’র আরেকটা ছেলে হলো সাত্তার। সাত্তারকে নারায়ণগঞ্জ থেকে টেলিফোনে আনাইলাম। আর ফারজানা ববি– সে হলো নায়িকা। আমি সন্ধ্যার আগে ঠিকই শুট করলাম। [আবার টেলিফোন। মিনিটখানেক] তো, সূর্য অস্তের আগে, সূর্য ডুবে যাচ্ছে, তখন আমি ছোট্ট একটা সিকুয়েন্স লিখে শুট করলাম। আর পরের দিন, ঐ রাত্রেই চলে গেলাম– প্রডিউসার খুশি। গান রেকর্ডিং হচ্ছে ইপসা স্টুডিতে। গানটা নিয়ে এসে ড্যান্স ডাইরেক্টররে, ড্যান্স ডাইরেক্টর জাভেদ ছিল, তাকে আমি বললাম, ‘দোস্ত, তুমি তিনদিন টাইম নিবা গানটার পিকচারাইজ করতে।’
বলল, ‘কেন?’
আমি বললাম, ‘এখনো গল্প রেডি হয় নাই। আই হ্যাড টু মেক অ্যা স্টোরি উইদিন দ্যাট থ্রি ডেজ।’
এবং তিনদিন টাইম নিলো। তিনদিনের মধ্যে গল্প তৈরি হয়ে গেল। শুট করলাম। এবং এক মাসেই ছবিটি শেষ হয়ে গেল।

রুদ্র আরিফ : এ জায়গায় একটা কথা বলতে চাই, আপনি যে অ্যাক্টরদের গড়ে তুললেন, বা, এক ধরনের শুরু হলো আপনার মাধ্যমে, এই অ্যাক্টররা অন্য সিনেমায়– তারা জনপ্রিয়– ডেফিনেটলি, এটা নো ডাউট; কিন্তু অন্য মেকারদের সিনেমা বা অন্য সিনেমায় গিয়ে ঠিক ঐ মানটায় দাঁড়াতে পারে না একজন অ্যাক্টর হিসেবে। এটা আপনি ব্যর্থতা মনে করেন নিজের?

কাজী হায়াৎ : না। আমি একটা উক্তি শুনেছিলাম, আমার একটি ছবিতে একজন অ্যাক্টর, এ দেশের একজন নামকরা অ্যাক্টর অভিনয় করেছিল– সাইফুদ্দীন সাহেব। ওনাকে কাস্ট করেছিলাম আমি ‘দেশদ্রোহী’ ছবিতে। উনি আমার শুটিংগুলো দেখতেন। একদিন গুলশানে ওহাবের বাড়িতে একটা শুটিং। আমি প্রত্যেকটা শটই দেখিয়ে দিচ্ছি : পারে না। তারপর আবার দেখিয়ে দিচ্ছি, মান্নাকে। নায়িকারটা নায়িকাকে। উনি বেশ কিছুদিন অবজার্ভ করেছিলেন আমাকে এই ছবিতে। মানে, ইট ইজ আফটার টেন অর ফিফটিন ডেজ, একদিন উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হায়াৎ সাহেব, একটা কথা বলতে চাই।’
‘কী?’
‘আপনি যেটা দেখিয়ে দেন, তার থেকে কত পারসেন্ট পেলে আপনি শট ওকে করেন?’
আমি বললাম, ‘আপনি তো দেখেন, আপনি তো একজন পাকা অভিনেতা, অনেক দিন আগের…’
বলল, ‘হ্যাঁ, আমি অভিভূত হয়ে দেখি আপনার অভিনয়। আর, তার যখন ব্যক্তয় ঘটে– সেটাও দেখি। তারপরও যখন ওকে করছেন, তাও দেখি। তো, কত পারসেন্ট?’
আমি বললাম, ‘আপনি তো সব বুঝতে পারছেন। ফিফটি পারসেন্ট হলেই আমি ওকে করি।’
তো, এই আর্টিস্টরা যখন অন্য জায়গায় যায়, তখন তো তাদের ফ্রি ছেড়ে দেওয়া হয়। সে যেটা বলবে, সেটাই ওকে। তখন তাদের মান তো একটু ডাউন হবেই।… যেমন আমার ছেলে ‘ইতিহাস’ ছবিতে একটি সিক্যুয়েন্সে– কবরের সামনে যখন একটি শট, আটবার যখন নেওয়া হয়েছে, তখন, যেহেতু আমি তার ফাদার এবং সে নূতন, ফিল্ম কিছু বোঝে-টোঝে না, তখন সে বলতেছে যে, ‘আমি আর পারব না। আমি যাইগা। আমার দ্বারা হবে না।’
তখন আমি তাকে গালি দিয়ে বলেছিলাম, ‘বাঞ্চোৎ, হতেই হবে! হবে না কেন? তুই কাজী হায়াতের ছেলে; তোর হতেই হবে। তোকে করতে হবে। এবং তোকে করায়্যা ছাড়ব আমি। আমি দেখাইয়া দেব। যতবার না পারবি, ততবার আমি এনজি করব। ফিল্ম আমার যাচ্ছে।’ এবং থার্টিন টেকে ওকে হয়েছিল; তের নাম্বার শটে।

'লুটতরাজ' সিনেমার ভিডিও কভার
‘লুটতরাজ’ সিনেমার ভিডিও কভার

রুদ্র আরিফ : আপনার তো একটা দীর্ঘ জার্নি। এই জার্নির পর এখন যখন একটা সাম-আপ করতে যান, একটা সামারি করতে গেলে কী মনে হয়? মানে, আপনার যে প্যাশনটা ছিল, ঐটার কত পারসেন্ট আপনি যেতে পারছেন?

কাজী হায়াৎ : আমার আপাদমস্তক এখনো সিনেমা। আমি লাস্ট সিনেমা তৈরি করেছি ‘ছিন্নমূল’। আমি এখন সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার জন্য চেষ্টা করছি। লাস্ট থ্রি মুভি তা-ই ছিল : ‘ইভটিজিং’, তারপর ‘সর্বনাশা ইয়াবা’, লাস্ট হলো ‘ছিন্নমূল’। ‘ছিন্নমূল’ বোধহয় দেখেননি! ‘ছিন্নমূল’ হলো গোয়ালন্দ ঘাটের একটি জারজ সন্তানকে নিয়ে। এখনো আমার আপাদমস্তক ফিল্ম; অথচ আমি সিনেমা বানাব না; কিন্তু আমি সিনেমা বানাব। আমি একটা টেকনিক নিজে আবিষ্কার করেছি, এবং আমি নিজে সাকসেস হতে যাচ্ছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তিনটা শর্টফিল্ম তৈরি করব। এবং কয়েকটি শর্টফিল্ম তৈরি করব– সিরিয়াল অফ শর্টফিল্মস; যাদের ডিউরেশন হবে ৩০ মিনিট, ২৫ মিনিট, এক ঘণ্টা– এই রকম। টেলিভিশন চ্যানেলের সাথে আলাপ হয়েছে। তারা আড়াই-তিন লাখ করে হয়তো আমাকে চ্যানেলে চালানোর জন্য দেবে। আর তিনটা গল্পের, আমার কাছে ইন্টারনেটেও মার্কেট আছে একটা। ইন্টারনেট মার্কেটিংয়ের জন্যে তিনটা গল্পই শুনে তাৎক্ষণিকভাবে দাম বলেছে, দুই লক্ষ টাকা। এবং টুমরো তারা এক লক্ষ টাকা অ্যাডভান্স করবে।
সিনেমা করে প্রফিট করা যায়– সেই চিন্তাই আমার; গবেষণাও আমার। এবং আমি এখান থেকে প্রফিট করব। এতে মার্কেট হলো– একটা টেলিভিশন, অনলাইন, আর একটা বিমান, আরেকটা হলো– বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যদি কিছু করতে পারি।
আমার তিনটা সাবজেক্টই স্পর্শকাতর। যেমন, একটা হলো, ‘হুসনাবানুর জবানবন্দি’। হুসনাবানু নাম কইরা একটা মেয়ে, গভীর রাত্রে একটা স্কুলের বারান্দায় বসা। সে নিজে কথা বলছে। জবানবন্দি দিচ্ছে– দেশীয় ভাষায়। বয়স তার চল্লিশোর্ধ। কত– সে জানে না। তার ছেলেবেলা থেকে শুরু করে, আজকে সে যেখানে বসে আছে, তার হাতে রশি, সে গলায় দড়ি দিয়ে মরবে– তার আগের টোটাল লাইফটা সে বলবে। এখানে কোনো গান নাই। এখানে আছে : ছোটবেলায় তার মামাবাড়ি যাওয়ার পথে চাচতো মামার সাথে, বয়স যখন তার ১০-১১, তখন ঐ স্কুলটা টিনের ঘর ছিল; এই স্কুলঘরেই সে ধর্ষিতা হয়েছিল। এবং নানীর কাছে গেল এই বিধ্বস্ত অবস্থায়, তখন যখন নানীর কাছে বলতেছিল, তখন নানী বলল, ‘এসব কথা বলতে হয় না! আমরা মেয়ে মানুষ। এসব কথা বললে মেয়েদের বিয়ে হয় না।’ এবং ও বলছে যে, ‘আমি বলিনি বলেই বোধ হয় আমার আড়াইখান বিয়ে হইছিল। দুইখান বিয়া কলমা পইড়া, আর একখান কলমা ছাড়া।’
এরপরে তার লাইফ : কীভাবে তার বিয়ে হলো এক রিক্সাঅলার সাথে; যশোরে নিয়ে গেল। সেই রিক্সাঅলা কিছুদিন পর [আবার] বিয়ে করল। সে প্রতিবাদ করল। [তাকে] পিটায়া একদিন বের করে দিলো। এবং তার মেয়েটাকে রেখে দিলো। এরপরে সে চলে আসলো মায়ের কাছে। মায়ের এখানে জায়গা নাই। ছোটভাইটা বিয়ে করেছে; সে মেইন ঘরে থাকে। একখান ঘর। থাকার জায়গা নাই। ওর থাকার জায়গা হলো বারান্দায়। বারান্দায় একদিন রাত্রে প্রস্তাব দিলো একটা ছেলে। ওকে সাবান কিনে দিলো। তাকে ধুরধুর করে বের করে দিলো। ধুর-ধুর করে বের করে দিলো… তারপর তাকে পরের দিন চার-পাঁচটা ছেলে এসে, মুখে গামছা দিয়ে কীভাবে তাকে গণ-রেপ করল, এবং সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। খালুর বাড়ি গেল।
খালু তাকে একটা বিয়ে দিলো একটা বৃদ্ধ লোকের সাথে। তার একটা বাচ্চা আছে। কিছুদিন পরে বৃদ্ধ লোকটি মারা গেল। ও ঘরেও তার একটা ছেলে হলো। পাঁচ-ছয় বছর বয়স। এই ছেলেটি নিয়ে কোথায় যাবে? সে তখন মাদ্রাসায় দিয়ে দিলো। এরপরে সে কাজ নিলো একটা হোটেলে : থালা-বাসন ধোয়া। হোটেল মালিক একদিন তাকে ডাকল। এবং তাকে বলল, বিয়ে করবে। বিয়ের কথা বলে তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ল। সে বারবার বলতেছিল যে, ‘আমাকে বিয়ে করেন… বিয়ে করেন।’ তখন একদিন দেখা গেল যে, হোটেল মালিকের ছেলে এসে ওর নাম ধরে ডাকছে, ‘হুসনাবানু কে রে? ডাক দে…’। ডেকে এনে, মূল মালিককে দেখে মাথা নিচু করে দাঁড়ানো; বলল যে, ‘বের হয়ে যা।’
ও তখন বলল যে, ‘না, আমি যামু না।’
‘ক্যান?’
‘আপনার আব্বা আমারে বিয়া করবে।’
‘কী কইলি? বিয়া করবি! হারামজাদি…!’ –এই বলে চ্যালা দিয়ে পিটাইল। খুব পিটায়া বাইর কইরা দিলো। এবং এরপরে সে আবার খালুর বাড়ি ফিরে আসলো। ফিরে আইসা শুনল, তার ঐ যশোরে যে মেয়েটা রেখে আসছিল, তার বিয়ে হয়েছে। তাদের বাড়ি দালান আছে। এবং সে বড়লোক। ভালো আছে। দুইটা-তিনটা দোকান আছে। সে সেই বাড়ি গেল; সেই মেয়েটার কাছে গেল। ভাবল যে, মেয়েটার কাছে থাকবে। মেয়েটা ওকে দেখেই বলল, ‘মা, তুমি চলে যাও। তোমার কীর্তিকলাপ সব শুনছি। যদি তোমার জামাই শোনে, আমাকে ছাইড়ে দেবে। আমি বলছি, আমার মা মরে গেছে।’
তখন ও বলল যে, ‘বলছিস মইরে গেছে? আমি মইরে গেলে তইলে শান্তি?’
‘শান্তি কিনা– জানি না; তবে বলছি, মইরে গেছে।’
তারপর সে ফিরে এসে, বলল যে, ‘এইখানে আমার জবানবন্দি শেষ। আমার হাতে রশি। ডালটাও দেখে এসেছি। আমি চলে যাব। তবে যাওয়ার আগে আমি কিছু কথা আবার বলতে চাই।… আপনারা, পুরুষ লোকরা বলেন, মাইয়া আর পুরুষ একই। মানুষ সবাই মানুষ। না, এক না! আমি যেইডা বুঝি, আপনেরা, ভদ্দরলোকরা কী বোঝেন– জানি না : আপনাগের মাথায় টাক পড়ে, আমাগের মাথায় টাক পড়ে না। আপনাগের দেহের গড়ন আর আমাগের দেহের গড়ন এক না। আপনারা যেখানে-সেখানে, রাস্তা-ঘাটে কুত্তার মতো যে কোনো সময় যা খুশি তা-ই করতে পারেন; কিন্তু তা আমরা পারি না। দুনিয়ার মধ্যে শুনছেন কোনোদিন যে, কোনো মাইয়া কোনো পুরুষলোকরে বেইজ্জত করছে? শুনবেনও না। কিন্তু দুনিয়ার মধ্যে অনেক শুনবেন যে, মাইয়ালোকরে পুরুষ লোকে বেইজ্জত করতেছে– প্রতিদিন, হাজার-হাজার। আমরা আর আপনারা এক না। মাইয়ালোক হলো মায়ের জাত। আমার পেটে অবৈধ সন্তান। আমার বড়ো মায়া লাগতাছে ওরে মারতে। [এ বেলা কণ্ঠ ধরে এসেছে কাজী হায়াতের। চোখ ছলোছলো…] আমি মইরে যাইতে পারি; কিন্তু অরে মারতে আমার খুব মায়া লাগতেছে। আমি মা। মা হইয়া এই সন্তানটাকে যদি প্রসব করি, একে অবৈধ হিসাবে পরিচয় দিতে হবে; আমি চাই না সে অবৈধ হিসেবে পরিচিতি পাক। তাই আমিও চলে যাচ্ছি। আপনাদের শেষ কথা বলে যাই : আপনারা কুত্তা; আমরা মানুষ।’
–এই হলো মাই শর্টফিল্ম। মাঝে মাঝে বর্ণনা থাকবে, মাঝে মাঝে ভিজ্যুয়ালি যাবে। ভিন্নধরনের স্ক্রিনপ্লে।


তৃতীয়/শেষ কিস্তি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]