কাজী হায়াতের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার । প্রথম কিস্তি

3
945

কাজী হায়াৎ। জন্মঃ ১৯৪৭; গোপালগঞ্জ। বাংলাদেশি সিনেমার কিংবদন্তি ফিল্মমেকার। ২৮ মে ২০১৬, বৃষ্টিস্নাত দুপুরে, তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে মুখোমুখি হয়েছিলাম পঞ্চাশটি ফিচার ফিল্মের এই রাগি নির্মাতার। একটানা আড়াই ঘণ্টার সেই আলাপের তিন কিস্তির প্রথমটি মুদ্রিত হলো আজ। বলে রাখি, আলাপের সহজাত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে, ট্রান্সক্রিপ্ট করা হলো অবিকল; ফলে, বাক্যে অসঙ্গতি থাকাই স্বাভাবিক…

রুদ্র আরিফ : আপনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন চুয়াত্তরের শেষের দিকে। কয়টা সিনেমায়, কয় বছর অ্যাসিস্ট করেছেন?

কাজী হায়াৎ : একটা আশ্চর্য বিষয় হলো, আমার জীবনে আমি কোনো ছবির পূর্ণাঙ্গ সহকারী [সহকারী পরিচালক] ছিলাম না। আমি প্রথম ঢুকি মমতাজ আলী সাহেবের ছবিতে। মমতাজ আলী সাহেবের ‘কে আসল কে নকল’ আর ‘সোনার কেল্লা’ ছবি– এতে সর্বমোট চারদিন শুটিং পেয়েছিলাম। আর এডিটিংটা, ফুল দুইটা ছবির এডিটিং টিমে ছিলাম উপস্থিত। আর আরেকটি বিষয় আশ্চর্য, সে হলো– আমি প্রথমেই, ফার্স্ট ডে, যেদিন আমাকে নিলেন মমতাজ ভাই, সেদিনই আমি চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যাই। ওনার একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল, তাকে আমাকে এডুকেশন… আমার সাথে কথাবার্তা বলে উনি কী বুঝলেন– আমি জানি না; তবে আমাকে হয়তো ভালো মনে করলেন, এবং বললেন যে, ‘হি ইজ চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট। ওর কাছে খাতা, কাগজ, কলম সব বুঝিয়ে দাও।’ এবং সবকিছু সে আমাকে বুঝিয়ে দিলো। অ্যাজ চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট, আমি সেখানে ওয়ার্ক করা শুরু করলাম।
নেক্সটে উনি বেশ কিছুদিনের জন্য বেকার হয়ে পড়লেন। তো একদিন আমি এফডিসিতে; ওই [আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে] জায়গায় দেখা আলমগীর কবির সাহেবের সঙ্গে। মাঝে মধ্যে সালাম দিতাম। উনিও হয়তো আমার তথ্য জানতেন; যে আমি লেখাপড়া জানি, একটা এডুকেটেড ছেলে, কথাবার্তাও হয়েছে ওনার সাথে, কথাবার্তা বলতাম মাঝে মাঝে। আলমগীর কবির হঠাৎ একদিন বললেন, যে, ‘আপনি কি এখন কোনো কাজ করছেন?’ আমি বললাম, ‘না। এই মুহূর্তে আমার হাতে কোনো কাজ নেই।’ তখন উনি আমাকে বললেন, যে, ‘আপনি যদি মনে কিছু না করেন, আমি তো একটু ভালো ছবি বানাই, পয়সা-কড়ি খুব একটা দিতে পারব না…।’… পয়সা-কড়ির কথা আমি খুব একটা কখনোই চিন্তা করিনি… “পয়সা-কড়ি খুব একটা দিতে পারব না। আমার এখন কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট নাই। একজনই অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকে আমার সব সময়– ডিউ টু মানি। তো, আমার একটি ছবি শেষের পথে, ‘সীমানা পেরিয়ে’, দুই-তিনদিন শুটিং আছে আর। এডিটিংটা আছে। আপনি যদি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করেন, তাহলে…।” তো, আমারও দারুণ একটা ইচ্ছে ছিল যে, যদি পরবর্তীতে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কারও সাথে কাজ করি, আলমগীর কবিরের সাথে কাজ করব। সুযোগটাও মিলে গেল। এবং আমি ওনাকে ‘ইয়েস’ বলে দিলাম।
এরপরে উনিও আবার বেকার হয়ে পড়লেন। তবুও, উনি বেকার হওয়া সত্ত্বেও, আমাকে মাসিক বেতন দিতেন দু’শো টাকা। উনি প্রতিমাসের এক-দুই তারিখে বেতন, আমি না গেলেও পাঠিয়ে দিতেন ওনার ম্যানেজারকে দিয়ে। তারপরে একদিন হঠাৎ করে মমতাজ আলী সাহেবের শ্যালক এসে আমার বাসায় উপস্থিত, যে, “আপনাকে ডেকেছে। মমতাজ ভাই নতুন ছবি পাইছে। ‘ঈমান’। আপনি কাজ করবেন। আপনাকে যাইতে বলছে। আইজই সাইনিং মানি দিবে আপনাকে।” আমি গেলাম এবং প্রযোজকের বাসায় নিয়ে গেল আমাকে। টু থাউজেন্ড টাকা সেলারিতে… আমাকে অ্যাডভান্স করলেন দু’হাজার টাকা। এই ফার্স্ট আমি সিনেমার টাকা পেয়ে খুব আনন্দিত হলাম। এবং আমি কবির সাহেবকে, আলমগীর কবির সাহেব এই জায়গায় [ইঙ্গিতে জায়গা দেখিয়ে], এক নাম্বার ফ্লোরের এইখানে বসা ছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলছিলেন, ওনাকে বললাম যে, ‘ভাই, আমি তো কাজ পেয়েছি। আমি মমতাজ আলী সাহেবের, আমার আগের ওস্তাদ, উনি ডেকেছেন, আমি ওখানে যেতে চাচ্ছি। আপনি কী বলেন?’ বলল যে, ‘আমার হাতে তো আর কাজ নেই এখন। ঠিক আছে, ভালোই হলো। আপনাকে ধরে রেখে আমি কী করব?’
অই ‘ঈমান’ ছবিটির অর্ধেক শুটিং হওয়ার কালীনই আমি অ্যামিকো গ্রাইফ ওয়াটারের একটা পাবলিসিটি ফিল্মের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হলাম এক ভদ্রলোকের সাথে। আহমেদ ফুডসের মালিক। এখন আহমেদ ফুডসের মালিক যে, তার একটা ওষুধ কোম্পানি ছিল, এমিকো ল্যাবরেটারিজ। ওখানে গিয়ে আমি খুব কম পয়সায়, ওনার বাজেট ছিল যেটা, তার থেকে আমি বলেছিলাম যে, ‘আপনি আপনার লোক দিয়ে খরচ করাবেন, আর আমাকে এই পরিমাণ টাকাটা দেবেন।’ উনি খুব খুশি হয়ে বলল যে, ‘আমাকে তো ইতিপূর্বে এত এত বাজেট দিয়েছে!’ মানে, তিন-চার গুণ। উনি দেখলেন যে, সময় মতো ডেলিভারিও দিয়ে দিছি, এবং প্রোডাকশনও হয়েছে ভালো : হি ওয়াজ ভেরি স্যাটিসফাইড। তখন একদিন আমাকে বললেন যে, ‘আমার তো সিনেমা তৈরি করার ইচ্ছা! একটা সিনেমা করতে কত টাকা লাগে?’
ইন-দি-মিন-টাইম, আমার জন নিপিয়ার অ্যাডামস নামে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছে। তার লাইফ দেখে… তার বাসায় একদিন গিয়েছিলাম, তো, বাসায় গিয়ে দেখি, একটা বাঙালি ড্রাইভারের বাচ্চাকে সে কোলে করে দুধ খাওয়াচ্ছে– ফিডার দিয়ে। আমি বললাম, ‘ও কে?’ বলল যে, অই ড্রাইভারের নাম বলল, যে, ‘তুমি চেন তাকে। সে মারা গেছে অ্যাকসিডেন্টে। তো, তার ওয়াইফকে আমি নিয়ে আসছি এখানে। আর আমি চাচ্ছি, আমি যতদিন বাংলাদেশে থাকব, ততদিন এদের প্রতিপালন করব। আমার তো কেউ নেই। আর পরবর্তীতে ভেবেছি, ওর বউ তো ইয়াং এইজ এখনো, বিয়ে-শাদি করে ফেলবে। এই বাচ্চাটার কী হবে? আই অ্যাম থিংকিং, আমি ওকে অ্যামেরিকা নিয়ে যাব।’
তো, আমি এই অ্যাফেকশানটা দেখে, তখন, তৎকালীন, আপনাদের মনে আছে কি-না জানি না, আপনাদের জন্ম হয়েছে কি-না জানি না, তখন সাউথ আফ্রিকায় ব্ল্যাক আর হোয়াইটদের মধ্যে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব ছিল। এবং সেই দ্বন্দ্বে প্রায় গৃহযুদ্ধ ছিল– নেলসন ম্যান্ডেলা যখন জেলে। দ্বন্দ্ব ছিল এবং প্রতিদিনই প্রায় খবরের কাগজে আসত, আজকে দশজন হোয়াইট মারা গেছে, অথবা দশজন ব্ল্যাক মারা গেছে। তো, আমার মনে খুব কষ্ট দিত– অ্যাজ হিউম্যান বিং। আমি ভাবলাম যে, এই ব্ল্যাক, এই জন লিপিয়ের অ্যাডামসকে দেখলাম, এটা তো একটা অ্যাফেকশনের মাধ্যমে সমাপ্ত হতে পারে– ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট [দ্বন্দ্বটা]। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই আমি স্টোরিটা তৈরি করলাম : ‘দি ফাদার’। এবং আমি ‘দি ফাদার’ গল্পটা তৈরি করে নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম, এবং আমি ওনাকে [আহমেদ ফুডসের মালিক] বললাম। (এই মুহূর্তে মোবাইল বেজে ওঠল। মুহূর্তের বিরতি পেরিয়ে…) তো, কোথায় ছিলাম…?

রুদ্র আরিফ : অই যে, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের দ্বন্দ্ব… ফাদারকে দেখে…

কাজী হায়াৎ : আমি স্টোরিটা বললাম, আহমেদ সাহেবকে, আহমেদ ফুডসের; এবং উনি বললেন, ‘বাজেট কত?’ আমি বললাম, ‘তিন-চার লাখ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।’ উনি শুনে অবাক হলেন। কারণ, উনি ইতিপূর্বে সিনেমা বানানোর জন্যে বোধহয় বড় কোনো ডিরেক্টর এবং… শ্রদ্ধেয় এহতেশাম সাহেবের নাম বললেন : ‘আমি ওনার কাছে গিয়েছিলাম, উনি যে বাজেট দিয়েছিল, সে বাজেট হিসেবে তিন-চারগুণ… তিন-চার লাখ টাকায় আপনি সিনেমা বানাবেন কীভাবে?’
তখন আমি প্রসিডিউটরটা বললাম; যে, এই জন পিয়ার অ্যাডামসকে নেব, আমি তার বাড়িতে শুটিং করব, সান-গান দিয়ে শুটিং করব, আর বাইরে থেকে একটা ক্যামেরা কন্ট্রাক্টে ভাড়া করে নেব। আর আমার ম্যাকআপ-ম্যান চুক্তিতে থাকবে– ডেইলি বেসিস ভাড়া করব। এটা হলো, আলমগীর কবিরের কাছ থেকে শিখেছিলাম। তাতে বাজেট অনেক কমে আসবে। এবং তারা বিলিভও করল বিষয়টা। [আবার মোবাইল বেজে ওঠা।… মুহূর্তের বিরতি…।]

রুদ্র আরিফ : মেকিং প্রসেসটা বলতেছিলেন আরকি… ম্যাথডটা…

কাজী হায়াৎ : অ! তো, ওনারা রাজি হয়ে গেলেন। এবং শুরু হয়ে গেল, ‘দি ফাদার’। এই হলো আমার শুরু। অর্থাৎ, আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমি কোনো ছবিতেই পূর্ণাঙ্গ সহকারী ছিলাম না কখনো; আর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, আমি যখন প্রথমই ঢুকি, প্রথম দিনেই আমি প্রধান সহকারী।

রদ্র আরিফ : আপনি ধরেন, এটা প্রথম কাজ ছিল আপনার– ‘দি ফাদার’… একটা নন-অ্যাক্টরকে দিয়ে এই অভিনয় করানোর ঝুঁকিটা নেওয়ার সাহসটা কীভাবে পেলেন?

কাজী হায়াৎ : তখন তো বেসিক্যালি আমি সিনেমা বুঝি না। কোন সিনেমা ব্যবসা করে কি করে না– সেটা আমি বোঝতাম না। ওখানে দেখেছেন বোধহয়, দুইটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেছিলাম, এবং একটা আর্টিস্টিক ফর্মে তৈরি করেছিলাম; যদিও গান ছিল, তবুও সে গানের যৌক্তিকতা ছিল। মানে, একটু আলাদা ধরনের, আলাদা ট্র্যাকের ছিলাম আমি; তো, সেটা আমি বুঝিনি। কিন্তু ছবিটি রিলিজ হওয়ার পরে বুঝলাম, দিস ইজ নট দি পারফেক্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল মুভি। মানে, ইন্ডাস্ট্রিতে যে সব ছবি হচ্ছে, দিস ইজ নট দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মুভি। ইট’স শো– আমাকে যদি সিনেমার মধ্যে থাকতে হয়, তাহলে কমার্সিয়াল কিছু… মেইনস্ট্রিমে আসতে হবে। যার ফলে, ‘দিলদার আলী’ ছবিটা আপনারা দেখেছেন কিনা– জানি না; ‘দিলদার আলী’ ছবিতে আমার একটা কান্না ছিল– একটা ডিরেক্টরের কান্না ছিল, যে : টেলি সামাদ একদিন বানর নিয়া গেছে খেলা দেখাইতে, কোনো লোক হয়নি। লোক সে জমাইতেই পারল না। এরপরে সে নিজে বলল যে, ‘দাঁড়া, তোরা কমার্সিয়াল না দিলে আসবি না। আমি আগামীকাইল কমার্সিয়াল নিয়া আসব।’ এসে সে বস্তিতে একটা মেয়েরে বলল, যে, ‘সাজগোজ কইরা চল আমার সাথে’। এবং সেই গানটিও এমন ছিল, ‘ও জুলিয়া/ প্রাণ খুলিয়া দে/ কোমর দুলাইয়া দে’। মানে, দ্যাট মিনস, কমার্সিয়াল দে। মানে, এটি ছিল একটা পরিচালকের কান্না; পরিচালকের কথা, যে, এ ছাড়া সিনেমা হচ্ছে না।

রুদ্র আরিফ : আপনার ‘দি ফাদার’-এর ধরেন এমনিতে প্রশংসা আছে প্রচুর, কিন্তু আপনার স্ট্রাগল ছিল। মানে ঐটা মুক্তি পাওয়ার পর বোধহয় আপনি প্রডিউসার বা অন্যদের কাছ থেকে ঐ রকম রেসপন্সটা পান নাই।

কাজী হায়াৎ : পাই নাই। এবং এটা মুক্তি দিতে অনেক হিস্ট্রি হয়েছে; অনেক ইতিহাস। মুক্তি দিতেই চায়নি। তৎকালীন যারা সিনেমার কনট্রোল করত, তারা মুক্তি দিতেই চায়নি। ইভেন, তাদের ছবিটি দেখানো হলো। দেখানোর পরও তারা বলল, যে, নো! কিন্তু এই ছবিটি দেখেছিলেন তৎকালীন সচিব, ইনফরমেশনের সচিব খোরশেদ আলম সাহেব– যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছিলেন। তিনি এইটা তার ওয়াইফকে দেখাইছেন, মন্ত্রীকে দেখাইছেন, ইভেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানরে পর্যন্ত দেখাইছেন। এটা আমি জানতাম না। এটা আমি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে শুনেছি, যে, উনিও দেখছিলেন ছবিটা। একটা পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, যে, উনি এত ভালো লোক ছিলেন, সিনেমাপ্রেমী ছিলেন, যে, উনি ‘দি ফাদার’ নামের একটা ছবির কথা শুনে উনি নিজে দেখেছিলেন।
তো, এই খোরশেদ আলম সাহেব এত ইয়ে ছিলেন এই ছবিটির প্রতি… এত উইকনেস ছিল… তখন তো ধরেন এই অনুদান প্রথা চালু হয়নি, আর ভালো ছবিও নির্মাণ খুব কম হয়, সেহেতু উনি আমাকে ডেকে বললেন, যে : ‘ছবিটা রিলিজ হচ্ছে না কেন? এক বছর হয়ে গেছে, ছবিটা রিলিজ হচ্ছে না কেন?’ তখন আমি বললাম যে, ‘আমি ডেট পাচ্ছি না। আমাকে কেউ মুক্তির ডেট দেয়নি।’ তখন উনি, তখনকার যারা কর্ণধার ছিলেন– খলীলউল্লাহ সাহেব, ইফতেখার আলম– তাদেরকে তিনি টেলিফোন করে দিলেন, যে : ‘এই ছবিটি যে করেই হোক, রিলিজ করেন’।
তখন তারা… মানে, খোরশেদ আলম সাহেব এত শক্তিশালী ছিলেন, মানে, এত পাওয়ারফুল ছিলেন, যে, তার কথা শুনতে তারা বাধ্য। তখন তারাই আমাকে ডাকলেন। ডেকে আমাকে বললেন যে, ‘ছবিটি রিলিজে কী কী প্রবলেম?’ আমি বললাম, ‘এই-এই প্রবলেম।’ তখন তারা আবার সিনেমাটা দেখল। এবং আমার দুঃখটা কোথায় : দেখে ওনারা ডিসিশন নিলো যে, এই ছবি চলবে না!

রুদ্র আরিফ : ওনাদের যুক্তি কী ছিল?

কাজী হায়াৎ : যুক্তি কী ছিল… স্টার কাস্ট নাই, কিছুই নাই, একটি…

'দি ফাদার'
‘দি ফাদার’

রুদ্র আরিফ : …আমরা অভ্যস্থ না এই ধরনের সিনেমায়?

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ… এই ধরনের সিনেমায় আমরা অভ্যস্থ না; আমাদের মেইনস্ট্রিমের দর্শকরা এইটা দেখবে না। পরে ছবিটি দেখেও ওরা এই মন্তব্য করলেন। কিন্তু ওইদিকে ওই খোরশেদ আলম সাহেবের চাপ। তারপর ওনারা প্রযোজককে ডাকলেন : এই আহমেদ সাহেব; আহমেদ ফুডসের মালিককে। আমাকে বলল যে, ‘ওনাকে নিয়া আগামীকাল আসেন’। গেলাম। তখন ওনারা আমাকে… আমার সামনে… এটি… আমার জন্যে সেদিনটা খুব লজ্জার ছিল, এবং যার ফলে আমি ‘দিলদার আলী’ তৈরি করেছিলাম; এত লজ্জার ছিল যে, যা ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না; এটা মনে মনে আপনারা যদি কেউ অনুধাবন করতে পারেন, তাহলে হয়তো পারবেন। আমার সামনে, আই অ্যাম বিং অ্যা ডিরেক্টর অফ দ্যাট মুভি, আমাকে… ঐ… প্রযোজক বসা, প্রযোজকের সামনে ঐ খলীলউল্লাহ সাহেব বলতেছিলেন, ‘আপনারা তো বোম্বাইয়া…’; মানে, ইনি কিন্তু অরিজিন ফ্রম বোম্বাই… মানে, আহমেদ সাহেব… ‘আপনি এই সব ডাইরেক্টার দিয়া ছবি বানাইতে গেছেন কেন? আপনারা এইসব ছবি বানাইতে গেছেন কেন? এইগুলো তো আর্ট ছবি। এইগুলো চলে না।’
তো, আহমেদ সাহেব তখন খুব… আমি… আহমেদ সাহেব কতটুকু ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, বা রাগ হয়েছিলেন, সেটার পরিচয় আমি পরে দিচ্ছি। কারণ, ছবিটি রিলিজ হলো শুক্রবারে; সোমবারে উনি… আমি এই ছবির পার্টনার ছিলাম; ওয়ার্কিং পার্টনার ছিলাম… সোমবারে ওনারা শহীদুল আমিন নাম করে একজন ডিরেক্টরকে ডাকলেন, যিনি জাদুর ছবি তৈরি করেন। তাকে আমার সামনে ডেকে… আমি বললাম যে, ‘ঠিক আছে, বানান আপনারা; বাট, আমি তো এই ছবির পার্টনার। আমিও কথা বলি?’
বলল, ‘না, আপনি রুমে ঢুকবেন না! আমাদের কথা হবে।’ আমি খুব কষ্ট পেলাম। এবং রাগ হয়ে চলে এলাম। আর যাইনি ওনাদের ওখানে কোনোদিন। ছবিটি লাভ করেছিল। এবং আমি টেন পারসেন্ট ওয়ার্কিং পার্টনার ছিলাম। আমি… সেই ডিলটা এখনো আছে। আমি কখনো যেয়ে জিজ্ঞেস করিনি, ‘কত লাভ হয়েছে? আমাকে কত টাকা দেবেন?’ কারণ, ছবিটির সোমবার, মঙ্গলবার– ডে-বাই-ডে সেল বাড়ছিল। এবং বৃহষ্পতিবারে যেয়ে প্রায় অধিকাংশ হলে টিকেট ব্ল্যাক হয়েছিল। আমি খলীলউল্লাহ সাহেবকে খুব অনুরোধ করেছিলাম, যে, ছবিটা সেকেন্ড উইক দুই-তিনটা হলে কন্টিনিউ করা যায় কিনা। উনিই তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি বুঝতে পারি নাই যে, ছবিটা এমনভাবে দর্শকরা নেবে। যদি জানতাম, তাহলে আমি আপনার জন্যে দুই-তিনটা হল রেখে দিতাম। আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। এগুলো বুকিং স্লিপ হয়ে গেছে। আমি দিয়ে দিয়েছি।’ তো, ওনারাই ছিলেন : হল বুকিং করতেন ওনারা। তো বলল যে, ‘ঠিক আছে; পরবর্তীতে আমি কোনো ভালো ডেট দেখে সিনেমাটা আবার চালানোর ব্যবস্থা করব।’
আর, এ দিকে প্রযোজকের কাছ থেকে খেলাম ধাক্কা। প্রযোজক আমাকে অ্যাভয়েড করে সোমবারে… সোমবার পর্যন্ত খারাপ ছিল… সোমবারেই ওনারা ইয়ে করেছিল…। ঐ ছবিতে আবার ওনারা লস করেছিলেন প্রচুর। ঐ ছবিতে ওনারা এত লস করেছিলেন যে, মানে, ‘শাহজাদী গুলবাহার’ না কী জানি ছবিটার নাম ছিল… একটা টাকাও পান নাই ঢাকা থেকে। মানে, কোথা থেকেও টাকা পান নাই। পুরো ক্যাপিটালটাই লস হয়েছিল। পরে ওনারা আমাকে ডেকেছিলেন।

রুদ্র আরিফ : মানে, ঐটা ওনাদের দ্বিতীয় সিনেমা ছিল?

কাজী হায়াৎ : হ্যাঁ। পরে ওনারা আমাকে ডেকেছিলেন ছবি করার জন্য। একেবারে আমার মারুফের যেদিন জন্ম হলো, সেইদিনই। মনে আছে আজও : বেলা একটার সময় আহমেদ সাহেবের বাসায় আমাকে খাওয়ালেন। খাওয়াইয়া-দাওয়াইয়া তারপর বললেন, ‘হায়াৎ সাহেব, যা হইছে– হইছে; আপনি একটা ছবি করেন।’
আমি বললাম, ‘না; স্যরি। আমি দুঃখিত, আমি বেকার হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াব, কিন্তু আমি আপনাদের সিনেমা আর বানাব না। আর আপনাদের কাছে কোনোদিন জানতেও আসব না– আমার ছবিটা কত ব্যবসা করেছে। এটা আপনাদের দিয়ে গেলাম আমি। কারণ, আপনারা লস্ট ইউর মানি… সেকেন্ড ছবিটাতে, বিগ লস করেছেন আপনারা।’
–এই হলো শুরুটা… ‘দি ফাদার’-এর শুরুটা।

রুদ্র আরিফ : তারপর ‘দিলদার আলী’র রেসপন্স কেমন ছিল?

কাজী হায়াৎ : ‘দিলদার আলী’র রেসপন্স ওয়াজ ভেরি গুড। যা ক্যাপিটাল ছিল, তার চাইতে… মানে, একমাসের মধ্যে একটা ছবি শেষ করা হয়েছিল…

রুদ্র আরিফ : ঐটার আইডিয়াটা, মানে কনসেপ্টটা মাথায় আসলো– ঐ যে, ঐ ব্যবহারের পর– সিনেমা মুক্তির… আপনি তারপরে রাজিবকে নিয়ে ‘খোকন সোনা’টা বানালেন…

কাজী হায়াৎ : আমি সবসময় খুঁজেছি মেইনস্ট্রিমের বাইরের লোক। শাবানাকে নিয়ে আমি কখনো চিন্তাও করিনি; রাজ্জাক সাহেবকে নিয়ে আমি কখনো চিন্তাও করিনি। বড় কাস্ট নিয়ে আমি কখনো চিন্তা করিনি। কারণ, আমি গল্প তৈরি করি হলো স্পটে। আর, আর্টিস্টের সিডিউল নিয়ে কাজ করতে হবে– এটায় আমি অভ্যস্থ হতে পারিনি কখনো; ইভেন নট টুডে যে, আমি একজন আর্টিস্টের সিডিউল নিয়ে কাজ করব। আমি মনে করি, এটা সুপারিয়রটি কমপ্লেক্স না; আমি মনে করি, আমার যখন ইচ্ছে হবে, তখন আমি শুটিং করব। এবং মান্নাকে দিয়ে তা-ই করেছি আমি। যেদিন মান্নার সিডিউল নেওয়ার দরকার হয়েছে, সেদিন মান্নাকে ছেড়ে দিয়েছি। যেদিন মান্না বলেছে যে, ‘ওস্তাদ, সিডিউলটা নিয়ে নেন’; আমি বললাম, ‘আমি তো সিডিউল নিয়ে কাজ করব না’। ‘সিডিউল না নিলে আপনি পিছিয়ে পড়ে যাবেন’। এবং একটা ছবি পিছিয়েও পড়ে যায়। তখনো আমি মান্নাকে ছেড়ে দিয়েছি।

রুদ্র আরিফ : ‘ খোকন সোনা’টাও তো ধরেন, গতানুগতিক কোনো কাহিনী ছিল না…

কাজী হায়াৎ : আমার কোনো ছবিই সাধারণত গতানুগতিক কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়নি। মানে, সিনেমা… তথাকথিত সিনেমা যে ধারায় তৈরি হয়, সে ধারার বাইরে আমার সব ছবি হয়েছে।

রুদ্র আরিফ : …তারপরও ঐটা তো ধরেন, খুব রিয়েলিস্টিক একটা সিনেমা– ‘ খোকন সোনা’টা; এবং রাজিবের মতো একজন… তখনো উনি বোধ হয় নতুন…

কাজী হায়াৎ : …একেবারেই নতুন…<

রুদ্র আরিফ : …এবং পজেটিভ চরিত্র… পজেটিভ চরিত্র মানে, তথাকথিত স্ক্রিপ্টিং ঐটাতে ছিল না। ‘দি ফাদার’-এর এই স্ট্রাগলের পরেও এই ঝুঁকিটা কন্টিনিউ করলেন কোন সাহসের জায়গা থেকে?

কাজী হায়াৎ : সাহস তো… আমি তো মেইনস্ট্রিমের [সিনেমা] তৈরি করতেও আসিনি। বেসিক্যালি আমি যখন গ্রাজুয়েশন করি, তখন ঐ পাঠ্যপুস্তকে কিছু গল্প ছিল, কিছু বই পড়া ছিল…। আমার ‘তারিনী মাঝি’ সিনেমাটা করার বড় শখ ছিল। ‘তারিনী মাঝি’ করার শখ ছিল; ‘কাবুলিওয়ালা’ সিনেমা করার শখ ছিল। এইসব ধরনের সিনেমা নির্মাণের জন্যেই আমি এসেছিলাম, বেসিক্যালি। কিন্তু মেইনস্ট্রিমে ঢুকে গিয়ে, আমি আসলে আমাকে হারিয়ে ফেললাম ঐ যে… ‘দি ফাদার’-এর কাজী হায়াৎকে চাবুক মেরে হত্যা করা হলো… ঐ খলীলউল্লাহ সাহেবরা, এবং ‘দি ফাদার’-এর মালিক– ওরা আমাকে, মনে হলো, যে, এই ছবিটি বানানোর অপরাধে আমাকে চাবুক মেরেছে। সে জন্যেই আমার চেইঞ্জটা আসলো। এবং চেইঞ্জটা আসতে আসতে আমি সুপারহিট ছবি কখন দিলাম? ‘দায়ী কে?’ ‘দায়ী কে?’ ছবি, তাও অফট্র্যাকের ছবি। এটিএম শামসুজ্জামান নায়ক। এটা শুনে সবাই অবাক। এটিএমও অবাক। হয়ে গেল! ছবিও সুপারহিট হলো। অনেক সুপারহিট ছবি। ‘ডাক্তার কদম আলী– ডিগ্রি নেই’ [এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত চরিত্র]। এরপরে আমি ‘যন্ত্রণা’– মান্নাকে নিয়ে করলাম। ফ্লপ করল। তারপর মান্নাকে নিয়েই থাকলাম। মান্না এমনভাবেই জুড়ে আমার সাথে থাকল, যে, মান্নাকে আর ছাড়তে পারলাম না। তখন মান্নাকে নিয়ে থাকতে থাকতে, মান্নাই এক সময় হিট হয়ে গেল। [আবার ফোন… মুহূর্তের বিরতি…]

রুদ্র আরিফ : …মান্না ভাইয়ের জায়গায় ছিলেন। মানে, মান্না ভাই আর আপনার নামটা তো ধরেন, একসাথে যায়…

কাজী হায়াৎ : … তো, মান্নাকে নিয়ে থাকতে থাকে মান্নাই একদিন স্টার হয়ে গেল…

রুদ্র আরিফ : …স্টার না, সে সুপারস্টার…

কাজী হায়াৎ : …সুপারস্টার হয়ে গেল। তো, এইভাবেই… আবার মান্না যখন সুপারস্টার হয়ে যখন ইয়ে হয়ে গেল… যখন তার সিডিউল নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলাম, তখন আমি চলে গেলাম আমার ছেলের কাছে : আমার ছেলেকে দিয়ে আমি ছবি বানাব; এখন আর আমি কাস্ট নিয়ে বানাব না।

রুদ্র আরিফ : ‘খোকন সোনা’র রেসপন্স এমনিতে কেমন ছিল?

কাজী হায়াৎ : ‘খোকন সোনা’য় আমি লাভ করেছিলাম।

'দাঙ্গা' সিনেমায় রাজিব
‘দাঙ্গা’ সিনেমায় রাজিব

রুদ্র আরিফ : …এবং আমি খুব বেশি সিনেমা যদিও দেখি নাই, সব সিনেমা দেখা তো সম্ভব না… মানে, এই রাজিবকে আপনি ‘দাঙ্গা’য় যেভাবে রিপ্রেজেন্ট করলেন…

কাজী হায়াৎ : ‘দাঙ্গা’র আগে রাজিবের রেমুনিরেশন ছিল হলো– কেউ দয়া করে ২০ হাজার, ১৫ হাজার দিত। ‘দাঙ্গা’য় সে এমন স্টার হয়ে গেল, তার এক লাফে রেমুনিরেশন হয়ে গেল ২ লাখ টাকা।

রুদ্র আরিফ : এই যে আপনি ধরেন, নন-অ্যাক্টর, তারপর অপরিচিত অভিনেতা– এদের দিয়ে ধরেন, নার্সিং করে যে তাদেরকে তৈরি করে ফেললেন, এই প্রক্রিয়াটা কী আপনার কাছে?

কাজী হায়াৎ : আমার ভালোলাগে।

রুদ্র আরিফ : …কারণ, তারা বেস্ট এফোর্টটা দিতে পারল?

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ। আমার ভালোলাগার কারণ, আমার মতো করে তারা অভিনয় করে; তাদের মতো করে তারা অভিনয় করতে পারে না। যেমন, এই যে এখন ফিল্ম বিজনেস করছে না, মূলধারার সিনেমা বিজনেস করছে না : আমার একটা ছবিতে লস করেছি আমি; টোটাল ক্যাপিটাল চলে গেছে। এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আই উইল মেক শর্টফিল্ম। তিনটা শর্টফিল্মের প্লট আমি নিয়েছি : অল নন-অ্যাক্টর। একটা এক্সট্রা ছেলে, এখানকার [এফডিসির] একটা এক্সট্রা ছেলেকে সিলেক্ট করেছি; হি উইল বি হিরো। একটা এক্সট্রা মেয়ে এখান দিয়ে [পরিচালক সমিতির সামনে] ঘুরে বেড়ায়, সে হবে নায়িকা। মানে, এদের সিডিউলের কোনো বিড়ম্বনা নাই; আমি ইচ্ছেমতো এদের দিয়ে সিনেমাটা আমার মতো করে তৈরি করতে পারব। আর ঘটনা হলো, আমার একটি বিষয় আছে; সেটি হলো– আপনি আমার ছবিতে যারা কাজ করেছে, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলে পাবেন, আমি একটু অভিনয় জানি বলে অভিনয় দেখিয়ে দিতে পারি; এবং সেটা যতক্ষণ তারা না পারে, তার জন্যে যে প্রসেসগুলো আছে, সে প্রসেস আমি অ্যাডাপ্ট করি। প্রসেস অ্যাডাপ্ট করে আমি আমার ডিমান্ড অনুযায়ী নিয়ে নিই তাদের কাছ থেকে।

রুদ্র আরিফ : আপনার প্রসেসগুলা কী? মানে, যদি মোটা দাগে বলেন?

কাজী হায়াৎ : মোটা দাগে, মানে, আমি অভিনয় শিখাই। মানে, এইভাবে কথা বলতে হবে, এইভাবে চলতে হবে– আমি দেখিয়ে দেই। বারবার দেখিয়ে দেই। নিজেই দেখিয়ে দেই।

রুদ্র আরিফ : আপনার ‘খোকন সোনা’র পরে বোধ হয় ‘রাজবাড়ি’? তারপর ‘মনাপাগলা’, ‘পাগলি’…। তো, ‘মনাপাগলা’ নিয়ে আমার একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট আছে। সেটা হচ্ছে যে, ঐ সময়ে আমার জন্ম। তো, আমার আম্মা আমাকে ছোটবেলায় ‘মনাপাগলা’ নামে ডাকত ঐ সিনেমার নামে। আমি বড় হওয়ার পর এই শুনতে পাইছি– টেলিসামাদের…। ঐ মাস-পিপলের কাছে তো ধরেন, কাজী হায়াতের চেয়ে অ্যাক্টরটা যায় : টেলিসামাদের ‘মনাপাগলা’। আমি পরে জানলাম যে, ঐটা এই সিনেমা।… আপনি ‘দায়ী কে?’তে এসে হচ্ছে ট্র্যাকটা চেঞ্জ করলেন এক ধরনের?

কাজী হায়াৎ : না, ট্র্যাক না; ওটাও অফট্র্যাক। অফট্র্যাক।

রুদ্র আরিফ : মানে, নিজের মতো করে একটা বাঁক নেওয়া?

কাজী হায়াৎ : হ্যাঁ। মানে, এই ছবিটা একটু ব্লকবাস্টারে চলে গেল। ‘দিলদার আলী’ও ব্লকবাস্টার ছিল। ‘দিলদার আলী’তে আমাদের একজন প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার সফদার আলী ভূইয়া, আমার মনে আছে, শনিবার দিন একটা ফুলের মালা নিয়ে অফিসে গিয়েছেন আমার। তো, আমি অফিসে বসা। প্রডিউসার ছিল হলো অন্য একজন। তো, অফিসে বসা, তখন আমাকে বললেন যে, ‘হায়াৎ, এদিকে আসো।’ উনি আমাকে মালাটা পরিয়ে দিলেন। পরিয়ে দিয়ে বললেন যে, ‘আমি সফদার আলী ভুইয়া, তোমাকে মালা দিতে এসেছি। আমি… একটা সিনেমা যে এত রিসিপশান পাইতে পারে, এবং এত গ্রহণযোগ্য হইতে পারে, সামান্য কাস্টিং– জুলিয়া আর তুমি একজন কমেডিয়ানকে দিয়ে ছবি বানিয়েছ, সেই ছবি যে অল শোজ, অল ক্লাস, অল শোজ ফুল… একটা টিকেটও বাকি থাকে নাই এই শুক্রবারে বিক্রি হতে, এটা আমাকে অভিভূত করেছে। তো, এইজন্যে আমি তোমাকে মালা দিতে আসছি।’

রুদ্র আরিফ : আমরা একটু আগের জায়গায় যাই; সেটা হচ্ছে যে, হায়াৎ ভাই, আপনার সিনেমায় আসার ড্রিমটা কখন গ্রো করল?

কাজী হায়াৎ : ইট ওয়াজ ফ্রম মাই চাইল্ডহুড। চাইল্ডহুডই বলা যায়। চাইল্ডহুড মানে, আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। আমি আমার মামার সাথে গিয়েছিলাম সিনেমা-হলে। আমার বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রামে; গ্রামাঞ্চলে। আমি যখন ছোট, ইভেন, আমি যখন কলেজে পড়ি, তখনো আমার… এখন ডিসট্রিক্ট হয়েছে– গোপালগঞ্জ জেলা; তখন তো ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ সাব-ডিভিশন ছিল… একখানা ইটেরও একটু পাকা রাস্তা ছিল না সারা গোপালগঞ্জে। তো, সেই প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বাড়ি। সেই গ্রামের বাড়ি থেকে আমি সিনেমার সাথে পরিচিত হলাম প্রথম– আমার মামার হাত ধরে খুলনা গিয়েছিলাম; খুলনা গিয়ে আমি ছবি দেখলাম, ‘সাগরিকা’। আমাকে অভিভূত করল। ‘সাগরিকা’, মানে, অবাক ব্যাপার, আর বোধহয় দেখিনি আমি কখনো; কিন্তু ‘সাগরিকা’র গল্প আমি বলে দিতে পারব। একটা প্রথম ওয়াচার, সিনেমা দেখে তার সেই গল্পটা মনে রাখা খুব কষ্ট হয়। কিন্তু আমি অবাক হই যে, আমি তখন কেবল ক্লাস ফোরে পড়ি, আমি কীভাবে গল্পটা এখনো বলতে পারি এবং আমার মনের মধ্যে গেথে থাকল! ঐটাই আমাকে ইন্সপায়ার্ড করল। এবং আমি আমার মামাকে বললাম, একদিন ঐ মামাকেই বললাম যে, ‘মামা, এ রকম আমরা হতে পারব না? এ রকম সিনেমার লোক হইতে পারব না– যারা তৈরি করে?’
তখন মামা আমাকে বলল, ‘ধুর বোকা! এরা অনেক বড়লোকেরা… অনেক বড়লোক…!’

রুদ্র আরিফ : …তখন সিনেমাটা একটা রূপকথার মতো?

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ। তো, সেই যে সিনেমাটা আমার মাথায় ঢুকল, সেই সিনেমা আর নামাতে পারি নাই। স্টুডেন্ট লাইফে, ইভেন আমি যখন গ্রামের কলেজ… আমার গ্রামের পাশেই কলেজ ছিল; গ্রাম্য-কলেজ… একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজে হোস্টেলে থাকতাম, তো মাঝে মাঝে হোস্টেলে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কথাবার্তা হতো : কার কী ইচ্ছা? আমি বলতাম, ‘আমি ফিল্মের ডিরেক্টর হব।’ আর ঐ ‘চিত্রালী’-টিত্রালি পড়তাম। ‘ফিল্মের ডিরেক্টর হব’। ওরা তখন আমাকে অনেকে ভর্তসনা করত। অনেকে অনেক কথা বলত। একজন তো একবার মুখের ওপর বলেই ফেলল, ‘তুই যদি কোনোদিন সিনেমার ডাইরেক্টর হইতে পারিস, আমি মুখ দেখাব না তোকে।’ সে বেঁচে আছে এখনো; হি ইজ মাই ভেরি কোজ ফ্রেন্ড : ‘এ সব হলো… তুই গ্রামে থেকে এইসব চিন্তা-ভাবনা করিস কীভাবে?… এ তো বড়লোকদের কারবার! অনেক লেখাপড়া জানা দরকার, অনেক কিছুর দরকার।’
‘তাহলে আমি হতে পারব না কেন? আমি হব। দেখবি, আমি একদিন হব!’
এবং এই যে নেভেটিভ ইয়েগুলো পেতাম… নেভেটিভ ধাক্কাটা খেতাম আমি, তখন আমার মধ্যে জিদটা আরও বাড়ত। এবং সেই জিদটাই বোধহয় আমাকে এইখানে নিয়ে এসেছে।

রুদ্র আরিফ : আপনার সিনেমায় জিদ একটা বড় জায়গা। জিদটা ধরেন ‘দি ফাদার’-এও এক রকম পাওয়া যায়, এবং শেষ পর্যন্ত শেষ সিনেমাটায়ও এক ধরনের পাওয়া যায়। তা আপনি এম্নে… কী বলে… সহকারি পরিচালক হিসেবে জড়ায়ে গেলেন কীভাবে? ঐটা? ঐ শুরুটা? ঐটা তো বলছেন যে, কতদিন কাজ করছেন; কিন্তু কন্টাক্ট… প্রথম কন্টাক্টগুলা?

কাজী হায়াৎ : এটাও গল্পের মতোই শোনাবে। দিস ইজ নট অ্যা স্টোরি বাট ইট ইজ রিয়েল। আমি জগন্নাথে এম.কমের… এম.কম পড়েছি জগন্নাথে [বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]। লাস্ট পরীক্ষার খাতাটা, আমার শেষ হয়েছে লেখা, স্যার আসছে খাতা নিতে; সবার খাতা নিয়ে গেলেন। তো, আমি চোখ বন্ধ করে বললাম, ‘আল্লাহ, আমার যেন জীবনে আর কোনোদিন কোনো পরীক্ষা দিতে না হয়। আমি যেন সিনেমায় চলে যেতে পারি, আল্লাহ। আল্লাহ, তুমি আমাকে এই পথ দিয়ে দিও।’
এবং পরীক্ষা শেষ করে, আমার রেজাল্ট কী হয়েছিল, শুনলে অবাক হবেন, অদ্যাবধি আমি জানি না। আমি জানতেও যাইনি। কারণ, দ্যাট সার্টিফিকেট আমার জন্য কিছুই করবে না। কারণ, আমি কোনোদিন চাকরির জন্যে অ্যাপ্লাই করব না। আমার এই সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। যার ফলে আমি জানতেও যাইনি আমার পরীক্ষার কী রেজাল্ট হয়েছিল; আমি কী। তো, আমি আমার আরাধ্য জায়গা খুঁজতে এসেছিলাম। এখানে [এফডিসির], এই পাশ দিয়ে তারকাটার বেড়া ছিল। ঝুকি মেরে আসতাম। এখানে এসে আমি হাসমত সাহেবকে, তারপর… কার-কার কাছে অ্যাপ্রোচ করেছি টু বি অ্যাসিস্ট্যান্ট… আমি… পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউশনে যাওয়া জন্য স্কলারশিপ ছিল তখন; গভঃমেন্ট একটা স্কলারশিপ… ওখান থেকে পাঠাত, গভঃমেন্ট [অ্যাপ্রোভ করত] ইন্টারভিউ দিয়ে…। জনাব কবীর চৌধুরী সাহেব ছিলেন তখন এডুকেশনের সেক্রেটারি। আমি একবার ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। আমাকে পাঠায়নি। তো, সেই ইন্টারভিউ বোর্ডে হাসান ইমাম সাহেবও ছিলেন। হাসান ইমাম ভাইকে মাঝে মাঝে বলি যে, ‘হাসান ভাই, আপনার কি মনে আছে যে, আমি ইন্টারভিউটা দিয়েছিলাম? কিন্তু আমাকে সিলেক্ট করেননি!’
তো, আমি অ্যাপ্রোচ করেছি আমজাদ হোসেনের কাছে, আমি অ্যাপ্রোচ করেছি আজিজুর রহমান সাহেবের কাছে, আমি ক্যাপ্টেন এহতেশামের বাসায় গিয়েছি, আমি আমজাদ হোসেনের বাসায় গিয়েছি– টু বি অ্যাসিস্ট্যান্ট। আর, মোস্তফা মেহমুদ নাম করে একজন পরিচালক ছিলেন, তার বাসায় গিয়েছি কমপক্ষে দশদিন। কোথাও হয়নি। হঠাৎ করে একদিন মমতাজ আলী সাহেবের কথা শুনলাম যে, ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট নাই, উনি অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেবেন। উনি কোথায় আছেন? আমি শুনলাম যে, উনি এডিটিংয়ের ওই জায়গায় আছেন; ওনার ছবির এডিটিং হচ্ছে। আমি… মমতাজ আলী সাহেবই ঘুরতেছে, আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করতেছি, ‘আচ্ছা, মমতাজ আলী সাহেব এখানে কে? ওনার এডিটিং হচ্ছে।’
তখন উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাকিয়ে তাকিয়ে বললেন যে, ‘কেন? কী জন্যে?’ উনি খুব বেটে লোক ছিলেন; কিন্তু রাশভারি লোক ছিলেন। আমি বললাম যে, ‘আমি শুনেছি খুব রিলায়েবল সোর্স থেকে’… –ঠিক এভাবেই বলছিলাম, উনি একটু লেখাপড়া কম জানতেন, ক্লাস ফোর-ফাইভ পাস ছিলেন– …‘রিলায়েবল সোর্স থেকে শুনেছি যে, ওনার কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই; উনি অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেবেন। আই অ্যাম ভেরি মাচ ইন্টারেস্টেড। আমি সিনেমায় কাজ করব।’
উনি আমার কথায় অনেকটা অভিভূত হলেন, এবং বললেন যে, ‘তুমি লেখাপড়া কদ্দূর করেছ?’
আমি বললাম, ‘আমি এম.কম পরীক্ষা দিয়েছি।’
‘গুড। আমি এ রকম এডুকেটেড ছেলেই চাচ্ছিলাম। তুমি আজ থেকেই কাজে লেগে যাও।’ –এবং উনি তাৎক্ষণিকভাবেই আমাকে এডিটিংরুমে নিয়ে গিয়ে, হাই নাম করে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন ওনার, আর এডিটর ছিল বুলবুল হক– বুলবুল সাহেব; বুলবুল সাহেবকে বললেন যে, ‘বুলবুল, ও আইজ থেকে চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট। ছেলেটা এম.কম পরীক্ষা দিয়ে আসছে। ওকে সেইভাবে জানবেন। সাধারণের মতো জানবেন না।… আর হাই, তুমি সমস্ত কাগজপত্র ওনাকে বুঝিয়ে দাও আজকে।’
–এই হলো আমার সিনেমায় আসা।

রুদ্র আরিফ : আপনার শুরুর দিকে, যেহেতু পুনেতেও আপনি ট্রাই করেছিলেন, ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন : ওটা তো খুব একটা সিরিয়াস ইনস্টিটিউট; তার মানে আপনার ইন্সপাইরেশনের জায়গাগুলা, বা অনুপ্রেরণার জায়গাগুলা কারা ছিল? মানে, কোন ফিল্মমেকারদের সিনেমা আপনাকে খুব ইন্সপায়ার্ড করত?

কাজী হায়াৎ : ‘চিত্রালী’ [বিনোদন সাময়িকী], সেই ‘সাগরিকা’ [সিনেমা]। ‘চিত্রালী’ পড়ে আমার মনে হতো, আমি কবে যাব? আমি কবে…

রুদ্র আরিফ : এমনিতে কোনো নির্দিষ্ট ফিল্মমেকার ইন্সপায়ার্ড করছে ঐ রকম, বা…?

কাজী হায়াৎ : না।

রুদ্র আরিফ : তারপর যদি সিনেমায় ফিরে আসি– ‘পাগলী’র রেসপন্স কেমন ছিল?

কাজী হায়াৎ : ‘পাগলী’ ওয়াজ গুড। ‘পাগলী’ ওয়াজ ভেরি নাইস।

রুদ্র আরিফ : তারপর তো বোধহয় ‘বেরহম’?

কাজী হায়াৎ : হ্যাঁ। এগুলো সাকসেসফুল ছিল। বিজনেস করেছিল।

দ্বিতীয় কিস্তি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

3 মন্তব্যগুলো

  1. ভাল লাগল খুব। কাজী হায়াতের পুরনো ছবিগুলো দেখার কোন উপায় থাকলে জানাবেন। পাগলী, দিলদার আলী ছবির মতো ছবিগুলো খুব দেখতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে ছবির গানগুলেো অসাধারণ।

মন্তব্য লিখুন