নতুন সিনেমা: নির্মাণ ও প্রদর্শন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা

1
350

গ্রন্থ : নতুন সিনেমা, সময়ের প্রয়োজন । গ্রন্থিক : নূরুল আলম আতিক । প্রচ্ছদ : লিটন কর । প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০৯ । প্রকাশক : ঐতিহ্য । পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৮০ । মূল্য : ৩০ টাকা

নতুন সিনেমা কী ও কেন?

সিনেমার আবার নতুন পুরান কী? সিনেমা সিনেমা। পুরান অনেক সিনেমা আজকের দিনেও নতুন। এরমধ্যে কিছু ছবি কালোত্তীর্ণ। সিনেমা-ছবি-চলচ্চিত্র-ফিল্ম-বায়োস্কোপ-বই যে নামেই ডাকি না কেন, ‘সিনেমা কী?’ — পাঠক তার স্বরূপটুকু জানেন। কিন্তু ‘নতুন সিনেমা’র ব্যাপারটা কী? ব্যাখ্যা করছি। তার আগে প্রয়োজন দেশের সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতিটা এক নজর পরখ নেয়া।

‘সত্যের জয় হবেই’, ‘মায়ের মতো আপন কেউ নাই’, ‘সবার উপরে মা/মাটি/মানুষ’,‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’, ‘বন্ধু তুমি শত্রু তুমি’ ইত্যাদি ইত্যাদি — এগুলোই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে, মানে আমাদের সিনেমার মূল ফ্যাক্টরি, বিএফডিসি থেকে উৎপাদিত ছবির মূল আইডিয়া। প্রায় একই ধরনের কাহিনী-বিন্যাস ও চরিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে এই আইডিয়াবীজগুলো পল্লবিত হয়। ফর্মুলাভিত্তিক এই ছবিগুলোর টার্গেট-অডিয়েন্স নিম্ন আয়ের মানুষজন। নিম্নমানের সেট, খারাপ ল্যাবওয়ার্ক ও অন্যান্য টেকনিক্যাল ত্রুটি সম্বলিত এই ছবিগুলি যখন একটি ছোট শহরের হলে গিয়ে পৌঁছায় — তখন তার চেহারা যা দাঁড়ায় তা বলা বাহুল্য। অস্পষ্ট আওয়াজ আর ঝাপসা ছবির এক জঘন্য মহড়া।

এদিকে বছর কুড়ি হলো — শর্টফিল্ম, প্যারালাল ফিল্ম, অলটারনেটিভ ফিল্ম, ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ইত্যাকার নানা নামে কিছু ছবি তৈরি হচ্ছে। শুরুতে ১৬মি.মি. এ চালু হলেও এখন তা ৩৫ মি.মি.-এ নির্মাণ ও প্রদর্শন হচ্ছে। বিএফডিসি’র অংশীদারিত্বে এই প্রক্রিয়াটি চালু থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্যুটিং পরবর্তী কাজগুলো হয় বিদেশে। মুক্তিযুদ্ধ, দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম, সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা, নর-নারীর মানবিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে — এমন সব বিষয়াবলী এই ধারার মূল বিষয়বস্তু। মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু মহতী এই উদ্যোগ আমাদেরকে ইন্ডাস্ট্রি-চলচ্চিত্রের শোচনীয় দশা থেকে রেহাই দিতে অক্ষম। শুরুতে মধ্যবিত্ত দর্শক বিপুল উৎসাহে সাড়া দিলেও আজকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন; প্রাণহীন, উদ্দেশ্যপ্রসূত, দুর্বল এই চলচ্চিত্র সমূহ থেকে। অনেকে আবার এই ধারাকে ‘আর্টফিল্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, আর তা করেন নিন্দার্থে। এই ছবিগুলোর অনেকগুলোই দেশে সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত কিম্বা বিদেশের ফান্ডে নির্মিত। প্রদর্শিতও হয় খুব সীমিত পরিসরে।

একসময় সিনেমা দেশের মানুষের যে পরিচয়কে প্রকাশ করতো এখন তার জায়গা নিয়েছে টেলিভিশন। ‘বোকা বাক্স’টি মোটেই বোকা নয় আর। এদেশের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে সিনেমা ত দেখায়ই, টেলিফিল্মও দেখায়। যদিও টেলিফিল্ম বলতে যা বোঝায় তা মোটেই নয়; টেলিভিশন-অডিয়েন্সের জন্য নির্মিত টেলিভিশন-প্রোডিউসড ফিল্ম না হ’য়ে এগুলো মূলতঃ বড় নাটক অথবা ইন্ড্রাস্ট্রির ফর্মুলা-সিনেমার রেপ্লিকা। সোপ-সিরিয়ালের বাইরে বাংলাদেশ টেলিভিশন একটি আশ্চর্য জিনিসের জন্ম দিয়েছে তা হলো — খন্ড নাটক বা একপর্বের নাটক। বিনোদন জগতে একটি বড় সংযোজন। বলা ভালো অর্জন। সারা পৃথিবী জুড়েই এটি একটি অনন্য ঘটনা। এখানে আমাদের বিবেচ্য — এই টিভি চ্যানেল প্রোডিউসড সিনেমা। বেশ কিছুকাল হলো টিভি চ্যানেল সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করছে। শুরুতে অনেক আশার আলো দেখা গিয়েছিল। কিন্তু নির্মাণ ও প্রদর্শনের পর, নির্মিত ছবির মান ও নামমাত্র দু’একটি হলে প্রদর্শন ও টিভিতে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের নামে বিজ্ঞাপন কন্টকিত ‘প্রচলিত ছবি’ই দেখা গেল। আবারো সেই অন্ধকার, সেই হতাশারই টেলিকাস্ট। বাংলাদেশের সিনে-ইন্ডাস্ট্রির দুঃসময়ের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত এই টিভি চ্যানেলগুলি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে আরো ধ্বংসের পথেই টেনে আনছে। কেন চ্যানেলগুলি এরকম করছে? এখানে টিভি ভিন্নতর এক বাণিজ্যের ঘ্রাণ পেয়েছে, সেটি হলো ব্রান্ডিং এর ব্যবসা। নানান প্রোডাক্টকে প্রোমোট করেই টিভির এই সিনে-বাণিজ্য, বিজ্ঞাপনই এখানে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ।

এছাড়াও কিছু নির্মাণ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় — বিদেশের প্রডাকশন। বিদেশ থেকে এসে এদেশের কিছু নির্মাতা বিদেশের অডিয়েন্সের জন্য ছবি বানাচ্ছেন। বিদেশি ফান্ডে এদেশের কিছু এনজিও তাদের নিজস্ব এজেন্ডা অনুযায়ী কিছু ছবি বানাচ্ছেন। সেগুলোও বিশেষ কোনো আশার আলো দেখাতে পারেনি এখনো।

তাহলে কি আমাদের সিনেমার কোনোই রূপান্তর ঘটবে না? আলো নিয়ে কারবার যে সিনেমার — তার নিজের ভবিষ্যৎ কি অন্ধকারেই থেকে যাবে? নতুন সিনেমার কোনোই সম্ভাবনা নেই? বছর দুয়েক আগে, নতুন সিনেমার সম্ভাবনা নিয়ে লিখতে গিয়ে টেলিভিশনের নাটক নির্মাতা, কলাকুশলী, বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছিলাম। মিডিয়া বুম ও ডিজিটাল টেকনোলজির ক্রম-অগ্রগতি এবং বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতে একজন তরুণ নির্মাতার করণীয় কী? বর্তমান পরিস্থিতিতে সিনেমা নিয়ে তরুণ মনের ভাবনা কী? — এ বিষয়ে ব্যক্তিগত ঔৎসুক্যের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সাথে একটি দিনব্যাপী আয়োজনে হাজির থেকে বুঝেছি একেবারে নতুন করে শুরু করতে হবে। প্রচলিত নির্মাণ ও প্রদর্শন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে নতুন মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই নতুন মানুষের, নতুন ভাবনা-জারিত চলচ্চিত্রই হবে আমাদের নতুন সিনেমা। এখানে নির্মাতা ও দর্শক উভয়েই হবেন নবীন।

ফিল্ম : ডুবসাঁতার  । ফিল্মমেকার : নূরুল আলম আতিক
ফিল্ম : ডুবসাঁতার । ফিল্মমেকার : নূরুল আলম আতিক

নতুন সিনেমায় কী দেখতে চাই?

হোক এমন সিনেমা — যা আমাদের দেশ ও দেশের মানুষের ছবি; ঐতিহ্য-অনুসন্ধানী ও চলচ্চিত্র-ভাষার যথার্থ উপস্থাপনা। জীবনযাপন প্রক্রিয়ার সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে সিনেমার ভাষাভঙ্গিও। এই বদলে যাওয়া জীবনের চিত্রায়ণ ঘটুক পাল্টে যাওয়া ভাষাচিত্রে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুদ্রিত হোক সমকালীন বাংলাদেশ ও বিশ্বমানচিত্র।

সিনেমা সব মানুষের জন্য হোক, নারীপুরুষশিশু, ধনীগরিব সকলের জন্য । বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের জন্য তৈরি হোক ‘নতুন সিনেমা’। একই ছবি সকলের জন্য নাও হতে পারে; শিশু-চলচ্চিত্র যেমন থাকবে তেমনি তৈরি হোক পূর্ণবয়স্কের ছবিও। কেউ সিনেমার বিনোদন খুঁজে নিক নাচ-গানের প্রচলিত সিনেমায়, কেউ ডকুমেন্টারি কিংবা এক্সপেরিমেন্টাল ছবিতে। শিক্ষামূলক হোক কিংবা স্রেফ বিনোদন — যাই হোক, নতুন সিনেমায় যেন থাকে এই দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। আর তা হোক শয়নভঙ্গির মতো সহজ স্বাভাবিক। বিশ্বগ্রামের মাঝে আবহমান বাংলার গ্রামটুকুও জেগে থাকুক। জেগে জেগে ঘুমানোর দিন শেষ হোক। নতুন সিনেমায় বাংলাদেশের মুখ জলের সারল্যে মুদ্রিত হোক। অন্ধকার পর্দায় ফুটে উঠুক আলোর গান, প্রাণের কথা, মননের ভাষা।

কে বানাবেন নতুন সিনেমা?

পাঠক, আপনি নিজেও হতে পারেন এই নতুন সিনেমার নির্মাতা — পালাবদলের সিনেমার রূপকার। ফরাসি কবি-স্থপতি-চলচ্চিত্রকর জাঁ ককতোঁ সিনেমার মুক্তির জন্য যে প্রয়োজনের কথাটি বলেছিলেন আজ তা অনেকটাই হাতের কাছে চলে এসেছে — সিনেমা নির্মাণ সরঞ্জাম এখনও কাগজ কলমের মতো শস্তা না হলেও অনেক সহজলভ্য। অবশ্য, আপনি যদি প্রচলিত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কথা না ভাবেন। হলিউড, মুলিউড-এর সিনেমা নির্মাণব্যয় ত দিনকে দিন আরো বেড়ে চলেছে। এই দু’টি ইন্ডাস্ট্রিই এখন প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে তাদের বাজার সম্প্রসারিত করেছে। পাঠক, আপনি যদি সিনেমার দর্শক হয়ে থাকেন, সিনেমা নির্মাণের গোপন আকাক্সক্ষা আপনার মনেও বাসা বেঁধে থাকে ত — নতুন সিনেমা আপনার অপেক্ষায়ই আছে। শুধু প্রয়োজন সংযোগ স্থাপন । প্রয়োজন ধ্রুপদী সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা। জানাশোনা প্রয়োজন, সিনেমার টেকনিকের এবং অতি অবশ্যই আধুনিক টেকনোলজির। ব্যস, নিজের ভাবনাটুকু ও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে নেমে পড়ুন নিজের সিনেমাটি নির্মাণে। টাকা আসবে কোত্থেকে? কোটি কোটি টাকা সব সিনেমা তৈরিতে প্রয়োজন পড়ে না। যদি আপনি কোটি টাকার মালিক না হয়ে থাকেন, এরকম একজন প্রডিউসারের জন্য অপেক্ষায় সময় আপনি অপচয় করতে না চান ত, ছবিটি নির্মাণের পরিকল্পনা এখনই করে ফেলুন। অল্প খরচের ডিজিটাল টেকনোলজি আপনার এই নির্মাণ আকাঙ্খার সহযাত্রী হতে পারে।

ভূমিকা পর্বে টেলিভিশন নিয়ে সাতকাহন কেন করলাম তা এইবার পরিষ্কার করি। আগের দুইটি লেখায় বলেছিলাম — নতুন সিনেমা যাদের দিয়ে তৈরি হবার সম্ভাবনা রাখে সেই সব নির্মাতাদের একটি গ্রুপ আসবে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতাদের মাঝ থেকে। টেলিভিশন নাটক নির্মাতা ও বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের অনেকেই সিনেমার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। তাদের স্বপ্ন বড় হয়ে তারা সিনেমা বানাবেন। টাকাকড়িতে, জনপ্রিয়তায়, পুরস্কারে ও অন্যান্য অর্জনে তারা যথেষ্ট বড় হলেও তাদেরকে সিনেমায় হাজির হতে দেখি না। কারণটা আঁচ করতে পারি। সিনেমা বানিয়ে ওইসব অর্জনের জন্য যে সময় ধৈর্য ও স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে তা প্রোভাইড করবার যোগ্যতা আমাদের নেই। নেই নিজের প্রতিও পর্যাপ্ত বিশ্বাস। তবু নবীন নাট্য ও বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কিছু কাজ নতুন সিনেমার ব্যাপারে আশাবাদী করে রেখেছে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা, মেজবাউর রহমান সুমন, আশুতোষ সুজন, অনিমেষ আইচ, রাজীব কিংবা দীপংকর দীপনের টেলিভিশনের জন্য বানানো কিছু নাটক দেখে আমার এই বিশ্বাস এখনো অটুট আছে। কামরুজ্জামান কামু, শাহনেওয়াজ কাকলির মতো নির্মাতারাও এই পঙ্‌ক্তিতে যোগ হচ্ছেন প্রতিদিন। ভূমিকাপর্বে বর্ণিত বিবিধ সিনেমার তুলনায় বিষয়বস্তু বা আইডিয়ার নতুনত্বে এই নির্মাতারা বরং অনেক বেশি ক্রিয়েটিভ। নিত্যনতুন সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট বরং এই টিভি মিডিয়ামে বেশি দেখা যায়। এক্সপেরিমেন্টেশন বলতে যা বোঝায় তাও। কেন এরকমটা হলো? আবারো বলছি, দুইটি জেনারেশন এফডিসির গেট পোরোতে পারেনি বা রেগুলার ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নতুন সিনেমায় সময়ের, বাস্তবতার যে নতুন রূপায়ণ আমরা দেখতে চাই তা অলটারনেটিভ সার্কিট কিংবা বিদেশী অর্থপুষ্ট এনজিও ছবিতে অসম্ভব। ওইটিও বিজ্ঞাপনের মতোই ভাবনার পণ্যায়ণ ছাড়া কিছু নয়। এক্সপেরিমেন্টেশনের কথা বলছিলাম। এইটি সম্ভব হচ্ছে টেকনোলজির সহজলভ্যতা ও উন্নয়নের কারণে। এটি ডিজিটাল টেকনোলজি। এখনো পর্যন্ত যা কেবলমাত্র টেলিভিশন ও এনজিও প্রোডাকশনগুলোতেই ব্যবহৃত। টেলিভিশনের ওইসব নির্মাতা ছবি বানানোর সুযোগ এখনো ক’রে উঠতে পারেননি বটে, তবু তাদের নাটকে রয়েছে অনেক সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট। কেউ কেউ আবার তাকে ভিডিওছবি, ডিজিটাল মুভি ইত্যাদি নানা নামে ডাকতে শুরু করেছেন।

পাঠক, আপনি যদি টেলিভিশনের ব্যাপারে উৎসাহী না-ও হন তবু আপনি হতে পারেন নতুন সিনেমার পথযাত্রী। দর্শক, আলোচক, নির্মাণকর্মী, নির্মাতা যেকোনো ভাবেই। কারণ ইতোমধ্যে হয়ত আপনি সিনেমার পোকা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো পড়াশুনা করছেন সিনেমা নিয়ে, ফিল্মসোসাইটিগুলোতে ওয়ার্কশপ করছেন, কিম্বা এসবের কিছুই না — বাংলাদেশের সিনেমার পালাবদল চান, শুধু এইটুকু।

ডিজিটাল মুভি, সময়ের প্রয়োজন

যেহেতু টেলিভিশনের ওই সব নবীন নির্মাতারা ভিডিও, ডিজিটাল ভিডিওতে ওইসব কাণ্ডকারখানাগুলো করছেন তাই এই টেকনোলজির বিষয়ে আমার ঔৎসুক্য। তবু কোনো স্বতন্ত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন পদ্ধতিতে এদের ব্যবহার দেখা গেল না। দেশে সিনেমার প্রচলিত ৩৫মি.মি.-এ নির্মাণ ও প্রদর্শনের প্রক্রিয়াটির মধ্যে শেষ পর্যন্ত পর্দায় যে ইমেজ ও শব্দ ভেসে ওঠে তার অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো না হওয়ায় তুলনামূক কম খরচে ডিজিটাল ফর্মাটকে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে নবীন সিনেমা নির্মাতাদের জন্য। দর্শক শেষ পর্যন্ত ছবিটিই দেখে, ফর্মাট দেখে না। এই ফর্মাটে ফিল্মলুক তৈরি করতে ইদানীং ডেপথ্ অব ফিল্ড অ্যাডাপ্টর ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এডিটিং ও পোস্ট প্রোডাকশনের রয়েছে নানান কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থা।

ফর্মাট কোনো বড় বিষয় নয়; কোন ছবিটি আমি দেখছি তাই বিবেচ্য। দেশের বেশিরভাগ সিনেমা দর্শক যখন টিভি, ডিভিডিতে ছবি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তখন নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। দেশের সকল ক্ষেত্রেই নবীনের জয়জয়কার। পালাবদলের এই প্রক্রিয়ায় সিনেমা কেন বাদ পড়বে। আর টেকনোলজির সর্বত্র যদি আমরা ডিজিটাল অ্যাডভান্সমেন্ট অ্যাপ্রিশিয়েট করি ত সিনেমার বেলায় কেন নয়? পুরান ব্যবস্থাপনার বাইরে নতুন কিছু। তাতে যদি কিছু ঘটে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, আমাদের সিনেমায়। প্রোডাকশন, পোস্ট প্রোডাকশনের নানান টেকনিক্যাল সাপোর্টের চেয়েও বাজেটের বিষয়টি এই ডিজিটাল ফর্মাটকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। টেলিভিশন-ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি নির্মাণ প্রক্রিয়াকে হাজির করা ছাড়া বাংলাদেশের সিনেমার মুক্তি নাই। ডিজিটাল মুভির বিষয়টি অনেকে বাঁকা চোখে দেখবেন, তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের লাভালাভের কথা ভেবে। তবু এইটি সময়ের দাবি। সময়ই তার নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আচরণ করবে। এক্ষণ শুধু সময়ের ট্রেনটা ফেইল না করলেই হল।

ফিল্ম : টেলিভিশন  । ফিল্মমেকার :  মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
ফিল্ম : টেলিভিশন । ফিল্মমেকার : মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

গুণবিচার কে করবে?

শেষ পর্যন্ত দর্শকই সিনেমার তুল্যমূল্যবিচারক। দর্শক যদি ছবিটি দেখেন, নিজের পকেটের পয়সা ও হাতের সময়টুকু ব্যয় ক’রে তবেই এই নতুন ছবি আলোর মুখ দেখবে। যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় ত বুঝতে হবে কোথাও গলদ হচ্ছে। তবু, জেনে যাবার প্রয়োজন, প্রবণতাটি চিনে নেবার প্রয়োজন। কারণ, অন্যতর কোনো আয়োজনে ত আমাদের আর চলছে না। চাই নতুন সিনেমা।

একটি জরুরি প্রসঙ্গ — কেউ যদি এই ফর্মাটে বানানো টিভি নাটক বানিয়ে বলেন নতুন সিনেমা, ডিজিটাল ছবি তাহলে? আশঙ্কা অমূলক নয়। ইদানিং স্রেফ টেলিভিশনে পাত্তা আরো বেশি পাত্তা চাইবার প্রয়োজনে অনেকেরই ডিজিটাল সিনেমা নিয়ে মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তারো চেয়ে বেশি প্রয়োজন সিনেমা ও সময় সম্পর্কে এক ধরনের বোঝাপড়া। আবার যেন সেটা বোঝা হয়ে নিজের কাঁধেই না পড়ে। নিজের দেশ, সময়, সমাজ আর তার মানুষজনের মনোজগতকে উন্মোচন করবে, তার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে চিহ্নিত করবে এই রকমের বোঝাপড়া জরুরি। কী চাই, কেন চাই, কীভাবে চাই — এইটুকুন বোঝাপড়া ছাড়া এখানে না আসাই ভাল। আর চূড়ান্ত বিচারে দর্শকই বলবেন, কোনটা সিনেমা আর কোনটা নাটক। সিনেমা বলতে আমি কী বুঝি, কোন সিনেমা আমি দেখতে চাই, দেখাতে চাই। যন্ত্র কিছু নয়, উপলক্ষ্য মাত্র। সার্জিক্যাল নাইফ দিয়ে প্রাণউদ্ধারী কাজ যেমন করা হয়, প্রাণসংহারও করা সম্ভব। এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন — একটি নিরবচ্ছিন্ন সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়া, যা আমাদের নতুন দিগন্তের নিশানা দেখাবে। সেইটি এখন খুঁজে বের করাটাই নবীন নির্মাতার লক্ষ্য।

প্রযোজকের নাম গৌরী সেন?

সিনেমা করাটা গরীব লোকের কাজ না। সিনেমা করতে চাই টাকা, অনেক কিংবা কম; তবু টাকা ছাড়া ছবি হবে না। সিনেমা তৈরি করতে টাকা লাগবেই। শুধু টাকা নয়, আরো অসংখ্য মানুষের সহচর্যের প্রয়োজন। সিনেমা করিয়ের এই সহচরেরা কেউ অভিনেতা-অভিনেত্রী, কেউ কলাকুশলী, কেউ চিত্রনাাট্যকার-পরিচালক। পরিচালকের মাথার সিনেমাটুকুন পর্দায় হাজির হতে এই সহচরদের ওপর ভর করতে হয়। তার জন্য শুধু ভাবনাটুকুনই যথেষ্ট নয়, ভাবনার বিকাশের জন্য চাই অর্থ। নইলে সমস্ত ভাবনাই অনর্থ। অর্থটা যিনি যোগান তিনিই সিনেমা প্রযোজক, বলা ভাল ভাবনার যোগানদাতা। এটি তার ব্যবসা, পরিচালকেরও। যিনি পরিচালক তিনি নির্মাতা, যিনি অর্থযোগানদার তিনি বিক্রেতা আর দর্শক, আপনি ক্রেতা। ক্রেতা-বিক্রেতা-নির্মাতা এই তিনের সমন্বয় ঘটলেই ভাবনার বিকাশটুকুন পর্দায় ফুটে উঠতে দেখি।

পাঠক, আপনার অজানা নেই যে সিনেমাতে কেউ টাকা ঢালেন আরো বেশি টাকা ফেরত পাবার আশায়। সিনেমা বিনোদন। বিনোদনের আবেদন ছাড়াও সিনেমার আরো কিছু ক্ষমতা রয়েছে, সেইটুকুন দর্শককে না জানলেও চলে। সেটা কী? তা হলো সিনেমা আপনার প্রাণের, আপনার হৃদয়ের, আপনার মননের, আপনার মানবিক পরিচয়ের প্রকাশ ঘটায়। বিনোদন মানে শুধুমাত্র কিছু জৈবিক অনুষঙ্গ নয়। বিনোদন জীবনের পরিভাষাও। আমরা বলছিলাম, যিনি বিক্রেতা তিনি যদি আপনার কাছে এমন পণ্য বিক্রয় করেন যাতে আপনি প্রতারিত হবেন না, আপনার বিনোদনে কোনো ভেজাল দেবেন না তাকে নিশ্চই আপনি মনে রাখবেন। শুধুমাত্র সিনেমা হলে নয়, নিজগৃহেও তার কথা মনে পড়বে। আমাদের প্রয়োজন এইরকম প্রযোজক-এর, এ ধরনের বিক্রেতার যিনি কেবল মাত্র ‘টাকায় টাকা আসে’ — এই ফর্মুলা মাথায় না রেখে একটি ব্যবসা প্রকল্প চিন্তা করবেন। সিনেমার শতবর্ষ পার করবার পরেও সিনেমা কি আর্ট না ইন্ডাস্ট্রি — সেই সংকট নিয়ে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়। আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রির একটি আশ্চর্য প্যাচ আমাদের বাংলাভাষায় রয়েছে — ‘শিল্প’। বাংলাভাষায় শিল্প আর্টের সমার্থক যেমন তেমনি ইংরেজী শব্দ ইন্ডাস্ট্রিরও পরিভাষা। কারো জন্য সিনেমা কেবলই ইন্ডাস্ট্রি, কেউ কউ বলে সুখ পান যে সিনেমা একটি আর্ট। কেউ কেবল শরীরের কথা বলবেন, কেউ আবার মনের ডাক্তার। শরীর আর মনের যুগপদ সম্পর্কটুকুন রচনা করে যিনি আজকে সিনেমার জন্য টাকা ঢালবেন সেই মানুষ আজ বড় প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীর কি এমন দায় ঠেকলো? কেন তিনি নতুন সিনেমায় অর্থলগ্নি করবেন। সকলে করবেন না, কেউ কেউ করবেন। এই কেউ কেউ কারা? তাদের চিনে নেয়া, খুঁজে নেয়া — সংযোগ স্থাপন করবার প্রয়োজন আছে নির্মাতার, যিনি এতটুকুন যত্ন নিয়ে তার অর্থ ব্যয় করবেন, অনর্থপাত করবেন না, কিছু অর্থ তৈরি করবেন। সুযোগ পেয়ে, বিক্রেতার কাঁধে বসে যা-কিছু বিক্রি করবার বাসনাটা নতুন সিনেমার নির্মাতার না ঘটুক। আমাদের জানবার কথা কে টাকা দেবেন, নতুন সিনেমার প্রযোজনা করবেন? বলছি সেই মানুষটির কথা যিনি এ মুহূর্তে অন্য যেকোন পণ্য বিক্রয় করুন না কেন তবু সিনেমা নিয়ে তার কিছুমাত্র কৌতূহল এখনো রয়েছে। একটি ছবি নির্মাণ করে তার সামাজিক অবস্থান আরো একটু শক্ত করে নেওয়া, নাকি বিশ টাকা ব্যয় করে চল্লিশ টাকা আয় করবার রাস্তা খোঁজা?। নাকি একটি পুরস্কার তার ঘরে শোভা পাবে এই ভেবে অর্থলগ্নি — না হোক ব্যবসা বাণিজ্য, নাকি কোনো প্রিয়জনের জন্য একটি উৎসর্গ-স্মারক হয়ে থাকবে এই সিনেমা? প্রেমের বেসাতি অথবা পছন্দের নায়িকার সাহচর্য? যাই কিছুই ঘটুক, আমাদের নতুন সিনেমার জন্য নতুন প্রযোজক বড়ই প্রয়োজন।

পাঠক, আমরা নতুন সিনেমার চরিত্র কী হবে সেইটি নিয়ে পূর্বেই কিছু কথা চালাচালি করেছি কিন্তু, তা কেবল ভাবনা মাত্র। কবে আমরা নির্মাতা-বিক্রেতা-দর্শকের সম্পর্কটুকু যাচাই করতে শিখবো। পাঠক, আপনার আজ ইলিশ খাওয়ার শখ, বাজারদর জানা আছে? বুঝলাম আপনার পকেটে অনেক পয়সা — এখন কি ইলিশের সিজন? আচ্ছা, তাও বুঝলাম এই শর্তগুলো পূরণ করা গেল। আপনি কি তেমন রাধুনী, যা ইলিশকে ইলিশ ইলিশ করে তুলবে? বাংলাদেশের সিনেমায় আজ যারা দর্শক তারা আমাদের একমাত্র পাঠক নয়, পাঠক-দর্শক তারাও যারা এখন আর বাংলাদেশের সিনেমা দেখেন না। শুধুমাত্র দেশী ইলিশের মতো দিশি সিনেমার ইলিশ ইলিশ গপ্পবাজী করেন আমরা তাদেরকেও সিনেমা দেখাতে চাই। কিন্তু এই চাওয়াটা আপাতত অমূলক, কারণ এখন সেই ইলিশ-এর সিজন নয়। নদীতে কারেন্ট জাল ফেলেও সেরকম একটি ইলিশও আর পাওয়া সম্ভব নয়। রূপকার্থে অনেক কথা বলা হলো। বাস্তব তার থেকে অনেক বেশি ইট ইট, ইলিশ ইলিশ নয়।

কী সেই বাস্তব? এমন কোনো প্রযোজক এখন আর নেই যিনি একটি নদী ও নারী বানাবেন, যিনি এদেশে এই নদীবর্তী মানুষকে বেহুলা উপহার দেবেন। এইবার একটু দুষ্টু কথা বলা যাক। প্রচলিত সিনেমা প্রযোজনা খারাপ লোকেদের কাজ। টাকার বিবিধ রং তবু সাদা-কালো টাকা বলে কিছু রয়েছে; সিনেমা কালো টাকাকে সাদা করবার একটি প্রক্রিয়াও। হ্যাঁ, পাঠক এইটি কেবল মাত্র দেশী ইলিশের মতো নয় — বিদেশীর ইন্ডাস্ট্রি সঙ্গী হয়ে থেকেছে এই শিল্প কিংবা কারখানায়। কালো ধোঁয়া ছেয়ে আছে সারাটা সময় জুড়ে। তবু কেন আমরা সিনেমার জন্য এত কথা বলি? কারণ এই সাদাকালো আমাদেরকে অনেক রঙিন কিছু স্বপ্ন দেখায়। তার জন্যেই আজকের নতুন সিনেমা যিনি করতে চান তিনি হয়ত গতকাল কবি ছিলেন। ভবিষ্যতে হয়তো সিনেমাও একই রকমভাবে একটি বেকার শিল্প হয়ে উঠবে — সে বিষয়ে আমাদের এক্ষণ মাথাব্যথা না করলেও চলবে। যতটুকু দেখা যাচ্ছে দৃশ্যে এবং দৃশ্যায়ণে, তাই নিয়ে কথা হোক। বেশি বেশি হলেও তবু আরেকবার বলা হোক — আমরা এখনো সিনেমার স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নদ্রষ্টা হচ্ছেন সেই নির্মাতা যিনি আমাদের কী নাকি দেখাবেন — যা তিনি নিজে দেখেছেন।

কিন্তু দর্শক, দেখতেও পয়সা লাগে, দেখাতে আরো বেশি লাগে। যিনি দেখাবেন তার খরচ বেশি, স্বপ্নটা তাকেও দেখতে হবে। প্রয়োজন এমন প্রযোজক যিনি শীতের ভোরে কুয়াশায় পা মেলবেন সেই পরিচিত ঘাসে, হয়ত শিশিরবিন্দু তার কাছে কিছুটা জীবনের অন্যতর অর্থ এনে হাজির করবে। ঐ শিশিরবিন্দুর জন্য যিনি একদিন প্রযোজক হয়ে উঠতে পারবেন, আমরা তার জন্য অপেক্ষায় থাকবো, থাকবো অপেক্ষায় সেই শীতের ভোরের জন্য। কিন্তু দর্শক, ব্যবসাটা কোথায়? যিনি টাকা ঢালবেন তার টাকাটা ফেরত দেবে কে? এই দায়টুকুন নির্মাতার এবং আপনারও।

শিশিরবিন্দুতে পা ভেজানোর গল্প অনেক হলো, এবার আসল কথায় আসি। কী সেই কথা? কথা হলো তিনি আজকে কী করে ব্যবসা করবেন — নতুন সিনেমায় সেই কথা তাকে জানান দেওয়া। তুলনামূলকভাবে কম টাকায় একটি সিনেমা তৈরি করে ব্যবসায়িকভাবে অধিকতর লাভবান হবেন এই কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কিন্তু এই প্রযোজক যদি এই সময়ের মানুষ হন, নির্মাতার এবং দর্শকের প্রায় সমবয়েসী হন আর চিহ্নিত করতে পারেন সময়ের চাহিদা তাহলে তার বাণিজ্যে বেসাতি অসম্ভব না। আর কে না জানে বাণিজ্য ছাড়া ব্যবসায়ীর অন্য কোনো ধর্ম নেই। নতুন সিনেমার প্রযোজক ধর্মে থাকুন, পরিচালক যদি নিজ ধর্ম পালন করেন, দর্শক যদি অধর্মাচারণ না করেন তবেই নতুন সিনেমার পালাবদল সম্ভব। তিন পাগলের মেলা সাঙ্গ হতে পারে।

নতুনের চিত্রভাষা: টেকনিক ও টেকনোলজি

ছবি কীভাবে নির্মাণ হয় সে বিষয়ে কৌতূহল থাকলেও দর্শকের তার খুঁটিনাটি জানবার প্রয়োজন নেই। এটি নির্মাতা দল, কলাকুশলীদের বিষয়। নির্মাতা পরিচালক কী কৌশলে তার বলবার কথাটুকুন হাজির করবেন, কোন ভাষাভঙ্গি ব্যবহৃত হবে সেটি তার ব্যক্তিগত রুচি ও মেধার প্রশ্ন। সিনেমা একটি জটিল নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। তাই তাকে এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। প্রি-প্রোডাকশন, প্রোডাকশন, পোস্ট-প্রোডাকশন-এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানা অবশ্য জরুরি। এটি একটি ইন্ডাস্ট্রি গ্রেড-এরও প্রশ্ন। প্রতিটি পর্যায়ের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক দুই ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনেরও প্রশ্ন।

পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতো এখানেও প্রতিটি স্তরে আধুনিক যন্ত্রপাতির সমাবেশ ঘটছে। এই মুহূর্তে আমরা সিনেমার জন্য আনুষঙ্গিক কোনো যন্ত্রপাতি নির্মাণের প্রক্রিয়ায় হাজির নেই, কেবলই ব্যবহারকারী মাত্র। এই যেমন ধরেন, আমরা এই কথাগুলো লিখছি যে কম্পিউটারে তা আমাদের আবিষ্কার নয়, এমনকি যে যন্ত্রে এটি মুদ্রিত হবে তাও ইম্পোর্টেড। আমি তো লিখছি বাংলা ভাষায়! — অন্ততঃ এভাবে হলেও আমরা সমকালীন যন্ত্রাণুষঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারি। একইভাবে সিনেমার কথাটা ভাবুন। পরিচালকের মাথায় যে গল্পটি ঘুরপাক খাচ্ছে তার পাত্রপাত্রী, জায়গাজমিন এই দেশের জল হাওয়ায় জারিত হবে স্বাভাবিক কথা। দর্শকের কাছে ঐ ভাবনাটুকু পৌঁছে দিতে পরিচালক যেসব যন্ত্রাণুষঙ্গের মুখোমুখি হবেন, তার প্রতিটির ব্যবহারবিধি পরিষ্কার জানাটা জরুরি কেন? প্রত্যেকটি যন্ত্রই আবিষ্কৃৃত হয়েছে মানুষের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনে। আমি যদি একটি সুনির্দিষ্ট মডেলের ক্যামেরার ক্যাপাসিটি এবং পসিবিলিটি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে না পারি তো নতুন ভাবনার দৃশ্যায়ন কী ক’রে সম্ভব?

তাই আজকে যিনি ছবির পোকা মাথায় নিয়ে ঘোরেন, তাকে প্রথমেই জেনে যেতে হবে সমকালীন টেকনোলজিক্যাল সাপোর্টের কতটুকু তার নাগালের মধ্যে। এই জেনে নেওয়ার, শিখে নেওয়ার রাস্তা একটাই — কাজ করা। করে করে শেখা। ভাবনা শেখানোর স্কুল না থাকলেও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার শিখবার কিছু কিছূ পাঠ্যক্রম দেশে এখন অত দুর্লভ নয়, আবার তা যথেষ্টও নয়। সিনেমার টেকনিক ঘরে বসেই জেনে নেওয়া যেতে পারে বারবার ছবি দেখে, বই পড়ে কিন্তু দক্ষতা অর্জন চর্চার বিষয়। যে সিনমাটিক-মোমেন্টের কথা ভেবে ভেবে পরিচালক সুখ পাচ্ছেন তা কি আদৌ দর্শকের কাছে হাজির করা যাবে — যদি আমরা টেকনোলেজিটুকু না জানি? ক্যামেরা, সাউন্ড-ডিভাইস, এডিট প্যানেল, কালার কারেকশনের মতো পোস্ট প্রোডাকশনের নানান যন্ত্রপাতি এখন এদেশে সুলভ। তা ডিজিটাল। টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি আর এনজিও-র কল্যাণে ডিজিটাল টেকনোলজির আমদানি ঘটেছে, ঘটছে। এখন প্রয়োজন আরো একটু মনোযোগী হয়ে সিনেমা নির্মাণে এই যন্ত্রপাতিগুলো নিজের সহজ স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসাবে গড়ে তোলা। নতুন নির্মাতা যেন জানেন — কোন টেকনোলজির সাপোর্ট নেবেন এবং কী তার ইমপ্যাক্ট হবে দর্শকের মনে। একটু খোঁজখবর করবার মতো কৌতূহলী হতে হবে, এইমাত্র।

ফিল্ম : জালালের গল্প । ফিল্মমেকার : আবু শাহেদ ইমন
ফিল্ম : জালালের গল্প । ফিল্মমেকার : আবু শাহেদ ইমন

কে দেখবে, কেন দেখবে?

নাচ, গান যিনি করেন — নিজের জন্য করেন, অন্যের জন্যও করেন। শিল্পের প্রতিটি শাখায় আমরা শিল্পীকে দেখি প্রথমতঃ তার নিজের নান্দনিক বোধ প্রকাশে মগ্ন থাকতে। আবার যখন তা ক’রে খেতে হয় তখন তা অন্যের কাছে এনে হাজির করবার, বিক্রী করবার প্রয়োজন পড়ে। এখানে যে দেখায় এবং যে দেখে তার সম্পর্কটা তখন ক্রেতা-বিক্রেতার। বিনোদনের বিক্রী-বাট্টার সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিটি এই সিনেমা।

নতুন সিনেমা কে দেখবে? সিনেমা দেখে সকলেই তবে তাদের কেউ কেউ কেবল হলে গিয়ে দেখে; সংখ্যাটা দিনে দিনে কমছে বই বাড়ছে না। তাই বলে সিনেমা দেখা তো থেমে নেই। আমরা যে সিনেমার সম্ভাবনার কথা বলছি, তার দর্শক শুরুতে খুবই সীমিত পরিসরে ঘটবে — এর থেকে বেশি প্রত্যাশা না করাই ভালো। আরো পরিষ্কার করে বললে, দর্শক হবেন কেবল নবীনেরা — নতুন জেনারেশন, নেক্সট জেনারেশন। তাদের রুচি, আকাক্সক্ষার সঙ্গে নতুন সিনেমার মেলবন্ধন ঘটলে চর্চাটা চালু থাকবে, অভ্যস্ততা তৈরি হবে। এই নবীন দর্শক একসময় বেড়ে উঠবেন, পরিবার-সমাজের দায়িত্ব নেবেন তখন হয়তো তাকে প্রবীণের প্রতিনিধি হিসেবে পেতে পারি। নতুন সিনেমার টার্গেট অডিয়েন্স এখনো পর্যন্ত নতুনেরাই।

পাঠক, এইবার এই টার্গেট অডিয়েন্স-নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। প্রথমতঃ স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ক্লাব, কালচারাল সেন্টার, মার্কেট, পার্ক, এইসব জায়গায় এদের ঘোরাফেরা — বিবিধ বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং খুঁজেও নিয়েছে তারা নিজ নিজ অভিরুচি মতো। টিকেট কেটে কনসার্ট দেখা, কফিশপে আড্ডাবাজি, গলির চা-দোকানের তর্ক-বিতর্ক, খেলাধূলা, টিভি দেখা, কম্পিউটার, নেট-সিডি-ডিভিডি আরো কত কী! এই জেনারেশন টিভির মুভি চ্যানেল, কম্পিউটার ডিভিডি প্লেয়ারে দেশী-বিদেশী ছবি দেখলেও খুব কমই আসে সিনেমা হলের কিউতে। কেন আসে না? সেটা বোধ করি এতক্ষণে আমরা সকলে জানি।

নেক্সট জেনারেশন কি এই নতুন বিনোদন কিনবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য রাখে? তাকে যদি আকৃষ্ট করবার মত কা-কারখানা নতুন সিনেমায় ঘটানো যায় ত কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে ট্রেন্ডি হয়ে উঠবার যে প্র্যাকটিস সে করে, তাতে প্রযোজকের ঘরে টাকা ফিরে আসবে শুধুমাত্র এই টার্গেট অডিয়েন্সের ওপর ভর করেই। তাই শুরুতে প্রয়োজন এই জেনারেশনের মনোজগতের চেহারাটুকু স্পষ্ট করে জানা, তাকে চিনে নেওয়া। একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য যা কিছূ প্রয়োজন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার খোঁজখবর চলছে চারিদিকে — ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে, সমাজ-রাষ্ট্রীয়ভাবেও। একই অন্বেষণে এই নতুন সিনেমার বয়ান এই জেনারেশনের জন্য, নেক্সট জেনারেশনের জন্য, সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যও। সুস্থ, স্বাভাবিক মনন বিকাশের, আনন্দের একটি আবহ যদি তৈরি করা যায় তবেই দর্শককে আবার সিনেমা দেখতে হলে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।

কে দেখাবে? প্রদর্শন ব্যবস্থা কী হবে? কোথায় প্রদর্শিত হবে?

যিনি প্রদর্শক তিনিই তো দেখাবেন। এটি তার ব্যবসা। তিনি হলের মালিক হতে পারেন কিংবা কেবলই প্রদর্শক এজেন্ট। অথবা কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম এই কা-টি করবে। নির্মিত ছবিটি যদি প্রযোজকের টাকা ফেরত পাবার মতন হয়, তবে প্রদর্শক গড়রাজি হবেন কেন, এটি তারও বাণিজ্য। পূর্বের একটি লেখায় আমি প্রদর্শন ব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম — যেটি এখন বিস্তারিত করি। বড় মার্কেটগুলোতে ইদানিং মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল তৈরি হচ্ছে কিন্তু সেগুলো দু’একটি বড় শহরেই কেবল হচ্ছে।

ধরা যাক, বছরে এই টার্গেট গ্রুপের জন্য বিশটি ছবি নির্মাণ করা গেছে। বিভাগীয় শহর ও বড় শহরগুলোতে ছোট ছোট হল নির্মিত হতে পারে যেখানে এইসব ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ পেশাজীবিদের উপস্থিতির সম্ভাব্য সংখ্যাটি হাজির রয়েছে। যদি ঐ বিশটি ছবি নির্মাণ করা যায় এবং দুই’শ সিটের বিশটি হল নির্মিত হয়, তাহলে পুরো নির্মাণ ও প্রদর্শন সংক্রান্ত কাজটি সম্পূর্ণ করা যেতে পারে। এই বিশটি হলের চেহারা কেমন হবে সেইটি মূল বিবেচনার বিষয় এইক্ষেত্রে। চেইন-স্টোরের মতো ক’রে কোনো একটি প্রদর্শক গোষ্ঠী একাই বিশটি হল নির্মাণ করতে পারেন আবার স্থানীয়ভাবে নবীন ব্যবসায়ীদের উৎসাহী করে তোলা যেতে পারে।

যদি অডিয়েন্সের টার্গেট গ্রুপের কথা বিচার করি তাহলে, হলের আর্কিটেকচার, প্রজেকশন সিস্টেম, সিট ব্যবস্থা, পারিপর্শ্বিক এমন অন্যান্য অনুষঙ্গ — এমনকি টয়লেট, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুনত্বের প্রকাশ থাকা প্রয়োজন। ডিজিটাল ছবির জন্য ডিজিটাল প্রজেকশন হল — এই হলগুলো হয়ে উঠতে পারে ইয়ং জেনারেশনের ক্রেজ। হলসংলগ্ন ছোট্ট একটি ফুডকোর্ট থাকা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি ইন্টারনেট, সিডি-ডিভিডির ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ। ছোট আকারের এই ছোট ছোট ইউনিট নতুন সিনেমা হলের মডেল হয়ে উঠবার সম্ভাবনা রাখে। ছবিটি চাই সবার আগে।

আমার বিশ্বাস, নতুন সিনেমার প্রযোজনা ও প্রদর্শনের এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যদি এই মুহূর্তেই ভাবতে চান, অর্থলগ্নী করেন তিনি আখেরে পস্তাবেন না। সময়ের পালাবদলে পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনাগুলোর রিপ্লেসমেন্টের প্রত্যাশা অনেকেরই। প্রচলিত সিনেমা হলের বিশাল আয়োজন এখন দর্শকের অভাবে জগদ্দলের মতো চেপে বসেছে অনেক হল-মালিকের কাছে, পরিণামে সেখানে হল ভেঙে মার্কেট গড়ে উঠছে। গত বছরগুলোতে দেশের মানুষের মার্কেটমুখীনতার কথা ভাবলেও ব্যবসায়ী মহল নতুন সিনেমা নিয়ে এই ধরনের ব্যবসায়ী প্রকল্পের কথা যে একেবারে ভাবেননি এমন নয়, কিন্তু ব্যাপারটি ত্রিমুখী বলেই নির্মাতা, দর্শক এবং ব্যবসায়ী — এই তিনের সংযোগ ঘটা প্রয়োজন একই সময়ে। সেই সংযোগ যত দ্রুত ঘটে, ততই মঙ্গল। পাঠক, এ বিষয়ে আপনার নিজের আওতায় থাকা সংযোগ সূত্রগুলো কাজে লাগাবেন — এমনটাই প্রত্যাশা। এতক্ষণে আপনি নিজেও নতুন সিনেমার সহযাত্রী হয়ে উঠেছেন।

টেলিফিল্ম : তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে । ফিল্মমেকার : মেজবাউর রহমান সুমন
টেলিফিল্ম : তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে । ফিল্মমেকার : মেজবাউর রহমান সুমন

নতুনের দায়, ডিজিটাল যুগে এই বাংলায়

মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন তাকে দেখতেই হয়। আর এই বাংলার মানুষেরা ত স্বপ্নভূক। ভুখা, নাঙ্গা, দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্ঠীর এই স্বাপ্নিক মানুষেরা অসংখ্যবার স্বপ্নভঙ্গের হাহাকারে জর্জরিতও হয়েছে। তবু স্বপ্নের শেষ নেই।

কীসের স্বপ্ন? প্রথমতঃ খুবই সামান্য স্বপ্ন — খেয়ে পরে বাঁচবার স্বপ্ন। তার সন্তান একটি সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকুক তার স্বপ্ন। ক্ষুধামুক্তির স্বপ্ন। মাতৃভূমির স্বপ্ন, মাতৃভাষার স্বপ্ন এদেশের মানুষকে প্রাণ উৎসর্গ করবার যে প্ররোচণা দেয় তার প্রতি দায়টুকু বর্তাবে নতুন সিনেমা করিয়ের কাঁধে। নতুন সিনেমায় যা-খুশি হবে সিনেমার নামে, তাও এই নতুন দর্শক মেনে নেবে না। আমরা যাদেরকে টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে কল্পনা করছি সেই তরুণ প্রজন্মের পূর্বসূরীরাই এই দেশে অগণিত দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

তাই আজকের নির্মাতা অন্তরের গরিবিয়ানাটুক হারাবেন, আর অর্জন করবেন মানুষের স্বাধীনতাটুকু। পাঠক, আপনি যদি শিল্পী হন, নির্মাতা হন, আপনি বলতেই পারেন — শিল্পীর আবার দেশ-কাল বিচারের কী আছে? সিনেমা সারা পৃথিবীর মানুষের। হ্যাঁ, শিল্পের কোনো আঞ্চলিকতার দায়বদ্ধতা নেই, শিল্পের ভাষা নিজস্ব। তবু এইখানে সজাগ থাকবার দরকার আছে নতুন নির্মাতার। তার নিজের পরিবারের, পরিপার্শ্বের, দেশের, পৃথিবীর মানুষের কী কী প্রবণতা তাকে প্ররোচণা দেয় সিনেমা তৈরি করতে, সেইটি যাচাই-বাছাই ক’রে একটি দায়িত্ব তাকে নিতেই হবে।

কী সেই দায়িত্ব? প্রথমতঃ যে ছবিটির ভাবনা মনে উদয় হয় তাকে পুরো প্রক্রিয়ায় সঞ্চালিত হতে দেখবার প্রতিটি মুহূর্তে যেন আমি ভুলে না যাই — আমি কে, কোথা থেকে এসেছি। কেন, কীভাবে এই কর্মযজ্ঞে সামিল হচ্ছি তাও পরিষ্কার জানবার প্রয়োজন আছে। এতসব বাৎচিতের মূল কথা হলো — জীবনের এইসব অনুষঙ্গ না জানলে জীবনের থেকে কিছু বড় নির্মাণের স্বপ্নটুকু বেকার হয়ে উঠবে। পর্দায় দারিদ্রপীড়িত মানুষগুলো মানুষ না হয়ে খড়ের পুতুল হয়ে উঠবে — পাপেট, জড়, অনড় কিছু। তরুণ মনের অন্তর্গত আকাক্সক্ষাগুলোকেই কেবল ব্যবহার না ক’রে তাকে নিরন্তর শুভ কিছুর দিকে চলার পথসঙ্গি করে নেওয়া। দেখার চোখ না থাকলে স্বপ্ন অন্ধ হতে বাধ্য।

অন্যকে প্রতারিত করে নিজের সমৃদ্ধির চেষ্টা যে কী পরিণাম বয়ে আনে তার নমুনা এই জেনারেশন জানে। মজার ব্যাপার হলো, এরা তো ঐ দুর্নীতিবাজ, ব্যবসায়ী, আমলা, কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদদেরই সন্তান। এবং তারা এতদিনে এই ব্যাপারটি জেনে গিয়েছে, নিজস্ব অভিব্যক্তিটুকু হাজির করতে শুরু করেছে। অর্জনের নামে যত আস্ফালন চারিদিকে ঘটতে দেখেছে যে তারা পূর্বসূরীর কথামালায় আর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না। সমাজ গবেষকরা এই জেনারেশনকে সাংস্কৃতিক পরিচয়বিহীন একটি ননপলিটিক্যাল এন্টিটি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন; তাতে কিচ্ছু আসে যায় না; যদি না তারা নেশার ঘোরে নিজেদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে। তাহলেই অদূরভবিষ্যতে নতুন সিনেমা প্রাণ পাবে।

গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধানের মিথ চালু আছে অসংখ্য দিন ধরে; সেটা কি মিথ না মিথ্যা, নাকি তা আবারও দিবাস্বপ্নে ঠেলে দেবার প্রবণতা — সেইটি চোখ কান খোলা রেখে দেখবার মতো মনোযোগী একজন মানুষ চাই এই নির্মিতির পালাবদলের সিনেমায়। ক্ষুধা বা দারিদ্রকে মিউজিয়ামে পাঠানোর স্বপ্নের আগে জরুরি অন্তরের গরিবিয়ানাটুকু ঝেড়ে ফেলা। বাংলাদেশী নাকি বাঙালী জাতীয়তাবাদ — এই টানাহেঁচড়ার রাজনীতিতে এই জেনারেশনের কোনো কৌতূহল নেই। নিজঘরের সেইসব ঝগড়াঝাটি দেখে সে বাইরে চোখ মেলতে শুরু করেছে। ঘর-বাহিরের এই টানাপোড়েনে এই জেনারেশন বিভ্রান্ত হবে না এইটি আমাদের প্রত্যাশা। নিজেকে চিনে নেবার, জেনে নেবার, করণীয় কী তা নির্ধারণ করবার স্বাধীনতাটুকু সে দাবি করবে। পাল্টে দেবার ক্ষমতা রাখে সে — বয়সের জোরে, তারুণ্যের জোরেই। আমাদের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সমস্ত পালাবদলে এই তরুণেরাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। সিনেমার পালাবদলটাও ঘটবে তাদের হাতে। পাঠক, আপনিও নতুন, সিনেমার — পালাবদলের সিনেমার জন্য একজন জরুরি মানুষ। এবার নিজের ভূমিকাটুকু খুঁজে নিন।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার । ডিজিটাল ফিল্ম : ডুবসাঁতার [২০১০]; পেয়ারার সুবাস [পোস্ট-প্রোডাকশন]; লাল মোরগের ঝুটি [পোস্ট-প্রোডাকশন]। টেলিফিল্ম : সাইকেলের ডানা; চতুর্থমাত্রা; বিকল পাখির গান প্রভৃতি

১টি কমেন্ট

  1. […] একটানা এগারো বছরের বেশি থেকেছি। অাতিক অার শুকু যখন ওই বাসা ছাড়ে, তারপর উঠি […]

মন্তব্য লিখুন