চান্তাল আকেরমানের সঙ্গে আলাপ । কিস্তি-৬ [৭]

0
53

সাক্ষাৎকার গ্রহণ । নিকোল ব্রেনেজ
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
চান্তাল আকেরমান [৬ জুন ১৯৫০-৫ অক্টোবর ২০১৫]। বেলজিয়ান ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম স্বতন্ত্র বিপ্লবী অ্যাকটর-ডিরেক্টর। ২০১১ সালের গ্রীষ্মকালে, সদ্যনির্মিত সিনেমা “আলমেয়ার’স ফলি”র সূত্রধরে, নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারটির ষষ্ঠ কিস্তি প্রকাশিত হলো এখানে…
আগের কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন এই বাক্যে


চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান

সা ক্ষা ৎ কা র

প্রসঙ্গ : উপন্যাস ও ফ্যামিলি রোমান্স

নিকোল ব্রেনেজ •
আলমেয়ার’স ফলিতে মার্ক বার্বে ও স্তানিস্লাস মোর্হা একই পিতা-চরিত্রের দুটি চেহারার প্রতিনিধিত্ব করেছেন; এদের একজন এক দুষ্ট হুইলার ডিলার, আর অন্যজন এক নিষ্ক্রিয় প্রেমিক– যে প্রথমজনের রোমাঞ্চের স্বপ্নগুলোতে নিজেকে গুম হয়ে যেতে দেয়; তারা দুজনেই মেয়ে– নিনার ঠিক একই রকম খেয়াল রাখে। অন্যদিকে, আমরা জানি না কেন আলমেয়ার নয়, বরং লিংগার্ডই [মার্ক বার্বে অভিনীত চরিত্র] নিনার ভরনপোষণের খরচ দেয়।

চান্তাল আকেরমান •
আমি এভাবে ভাবিনি। এটি এসেছে উৎস-গ্রন্থটি থেকে। তবে স্তানিস্লাসের চেয়ে বার্বের মধ্যেই পিতৃ-ভাবমূর্তিটি অধিক ফুটে উঠেছে। সে খারাপ বাবা– এ কারণেই তার গায়ে আমি একটি টাক্সেডো [নৈশভোজে পরিহিত বিশেষ জ্যাকেট] পরিয়ে দিয়েছি; যেন আমরা ভাবতে পারি, সারারাত সে সরাইখানাতেই কাটায়। স্তানিস্লাসের মতো কিশোরবয়স্ক সে নয়; পুরুষের ধারণ করা সকল জঘণ্য প্রবণতা সহকারে সে একজন পুরুষ, এবং টাকা কামানোর জঘণ্য স্বপ্নে সে বিভোর– যে টাকা দিয়ে আলমেয়ারকে সংক্রমিত করতে সক্ষম।

নিকোল ব্রেনেজ
কনর‌্যাডের বইটিতে, তরুণ লোকটির চরিত্র– দাইন’ই কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তুলনামূলকভাবে অধিক ভূমিকা পালন করেছে। সিনেমাটিতে আমরা তার দেখা সামান্য সময়ের জন্যই পাই।

চান্তাল আকেরমান •
তাকে নিয়ে আরও বেশকিছু দৃশ্যের শুট করেছিলাম ঠিকই, তবে সেগুলো ফিল্মটির জন্য ওভারলোডেড ছিল। আসলে, দাইনের অস্তিত্ব রয়েছে চায়নিজ লোকটির স্বপ্নগুলোতেই; কেননা, সে নিনার ভালোর জন্য স্বপ্ন দেখে। দাইনের সঙ্গে নিনার দেখা হওয়ার একটি চমৎকার ও মধুর দৃশ্য আমি রাখতে চেয়েছিলাম।

নিকোল ব্রেনেজ
উপন্যাসটিতে দাইন একটি উপনিবেশবিরোধী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়। সিনেমাটিতে আপনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, সে এমনই এক রাষ্ট্রদ্রোহী– যার কাজ মাদক কিংবা অস্ত্রের চোরাকারবারি করা। কনর‌্যাডের উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট হিসেবে রয়েছে স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই, সেটির কোনো ইঙ্গিতই ফিল্মটিতে নেই। চরিত্রটিকে এতটা খর্ব করে দেওয়াটা কি অপচয় নয়?

চান্তাল আকেরমান
আলমেয়ার’স ফলি
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

চান্তাল আকেরমান •
তা না হলে দেশটির ইতিহাসের মধ্যে ঢুকে যেতে হতো। সেটি তাহলে আরেকটি সিনেমা হয়ে যেত।

নিকোল ব্রেনেজ
সিনেমাটির প্রথম দৃশ্যটির উৎস কী? এটি তো বইয়ে ছিল না। আপনি কি এটি অন-লোকেশনে ইমপ্রোভাইজ করেছেন?

চান্তাল আকেরমান •
না, এটি স্ক্রিপ্টেই ছিল। নিনার গানটির বেলায়, কোনো তেলচিটে নাইটক্লাবের একটি খ্রিষ্টধর্মীয় গান হিসেবে মোজআর্তের ‘আভে ভেরাম’ গানটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি ইতস্তত ছিলাম; তবে এটি একেবারেই দুর্দান্ত রকমের মনোরঞ্জক ও মানানসই হয়ে উঠেছে। স্কুলে আমার শেখা অল্প কয়েকটি গানের একটি এটি।

নিকোল ব্রেনেজ
নিগ্রহ ও আইনের উৎস হিসেবে, ফিল্মটির মধ্যে মাদার সুপারিয়রের কণ্ঠস্বরটি নিজেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

চান্তাল আকেরমান •
সিদ্ধান্তটি আমি নিইনি। শুটিং করার মুহূর্তে কেউ একজন বলল, ‘তুমিই করো’। আমি যে বলছি, “‘সে’ তো আমাদেরই লোক”– এটি আমার বাবার মুখের বুলি।

নিকোল ব্রেনেজ
আমি ভেবেছিলাম, টড ব্রাউনিংয়ের ফ্রিকস [১৯৩২] সিনেমার বুলি এটি; সেই ভয়ঙ্কর নিবারণটি : ‘আমাদেরই লোক’।

চান্তাল আকেরমান •
না, এটির উৎস আসলে আমার বাবার সবসময় জিজ্ঞেস করা একটি প্রশ্ন থেকে এসেছে– ‘সে কি আমাদেরই লোক?’

চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান

প্রসঙ্গ : পাজামা

নিকোল ব্রেনেজ
শুটিংয়ের দিনগুলোতে কমিউনাল লাইফস্টাইলের ব্যবস্থাটি আপনি কীভাবে করেন?

চান্তাল আকেরমান •
প্রত্যেকটি সিনেমাই আলাদা, এবং সেটি তার নিজস্ব জীবন, নিজস্ব ভিত খুঁজে নেয়। নিয়মনীতিগুলোও নিজের মতো করে বিকশিত হয়। এসব বলে-কয়ে হয় না; এমনকি এর মানে যদি হয়ে থাকে সেগুলো আদৌ কোনো নিয়মনীতিই নয়, তবু। শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠার কোনোই দরকার নেই আমার। জ্যেন ড্যিলমাঁর সময়, একজন সাউন্ড মিক্সারের সঙ্গে বিবাদ লেগে গিয়েছিল। তিনি ভেবেছিলাম, ফিল্মটি আমরা সম্মিলিতভাবে বানাতে যাচ্ছি। এ ছিল মাওবাদের সেই তুখোড় যুগের কথা। তিনি দেলফিনকে বাজিয়ে দেখছিলেন, যেহেতু দেলফিন উচ্চ-বুর্জোয়া পরিবারের মানুষ। তবে দেখেছি সেই সাউন্ড মিক্সারটি নন, বরং দেলফিনই সিনেমাটির জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন। নিয়মনীতি আমাদেরকে জীবনকে যাপন করার পথে বাধা দেয়। আমি পাজামা পরেই শুট করি। ফ্যাশনের ব্যাপারে নিজের বিধান নিজেই ঠিক করে নিয়েছি। আমার সর্বশেষ সিনেমাটির পুরোটার শুটিংই আমি পাজামা পরে করেছি। এই যে, এখনো পাজামা পরেই আছি।


প্রত্যেকটি
সিনেমাই আলাদা,
এবং সেটি তার নিজস্ব
জীবন, নিজস্ব ভিত খুঁজে নেয়

নিকোল ব্রেনেজ
আপনি তো মাইকেল জ্যাকসনের একজন অনুসারী ছিলেন; তিনি একদিন সকালে পাজামা পরেই আদালতে নিজের বিরুদ্ধে চলা মামলায় হাজিরা দিয়েছিলেন।

চান্তাল আকেরমান •
মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন রূপান্তরনের মাস্টার; নিজেকে পুনর্নির্মাণ করা থেকে কোনোকিছুই তাকে আটকাতে পারত না।

নিকোল ব্রেনেজ
তার মানে, কোনো একটি মাত্র আত্মপরিচয়ের গণ্ডিতে মাইকেল জ্যাকসনকে কেউ নির্দিষ্ট করতে পারবে না। এক ধরনের রূপান্তরনের মধ্যে নিজেকে রূপান্তরিত করা মানুষ ছিলেন তিনি।

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ।

পিয়ের পাওলো পাসোলিনি
মামা রোমা
ফিল্মমেকার । পিয়ের পাওলো পাসোলিনি

প্রসঙ্গ : পিয়ের পাওলো পাসোলিনি ও ‘মামা রোমা’

চান্তাল আকেরমান •
এই নারীটিকে [মামা রোমার কেন্দ্রীয় চরিত্র] আমি ভালোবাসি। তার ঔদার্যকে ভালোবাসি। গিগোলোকে [পেশাদার পুরুষ নৃত্যসঙ্গী বা যৌনসঙ্গী] যখন সে টাকা দেয়, তখন তার জন্য খারাপ লেগেছে আমার। তার ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে আরেক যিশুর মতোই– আমার কাছে বিনাদ্বিধায় এটিকে ফিল্মটির একটি দুর্বল দিক বলে মনে হয়েছে; কেননা, ক্যাথোলিসিজম সম্পর্কে আমার এক ধরনের উল্টো মনোভাব রয়েছে। অসমীচীন হলেও আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। আন্না মাগনানি অভিনীত নারী চরিত্রটি নিয়ে শুধু এটির ফিকশনের জন্যই নয়, বরং ডকুমেন্টারি ডায়মেনশনের বিবেচনায়ও এই ফিল্মটি অসাধারণ। স্পষ্টতই একটি গাড়ির ভেতর থেকে শুট করা অপ্রচলিত সেই ট্র্যাকিং শটটিতে নারীটি যখন অন্য পতিতাদের সঙ্গে হেঁটে বেড়ায়, আর দর্শকমাত্রই এ নারীর ও অন্য নারীগুলোর আনন্দের অংশীদারী হয়ে ওঠে– স্রেফ এই শটটির জন্যই তো এই ফিল্মটি ভীষণ রকমের অসাধারণ।

চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান
শৈশবে

প্রসঙ্গ : আশ্রয়

চান্তাল আকেরমান •
আমার মা তার সবকিছু ভেঙে পড়া সত্ত্বেও কী দারুণভাবে বেঁচে থাকতে চান– আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। তিনি আমার একেবারেই উল্টো, এক জ্যান্ত আত্মার মানুষ। কেননা, বন্দিশিবিরে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে, ১৫টি বছর তিনি পৃথিবীর ওপর আস্থার জীবন কাটাতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে, আমি তো জন্মেছিই ট্রমার ভেতর। আমার বোন সিলভিয়ানা আর আমি, আমাদের দুজনকে গত তিন মাস ধরে মায়ের দেখভাল করতে হয়; তিনি এখন স্ট্রেচারে শুয়ে জীবনযাপন করলেও, সামনে কোনো সুদর্শন তরুণকে দেখলে, ফ্লার্ট শুরু করেন! অন্যদিকে, আমি জন্মেছিই উৎকণ্ঠা সঙ্গী করে। মা আমাকে কোনোদিনই তার কাছ থেকে সত্যিকারের আলাদা হয়ে যেতে দেননি, কিংবা, সম্ভবতই আমি এ কাজটি করতে পারিনি; কেননা, নিজের বেঁচে থাকতে পারা নিয়েও আমার সঙ্কট রয়েছে।


আমি তো জন্মেছিই
ট্রমার ভেতর

যখন ছোট ছিলাম, যখন বুঝতে পেরেছি তিনি কতটা ভোগান্তি পোহিছেন, তখন থেকে আমি তাকে তার নিজের মতো করে ছেড়ে দিয়েছি। তারপর কোনোদিনই কাঁদিনি আমি; ‘না’ শব্দটি বলিনি কোনোদিন। যখন আমি তরুণী, অল্প অল্প করে বুঝতে শিখেছি, কোন পরিসরে, আমার পক্ষে একজন নারী হয়ে ওঠার মতো কোনো স্পেস ছিল না। মা আমাকে এখনো, সবসময়ই ‘জান আমার’ বলে ডাকেন; আমার এ ডাক সহ্য হয় না। ইহুদিধর্মে, নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসা জন্য, বরং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোই কেবল আপনার জন্য অনিবার্য। কখনো কখনো তাদের প্রতি ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা– কোনোটাই আমি অনুভব করি না; আর কখনো কখনো, হয়তো ঠিক পরদিনই, ভরপুর টের পাই এসব।

আমার নানী বন্দিশিবিরেই মারা গেছেন। ফলে নানী যখন বুড়ো, তার দেখভালের দায়িত্ব মাকে নিতে হয়নি। শেষবার মা যখন কিছু একটা ভেঙে ফেললেন, রাতের বেলা পড়ে গেলেন তিনি, অ্যাড্রিনালিনের [ঔষধে ব্যবহৃত বৃক্কনিঃসৃত রসবিশেষ] কল্যাণে খানিকটা সময়ের জন্য তাকে কিছুই অনুভব করতে হয়নি। পরের দিন তাকে ক্লিনিকে আমার নিয়ে যেতেই হলো। আমি বললাম, ‘মা, তোমার বয়স এখন আর ১৮ নয়, রাতের বেলা তোমার লাইট জ্বালিয়ে চলাফেরা করা উচিত’। তার বয়স ৮৪। কিন্তু কথাটি শুনে তিনি এতই মন খারাপ করলেন, পাঁচ দিন মুখে খাবার তুললেন না। আমার আসলে কিছুই করার ছিল না। নিজেকে বললাম : ‘আচ্ছা, সে তার মতো মরুক, এটা তার পছন্দ, ঠিক বুড়ো কুকুর যেমন মরার জন্য খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়!’ আমার বোন এলো। আমার বোনের সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটি যেহেতু একেবারেই ভিন্ন, তাই সে আসামাত্রই তিনি আবারও খেতে শুরু করলেন।

নিকোল ব্রেনেজ
আপনার কি ধারণা, আপনার মা আপনার অস্তিত্বের অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?

চান্তাল আকেরমান
আমি ঠিক জানি না। এ একেবারেই দুর্বোধ্য ব্যাপার। কখনো কখনো আমারও এমনটাই মনে হয়। কখনো কখনো আমি তার মৃত্যু কামনা করি! মনে হয়, আমার পক্ষে তাকে মৃত ভাবাই শ্রেয়। তা অবশ্য নারী হিসেবে নয় নিশ্চয়ই, বরং স্রেফ মা হিসেবে। কিন্তু আমি জানি, এতে শেষ পর্যন্ত কোনোকিছুই বদলাবে না।

চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান
শৈশবে, মায়ের সঙ্গে

প্রসঙ্গ : দারিদ্র

নিকোল ব্রেনেজ
এ অনুমান আমরা করতেই পারি : নিজের ভেতর ভীষণ রকম ছোট হয়ে থেকেছেন বলে, নিজেকে এমনকি বঞ্চিত করেছেন বলে আপনি কোনোদিনই কোনোকিছুর আবদার করেননি; আর এ জিনিসটিই পৃথিবীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক এবং প্রথমত আত্মসংযমব্রতের বৈশিষ্টধারী একটি স্টাইল– উভয় ক্ষেত্রেই আপনার সিনেমার স্ট্রাকচারগুলো তৈরি করে দিয়েছে।

চান্তাল আকেরমান •
ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বাবা-মার আসলে কিছুই নেই; ফলে চাইলেও কিছুই পেতাম না কিংবা কোনোকিছুর আবদার করিনি। যখন আমি কিছু একটা পাই, আমাকে সেটি ছেড়ে দিতেই হয়, সেটিকে বাতাসে ছিটিয়ে দিতেই হয়। বড় ধরনের কোনো চাহিদা আমার নেই। যখন ছোট ছিলাম, আমাকে সবসময়ই আড়ালে সরিয়ে রাখা হতো, যেন বন্দিশিবিরের দিনগুলোতে ভয়ানক রকমের ভোগান্তি পোহিয়ে এসেছেন বলে মা নিজের মতো জীবন কাটাতে পারেন, নিজেকে সময় দিতে পারেন। দেখুন, এখন নিজেকে আমি এ কথাটিই বলি। কোনো অবস্থাতেই কোনোদিন আমি রাগের কোনো লক্ষণ দেখাইনি; সবচেয়ে বড় কথা, মাকে আমি ভোগান্তি দিতে চাইনি।

আমি আমার কাজিনদের জামা কাপড় পরতাম; তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না আমার। বাবা আমাকে ইহুদি স্কুলটিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন; এবং ১৯৫৬ সালে, ইতোমধ্যেই এমন এক শ্রেণির বাবা-মা ঠিকই ছিলেন– যারা ইতোমধ্যেই নিজেদের ভাগ্যকে মেরামত করে নিয়েছিলেন। তাদের সন্তানরা দুজারদাঁর পোশাক পরত– এখনকার শিশুরা যেমন ব্র্যান্ড-নেম দেখে পোশাক কেনে। আমার যখন ১৩-১৪ বছর বয়স, জীবনের প্রথমবার মা আমাকে সরাসরি কোনো টাকা দিয়েছিলেন– যে টাকাগুলো আমার জন্মদিন উপলক্ষে তার হাতে ফুফুরা দিয়েছিলেন। টাকা পেয়েই আমি দুজারদাঁয় গেলাম একটা পোলো শার্ট কিনতে; আর মুহূর্তেই উপলব্ধি হলো, বোকামি করেছি; এ রকম কাণ্ড এটিই ছিল আমার সর্বশেষবার করা।

ক্লোকে-হাইস্ট সৈকতে, একই জায়গায় সবাই যাচ্ছিল। উইন্ডব্রেকার দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছিল সৈকতটি; আর সবারই থাকত একই স্পটে– ‘ভিয়ানা’। অরণ্যের ছোট্ট কুটিরে বায়ুবদল করতে যেত সবাই। সৈকতের চেয়ারে বসে থাকতেন এইসব মহিমান্বিত পোশাক ও সানগ্লাস পরা সকল মা। অবশ্য আমার মা-ই ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরী। সব শিশুরই ছিল বাইসাইকেল। আমার বাবা আমার জন্য একটা বাইসাইকেল ভাড়ায় এনে দিয়েছিলেন– পাঁচ বেলজিয়ান ফ্রাঁয় [বেলজিয়ান অর্থমুদ্রা] আধঘণ্টা। বাচ্চারা টেনিস খেলছিল। তবে আমি খেলেছি পিং-পং; কেননা, এটি ফ্রি ছিল। তিন লেয়ারের আইসক্রিম খেয়েছে ওরা; আর আমারটা ছিল এক লেয়ারের। কিন্তু বাবা যে কত পরিশ্রম করছেন– আমি তা দেখতাম; আর তাই তার কাছে কোনোকিছুর আবদার করিনি, কিংবা অন্তত মুখ ফুটে কিছুই চাইনি কখনো।

আমার এক ফুফুর অবস্থা ছিল আরো হতদরিদ্র। তার জন্য ২৫ পয়সার কয়েন জমাতাম আমি। খেতে চাইতাম না। মায়ের মাথা প্রায় বিগড়ে গিয়েছিল। আমার বোন যখন জন্মাল, তারপর অবস্থার উন্নতি হতে থাকল। কিশোরী বয়সে পৌঁছানোমাত্রই একটা বাইসাইকেল, একটা রেকর্ড প্লেয়ারের আবদার করে বসল সে। রেকর্ড প্লেয়ার পাবার চেষ্টা চালাতে হাজির হয়েছিল কেডিও-রেডিওতে [ইলেকট্রনিক কোম্পানি]। ওর এমন কাণ্ড দেখে আমি পুরাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান
শৈশবে, মায়ের সঙ্গে

নিকোল ব্রেনেজ
আপনি এই অস্তিত্বগত আত্মসংবরণব্রতকে একটি স্টাইলে, এই কঠোরতাকে মিনিমালিজমে রূপান্তরিত করেছেন।

চান্তাল আকেরমান •
হয়তো এটিকে আমি কিছু একটা করেছি। তবে এর তাৎপর্য আমার কাছে সবসময়ই গৌণ রয়ে গেছে। অবশ্য অন্য অনেক ফিল্মমেকারের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবেন, আমি আমার ফিল্মের জন্য কখনোই যথেষ্ট লড়াই করিনি; কখনোই এগুলোর জন্য কোনো ‘সামাজিক’ স্থানবরাদ্ধের দাবী তুলিনি। কী করে একটা বাচ্চা মেয়ে নিজেকে এসব জিনিস শোনাবে? এই যে এত কিছু আমি নিজের ভেতর চাপা দিয়ে রেখেছি, কী করে কেউ আমার ভেতর দিয়ে তা বুঝে ফেলতে পারবে? এর ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।

যখন বাচ্চা ছিলাম, বাবা-মা বাইরে গেলে আমি কখনোই কাঁদিনি। আমার বোনটি জন্মানোর পর মা বললেন, ‘চান্তাল আকেরমান ঈর্ষাকাতর নয়’। ফলে ঈর্ষার অনুভূতিটিকে আমি বুকে চাপা দিয়ে, ঈর্ষা না থাকার গর্ববোধ করলাম! আমার সকল আবেগের সম্পর্কের মধ্যেই, আমার ঈর্ষা নেই বলে, এই ফয়সালাটির প্রমাণ রাখতে পারি– যা কিনা, এটি যদি কোনো নির্দেশ হিসেবে জারি হতো, সেটির তুলনায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। আমার সাইকোঅ্যানালাইস্ট আমাকে বলেন, ‘আপনি এত বেশি ক্রোধ বুকে জমিয়ে রেখেছেন, সেটি ফেটে পড়তে পারে।’ এটি বেরিয়ে পড়লে কাউকে আমি খুন করে ফেলতে পারি– এ ভয় আমার রয়েছে। এ সবই যুদ্ধ আর বন্দিশিবিরের সঙ্গে বাঁধা।


সাইকোঅ্যানালাইস্ট
আমাকে বলেন,
‘আপনি
এত
বেশি ক্রোধ
বুকে জমিয়ে রেখেছেন,
সেটি ফেটে পড়তে পারে।’

বাচ্চাকালে একই দুঃস্বপ্ন আমার ঘুমে বারবার হানা দিতো। এরমধ্যে দুটির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সবচেয়ে বেশিবার। প্রথমটি হলো– এক বন্দিশিবিরে একটি অতিকায় চেয়ারে স্থির আসীন হয়ে আছেন হিটলার, আর জোর করা হাসিমুখে ভায়োলিন বাজাচ্ছে ইহুদিরা– পিনা বাউশের নৃত্য পরিবেশনার মতো, একটা বৃত্ত গড়ে তুলে। দ্বিতীয় স্বপ্নটি হলো– খাবার কিছুই নেই বলে, মানুষ মানুষকেই খেয়ে ফেলছে। কসাইয়ের হুঁকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য, আমাকে আর মাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তারা। আমি একেবারেই পিচ্চি; কোনোমতে পালিয়ে যেতে পারলাম। বাড়ি ফিরে মাকে দেখলাম আবার। তবু নিজেকে বাঁচাতে পালিয়ে এসেছি বলে কেবলই অপরাধবোধ হতে থাকল। এই স্বপ্নের উৎস কী? ‘ল্যাগার’ শব্দটি বাড়িতে আমি অনেক শুনেছি, ইংরেজিতে ‘ক্যাম্প’। আমার ধারণা, ক্যাম্পে মায়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছিল। এ নিয়ে কোনোদিনই তিনি কিছু বলেননি; কিংবা বলা ভালো, প্রায় কোনোদিনই বলেননি।

ঘুমোতে যেতে ভীষণ ভয় করত আমার; ‘বনা নুই্য, চান্তাল’, ‘গুডনাইট, চান্তাল’– আমাকে এ কথাটি বারবার বলার অনুরোধ করতাম– যতক্ষণ না মা ঠিকস্বরে বলে উঠছেন। এসব নিয়ে আমি কিন্তু মোটেও অভিযোগ করছি না; নালিশবাজ লোক আমার পছন্দ নয়। আমি কথাগুলো আপনাকে শোনাচ্ছি কেবল।

নিকোল ব্রেনেজ
এ রকম নির্যাসতুল্য সিনেমা বানানোর সময়, আপনার সামনে কিছু নিদর্শন নিশ্চয়ই ছিল– বিশেষত রোবের ব্রেসোঁর কাজ…

চান্তাল আকেরমান •
ব্রেসোঁর সন্ধান আমি পরে পেয়েছি, ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ-এর পরে, যখন আমার বয়স ২৫ বছরের মতো। ব্রেসোঁ একজন তুখোড় ম্যাটেরিয়ালিস্টও বটে। ডায়েরি অব অ্যা কান্ট্রি প্রিস্ট-এর [১৯৫১] ধর্মযাজকটির কান : এ রকম তুখোড় কান আমি সারাজীবনেরও আর কখনো দেখিনি; ফলে এটির দিকে আমি নিরন্তরভাবে তাকিয়ে ছিলাম। এ কারণেই ‘ক্যাথলিক ফিল্মমেকার’, ‘ইহুদি ফিল্মমেকার’, ‘নারী ফিল্মমেকার’, ‘সমকামী ফিল্মমেকার’– এইসব তকমাগুলোকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে; কেননা এসবের সত্যিকারঅর্থেই কোনো মানে নেই।

রোবের ব্রেঁসো
ডায়েরি অব অ্যা কান্ট্রি প্রিস্ট
ফিল্মমেকার । রোবের ব্রেঁসো
সাক্ষাৎকার গ্রহণকাল । ১৫ জুলাই ও ৬ আগস্ট ২০১১; প্যারিস, ফ্রান্স 
সূত্র । লোলা জার্নাল

সপ্তম ও শেষ কিস্তি, আসছে শিগগিরই…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন