আলমগীর কবির যেদিন মারা গেলেন/ আখতারুজ্জামান

0
288
আলমগীর কবির

লিখেছেন । আখতারুজ্জামান


আলমগীর কবির
আলমগীর কবির
২৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮–২০ জানুয়ারি ১৯৮৯

ফেরিবোটটি আরিচাঘাটে যখন ভিড়লো তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লাফ দিয়ে ফেরিবোটে উঠে লোকজন ও যানবাহনগুলোকে পাশ কাটিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম মোরশেদুল ইসলামকে। আলমগীর কবির ও টিনার লাশ বহনকারী ট্রাকটি তিনি নিয়ে এসেছেন ওপার থেকে। সঙ্গে তার স্ত্রী মুন্নী। পরম করুণাময়ের কৃপায় অলৌকিকভাবে মুন্নী ফিরে এসেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে।

আমাকে জড়িয়ে ধরলেন মোরশেদ। বললেন, ‘আখতার ভাই! কবির ভাই নেই।’

মোরশেদের কণ্ঠ ভেঙে গেছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন। আমিও ধরে রাখতে পারছি না চোখের পানি। মুন্নী বসে আছেন আকটা গাড়ির ভেতরে। পাথরের মূর্তির মতো– আতঙ্কগ্রস্ত, শোকাহত।

এফডিসি থেকে দেওয়া মাইক্রোবাসটি নিয়ে বেলা আড়াইটা নাগাদ আরিচাঘাটে পৌঁছেছিলাম আমি। আমার সঙ্গে নেসার আহমেদ [দুর্ঘটনায় নিহত টিনার সবচাইতে কাছের মানুষটি।]

আরিচায় পৌঁছেই শিবালয় থানার কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছিলাম আমাদের দ্রুত নগরবাড়ি পৌঁছানোর একটা ব্যবস্থা করে দিতে। আমাদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানার পর তিনি বললেন, ‘ওপারে গিয়ে লাভ নেই। আপনারা এখানেই অপেক্ষা করুন। লাশ বহনকারী ফেরিটি একটু আগেই রওয়ানা দিয়েছে আরিচার পথে।’

ডিউটিরত সেই কর্মকর্তা চা আনিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করলেন।

অপেক্ষার যন্ত্রণা কি যে দুঃসহ তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলাম সেদিন যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে। আমি অধৈর্য হয়ে পায়চারী করছিলাম। আর নেসার একটা পাথরের চাইয়ের ওপর বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে টেনে যাচ্ছিলেন একটার পর একটা সিগারেট। যমুনায় তার স্বপ্ন ডুবে গেছে। আর ক’দিন পরেই টিনার সঙ্গে ঘর বাঁধার পরিকল্পনা ছিল তার।

দুঃসংবাদটি জেনেছিলাম আগের দিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে। ঘরে ঢুকতেই আমার স্ত্রী আসমা বললেন, ‘বাংলার বাণী থেকে ফোন এসেছিল। সেলিম ভাই [শেখ সেলিম, সম্পাদক] তোমাকে এক্ষুণি যেতে বলেছেন।’ আমি তখন বাংলার বাণী গ্রুপের পত্রিকা সাপ্তাহিক সিনেমার নির্বাহী সম্পাদক।

সেলিম ভাইয়ের রুমে ঢুকতেই তিনি বললেন, ‘আখতার! একটা খবর এসেছে।’ তাঁর টেবিলে রাখা ছিল এক টুকরো কাগজ। সেটা তিনি ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। বাসস’র [বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা] একটা নিউজ ফ্ল্যাশ। চোখ বুলিয়ে দেখি খবর এসেছে নগরবাড়ি ফেরিঘাটে ট্রাকের ধাক্কায় নদীতে পড়ে গেছে আলমগীর কবিরের গাড়ি। গাড়ির ভেতরে ছিলেন আলমগীর কবির, টিনা ও মোরশেদুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নী। মুন্নীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গাড়ি ও বাকি দুজনকে উদ্ধারের জন্য ডুবুরিরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিজের রুম খুলে ফোন করলাম চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামের বাসায়। তার বড়ভাই জানালেন, খবরটি তিনিও পেয়েছেন। কে একজন তাকে ফোন করে জানিয়েছেন, মোরশেদ বেঁচে আছেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলেন দুর্ঘটনার একটু আগে ফেরির টিকেট কাটতে।

টিনা খান
২৫ মে ১৯৬৬–২০ জানুয়ারি ১৯৮৯

সেলিম ভাইয়ের রুমে বসেই টিভিতে দেখলাম রাতের খবর। আমার জানা হয়ে গেল, আমার দুজন পরমপ্রিয় মানুষ আলমগীর কবির ও ফিরোজা খন্দকার টিনার সঙ্গে আর কোনোদিন আমার দেখা হবে না, কথা হবে না। আমার চলচ্চিত্রকার সত্তার ভিত গড়ে দিয়ে চিরকালের মতো হারিয়ে গেছেন তারা। শিক্ষক হিসেবে আলমগীর কবির ফুটিয়ে দিয়ে গেছেন আমার মনের চোখ। বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন আমার পর্যবেক্ষণ, অনুধাবন আর উপলব্ধির সীমানা। আর প্রযোজিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে টিনা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের।

নিজের রুমের সামনের চেয়ারটার দিকে তাকালাম। মাত্র চারদিন আগে বিকেল বেলায় টিনা এসে বসেছিলেন ওই চেয়ারটিতে। বলেছিলেন, ‘দুলাভাই, বগুড়া যাচ্ছি, কবির ভাই যেতে বলেছেন, মোরশেদ ভাই আর ভাবীও যাচ্ছেন।’ জীবিত অবস্থায় টিনার সঙ্গে সেটাই আমার শেষ দেখা। আলমগীর কবিরকে শেষবারের মতো দেখেছিলাম জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনের সামনে। আমার পরবর্তী ছবির অগ্রগতি সম্পর্কে সেদিন খোঁজ খবর নিয়েছিলেন তিনি। দুজনের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমার কত স্মৃতি, জীবনের কত আলোকিত মুহূর্ত!

সারারাত বাংলার বাণী ভবনে কাটিয়ে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম জাকী ভাইয়ের ধানমন্ডির বাসায়। কলিংবেল টিপলাম। সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী নিজেই দরজা খুললেন। আমাকে দেখে অবাক। ‘কি আখতার? এত সকালে।’ বুঝলাম, যে কারণেই হোক রাতের টিভি সংবাদ তার দেখা হয়নি।

দরজায় দাঁড়িয়েই দুঃসংবাদটি টানালাম তাকে। স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। আমাকে বসালেন তার ড্রয়িংরুমে। ভেতরে ঢুকে বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে এলেন জাকী ভাই। ভাবী ততক্ষণে নাস্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। চা নাস্তা খেয়ে জাকী ভাইয়ের গাড়িতে করেই এফডিসিতে এলাম।

এফডিসির অপারেটিং ডিরেক্টর সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী তার কক্ষে বসে কয়েকটা ফোন করলেন দ্রুত। দৈনিক পত্রিকাগুলোর সুবাদে ততক্ষণে অনেকেই জেনে গেছেন দুঃসংবাদটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এফডিসিতে পৌঁছলেন এমডি সৈয়দ ইউসুফ হোসেন।

এফডিসি থেকে জাকী ভাই এবং ইউসুফ সাহেব আমাকে একটা মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি রওয়ানা হলাম আরিচার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে একবার গেলাম টিনার রামপুরার বাসায়।

পত্রিকা দেখে এলাকার সবাই ততক্ষণে খবরটি জেনে গেছেন। টিনার ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে তার একমাত্র শিশুকন্যা রিমুর বুক ফাটা কান্না। বৃদ্ধা নানীকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটি তারস্বরে চিৎকার করছে। পাথরের মতো বসে আছে টিনার তিনটি বেকার ছোটভাই। প্রতিবেশিরা চোখের পানি মুছে দেখছেন সেই দৃশ্য। সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছেন মেয়েটিকে। আমাকে দেখে রিমুর চিৎকার আরও বেড়ে গেল– ‘মামা, আমাকে রেখে আম্মু কেন গেল… কেন গেল!’

মেয়েটাকে কোলে নিয়ে আমি উঠলাম মাইক্রোবাসে। ততক্ষণে নেসার এসে গেছেন। তাকেও গাড়িতে তুলে নিয়ে ছুটলাম আমার বাসায়। আমার স্ত্রীর হাতে রিমুকে তুলে দিয়ে বললাম, ‘ওকে দেখো।’ তারপর ছুটলাম আরিচার উদ্দেশ্যে। আমার সঙ্গে নেসার।

ফেরি থেকে নেমে এলো লাশবাহী ট্রাকটি। সামনের গাড়িটিতে আমরা। ড্রাইভার, নেসার, আমি, মোরশেদ ও মুন্নী।

ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটছে আমাদের গাড়ি। মুন্নী তখনও থেকে-থেকে কেঁপে উঠছেন। মোরশেদ তাকে জড়িয়ে ধরে রইলেন সারাটা পথ। আমাদের সকলের চোখেই পানি।

ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটছে আমাদের গাড়ি। ভেতরে বসে নীরবে কাঁদছি আমরা স্মৃতিসিক্ত হয়ে।


শৈল্পিক
কোনো কিছু
সৃষ্টি করার যন্ত্রণার
আনন্দ সম্ভোগের প্রক্রিয়ায়
যাদের জীবন জড়িয়ে যায়, সেই
মানুষগুলো নানা উৎস থেকে
তাদের নেশার
রসদ খুঁজে
নেন

আমি চলচ্চিত্র আচার্য আলমগীর কবিরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম একজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবে, তার একজন ছাত্র হিসেবে এবং উত্তরকালে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে। প্রথমদিকে দূর থেকে তাকে দেখতাম অত্যন্ত সমীহের সাথে। ক্রমশঃ তাকে জেনেছি অন্তরঙ্গভাবে। যত তার কাছে এসেছি, তার প্রতি আমার বিমুগ্ধতা ততই বেড়েছে। তার সাথে আমার দেখা হতো বিভিন্ন আড্ডা, সেমিনারে, তার বাড়িতে, শুটিং স্পটে, বাচসাস-এর [বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি] বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। চলচ্চিত্র মাধ্যমের একজন ছাত্র হিসেবে আজ আমি অনুভব করি, শৈল্পিক কোনো কিছু সৃষ্টি করার যন্ত্রণার আনন্দ সম্ভোগের প্রক্রিয়ায় যাদের জীবন জড়িয়ে যায়, সেই মানুষগুলো নানা উৎস থেকে তাদের নেশার রসদ খুঁজে নেন। আলমগীর কবির আমার জীবনে তেমনি এক প্রেরণার উৎস।

আলমগীর কবিরের প্রতি আমার বিমুগ্ধতার কারণগুলো ব্যাখ্যা করার আগে আমার চলচ্চিত্র মাধ্যমের একজন ছাত্র হয়ে ওঠার ঘটনাটি প্রাসঙ্গিকতার খাতিরেই বলে নেওয়া প্রয়োজন।

ষাটের দশকের শেষার্ধে সিনেমা সাপ্তাহিক চিত্রকাশ পত্রিকার একজন অ্যাপ্রেন্টিস সাব-এডিটর হিসেবে আমার কর্মজীবনের শুরু। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও এই মাধ্যমটির প্রকৃতি, গুরুত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে তেমন কোনো বোধ আমার মনে তখনও অংকুরিত হয়নি। তবে এটুকু জেনেছি, চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘চিত্তবিনোদনের মাধ্যম’।

নুন আনতে পান্তা ফুরায়– এ রকম একটি পারিবারিক পরিবেশে অতিবাহিত হয়েছে আমার ছাত্রজীবন। টিউশনি করে পকেট মানি জোগাড় করতাম। ছবি দেখা সঙ্গত কারণেই আমার কাছে ছিল একটা বিলাসিতার ব্যাপার। কালেভদ্রে দুয়েকটি ছবি দেখতাম। আমার জীবনেও কোনো একজন ‘সাগরিকা’ এসে যেতে পারে কিংবা কোনো বিপদগ্রস্ত নারীর জীবনে সোঁলবা সাল-এর দেবানন্দের মতো আমিও ভূমিকা রাখতে পারি, ছবি দেখার পর এ জাতীয় ভাবালুতা আমাকে পেয়ে বসতো।

আলমগীর কবির
আলমগীর কবির ও পটুয়া কামরুল হাসান

চিত্রাকাশ পত্রিকার শুরুর দিকে আমার কাজটা ছিল অনুবাদের। বিভিন্ন বিদেশি ম্যাগাজিন অথবা নিউজলেটার থেকে সম্পাদকের বেছে দেওয়া ‘তারকা সংবাদ’গুলো অনুবাদ করে একজন চিত্রসাংবাদিক হিসেবে ‘হাত পাকাচ্ছিলাম’ আমি। সে সময় একদিন হাতে এসে গেল কলকাতা থেকে প্রকাশিত চতুরঙ্গ পত্রিকার একটি কপি। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত একটা নিবন্ধ পড়ে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি খেলাম।

নিবন্ধের নাম, ‘চলচ্চিত্রের শিল্প প্রকৃতি প্রসঙ্গে’; লেখক সত্যজিৎ দত্ত, যার নামটাই কোনোদিন শুনিনি। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি পথের পাঁচালীর বিভিন্ন দৃশ্য বিশ্লেষণ করে কি জ্ঞানগর্ভ ও গভীর আলোচনা! লেখাটি পড়ে আমার মনের ভেতরে ‘সুনামি’র মতো একটা কিছু বয়ে গেল যেন। আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম বেশ কিছুদিন। পড়ি আর ভাবি। চলচ্চিত্রে শিল্পর সূত্রগুলো তাহলে এভাবে কাজ করে! এভাবে তাহলে চলচ্চিত্রের গভীরে যেতে হয়, সেই নিবন্ধটির অভিঘাতে আমি অনুভব করলাম : পেশাগত চর্চার ব্যাপারে আমাকে আর দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে হবে না। আমার পুরো জীবন কাটিয়ে দেবার মতো সর্বোত্তম মাধ্যমটির সন্ধান আমি পেয়ে গেছি।

এইভাবে আমি জানলাম চলচ্চিত্র একটি ‘শিল্পমাধ্যম’। নিছক ‘চিত্তবিনোদনের’ মধ্যেই এই মাধ্যমটির ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়।

এই উপলব্ধির পর চলচ্চিত্র মাধ্যমের ছাত্র হিসেবে শুরু হয়ে গেল আমার খোঁজাখুঁজি ও আহরণের পালা। চলচ্চিত্রের ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব, সমালোচনা, বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের লেখা, তাদের ওপর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা, সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলন ও নানামুখী গতিধারা, চলচ্চিত্রের গঠন শৈলী, টেকনিক ইত্যাদি সম্পর্কে যেখানে যা কিছু পাই পড়ে ফেলি।

উপলব্ধির এই পর্যায়ে ছবি দেখাটাকেও পরিণত করলাম নিয়মিত অভ্যাসে। যত অর্থকষ্টে থাকি না কেন, দেখার মতো ছবি হলে মিস করি না। বহু খারাপ ছবিও এ সময়ে গোগ্রাসে গিলেছি।

ঢাকায় তখন চলচ্চিত্র মাধ্যমের সিরিয়াস দিকগুলো নিয়ে লিখতেন ওবায়েদ উল হক, সৈয়দ শামসুল হক, আজিজ মিসির, ফজল শাহাবুদ্দিন, ফতেহ লোহানী, আজাচৌ [আহমেদ জামান চৌধুরী], এবং আরও কেউ কেউ– এদের লেখাগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আমার অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার এই পর্যায়ে একদিন খুঁজে পাই আলমগীর কবিরকে।


জহির ভাই
একদিন আমাকে
বললেন, ‘আলমগীর কবিরের
লেখাগুলো
পড়বেন’

চিত্রাকাশ পত্রিকার রিপোর্টারের দায়িত্ব লাভের পর খবর আহরণের সুবাদে ততদিনে ঢাকার চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, পরিবেশক, তারকা ও কুশলীদের সঙ্গে গড়ে উঠতে শুরু করেছে আমার ওয়ার্কিং সম্পর্ক। জহির রায়হানের দিলু রোডের বাসায় তখন আমরা কয়েকজন উঠতি চিত্রসাংবাদিক নিয়মিত যেতাম। উদারভাবে প্রশ্রয় দিয়ে তিনি মিটিয়ে যেতেন আমাদের যাতবীয় প্রশ্ন-তৃষ্ণা। জহির ভাই একদিন আমাকে বললেন, ‘আলমগীর কবিরের লেখাগুলো পড়বেন। অনেক কিছু জানতে পারবেন।’

জহির ভাইয়ের মুখেই শুনলাম, ভদ্রলোক লন্ডনে গিয়েছিলেন বিজ্ঞান পড়তে। তবে চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়ে যাবার পর বিজ্ঞানের সার্টিফিকেট টেমস নদীতে ফেলে দিয়ে তিনি ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেছেন এবং সেখান থেকে চলচ্চিত্র শিক্ষা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে এসেছেন। এই তথ্যটি আলমগীর কবির সম্পর্কে আমার মনে সঞ্চার করে এক সমীহ মেশানো বিস্ময়ের অনুভূতির।

আলমগীর কবির লিখতেন ইংরেজিতে। হলিডে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি ধারাবাহিক রচনা : ‘ফিল্ম ক্রিটিসিজম ইন পাকিস্তান’। সবগুলো লেখা জোগাড় করে পড়ে ফেলি। সংগ্রহ করি তার লেখা সিনেমা ইন পাকিস্তান নামক বইটি। তার সম্পাদিত চলচ্চিত্র পত্রিকা সিকোয়েন্স-এর কপিগুলোর জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। লেখালেখি ছাড়াও তিনি আরও কিছু ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিলেন। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে জোরদার করার। চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সংগঠক ‘পিসিজেএ’কে [এখন ‘বাচসাস’] গতিশীল করার ব্যাপারেও তিনি নিয়েছিলেন জোরালো ভূমিকা। এই সংগঠনের সদস্য হবার পরই মাঝে মধ্যে সামনাসামনি বসে তার কথাবার্তা শোনার ও চিন্তা চেতনা অনুধাবনের সুযোগ পেয়ে যাই আমি।

জহির রায়হানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন আলমগীর কবির। এফডিসির তিন নম্বর ফ্লোরে নিজের প্রজেক্টর ও স্ক্রিন এনে সে ছবির একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন তিনি। সেদিন আমরা প্রথম দেখলাম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপরও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হতে পারে।

ডিএফপি’র কর্মকর্তা সৈয়দ বজলে হোসেন ‘সায়মন ইন ব্রিকস’ নামে এদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বমণ্ডিত সৌধগুলোর ওপর একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন। একটি হোটেলে এই ছবিটির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন আলমগীর কবির। সেদিন তার মুখে শুনেছিলাম, ‘এদেশ হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্রের একটা সোনার খনি। কত বিষয় ছড়িয়ে আছে এখানে-সেখানে।’

শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সরব ও নীরব প্রতিভাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের সম্মানিত করার দায়িত্বটি আলমগীর কবির গ্রহণ করেছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। জহির রায়হানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, খুঁজে-পেতে সৈয়দ বজলে হোসেনের প্রামাণ্যচিত্রটির আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীর আয়োজন এবং তার সম্পাদিত সিকোয়েন্স পত্রিকার মাধ্যমে গুণীজনদের অবদান চিহ্নিত করে ‘সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষণার রেওয়াজ থেকেই সেটা আমরা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম।


নিজেদের
নতুন করে
আবিষ্কার করার
জন্যই আমাদেরকে
বারবার অতীতের কাছে
ফিরে
যেতে
হবে

এ সম্পর্কে আমাকে একদিন তিনি বলেছিলেন, ‘নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করার জন্যই আমাদেরকে বারবার অতীতের কাছে ফিরে যেতে হবে। সর্বক্ষেত্রে আমাদের সৃজনশীল প্রতিভাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের স্বীকৃতি প্রদানের একটা ঐতিহ্য গড়ে তুলতে হবে।’

দেশ স্বাধীন হবার পর রিপোর্টার হিসেবে আমি যোগ দিই চিত্রালীতে। তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার ও তাকে অন্তরঙ্গভাবে জানার সবচেয়ে বেশি সুযোগ পেয়েছিলাম চিত্রালীতে কাজ করার বছরগুলোতেই।

চিত্রালী সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজের কক্ষে প্রতিদিনই একটা আড্ডা জমতো। শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রনির্মাতা, তারকা, ব্যবসায়ী, প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রখ্যাত সাংবাদিকদের সমাবেশ ঘটতো সেইসব আড্ডায়। চা-সিঙ্গারা সহযোগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতো এই ঘরোয়া বৈঠক। নানা প্রসঙ্গ ছুঁয়ে চলতো আলোচনা।

আলমগীর কবিরও মাঝে মধ্যে আসতেন তার কক্ষে। তিনি এসেছেন জানতে পারলেই আমি ঢুকে যেতাম সেখানে। তার কথাবার্তা শোনার জন্য একটা মোহান্ধতার জন্ম হয়েছিল আমার ভেতরে। যত শুনি, তত জানতে পারি এবং আলোকিত হই।

মহানায়ক
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

একদিন কবির ভাই এলেন একটা বই হাতে নিয়ে। ইংরেজি বই। নাম চিত্রবাণী। লেখক গাস্তঁ রোবের্জ। কলকাতা থেকে প্রকাশিত চলচ্চিত্রবিষয়ক বইপত্রের মধ্যে যেগুলো সে সময় ঢাকায় পাওয়া যেট তার প্রায় সবগুলোই ততদিনে আমি সংগ্রহ করে ফেলেছি। তবে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশনের ওপর লেখা এই বইটি কখনো আমার চোখে পড়েনি।

আমি বইটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। সেটা লক্ষ্য করে আলমগীর কবির বললেন, ‘খুব ভালো বই। পড়ে দেখবেন।’ আমি বললাম, ‘কবির ভাই, ঢাকার কোনো বইয়ের দোকানে এই বইটা আমার চোখে পড়েনি। তাহলে কিনেই ফেলতাম।’ আলমগীর কবির কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘কিপ আট। আগামী সপ্তাহে কলকাতায় যাচ্ছি, আমি আরেকটা জোগার করে নেব।’ কবির ভাইয়ের এই উপহারটি আমি কোনোদিনই হাতছাড়া করবো না।

জয়শ্রী কবির
জয়শ্রী কবির

আরও একবার একটা এক্সক্লুসিভ উপহার তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। জয়শ্রীর সাথে বিয়ে হবার পর খবরটি প্রথম তিনি চেপে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে হাওয়ায় ফিসফাস শুনে তাকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম এ ব্যাপারে। আমাকে তিনি নিরাশ করেননি। পরের দিন ঢাকা ক্লাবে লাঞ্চে দাওয়াত করেছিলেন। ফটো জার্নালিস্ট বেলালকে নিয়ে আমি হাজির হয়েছিলাম যথাসময়ে। জয়শ্রীকে নিয়ে এসেছিলেন কবির ভাই। তাদের প্রেম ও প্রণয়ের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারটি চিত্রালীতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল। সেদিন আমি প্রথম অনুভব করি সর্বত্র বুলডোজারের মতো গতিময় এই মানুষটি ভেতরে ভেতরে কতটা রোমান্টিক!

একটা সময়ে সুযোগ পেলেই আমি চলে যেতাম শ্যামলীতে তার রিং রোডের বাসায়। জয়শ্রী তখন তাঁর জীবন থেকে ঝরে যেতে শুরু করেছেন। দারুণ বিরক্ত ও বিপর্যস্ত মনে হতো তখন কবির ভাইকে।

তাকে নতুন একটি রূপে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছিলাম বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ আয়োজিত চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হবার পর। কবির ভাই ছিলেন কোর্স কো-অর্ডিনেটর। চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও সমালোচনা পড়াতেন তিনি। এর আগে ঢাকায় আয়োজিত এবং প্রখ্যাত বিদেশি চলচ্চিত্র বিশারদদের দ্বারা পরিচালিত আরও কয়েকটি কোর্সে আমি অংশ নিয়েছিলাম। তুলনামূলক বিচারে আমি অনুভব করি চলচ্চিত্র মাধ্যমটির ওপর শিক্ষা দেয়ার জন্য তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সন্ধান আমি এখনো পর্যন্ত পাইনি।


ফরাসি নুভ্যেল ভাগ আন্দোলনের পেছনে
আদ্রেঁ বাজাঁ যে ভূমিকা পালন
করেছেন, ফিল্ম ইনস্টিটিউটে
প্রশিক্ষণদানকালে
আলমগীর কবিরও পালন
করেছেন অনেকটা সেই ভূমিকা

নিওরিয়েলিজম, ন্যু ভেল ভাগ, ওতর সিনেমা, মিজ-অঁ-সিন, মন্তাজ– এসব বিষয়ের ওপর আমাদের ভাসা ভাসা ধারণাগুলোকে পরিপুষ্ট করার সুযোগ আমরা এখানেই পেয়েছিলাম। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ফরাসি নুভ্যেল ভাগ আন্দোলনের পেছনে আদ্রেঁ বাজাঁ যে ভূমিকা পালন করেছেন, ফিল্ম ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণদানকালে আলমগীর কবিরও পালন করেছেন অনেকটা সেই ভূমিকা। এই কোর্সে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদেরই কয়েকজন খুঁজে পেয়েছিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো।

স্বভাব প্রকৃতির দিক দিয়ে আমি বরাবরই একটু বেশি মাত্রার বিনীত, নম্র। কবির ভাই সেটা লক্ষ্য করেছিলেন। একদিন আমার কথা বলার ধরন দেখে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘আপনার এই কাচুমাচু স্বভাবটা বদলান তো। যথেষ্ট বয়স হয়েছে আপনার। রিপোর্টারের প্রশ্ন হবে শার্প, বোল্ড অ্যান্ড পেনট্রেটিং। নেভার হেজিটেট টু স্পিক আউট ইওর মাইন্ড হোয়ে ইউ হ্যাভ টু।’ তার এই উপদেশের পর স্বভাবত নিজেকে কিছুটা বদলাতে পেরেছি।

সীমানা পেরিয়ে
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

কবির ভাইয়ের উদ্যোগে ঢাকার কয়েকজন চলচ্চিত্র পরিচালক সংগঠিত হয়ে একদা ‘সৎ চলচ্চিত্র আন্দোলন’ গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছিলেন। ‘সৎ চলচ্চিত্র’ কথাটি নিয়ে বেশ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল মূলধারার চলচ্চিত্র শিল্পে। এ সময় একদিন আমার এক প্রশ্নের উত্তরে কবির ভাই বলেছিলেন, ‘সৎ চলচ্চিত্র সভ্যতার চাকাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আলোকিত করে মানুষকে।’ আলোচনার সূত্র ধরে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন গোদারের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘সিনেমা ইজ ট্রুথ টুয়েন্টি ফোর ফ্রেম পার সেকেন্ড।’ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ‘চলচ্চিত্রের স্তরে স্তরে রস’ বিষয়ক ঋত্বিক ঘটকের সেই বিখ্যাত তত্ত্বটি।

ফিল্ম রিভিউ এবং ফিল্ম ক্রিটিসিজমের পার্থক্য বুঝতে গিয়ে তার কাছে শুনেছি, ‘রিভিউ হচ্ছে ছবি সম্পর্কে সাদামাটা ধারণা প্রদান। আর ক্রিটিসিজম নিবিষ্ট পর্যবেক্ষণ প্রসূত বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা।’ পার্থক্যটা বোঝাতে গিয়ে সুন্দর একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিড়ালটি মাদুরের ওপর বসে আছে– এটা হচ্ছে রিভিউ। আর কালো বেড়ালটি রান্নাঘরের কাছে একটা ছেঁড়া মাদুরের ওপর বসে আছে– এটা হচ্ছে ক্রিটিসিজম।’

ধীরে বহে মেঘনা
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

এফডিসির দুই নম্বর ফ্লোরে ছোট্ট একটি সেট ফেলে কবির ভাই শুটিং করছেন, ধীরে বহে মেঘনার। অতটুকু জায়গায় তিনি কিভাবে দৃশ্য কম্পোজ করছেন সেই কৌশলটা আমি দেখছি। আমার কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, ‘ক্রিয়েটিভ মন থাকলে, কম্পোজিশনের বেসিক সূত্রগুলো জানা থাকলে যেকোনো স্থানেই দৃশ্য কম্পোজ করা যায়। লক্ষ্য করলে দেখবেন মরুভূমি, উদাত্ত মাঠ, উত্তাল সমুদ্র, বরফে ঢাকা পাহাড়– এ সবকিছুকেই পরিবেশের বৈশিষ্ট্যগুলোতে ধারণ করে কত বিচিত্রভাবে ক্যামেরায় তুলে আনেন সৃজনশীল পরিচালকরা।’

রূপালী সৈকতে
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

রূপালী সৈকতে ছবির কাহিনীর স্ট্রাকচার আমার কাছে জটিল মনে হয়েছিল। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন, ‘আপনারা সবসময় লিনিয়ার প্রোগ্রেসনে কাহিনী আশা করেন কেন? সিনেমাতে উপন্যাসের আমেজ যেমন থাকতে পারে, তেমনি সিনেমা তো পত্রিকার রিপোর্টের মতো, প্রবন্ধের মতো, কিংবা কবিতার মতোও হতে পারে।’ প্রসঙ্গক্রমে ব্যাখ্যা করেছিলেন ছবির ন্যারেটিভে ‘চেতনা প্রবাহ রীতি’র প্রয়োগ। গোদারের উক্তি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘ছবিতে আদি, মধ্য এবং অন্ত অবশ্যই থাকে। তবে এই ক্রম অনুসারেই যে থাকতে হবে তার কোনো কথা নেই। শেষের দৃশ্যটি শুরুতে, শুরু দৃশ্যটি মাঝখানে এবং মাঝখানের দৃশ্যটি সবার শেষেও আসতে পারে।’

তার দাবি ছিল, ‘নির্মাতাকেই কেন সবসময় দর্শকদের কাছে যেতে হবে, তাদের মনের খোরাক জুগিয়ে তলতে হবে। দর্শকরাও তো এগিয়ে আসতে পারেন পরিচালকের কাছে।’ ছবি দেখা সম্পর্কে তার উপদেশ ছিল, ‘খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখবেন। পরিচালক তার চিন্তা ও অনুভূতিগুলো ছড়িয়ে দেন ফ্রেমে। দৃশ্যগুলো বিশ্লেষণ করতে করতেই এক সময় হয়তো নির্মাতার অবচেতন মনের স্তরটিতেও পৌঁছে যাওয়া যায়।’


অতিশয়
মূর্খরাই কেবল
নিজেদের সর্বোত্তম
প্রতিভা হিসেবে গণ্য করে

তিনি আরও বলতেন, ‘সিনেমায় সবচেয়ে বড় পরিচালক বলে কেউ নেই। দুনিয়াজুড়ে হাজার হাজার নির্মাতা এই মাধ্যমে কাজ করছেন। কে কোথায় কোন বিপ্লব ঘটাচ্ছেন তা কি বলা যায়? অতিশয় মূর্খরাই কেবল নিজেদের সর্বোত্তম প্রতিভা হিসেবে গণ্য করে।’ দি রিপোর্টার নামক একটি বিদেশি ছবির ওপর আলোচনার সূত্র ধরে তিনি চমৎকারভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ‘কন্সপিরেসি অব সাইলেন্স’ কথাটি। এস্টাব্লিশমেন্টের ষড়যন্ত্রের কারণেই প্রয়াত বিপ্লবী নেতাটির ওপর পত্রিকার রিপোর্টার এত দীর্ঘ একটা প্রতিবেদন লেখা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সাদামাটাভাবে খবরটির মাত্র পাঁচ-ছয়টি লাইন উক্ত পত্রিকায় ছাপা হলো। রুমানিয়ার এই ছবিটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য কী?’ কবির ভাইয়ের উত্তর, ‘সুশীল সমাজে কেউ নির্যাতিত বা লাঞ্ছনার শিকার হয় না। কারও অবদানকে মুছে ফেলার তৎপরতাও চালানো হয় না।’

সূর্যকন্যা
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

পূর্বাণী হোটেলে শুটিং হচ্ছে সূর্যকন্যার। কভার করতে গিয়েছি সেখানে। শিল্পী আহসান ও জয়শ্রী। একটি দৃশ্য শুরু করার আগে কবির ভাই জয়শ্রীকে নিয়ে গেলেন পাশের কামরায়। এক সময় কানে এলো তাদের কথোপকথন।
কবির ভাই বলছেন : ‘প্লিজ, জয়শ্রী। ইটস মাই রিকোয়েস্ট।’
জয়শ্রীর উত্তর : ‘না, না। ওটা সম্ভব না। আমার দ্বারা হবে না।’
কবির : ‘কেন হবে না? মাত্র একবার তো!’
জয়শ্রী : ‘না, না! আমি পারবো না।’
পাশের ঘর থেকে এসব কথাবার্তা ভেসে আসছে। আমি কান খারা করে রাখলাম। একটা রগরগে কিছু ঘটতে যাচ্ছে কি?

একটু পরেই থমথমে মুখ নিয়ে এ ঘরে চলে এলেন কবির ভাই। জয়শ্রী রায় তার পেছনে পেছনে। দুজনেই বেশ গম্ভীর। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বহিরাগত সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে এক সময় দৃশ্যটির চিত্রায়ন করলেন কবির ভাই।

প্রিন্সেস টিনা খান
ফিল্মমেকার । আখতারুজ্জামান

কি নিয়ে সেদিন তাদের মধ্যে এই বাদানুবাদ হয়েছিল সেটা অনুমান করতে পারলাম দৃশ্যটি পর্দায় দেখার পর। খাটের ওপর পরম প্রশান্তিতে নিদ্রামগ্ন নায়কের শরীর থেকে ক্যামেরা চলে এলো মেঝেতে। খাটের নিচে পড়ে রয়েছে একটি ব্যবহৃত কনডম। দেখার পর বুঝলাম কবির ভাই সম্ভবত আরও অন্তরঙ্গভাবে দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরতে চেয়েছিলেন। জয়শ্রী রায়ের আপত্তির কারণে সেটা সম্ভব হলো না। অগত্যা তাৎক্ষণিক ইমপ্রোভাইজেশনের মাধ্যমে একটু ভিন্নভাবে সেই দৃশ্য পর্দায় তুলে এনেছেন পরিচালক। চলচ্চিত্র মাধ্যমটি সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও বোধ-বুদ্ধির সমাবেশ ঘটিয়ে আমার পরিচালিত প্রথম ছবি প্রিন্সেস টিনা খান-এর কাজ একদিন শেষ করে ফেললাম। নানা ঘাটে ঘুরতে ঘুরতে এবং নানা হাত বদল হয়ে তসলিমা খাতুন নামের একটি গ্রাম্য ললনার যাত্রামঞ্চের ‘প্রিন্সেস টিনা খান’ হয়ে ওঠার ঘটনা নিয়ে ফেঁদেছিলাম ছবির গল্প। কবির ভাইয়ের কাছ থেকে ততদিনে জেনে গেছি ডকুমেন্টারি ছবি ও ফিচার ছবির বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য। গ্রিয়ারসনের উক্তি উদ্ধৃত করে কবির ভাই আমাকে বলেছিলেন, “ডকুমেন্টারি হচ্ছে ‘ক্রিয়েটিভ ট্রিটমেন্ট অব অ্যাকচুয়ালিটি’। আর ফিচার ছবি হচ্ছে ‘ক্রিয়েটিভ ফিকশন আউট অব রিয়েলিটি’।” এই সূত্র কাজে লাগিয়েই আমি কাহিনি ও চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলাম।

ছবিটা শেষ হবার পর একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ মিলনায়তনে। একজন ছাত্রের ‘সৃষ্টি’ দেখার জন্য বেশ উৎসাহ নিয়েই স্ত্রী জয়শ্রীকে নিয়ে সেই প্রদর্শনীতে এসেছিলেন আলমগীর কবির। ছবি শেষ হলো। আমি সীমাহীন কুণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে। আমার ছবি তাকে কতটা ‘নিরাশ’ করেছে তা বোঝার জন্য। মুখে কিছু না বলে পিঠে দুটো চাপড় দিয়ে কবির ভাই বেরিয়ে গেলেন হল থেকে। অভ্যাগতরা চা খেতে খেতে ছবিটি সম্পর্কে নানা মন্তব্য করছেন। কিন্তু আমি তো তৃষ্ণার্ত আমার প্রিয় শিক্ষকের মন্তব্য শোনার জন্য। ভীরু পায়ে, দুরু দুরু বক্ষে গিয়ে দাঁড়ালাম কিউরেটর রউফ ভাইয়ের ঘরের সামনে। শুনতে পেলাম কবির ভাইয়ের কণ্ঠ। রউফ ভাইকে তিনি বলছেন, ‘কি? দেখলেন তো! একজন শিক্ষার্থীর প্রথম কাজ। এসব কোর্সটোর্স কি বৃথা যায়?’

সেই ছবি এবং পরে আর দুটি ছবির সুবাদে আমি জাতীয়, বাচসাস ইত্যাদি পুরস্কার পেয়েছি। তবে রউফ ভাইয়ের কাছ কবির ভাইয়ের সেই মন্তব্যটিকেই আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে গণ্য করি।

আগামী
ফিল্মমেকার । মোরশেদুল ইসলাম

আমার প্রথম ছবি নির্মাণের প্রায় কাছাকাছি সময়ে তার দুজন অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র মোরশেদুল ইসলাম এবং তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেন তাদের প্রথম চলচ্চিত্র। মোরশেদুল ইসলামের আগামী এবং তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া। এ দুজনের কাজ দেখে বিপুলভাবে উৎসাহিত হয়েছিলেন কবির ভাই। একদিন কথায় কথায় আমাকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পরিশ্রম ব্যর্থ হবে না। দেখবেন শিগগিরই এরা দুজন চলচ্চিত্রের নতুন জমি তৈরি করে ফেলবে।’ এখন অনুভব করি কতটা দূরদর্শী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল তার।

স্বল্পদৈর্ঘ্য আন্দোলন এবং বিকল্প ধারার আন্দোলনের সুবাদে এ দেশের শৈল্পিক ও জীবনঘনিষ্ঠ ছবির যে ধারাটি ক্রমশ বেগবান হয়ে উঠেছে, তার নেতৃত্ব দিয়েছেন তো এ দুজনই। মোরশেদুল ইসলাম এবং তানভীর মোকাম্মেল।

আমি আমার কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছি মূলধারাকেই। কবির ভাই আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘ওখানে কাজ করে কতটা এগোতে পারবেন বলা মুশকিল। থিংস আর রিয়েলি টাফ দেয়ার। অক্সিজেনের ঘাটতি অনুভব করবেন। পদে পদে অনুভব করবেন কিছু কিছু শিকল কিছুতেই কাটতে পারছেন না। তবুও হতাশ হবেন না। বি টাফ অ্যান্ড বোল্ড। চালিয়ে যান।’

কবির ভাইয়ের আরও একটি উচ্চারণ এখনো আমার কানে বাজে।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ক্র্যাক-ডাউনের পর ঢাকা থেকে পালিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে গেছি দেশের বাড়িতে [বর্তমানে নরসিংদী জেলা]। একদিন দুপুরে ‘খানবাড়ি’ রেল স্টেশনে গেলাম চা খেতে। হঠাৎ চমকে উঠলাম কবির ভাইকে দেখে। চায়ের দোকানের এক কোণায় বসে আছেন তিনি। তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘এখানে কোথায়?’
আমি জানালাম, ‘আমার নানার বাড়ি এই গ্রামে। আপনি কোথায় উঠেছেন?’
কবির ভাই জানালেন, ‘পাশেই, আদিয়াবাদ গ্রামে, এক আত্মীয়ের বাসায়।’


যুদ্ধ
চালিয়ে
যাবার জন্য
কেউ না কেউ
এসেই
যায়

সেখানে বসে কিছুক্ষণ কথা হলো তার সঙ্গে। দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে কবির ভাইয়ের বক্তব্য : ‘বাঙালির ইতিহাসে নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে। দেখবেন, বদলে যাবে সবকিছু।’
প্রশ্ন করলাম, ‘কবির ভাই, বঙ্গবন্ধু তো বন্দি। নেতৃত্ব দেবেন কে?’
তার উত্তর, ‘এসব ভ্যাকুয়াম থাকে না। যুদ্ধের মাঠে সেনাপতি মারা গেলে কিংবা আহত হলে যুদ্ধ কি থেমে যায়? যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য কেউ না কেউ এসেই যায়।’

আলমগীর কবির– যাকে আমি জেনেছি নানা পরিচয়ে, দেখেছি নানাবিধ ভূমিকায়, এ দেশের মাটিতে চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক বিকাশে তাকে আমি অন্যতম প্রধান বৃক্ষ বলেন জানবো। ছবি নিয়ে লেখালেখি, ছাত্র তৈরি করা, বক্তৃতা দেওয়া, আন্দোলন গড়ে তোলা, গুণীজনের মূল্যায়ন, চলচ্চিত্র নির্মাণ– কত ভূমিকা ছিল তার। আলমগীর কবির নামক মহাকাব্যটি বহুধা বিভক্ত হয়ে আমাদের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে আছেন কণায় কণায়। এই পরিমণ্ডলে যুদ্ধ এখনো চলছে। নেতৃত্ব দেবার জন্য আজ তিনি নেই। তবে সেই শূন্যতা পূরণের জন্য কেউ না কেউ ঠিকই এসে যাচ্ছেন।

আমার বিমুগ্ধ উপলব্ধিতে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের সীমিত পরিসরে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আলমগীর কবির চিরকাল একটি মহাসাগরের মহিমা নিয়েই বিরাজ করবেন।

আলমগীর কবির
শুটিংয়ে চিত্রগ্রাহক এম এ মবিনের সঙ্গে আলমগীর কবির

মূল শিরোনাম : কানে বাজে তাঁর উচ্চারণ : “কেউ না কেউ এসেই যায়”
সূত্র : সোনারং : চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবির সংখ্যা
সম্পাদক : মুনিরা মোরশেদ মুননী
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০০৬

[লেখক প্রয়াত হওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় অনুমতি ছাড়াই পুনঃপ্রকাশ করা হলো বলে দুঃখিত —ফিল্মফ্রি]

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ ।। জন্ম : ১৯৪৬; নরসিংদী । প্রয়াণ : ২৩ আগস্ট ২০১১; ঢাকা ।। ফিল্ম : ফেরারী বসন্ত [যৌথপরিচালনা; ১৯৮৩]; প্রিন্সেস টিনা খান [১৯৮৪]; পোকামাকড়ের ঘর বসতি [১৯৯৬]

মন্তব্য লিখুন