জোনাকি : হয়তো সিনেমা কিংবা স্বপ্ন/ ইশতিয়াক আহমেদ হৃদয়

0
176

লিখেছেন । ইশতিয়াক আহমেদ হৃদয়

জোনাকি
স্ক্রিনরাইটার, এডিটর ও ফিল্মমেকার । আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত
প্রডিউসার । সমীর সরকার
সিনেমাটোগ্রাফার । আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত; মহেন্দ্র শেঠী
প্রোডাকশন ডিজাইনার । জোনাকি ভট্টাচার্য
সাউন্ড ডিজাইনার । হিন্দোল চক্রবর্তী
মিউজিক । আকেক্সান্দার জেকা
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । রত্নাবলি ভট্টাচার্য [মা]; ললিতা চট্টোপাধ্যায় [জোনাকি]; সুমন্ত চট্টোপাধ্যায় [বাবা]; জিম সার্ব [প্রেমিক]
রানিংটাইম । ৯০ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । ভারত
রিলিজ । ২০১৮


সিনেমা বলতে মূলত বুঝি কথোকথন কিংবা গল্পের মিশেল। তারপর আবির্ভাব হলো সেইসব নির্মাতাদের– যাদের সিনেমার একেকটা ইমেজ মূলত একেকটা গল্প। সত্য কথা বলতে গেলে আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের মতো বাংলাতে আর কোনো  ডিরেক্টর শুধু ইমেজ দিয়েই তার পুরো গল্প এক নিঃশ্বাসে বলতে পারেন না।

তাই বরাবরের মতোই অসাধারণ সব ইমেজ আর ডিটেইলিং দিয়ে পরিপূর্ণ তার দ্বিতীয় সিনেমা– জোনাকি। এই সিনেমার গল্প সংক্ষেপে বলতে গেলে, এক বয়স্ক মহিলা তার মৃত্যুশয্যায় তার যাপিত জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেখতে থাকেন। তিনি মনে করতে থাকেন তার গবেষক বাবার কথা– যার সংসারে কোনোরকম মন ছিল না, কিংবা তার খ্রিস্টান প্রেমিকের কথা; কীভাবে তার বিচ্ছেদ হয়ে আরেকজনের সাথে বিয়ে হয়– এইসব ঘটনা দিয়েই এগোতে থাকে গল্প।মূলত আদিত্য বিক্রমের দাদীর কাহিনি নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমা। তার ছোটবেলায় দাদীর মুখে শোনা গল্প নিয়েই জোনাকিজোনাকির গল্পের বর্ণনা দেওয়ার কিছু নাই; যেটা দরকার, তা হচ্ছে– এইসব ইমেজ নির্মাতা তৈরি করেছেন কিভাবে।

জোনাকি
জোনাকি

আর স্বপ্ন যে একটা নন এডিটেড ফিল্ম– তা প্রমাণ করতে কোনো ভুল করেননি নির্মাতা । আদিত্য তার সিনেমার গল্প কতটা সৎ রাখার চেষ্টা করেছে সেটা তার গল্প বলার ভঙ্গিতেই বোঝা গেছে। যেমন, তিনি তো তার দাদীর ছোটবেলাকে নিজ চোখে দেখেন নাই; তাই তিনি বেশিরভাগ সময় দাদীর ছোটবেলাকে কিংবা যৌবনকে দেখিয়েছেন তার দেখা হিসেবেই। যেমন, তিনি তার দাদীকে বয়স্ক অবস্থাতে দেখেছেন; তাই  তাকে বেশিরভাগ সময়েই দেখিয়েছেন ঐ বয়সেই– যা গল্পকে দিয়েছে এক অন্যমাত্রা ।


প্রতিটা ফ্রেম
একেকটা গল্প বলতে
থাকে একেক সময়ের

জোনাকি হতে পারে একটা স্বপ্ন কিংবা সিনেমা। আমাদের স্বপ্ন যেমন আমরা কেটে ফেলতে পারি না মাঝ থেকে, জোনাকিও ঠিক তাই। প্রত্যেক ফ্রেম মনে হয় তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে।মনে হয় প্রতিটা শট কতটুকু যাওয়া প্রয়োজন– সেদিকে মনোনিপাত করেননি নির্মাতা, সে তার আপন গতিতে শুরু হয়, শেষও হয় তার নিজস্ব গতিতেই। প্রতিটা ফ্রেম অত্যন্ত দক্ষভাবে নির্মিত । জোনাকি একটা এমন সিনেমা যার প্রতিটা ফ্রেম একেকটা পেইন্টিং ভেবে সাজিয়ে রাখা যাবে। জোনাকির প্রতিটা ফ্রেম একেকটা গল্প বলতে থাকে একেক সময়ের। আদিত্য এখানে সময়ের স্পেসটা ধরে রেখেছেন তার গল্পের প্রতিটা ধাপেই।

জোনাকি
জোনাকি

ভিজুয়ালের ডিটেইলিংই এই সিনেমার মূল হাতিয়ার। জোনাকির গল্পের প্রতিটা ভিজুয়ালই কোনো না কোনো ব্যপার নির্দেশ করে। পুরো মেটাফোর দিয়েই পরিপূর্ণ এই সিনেমা। যেমন, পুরো শুটিং করা হয়েছে এক পুরাতন বাড়িতে– যা কিনা জোনাকির জীবনের মত ক্ষয়ে যাওয়া; সেখানে নতুন কিছু নাই কিংবা নতুন কোনো জীবনের সঞ্চার হওয়ার সম্ভাবনা নাই। আর জোনাকির জীবনের খ্রিস্টান প্রেমিকের সাথে প্রেম হয় কমলার মধ্য দিয়েই। প্রেম শুরুর সময়গুলোতে একটা করিডোরে একটা-দুইটা কমলার দ্বারা তা শুরু হইলেও কিছুক্ষণ পর পুরা ভরে যায় কমলাতে, যেখানে হয়তো আমরা বুঝি তাদের প্রেমের বয়সও বেড়ে গেছে। এত সুন্দর ভিজুয়াল দেখে মনে হচ্ছিল ঘাসসান কানাফানির ছোটগল্প দ্য ল্যান্ড অব স্যাড অরেঞ্জেস-এর মতোই কমলার দুঃখ চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে।

এ  সিনেমার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মশারি– যা মূলত এখানে বিচ্ছিন্নতা কিংবা অসহায়ত্ব হিসেবেই দেখানো হয়েছে। জোনাকির মা– যিনি তার সংসারের দেখাশোনাতেই জীবন পার করে দিয়েছেন, তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবেগ  কিংবা শারীরিক প্রয়োজনীয়তা রোধের ব্যপারটা নির্মাতা ফুটিয়ে তুলেছেন মশারির মাধ্যমেই। আবার যুদ্ধের ফিগারগুলা দিয়ে জোনাকি তার প্রেমিককে কাছে নিয়ে যায়– সেইটাও স্পষ্ট। তবে যে ব্যপারটা হাইলাইট না করলেই না, সেটা হচ্ছে– কেকের দৃশ্যায়ন। তার স্বামী যখন তাকে মুখে কেক মাখিয়ে চলে যায়, তখন আর কেউ না থাকলেও কেক মাখা মুখে শুধু তার মা তার পাশে থাকেন। কেক’কে হয়তো নির্মাতা কালিমা হিসেবেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। চার্চের মধ্যে অনেকগুলো ছেলেমেয়ের জোনাকি হয়ে উড়ে যাওয়াতে জোনাকির বাচ্চা চলে যাওয়া বা তার জীবনের সমাপ্তি নির্দেশ করে। জোনাকির গল্পের ডিটেইলিংয়ের প্রশংসা আসলে বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না ।

জোনাকি
জোনাকি

জোনাকিতে নামচরিত্রে অভিনয় করেছেন ললিতা চট্টোপাধ্যায় , মায়ের চরিত্রে রত্নাবলি ভট্টাচার্য, বাবার চরিত্রে সুমন্ত চট্টোপাধ্যায় এবং প্রেমিকের চরিত্রে জিম সার্ব। ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় অত্যন্ত সাবলীল, শীতল। তার জমাট আবেগগুলো ধীর চিত্রগ্রহণকে মনে হচ্ছে পূর্ণতা দিয়েছে। রত্নাবলি কিংবা সুমন্তর ডায়ালগের ইমোশান অতিমাত্রার দুষ্টে দুষ্ট নয়; যতটুকু দরকার– ঠিক ততটুকুই তাদের অভিনয়। জিম সার্বের অভিনয়ের স্পেস নাই; তার অভিনয় নিয়ে বলারও কিছু নাই।

জোনাকির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন মাহেন্দ্র শেঠী এবং আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত। আদিত্যের  প্রথম সিনেমা আসা যাওয়ার মাঝেতেও তারা একসাথে কাজ করেছেন। আবার মাহেন্দ্র শেঠীর পুরাতন কিংবা অতিমানবীয় কাজসম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে বিক্রামাদিত্য মোটওয়ানের লুটেরাজোনাকির প্রতিটা ইমেজের এত সুন্দর লাইটিং আর সুন্দর ডলি শট বা ক্যমেরা মুভমেন্ট– যা ফ্রেমগুলাতে এনে দিয়েছে অপার শান্তি । অনেকের মতে  আদিত্য বিক্রমের ভিজুয়াল তারকোভস্কির ভিজুয়াল দ্বারা প্রচণ্ড অনুপ্রাণিত; যদিও আমার মনে হয় তার সাথে বেশি মিল পাওয়া যায় বেলা তারের ক্যমেরা মুভমেন্টের।

জোনাকি
জোনাকি

যদিও জোনাকি সিনেমাটার মূলত এত প্রশংসা পাওয়ার কারণ যদি একটা ডিফাইন করা হয়, তাইলে সেক্ষেত্রে সেটা যাবে প্রোডাকশান ডিজাইন। জোনাকির প্রোডাকশান ডিজাইন করেছেন, যার নামে মূলত এই সিনেমা– জোনাকি ভট্টাচার্য। তিনি আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের স্ত্রী এবং তিনি আদিত্যর পূর্বের সিনেমাতেও প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন; আবার কাজ করেছেন রুবাইয়াত হোসেনের মেড ইন বাংলাদেশ-এও । কাজ দেখলেই বোঝা যায় তার  গভীরতা সম্পর্কে। আতিপ্রাকৃত সেট ডিজাইন; কিন্তু কি সাবলীল দেখা যায় সেগুলোকে!

এতক্ষণ প্রশংসার পর যেটা বলা যায়, তা হলো, আদিত্যের সিনেমা কোনো তথ্যনির্ভর সিনেমা না ।পুরোটাই ভিজুয়াল। সুতরাং যারা ইমেজ ভালবাসেন, কিংবা ধীর গতির সিনেমার মাঝে একটা দুর্দান্ত গতিতে চলতে থাকা ছবির সংকলন দেখতে চান, তবে জোনাকি তাদের জন্য আদর্শ।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনে-কর্মী, বাংলাদেশ । জন্ম রাজশাহী । পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, যোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে । পাঠ নিচ্ছেন সিনেমাটোগ্রাফির; কাজ করছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে

মন্তব্য লিখুন