অরসন ওয়েলসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার । কিস্তি ৫:৫

1
94

সাক্ষাৎকার । কেনেথ টাইনান
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অরসন ওয়েলস [৬ মে ১৯১৫–১০ অক্টোবর ১৯৮৫]। আমেরিকান মাস্টার ডিরেক্টর ও অভিনেতা। থিয়েটার, রেডিও ও সিনেমা– তিন মাধ্যমেই সৃজনী শিল্পগুণের কারণে তিনি বিখ্যাত। তার ‘সিটিজেন কেইন’কে অনেকেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে গণ্য করে…

আগের কিস্তি পড়তে, এই বাক্যে ক্লিক করুন


পঞ্চম ও শেষ কিস্তি

অরসন ওয়েলস
অরসন ওয়েলস
কৌশোরে

কেনেথ টাইনান
কোনো ধর্মীয় আবহে কি বেড়ে উঠেছেন আপনি?

অরসন ওয়েলস
বরং তার উল্টো। আমার মা ছিলেন জন্মগতভাবে একজন ক্যাথলিক; তবে পরে তিনি প্রাচ্যের ধর্মগুলোর একজন ছাত্রী হয়ে উঠেছিলেন– যেটির প্রতি পরবর্তীকালে আবার হারিয়ে ফেলেছিলেন আগ্রহ। বাইবেল তিনি আমাকে পড়তে শিখিয়েছেন চমৎকার এক সাহিত্যকর্ম হিসেবেই। আমার বাবা ছিলেন একেবারেই অজ্ঞেয়বাদী এক মানুষ; আর ড. বার্নস্টেইন [ড. মরিস বার্নস্টেইন; অরসন ওয়েলসের মেন্টর]— যে অভিভাবকটি বাবা-মার মৃত্যুর পর আমার দেখভাল করেছেন, বাইবেলের কাহিনিগুলো নিয়ে তিনি সবসময়ই হাসি-ঠাট্টা করতেন। শৈশবে এ বিষয়টি আমাকে মর্মাহত করত। প্রাচ্যে কিংবা পাশ্চাত্যে– একজন মানুষ নিজের সাধ্যের অতীত যে জিনিস কামনা করে, সেটির প্রতি আমার শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের একটি সহজাত অনুভূতি রয়েছে। এটি আমার কাছে কোনো উল্লসিত অবিশ্বাসবাদের চেয়ে বরং ভক্তিশ্রদ্ধার অনুভূতি হয়েই সহজে ও সহজাতভাবে ধরা দেয়। অতীন্দ্রিবাদী লেখা পড়ি আমি ঠিকই, তবে নিজে আমি অতীন্দ্রিবাদী মানুষ নই।

কেনেথ টাইনান
ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে আপনার?

অরসন ওয়েলস
এ বিষয়টি সম্পর্কে আমার অনুভূতিগুলো একটি স্থির অন্তর্জাগতিক সংলাপের মধ্যে নিহিত : যাদের চিনি না, সেই মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগস্থাপন করে আমার আদৌ কোনো লাভ আছে কিনা, এ ব্যাপারে আমি যথেষ্ট নিশ্চিত নই। হয়তো ধর্মবিশ্বাসী নই, তবে নিশ্চিতভাবেই ধার্মিক আমি। এক আজব তরিকায়, আমি এমনকি যিশুর অমরত্বকেও মেনে নিই। ধর্মবিশ্বাসের আহরণটি এটির নিজস্ব সত্যপরায়ণতা সৃষ্টি করে। এটি এক ধরনের ইয়ুং-ধর্মী [কার্ল ইয়ুং] বোধে কাজ করে; কেননা, এটি একদিক থেকে অনেকটা জীবনের মতো বাস্তব রূপে সত্য করে তৈরি হয়েছে। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ইহুদি পণ্ডিতটি ঈশ্বর কিনা, জবাব দেবো– না। তবে জুডাও-ক্রিশ্চিয়ান আইডিয়া সম্পর্কে ব্যাপক ও দুর্নিবার জিনিস হলো এই মানুষটি : কী তার বংশপরিচয়, কোনো খুনি বনমানুষের সঙ্গে তার মিল কতটা– এসবে কিচ্ছু আসে-যায় না; সে সত্যিকারঅর্থেই অনন্য। যদি নিঃস্বার্থভাবে একে অন্যকে ভালোবাসতে সক্ষম হই, তাহলে এই গ্রহের একটি প্রজাতি হিসেবে সত্যিকারঅর্থেই আমরা একক। দূরবর্তী অবস্থান থেকেও আমাদের মতো দেখতে আর কোনো প্রাণির অস্তিত্ব নেই। যিশুর অমরত্বের মতবাদটি একদিক থেকে এ কথাই বলে। এ কারণেই মিথটি সত্য। সর্বোচ্চতম ট্রাজিক বোধে, এটি এ আইডিয়াকে নাটকীয় করে তোলে যে– মানুষ স্বর্গীয়।


যদি
নিঃস্বার্থভাবে
একে অন্যকে ভালোবাসতে
সক্ষম হই, তাহলে এই গ্রহের
একটি প্রজাতি হিসেবে
সত্যিকারঅর্থেই
আমরা
একক

কেনেথ টাইনান
পুরুষ সম্পর্কে আপনার যে আদর্শ-নিরূপন, নারীর ক্ষেত্রেও কি তা সমানরূপে প্রযোজ্য? এমন কোনো সীমাবদ্ধতা কি রয়েছে– যা নারী অর্জন করতে পারবে?

অরসন ওয়েলস
প্রথম স্ত্রী ভার্জিনিয়া নিকোলসন ওয়েলস ও কন্যা ক্রিস্টোফার ওয়েলসের সঙ্গে
সময় । ১৯৩৮

অরসন ওয়েলস
না। নারী ‘সম্ভবত’ করতে চায়– এমন একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে; তবে সে করতে ‘পারে’– এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সবকিছু করার ব্যবস্থা নারী করে; তবে যা করার সম্ভাবনা তাদের রয়েছে– সেটির প্রশ্নে প্রায়শই সন্তুষ্ট হয় সামান্যই। শিল্পের জগতে পুরুষের মতো বহুসংখ্যক তারা হয়ে ওঠবে– এমনটি অভাবনীয় ব্যাপার। আমি মনে করি, যদি পুরুষের কোনো অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে শিল্পেরও কোনো অস্তিত্ব থাকত না; তবে যদি নারীর কোনো অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে পুরুষ কখনোই শিল্প সৃষ্টি করতে পারত না।

কেনেথ টাইনান
নারীর প্রতি পুরুষের আচরণ যেমন হওয়া উচিত– সেই বিবেচনায় কাকে আপনি আদর্শ হিসেবে বেছে নেবেন?

অরসন ওয়েলস
রবার্ট গ্রেভস। অন্যভাবে বললে, সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন [করতে পারা পুরুষ]। যতটুকু থাকা উচিত, আমার মধ্যে তারচেয়ে কম রয়েছে। মেয়েদের ব্যাপারে আমি পাগলাটে; তবে সমুদ্রবন্দরে আমি ছেলেদের ঘিরে বসে থাকতেই পছন্দ করব। নিজের মধ্যে এডওয়ার্ডিয়ান যুগের [১৯০১-১৯১০] সেকেলে প্রবণতা খুঁজে পাই আমি– যা কিনা নানা যুগে নানা সমাজে বিদ্যমান ছিল : সান্ধ্যভোজের পর আমরা পুরুষরা যেন একটু আলাদা হয়ে কথা বলতে পারি, সেজন্য নারীরা যেন ছেড়ে দেয় আমাদের। আমরা পরে আবার তাদের সঙ্গে যোগ দেবো। যৌনতার উদ্দেশে নারীদের সঙ্গে অবিরাম কথা বলেছি আমি; জীবনের অনেকগুলো বছর এ কাজের জন্য দিয়েছি ছেড়ে। কিন্তু নারীরা সাধারণত বিষণ্নতা কিংবা কর্তৃত্ব আরোপের মাধ্যমে একটি আলাপচারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে; যদিও, নিশ্চিতভাবেই এদের মধ্যে দুর্দান্ত ও সাহসশূন্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। একদিক থেকে, প্রতিটি নারীই একেকজন ব্যতিক্রম। এটিই সাধারণত একজন পুরুষকে উগ্র জাতীয়তাবাদী করে তোলে, আমার মতো।

অরসন ওয়েলস
দ্বিতীয় স্ত্রী রিটা হেওয়ার্থ ও কন্যা রেবেকা ওয়েলসের সঙ্গে
সময় । ১৯৫০

কেনেথ টাইনান
কারও কারও মতে, হ্যালুসিনোজেনিক মাদকের ব্যবহার শিল্প ও বাস্তবতার কিছু অগ্রযোদ্ধাকে সহসাই পিছিয়ে দিতে পারে। এইসব তথাকথিত উপলব্ধির সহায়তা সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?


লাফিয়ে বেড়ানোর চেয়ে যেসব
মানুষ দোলা দিয়ে যায়–
তাদেরকেই আমার
বেশি পছন্দ

অরসন ওয়েলস
মাদকের ব্যবহার হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী, সমাজবিরোধী ও জীবনবিনাশীর একটি বিকৃত প্রকাশভঙ্গিমা। বিশেষত পশ্চিমাবিশ্বে, ভবিষ্যতে, সমাজের অবশ্যম্ভাবীরূপী সমষ্টিগত ধরনের বিরুদ্ধে সর্বাঙ্গীনভাবে ব্যাপক এক প্রতিক্রিয়া এটি। চলুন, অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ টানা যাক। ইউরোপিয়ান নারীরা নিজেদের চোখের পাতায় রঙ করছে, যেন তাদের দেখতে চীনাদের মতো লাগে। জাপানি নারীরা অস্ত্রোপচার করছে– যেন তাদের দেখতে আমেরিকানদের মতো লাগে; শ্বেতাঙ্গ লোকেরা রোদে পোড়াচ্ছে ত্বক, আর নিগ্রোরা নিজেদের চুল করছে সোজা। আমরা একে অন্যের মতো হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্যস্ত। এই ব্যাপক বিস্তৃত গণ-আন্দোলনে– যা কিনা একইসঙ্গে ভালো ও খারাপ– সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবক্ষয়, এবং মানব সংহতির একটি সমর্থন– উভয়ই ডেকে আনছে; এ হলো গণমানুষের কাছ থেকে পিছু হটে কারও একান্তই নিজ একাকিত্বের কাছে ফেরা। এ ধরনের [হ্যালুসিনোজেনিক] মাদকের কাজ আসলে এটিই। এটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের কোনো সাক্ষ্য নয়; বরং সেটির একটি বিকল্পরূপ। যেহেতু বাকি সবাই হয়ে ওঠছে অনেকটা একই রকম, সেখানে এটি আলাদা হওয়ার কোনো প্রচেষ্টা নয়; বরং এক ধরনের ছলচাতুরী। আর আপনার পক্ষে এরচেয়ে খারাপ কিছু করা সম্ভবও নয়। লাফিয়ে বেড়ানোর চেয়ে যেসব মানুষ দোলা দিয়ে যায়– তাদেরকেই আমার বেশি পছন্দ।

কেনেথ টাইনান
কিছু দার্শনিক মনে করতেন, শিল্প হলো প্রতিবাদের একটি প্রকাশভঙ্গিমা। যদি তা-ই হয়, আপনি কি মনে করেন নৈরাশ্য ও চাপবর্জিত, প্রাচুর্যের একটি স্বয়ংক্রিয় পৃথিবীতে, শিল্প সৃষ্টি করার কথা অনুভব করতে কেউই বাধ্য হবে না?

অরসন ওয়েলস
এমনকি একটি নিখুত ঝিঁনুকের খোলসে, অন্য কোনো বালুকণা আর হবে না, তার মানে হবে না অন্য কোনো মুক্তা– আমি তা মনে করি না। শিল্পকে নিরানন্দের ওপরই ভিত্তি করা জরুরি– এমন কথা মানি না আমি। এটি তো প্রায়শই নির্মল ও আনন্দমুখর, এবং এক ধরনের উদযাপনও। আত্মিক ও অর্থনৈতিক হীনাবস্থা এবং এমনকি পীড়নের পরিস্থিতিতে ব্যাপকসংখ্যক শিল্পকর্ম সৃষ্টি হয়েছে– এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই ঠিকই; তবে মানুষ যত সুখি হবে, সংস্কৃতি ততই দরিদ্র হতে থাকবে– এমনটা হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

কেনেথ টাইনান
কিছু সমালোচক দাবি করেন, আধুনিক শিল্প দৈবক্রমেও সৃষ্টি হতে পারে– যেমন অ্যাকশন পেইন্টিং, সাডেন মিউজিক ও থ্রিয়েট্রিক্যাল মোমেন্ট। কোনো রকম উদ্দেশ্য ছাড়াই একটি শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা সম্ভব বলে মনে করেন আপনি?

অরসন ওয়েলস
সুনিশ্চিতভাবেই না। আপনি এমন কিছু হয়তো সৃষ্টি করতে পারেন, যা আপনাকে কোনো শিল্পকর্মের মতোই খানিকটা আনন্দ ও আবেগ এনে দেবে; স্রেফ যেমন তুষারকণা কিংবা ফিতাকৃমি কিংবা ক্যান্সার কোষের কোনো মাইক্রোস্কোপিক স্টাডি হয়তো কোনো সুন্দর অবজেক্ট হতে পারে। কিন্তু একটি শিল্পকর্ম হলো এমন একটি সচেতন মানব উদ্যোগ– যেটিকে যোগাযোগসক্ষম হয়ে ওঠতেই হয়। এটি হয় এমনই; নয়তো এ কিছুই নয়। যখন কোনো দৈবঘটনাকে শিল্পকর্ম হিসেবে প্রশংসিত করা হয়, যখন অসাবধানী সৌন্দর্যের মাধুর্য ঘিরে কোনো স্তুতি বেড়ে ওঠতে থাকে, তখন বুঝতে হবে পশ্চিমাবিশ্বের ইতিহাসের সর্বব্যাপক অবক্ষয়ের সম্মুখে উপস্থিত রয়েছি আমরা।

অরসন ওয়েলস
তৃতীয় স্ত্রী পলা মোরি ও কন্যা বিট্রিসের সঙ্গে
সময় । ১৯৫৬

কেনেথ টাইনান
যেসব আধুনিক শিল্পী বলে থাকেন : ‘নিজ কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, কেবল বর্তমানই গুরুত্বপূর্ণ’– তাদের সঙ্গে আপনি একমত?

অরসন ওয়েলস
না। কেননা, আজকের দিন কী হচ্ছে– এ নিয়েও মাথা ঘামানো উচিত নয় শিল্পীর। আত্মসচেতনভাবে সমকালীন হতে চাইলে আজকের দিন নিয়ে মাথা ঘামানো মানে অন্য সময়টিকে বর্জন করা– যা কিনা বিশ্রি রকমের সঙ্কীর্ণতা। ফেরিঅলা সংশ্লিষ্ট শিল্পী সংগঠনগুলোর সমস্যা এটিই। এ ক্ষেত্রে আজকের দিনকে মহিমান্বিত ও সৌন্দর্যদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু আজকের দিন তো আমাদের গ্রহের ইতিহাসে স্রেফ একটি দিনই মাত্র। যে মানুষ কোনো কিছু বিক্রি করছে– এটি তো কেবল তার কাছে ‘এ-ই সব’ ও ‘সবই শেষ’ ব্যাপার।

কেনেথ টাইনান
অ্যাডভারটাইজিং ইন্ডাস্ট্রি শিল্পীদের ওপর– লেখকদের পাশাপাশি পেইন্টার ও ডিজাইনারদের ওপরও কোন ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?

অরসন ওয়েলস
অ্যাডভারটাইজারেরা যেখানেই হাত রাখছেন, সেখানেই একটি সর্বনাশা প্রভাব তৈরি করে দিচ্ছেন। তারা শিল্পীকে শুধু বিপথগামীই করছেন না, বরং তাদের সত্তাকে করে দিচ্ছে খর্বও। তারা কেবল তাকে খর্বই করে দিচ্ছেন না, বরং তার আত্মাকেও শুষে নিচ্ছেন। আর শিল্পীটি জীবনে যত না ব্যবসায়ীর কাছে গিয়েছেন, তারচেয়েও বেশি যাওয়া অব্যাহত রাখছেন অ্যাডভারটাইজারের কাছে। শিল্পের এই চিরন্তন শত্রুটির জন্য বাজারে সবসময়ই জায়গা থাকে। সেখানে আপনি সওদাগরটি ও হাতুড়ে ডাক্তারটিকে পাবেন– যে মানুষটির কাছে বিক্রির জন্য সদাই রয়েছে এবং যে মানুষটির কাছে রয়েছে সাপের তেল। অতীতে যারা ছিলেন বণিক রাজপুত্র, ঠেলাগাড়িঅলা হকার, তারা হলিউডের মুঘল হয়ে ওঠেছেন ঠিকই; কিন্তু তারা ছিলেন ব্যাপক পরিসরে সৎ বিক্রেতা, তারা মানুষকে সে জিনিসই দিতেন– যে জিনিসকে নিজেরা ভালো মনে করতেন; আর যদি তা [ভালো] না হয়েও থাকে, তারা শিল্পীর জীবনে ততক্ষণ পর্যন্ত হানা দিতেন না, যতক্ষণ না শিল্পী স্বেচ্ছায় সেই ছাড়টুকু দিতে রাজি হতেন। কিন্তু এখন আমরা পড়ে গেছি সাপের তেল বিক্রেতা বালকদের হাতে। অ্যাডভারটাইজারদের মধ্যে আপনি সেই শিল্পীদের খুঁজে পাবেন– যারা নিজেদের পেশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, এবং যারা একই পেশায় থাকা নিজেদের গুরুভাইদের সঙ্গে লেপ্টে থাকেন।


এখন
আমরা
পড়ে গেছি
সাপের তেল
বিক্রেতা বালকদের হাতে

অ্যাডভারটাইজিং পেশাটির বেশিরভাগ অংশই ভরে আছে নির্লজ্জ কবি, হতাশাগ্রস্ত ঔপন্যাসিক, নিরাশ অভিনেতা ও অসফল প্রডিউসারদের জোড়াতালিতে। তারা কোনো-না-কোনোভাবে শিল্পের সামগ্রিক মহাবিশ্বটিতে পরিব্যাপ্ত হতে সক্ষম হয়েছেন; ফলে শিল্পী নিজেকে এখন একজন অ্যাডাটাইজিংয়ের মানুষ হিসেবেই ভাবেন ও কাজ করেন। তিনি বিক্রয়যোগ্য জিনিসপত্র তৈরি করেন; মুহূর্তেই ফল পাওয়ার তরিকায় কাজ করেন, আর সত্যিকারের কনটেন্টের ঘাটতি নিয়েই করেন হুল্লোড়। তিনি সাবানের কৌটার ছবি পেইন্ট করেন; আর বলেন, এ নাকি শিল্প। যথেষ্ট সুন্দরভাবে ডিজাইন করা সাবানের একটি কৌটার পক্ষে একটি শিল্পকর্ম হয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু এটির পক্ষে কোনো পেইন্টিং হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।

অরসন ওয়েলস
অরসন ওয়েলস
জীবনের শেষ প্রান্তে

কেনেথ টাইনান
মৃত্যুর পর কী হবে– এ নিয়ে আপনার কোনো তত্ত্ব আছে?

অরসন ওয়েলস
আমি আমার আত্মাকে চিনি না, তবে শরীরটি হোয়াইট হাউসে পাঠানো হবে। মৃত্যুর পর আপনার জিনিসপত্র কোন দেশে কোন মানুষটির কাছে পাঠানো হবে– সেটি আমেরিকান পাসপোর্টগুলোতে লেখাই থাকে। বহুকাল আমি খেয়াল করেছি, এতে [পাসপোর্টে] প্রেসিডেন্টের নাম-ঠিকানা লেখার কোনো বিধান নাই। ডিপ্লোমেটিক ভিসার ক্ষেত্রে বহু দেশের সীমান্তের ওপরই একটি শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। এইজেনহাওয়ারের [আমেরিকান প্রেসিডেন্ট] সুদীর্ঘ বছরগুলোতে, আমার একেবারেই মরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হয়েছিল, কোনো এক সন্ধ্যায় তার টেলিভিশন সেটের সামনে আমার কফিনটি দেখানোর উদ্দেশে।

কেনেথ টাইনান
আপনাকে এ দুনিয়া কীভাবে মনে রাখুক– আপনি চান?

অরসন ওয়েলস
কাজের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে দুনিয়ার সঙ্গে বৈষয়িক সাফল্যের বিচারে সম্পৃক্ত থাকার বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি আমি। এটি একেবারেই সত্যি কথা; এর মধ্যে রঙ-ঢঙ নেই কোনো। একটি পর্যায় পর্যন্ত, কাজ করার জন্য আমার সাফল্য পাবার দরকার ছিলই। কিন্তু আমি মনে করি, সাফল্যের লালন করাটা কলুষিত বিষয়; আর, উত্তরসূরী নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে ইতরামি অন্য কিছুই হতে পারে না।


কেনেথ টাইনান
[২ এপ্রিল ১৯২৭–২৬ জুলাই ১৯৮০]
লেখক ও সমালোচক । যুক্তরাষ্ট্র

উৎস ।। প্লেবয় ম্যাগাজিন । ১৯৬৭
অনুবাদটির প্রথম প্রকাশ ।। ইত্তেফাক ঈদ ম্যাগাজিন । ২০১৮
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন