চান্তাল আকেরমানের সঙ্গে আলাপ । কিস্তি-৫ [৭]

1
40

সাক্ষাৎকার গ্রহণ । নিকোল ব্রেনেজ
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
চান্তাল আকেরমান [৬ জুন ১৯৫০-৫ অক্টোবর ২০১৫]। বেলজিয়ান ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম স্বতন্ত্র বিপ্লবী অ্যাকটর-ডিরেক্টর। ২০১১ সালের গ্রীষ্মকালে, সদ্যনির্মিত সিনেমা “আলমেয়ার’স ফলি”র সূত্রধরে, নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারটির তৃতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো এখানে…
আগের কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন এই বাক্যে


সা ক্ষা ৎ কা র

প্রসঙ্গ : জ্যেন ডেলমাঁ

চান্তাল আকেরমান
জ্যেন ডেলমাঁ
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
আপনার কাজে একগুচ্ছ আত্মপ্রতিকৃতি রয়েছে, এবং একটি সৌম্য ব্যক্তিত্ব– যে পোর্ট্রেইচার ও ন্যারেটিভের মধ্যকার সম্পর্কটি সামগ্রিকভাবে নতুনরূপে হাজির করেছে : একজন মায়ের ব্যক্তিত্ব, জ্যেন ডেলমাঁর ব্যক্তিত্ব।

চান্তাল আকেরমান •
জ্যেন ডেলমাঁ
র স্ক্রিপ্ট লেখার সময়, এই ব্যক্তিত্বটিকে আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি। বহুকাল পরে বুঝতে পারলাম, এই সিনেমাটি কেবল একজন বিমুগ্ধকারী নারীরই নয়, বরং হারানো ইহুদি আচার-সংস্কারের ওপরও। নারীটি যদি ভীষণ রকম বিমুগ্ধকারী হয়ে থাকে, এর কারণ, উদ্বেগের উদ্দেশে এক ঘণ্টা ছেড়ে দেওয়াকে এড়িয়ে যাওয়া। যখনই সেই অতিরিক্ত ঘণ্টাটি এসে হাজির হয়, তার সকল উদ্বেগ প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।

মানসিক সঙ্কট ও বিশ্লেষণের পর আমি এটা বুঝতে পেরেছি। আমি চাইতাম, আমার মা যেন স্যাবাথ [ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মমতে, সপ্তাহে এক দিন জাগতিক ব্যস্ততা পরিহার করে ধর্মচর্চায় নিজেকে নিবেদিত করার রীতি; ইহুদিরা পালন করে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত] পালন করেন, মোমবাতি জ্বালান; আমার দাদার মৃত্যুর পর থেকে এটি চলে এসেছে– আমার মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটাকে যে মানুষটি মেনে নিয়েছিলেন [নানা মারা গিয়েছিলেন বন্দিশিবিরের দিনগুলোতেই]। দাদা যখন মারা যান, তখনো আমি খুব ছোট; রাতের বেলায় আমাকে ইহুদি স্কুলটি থেকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল। এ ছিল এক প্রবল ধাক্কা। কেননা, এর মাধ্যমে আমার দাদার সঙ্গে আরেকটি সংযোগ ভেঙে পড়ল। আমার কাছে স্যাবাথ পালন করা মানে ছিল, আমার মেয়েজন্মকে মেনে নেওয়া সেই মানুষটির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের একটি পুনরুজ্জীবন। এ সত্যিকারঅর্থেই এক চমৎকার ধর্মীয় রীতি, শক্তিধর ও এমনকি দার্শনিকও– যদি আপনি এটিকে উপলব্ধি করতে পারেন। প্রাণী থেকে মানুষ হয়ে ওঠার উত্তরণের সঙ্গে এই ধর্মীয় রীতিটির আইডিয়া জড়িত। খাদ্যসংক্রান্ত নিয়ম অনুসারে, আপনাকে জানতেই হবে, কোনটি দুধের তৈরি, কিংবা কোনগুলো অন্যান্য খাবারের পণ্য; আপনাকে ভেবেচিন্তে খেতে হবে। এই আইডিয়াটি আমার পছন্দ। ঠিকঠাক মানি না ঠিকই, তবে মূল বিষয়গুলো অন্তত জানা আছে আমার। আমি জানি, এ সময়ে কেন আপনি শেলফিশ [চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক শ্রেণির খাবার] খেতে পারবেন না : কারণ কখনোই পূর্ণ বিকাশ ঘটে না এগুলোর।

নিকোল ব্রেনেজ •
আপনার কথা শুনে কেইন জ্যাকবসের কথা মনে পড়ে গেল, যিনি একবার বলেছিলেন, টম, টম, দ্য পিপার’স সন [১৯৬৯] ফিল্মটি যৌনপ্রবৃত্তির একটি ইহুদি ধর্মরীতি সম্পর্কে বানানো।

চান্তাল আকেরমান •
নারীকে বলাৎকার করার আগে পুরুষেরা যেন খুব সামান্যই ভাবে– সেজন্য প্রচুরসংখ্যক যৌনাচার তৈরি করা হয়েছে। ইহুদি ধর্মমতে, নিজের স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করা পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক। যদি সে তা না পারে, তাহলে এর ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যেতে পারে। আমার এক কাজিনকে স্রেফ এ কারণেই বিবাহবিচ্ছেদ করতে হয়েছিল। শুক্রবার রাতে, পুরুষটিকে নিজ স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতেই হবে; ফলে নিজের স্ত্রীর কাছে তাকে যেতেই হয়েছি, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে নিজেকেই ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ রীতিটি মানার জন্য আপনাকে ধর্মবিশ্বাসী হতেই হবে– তা কিন্তু নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, অতি-ধর্মগোঁড়ারা এইসব রীতি বদলে দিয়েছেন, এবং তা বাজেভাবেই।

অ্যানিয়েস ভার্দা
অ্যানিয়েস ভার্দা মার্গারিতা দুরাস

নিকোল ব্রেনেজ •
জ্যেন ডেলমাঁ মুক্তির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

চান্তাল আকেরমান •
কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনীর পর, প্রথম যিনি আওয়াজ তুলেছেন, তিনি– মার্গারিতা দুরাস। তক্ষুণি তিনি ফিল্মটিকে খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, তিনি হলে খুনের দৃশ্যধারণ করতেন না, তিনি হলে এটিকে ‘পর্যায়ক্রমিক’রূপে বানাতেন। তিনি আদৌ কিছু বুঝতে পেরেছিলেন বলে আমার মনে হয় না। তিনি বলেছিলেন, ‘নারীটি বদ্ধউন্মাদ’। তার মানে, তিনি নিজের দুনিয়ার সঙ্গে চরিত্রটিকে এভাবেই মেলাতে চেয়েছেন। শুনে রাগে ফুঁসে ওঠেছিলাম আমি। আমার কাছে নারীটি [কেন্দ্রীয় চরিত্র] তো আমার ছোটবেলা থেকে চেনা-জানা সকল নারীর মতোই। তারা কি উন্মাদ ছিলেন, নাকি তাদের জন্য এ ছিল উন্মাদনা ও উৎকণ্ঠার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি তরিকা?

মার্গারিতা নিজের চারপাশে রক্ষাকবজ তৈরি করে নিতে পেরেছেন, যেন তিনি অবিরাম উন্নতি করতে ও দোল খেতে পারেন। অ্যানিয়েস প্রসঙ্গে বলব, আমরা কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম ঠিকই, তবে নারীদের প্রতি তুমুল ঔদার্যের মুহূর্তগুলো ধারণ করতে তিনি সক্ষম; অন্যদিকে মার্গারিতার দাক্ষিণ্য কেবল পুরুষের প্রতি; তাদেরকে তিনি পাগলের মতো ভালোবাসতেন। তার সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা না হলেই ভালো হতো।


যখনই
কেউ আমাকে
বলে, ‘আপনার কাজ
ভালোবাসি, আপনার সঙ্গে
দেখা করতে চাই’, আমি বলি :
দেখা না করাই বরং ভালো। আমি
আপনাকে হতাশ
করতে
পারি।’

জ্যেন ডেলমাঁ ইন্ডিয়া সং [মার্গারিতা দুরাস; ১৯৭৫] একসঙ্গে মুক্তি পাওয়ায় এবং সব ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাশাপাশি দেখানোয় আমাদের দুজনকে তিন মাস একসঙ্গে কাটাতে হয়েছিল। মার্গারিতা অহর্নিশ খারাপ দিকটি পেয়েছেন, প্রথমত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, তারপর কমিউনিস্ট পার্টির দিনগুলোতে; তবে এগুলোর প্রতিফলন তার কাজে পড়েছে। মঞ্চে তার ইডেন সিনেমা [L’Eden Cinéma; ১৯৭৭] দেখতে গিয়েছিলাম; দুর্দান্ত নাটক ছিল এটি। অন্তঃস্থল থেকে বললে, তাকে আমি তবু পছন্দ করি।

সত্যিকারঅর্থেই ‘সৃজনকারীদের’ সঙ্গে দেখা না করাটা সবসময়ই শ্রেয়। যখনই কেউ আমাকে বলে, ‘আপনার কাজ ভালোবাসি, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই’, আমি বলি : দেখা না করাই বরং ভালো। আমি আপনাকে হতাশ করতে পারি।’

প্রসঙ্গ : ইমানুয়েল লিভিনাস

চান্তাল আকেরমান
গোল্ডেন এইটিজ
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
দুল্যুজ কিংবা লাকাঁর চেয়ে লিভিনাসের সেমিনারগুলোতে আপনি অপেক্ষাকৃত বেশি নিবিড়ভাবে নজর রেখেছেন।

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ, প্রতি শনিবার আমি মিশেল-আগেঁ অতুইয়ের [প্যারিস মেট্রোর সাবওয়ে স্টেশন] ইএনআইও’তে [‘দ্য ইস্টার্ন ইসরায়েল নরমাল স্কুল’] যেতাম। সাপ্তাহিক স্তবকটির অনুবাদ শোনাতেন লিভিনাস। সারাটা বছর তিনি বাইবেলের অনুবাদ শুনিয়েছেন, স্তবক অনুবাদের ছাত্র বানিয়েছেন, তারপর চারপাশে বই ঘিরে রাখা নিজের চেয়ারটিতে গুটিসুঁটি মেরে বসে তিনি স্তবকগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা প্রশ্ন করে, তর্ক করে শিখতাম; তবে বেশিরভাগ সময় প্রশ্ন করেই। কোনো ইয়েশিভাতে [ইহুদিধর্মীয় পাঠশালা] যাওয়া মানে প্রশ্ন ও তর্কের শিল্পটিকে শেখা; আর তা এই সহস্রাব্দকে ঘিরে, হিব্রু-বাইবেলকে ঘিরে। তালমুদ [র‌্যাবিনিক ইহুদিবাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং ইহুদি ধর্মবিধি ও ধর্মতত্ত্বের প্রাথমিক উৎস] মানে আলোচনা করতে শেখা, সবকিছুকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলা, নিজের ভাবনার বিকাশ ঘটানো।

নিকোল ব্রেনেজ •
…একটি ন্যায়শাস্ত্রসম্মত বোধ অর্জন করার জন্য…

চান্তাল আকেরমান •
এ ক্ষেত্রে ন্যায়শাস্ত্র [ডায়ালেকটিক] শব্দটিকে আমার ঠিক যথাযোগ্য মনে হয় না। না। যাহোক, এই শব্দটি আসলে মার্ক্সবাদের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত, এমনকি মার্ক্স ইহুদি হলেও কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের প্রতিফলন এবং আরো বেশিমাত্রার প্রতিফলন চর্চার ভেতর শেকড় প্রোথিত ছিল তার।

নিকোল ব্রেনেজ •
লিভিনাসের সেমিনারগুলো থেকে আপনি কি কোনো নোট রাখতেন?

চান্তাল আকেরমান •
না, আমি কোনো নোট নিইনি; আর আমার প্রথম ব্রেকডাউনের পর সবকিছুই ভুলে গেছি। তারপর থেকে আমার স্মৃতিশক্তি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। যে রকম বানাতে চেয়েছিলাম, সে রকম হয়ে না ওঠা সিনেমা– গোল্ডেন এইটিজ-এর স্রেফ আগ পর্যন্ত এই স্মৃতিশক্তিহ্রাসই ছিল আমার জন্য এক সত্যিকারের দুর্যোগ।

নিকোল ব্রেনেজ •
সময়ের ল্যান্ডস্কেপে এটি কি অবিশ্বাস্য রকমের বিরল ও বিস্ফোরণ এক কাজ হয়ে উঠেছিল– তা আমার মনে আছে; এ রকম একটি ফুরফুরে ও প্রাণবন্ত মিউজিক্যাল ফিল্মের প্রত্যাশা কেউই করেনি। ১৯৮০ দশকের অথর ফিল্মগুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ রুচির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে এ ছিল এক ধরনের উল্লাস।


আমি সবকিছু ‘লাত্থি মারতে’
চেয়েছিলাম– বাবার
নামে লাথি মেরে,
নিজেকে
পুনরাবৃত্ত
করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলাম

চান্তাল আকেরমান •
প্রডিউসাররা চেয়েছিলেন আমাকে দিয়ে জ্যেন ডেলমাঁর রিমেক বানাতে; কিন্তু আমি সবকিছু ‘লাত্থি মারতে’ চেয়েছিলাম– বাবার নামে লাথি মেরে, নিজেকে পুনরাবৃত্ত করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলাম। এ জন্য বেশ কয়েকটি ট্রায়ালও করলাম; এবং অন্যান্য কারণের পাশাপাশি রিসোর্সের ঘাটতিতে ভোগান্তি পোহানো সর্বশেষ ফিল্মটির চেয়ে আরও উল্লাসমুখর কোনো সিনেমার সম্ভাবনা যাচাই করে দেখলাম দ্য এইটিজ ও অন্যান্য সিনেমার মাধ্যমে। যাহোক, গানগুলো লিখতে পেরেছিলাম বলে আমি খুব খুশি।

প্রসঙ্গ : মেনিলমোন্তাঁ

নিকোল ব্রেনেজ •
প্যারিসের এই দুঃস্থ অঞ্চলটিতে বসবাস করার সিদ্ধান্তটি কেন নিয়েছিলেন?

চান্তাল আকেরমান •
আমি এটিকে দুঃস্থ ভাবি না; বরং উল্টোই ভাবি। আমি এই শঙ্কর পাড়াটিতে থাকতে ভালোবাসি। এখানে ২০ বছর ধরে আছি। আগে থাকতাম ১০৭ রু দু মেনিলমোন্তাঁয়। অন্য সব শহরের মতো, এখানেই একটা স্থানীয় পাগলা লোক আছেন, নাম– গাসপার। পুরো এলাকটির খেয়াল রাখেন তিনি। রাস্তার অপর পাশের দালানটিকে ৮৯টি ভিন্ন ভিন্ন জাতিয়তার লোকজন থাকে। আমি এখানে শিশুদের বড় হয়ে ওঠতে দেখেছি, দালানটিকে জীর্ণ হয়ে ওঠতে দেখেছি; কেউই কিছু করেনি। পা কেটে ফেলে এক যুবককে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলতে দেখেছি। এখন সে একটা বেঞ্চে বসে, অতিকায় এক রেডিওতে র‌্যাপ গান শুনে জীবন কাটায়। আমি ওর পাশ দিয়ে যখন যাই, সবসময়ই বলে, ‘কেমন লাগছে, চান্তাল?’ ‘ওহ, ভালোই লাগছে।’ কখনো কখনো আমাকে সে ‘মাদাম চান্তাল’ বলেও ডাকে।

প্রসঙ্গ : এফ.ভি. মুরনৌ ও ‘টাবু’

এফ.ভি. মুরনৌ
টাবু
ফিল্মমেকার । এফ.ভি. মুরনৌ

চান্তাল আকেরমান •
কী যে সারল্যের সঙ্গে, কী যে মিতব্যয়ের সঙ্গে, কী যে সৌন্দর্যের সঙ্গে টাবুর অল্পবয়সী চরিত্রগুলোকে হাজির করা হয়েছে। নিপীড়কদের জন্য এটি সত্যিই একটি আতঙ্ক। সানরাইজ [এফ.ভি. মুরনৌ; ১৯২৭] সিনেমাটাও আমার পছন্দের; তবে টাবুতে বিষয়গুলো হয়ে উঠেছে আরও বেশি খারাপ; এটির প্রেমিকযুগলটি সানরাইজ-এর মতো শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার পায়নি। এখানে কোনো ভালো কিংবা খারাপ নারী নেই।

নিকোল ব্রেনেজ •
আলমেয়ার’স ফলিতে নৌকায় সব তরুণ-তরুণীর ঘুমিয়ে থাকার শটটি টাবু দ্য নাইট অব দ্য হান্টার-এর [চার্লস লাফটন; ১৯৫৫] মধ্যকার একটি ক্রস বা পারাপার বলে মনে হয়।

চান্তাল আকেরমান •
তা হতে পারে। আমার কোনো ভিজুয়াল মেমরি নেই; আছে কেবল ইমোশনাল মেমরি; কেবল নিজে থেকে আমার মনে উঁকি না দিলে, আমি কোনো শটই আলাদা করে ঠিকঠাক মনে রাখতে পারি না।

প্রসঙ্গ : না

চান্তাল আকেরমান
ফ্রম দ্য ইস্ট
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
আপনাকে কেউ কখনো কোনো প্রশ্ন করলে, সাধারণত দেখা যায়, উত্তর দিতে গিয়ে আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়াটি হয়ে থাকে– ‘না’। প্রচুর লেখক ও চিত্রশিল্পীর মতো আপনার মধ্যেও স্ববিরোধিতার একটি প্রবল দাপুটে প্রবৃত্তি রয়েছে। আপনার কথা ভাবলে গোয়্যেটের লেখা ফাউস্ট-এর সেই লাইনটি মনে পড়ে যায় : “প্রবৃত্তিটি সবসময়ই ‘না’ বলে।”

চান্তাল আকেরমান •
কিন্তু না! যখন উত্তরগুলো আমাকে আঁকড়ে ধরে, ভাষান্তরের একটি রীতি হিসেবে আমি ‘না’ শব্দটি বলি। আমি এটিকে এভাবে মানতে, একেবারেই সহজ হিসেবে ধরতে চাই না। তবে ‘না’ বলার পর আমি মুখ খুলি। যখন কোনো প্রসঙ্গকে সত্যিকারঅর্থেই নিবিড়ভাবে জানতে পারি, তখন সেটিকে ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে ও মুখ খুলতে কিছুটা সময় নিতে চাই। কেবল একটিমাত্র ভাবনাই আঁকড়ে থাকতে চাই না; ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে খেলা করতে পারে– এমন ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা আমি পেতেই চাই। ফলে যখন নিজেকে কোনো ‘অ্যাজেন্ডা’র মধ্যে খুঁজে পাই, তখনই ‘না’ দিয়ে কথা শুরু করি। শিল্প নিয়ে যে মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলতে আমি সত্যিকারঅর্থেই ভালোবাসি, তাদের অন্যতম হলেন অস্ট্রেলিয়ান কিউরেটর– লিন কুক। সবসময়ই একটা উন্মুক্ত অবস্থান থেকে, চমৎকারভাবে প্রশ্ন করেন তিনি। ফ্রম দ্য ইস্ট-এর র‌্যাপপার্টির [শুটিং শেষের পার্টি] ঠিক পরদিনই তার সঙ্গে প্রথম দেখা আমার; সারা রাত আমরা মাত্রাতিরিক্ত রকমের মদ্যপান করে, মাত্রই ঘুমিয়েছি। আচমকা কলিংবেল বেজে ওঠল; আমি দরজা খুলে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে। তাকে দেখার আশা আদৌ করেছিলাম কিনা, মনে পড়ে না। জানতামও না তার পরিচয়। বিশুদ্ধতম না হয়েও কোনো না কোনোভাবে তিনি বিশুদ্ধ মানুষ। তিনি আমাকে প্রচুর ভাবাতে থাকলেন; আমার মতে তিনি এ সময়ে শিল্পের দুনিয়ায় অন্যতম সেরা চিন্তাবিদ।

নিকোল ব্রেনেজ •
সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে কার কার প্রতি আপনার আগ্রহ আছে?

চান্তাল আকেরমান •
বরাবরের জন্যই রিচার্ড স্যেরা। তাকে আমি শ্রেষ্ঠতম ভাস্কর, শ্রেষ্ঠতম ভিজুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে গণ্য করি। তার ভাস্কর্যের জগতে ঢোকা মানে টাইম ও স্পেস ভুলে যাওয়া, আর একটা ফিজিক্যাল জিওমেট্রির আবির্ভাব ঘটা– যা কিনা আমার ভালোলাগে। মিউজিকের ক্ষেত্রে কুর্টাগ, সেলসি ও মন্তেভের্দি আমার প্রিয়। ১৯৬৮ সালে স্টকহাউকেনের মোমেন্তে আমাকে সত্যিকারের ঝাঁকুনি দিয়েছে; কনটেম্পরারি মিউজিকের কাছ থেকে এটিই আমার পাওয়া প্রথম ঝাঁকুনি। কোর‌্যালি তিনি যা কিছু করেছেন, সত্যিই খুব সুন্দর।

১৯৭১-৩ সালে, যখন আমি নিউইয়র্ক থাকতাম, এই সকল ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক আইডিয়াগুলোর অন্বেষণ ও আবির্ভাবে নিজেকে নিমগ্ন রেখেছি। চার্লমাগনে প্যালেস্টিন, ফিল গ্লাস– এদের কাজ আমার বিশেষভাবে ভালোলাগত; তবে ফিল গ্লাসের কাজ এখন হয়ে উঠেছে একটি একেবারেই সরলরীতির মতো, ফলে আমাকে আর টানে না। অন্যদের কাজ এখনো নজরে রাখার মতো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকাল । ১৫ জুলাই ও ৬ আগস্ট ২০১১; প্যারিস, ফ্রান্স 
সূত্র । লোলা জার্নাল

ষষ্ঠ কিস্তি, আসছে শিগগিরই…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন