যে জীবন জিন সিবার্গের

0
90

মূল । রব বেকার
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

জিন সিবার্গ
জিন সিবার্গ
[ফরাসি উচ্চারণ, জ্যঁ সেবার্গ]
জন্ম । ১১ নভেম্বর ১৯৩৮; মার্শালটাউন, আইওয়া, যুক্তরাষ্ট্র
প্রয়াণ । ৩০ আগস্ট ১৯৭৯; প্যারিস, ফ্রান্স

“তার প্রতিটি নড়াচড়াই মাধুর্যময়; প্রতিটি চাহনিই সুনিপুণ। তার মাথার আকার, তার দেহভাষা, তার হাঁটা… সবই নিখুঁত।”
–ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো


১৯৫৬
অভিনেত্রী হতে লন্ডনে হাজির অষ্টাদশী সিবার্গ

১৯৭৪ সালে, কয়েকটি রূঢ় বছর কাটানোর পর, জিন সিবার্গকে এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কী করে তিনি সামলে উঠছেন; জবাবে বলেছিলেন, ‘নিজের মতোই থাকছি; যদি জানতে চান আজ থেকে ১০ বছর পর কী করব, আমি তার জবাব দিতে পারব না। এ হলো ৪৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরও মাধুর্যময়ী থাকবে কি না– কোনো নারীকে এমনতর প্রশ্ন করা।…’

জিন সিবার্গ
১৯৫৬
ফটোগ্রাফিক ম্যাগাজিন ‘পিকচার পোস্ট’-এ তার আবির্ভাব সংবাদ

ছয় বছর পর, ৪০ বছর বয়সে, প্যারিসের একটি রাস্তার পাশের এক গাড়ির পেছনের আসনে তাকে মৃত পাওয়া গেল। তখন আগস্ট মাস; কম্বলে প্যাঁচানো মৃতদেহ তিনি; ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর শুয়ে আছেন! মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ; ফরাসি কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘সম্ভবত আত্মহনন’ হিসেবে গণ্য করল। পাশে পাওয়া গেল নিজের পুত্রকে লেখা তার চিরকুট :

“ক্ষমা করে দিও আমাকে। এ রকম মানসিক অবস্থায় আমি আর বেঁচে থাকতে পারছিলাম না। বোঝার চেষ্টা করো। আমি জানি তুমি বুঝবে; জানোই তো তোমাকে ভালোবাসি। সাহস রেখো।
–তোমার স্নেহময়ী মামণি, জিন।”

জিন সিবার্গ
১৯৫৬
সেন্ট জ্যোন-এর স্ক্রিনটেস্টে
ছবি । বব উইলাফবাই

জর্জ বার্নার্ড শ’র সেন্ট জ্যোন নাটক অবলম্বনে, একই শিরোনামে বানানো সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য, ১৯৫৬ সালে তিনি যখন ইংল্যান্ডে উড়ে এসেছিলেন, তার তখন মাত্রই ১৮ বছর বয়স। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যের মার্শালটাউন শহরের একেবারেই অনভিজ্ঞ এই ছাত্রীটিকে দেড় লাখ ডলারের এক প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৮ হাজার প্রার্থীর মধ্য থেকে বেছে নিয়েছিলেন ফিল্মমেকার অতো প্রিমিঙ্গার। স্ক্রিপ্টটি রি-রাইট করেছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক গ্রাহাম গ্রিনি। সিনেমাটিতে জন জিলগাড, অ্যান্টন ওয়ালব্রুক ও রিচার্ড ওইডমার্কের মতো অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন সিবার্গ। এ নিশ্চয়ই তার মতো একজন আনকোড়া বালিকার জন্য ছিল রীতিমতো গা-ছমছমে ব্যাপার!

১৯৫৬
সেন্ট জ্যোন-এর স্ক্রিনটেস্টে; তার বিখ্যাত হেয়ারকাটের আগে
ছবি । বব উইলাফবাই

সমালোচনামূলক ও বাণিজ্যিক– উভয় বিচারেই ফ্লপ করেছিল সিনেমাটি। তবু বেশিরভাগ সমালোকের কাছে কিশোরী সিবার্গ পড়েছিলেন বিশেষ নজরে। দ্য টাইমস পত্রিকায় লেখা হয়েছিল : ‘জ্যোন [চরিত্রটি] নিশ্চিতভাবেই কিশোরী ও অজ্ঞ হলেও অসামান্য গুণাবলীর অধিকারিনী।… অথচ মিস সিবার্গের অভিনয়ে এইসব গুণের কোনো চিহ্ন পড়েনি।’ দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় সিনেমাটি সম্পর্কে সমালোচক জন ম্যাককার্টেন লিখেছিলেন, ‘কেন্দ্রীয় চঞ্চলা শিশুটি ১৭ বছর বয়সী এক মেয়ে, জিন সিবার্গের অভিনয় যে চরিত্রটিকে একটি দীর্ঘপথের নিখাঁদ, এবং সম্ভাব্য মশলা ও গতি দিয়েছে।…”

১৯৫৭
সেন্ট জ্যোন-এর সেটে; ফিল্মমেকার অতো প্রিমিঙ্গারের কাছ থেকে দৃশ্য বুঝে নেওয়া

তাকে দিয়ে অভিনয় করানোর ঝুঁকি নেওয়ায় প্রিমিঙ্গার আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সিবার্গ বলতেন, ‘আমার মতো একজন গেঁয়ো ‘চাষা’কে অভিনেত্রী বানানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি; এবং [সমালোচকেরা বলেছেন] আমার বরং খামারেই ফিরে যাওয়া উচিত। কিছু কিছু রিভিউ সতিকারঅর্থেই ভয়ঙ্কর নির্মম ছিল।’

জিন সিবার্গ
১৯৫৮
‘বোঁজো ত্রিস্তেস’-এর শুটিংশেষে জন্মশহর মার্শালটাউনে ফিরে…
জিন সিবার্গ
আগস্টের কোনো একদিন, কোনো এক ম্যাগাজিন স্টোরের সামনে
ছবি । জিম হামান

সিবার্গের পরবর্তী সিনেমাটিও প্রিমিঙ্গারের বানানো। ১৮ বছর বয়সে ফরাসি সাহিত্যিক ফ্রাঁসোয়া সাগাঁর লেখা, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত বোঁজো ত্রিস্তেস উপন্যাসটি অবলম্বনে একই শিরোনামের এই সিনেমায় সিবার্গের সহ-অভিনেতা ছিলেন ডেভিড নিভেন ও ডেবোরা ক্যের। দুর্ভাগ্যক্রমে এটি তার প্রথম সিনেমাটির চেয়ে কিঞ্চিৎ ভালো হয়েছিল; পরে তিনি বলেছিলেন, ‘একটি কারণে [প্রিমিঙ্গারকে] আমি কোনোদিনই ক্ষমা করব না : তিনি আমার কাছ থেকে এমন একটা জিনিস কেড়ে নিয়েছিলেন, যেটি একজন অভিনেত্রীর জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য, আর তা হলো– আত্মবিশ্বাস।’

জিন সিবার্গ
১৯৫৮
স্বামী ফ্রাঁসোয়া মোরিউয়্যের সঙ্গে

ফ্রেঞ্চ রিভেরায় যখন বোঁজো ক্রিস্তেস-এর শুটিং চলছিল, তখনই ফ্রাঁসোয়া মোরিউয়্যে নামের এক তরুণ আইনজীবীর [পরবর্তীকালে ফিল্মমেকারও] সঙ্গে পরিচয় ও সহসাই সম্পর্কে জড়িয়ে যান সিবার্গ। পরে তিনি বলেছিলেন, লোকটিকে দেখতে সফিসটিকেটেড লেগেছিল এবং সঠিক সময়ে সঠিক ওয়াইন বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার– এ বিষয়টিই আকৃষ্ট করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮, সিবার্গের জন্মশহর মার্শালটাউনে বিয়ে করেন তারা। প্রিমিঙ্গারের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে সিবার্গকে মুক্ত হতে সাহায্য করেন মোরিউয়্যে।

জিন সিবার্গ
১৯৫৮
‘বোঁজো ক্রিস্তেস’-এর শুটিংয়ের ফাঁকে, প্যারিসের এক রেস্তোঁরায়
ছবি । বব উইলাফবাই
জিন সিবার্গ
‘বোঁজো ক্রিস্তেস’-এর শুটিংয়ের দিনগুলোতে, ফ্রান্সে, বিছানায় শুয়ে পত্রিকা পড়ছেন
১৯৫৯
দ্য মাউস দ্যাট রোরড‘-এ

পরবর্তী সিনেমা, কলম্বিয়া পিকচার্সের ডিস্ট্রিবিউশনে, জ্যাক আর্নল্ড নির্মিত দ্য মাউস দ্যাট রোরড-এ তিনি অভিনয় করেন পিটার সেলারসের সঙ্গে। সিনেমাটি পিটারকে আন্তর্জাতিক ব্রেকথ্রু এনে দিয়েছিল। এ সময়েই মোরিউয়্যে শুনতে পান, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর একটি খসড়া স্ক্রিপ্ট অবলম্বনে, স্বল্পকালীন গ্যাংস্টার ও তার প্রেমিকার কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করছেন জ্যঁ-লুক গোদারফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ফিল্মমেকারেরা প্রিমিঙ্গারকে পছন্দ করতেন; আর গোদার পরে বলেছেনও, ‘[আমার সিনেমায়] জিন সিবার্গ যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন, সেটি আসলে বোঁজো ত্রিস্তেস-এ তার অভিনীত চরিত্রটিরই একটি ধারাবাহিকতা। প্রিমিঙ্গারের সিনেমাটির লাস্ট শটটি ব্যবহার করে, তারপর ‘তিন বছর পর’ লেখাটির উপর ডিজলভ করে দিয়েও সিনেমাটি আমি শুরু করতে পারতাম।’

১৯৬০
‘ব্রেথলেস’-এর সেটে, শুটিংয়ের ফাঁকে
ব্রেথলেস
‘ব্রেথলেস’-এর দৃশ্যে, কো-আর্টিস্ট জ্যঁ পল বেলমদোঁর সঙ্গে
ব্রেথলেস
চলছে ‘ব্রেথলেস’-এর শুটিং; বাম থেকে ফিল্মমেকার গোদার, সিনেমাটোগ্রাফার রাউল কুতার, অ্যাকট্রেস সিবার্গ ও অ্যাকটর বেলমদোঁ

গোদারের ব্রেথলেসই অবশেষে সমালোচকদের কাছে সিবার্গকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তার লুক ও স্টাইল, তার পিক্সি হেয়ারকাট, ব্ল্যাক আইলাইনার, তার সেইলর স্ট্রিপ টিশার্ট… সবকিছুর কপি হতে থাকে সর্বত্র।

জিন সিবার্গ
১৯৬১
‘লা রিক্রেয়েশন’-এর সেটে

১৯৫৯ সালে মোরিউয়্যে ও সিবার্গ লস অ্যাঞ্জেলস ভ্রমণে এসে ফরাসি কনসুল জেনারেল, ঔপন্যাসিক ও যুদ্ধকালীন নায়ক রোমাঁ গ্যারির সঙ্গে নৈশভোজে দেখা করেন। জরুরি প্রয়োজনে আকস্মাৎ প্যারিসে ফিরতে হয়েছিল বলে নিজ স্ত্রীর খেয়াল রাখার ভার গ্যারির উপর দিয়ে যান মোরিউয়্যে। পরে মোরিউয়্যে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘নিশ্চিতভাবেই খেয়াল রেখেছিলেন তিনি [গ্যারি]’! ১৯৬১ সালের শেষদিকে, প্যারিসের ১০৮ রু দ্যু বাক স্ট্রিটের একটি সুবিশাল অ্যাপার্টমেন্টে ওঠেন গ্যারি ও সিবার্গ। মোরিউয়্যে নির্মিত সিনেমা লা রিক্রিয়েশন-এ অবশ্য সিবার্গ অভিনয় করেছেন; সেটি মুক্তি পায় সে বছরেরই শুরুর দিকে। ১৯৬২ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায়; এরপর জীবনে মাত্র একবারই দেখা হয়েছে তাদের।

জিন সিবার্গ
১৯৬১
‘কঙ্গো ভিগো’ সিনেমার শুটিংয়ে পাড়ি জমানোর আগে, রোমাঁ গ্যারির সঙ্গে, ইতালির রোমে

সিবার্গের ভাষ্যমতে, তাদের দাম্পত্যজীবনটি ছিল ‘সহিংস’, এবং ‘বিয়ে করাটা সবদিক থেকেই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত’ তার জন্য। এরপর সারোলা-কারকোপিনো অঞ্চলের ছোট্ট একটি কর্সিকান গ্রামে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করেন সিবার্গ ও গ্যারি।

জিন সিবার্গ
১৯৬২
বিয়ের দিনে অতিথিদের সঙ্গে গ্যারি ও সিবার্গ

১৯৬৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন : ‘অভিনেত্রীর জীবন খুবই অনিশ্চয়তার। ঠিক যেন সিনেমার পেশিবহুলতার মতো। আপনি কখনোই জানবেন না আপনার ক্যারিয়ারের কী ঘটতে যাচ্ছে। কিছু অভিনেত্রী আটকা পড়েন ভুল চরিত্রের ফাঁদে। কেউ কেউ সফল হয়ে উঠেন; বাকিরা স্রেফ হারিয়ে যান। আমার ধারণা, এ মাধ্যমে কাজ করার সম্ভাব্যতা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি হাঁফিয়ে উঠেছি। যখনই আমাকে কোনো ফরাসি সিনেমার কোনো চরিত্র করতে দেওয়া হয়, তারা চেষ্টা করে চরিত্রটিকে একজন আমেরিকান মেয়ে হিসেবে কিংবা আমার ফরাসি উচ্চারণ বিবেচনায় নিয়ে রি-রাইট করার; এ খুবই ফালতু ব্যাপার।’

১৯৬৪
‘লিলিথ’-এর দৃশ্যে, কো-আর্টিস্ট ওয়ারেন বিটির সঙ্গে
১৯৬৪
জ্যঁ বেকারের ‘ব্যাক ফায়ার’ সিনেমায়
১৯৬৫
নিকোলাস গেসনারের ‘ডায়মন্ডস আর ব্রিটল’-এর দৃশ্যে কো-আর্টিস্ট ক্লুদ রিশের সঙ্গে
১৯৬৬
আর্ভিন ক্রেজনারের ‘অ্যা ফাইন মেডনেস’-এর দৃশ্যে

রবার্ট রোজেনের ১৯৬৪ সালের সিনেমা লিলিথ-এ অভিনয় করে সমালোচকদের কাছ থেকে আরও প্রশংসা পেতে থাকেন সিবার্গ; আর হলিউডের সিনেমায় তার আবির্ভাব ঘটে, যদিও একইসঙ্গে ইউরোপিয়ান সিনেমাও করছিলেন। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পেইন্ট ইউর ওয়াগন-এর কাজ শেষ করার পর ‘ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি’র ‘ব্রেকফাস্ট প্রোগ্রাম’-এ সাহায্য করতে শুরু করেন সিবার্গ; সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গরম খাবার সরবরাহ করছিল প্রোগ্রামটি। সহসাই বেশ কয়েক হাজার ডলার ক্যাশ তিনি সেই আন্দোলনটিতে অনুদান দিয়েছিলেন।

১৯৬৬
ক্লুদ শ্যাব্রোলের ‘লাইন অব ডিমারকেশন’ সিনেমায় কো-আর্টিস্ট জ্যাক পেরিঁর সঙ্গে
১৯৬৭
অক্টোবরের কোনো একদিন, আড্ডায়, অভিনেত্রী দানিয়েলা দারুক্স ও স্বামী রোমাঁ গ্যারির সঙ্গে
১৯৬৮
রোমাঁ গ্যারির ‘বার্ডস ইন পেরু’ সিনেমায় কো-আর্টিস্ট মরিস রনের সঙ্গে

ব্ল্যাক প্যান্থারদেরকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করতেন এফবিআই’র ডিরেক্টর জে. এডগার হুভার; ফলে সিবার্গকে নজরদারিতে রাখা, এবং তার টেলিফোনে আড়ি পাতা হয়। এফবিআই জানতে পারে, সিবার্গ গর্ভবতী; স্বয়ং হুভারের অনুমোদনে এ সময়ে একটি গুজব রটিয়ে দেওয়া হয়– এই সন্তানের পিতা নিশ্চয়ই কোনো ‘নিগ্রো সন্ত্রাসবাদী’। সিবার্গ গর্ভধারণ করেছিলেন ঠিকই, তবে তার সন্তানের পিতা কোনো ব্ল্যাক প্যান্থার কিংবা তার স্বামীও নন, বরং এক বিপ্লবী ছাত্র– ১৯৬৯ সালে মেক্সিকোতে একটি সিনেমার কাজ করতে গিয়ে যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার।

১৯৬৯
‘পেইন্ট ইউর ওয়াগন’-এর সেটে, শুটিংয়ের ফাঁকে

সিবার্গের নাম উল্লেখ না করেই, গ্রীষ্মের কোনো একদিন এই গুজবটি প্রথমত প্রকাশ পায় লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকায়। পাঠক যেন সিবার্গকে সণাক্ত করতে পারে, সেজন্য পর্যাপ্ত ইঙ্গিত দেওয়া ছিল খবরটিতে : ‘এই নারীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এক সুদর্শন ইউরোপিয়ান।… ধরুন নারীটির নাম ‘মিস এ’। তিনি কালোমানুষদের বিদ্রোহে মুক্তহস্তে প্রচুর টাকা দান করেছেন।… আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে পাওয়া নানা বিষয় বিবেচনা করে নিশ্চিত বলা যায়, মিস এ এখন সন্তানসম্ভবা। সন্তানটির পিতা একজন বিশিষ্ট ব্ল্যাক প্যান্থার।’


মার্শালটাউনে হওয়া
অন্তেষ্ট্যিক্রিয়ায়
কফিন খুলে
সবাইকে
সিবার্গ
দেখান, সন্তানটি শেতাঙ্গ

২৪ আগস্ট ১৯৭০, নিউজউইক ম্যাগাজিনে সরাসরি সিবার্গের নাম উল্লেখ করা হয়; এ সময়ে আমেরিকার আরও অনেক পত্র-পত্রিকায়ও তার নাম নিয়ে ছাপা হতে থাকে গুজবটি। এ সময় সিবার্গ একদম ভেঙে পড়েন। সেই মাসের শেষদিকে তিনি একটি প্রিম্যাচিউর কন্যাসন্তান জন্ম দেন; দুইদিন পরই মারা যায় শিশুটি। মার্শালটাউনে হওয়া অন্তেষ্ট্যিক্রিয়ায় কফিন খুলে সবাইকে সিবার্গ দেখান, সন্তানটি শেতাঙ্গ। সহসাই তিনি পাড়ি জমান নিউইয়র্কে, নিজের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে। সিবার্গ পরে বলেছেন, ‘আইনজীবী জানাল মানহানির মামলা করলে ১০ লাখ ডলার আর ১০ বছরের মতো লেগে যেতে পারে; সে জানাল, এতে বরং তিক্ততা বাড়বে। আর যখন আমার মাথা পুরোই বিগড়ে যেত, তখন ঘরে আটকে রাখা হতো আমাকে।’

সেই মানসিক ধাক্কাটি থেকে কোনোদিনই পুরোপুরি সেরে উঠেননি সিবার্গ। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সিবার্গ ও গ্যারির বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায় ঠিকই, তবু তারা বন্ধু হয়ে ছিলেন; নিজেদের প্যারিসিয়ান অ্যাপার্টমেন্টটিকে দুইভাগ করে নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে তৃতীয়বারের মতো বিয়ে করেন সিবার্গ। পাত্র– ফিল্মমেকার জন বেরির পুত্র এবং প্রতিশ্রুতিশীল ফিল্মমেকার ডেনিস বেরি। প্যারিসেই জীবন কাটতে থাকে তার। টেলিভিশন মুভি মাউসির কথা বাদ দিলে, যুক্তরাষ্ট্রে আর কোনোদিনই তিনি কাজ করেননি।

১৯৭২-৭৯
কোনো এক সময়, স্বামী ডেনিস বেরির সঙ্গে

এটি ছিল তার আরও বেশি ‘মানসিক অস্থিরতা’র সময়কাল; তিনি মাদক, অ্যালকোহল এবং উড়াধুরা আড্ডাবাজির জীবনযাপনের উপর দিন দিন আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন : ‘বন্ধুরা আমাকে ঘিরে হো-হো করে হেসে উঠবে– এমনটা দেখতে ভালোলাগে; ভালো খাবার, ভালো ওয়াইন আমার প্রিয়; ফলে আমি যদি একা একাই থাকি, তাহলে কে এসবের খেয়াল রাখবে আমার জন্য?’

১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯, সিবার্গের ময়নাতদন্তের ঠিক পরদিন এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি এফবিআই’কে দায়ী করেন গ্যারি। ব্ল্যাক প্যান্থারদের আর্থিক সাহায্য করেছিলেন বলে এই অভিনেত্রীর মর্যাদাহানীর জন্য এফবিআই যা কিছু করেছে, তার পরিণামে প্রতি বছর কন্যার মৃত্যুদিনে আত্মহননের প্রচেষ্টা নিয়ম করে চালিয়ে গেছেন সিবার্গ। তিনি মারা যাবার পর তার বন্ধুরা নানা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সিবার্গকে বছরের পর বছর ধরে এফবিআই’র ভয়ঙ্কর নজরদারির পাশাপাশি একান্ত ব্যক্তিজীবনের হুটহাট অনুপ্রবেশ ও নানা ধরনের হুমকির শিকারও হতে হয়েছে।

১৯৭৯
রাস্তার পাশের গাড়ি থেকে উদ্ধার করে তার মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ
তার অন্তেষ্ট্যিক্রিয়ায় প্রাক্তন স্বামী গ্যারি ও পুত্র দিয়েগো
তার মৃত্যুর পর অবশেষে এফবিআই’র স্বীকারোক্তি

২ ডিসেম্বর ১৯৮০, সিবার্গের প্রাক্তন স্বামী রোমাঁ গ্যারিও আত্মহননের পথ বেছে নেন– ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে। ‘ভগ্ন হৃদয়ের অনুরাগী’ তো অন্যকোনো পৃথিবীতে খোঁজে আশ্রয়– তার এই আত্মহননকে এভাবেই দেখেন অনেকে। গ্যারির অনেক বন্ধু ও সহযোগীর অবশ্য কিঞ্চিৎ দ্বিধা আছে, সিবার্গের মৃত্যু তাকে আদৌ এত বেশি মনমরা করে তুলেছিল কি না।

দাম্পত্যজীবনের কোনো এক সময়, স্বামী গ্যারির সঙ্গে

ব্রেথলেস-এর মূল খসড়াটি যার লেখা, সেই ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো চেয়েছিলেন তার ১৯৭৩ সালের সিনেমা ডে ফর নাইট-এ সিবার্গকে অভিনয় করাতে; কিন্তু সে সময়টি ছিল এই অভিনেত্রীর জীবনের আরেকটি বিষণ্নতার কাল, ফলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি ত্রুফো। তবে সেই ১৯৫৮ সালে, যখন দুনিয়ার বেশিরভাগ সমালোচকই সিবার্গকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছিল, ত্রুফো তখন লিখেছিলেন : তার ‘ডাগর ডাগর নীল চোখে’ রয়েছে ‘বালকসুলভ আক্রোশের এক ঝলকানি’, এবং ‘জিন সিবার্গ যখন পর্দায় হাজির হন, তখন আপনার পক্ষে অন্যকোনো দিকে চোখ ফেরানো সম্ভব নয়। তার প্রতিটি নড়াচড়াই মাধুর্যময়; প্রতিটি চাহনিই সুনিপুণ। তার মাথার আকার, তার দেহভাষা, তার হাঁটা… সবই নিখুঁত। এমনতন যৌনাবেদন সিনেমার পর্দায় আর দেখা মেলেনি।’

১৯৫৬
‘সেন্ট জ্যোন’-এর সেটে সিবার্গ; যে সিনেমায় শুরু হয়েছিল তার স্বপ্নযাত্রা, নাকি সূচিত হয়েছিল দুঃস্বপ্নের দীর্ঘপথ?
সূত্র
ফ্ল্যাশব্যাক
অনলাইন জার্নাল। ২১ জুলাই ২০১৮
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন