চান্তাল আকেরমানের সঙ্গে আলাপ । কিস্তি-৪ [৭]

2
36

সাক্ষাৎকার গ্রহণ । নিকোল ব্রেনেজ
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
চান্তাল আকেরমান [৬ জুন ১৯৫০-৫ অক্টোবর ২০১৫]। বেলজিয়ান ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম স্বতন্ত্র বিপ্লবী অ্যাকটর-ডিরেক্টর। ২০১১ সালের গ্রীষ্মকালে, সদ্যনির্মিত সিনেমা “আলমেয়ার’স ফলি”র সূত্রধরে, নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারটির তৃতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো এখানে…
আগের কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন এই বাক্যে


সা ক্ষা ৎ কা র

প্রসঙ্গ : জ্যঁ-লুক গোদার ও ‘পিয়েরো লা ফ্যু’

পিয়েরো লা ফ্যু
পিয়েরো লা ফ্যু
ফিল্মমেকার । জ্যঁ-লুক গোদার

নিকোল ব্রেনেজ •
আপনি প্রায়শই বলেন, সিনেমার প্রতি আপনার ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে পিয়েরো লা ফ্যু [জ্যঁ-লুক গোদার]।

চান্তাল আকেরমান
হ্যাঁ। এ ছিল এমনই জিনিস– যা আমি আগে কোনোদিনই দেখিনি। সিনেমা এমনও হতে পারে– জানতামই না। এটি আমাকে ফিল্মমেকার হয়ে ওঠার শক্তি, আকাঙ্ক্ষা, এই উন্মত্ত বাসনাটি দিলো। তবে আরেকবার দেখার পর সিনেমাটিকে কিন্তু আমার ততটা ভালো লাগেনি। অবশ্য, এ বিষয়টি নির্ভর করে। সাউথের অংশটি আমার প্রিয়; আর সেই গানটি– ‘মা লিগনে দু চাঁ’।

নিকোল ব্রেনেজ •
আর, বিস্ফোরণটি?

চান্তাল আকেরমান •
ওহ, নিশ্চিতভাবেই, বিস্ফোরণটিই সবচেয়ে প্রিয়। ‘হায়, হায়, হায়’!

প্রসঙ্গ : আলফ্রেড হিচকক ও ‘ভার্টিগো’

আলফ্রেড হিচকক
ভার্টিগো
ফিল্মমেকার । আলফ্রেড হিচকক

চান্তাল আকেরমান •
ভার্টিগো [আলফ্রেড হিচকক; ১৯৫৮] ভিজুয়ালি মহত্তম, বস্তুকামবিষক একটি সিনেমা– যেটি অন্য মানুষকে দেখা নয়, বরং নিজেরই একটি এক্সটেনশন তৈরি করে, অন্যদেরকে খর্ব ও অস্বীকার করে আপনার নিজস্ব উৎকণ্ঠাগুলো তাদের খাইয়ে দেয়। এই সিনেমাটি নিয়ে আরও অনেক কিছুই বলা সম্ভব।

নিকোল ব্রেনেজ •
লাকাঁ যেমনটা বলেছেন, একজন পুরুষ কখনোই কোনো নারীকে দেখে না।

চান্তাল আকেরমান
কথাটা খুবই সুন্দর। কিন্তু তাহলে নারী আর পুরুষ আসলে কী জিনিস? নারীর জন্য এটি একটি কল্পনা হিসেবেই ঘটা উচিত– এটি তাকে শীৎকার এনে দেওয়া কোনো সঙ্গম নয়; সে শিশুর মতোই আরও বেশি বহুরূপী হয়ে ওঠতে পারে। পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষা তাকে ভাবাতে শেখায়, এটিকে রন্ধ্রের মধ্যে জায়গা করে দিতে হবে– যখন এটি সত্যিকারঅর্থেই অন্য কোথাও সংগঠিত হয়, তাকে নিজেরই যৌনতার প্রশ্নে পুরুষের মতো বস্তুকামী হয়ে ওঠার দরকার– এ কথা না জানিয়েই।

প্রসঙ্গ : ইকোনোফোবিয়া

নিকোল ব্রেনেজ •
এক ধরনের সমষ্টিগত টিকে থাকার লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র– কম্বোডিয়া থেকে আপনি ফিরে এসেছেন। সবাই যাদের ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে ডাকে, এমন একটি দেশে সফর করা আপনার জন্য কেমন ছিল?

চান্তাল আকেরমান •
দুর্দান্ত এক অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। সেদেশের ইতিহাস যদি আপনি না জানেন, তাহলে ভাবতেও পারবেন না : একটা গোটা প্রজন্মই খোয়া গেছে– এটা টের পাবেন, অথচ কোনো ব্যক্তিমানুষের মধ্যেই এর কোনো সাক্ষ্যই আপনি পাবেন না, কিংবা এমনকি আপনাকে তারা তা খেয়াল করতেই দেবে না। সবাই হাসিমুখে, সুখী ভাব নিয়ে, সুবোধের মতো আচরণ করবে। আপনি অবাক হয়ে ভাববেন, কী করে এখানে গণহত্যা চালানো সম্ভব হয়েছিল? ইহুদিরা এই ট্রমা অনুভব করে। আমাকে যে বিষয়টি সত্যিকারঅর্থেই চমকে দিয়েছিল, তা হলো– [আলমেয়ার’স ফলিতে] শিশু নিনার চরিত্রে অভিনয় করা বাচ্চা মেয়েটির প্রতিক্রিয়া। ছয় বছর বয়সী এই মেয়েটি আমাকে চলে আসতে দিতে চায়নি। যখন তাকে আমার সঙ্গে নিউইয়র্কে আসার প্রস্তাব দিলাম, দোভাষীকে সে বলেছিল, আমি খুবই ভালোমনের মানুষ। এটি গণহত্যার পরিণাম : উদারতাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। নাতালিয়া নামের এক সেলো-টিচারও [সেলো : বাদ্যযন্ত্রবিশেষ] একই কথা বলেছেন; তিনি এমনই একটি নিরন্তর অভিশাপের দুনিয়ায় জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে পানির কল চালিয়ে রাখা হতো, যেন তাদের কথাবার্তার শব্দ শোনা না যায়। এমন একটি দুনিয়ায়, কে যে ভালোমনের মানুষ– সেটি জানা অনিবার্য ব্যাপার।


আমি
কোনোদিনই
মানুষের মৃত্যু দেখাইনি

তবে কম্বোডিয়াই একমাত্র তৃতীয় বিশ্ব নয়। আফ্রিকায় আমি কখনোই যাইনি, একজন ফিল্মমেকার হিসেবে যেতে পারিনি; সেখানে যেতে হলে আপনাকে ডাক্তার হিসেবে যেতে হবে। ইহুদি ধর্মের মূলতত্ত্বে ছবি দেখানো নিষেধ; এই ধর্মটি ছবিকে নিষিদ্ধজ্ঞান করে। এটি আমার মধ্যেও রয়েছে : আমি কোনোদিনই মানুষের মৃত্যু দেখাইনি। কয়েকটি সিনেমায় আমি সেটি দেখেছি, এরমধ্যে একটি ছিল একজন অস্ট্রেলিয়ান তরুণ ফিল্মমেকারের কাজ, যেটিতে তিনি নিজের ক্যামেরার সামনে একটি মৃতশিশুকে দেখিয়েছেন; কিংবা এমনকি রেমোঁ দুপার্দো তার নিউজ আইটেমস [১৯৮৩] সিনেমায় একটি আত্মহননের ঠিক পরপরই মৃতদেহটিকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন– যেখানে কেউ একজন তাকে এ কাজটি করতে বারণ করছিল। আমি এটিকে খুনে মানসিকতা, একটি অপরাধ হিসেবেই গণ্য করি।

নিকোল ব্রেনেজ •
এবিসি আফ্রিকাতে [২০০১] আব্বাস কিয়ারোস্তামিও একটি শিশুর মৃত্যু-মুহূর্তের দৃশ্যধারণ করেছেন। কিন্তু দুর্যোগের মুখোমুখি হলে কী করার আছে?

চান্তাল আকেরমান •
আপনাকে আমি উপায় বলে দিচ্ছি– মৃতদেহ যেখানে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জায়গাগুলো দেখান। এটি অপেক্ষাকৃত শ্রেয় আবেদন জাগাবে; এটি আপনার [ফিল্মমেকার] ও দর্শকের মনে অপেক্ষাকৃত অধিক ছাপ ফেলবে। শেষ পর্যন্ত এইসব আক্ষরিকতা-মনস্কের ইমেজগুলো ইফেক্টিভ হয় না; আপনাকে আরেকটি রাস্তা খুঁজে নিতে হবেই, যেন এটির মুখোমুখি হওয়া লোকগুলো নিজেদের রূপেই থাকে এবং এটিকে আত্মস্থ করে– বস্তুত ইমেজগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এ কারণেই সবকিছুর শুটিং ফ্রন্টালি করার প্রতি ঝোঁক আমার।

চান্তাল আকেরমান
দ্য ক্যাপটিভ
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
কিন্তু ফ্রন্ট থেকে, কোনো দেয়ালের বিপরীতে, কোনো চেহারা তো একটি বাইজেন্টাইন, ফরমাল স্কিমা; এবং এর চেয়ে পৌত্তলিক কিছু আর নেই। ক্লোজআপের কারণে, ঠিক যেমনটা জ্যঁ ইপস্তাইন করেছেন, সিনেমা আসলে দেবতাদের উৎপন্ন করে।

চান্তাল আকেরমান •
কিন্তু এটি উপাদান, এবং এটি মুভ করে– এমনকি তা এটিকে দেখতে অনড় মনে হলেও। আর, যখন আপনি লো-অ্যাঙ্গেল ও সাবজেক্টিভ শট এড়িয়ে যাবেন, তখন এড়িয়ে যাবেন বস্তুকাম। যখন ফ্রন্টালি শুট করবেন, আপনি দুটি আত্মাকে সমানভাবে মুখোমুখি করে দেবেন, আর দর্শকের জন্য একটা প্রকৃত জায়গা বের করে নেবেন। ফলে এটি দেবতাতুল্য হবে না। অনড় কিছুকে আপনি ভাবতে থাকবেন। আপনার চোখ এতটুকুও পিটপিট করবে না, এতটুকুও কুঞ্চিত হবে না।

নিকোল ব্রেনেজ •
তার মানে ইমেজ সম্পর্কে আপনার ধারণাটি দুই পক্ষের মধ্যে একটি লড়াই : একপক্ষ আক্ষরিকতা-মনস্কের বিরুদ্ধে; আর অপরপক্ষ পৌত্তলিক ইমেজের প্রোডাকশনের বিরুদ্ধে।


আমি
ইমেজ ও দর্শকের
মধ্যে সবসময় সমতা
চাই

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ, আক্ষরিকতা-মনস্কতা আপনাকে প্রায় সময়ই আটকে দেবে। কিংবা বলা ভালো, আপনি কোনটি আক্ষরিকতা-মনস্কতা বলেন– এটি আসলে তার ওপর নির্ভর করছে। ইহুদিদের কাছে কিছু জিনিস নীতিগত নিয়মের মতো– যেটি ‘অপরের’ সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়, যে বিষয়টিকে ইমানুয়েল লিভিনাস বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি ‘অপরের’ মুখোমুখি। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ মুখোমুখিটি থেকে আপনার ভেতর দায়িত্ববোধের সূচনা ঘটবে। লিভিনাসের মতো করে বললে, ‘এবার আপনি বুঝতে পারছেন, নিশ্চয়ই আপনার পক্ষে খুন করা সম্ভব নয়।’ নৈতিকতা সম্পর্কে এটিই আমার ধারণা। এ কারণেই আমি ইমেজ ও দর্শকের মধ্যে সবসময় সমতা চাই। কিংবা, অপরের বিষয়ে একটি অবচেতনের উত্তরণ চাই।

প্রসঙ্গ : ব্যক্তিমানুষ

নিকোল ব্রেনেজ •
সিনেমা পৃথিবীতে জীবনযাপনের উপায়গুলোর, বসবাসের উপায়গুলোর প্রোটোটাইপ সৃষ্টি করে। আপনার কাজে আমরা দেখতে পাই, কী নিরন্তরভাবে আপনি দুই ধরনের ব্যক্তিমানুষের মধ্যে ইন্টারওয়েভ ঘটান : একদিকে নিজের কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিজেই নেওয়া সার্বভৌম ব্যক্তিমানুষ– যে নিজ স্বাধীনতার উদ্ভাবন করতে থাকে; অন্যদিকে এমন ব্যক্তিমানুষ, যে নিজের কাছে নিজেই একজন শিকার, সমগ্র গোপনীয়তার মুহূর্তগুলোকে যে শিকার করে।

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ, আপনার কথা হয়তো ঠিকই। কোনো লাশ বইতে কিংবা কাদ্দিস [ইহুদি ধর্মগীত] গাইতে দশজন লোক লাগে। এসব কাজ কেউ একা করতে পারে না। তবু ব্যক্তিসত্তাকে অতিরিক্ত রকমের বড় করার মতো মহিমান্বিত না করেই, নিজের সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা থাকা চাই আপনার। এ কারণে আমি টানা ১০-১২ বছর ধরে গবেষণা করতে থাকি। মাঝে মাঝে দম নিই, এক পা পিছু হটি। একজন ব্যক্তিসত্তা হিসেবে আমি কি সচেতন? জানি, আমি স্রেফ আমিই– যদিও জানি না ‘আমিই’ বলতে আসলে কী বোঝায়। আমার বিশ্লেষককে আমি বন্ধু ভাবি; বাইবেল [হিব্রু বাইবেল] থেকে গল্প কিংবা পরিস্থিতি নিয়ে– বিশেষ করে জাজমেন্ট অব সলোমন কাহিনিটি নিয়ে– যেটিতে ভালো মায়ের বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে– সারাক্ষণ আমি একই কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকি।

দাসত্বের সকল নিশানা মুছে দিতে চল্লিশটি বছর মরুভূমিতে কাটিয়েছে ইহুদিরা : যে অভিজ্ঞতা নিগ্রো কিংবা বন্দিশিবিরের শিকারদেরও নেই। এই আইডিয়াটিই তো মহিমান্বিত : নিশানা মুছে দিতে সময় নেওয়া। দাসত্বের নিশানা গুলো। বলা হয়ে থাকে, শিবিরগুলোতে এমনটা করতে হলে তিন প্রজন্ম লেগে যেত। আমার ছোট ভাগ্নিটি পেটের পীড়ায় ভুগছে, ওর বয়স ২৭; এবং সে তৃতীয় প্রজন্মের। আমার মা সবসময়ই নাতনির ঘরের সন্তান দেখার অপেক্ষা করেছেন; তিনি অপেক্ষায় রয়েছেন চতুর্থ প্রজন্মের।

চান্তাল আকেরমান
ডাউন দেয়ার
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

প্রসঙ্গ : ইনস্টলেশন

নিকোল ব্রেনেজ •
১৯৯৫ সাল এবং ফ্রম দ্য ইস্ট : বর্ডারিং অন ফিকশন-এর পর থেকে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে আপনি নিয়মিতই ইনস্টলেশন আর্টওয়ার্ক করছেন; যেমন, ২০০১ সালে ওম্যান সিটিং আফটার কিলিং, ২০০৩-এ অ্যা ভয়েস ইন দ্য ডিজার্ট, ২০০৮ সালে উইমেন ফ্রম অন্তোয়ের্প ইন নভেম্বর। সবসময় না হলেও, প্রায়সময়ই এইসব ইনস্টলেশনের ম্যাটেরিয়ালগুলোকে আপনার সিনেমায় পুনরাবির্ভূত হতে দেখা যায়। সিনেমা ও ইনস্টলেশনের মধ্যে সমন্বয় ঘটান কীভাবে?

চান্তাল আকেরমান •
ইনস্টলেশন আর্টওয়ার্ক মানে একটি ঝামেলাবিহীন সিনেমা; আর তা প্রোডাকশনের যেকোনো রকমের অবমাননাকর টার্মবিহীন সিনেমা। এটি সিনেমার সকল রকমের ভার থেকে মুক্ত। টাকার জন্য অপেক্ষায় না থেকে, বাড়িতে একা একাই আমি এ কাজ করতে পারি। বস্তুতই হস্তনির্মিত এই শিল্পকর্ম আমার খুব ভালোলাগে। এর মতো কোনো কাজ আর নেই।

নিকোল ব্রেনেজ •
যেসমস্ত উপাদান জড়ো করেন, সেগুলোতে নিজেকে ‘ইনস্টল’ করেন কীভাবে?

চান্তাল আকেরমান •
এই প্রক্রিয়াটি ফিকশনের চেয়ে বরং ডকুমেন্টারির বেশি কাছাকাছি। ডকুমেন্টারির বেলায় আমি একটা শূন্য পাত্র হয়ে ওঠি। যদি আপনি কোনো পূর্বপরিকল্পিত আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন, তাহলে সেটি পেয়ে যাবেন ঠিকই, কিন্তু একটি জিনিসের দেখা পাবেন না। যখন নিজেকে আমি কোনো ইনস্টলেশনের জন্য ম্যাটেরিয়ালের মধ্যে বন্দি করে ফেলি, তখন বিষয়টি ডকুমেন্টারির শুটিং করার মতোই হয়ে ওঠে : কী ঘটবে– তা আপনি জানেন না, আপনি আপনার ম্যাটেরিয়ালকে একটা ধরন দেন, সেগুলো নিজেদের বিন্যাস নিজেরাই করে নেয়। তারপর, এক পলকের মধ্যেই, আচমকা যেটির দেখা সেখানে পেয়ে যাবেন, সেটিই স্বতঃসিদ্ধ।

 চান্তাল আকেরমান
ইন দ্য মিরর
ইনস্টলেশন । চান্তাল আকেরমান

ফিকশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সূচনা ও সমাপ্তি সহকারে একটি কাঠামো থাকা লাগেই; আপনি অনুষঙ্গগুলোকে এদিক-সেদিক সরাতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো যেদিকে মুখ করে আছে– সেটিকে বদলাতে পারবেন না; সেগুলোর মধ্যকার সুতাটিকে আপনার অনুসরণ করতেই হবে। ইনস্টলেশনের বেলায় আমি সেই সুতোটিকে অনুসরণ করি না। এ এক জাদুকরি ব্যাপার : ম্যাটেরিয়ালটি নিয়ে যখন আমি কাজ করি, তখন নানা রকমের সম্ভাবনার আবির্ভাব ঘটতে পারে, আর সেই ম্যাটেরিয়ালটি নিজের মধ্যে আমাকে টেনে নেয়। আমি এটিকে নিয়ে কাজ করি, এটি হয়ে ওঠে অন্য কোনোকিছু, এবং তারপর আমি রূপটির দেখা পাই। রূপান্তরের ভেতর থেকে সৃজনশীলতার আবির্ভাব ঘটে; মুক্তিদান ও মনোমুগ্ধতার এই প্রক্রিয়া একটি নিখাঁদ আনন্দের ব্যাপার।

নিকোল ব্রেনেজ •
১৯৯৫ সাল থেকে শুরু করার পর, আপনার ইনস্টলেশনের বিবর্তনের দিকে যদি তাকান, কী কী পার্থক্য চোখে পড়ে?

চান্তাল আকেরমান •
প্রধান পার্থক্যগুলো হলো– একটি সিঙ্গেল-মাইন্ডেড ফিকশনের জন্য বিকল্প ফর্মগুলোর অন্বেষণ করা, এবং দর্শকের জন্য নতুন নতুন ওপেন স্পেস ছেড়ে দেওয়া। টেকনিক্যাল ডিভাইসগুলো বদলে গিয়ে, কোনো কোনোটা আরও বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। সব ইনস্টলেশনের কিন্তু আমার সিনেমার সঙ্গে বন্ধন নেই। সর্বশেষ ইনস্টলেশন ম্যানিয়াক সামারটি [২০০৯] আমি কিছু অরিজিনাল ইমেজ থেকে বানিয়েছি; এবং কিছু ছিল একেবারেই র‌্যানডম। অগ্রগতিহীন অবস্থায় পরিত্যক্ত পরে থাকা একগুচ্ছ ফিল্মের মাধ্যমে আমি একটি ইনস্টলেশন করতে চেয়েছিলাম– যেন সেটি কোনো সহিংস বিচ্ছুরণের পর অধ্যাবসায়ী চিহ্নের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়ে আছে। দ্য গোস্টস অব হিরোশিমা এটিকে আন্ডারলায়িং স্ট্রাকচারটি দিয়েছিল।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকাল । ১৫ জুলাই ও ৬ আগস্ট ২০১১; প্যারিস, ফ্রান্স 
সূত্র । লোলা জার্নাল

পরের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]