সালাহ আবু সাইফ : মিসরীয় সিনেমার ‘মাস্টার অব রিয়ালিজম’

0
107

মূল । ইব্রাহিম আল আরিস
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

 সালাহ আবু সাইফ
সালাহ আবু সাইফ
জন্ম । ১০ মে ১৯১৫; কায়রো, মিসর
মৃত্যু । ২৩ জুন ১৯৯৬; কায়রো, মিসর

১৯৯৫ সালের গ্রীষ্মকাল। হৃদপিণ্ডের সাধারণ এক সার্জারির জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে মিসরীয় তরুণ ফিল্মমেকার আতেফ আল-তায়েবকে [১৯৪৭-১৯৯৫]। এ নিয়ে উৎকণ্ঠার শেষ নেই সালাহ আবু সাইফের। সে সময়ে আবু সাইফের নিজের স্বাস্থ্য একদম ঠিকঠাক; তবু ৮০তম জন্মদিনে পৌঁছে, ফিল্মমেকিংয়ে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি।

কয়েক সপ্তাহ পর, সার্জারির সময় মারা গেলেন আল-তায়েব। এই ঘটনা আবু সাইফের মনে গভীর ক্ষত এঁকে করল। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, নিজেরই একটা অংশ খুইয়ে ফেলার বেদনা তার হয়েছে। হায়, আল-তায়েবের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে আবু সাইফ নিজেও পাড়ি জমালেন পরপারে। তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, মিসরীয় সিনেমার “স্কুল অব রিয়ালিজম” বা বাস্তববাদের পাঠশালাটি সেটির প্রধান প্রতিষ্ঠাকারীদের একজনকে এবং সেটির সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারীদের একজনকে হারিয়ে ফেলল।

ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ
রায়া অ্যান্ড সাকিনা
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

৮১ বছর আয়ু পাওয়া সালাহ আবু সাইফ ছিলেন মিসরীয় ও আরব ‘ সেভেন্থ আর্ট’ সিনেমার সেরা ওস্তাদদের একজন। ৫০ বছরের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৪০টিরও বেশি সিনেমা বানিয়েছেন তিনি, সেগুলোর কয়েকটি রীতিমতো ক্লাসিক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেগুলো এই মহান শিল্পীর নামের সঙ্গে ‘ডিরেক্টর অব রিয়ালিজম’ উপাধিটি এনে দিয়েছে– যদিও তিনি নিজে বরাবরই এই শ্রেণিভুক্তকরণের বিরুদ্ধে নালিশ জারি রেখেছেন; কেননা নিজেকে তাতে বন্দি-বন্দি লাগত তার।

১৯৯৬ সালের জুনের শেষদিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা আবু সাইফ শুধু মিসরীয় সিনেমায় রিয়ালিজমের শ্রেষ্ঠতম প্রতিষ্ঠাকারীদের একজনই ছিলেন না, ছিলেন আরব সিনেমার সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের অন্যতম, এবং ইউসেফ শাহিন [১৯২৬–২০০৮] ও তৌফিক সালেহ’র [১৯২৬–২০১৩] মতোই, ১৯৫০ দশকের মধ্যভাগ থেকে ‘ সেভেন্থ আর্ট’-এ শ্রেষ্ঠতম বিপ্লব এনে দেওয়া সেই সিনেমাটিক মডার্নিজম বা ফিল্মি-আধুনিকতাবাদেরও ফাদার-ফাউন্ডার। এক ফর্ম থেকে আরেক ফর্মে, আবু সাইফ সে সমস্ত তরিকা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, সেগুলোর প্রতি নিজেদের আকৃষ্ট হওয়ার কথা সমকালীন অনেক ফিল্মমেকারই অস্বীকার করতে পারবেন না।


আবু সাইফ
শুধু মিসরীয়
সিনেমায় রিয়ালিজমের
শ্রেষ্ঠতম প্রতিষ্ঠাকারীদের
একজনই ছিলেন না, ছিলেন
আরব সিনেমার সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের অন্যতম

মিসরীয় সিনেমা ও আবু সাইফ– এই গল্পের শুরু তার তারুণ্যে : তিনি তখন টেক্সটাইল কারখানার কর্মচারি; ঘটনাচক্রে তরুণ ফিল্মমেকার নিয়াজি মোস্তফার [১৯১১–১৯৮৬] সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ‘স্টুডিও মিসর’-এর খরচে ফিল্মের উপর পড়াশোনা শেষে জার্মানি থেকে সদ্যই দেশে ফিরেছেন মোস্তফা তখন। তার সঙ্গে সেই দেখা হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আবু সাইফের মনে সিনেমার প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা জোরাল করে তোলে। ফলে নিয়াজি মোস্তফার সামনে হাজির হন তিনি, এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতে পারার সম্মতি আদায় করে নিলেন। সেই যে এক যাত্রা হলো শুরু, সেটি অব্যাহত ছিল ১৯৯০ দশক পর্যন্ত, আর তার নিজের, মোস্তফা ও কামাল সেলিমের [১৯১২–১৯৪৬] এক যৌথপ্রচেষ্টার ফসল হিসেবে ডিটারমিনেশন [El Azima; কামাল সেলিম; ১৯৩৯] সিনেমাটির জন্ম দিয়েছে– যেটিকে মিসরীয় সিনেমায় বাস্তববাদের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করা হয়।

নিজের ফিচার ফিল্ম নির্মাণের সুযোগ পাবার আগে, সেই অভিজ্ঞতাটি আবু সাইফের জন্য বেশকিছু শর্ট ডকুমেন্টারি বানানোর সুযোগ করে দেয়। তবে আধডজনখানেক ফিল্ম বানানোর জন্য তাকে আরও ছয় বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে; তারপরই তিনি নিজেকে সেই পাঠশালার পথে নিযুক্ত করেছেন– যেটির প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে তার নাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে, এবং যেটি তাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়। অলওয়েজ ইন মাই হার্ট, দ্য রিভেঞ্জার, দ্য স্ট্রিট অব দ্য অ্যাক্রোব্যাট এবং দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব আন্তার অ্যান্ড আবলা সিনেমাগুলো বানানোর সময় তিনি হিস্টোরিক, কমেডিক, রোমান্টিক ও মিস্টেরি ধারাগুলোকে ভেঙে-চুরে একান্তই নিজস্ব স্টাইলেরই অনুসন্ধান রেখেছিলেন অব্যাহত।

সালাহ আবু সাইফ
দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব আন্তার অ্যান্ড আবলা
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

সাফল্য এবং কোনো কোনোটির বিশেষ স্বাতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও এই ফিল্মগুলোকে তিনি বস্তুত এক্সারসাইজ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন; আর তা তাকে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল তার প্রকৃত শুরুর রাস্তায়। সেটির সাক্ষ্য দেয় তার গ্রেট সিনেমাগুলোর প্রথমটি– এমিল জোলার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ইউর ডে উইল কাম। ১৯৫১ সালের এই সিনেমাটি যদিও বিদেশি উপন্যাস অবলম্বনে, তবু এখানে সেই সকল অনুষঙ্গেরই দেখা মিলেছে যেগুলো পরবর্তীকালে আবু সাইফের সিনেমার একেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য : অভিনেতা-অভিনেত্রীদের, বিশেষত ফাতেন হামামাকে [১৯৩১-২০১৫] অপ্রচলিত তরিকায় ব্যবহার করা; সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবনচিত্র ফুটিয়ে তোলা; একেকটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকাশ ঘটানো; অপরাধকে সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য করে সেটির পরিণামের বদলে বরং সেটির কারণগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা; এবং এর পাশাপাশি ঘটনা ও চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রাগুলো ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে লাইট, মন্তাজ ও মেকআপের মতো টেকনিক্যাল এলিমেন্টগুলোকে কাজে লাগানো। আবু সাইফের পরবর্তীকালের সিনেমাগুলোতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দেখা পাওয়া যায় : একটি দৃশ্যতই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সিনেমাগুলোর সূচনা; তারপর সেগুলো সেই অপরাধটিকে বিশ্লেষণ করে, এবং সমাজের একটি ছবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা চালায়; আর সেই ছবিটি সাধারণত হয়ে ওঠে নৈরাশ্যবাদী– যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে নিজ দ্বিধা, নিজ সম্পর্ক-সকল ও নিজ অভিযাত্রার মধ্যে হাজির করা হয়।


আবু সাইফের রিয়ালিজম বা
বাস্তববাদ সে সময়কার
বাস্তববাদসংশ্লিষ্ট বহু
সমালোচককে খুশি
করলেও, তিনি
স্বয়ং সন্তুষ্ট
ছিলেন
না…

সুতরাং বলা যেতেই পারে, ইউর ডে উইল কামই আবু সাইফের এইসব পরবর্তী সিনেমার জন্ম দিয়েছে : ফোরম্যান হাসান, রায়া অ্যান্ড সাকিনা, দ্য মনস্টার, দ্য টাফ। এই সিনেমাগুলোকে এখনো আবু সাইফের সেরা লিগেসি হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের হয়তো খেয়াল রাখা দরকার, এই সবগুলো সিনেমার জন্ম হয়েছে সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে। সাধারণ অপরাধ কিংবা জঘন্য কাজের আবির্ভাব ঘটায়– এমনতর ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাগুলোকে ঝালিয়ে দেখে [রিয়া অ্যান্ড সাকিনা], শ্রেণিবৈষম্যগুলোর ছবি এবং জাহান্নাম ডেকে আনার মতো ট্রাজেডির চিত্র ওস্তাদিপনায় ফুটিয়ে তুলে [ফোরম্যান হাসান], আমজনতার জীবনযাপনে ছড়ি ঘুরানো বাজারটি উপর অপরাধমূলক নিয়ন্ত্রণের উপস্থিতিকে জাহির করে [দ্য টাফ], এবং নিজ অপরাধের জন্য অপরাধীটির দায়ভারের বিষয়টিতে প্রশ্নবাণ বিস্তৃত করার মাধ্যমে [দ্য মনস্টার] এই চেষ্টাগুলো করে গেছেন আবু সাইফ। নিজের প্রথম ও ভিত্তিগত পর্যায়কালটি ভেঙে দিয়ে, সাদাকালোর মধ্যে ভরসা রেখে, নতুন সম্ভাবনার তল্লাটগুলোর দেখা কী করে পাবেন– সে কথা ভালোই জানা ছিল তার। আবু সাইফের রিয়ালিজম বা বাস্তববাদ সে সময়কার বাস্তববাদসংশ্লিষ্ট বহু সমালোচককে খুশি করলেও, তিনি স্বয়ং সন্তুষ্ট ছিলেন না। সেই সমালোচকদের হতাশ করে, ১৯৫৭ সালে নিজের দ্বিতীয়, অর্থাৎ ‘রোমান্টিক’ ফেজ বা পর্যায়কালের সূচনা করেছিলেন তিনি। এই পর্যায়কালটিকে অনেকেই ‘আল হারা আল শাবিয়া’ বা ‘দ্য পপুলার কোয়ার্টার’ ছেড়ে পেটি ও মধ্যবিত্ত বুর্জোয়াদের গৃহে আবু সাইফের প্রবেশ হিসেবে গণ্য করে।

সালাহ আবু সাইফ
ইউর ডে উইল কাম
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

এই রূপান্তরনের অংশ হিসেবে নাগিব মাহফুজের [১৯১১–২০০৬] দুনিয়া ছেড়ে ইহসান আবদেল কুদ্দুসের [১৯১৯–১৯৯০] দিকে মুখ ঘোরালেন আবু সাইফ; আয়নিক্যালি স্বয়ং মাহফুজকে দিয়ে আবদেল কুদ্দুসের কয়েকটি মেজর উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা জন্য স্ক্রিপ্ট লেখালেন তিনি।

আবু সাইফ ও মাহফুজের মধ্যে এই কর্মসম্পর্কটির সূচনা ঘটেছিল আবু সাইফের ফিল্ম ক্যারিয়ারের সূচনালগ্নেই; আর সেই সময়কালটি স্ক্রিপ্টরাইটার হিসেবে মাহফুজেরও সূচনাকাল। মাহফুজের সঙ্গে তার একজীবনের সুদীর্ঘ বন্ধুত্বটি টিকিয়ে রাখার নেপথ্যে সিনেমাই যে ভূমিকা রেখেছে– এ নিয়ে সবসময়ই খুশি ছিলেন আবু সাইফ। ১৯৪০ দশকের শেষভাগে যখন তাদের দুজনের পরিচয় হয়, তখন সিনেমার কর্মজগত সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই না জানা মাহফুজকে বস্তুত তিনিই স্ক্রিপ্ট লেখার কলাকৌশলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। অস্বস্তির ব্যাপার হলো, যদিও মাহফুজের সঙ্গে আবু সাইফ কাজ করেছেন, তার লেখা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করেছেন, তবু মাহফুজের উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে মিসরীয় ফিল্মমেকারদের মধ্যে তার আগ্রহই ছিল সবচেয়ে কম! বলাবাহুল্য, মাহফুজের দুটি বিখ্যাত উপন্যাস বিদায়াত ওয়া নিহায়াত [‘বিগেনিং অ্যান্ড এন্ড’] ও আল-কাহিরা আল-জাদিদা [‘দ্য নিউ কায়রো’] অবলম্বনে সিনেমা বানিয়ে নিজের সিনে-দুনিয়ায় নতুন ভিত তৈরি করেছিলেন আবু সাইফ। এই দুটিকেও আবু সাইফের শ্রেষ্ঠ সিনেমার তালিকায় জায়গা দেওয়া হয়। তবু, এই দুজনের এই কর্মসম্পর্কের ভিতটি মূলত রচিত হয়েছে অন্য উপন্যাসিকদের, বিশেষত আমিন ইউসুফ গারাব ও ইহসান আবদেল কুদ্দুসের উপন্যাস অবলম্বনে মাহফুজের লেখা স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে।


ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার
ভেতর দিয়ে শ্রেণিচৈতন্যের
বিকাশটিকে কালানুক্রমিক
দেখানোর প্রচেষ্টা ছিল তার

আবু সাইফ ও আবদেল কুদ্দুসের কর্মসম্পর্কটি ১৯৫০ দশকের দ্বিতীয়ভাগে জায়গা করে নিয়েছে; এই সময়কালটিতে আবু সাইফ নির্মাণ করেছেন দ্য এম্পটি পিলো, স্লিপলেস, দ্য বেয়ারড রোড, আই অ্যাম ফ্রি, এবং এরপর দ্য গার্লস ইন দ্য সামার-এর একটি পর্ব। যদিও এই সিনেমাগুলোর মধ্য দিয়ে আবু সাইফ “পপুলার কোয়ার্টার” থেকে “হোম অব দ্য বুর্জোয়া”য় ট্রাঞ্জিশন করেছেন, তবু সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা টেকটিক ক্যারেক্টারাইজেশনে তিনি আমূল পরিবর্তন জাহিরকরেছেন– এমনটা বোঝানো ভুল হবে। বরং এই সিনেমাগুলোর একটি বিশ্লেষণ আমাদের জানান দেয়, শুরুতে যেমন ছিলেন, সে পথেই চলা অব্যাহত রেখেছেন আবু সাইফ : যেমন, কোনো স্বাধীন প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং সামাজিক অবস্থার প্রতি একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে তার চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের উপর ফোকাস করে গেছেন তিনি। পরিণামে, ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শ্রেণিচৈতন্যের বিকাশটিকে কালানুক্রমিক দেখানোর প্রচেষ্টা ছিল তার।

সালাহ আবু সাইফ
বিটুইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

স্পষ্টতই, যে বিষয়টিতে অন্য ফিল্মমেকারদের চেয়ে আবু সাইফের মনোযোগ বেশি ছিল, তা হলো– হোক তার সিনেমা রিয়েলিস্ট, রোমান্টিক, কমন কিংবা বুর্জোয়া– সেগুলো বস্তুত ছিল সামাজিক অবস্থার সঙ্গে একজন ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প। সেই ব্যক্তিমানুষটি হোক সাধু কিংবা অপরাধী, পাপী কিংবা শিকার– সে শেষ পর্যন্ত সামাজিক অবস্থারই একটি পণ্য। “‘অহং আমাকে ‘অপর’ করে তোলে”– এ কথা আবু সাইফ প্রায়শই বলতেন। আর এ বিষয়টিই বিশেষত নিজের দুটি সিনেমায় তিনি ফুটিয়েও তুলেছিলেন, যেটিকে তার সামগ্রিক ফিল্মি দুনিয়ার একটি নির্যাস হিসেবেও গণ্য করা যায় : অ্যা ওম্যান’স ইয়ুথবিটুইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ। এই সিনেমাগুলোর প্রতিটিতেই আবু সাইফ নিজের চরিত্রগুলোকে একটি বদ্ধ পরিক্রমার মধ্যে অবস্থান করিয়েছেন, এবং নিজে এগিয়ে গেছেন যেন কোনো রাসায়নিক পরীক্ষার মতোই নিজ উপাদানগুলোকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে যাচাই করতে, আর আমাদের, মানে দর্শকদের রেখে গেছেন শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্ন তুলতে : অ্যা ওম্যান’স ইয়ুথ-এর এই ব্যভিচারী নারীটি [তাহিয়ার কারিয়োকা অভিনীত] আসলেই শয়তান, নাকি পরিবেশ-পরিস্থিতিই তার জীবনকে এ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে? এমনকি যদিও সিনেমাটির শেষ হয় নারীটিকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার মধ্য দিয়ে, তবু তার জন্য আবু সাইফের সিনেমাটিতে গোপন সমবেদনার আভাস রয়েছে- সে কথা কি আমরা বলতে পারি না?

সালাহ আবু সাইফ
দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

যদিও ১৯৫০ দশকের শেষভাগে আবু সাইফ দৃশ্যই বলতেন, যা তার করার ছিল, করে ফেলেছেন; তবু ১৯৬০ দশক তাকে দ্বিতীয়বার ডানা মেলতে দেখল। একইসঙ্গে বিভিন্ন পাঠশালা ও পর্যায়ের মধ্যে দুলতে থাকলেন তিনি। ১৯৬০ দশকটি দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড সিনেমাটির এক তুখোড় বিগিনিং বা সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে; এটি ছিল নাগিব মাহফুজের উপন্যাস-জগতের সঙ্গে তার প্রথম বোঝাপড়া; আর দশকটির উপসংহার ঘটে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ফিল্ম দ্য ড্যন অব ইসলাম-এর মধ্য দিয়ে। এই দুটি তুখোড় সিনেমা দিয়ে বিভক্ত এই পিরিয়ডটিতে আবু সাইফ আটটি সিনেমা বানিয়েছেন, যেগুলোর কয়েকটিকে মিসরীয় সিনেমার ইতিহাসের শীর্ষবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয় : লতিফা আল-জাইয়াতের [১৯২৩–১৯৯৬] উপন্যাস অবলম্বনে দ্য সান উইল নেভার সেট; মাহফুজের দ্য নিউ কায়রো উপন্যাস অবলম্বনে কায়রো ৩০; দ্য সেকেন্ড ওয়াইফ ; এবং সর্বশেষ দ্য কেইস ৬৮— যে সিনেমাটিকে তখনকার সমাজতান্ত্রিক নীতিমালার সবচেয়ে রূঢ় সমালোচনার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


‘আমার
এত এত
সন্তান মিসরের
বর্তমান সিনেমার
একেকজন মাস্টার
ফিল্মমেকার হয়ে উঠেছে,
তার
মানে এখন
তো আমার বিশ্রাম
নেওয়াই শ্রেয়, তাই না?’

ফিল্মমেকিং থেকে অবসর নেওয়ার আগে, নিজ ক্যারিয়ারের শেষ পিরিয়ডটিতে আবু সাইফের বানানো দুটি সিনেমাকেও তার শ্রেষ্ঠ সিনেমার তালিকায় জায়গা দেওয়া যেতে পারে : ওয়াটার-কেরিয়ার ইজ ডেডদ্য ইজিপসিয়ান সিটিজেন। ইউসুফ সিবাইয়ের [১৯১৭–১৯৭৮] একটি সাহিত্যকর্মের উপর ভিত্তি করে ওয়াটার-কেরিয়ার ইজ ডেড নির্মিত; দ্য ইজিপসিয়ান সিটিজেন বানানো হয়েছে ইউসুফ আল-কাঈদের একটি উপন্যাস অবলম্বনে। এই দুটি সিনেমা আবু সাইফের শিল্পগত ইতিহাসের সামগ্রিক রূপটির সারসংক্ষেপ হয়ে আছে।

সালাহ আবু সাইফ
কায়রো ৩০
ফিল্মমেকার । সালাহ আবু সাইফ

মহাপ্রয়াণের এক বছর আগে, যখন তিনি আতেফ আল-তায়েবের শেষ দিনগুলো গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন আমাদের বলে গেছেন : ‘আমার এত এত সন্তান মিসরের বর্তমান সিনেমার একেকজন মাস্টার ফিল্মমেকার হয়ে উঠেছে, তার মানে এখন তো আমার বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়, তাই না?’ যে সন্তানদের কথা তিনি বোঝাচ্ছিলেন, সেই তালিকায় আতেফ আল-তায়েব তো অবশ্যই রয়েছেন, আরও রয়েছেন খায়রি বেফারা [১৯৪৭–], মোহাম্মদ খান [১৯৪২–২০০১৬], রাফাত আল মিহি [১৯৪০–২০১৫], আলি বাদ্রাখান [১৯৪৬–] এবং অন্যরাও। মনে পড়ে, ১৯৮০ দশকের শুরুতে এক লেখায় এই ফিল্মমেকারদের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি শিরোনাম দিয়েছিলাম আমি, ‘সড়কের সন্তানেরা, সালাহ আবু সাইফ ও কোকাকোলার সন্তানেরা।’ এই বৈশিষ্ট্যায়নটি আবু সাইফকে আনন্দ দিয়েছিল, যদিও বিষয়বস্তু হিসেবে ‘কোকাকোলা’কে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন তিনি।

ইব্রাহিম আল আরিস। প্যারিসভিত্তিক আরব সিনে-সমালোচক
সূত্র । আল জাদিদ । আরব শিল্প ও সংস্ক্রৃতির জার্নাল


সালাহ আবু সাইফ
সালাহ আবু সাইফ
সালাহ আবু সাইফের ফিল্মোগ্রাফি

১৯৪৫-৪৬ । অলওয়েজ ইন মাই হার্ট [Dai'iman fi qalbi]
১৯৪৭ । দ্য রিভেঞ্জার [Al-muntaqim]
১৯৪৮ । দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব আন্তার অ্যান্ড আবলা [Mughamarat Antar wa Abla]
১৯৪৯ । স্ট্রিট অব দ্য অ্যাক্রোব্যাট [Shari al-bahlawan]
১৯৫০ । দ্য ফ্যালকন [El sakr]
১৯৫২ । ইউর ডে উইল কাম ওরফে অপ্রেসর'স ডে ইজ কামিং [Laka yom ya zalem]
১৯৫২ । লাভ ইজ অ্যা স্ক্যান্ডাল [El hub bahdala]
১৯৫২ । ফোরম্যান হাসান [El osta Hassan]
১৯৫৩ । রায়া অ্যান্ড সাকিনা [Raya wa Sekina]
১৯৫৪ । দ্য মনস্টার [El wahsh]
১৯৫৬ । দ্য লিচ ওরফে অ্যা ওম্যান'স ইয়ুথ [Shabab emraa]
১৯৫৭ । দ্য টাফ ওরফে থাগস [El fatawa]
১৯৫৭ । স্লিপলেস ওরফে আই ডু নত স্লিপ [La anam]
১৯৫৭ । দ্য এম্পটি পিলো [El wessada el khalia]
১৯৫৮ । দ্য বেয়ারড রোড [El tarik el masdud]
১৯৫৮ । থিফ অন হলিডে [Mugarem fi ijaza]
১৯৫৮ । আই অ্যাম ফ্রি [Ana hurra]
১৯৫৯ । অ্যা গার্ল অব সেভেনটিন [Bint sabatashar]
১৯৬০ । দ্য গার্লস ইন দ্য সামার [El banat waal saif]
১৯৬০ । দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড [Bidaya wa nihaya]
১৯৬০ । বিটুইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ [Bayn el samaa wa el ard]
১৯৬০ । অ্যাগোনি অব লাভ [Lawet el hub]
১৯৬১ । দ্য সান উইল নেভার সেট [La tutfi el shams]
১৯৬৩ । নো টাইম ফর লাভ [La wakta lil hub]
১৯৬৩ । লেটার ফ্রম অ্যান আননৌন ওম্যান [Ressalah min emraa maghoula]
১৯৬৬ । কায়রো ৩০ [Al-Kahira thalatin]
১৯৬৭ । দ্য সেকেন্ড ওয়াইফ [Al-zawja al-thaniya]
১৯৬৮ । দ্য ট্রায়াল ওরফে দ্য কেইস ৬৮ [Al-qadia 68]
১৯৬৯ । থ্রি উইমেন [Thalath Nessaa]
১৯৬৯ । অ্যা বিট অব সাফারিং [She' Mn El Azab]
১৯৭১ । ড্যন অব ইসলাম [Fajr al islam]
১৯৭৩ । দ্য বাথহাউস অব মালাতিলি [Hammam al-Malatily]
১৯৭৫। দ্য লায়ার [Al kaddab]
১৯৭৬ । লাভ ফার্স্ট ইয়ার [Sana oula houb]
১৯৭৭ । শি ফেল ইন দ্য হানি সী [Wa sakatat fe bahr el-asal]
১৯৭৭ । দ্য ওয়াটার-কেরিয়ার ইজ ডেড [Al-saqqa mat]
১৯৭৮ । দ্য ক্রিমিনাল [Al-Mugrem]
১৯৮১ । দ্য কাদিশিয়া [Al Qadisiyya]
১৯৮৬ । দ্য বিগিনিং [Al-Bidaya]
১৯৯১। দ্য ইজিপসিয়ান সিটিজেন ওরফে ওয়ার ইন দ্য ল্যান্ড অব ইজিপট [Al-moaten Masry]

সূত্র । উইকিপিডিয়াআইএমডিবি
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন