সাহিত্য থেকে সিনেমার অ্যাডাপটেশান ও সত্যজিৎ রায়ের ‘পোস্টমাস্টার’/ লাবণ্য দে

1
189
লাবণ্য দে

লিখেছেন । লাবণ্য দে


শিল্পের নানা মাধ্যম। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে থাকে এই শিল্প। এই নানামাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিল্প বিচ্ছিন্ন ও একমুখী নয়। এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে শিল্পের চলাফেরা অবাধ। বিভিন্ন সময় এই বিভিন্ন মাধ্যমের আদান-প্রদানেই গড়ে ওঠে শিল্পের শরীর। সাত্যকি ব্যানার্জী একবার ওনার একটি লাইভ কনসার্টে বলেছিলেন ওনার গাওয়া বহু গা­নই বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে এসে উনি সেই সংস্কৃতি বা সেই লোকগুলোর নিজেদের গানগুলোকে পেয়েছেন, তাতে গানের কিছু মনে থেকে গেছে, কিছু গেছে হারিয়ে। তার থেকেই গানের কিছু কথা, যন্ত্রানুসঙ্গ নিজের মতো করে নিয়ে গেয়ে শোনালেন তিনি। হয়তো আবার সাত্যকির থেকে এই গান শুনে অন্য তানে বেঁধে গাইতে পারেন অন্য কোনো শিল্পী। এই যে একটি গান এক থেকে আরেক হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, শিল্পের এভাবেই এক থেকে বহু হয়ে ব্যাপ্ত হয়ে যাওয়ার পদ্ধতি শিল্পসৃষ্টির শুরুর দিন থেকে বিদ্যমান। কোন সুদূর পশ্চিমের ‘ওল্ড ল্যাং সাইন’ কিভাবে রবীন্দ্রনাথকে নাড়া দিয়ে সৃষ্টি করেছিলো ‘পুরানো সেই দিনের কথা’র সুর– তার রহস্য কেবল সেই শিল্প আর শিল্পীই জানেন।

এই যে এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যম হয়ে ছড়িয়ে পড়া– শিল্পের এই প্রবণতা চিরকালীন। অ্যাডাপটেশান নাম দিয়ে যাকে আমরা ব্যক্ত করে থাকি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অ্যাডাপটেশান সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন আমাদের মধ্যে থেকে যায়। তা মূল টেক্সটটির অনুসারী থাকলো কিনা বা মূল থেকে কতটা আলাদা হয়ে গেলো ইত্যাদি। অ্যাডাপটেশান মাত্রই যে তা মূল টেক্সটটির হুবহু অনুসরণের দায় রাখে না, কেন রাখে না, কিভাবে রাখে না, কেন নতুন টেক্সটটির স্বার্থে তার লজিকাল এক্সটেনশানের প্রয়োজন হয়– তা রবীন্দ্রনাথের একটি ছোটগল্প [পোস্টমাস্টার] ও একই নামে সত্যজিৎ রায়ের একটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পচর্চিত ছোট ছবির নিরিখে আলোচনা করবো।

অ্যাডাপটেশান সংক্রান্ত

একটি টেক্সট থেকে আরেক টেক্সটের ‘অ্যাডাপটেশান’ যে সবসময় সচেতন আডাপটেশান হবে এমন কোনো কথা নেই। অ্যাডাপটেশান সচেতন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। অবশ্য এই অবচেতন অ্যাডাপটেশানকে আমরা অ্যাডাপটেশান নাম না দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবচেতন প্রভাব বলে থাকি। যেমন, ন্যারেটিভ গল্প বলা ছবি বানানোর সময় যেকোনো ফিল্মমেকার জীবনে একটাও ক্লাসিকাল হলিউড না দেখলেও অবচেতনেই তার ফর্ম অনুসরণ করে চলেন। বা আধুনিক কবিতার বিমূর্ততা আধুনিক উপন্যাসের বিমূর্ততার সাথে মিলেমিশে যায়। এলিয়টের ‘let us go then, you and I, When the evening is spread out against the sky’-এর মতো আপাত রোমান্টিক লাইনের পরেই আসে ‘patient etherized upon a table’-এর চিত্র– আমরা জানি না আধুনিক এই দ্যোতনা বিনয় মজুমদারের অবচেতনে মিলেমিশে তাঁর কবিতায় এসেছিলো কিনা– ‘সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হয়ে গেছে তবু/ কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্কস্থাপন করা যায় না এখনো’।


কোনো
সাহিত্যের
গল্পকে যখন
চলচ্চিত্রের মাধ্যমে
বলতে চাওয়া হয় তখন
তা কতটা মূল গল্পের অনুসারী
থাকছে– এই প্রশ্ন আসলে অপ্রয়োজনীয়

অবচেতনের এই অনুসরণ সর্বত্র। চারুলতা ছবিটিতে চারু যখন প্রথম লিখতে শুরু করে, তার লেখা তার অজান্তেই অমলের মতো হতে থাকে, পরে সে তা বুঝতে পেরে তাকে কাটিয়ে উঠে নিজের ভাষা খুঁজে পায়। এখন এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের ইতিহাসের এতো যুগ পেরিয়ে যাওয়ার পর আজ যেকোনো মাধ্যমে শিল্প সৃষ্টি করতে গেলেই পূর্বসূরিদের প্রভাব আসতে বাধ্য, এখন সেই প্রভাবের বশে অন্ধ অনুকরণ করলে তা অনুকরণই থেকে যায়, শিল্প হয়ে ওঠে না। বরং শিল্পের ইতিহাসকে গায়ে মেখে তার অনুরণনকে উপলব্ধি করে নতুন কিছু তৈরি করবার মধ্যেই আছে শিল্পের সার্থকতা। চারুর লেখায় তাই অন্য লেখকদের লেখার ভাবনা মিশে থাকলেও তা হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র।

অবচেতন মনের এই প্রভাব [বা অবচেতন অ্যাডাপটেশান]-এর প্রসঙ্গ বাদ রেখে সচেতনভাবে যখন কোনো টেক্সটের অ্যাডাপটেশানে তৈরি হয় আরেকটি টেক্সট, সেই ক্ষেত্রেও অবশ্য এই বিষয়গুলো জরুরী হয়ে ওঠে। কোনো সাহিত্যের গল্পকে যখন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলতে চাওয়া হয় তখন তা কতটা মূল গল্পের অনুসারী থাকছে– এই প্রশ্ন আসলে অপ্রয়োজনীয়। বরং সেই গল্পকে সিনেমার ভাষায় সুচারুভাবে ব্যখ্যা করা গেলো কিনা, সিনেমার আঙ্গিকে গল্প বুনোট বাঁধতে পারলো কিনা তার দিকে লক্ষ্য রাখাই তখন প্রাসঙ্গিক।

সাহিত্য থেকে সিনেমা

সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ছবিটি মূল গল্প নষ্টনীড়-এর থেকে আলাদা হয়েছে বলে অশোক রুদ্র [চলচ্চিত্র সমালোচক] তার বিস্তৃত সমালোচনা লিখেছিলেন। এখন সিনেমার সমালোচনা সিনেমাটি মূল গল্পের কতটা অনুসারী হলো তা দিয়ে কখনোই হতে পারে না, বরং সেই মূল গল্পের আধারে তা কিভাবে সিনেমার ভাষার উৎকর্ষে পৌঁছাতে পারলো বা পারলো না সেটাই সমালোচনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অশোক রুদ্রের উত্তরে সত্যজিৎ রায় চারুলতা প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলেন– “শ্রীরুদ্র নষ্টনীড়ের ‘সুসংবদ্ধ ও সুসংহত’ প্লটের কথা বলেছেন। আমার মতে নষ্টনীড়ে প্লট জিনিসটা গৌণ। যদি তা না হত তবে মূলের ধারাবাহিকতা বজায় রক্ষা করে নষ্টনীড়ের গল্প মুখে বলা সম্ভব হত”।


শিল্প
যখন
এক মাধ্যম
থেকে আরেক মাধ্যমে
ছড়িয়ে পড়ছে তখন প্রতিবার
তার পুনর্জন্ম ঘটছে, প্রতিবার
তৈরি হচ্ছে আরেকটি
নতুন
শিল্প

আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাহিত্যের [উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি] মূল প্লট বা গল্পকে এককথায় বলে দেওয়া যায়, তাহলে আমরা পাতার পর পাতা লেখা পড়ি কেন? সংক্ষিপ্তাসার পড়ে নিলেই তো মিটে যেতো। পড়ি, কারণ গল্পটুকু ছাড়াও গল্পের ট্রিটমেন্ট এখানে হয়ে ওঠে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যে এই ট্রিটমেন্টের অ্যাপারেটাস [প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি] ­শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন, ছন্দ, ­­­­­­­­­­­­­বর্ণনা সর্বোপরী লিখনশৈলী। সাহিত্যের এই গল্প যখন সিনেমায় বলা হবে তখন একই গল্পের উপর ভিন্ন অ্যাপারেটাস– যথা ক্যামেরা পজিশান, শট কম্পোজিশান, আলোর ব্যবহার, সম্পাদনা প্রয়োগ করা হবে। আবার সেই গল্পকেই মঞ্চে দেখাতে চাইলে তার জন্য নিতে হবে অন্য পদ্ধতি। এই ভিন্ন অ্যাপারেটাস-এর স্বার্থে এবং শিল্পীর নিজস্ব স্বকীয় সৃষ্টির জায়গা থেকে একটি টেক্সটের অ্যাডাপটেশানে টেক্সটির হুবহু অনুকরণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। অর্থাৎ শিল্প যখন এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে তখন প্রতিবার তার পুনর্জন্ম ঘটছে, প্রতিবার তৈরি হচ্ছে আরেকটি নতুন শিল্প। তাই ব্লু ইজ দ ওয়ার্মেস্ট কালার সিনেমাটি একই নামের গ্রাফিক নভেলকে কতটা অনুকরণ করেছে, বা কুরোসাওয়ার থ্রোন অফ ব্লাড কতটা শেকসপিয়ারের ম্যাকবেথ-এর কাছাকাছি হয়েছে তার থেকেও বেশি জরুরী হয়ে ওঠে স্রষ্টা কিভাবে কাজটি করেছে, এবং তাতে স্রষ্টার কি দর্শন মিশে আছে, সেই দিকটি।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যেহেতু একটি নির্দিষ্ট টেক্সট [পোস্টমাস্টার] রাখার কথা বলেছি, তাই আপাতত এই ছোটগল্পটি  কিভাবে একই নামের ছবিতে অ্যাডাপ্ট করা হয়েছে তার সম্বন্ধে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।

পোস্টমাস্টার : ছোটগল্প ও সিনেমা

পোস্টমাস্টার ছোটগল্পটির শুরুতেই দেখা যায় পোস্টমাস্টারের কাজ করতে এক গন্ডগ্রামে শহুরে বাবু এসে পড়েছেন। ওনার অবস্থাটি ব্যাখ্যা করতে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যে-রকম হয়, এই গন্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে”। এই অবস্থাটিকে সিনেমায় ধরবার জন্য সত্যজিৎ রায় নানাবিধ কৌশল নেন। রবীন্দ্রনাথ যে ভাব এক বাক্যের মধ্যে ব্যক্ত করে দিয়েছেন, সেই ভাবকে সিনেমায় পুনর্গঠন করতে গেলে কিছু ঘটনার উত্থাপন করতেই হয়।

শুরুতেই দেখা যায় :

পোস্টমাস্টার
[১]

[১]
ওই ছোট একচালা ঘরটিতে নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখতে খানিক সমস্যায় পড়ছেন পোস্টমাস্টার [ছবিতে এই ভূমিকায় অনিল চ্যাটার্জী অভিনয় করেছেন]।

পোস্টমাস্টার
[২]

[২]
স্নানের জন্য পুকুরে যেতে গিয়েও পুকুরের ময়লা আর পানা দেখে সেখানে স্নান করতে পারেন না তিনি, ফিরে এসে রতনকে বলেন ভালো জল তুলে আনতে।

পোস্টমাস্টার
[৩]

[৩]
রতন জল আনতে যাওয়ার সময় গ্রামের এক পাগল পোস্টমাস্টারের আপিসের সামনে এসে প্রলাপ বকতে থাকে, নতুন পরিবেশে এই  উৎপাতে রীতিমতো ভয়ে কুঁকড়ে যায় পোস্টমাস্টার চরিত্রটি।

রতনের সাথে ঠিক করে সম্বন্ধ তৈরি হওয়ার আগেই সত্যজিৎ রায় পরপর এই বিষয়গুলির উত্থাপন করেন, যা মূল ছোটগল্পের অন্তর্গত নয়। অথচ এই বিষয়গুলি উত্থাপিত না হলে শহুরে চরিত্রের গ্রামে আসার সাথে জলের মাছকে ডাঙায় তোমার উপমার প্রয়োগ সিনেমার পর্দায় সার্থক হতো না। ছোটগল্পটিতে যা পঞ্চম লাইনেই উপস্থাপনা করা গেছে ছবিতে তা প্রতিষ্ঠা করতে রিল টাইমের প্রায় বারো মিনিট সময় নিয়েছেন পরিচালক। যদিও সমগ্র ছবি এবং ছোটগল্পটি জুড়েই শহুরে বাবুর গ্রামে এসে মুশকিলে পড়ার থিম বিরাজ করছে, তাও সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই অত্যন্ত মুন্সীয়ানায় যথাক্রমে তাদের ছবি ও গল্পের শুরুতেই এর রেফারেন্স দিয়ে রেখেছেন– দুজন দুরকমভাবে।

ছোটগল্পে রতনের বর্ণনায় বলা আছে সে বারো তেরো বছরের ‘পিতৃমাতৃহীন অনাথা বালিকা’। সিনেমায় একটি বারো তেরো বছরের মেয়েকে দেখালেই তা বুঝতে পারা যায়, কিন্তু পরের কথাটি বোঝানোর জন্য সংলাপের প্রয়োজন, প্রয়োজন সঠিক জায়গায় এই সংলাপ ব্যাবহারের পরিমন্ডল তৈরি করা। তার সাথে রতনের প্রতি পোস্টমাস্টারের স্নেহের দিকটাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সিনেমার শুরুতে পোস্টমাস্টারকে রতনের সাথে চিরাচরিত মালিক-ভৃত্যের সম্পর্কের মতো করেই রুক্ষ্মভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তাকে ঘর মোছার সময় সরে দাঁড়াতে বলা বা পাতকুয়ো থেকে জল তুলে আনতে বলার মধ্যে ছিলো শুষ্ক আদেশের কন্ঠস্বর, অথচ গল্পের খাতিরে আমরা জানি, এরপর তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হবে। এই বন্ধুত্ব তৈরি হওয়ার আগে প্রথম পরিচয়ের অবস্থানটা দেখিয়ে দেওয়া দরকার, নইলে মনে হতে পারে এরা দুজন পূর্বপরিচিত।

জল বয়ে আনার পরের দৃশ্যে বাবু বিশুপাগলকে ভয় পাচ্ছে দেখে তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রতন বাবুর প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চায়। ঠিক এর পরের সিনেই এই দুই চরিত্রের মধ্যে এই বন্ধুত্ব ও স্নেহের সম্পর্কের সূচনা হয়। টেবিলে চিঠি লিখতে লিখতে মুখ তুলে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো রতনের সরল চোখের দিকে তাকিয়ে পোস্টমাস্টার জিজ্ঞাসা করে, “তোর কাপড় এতো ময়লা কেন? মা কেচে দেয় না?” রতন জানায় তার মা, বাবা দুজনেই ছোটবেলায় মরে গেছে। পোস্টমাস্টার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এই দৃশ্যটির মাধ্যমে রতনের অবস্থান এবং দুটো চরিত্রের সম্পর্কের ভিত্তি গঠিত হয়ে যায়।

পোস্টমাস্টার

রতন এবং পোস্টমাস্টার ছাড়াও যে গ্রামে কিছু চরিত্র আছে তার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। পূর্বে বিশুপাগল আর পোস্টমাস্টারের ঘর দেখিয়ে দেওয়ার একজন লোক ছাড়া আর কারোর পরিচয় পাওয়া যায়নি। অথচ একটা গ্রাম যেখানে একটা পোস্টআপিস আছে, তা তো জনশূন্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পটিতে অন্যান্য চরিত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন– “বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাহার মেলামেশা হইয়া উঠে না”। একে সিনেমার ভাষায় দেখানোর জন্য দুটো জিনিস বোঝানো প্রয়োজন– প্রথমতঃ স্থানীয় লোকের উপস্থিতি, দ্বিতীয়তঃ তাদের সাথে পোস্টমাস্টার মেলামেশা করতে পারছে না। এই সূত্রে ছবিতে একটিমাত্র দৃশ্য উপস্থাপনা করা হয়, যেখানে ক্যামেরা জুম ইন করে পোস্টমাস্টারের কাজ করা দেখায়, তারপর ক্রমশ ক্যামেরার জুম আউট এ পুরো ঘরের চিত্র স্থাপিত হলে দেখা যায় সেখানে গ্রামের কিছু মানুষ বসে আছে, শহুরে বাবুর সাথে গল্প জমানোর অছিলায়। এই দৃশ্যগঠনে রতনের মতোই স্থানীয় মানুষদের সাথেও তার বন্ধুত্ব তৈরি হওয়ার একটা সম্ভাবনার ক্ষেত্র গড়ে ওঠে। কিন্তু পোস্টমাস্টারের কথোপকথন ও শরীরী অভিব্যক্তির মধ্যে দিয়েই বোঝা যায় যে সে গ্রামের মানুষের সাথে ঠিক স্বচ্ছন্দ হতে পারছে না বা চাইছে না। এর অনেকগুলি দৃশ্যের পরে স্থানীয় লোকেদের গানের আসরে পোস্টমাস্টারকে দেখা যায়, এখানেও তাদের সাথে সম্বন্ধ-স্থাপন হওয়ার পরিসর থাকলেও সম্বন্ধ তৈরি হয় না– পোস্টমাস্টার জ্বরের ঘোরে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে আসে। অর্থাৎ বোঝা যায় রতন ছাড়া এই অজ পাড়াগাঁয়ে তার আর কোনো ভরসা নেই।


সে একটি
কথাও বলে
না– কেবল
তার অশ্রুপূর্ণ
অভিমানী মুখের
ক্লোজআপ-এই তার
অনুভূতি পড়ে ফেলি আমরা

এই রতন চরিত্রকে ভারী যত্ন নিয়ে বুনেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার মনের চিত্র আঁকা হয়ে গেছে এই গল্পে। এই মনের চিত্র বা আত্মার ছবি সিনেমায় কি করে পড়া সম্ভব? এক্ষেত্রে ক্লোজআপ ব্যবহারের দিকটা উল্লেখযোগ্য। পোস্টমাস্টারের সাথে প্রথম বন্ধুত্ব হওয়ার রাতে, রতন তার মা বাবাকে হারানোর কথা বলতে বলতে চুপ করে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে– এমন সময় ক্যামেরা প্রথম তার ক্লোজআপ [৪]নেয়, প্রথমবার রতন মুখ্য চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মন পড়বার চেষ্টা করে ছবিটি। এরপর রতন পোস্টমাস্টারের তার নোংরা কাপড়ের প্রতি মায়া প্রকাশ করতে দেখে সে নিজেই তার কাপড় কেচে আনে, পোস্টমাস্টারকে সরাসরি কিছু না বলে তাকে ‘ছোটবাবু’ বলে ডেকে কাপড় ধরে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। ক্যামেরা আবার ক্লোজআপ-এ [৫] চলে যায়– রতনের প্রতি অনেকদিন পর কেউ যত্ন করেছে– রতনের সেই আনন্দকে ক্যামেরা একমনে দেখতে থাকে। রতনের মনের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্যামেরা ক্লোজআপ থেকে টাইট ক্লোজআপ [৬] নিয়ে ফেলে পোস্টমাস্টারের অসুখের রাতে, যখন রতন তার শিয়রে বসে শুশ্রূষায় ব্যস্ত। এইখানেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বালিকা রতন আর বালিকা রহিল না। সেই মুহূর্তেই সে জননীর পদ অধিকার করিয়া বসিল।” রতনের শেষ ক্লোজআপ [৭] সবথেকে ট্র্যাজিক– রতন বুঝতে পারে তার বন্ধু পোস্টমাস্টার চলে যাচ্ছে, সে একটি কথাও বলে না– কেবল তার অশ্রুপূর্ণ অভিমানী মুখের ক্লোজআপ-এই তার অনুভূতি পড়ে ফেলি আমরা। 

পোস্টমাস্টার
[৪]
পোস্টমাস্টার
[৫]
পোস্টমাস্টার
[৬]
[৭]

রবীন্দ্রনাথের গল্পের পরিসরটি একদিনের নয়। অর্থাৎ বেশ কিছুকাল যাবৎ পোস্টমাস্টারের উলাপুর গ্রামে থাকার কথা এখানে রয়েছে। এখন একটি ন্যারেটিভ সিনেমায় এই অনেকটা সময় বা পরপর কিছু দিন বোঝাতে তো প্রতিটা দিন দেখানো সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে বেছে নিতে হয় কিছু সিনেম্যাটিক কৌশল। মন্তাজের মাধ্যমে পোস্টমাস্টারের চাকরির কাজ, রতনকে পড়ানো পরের পর দেখিয়ে সত্যজিৎ রায় এই সময়ের ব্যপ্তিকে বোঝাতে চেয়েছেন। আর তার মাঝে মাঝে  প্রাত্যহিক থেকে একটা দিনের টুকরো বা কিছু সময়ের বিশেষ কিছু ঘটনা দেখিয়ে গঠন করা হয়েছে চরিত্রগুলির সম্পর্ক ও ন্যারেটিভ কাঠামো। যে শহুরে পোস্টমাস্টার এই সুদূর গাঁয়ে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিলো, দিনে কাজ আর সন্ধ্যেতে রতনকে পড়িয়ে আর তার সাথে স্নেহের সম্পর্কে আগের থেকে ভালো দিন কাটছিলো– সেই পোস্টমাস্টার বিষম জ্বরে পড়লে কাহিনী এক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়। জ্বর যে কি ভীষণ তা বোঝাতে সত্যজিৎ রায় পোস্টমাস্টারের জ্বরের ঘোরের দৃশ্যটি বিস্তৃতভাবে রচনা করেন। রতন তার নিজের কাঁথা বাবুর গায়ে চাপিয়ে দেয়, না ঘুমিয়ে বাবুকে জলপটি সেবা করতে থাকে। এ বাবুই এতোদিন তাকে ভালোবেসে পড়াশোনা শিখিয়ে এসছে। হয়তো রতন এই বাবুর থেকেই প্রথম এতো যত্ন পায় [আগের বাবুরা যে তাকে বকতো, মারতো তার উল্লেখ সিনেমাতে রয়েছে]। সেই বাবু অসুস্থ হয়ে পড়ায় রতন তার সর্বস্ব দিয়ে তাকে সেবা করতে থাকে। উলটোদিকে বিষম জ্বরের ঘোরে সাউন্ডস্কেপে বিশুপাগলের চিৎকার শুনতে শুনতে  রতনকে চিনতে পারে না পোস্টমাস্টার।

পোস্টমাস্টার

রবীন্দ্রনাথের গল্প অনুসারে এই জ্বর থেকে উঠলেই পোস্টমাস্টার ফিরে যাবে, তাই এই সন্ধিক্ষণের মুহুর্তকে সিনেমার ভাষায় যত্ন করে গড়েন সত্যজিৎ রায়। মূল গল্পে এই জ্বরের প্রায় কোনো বর্ণনাই ছিলো না, কিন্তু আসন্ন বিচ্ছেদের সূচনা করার পূর্বে কাহিনীর এই মুহুর্তগুলোর সিনেমায় বিস্তৃত করার প্রয়োজন হয়। জ্বরের আবেশে পোস্টমাস্টার রতনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘তুই কে?’, রতন আন্তরিকভাবে বোঝাতে চায় সে রতন– বাবুর কাজ করে দেয়। এই প্রথম রতনকে চিনতে ভুল করে পোস্টমাস্টার– এই দৃশ্যরচনা পরবর্তীতে পোস্টমাস্টারের রতনকে ছেড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্যপটের পূর্বাভাস দেয় যেন। 

এরপরে রবীন্দ্রনাথের গল্পের শেষে আসে সেই চরম বিচ্ছেদের মুহুর্ত– রতনের কেঁদে ওঠা, তীব্র অভিমান আর পোস্টমাস্টারের সাথে তার বাড়িতে যেতে চাওয়া। কিন্তু সত্যজিৎ রায় এই মুহুর্ত রচনা করতে রতনকে কোনো সংলাপ দেননি, ক্লোজআপে তার একাকী কান্নার মুহুর্ত রয়ে গেছে আর পোস্টমাস্টারের ডাকে সাড়া না দিয়ে সে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে শুধু। রবীন্দ্রনাথ যে দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়বার প্রসঙ্গ এনেছিলেন, তার খানিক ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন সত্যজিৎ রায়, রতনের মুখে ‘নতুনবাবু জল এনেছি’র মধ্যে দিয়ে। রতনকে আর ফ্রেমে দেখা যায় না, শুধু শুনতে পাওয়া যায়। আর পুরোনো পোস্টমাস্টার “পৃথিবীতে কে কাহার” তত্ত্বসমূহ ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলে ক্রমশ।


শিল্প
আমাদের
বিস্মিত করতে
থাকবে প্রতিনিয়ত

আলোচনার শেষে আবার শুরুর কথাগুলোতেই ফিরে যেতে হয়। কোনো সাহিত্য থেকে তৈরি হওয়া অন্য মাধ্যমের শিল্পের সার্থকতা তার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণের মধ্যে থাকে না, বরং তাকে উপলব্ধি করে নতুনভাবে শরীর দেওয়াতেই এর সৃষ্টিমূল্য। পোস্টমাস্টার ছোটগল্পটিকে ন্যারেটিভ সিনেমার ভাষায় গঠন করতে গেলে কিছু ‘লজিকাল এক্সটেনশান’ [যুক্তিপূর্ণ বিবর্ধন] করা আবশ্যিক। সত্যজিৎ রায় কিভাবে তা পরের পর দৃশ্যগঠনের মাধ্যমে নির্মাণ করেছেন তা খানিক দেখাবার চেষ্টা করলাম এই লেখায়। এক্ষেত্রে ওনার পোস্টমাস্টার ছবিটি স্বল্পদৈর্ঘ্যর, মূল গল্পটিও একটি ছোট দৈর্ঘ্যের ছোটগল্প। অন্যান্য ক্ষেত্রে একটি বড়ো উপন্যাস বা কোনো আত্মজীবনী থেকে ছবি নির্মাণের আঙ্গিক বদলে বদলে যেতে পারে। বা এই আপাত গল্প বলা ন্যারেটিভ কাঠামোর ছবির বাইরে বেরিয়ে ছবির ভাষায় কিছু বৈপ্লবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে।

যাই করা হোক না কেন, শিল্প যতদিন থাকবে তার বিভিন্ন মাধ্যমের পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়াও চলতে থাকবে– বিভিন্ন মাধ্যম, বিভিন্ন ভাবনার সংশ্লেষে উন্মুক্ত হতে থাকবে শিল্পের আরো নতুন নতুন স্তর। শিল্প আমাদের বিস্মিত করতে থাকবে প্রতিনিয়ত।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনেমা ও সাহিত্য প্রেমী; শিক্ষার্থী, তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

১টি কমেন্ট

  1. লাবণ্য, আপনি একটি বিষয়ে আলোকপাত করেন নি: সত্যজিত সচেতনভাবেই রতনের বয়স ১২-১৩ থেকে কমিয়ে ৭-৮ দেখিয়েছেন। এতে তার দাদাবাবুর প্রতি মানসিক আকর্ষণটা কিছুটা একমাত্রিক হয়ে গেছে।

মন্তব্য লিখুন