‘নায়ক’ : সত্যজিৎ রায়ের একমাত্র আধুনিক প্রেমের ছবি?/ সায়ন্তন দত্ত

1
162
নায়ক

লিখেছেন । সায়ন্তন দত্ত

নায়ক

নায়ক
স্ক্রিনরাইটার ও ফিল্মমেকার । সত্যজিৎ রায়
প্রডিউসার । আর. ডি. বানশাল; স্মরণকুমারী বানশাল
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । উত্তম কুমার [অরিন্দম মুখার্জি]; শর্মিলা ঠাকুর [অদিতি সেনগুপ্তা]
সিনেমাটোগ্রাফার । সুব্রত মিত্র
মিউজিক । অপরেশ লাহিড়ি; সত্যজিৎ রায়
এডিটর । দুলাল দত্ত; সত্যজিৎ রায়
প্রোডাকশন কোম্পানি । আর. ডি. বানশাল অ্যান্ড কোং
রানিংটাইম । ১১৭ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । ভারত
রিলিজ । ৬ মে ১৯৬৬


সত্যজিৎ রায়ের সারা জীবনের কাজের মধ্যে নায়ক ছবিটির স্থান বেশ গোলমেলে। ছেষট্টি সালে বানানো এই ছবি, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চাপা উত্তেজনা ক্রমশঃ বাড়ছে, আর দুইবছরের মধ্যে নকশালবাড়িতে ফেটে পড়বে বলে। নায়ক সে বিষয়ে প্রায় নিশ্চুপ– উচ্চবিত্ত সমাজের অন্তর্গত মজ্জাগত ভন্ডামির উন্মোচন এ ছবির অন্যতম গুরুত্ব বিষয়; কিন্তু সে উন্মোচনে সরাসরি তীব্র রাজনীতি নেই, সত্যজিৎ রায়ের মার্কামারা একধরনের মানবতাবাদী মেজাজ যে উচ্চারণের প্রাণকেন্দ্র। সত্যজিৎ রায় এরপরেই রাজনৈতিক হতে গিয়ে একধরনের রূপকথায় আশ্রয় নেবেন, সে প্রসঙ্গ এখানে অপ্রয়োজনীয়। ছেষট্টি সালের চাপা রাজনৈতিক উত্তেজনার কোনো সরাসরি প্রভাব নায়ক ছবিতে নেই, তার ছেলেবেলার বন্ধু ‘বীরেশ’র প্রসঙ্গ ছাড়া। তাই বাঙালি সিরিয়াস রাজনৈতিক সিনেবোদ্ধার কাছে নায়ক ছবি খুব একটা সমাদর পায়নি কখনও, ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ-এর দুর্বল ছায়া হয়েই নায়ক-এর কপালে রিফ্লেক্টেড গ্লোরি জুটেছে। এমনকি অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় সম্পর্কিত বাংলা ভাষায় সবচেয়ে নিষ্ঠাবান সমালোচক– তাঁর সমালোচনাতেও এই একটা দূরত্ব রয়ে গেছে– সে দূরত্ব শিল্পকর্ম আর সমালোচকের মধ্যে প্রায়শই ঘটে। শিল্প যা হয়ে উঠতে চায় না সমালোচক তার কাছে তেমন একটা কিছু প্রত্যাশা করেন– যার ফলে ভুল কারণে শিল্পের প্রতি ভুল বিচার চাপানো হয়।

নায়ক
…অরিন্দম আদর করে তার নাম জিজ্ঞেস করে…

নায়ক সত্যজিৎ রায়ের মধ্যপর্বের ছবি, আমার সামান্য জানাশোনায় যে পর্ব শিল্পের সৌন্দর্যের নিরিখে সবচেয়ে শক্তিশালী। সত্যজিৎ রায় ফিল্মে ফর্মের দিক থেকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন– চারুলতা ছবির হীরকতুল্য বিচ্ছুরণ যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। নায়কচারুলতার ঠিক পরের পরের ছবি, তাই স্বাভাবিকভাবেই এর কাঠামোও ঝকঝকে, শৈল্পিক পারিপাট্য অসামান্য। এ লেখার বিষয় যদিও তা নয়, তবু যাঁরা এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তাঁদের একটি বিশেষ ব্যপারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। নায়ক ছবির শুরুতে, অরিন্দম যখন ট্রেনে উঠছে, একটি ছোট্ট বাচ্চা, মায়ের হাত ধরে ট্রেনের করিডর দিয়ে হাঁটে, অরিন্দম গালে হাত দিয়ে হ্যালো বলে তাকে। [সাড়ে তেরো মিনিটের মাথায়] এর খানিক পর, বার্গম্যানের ছবির ইমেজ মনে করিয়ে বাচ্চাটি সত্যজিতের ক্যামেরার ফোরগ্রাউন্ডে চলে আসে।অরিন্দম আদর করে তার নাম জিজ্ঞেস করে। বাচ্চাটির ছবিজুড়ে সেভাবে কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু, এই ধরনের বিষয়, যা সরাসরি মূল গল্পের সাথে সংযুক্ত নয়, মূলত স্পেসের ডিটেলিং বোঝাতে যাদের গুরুত্ব তাদের কীভাবে গল্পের মূলস্রোতের সাথে মিলিয়ে দিতে হয়, তার একদম ক্লাসরুম নায়ক ছবি। একদম শেষে, অদিতি-অরিন্দমের কথা হওয়ার ঠিক আগে, অরিন্দম যখন স্টেটসম্যানের বৃদ্ধ লেখককে বিরক্ত করে অদিতিকে ডাকতে পাঠিয়েছে, [একঘন্টা চল্লিশমিনিট] বাচ্চাটিকে আবার আমরা দেখি। বাচ্চাটি মাতাল অরিন্দমের চেহারা দেখে অবাক, ভীত। অরিন্দম ওর দিকে এক পা এগোতেই ছুটে নিজের ক্যুপে পালিয়ে যায়। আমি নিশ্চিত, দশজনে ন’জন পরিচালক স্পেসের ডিটেল হিসেবে বাচ্চাটিকে ভাবলেও এভাবে ফিল্মের কাঠামোর অঙ্গ করে তাকে নাটকের সবচেয়ে জরুরি অংশে [আমরা অদিতি-অরিন্দমের কথা শুনব এবার] তাকে নিয়ে আসার কথা ভাবতেন না। এতে করে শুধু মোক্ষম মূহুর্তে নায়কের চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ [অথবা দোষ] বা সাধারণ মানুষের মাতাল নায়ককে দেখে প্রতিক্রিয়া দেওয়াই হলো না; বরং একটি সুবিন্যস্ত সাংগীতিক কাঠামোর একটি ছোট্ট মৃদু সুর মূল থিমকে শেষবারের মতো একবিন্দু ছুঁয়ে গেল– আর তাঁর সাথে ক্লাসিকাল হলিউড সিনেমার কাঠামোর সৌন্দর্য টের পাওয়া গেল– এমন কিছু যেন গল্পে না থাকে যা গল্প থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

নায়ক
…বাচ্চাটি মাতাল অরিন্দমের চেহারা দেখে অবাক, ভীত…

কিন্তু এ তো ফর্মাল সৌন্দর্য। ব্যবসায়ী দুই ভদ্রলোকের পারষ্পরিক কাজে একজনের স্ত্রীর ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া এবং সেই স্ত্রীরই নিজের ইচ্ছের কোনো দাম স্বামীর কাছে না থাকা– এহেন জরুরি একটি স্পষ্ট বিষয়কেও বাঙালি সমালোচকরা গুরুত্ব দেননি– কারণ নায়ক ছবিতে চিৎকৃত রাজনীতি নেই। তাছাড়া, নায়ক ছবিতে দোষও আছে– স্বপ্ন এবং সেই সুত্রে দুর্বল সাররিয়েলিজম সত্যজিৎ ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারেননি, ভাবতে অবাক লাগে দু’বছর আগে চারুলতায় গ্রামের স্মৃতি অন্বেষণের অসামান্য ইমেজ সাউন্ড এই ছবিতে এত প্রত্যক্ষ এবং দুর্বল হয়ে গেল কেন। কিন্তু আমরা, এসব ছেড়ে অন্য একটি বিষয় এ লেখায় প্রাথমিক মনোযোগ দেব, কারণ এ লেখকের মতে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে এ বিষয়টি এত স্মার্টভাবে এসেছে হয়তো আর মাত্র একবার– অরণ্যের দিনরাত্রির সৌমিত্র-শর্মিলার সামান্য প্রেমের মধ্যে দিয়ে। তাও সে প্রেমে এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ছিল, টাকার উপরে ঠিকানা লিখে দেওয়া ছিল– এ ছবিতে সেই সম্ভাবনাও প্রায় নেই।

অপর্ণা সেন একবার অভিযোগ করেছিলেন, মাণিকদা সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রেমের ব্যপারটিকে ঠিকঠাক যেন ম্যানেজ করতে পারেন না, এটা ওনার কমফোর্ট জোন না। কথাটা সর্বৈব ভুল না, কারণ সত্যজিতের ছবির শ্রেষ্ঠ প্রেমের দৃশ্যেগুলোর কথা মনে করুন– অপুর সংসার বা দেবী— বিয়ে’র নিশ্চিন্ততায় সুন্দরস্থায়ী মধুর প্রেম। সে প্রেমে কোনো সামাজিক নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করা নেই, কোনো তথাকথিত ‘অবৈধ’ সম্পর্কের ছোঁয়া নেই। যখন সে ছোঁয়া এসেছে– চারুলতায় প্রেম দেখানোর চেয়ে সেখানে জরুরি হয়ে পড়েছে একজন নারীর মনস্তত্ত্ব– সেখানেও সত্যজিৎ নিশ্চিত যে সেই ‘অবৈধ’ সম্পর্ক আদপে টিকবে না, তাই ছবির মূল বিষয় প্রেম নয়, বরং অসম্ভবের অসম্ভাব্যতার একটি নাছোড় প্রকাশ।কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রেমের পাত্র কে হবেন তা প্রায় শুরু থেকে প্রেডিকটেবল, আর আর ছবির শেষ হয় ভবিষ্যতের স্পষ্ট সম্ভাবনার ছোঁয়া রেখে। পোস্টমাস্টার-এ রবীন্দ্রনাথের গল্পের প্রেমের তীব্র দ্যোতনা সত্যজিৎ প্রায় এড়িয়ে গেছেন, সমাপ্তির প্রেম শেষ হয়েছে দুরন্ত বালিকাকে শান্ত করে বিয়ের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। কাপুরুষের প্রেমেও প্রত্যক্ষ তীব্র টেনশন, অসহায় পরিসমাপ্তি। প্রতিদ্বন্দ্বীতে প্রথাসিদ্ধ সম্পর্কের সম্ভাবনায় পরিণতি, সীমাবদ্ধ-এ জামাইবাবু শ্যালিকার টেনশন এবং তার নৈতিক ওভারটোন, জন অরণ্য-এ প্রেমের নিষ্ঠুর সমাপ্তি, ছবির শুরুতেই। আর পিকুতে সত্যজিৎ প্রায় রিগ্রেসিভ, অপর্ণা সেনের চরিত্রটিকে চারিত্রিক জাজমেণ্ট করে করে।


অপর্ণা সেন
একবার অভিযোগ
করেছিলেন, মাণিকদা
সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠান ছাড়া
প্রেমের ব্যপারটিকে ঠিকঠাক
যেন ম্যানেজ করতে পারেন না

তাই ওনার সমস্ত কাজে, একমাত্র নায়ক এবং কিছুটা অরণ্যের দিনরাত্রি ছাড়া– অরণ্যের দিনরাত্রিতেও প্রেম প্রায় অবশ্যম্ভাবী– সেভাবে আধুনিক প্রেমের দ্যোতনা আমি অন্তত পাই না। নায়ক ছবিতে সরাসরি প্রেমের প্রসঙ্গ আসার আগে, এখানে ‘আধুনিক প্রেম’ অর্থে আমি কী বুঝছি, তা একটু স্পষ্ট করে নেওয়া যাক।

সিনেমা শুরুর দিন থেকেই বয় মিটস গার্ল স্টোরি– একজন সুবেশ নায়ক বা আরেকজন সুবেশা নায়িকার উপস্থিতি ন্যারেটিভ সিনেমায় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। দুই নায়ক নায়িকার অবশ্যম্ভাবী প্রেম– সেখানে নানান ক্রাইসিস পেরিয়ে অবশেষে প্রথাসিদ্ধ বা প্রথাবৈধ প্রেমের মিলন, বা বিচ্ছেদে ছবির পরিসমাপ্তি– যে কোনো ন্যারেটিভ প্রেমের ছবি দেখলেই আমাদের এ কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না।

এ ধরনের অবশ্যম্ভাবী প্রায়-নিয়তিনির্ভর প্রেমের ছবি নায়ক না, বলা বাহুল্য। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা এ জাতীয় সময় কখনও অনুভব করি, যেখানে উল্টোদিকের ছেলেটি বা মেয়েটির সাথে কথা বলতে, ঘটনাচক্রে সারাদিন কাটাতে কাটাতে [এখানে যেরকম ট্রেন] আমরা একধরনের মৃদু আকর্ষণ অনুভব করি, একধরনের আচ্ছন্ন করা ভালোলাগা, যা উভয়ের ক্ষেত্রে হলেও উভয়েই চুপ করে থাকতে চাই, বাধ্য হয়ে। কখনও, অরিন্দমের মতো, মনের সমস্ত চেপে রাখা কথা উজাড় করে দিতে ইচ্ছে করে অদিতির কাছে; কিন্তু হয় না। হয় না বাস্তবতার চাপে, পরিস্থিতির চাপে। হয়তো বা ভদ্রতা, শিষ্ঠতা, সভ্যতার চাপেও। এই একধরনের মৃদু ভালোলাগা, যা হয়তো সম্পর্কের দাবী করে না, কোনো অধিকারবোধ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা করে না, তাই স্বীকৃত ‘প্রেম’ও নয়– বরং কী যেন এক বর্ণনার অতীত অনুভূতি– জানিই কিছুক্ষণ পরে আর থাকবে না, তাও সময়টুকু যাপন করতে ইচ্ছে করে। ‘আধুনিক প্রেম’ বলতে আমি একেই বুঝছি, যেখানে সম্পর্ক বা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা নেই, অধিকারবোধ নেই, অপরের কাছে স্পষ্ট করে প্রকাশ করাও নেই, এবং কয়েক মুহূর্তের বাইরে কোনো স্থায়িত্বও নেই– অথচ সময়টাকে সামান্য উপভোগ করে যাওয়া– কোনো প্রত্যাশা না রেখে।

নায়ক— আশ্চর্যভাবে, প্রেমের প্রেক্ষিতে সত্যজিৎ রায়ের ছবির নিরিখে সবচেয়ে আধুনিক, কারণ উপরের প্রতিটা বর্ণনা আসলে নায়ক থেকেই নেওয়া। অটোগ্রাফ নিতে চাওয়ার জায়গা থেকে শেষপর্বের ‘মনে… রেখে দেব’ অবধি আমরা প্রেমের প্রকাশে একধরনের আধুনিকতা পাই, নারী-পুরুষের সম্পর্কের খাতিরে– যা বন্ধুত্বের চেয়ে খানিক বেশি হয়তো, কিন্তু যা আবার কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের আওতায় ঢুকে পড়া নিশ্চিত প্রেম নয়। আমরা আলোচনার সুবিধের জন্য অদিতি-অরিন্দমের প্রতিটি দৃশ্যের তালিকা করব :

১.
অটোগ্রাফ আনতে যাওয়া– পরষ্পরের পরষ্পরকে খোঁচা– অদিতির খানিক অভদ্রতা করে উঠে আসা।

২.
অদিতির ইন্টারভিউ নিতে যাওয়া, অরিন্দমের এবারেও প্রায় সরাসরি প্রত্যাখ্যান– নিজেকে বাজারের দোহাই দিয়ে উন্মুক্ত করতে না চাওয়ার নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি।

৩.
স্বপ্ন দেখে অরিন্দমের নিজে থেকেই অদিতির কাছে যাওয়া– শঙ্করদা-মুকুন্দ লাহিড়ী-বীরেশের তিনটি দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক-ছবির সবচেয়ে দীর্ঘদৃশ্য – দুজনের বন্ধুত্বের সুত্রপাত।

৪.
এরপরেই, কনডাকটরকে দিয়ে অদিতিকে ডেকে পাঠানোর বিখ্যাত দৃশ্য– সবকিছু উজাড় করে বলতে চাওয়া এবং না পারা।

৫.
স্টেশনের শেষ একমুহূর্ত বাদ দিলে শেষ সাক্ষাৎকার– ‘মনে… রেখে দেব’।

প্রথম দুটি পর্বে প্রেম বা আলাদা কোনো ভালো লাগার কোনো ছিটেফোটা ইঙ্গিতও নেই– সুদর্শন প্রায় সমবয়সী দুটি বিপরীত লিঙ্গের মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ ছাড়া। দ্বিতীয় পর্বে, আমরা লক্ষ্য করি, অদিতি অরিন্দমকে প্রশ্ন করে, ‘কিন্তু এই যে এত বেশি করে পাওয়া, এর মধ্যে একটা ফাঁক, একটা অভাববোধ, কোনো রিগ্রেটস নেই?’ [ছাব্বিশ মিনিট] ম্যাটিনি আইডল সুলভ স্বভাবসিদ্ধ স্মার্টনেসের দৌলতে বাজারের কথা বলে তা এড়িয়ে গিয়ে অরিন্দম এ প্রশ্নকে যে একটুও সিরিয়াসলি নেয়নি, আমরা বুঝতে পারি। অদিতি চলে যায়, মন্তব্য করে, ‘এরা আসলে কীরকম জানেন, ঐ যে একরকমের গাছ হয়, কাঁচের ঘরে আলো বাতাস বাঁচিয়ে তোয়াজ করে রাখতে হয়, ওরা ঠিক সেইরকম’ [সাড়ে আঠাশ মিনিট]। আকর্ষণের বদলে অদিতির তরফে খানিক বিকর্ষণের ইঙ্গিত পাই আমরা, আর অরিন্দম হালকা মেজাজে অঘোর চ্যাটার্জীর সাথে মজা করে। এরপর অন্যান্য চরিত্রদের নিয়ে কিছু দৃশ্যের পর আমরা অরিন্দমকে ঘুমোতে দেখি, এবং টাকার সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার স্বপ্নদৃশ্য আসে। আমরা বুঝতে পারি, ছবির এতক্ষণ পর্যন্ত নিজের আত্মাকে সযত্নে লুকিয়ে আসা অরিন্দম এবার নিজের কাছে ভেঙ্গে পড়ছে, যার উৎস অদিতির ঐ প্রশ্ন– এত বেশি করে পাওয়ার মধ্যে কোনো ফাঁকি নেই? প্রধান চরিত্রের স্বভাবসিদ্ধ জটিলতার বাইরে এই কারণটি আরেকটি মাত্রা যোগ করে– আমরা বুঝতে পারি অদিতির সাথে কথোপকথনের প্রভাব অরিন্দমের মনে পড়েছে, যার ফলে গহন অন্ধকার থেকে শঙ্করদার বিকৃত মুখ অরিন্দমকে স্বপ্নে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।


আমরা
বুঝতে পারি
অদিতির সাথে
কথোপকথনের প্রভাব
অরিন্দমের মনে পড়েছে,
যার ফলে গহন অন্ধকার থেকে
শঙ্করদার
বিকৃত মুখ
অরিন্দমকে স্বপ্নে
তাড়া করে বেড়াচ্ছে

তৃতীয় পর্ব– অরিন্দম কোনো রাখঢাক না করে অদিতির কাছে যায়। এই বিষয়টি জরুরি– কারণ এই বিষয়টিই আধুনিক। হেটেরো-সেক্সুয়াল যেকোনো মানুষের বিপরীত লিঙ্গের মানুষের উপর যেকোনো আকর্ষণ মূলগতভাবে যৌন– ফ্রয়েডের দৌলতে আমরা সবাই এতদিনে তা জেনে গেছি। কিন্তু নায়ক ছবির আধুনিকতা এখানেই, এই যৌন আকর্ষণকে কোনো প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক যৌনতার মধ্যে না নিয়ে গিয়ে, সম্পূর্ণ মনোজগতের অদম্য আকর্ষণ দুই চরিত্রই নির্দ্বিধায় স্বীকার করে। অরিন্দম অদিতির কাছে যায়, অরিন্দম জানে যে অদিতির প্রভাবেই তার এই অস্বস্তিকর অতীত বেরিয়ে পড়ছে। চেপে রাখা এই অতীত অরিন্দম এবারে সাংবাদিক অদিতি, অটোগ্রাফ চাইতে আসা অদিতির চেয়েও তার সামান্য ভালোলাগা অদিতির কাছে সে বলবে। অচেনা মানুষের কাছে ব্যক্তিগত কথা বলার অস্বস্তিকর দূরত্ব যেখানে মুছে যাবে পারষ্পরিক যৌন আকর্ষণে।

নায়ক
… প্রোফাইল শটে স্পষ্ট মুগ্ধতা, খানিক লজ্জা…
…বুঝতে পারি তার মনে তীব্র আলোড়ন চলছে…

তৃতীয় পর্বের মধ্যেই ছবির মূল থিমের সবচেয়ে জরুরি মুভমেন্ট হয়– আমরা তিনটি ফ্ল্যাশব্যাকে নায়কের মনের ভেতর একটু একটু করে ঢুকে পড়তে থাকি, এবং সাথে সাথে দুজনের সম্পর্ক ক্রমশঃ কাছে আসতে থাকে। যে অদিতি অরিন্দমকে কাঁচের ঘরে রাখা গাছ বলেছিল, সে-ই এবার সেই গাছের জটিলতাময় অতীত এবং মনোস্তত্ত্বগত গভীরতায় স্পষ্ট মুগ্ধ হয়– ‘এই যে আপনি এতগুলো লোককে আনন্দ দিচ্ছেন, এটাও তো একটা বড় কাজ’। ঠিক একঘন্টা একুশ মিনিটের মাথায়, শর্মিলার প্রোফাইল শটে স্পষ্ট মুগ্ধতা, খানিক লজ্জা– শুধু সংলাপে নয়, বরং পারফরমেন্সও এই দুই মানুষের সংযোগকে স্বীকার করছে। সত্যজিৎ রায় অবশ্য দর্শকের উপর খুব একটা ভরসা রাখেননি, এত সুক্ষ্মতায় দুজনের আকর্ষণ বোঝা যাবে কি-না। তাই অদিতিকে স্পষ্ট দেখি আমরা পরের দৃশ্যে, বিচলিত, চিন্তিত, প্রেমে পড়া এবং প্রায় অসম্ভব প্রেমের আকর্ষণের জটিলতায় স্পষ্টত নির্জন। আরও স্পষ্ট হয়, অস্বস্তি কাটানোর জন্য পাশের বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীকে অদিতি লজেন্স অফার করে– আমরা বুঝতে পারি তার মনে তীব্র আলোড়ন চলছে, সে আলোড়ন হঠাৎ কোনো মানুষকে ভালোলাগা এবং উল্টোদিকের তারও ভালোলাগা বুঝতে পারার আলোড়ন।

অদিতির মুখে পরিণতিবোধের শ্রেষ্ঠ এক্সপ্রেশন…

অরিন্দমও বিচলিত– বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পরিস্থিতি খানিক বিচার করে নিতে চায় যেন। তারপর দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক এবং ছবির শুরু থেকে উল্লেখ করা কাগজে বেরোনো স্ক্যান্ডালাস মারপিটের দৃশ্যটি আবার দুর্বল সাররিয়েল স্বপ্নের আকারে আমরা দেখে ফেলি। নাটক ঘনিয়ে ওঠে, অরিন্দমের বিবেক তীব্র আলোড়ন তোলে, স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসে অরিন্দম মাতাল হয়ে পড়ে, অদিতিকে ডাকে। চতুর্থ পর্ব শুরু হয়, অরিন্দম তার কাগজে বেরোনো স্ক্যান্ডালের ব্যখ্যা দিতে চায় অদিতিকে। আবার অদিতির পরপর দুটো প্রতিক্রিয়া, চরিত্রদের আধুনিকতাকে আন্ডারলাইন করে– অদিতি স্পষ্ট বলে তার ঘটনা জানা এবং সে কোনো ভেতরের খবর জানতে চায় না। যাকে ভালোলাগছে, যৌন আকর্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেই প্রেক্ষিতে এই মাত্রাবোধ অত্যন্ত আধুনিক– একইসাথে কোনো মানুষকে ভালোলাগা এবং তার প্রাইভেসিকে সম্পূর্ণ সম্মান দেওয়ার মাত্রাবোধ– যা আমরা প্রেম থেকে সম্পর্কে এলেই ভুলে যাই। অরিন্দম বলে, ‘আরে আমার সব কথা বলা প্রয়োজন… সব জমে আছে… এখানে…’। অদিতির মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। ‘একটা লোক নেই যাকে বলি…’।  আবহসঙ্গীত আবেগকে আরও ঘনীভূত করে, ‘আজ যারা আসে, জানেন, যদি কোনোদিন হড়কে যাই, কোনো শালা…’। ভদ্র মেয়ের সামনে গালাগালি দিয়ে ফেলে অরিন্দম সচেতন হয়। অদিতির মুখে পরিণতিবোধের শ্রেষ্ঠ এক্সপ্রেশন পাই আমরা– তারপরেই সংলাপ, ‘ধরে নিন আপনার সব বলা হয়ে গেছে, আমি সব জেনে গেছি’। আবারও, সেই অন্যের প্রাইভেসিকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে, ভালোলাগার মানুষের সব জেনে না ফেলার মধ্যে যে পরিণতি আছে, সেই আবেগ প্রকাশ পায়, দেবতুল্য নায়কের স্বরূপ জেনে ফেলার পরেও অদিতির অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ভালোলাগা এবং প্রশ্রয়ের ছোঁয়া– হয়তো কিছু অনুকম্পাও– অদিতি, অন্তত খানিকটা হলেও জেনে গেছে আসল মানুষটাকে। তারপরেই, ভালোলাগার সুস্পষ্ট প্রকাশ– মদ্যপ অরিন্দমকে শান্ত বকুনি দেয় অদিতি– নিজে যাওয়ার আগে ঘরে যেতে বলে।

…‘সবই তো বোঝেন, বলুন তো কেমন আছি?…

রাত্রি শেষে পরের ভোরে পঞ্চম দৃশ্যে অরিন্দমের সংলাপ আরও স্পষ্ট, অদিতির কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তর, ‘সবই তো বোঝেন, বলুন তো কেমন আছি?’ প্রথম দৃশ্যের অদিতির প্রশ্নের জবাব অরিন্দম যেন এইবার দেয়, ‘কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে, একটা অভাব বোধ করছি… আপনার সঙ্গে তো আর দেখা হবে না’। দর্শকের মনে পড়ে যেতে বাধ্য অদিতির প্রশ্ন– ‘কিন্তু এই যে এত বেশি করে পাওয়া, এর মধ্যে একটা ফাঁক, একটা অভাববোধ, কোনো রিগ্রেটস নেই?’ অরিন্দম জানিয়ে দেয় তার না পাওয়ার মৃদু কষ্ট– কিন্তু আমরা জানি, প্রথাবদ্ধ প্রেম বলতে যা বুঝি, ওদের তা হওয়া সম্ভব নয়। এরপরেই, আমার কাছে বিশ্বচলচ্চিত্রে অন্যতম সেরা এবং সুক্ষ্ম প্রেমের প্রসঙ্গটি আসে– ম্যাটিনি আইডল থেকে কাছের মানুষ হয়ে যাওয়া অরিন্দমের সমস্ত ব্যক্তিগত কথা অদিতি ছিঁড়ে ফেলে দেয়, আর সেই বিখ্যাত সংলাপ আসে, ‘মনে… রেখে দেব’। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা– দ্রুত কাউন্টার শট আসে দুজনের ক্লোজআপের। দুজনের জীবনেরই অন্যতম মধুর অধ্যায়টি শেষ হয়, অদিতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখে চশমা পরে নেয়, ম্যাটিনি আইডলের গগলস-হীন চোখে অরিন্দম কয়েক মুহূর্ত চেয়ে দেখে শুধু।

…দ্যোতনা থেকে যায়…

দুজনের দেখা শেষ হয়, কিন্তু ভালোলাগা এবং প্রেমের দ্যোতনা থেকে যায়, প্রায় সম্পূর্ণ পরিণতিহীন অবস্থায়। এতক্ষণের আলোচনা করা আধুনিকতার জায়গা এইটিই, যেখানে আমরা প্রায় নিশ্চিত, ওদের আর কোনোদিন দেখা হবে না, এই ভালোলাগা কোনোই প্রতিষ্ঠান পাবে না। সত্যজিৎ রায়, তাঁর এই একমাত্র ছবিতে আর কোনো সম্ভাবনা, কোনোরকম সামাজিক নিয়ম নিষ্ঠার হিসেব না রেখে পাশাপাশি দুটো মানুষের নাছোড় ভালোলাগা এবং নাছোড় বিচ্ছেদের গল্প দেখান– অত্যন্ত সুক্ষ্মতায়– যেখানে প্রেমের সমাপ্তি মিলন-বিচ্ছেদের কোনোটাতেই নয়, বরং এক তীব্র অসহায়তায়, যার কোনো ভাষা এবং অর্থ নেই। ভাষায় তা প্রকাশও করাও যায় না, হয়তো কবিতা যে কাজ পারে। আমার কাছে আধুনিকতা ঠিক এই প্রসঙ্গে, যেখানে ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে’, আর কোনোকিছুর হিসেব না রেখে, কোনো স্পষ্ট প্রত্যক্ষ পরিণতির পথে না গিয়ে।

আরও একটি জরুরি বিষয়– নায়ক সত্যজিতের নিজের চিত্রনাট্য। ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থিম, সফলতা-ব্যর্থতার ওপারে থাকা মধুরতম প্রেম– সত্যজিতের নিজস্ব ভাবনা, ওঁর নিজের সময় এবং অবস্থানের বিচারে তীব্র আধুনিক। অন্যান্য ছবিতে প্রতিষ্ঠানের অবশ্যম্ভাব্যতায় প্রেমের পরিণতি হওয়া, নাকি এই ছবির চূড়ান্ত আধুনিক প্রেমের প্রকাশ– কোনটা সত্যজিতের নিজের মনোভাব জানি না, আমাদের পক্ষে জানা সম্ভবও নয়, বোধহয় দরকারও নেই। শুধু এইটুকুই বোধহয় যথেষ্ট, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র শিল্পী এরকম চমৎকার আধুনিক ছবি করতে জানতেন, জনপ্রিয় মহলে ওনার সম্পর্কে প্রচলিত কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়েও।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্ম অ্যাকটিভিস্ট ; শিক্ষার্থী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

১টি কমেন্ট

  1. বাহবা নতুন পাঠকে।
    একটা কিছুটা-অপ্রাসঙ্গিক জানার ইচ্ছা: স্বপ্নদৃশ্য দুটো চারুর গ্রামের স্মৃতির থেকে দৃশ্যগতভাবে দুর্বল কিসের নিরিখে! যদি সময় করে জানান যায় ভাল হয়।

মন্তব্য লিখুন