লাইভ ফ্রম ঢাকা : আসল পুরুষের খোঁজে/ বিজয় আহমেদ

0
203
live from dhaka

লিখেছেন । বিজয় আহমেদ

লাইভ ফ্রম ঢাকা
Live From Dhaka
স্ক্রিনরাইটার, ফিল্ম এডিটর ও ফিল্মমেকার । আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ
প্রডিউসার । শামসুর রহমান আলভী
সিনেমাটোগ্রাফার । তুহিন তমিজুর
আর্ট ডিরেক্টর । উজ্জ্বল আফজাল
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । মোস্তফা মনওয়ার [সাজ্জাদ]; তাসনোভা তামান্না [রেহানা];’ তানভীর আহমেদ চৌধুরী [মাইকেল]; মীর মোশাররফ হোসেন [মীর]; শিমুল জয় [শাহেদ]
রানিংটাইম । ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । বাংলাদেশ
প্রিমিয়ার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬ [সিঙ্গাপুর]
রিলিজ । ২৯ মার্চ ২০১৯ [বাংলাদেশ]


লাইভ ফ্রম ঢাকা
লাইভ ফ্রম ঢাকা

অমানবিক এক শহরের নাম ঢাকা। রুদ্ধশ্বাস দৌড়, ট্রাফিক জ্যামে জেরবার, জীবনযাপনের ন্যুনতম চাহিদা মেটাতে সর্বক্ষণ তটস্থ থাকা এক ম্লান জনগোষ্ঠীর চেহারা কেমন, কী এর প্রতিচ্ছবি? শহর তো বোবা, তুমি যত যন্ত্রণা তাকে দেবে, সে তা উগড়েও দেবে। কিন্তু মুখে বলবে না কিছু। তাহলে এই শহরের কথাগুলো কে বলবে? শহরের মানুষগুলোর কথা কে বলবে? গল্প, উপন্যাসে কিছু বলা হয়েছে হয়তো। আর সিনেমায়? মেলোড্রামা, সিনেম্যাটিক প্রেমের বাইরে দাঁড়িয়ে কে বলবে আমাদের কথা? প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নানান অমানবিকতাকে কে দেখবে/দেখাবে যথার্থ অমানবিক চোখ দিয়েই, কোনো প্রকার পক্ষ অবলম্বন ছাড়াই? শুধু বেঁচে থাকার দায়ে এই শহরে যা যা করতে হয়, তা তো পক্ষ নিতে বলে, ফ্যাব্রিকেটেড মায়াবী চেহারা আঁকতে বলে? কেউ না কেউ তো করবেই, কোনো কবি হয়তো লিখবে, কোনো গল্পকার হয়তো গল্পে গল্পে বলবে এসব। তবে তার কায়দা হতে হবে গেরিলা আক্রমণের। আর বাংলাদেশি সিনেমার এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রুপটা, এই গেরিলা কায়দাতেই বলে দিয়েছেন সাদ। লাইভ ফ্রম ঢাকা নামের এক সিনেমায়।


কাহিনীকার
আর পরিচালক
পক্ষ/বিপক্ষের বাইরে
গিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন
বলেই, বিপ্লবটা
ঘটেছে

এই সিনেমায় কোনো পক্ষ নাই। কাহিনীকার আর পরিচালক পক্ষ/বিপক্ষের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন বলেই, বিপ্লবটা ঘটেছে। নিজেদের চেহারার রুপটা দেখে খানিকটা আঁতকে উঠেছে সবাই। ভঙ্গিটা এখানে নৃবিজ্ঞানীর। সময় খুড়ে সাদ, ভাড়ার ভরে অমূল্য রত্ন তুলে এনেছেন। পাপ-তাপের বাইরে গিয়ে, বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার মহিমা বর্ণনা করেছেন। আর এই প্রক্রিয়া বলার জন্য বেছে নিয়েছেন সাজ্জাদ, রেহানা সহ আরো কিছু চরিত্রকে৷ আর কেন্দ্রে রেখেছেন শেয়ারবাজার ও নির্দয় এক সোসাইটির অশ্লীল উলম্ফনকে!

সাজ্জাদ অধুনার সুপারম্যান হতে চাওয়া মানুষ। চেয়েছিল উড়তে, কিন্তু ডানা ভেঙ্গে গেছে তার মাঝপথে। সে যখন ইকারুস, যখন তার ভেঙ্গে গেছে ডানা, গল্পটা সেখান থেকে। এই শহরে এমন তরুণ ঢের। শেয়ারবাজারে হুট করে পেয়ে যাওয়া টাকা, সেই টাকা যে একটা ফাঁদ, সাজ্জাদের যাত্রা যেন সেই ফাঁদের দিকে নিয়তি নির্ধারিত।

সাজ্জাদ রুড়। প্রেমিকার সাথে সে ঢাকার প্রকৃত পুরুষ চরিত্র। সাদ সাহিত্য এড়িয়ে গেছেন। বরং সাহিত্যিক চরিত্র না বানিয়ে আসল পুরুষকে হাজির করেছেন সিনেমায়। যে কারণে প্রেমও যতটা স্বার্থের কাছাকাছি থাকতে পারে, সেটা দেখাতে পেরেছেন তিনি।

লাইভ ফ্রম ঢাকা
লাইভ ফ্রম ঢাকা

০২

সাজ্জাদ হলো রিয়েলিটি। আর তার ভাই ও রেহানা হলো দুইটা প্রতীক। ভাইয়ের চরিত্রটা হলো, আর্বান মানুষের অসহায়তার কারনামা। আর রেহানা হলো, এত ঘাম ঘা, জিঘাংসা, কাম, প্রতারণার মাঝেও চুপ দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রকার মায়া। যা এই শহরের ইঞ্জিন। বা, ডায়নামো। সবাই যখন ঘুমিয়ে যায় শহরের। ঘুমায় জ্যাম, এটিএম বুথ, পুলিশ, সিএনজি স্টেশন, র‍্যাবের পোশাক, কারওয়ান বাজারের ঝুপড়িওয়ালা, তখন, এই মায়া পরীর মতো সবার বুকে নেমে আসে। মায়ার পরশ বুলিয়ে দেয়। পরেরদিনের অযৌন বর্বরতায় টিকে থাকার সাহস দিয়ে যায়!

লাইভ ফ্রম ঢাকা
লাইভ ফ্রম ঢাকা

০৩

সাদের দেখার চোখ খুবই নৈর্ব্যক্তিক। তার সিনেমা থেকে একটা দাঁড়ি বা কমাও যেন ফেলে দেয়া যাবে না। আর নৈর্ব্যক্তিকতার জন্য, সাদ এত বড়ো সোসো-পলেটিক্যাল একটা সিনেমা বানাতে পেরেছেন। নিকট অতীতে এই গদ্যকার, আর কোনো সিনেমায় রাষ্ট্রের ভূমিকাকে এতটা প্রশ্নের মুখে পড়তে দেখেন নাই। যেইটা সাদ পেরেছেন।


সাজ্জাদ
যেন
দায়িত্বজ্ঞানহীন
এক
রাষ্ট্র

রেহানা যেন জনগণ। সাজ্জাদ যেন দায়িত্বজ্ঞানহীন এক রাষ্ট্র৷ রেহানা কিন্তু রাষ্ট্রের উদ্দ্যেশ্যেই বলে উঠছে, ‘আমাকে ফেলে কোথায় যাচ্ছো সাজ্জাদ? আমার সন্তানকে ফেলে’…।

লাইভ ফ্রম ঢাকা

০৪

বাংলাদেশি সিনেমার আসল রুপরেখা কেমন হতে পারে, তাই যেন অনেক প্রকাশ্য করে তুলেছে এই পরিচালক। এরপর সাদের কোটের ভিতর থেকে, যদি আরো ১০-২০ জন ফিল্মমেকার বেরিয়ে আসেন, তাহলেই হবে। আশা করি এমন।

গদ্যকার সিনেমাকার না। এই গদ্যকার শুধুমাত্র একজন দর্শক। আর দর্শকের রুপে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখা শেষে, আমি বলতে চাই, বাংলাদেশি সিনেমার ‘আসল পুরুষ [পরিচালক]’-এর খোঁজ যদি কেউ চান, তাহলে আর কষ্ট করতে হবে না। লাইভ ফ্রম ঢাকার পরিচালকের দিকে, নির্দ্ধিধায় আঙুল তোলে দিতে পারব।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; সিনে-লেখক । বাংলাদেশ ।। সম্পাদিত ওয়েবজিন : লাল জিপের ডায়েরি ।। কাব্যগ্রন্থ : সার্কাস তাঁবুর গান । মুচকি হাসির কবিতা । কমিকস, ক্যামেরা, ট্রাভেলগ ইত্যাদি । শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি ।। সিনে-গ্রন্থ [যৌথ সম্পাদনা ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [ইরান পর্ব] । ফিল্মমেকারের ভাষা [লাতিন পর্ব] । ফিল্মমেকারের ভাষা [আফ্রিকা পর্ব] । ফিল্মমেকারের ভাষা [কোরিয়া পর্ব] ।। কিশোর উপন্যাস : বাবলুর অদ্ভুত সাইকেল ।। কিশোর কবিতার বই : লাল মোরগের ঝুঁটি

মন্তব্য লিখুন