স্মৃতির তারকোভস্কি/ নাতালিয়া বন্দারচুক

0
162
আন্দ্রেই তারকোভস্কি

মূল । নাতালিয়া বন্দারচুক
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

গ্র ন্থ সূ ত্র
স্মৃতির তারকোভস্কি
গ্রন্থনা ও অনুবাদ । রুদ্র আরিফ
পৃষ্ঠাসংখ্যা । ১১২
প্রথম প্রকাশ । ফেব্রুয়ারি ২০১৮
বাংলদেশি সংস্করণের প্রকাশক । মেঘ
ভারতীয় সংস্করণের প্রকাশক । প্রতিভাস



কিস্তি । ১ [২]


আমি এখন বসে আছি আমার মা ইনা ভ্লাদিমিরোভনা মার্কারোভা ও বাবা সের্গেই বন্দারচুকের বাড়িতে। বহু বছর আগে, এখানেই আন্দ্রেই আর্সেনিয়েভিচ তারকোভস্কির সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়েছিল আমার। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ঘটনাটি ঘটেছিল কাছেই, রাস্তার ঠিক ওপারে, ইরিনা জিগালকোর বাড়িতে। ইরিনা আলেকসান্দ্রোভনা জিগালকো ছিলেন রমের শিক্ষিকা। আমার বয়স তখন ১৩ বছর। ততদিনে স্তানিস্লফ লেমের সোলারিস উপন্যাসটি আমার পড়া হয়ে গেছে। আন্দ্রেই আর্সেনিয়েভিচ তখনো সেটি পড়েননি। তিনি ছিলেন মিখাইল রমের ছাত্র। রমের ছাত্রছাত্রীরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।

ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন কেউ একজন। সেখান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। কেতলির দিকে তাকিয়ে ছিলেন কেউ একজন। কেউ একজন দোল খাচ্ছিলেন এক রকিং চেয়ারে, এখন আমি যেমনটা খাচ্ছি। ফায়ারপ্লেসের কাছে ছিলেন আসলে আন্দ্রেই কঞ্চালোভস্কি। কেতলির দিকে তাকিয়ে ছিলেন ভাসিলি মাকারোভিচ সুকশিন। আর রকিং চেয়ারটি দুলছিলেন সরু গোঁফঅলা যে লোকটি, তিনি আন্দ্রেই তারকোভস্কি। তাকে আমি সোলারিস বইটি দিলাম। এটির মালিকানা ছিল ইরিনা আলেকসান্দ্রোভনা জিগালকোর। এভাবেই দেখা হয়েছিল আমাদের। পরবর্তীকালে আমি আর আন্দ্রেই প্রায়শই এ স্মৃতিচারণা করতাম।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি
আন্দ্রেই তারকোভস্কিনাতালিয়া বন্দারচুক

এরপর কতগুলো বছর কেটে গেছে। সিনেমাটিতে আমি অভিনয় করি ১৮ বছর বয়সে। এখন তো আমি বুড়ি হয়ে গেছি; অন্যদিকে, আন্দ্রেই তারকোভস্কি আর বেঁচে নেই। আমি এখন পুশকিনের ওপর একটি সিনেমা বানাচ্ছি [পুশকিন : দ্য লাস্ট ডুয়েল (Pushkin: Poslednyaya duel); ২০০৬] : আমার সবচেয়ে সিরিয়াস সিনেমা; আর অবাক হয়ে ভাবছি, জিনিয়াস কাকে বলে? আর, সাধারণত, জিনিয়াসনেস কোনো কাজে লাগে নাকি সাধারণ মানুষের? তারা খুব একটা প্রীতিকর মানুষ হন না। তাদের মধ্যে সবসময়ই কোনো-না-কোনো ঝামেলা থাকে। তারকোভস্কি জিনিয়াস ছিলেন কিনা, জানি না। তবে তুখোড় টেলেন্টেড ছিলেন তিনি।


একজন
জিনিয়াস… এখনো
পরিচিতি পাননি… আসছিলেন
হেঁটে। তার কোনো সিনেমা এখনো
দেখেনি কেউ; তবু
সবাই জানে, তিনি
জিনিয়াস

আমি যখন ভিজিআইকে’তে [গেরাসিমভ ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি; ফিল্মস্কুল, মস্কো] পড়তাম, মনে পড়ে, একদিন একটি গুঞ্জন শুনেছিলাম : ‘ঐ যে, জিনিয়াস আসছেন!’ সেখানে, করিডর ধরে হেঁটে আসছিলেন ‘জিনিয়াস’টি। ছোটখাট মানুষ, পাতলা গোঁফ, মাথায় ছোট্ট এক পিম-পাম হ্যাট, আর মারিনা ভ্লাদির কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া একটি স্কার্ফ। একজন জিনিয়াস… এখনো পরিচিতি পাননি… আসছিলেন হেঁটে। তার কোনো সিনেমা এখনো দেখেনি কেউ; তবু সবাই জানে, তিনি জিনিয়াস। সবাই ফিসফাস করছিল, তিনি নিজের [সিনেমার] অভিনেতা-অভিনেত্রী কাস্ট করতে এসেছেন। জানতে চাইলাম, কোন সিনেমা? তারা বলল, ‘সোলারিস’। উপন্যাসটি আমার খুব প্রিয়, লেমও আমার প্রিয় লেখক। আমি সত্যিই চাইছিলাম ফিল্মটিতে ঢুকতে। ততদিনে আমি ক্যাচার ইন দ্য রেতে অল্পবয়সী ফোবি, হ্যামলেট-এ ৪২ বছর বয়সী গার্টরুড, আর গুগলের ডেড সোলস-এর ৮২ বছর বয়সী করোবোচকা চরিত্রে অভিনয় করে ফেলেছি। আমার এই কর্মব্যাপ্তির কারণেই সম্ভবত তারকোভস্কি আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। আমি মুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম দোনাতাস বানিওনিসের পাশে– [অডিশনে] যিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। তিনি আমাকে প্রচুর সাহায্য করেছেন, এবং চেয়েছিলেন, যেন চরিত্রটি আমি পাই। অভিনয়, কান্না… সব মনে পড়ছে আমার।

অডিশনে আন্দ্রেই তারকোভস্কি আমার দিকে এগিয়ে এলেন, হ্যান্ডশেক করলেন, আর বললেন, ‘দুর্দান্ত, নাতালিয়া, ভীষণ ভালো অভিনয় করেছেন আপনি : যেন স্বয়ং গেরাসিমভ আপনাকে শিখিয়েছেন।’
বললাম, ‘তাহলে?’
‘আমি আপনাকে নিচ্ছি না।’
জানতে চাইলাম, ‘কারণটা কি জানতে পারি?’
বললেন, ‘নিজের দিকে তাকান। বয়স কত আপনার?’
‘আঠারোর মতো হবে।’
‘আহা! দোনাতাসকে জিজ্ঞেস করুন, ওনার বয়স কত।’

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

দোনাতাস বানিওনিস ও নাতালিয়াকে দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন আন্দ্রেই
সোলারিস-এর সেট

আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন দোনাতাস, আর আমার ‘স্বামী’ হিসেবে নিশ্চয়ই মানানোর কথা নয় তার। দোনাতাস খুব ক্ষুব্ধ হলেন; তবে তা চেপে রাখলেন নিজের মধ্যেই। আমার মেধার অপচয় না ঘটানোর জন্য, তারকোভস্কি আমাকে তার নিজের সমসাময়িক ফিল্মমেকার লারিসা শেপিৎকোর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। নিজে কোনো অডিশন না নিয়ে, কেবল আন্দ্রেইর অডিশনের ওপর নির্ভর করেই, আমাকে ইউ অ্যান্ড আই [Ty i ya; ১৯৭১] ফিল্মে নিয়ে নিলেন লারিসা। ফিল্মটির শুটিং হয়েছিল নরিলস্ক শহরে; খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল সেটি। স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন জেনাদি শপালিকভ।

এরপর ছয় মাস কেটে গেল। শুটিং থেকে ফিরে এলাম আমি। জানলাম, তারকোভস্কি ইতোমধ্যেই প্রচুরসংখ্যক অভিনেত্রীর অডিশন নিয়েছেন। এরমধ্যে কয়েকজন বিদেশিনীও ছিলেন। তিনি [তারকোভস্কি] এদের সবারই অডিশন নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কাউকেই নির্বাচিত করেননি।

তারপর, খানিকটা লজ্জা নিয়েই, লারিসা শেপিৎকোকে আমি বললাম, যেন তিনি তার সিনেমার ফুটেজগুলো আন্দ্রেইকে দেখান। পরস্পর ভালো বন্ধু ছিলেন তারা। লারিসা নিজের সিনেমার ফুটেজগুলো আন্দ্রেইকে দেখালেন, আর আন্দ্রেই বললেন, ‘আচ্ছা, তোমার এই অভিনেত্রীটি কে?’
লারিসা বললেন, ‘ও তো আমাকে দেওয়া তোমারই উপহার– নাতালিয়া।’
‘কোন উপহার? কী নাম?’
‘নাতালিয়া বন্দারচুক।’
‘সেই বন্দারচুক? আমার দেওয়া উপহার আমাকে ফিরিয়ে দাও!’

আর এভাবেই লারিসার অডিশনের মধ্য দিয়ে তারকোভস্কির সিনেমার জন্য মনোনীত হয়ে গেলাম আমি।

আমরা শুটিং শুরু করলাম। [শুটিংয়ে] সবার আগে আবহ তৈরি করে নিতেন আন্দ্রেই। তিনি একজন ইউনিক ফিল্মমেকার। আমি মনে করি, আমার বাবার পর তিনিই একমাত্র ফিল্মমেকার, পশ্চিমাবিশ্বে যার ব্যাপক খ্যাতি ছিল। তার সিনেমাগুলো সার্বজনীন দর্শকের উদ্দেশে বানানো। সোভিয়েত ভূখণ্ডে সেই দিনগুলোতে এগুলোর কোনো মূল্যই ছিল না! এ সবই ছিল শ্বাশত জিনিস। অথচ আমাদের ভূখণ্ডে এই শ্বাশত গুণটি চিহ্নিত হয়নি। আমরা সবাই ছিলাম কবর খোদক; আর তার শিল্প ছিল শ্বাশতবিষয়ক। ভীষণ কাব্যিক ছিল এগুলো, যা সবসময় নিবেদিত হয়েছে স্রষ্টার প্রতি। ধার্মিক এক মানুষ ছিলেন তিনি। সম্ভবত একটি মহাবৈশ্বিক প্রকৃতির প্রতি ছিল তার আস্থা। আর, নানাবিধ বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ঠিকই, তবে তিনি ছিলেন ভীষণ মরমী মানুষ; আর তা একেবারেই দৃশ্যমান ছিল। একজন মহান শিল্পীর জীবন সম্ভবত খুবই কঠিন হয়ে থাকে। আন্দ্রেইর জীবন ছিল ভীষণ কঠিন; আরও ইন্টরেস্টিং হলো তার শিল্প। নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়ারই ছিল তার; আর ছিল সেই সমাজকে অনাবৃত করা– যে সমাজ তাকে চিনতে পারেনি।


ভীষণ
নার্ভাস এক
মানুষ ছিলেন
আন্দ্রেই। ভয়ঙ্কর
নার্ভাস। স্বাভাবিকের
চেয়ে অনেক
বেশি

ভীষণ নার্ভাস এক মানুষ ছিলেন আন্দ্রেই। ভয়ঙ্কর নার্ভাস। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। এ অনেকটা অসুখের মতো ছিল তার। আমি বলছি না, তিনি উন্মাদ ছিলেন; তবে তিনি ছিলেন, আমাদের সবার মতোই, শিল্পের প্রতি ঘোরগ্রস্ত। সবসময়ই নার্ভাস থাকতেন; সারাক্ষণ নখ কামড়াতেন। তার [সিনেমার] চরিত্রগুলোর মধ্যে তিনি জীবন কাটাতেন; সেগুলোর পরিবেশ-প্রতিবেশের মধ্যে করতেন বসবাস। তার কাছে সবকিছুই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমার অ্যামেচারেরা হয়তো বলবেন, ‘দেখুন, অভিনয়মান ও সেটগুলো খুব একটা ভালো হয়নি তো, ঠিক আছে, চলুন, মিউজিক দিয়ে এগুলো কাটিয়ে তোলা যাক। তাহলে সব ঠিকঠাক মনে হবে।’ অথচ, তার কাছে সবকিছুই ছিল গুরুত্বপূর্ণ : মিশা রমাদিনের সেট ডিজাইন থেকে শুরু করে জিনিয়াস, আমার মতে সত্যিকারের জিনিয়াস– ভাদিম ইউসুভের সিনেমাটোগ্রাফির অতি সূক্ষ্ম তারতম্য পর্যন্ত সবকিছু।

চলুন, ইউসুভ সম্পর্কে একটি গল্প শোনাই। ভাদিমকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। ভীষণ নিগূঢ় এক শিল্পী তিনি। একটি দৃশ্য ছিল, যেটিতে আমার শুটিং করছিলেন তারা। এটি সে দৃশ্য, যেখানে আমার অভিনীত চরিত্র হারি ‘নিজের সঙ্গে’ দেখা করে। খুবই বিখ্যাত এক দৃশ্য। মস্কোর খুব কাছাকাছি, জভেনিগরোদে শুট হয়েছিল এটির। শুটিংকৃত সব ম্যাটেরিয়াল আমাকে তারা দেখিয়েছিলেন। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ‘গাছের শিকড়গুলো কী সুন্দর এখানে। কী চমৎকার দৃশ্যপট! এমন জায়গায় আমি কোনোদিনই যাইনি।’ তারপর দেখলাম, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি স্বয়ং আমি! আচমকাই টের পেলাম, এটির ডিরেকশন দিয়েছিলেন আন্দ্রেই, আর ক্যামেরা চালিয়েছিলেন ভাদিম। ফলে ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি– এ দৃশ্যে নিজেও রয়েছি। এটি ছিল আলাদা এক জায়গা; কেননা, এটি অন্য এক শিল্পীর চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে। আমি এভাবে এটিকে দেখিনি। এইসব শিকড়, এইসব গাছের বাকল চোখে পড়েনি আমার; আচমকাই খেয়াল করলাম, আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি সেখানে। এটি ছিল ফেনোমেনা; কেননা, প্রত্যেক শিল্পীই যার যার নিজের মতো।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি
অ্যাকট্রেস । নাতালিয়া বন্দারচুক
সিনেমাটোগ্রাফার । ভাদিম ইউসুভ
ফিল্মমেকার । আন্দ্রেই তারকোভস্কি
ফিল্ম । সোলারিস

আন্দ্রেই প্রায়শই বলতেন, ‘আমি যদি কোনো দীর্ঘ এক বোরিং ফিল্ম বানাতে না পারতাম, তাহলে নিজেরই শুটিং করতাম।’ তিনি নিশ্চয়ই ইয়ার্কি করছিলেন; তবে বাতাসে নেচে যাচ্ছে ঘাস– ইত্যাদি ধরনের জিনিস তিনি দেখিয়েছেন। আমরা যখন কোনো ল্যান্ডস্কেপের দিকে তাকাই, আমি বলতে চাচ্ছি, স্রেফ চোখ বুলাই, আর দেখি আর দেখি, এবং তারপর অপেক্ষা করি কিছু একটা ঘটার– আমাদের মনোযোগ এককেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। এটি ধ্যানের মতো। তিনি ছিলেন এ ধরনের বিষয়ের একজন ওস্তাদলোক। আমার বাবা যদি দীর্ঘ কোনো অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং করতেন, পৃথিবীর অন্য যে কারও চেয়ে আলাদা হয়ে, অন্য কারও পক্ষে ‘আবহ’কে আন্দ্রেইয়ের মতো দেখানো সম্ভব হতো না। ব্যাপারটি এমন, যেন বাস্তবতা একটি আলাদা মাত্রায় মুভ করেছে, শিল্পের মাত্রার।

আমরা যদি কোনো ল্যান্ডস্কেপের দিকে তাকাই, যেন এ কোনো ডকুমেন্টারি। কিন্তু যখনই আমরা দেখতে শুরু করি, আর শুনতে পাই এমন কিছু– যা শিল্পীটি আমাদের জন্য দর্শনযোগ্য করে তুলেছেন, সেটিই শিল্প, আর সেটি আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলে। কিন্তু সেটি কেবল সেই মানুষদেরই প্রভাবিত করে, যারা এটির ভেতরে রয়েছেন; যারা ইতোমধ্যেই অনেককিছু জড়ো করেছেন নিজেদের আত্মায়– এর ভেতর ঢুকে পড়তে। এ কারণেই এ ধরনের শিল্প নিশ্চিতভাবেই সবার জন্য নয়।


তিনি
হয়তো
বললেন,
‘আমার মন
পুড়ছে…’, তার
মানে আমি বুঝে
যেতাম, আমার অভিনয়
ভালো হয়নি

কীভাবে আমরা একসঙ্গে কাজ করলাম? তার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল আমার। সম্পূর্ণই। যেমন ধরুন, তিনি হয়তো বললেন, ‘আমার মন পুড়ছে…’, তার মানে আমি বুঝে যেতাম, আমার অভিনয় ভালো হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, শিল্পের মধ্যে অতি উচ্ছ্বাস তিনি পছন্দ করতেন না। এ কথার মানে কী? যেমন ধরুন, আমি খুবই নাটকীয়ভাবে অভিনয় শুরু করলাম, আর তিনি চিৎকার করে ওঠলেন, ‘কী করছেন আপনি? আপনি তো একজন নারী! তারা আপনার কথা শুনবে না। কেন শুনবে না? আপনার কথা শোনাচ্ছে কোনো কর্কশ দরজার মতো!’ এভাবেই তিনি ডিরেকশন দিতেন। আমি কেবল তারপরই বুঝতে পারতাম, তিনি ঠিকই বলেছেন। কেননা, আমি যদি অতি উচ্ছ্বাসের আবির্ভাব ঘটাতাম, যেন হারি কোনো সোভিয়েত আমলের দেশপ্রেমিক যোদ্ধা, তাহলে সেটি ভুল ইমেজ হয়ে যেত। হারির তো এমন হওয়ার কথা নয়। সে আসলে কেউই ছিল না; ছিল স্রেফ কোনো গর্ভ কিংবা কোনো ছাঁচের মতো। সে বুঝে, সে মানুষ নয়, বরং সে কোনো প্রতিমূর্তির মতো। এ এক অবর্ণনীয় সংঘাত।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি
শুটিংয়ের ফাঁকে, আন্দ্রেই ও নাতালিয়া

পরে আমি আর আন্দ্রেই এ নিয়ে কথা বলেছি। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল আমাদের মধ্যে; পরস্পর যোগাযোগের মধ্যে থেকেছি। তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আন্দ্রেই, আমি কার চরিত্রে অভিনয় করছিলাম, আপনি তো তা জানতেন?’ আমি লিটল মারমেইডের [রূপকথা] চরিত্রে ছিলাম। মানুষকে ভালোবাসার অধিকার তারও ছিল না। সে ছিল মাছের মতো লেজঅলা এক জলপরী। ৩০০ বছর আয়ু পেয়েছে সে; অথচ মানবাত্মার অধিকারী হতে পারেনি। কিন্তু এক মানুষকে সে এত বেশি ভালোবেসেছিল যে, সে নিজে হয়ে উঠেছিল একজন মানুষ। হারির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। ভালোবাসার কোনো অধিকারই তার ছিল না; তবু সে ভালোবেসেছে। আরেকজন মানুষকে বুঝতে শুরু করেছিল সে; আর নিজে হয়ে উঠেছিল আমাদের চোখে সাক্ষাৎ একজন মানুষ। এই রূপান্তরটি অনন্য। যদিও স্তেন্দহালের এক দুর্দান্ত উপন্যাস অবলম্বনে, আমার শিক্ষক গেরাসিমভের বানানো রেড অ্যান্ড ব্ল্যাক-এ [Krasnoe i chernoe; ১৯৭৬], এবং মতিলের দ্য ক্যাপ্টিভেটিং স্টার অব হ্যাপিনেস-এ [Zvezda plenitelnogo schastya; ১৯৭৫] আমি অভিনয় করেছি, তবু এটিই [সোলারিস] আমার প্রিয় সিনেমা। এ পর্যন্ত ৪২টির মতো চরিত্রে আমি অভিনয় করেছি। তবু সোলারিস আমার কাছে শীর্ষবিন্দু। এটি আমার পছন্দের সিনেমা।


তিনি
সর্বত্রই
বিরাজমান

আমি যখন ফিল্মমেকার হয়ে ওঠলাম, ব্যাপারটি বুঝতে পারলাম। একবার এক বসায় নিজের সবগুলো সিনেমা আমি দেখেছি, একটার পর একটা করে। সার্গুতের [রাশিয়া] এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ছিল সেটি। ইয়ানকোভস্কি, মার্গারিতা তেরেখোভা… সব সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছিলেন সেখানে। আর আমরা একের পর এক করে, তারকোভস্কির সব সিনেমা দেখেছিলাম। দেখানো শেষ হয়ে গেলে, আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারছিলাম না। এই অলৌকিকতা, এই ফেনোমেনা নিয়ে ভাবছিলাম আমরা। কেননা, মনে হচ্ছিল, যেন আমরা একটি সিনেমাই দেখেছি। একটিমাত্র সিনেমা। কেননা, এ সকলকিছুর মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং জিনিসটি হলেন তারকোভস্কি স্বয়ং। তিনি সর্বত্রই বিরাজমান। তিনি আমার চরিত্রটির ভেতর ছিলেন; ছিলেন দোনাতাস অভিনীত চরিত্রটির মধ্যেও। কিন্তু তা এই ফিল্মটিকে কোনোভাবেই সীমাবদ্ধ করে দেয়নি। এ বড়ই আজব ব্যাপার। কেননা, যখন ফিল্মমেকারই শেষ কথা, তা কিছু সীমাবদ্ধতা জাহির করতে বাধ্য; কিন্তু এখানে তা হয়নি। এর কারণ সম্ভবত আবহ, সাউন্ড, অপ্রচলিত চরিত্রগুলো, চোখের পলক ফেলার একটি মুভমেন্ট– সবই তিনি সম্পূর্ণভাবে ভালোবেসেছিলেন। তিনি এমন এক আবহ সৃষ্টি করেছেন– যা অন্য কেউ পারত না।

একবার তার মাথায় এক আজব আইডিয়া এসেছিল– চারজন আলাদা সিনেমাটোগ্রাফারকে [ফিল্মমেকার] ব্যবহার করা– যারা সর্বসেরা : আন্তোনিওনি, ব্রেসোঁ… সর্বসেরা কিনা জানি না, তবে সত্যিকারের জেনুইন ফিল্মমেকারদের! আর তাদের দিয়ে, অভিন্ন কাহিনি নিয়ে, অভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে একেকটি সিনেমা বানানো। তিনি ভেবেছিলেন, এটি ব্যাপক ইন্টারেস্টিং এক ব্যাপার হবে। কেননা, সিনেমাগুলো হয়ে ওঠবে একটির চেয়ে আরেকটি একেবারেই আলাদা। তার নিজের সিনেমাগুলো তো চূড়ান্ত রকমের স্বতন্ত্র।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি
আন্দ্রেইনাতালিয়া
নাতালিয়া বন্দারচুক
জন্ম ১০ মে ১৯৫০। অভিনেত্রী ও ফিল্মমেকার, রাশিয়া
ফিল্ম [অভিনয়] : সোলারিস; বাই দ্য লেক; লিভিং রেইনবো; দ্য ইয়ুথ অব পিটার দ্য গ্রেট প্রভৃতি

দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি, আসছে শিগগির…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন