জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রের রূপরেখা ও আমার প্রস্তাবসমূহ/ বেলায়াত হোসেন মামুন

1
183

লিখেছেন । বেলায়াত হোসেন মামুন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সঙ্কটের দিক হলো, বাংলাদেশে চলচ্চিত্র ‘সংস্কৃতি’ নয়। সমাজে এবং রাষ্ট্রে চলচ্চিত্রকে ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। সরকার চলচ্চিত্রকে দেখে একটি আয়কর প্রদানকারি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে ‘সংস্কৃতি’ হয়ে উঠতে পারেনি, এই সঙ্কটটি এখনও চলচ্চিত্রের সর্বস্তরের মানুষ অনুভব করেন না। সবচেয়ে বড় সঙ্কট সম্ভবত এটাই।

১.

চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মাঝে কত মানুষ আছেন? আমরা কখনও সেই পরিসংখ্যান তৈরি হতে দেখি না। দরকারও নেই। কিন্তু পুরো চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে বুঝতে হলে চলচ্চিত্রের মানুষের তো নিজের দেশের চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সকল মানুষের প্রয়োজন ও কর্মের ক্ষেত্রটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। না হলে ‘অন্ধের হস্তী দর্শনের’ মতো কেবল পা, কেবল লেজ অথবা কেবল দাঁত ধরে আন্দাজি একটা অবয়ব কল্পনা করতে হবে। বাস্তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির দশাটা অনেকটা এমনই।

এখানে, মানে বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রির মানুষজন এমন একটি বদ্ধ পরিবেশে থাকেন যে, তারা বাকি দুনিয়ার খবর বলতে কেবল মাদ্রাজ আর তামিলনাড়ুতে কি ধরনের চলচ্চিত্র হচ্ছে, হয়তো এই সংবাদটুকু জানেন। কারণ এই জানাতে তাদের স্বার্থের সম্পর্ক আছে। তারা সেসব চলচ্চিত্র দেখেন, দেখে নকল করেন, আর তাই নিয়ে মেতে থাকেন। এর বাইরে বাকি বিশ্বের চলচ্চিত্র, এমনকি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কত বৈচিত্রপূর্ণ চলচ্চিত্র হচ্ছে তারও কোনো খোঁজখবর রাখেন না। তাদের এই কূপণ্ডুকতা একদিনের নয়। এই কূপমণ্ডুকতার বলি হয়েছে ঢাকার চলচ্চিত্রের বাজার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজার ব্যবস্থা নিয়ে এই আলোচনা এখানে আপাতত এইটুকুই প্রাসঙ্গিক। ঢাকার বাজার নষ্টের কলকব্জা অন্য কোনো সময়ে বিস্তারিত আলাপ হতে পারে।

Zahir Raihan
জীবন থেকে নেয়া
ফিল্মমকার । জহির রায়হান

২.

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বাইরে যে চলচ্চিত্র হয়, তাকে খুব সহজে আমরা নাম দিয়ে দিয়েছি ‘বিকল্পধারা’র চলচ্চিত্র। কোনো কোনো নির্মাতা ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেন, তিনি ‘স্বাধীনধারার’ নির্মাতা এবং তার চলচ্চিত্র ‘স্বাধীন চলচ্চিত্র’। বাস্তবে এখন বাংলাদেশে কোনো বিকল্পধারার চলচ্চিত্র হয় না। বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের পৃথক ঘোষণাপত্র ছিল। সেই ঘোষণা গত শতাব্দীর আশির দশকে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোষণার যেসব শর্ত ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে তারা তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণের অঙ্গিকার করেছিলেন, তা নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে পথ হারায়। এরপরও সেই আন্দোলনের নাম ধারণ করে তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রকে ‘বিকল্পধারা’র চলচ্চিত্র বলা হচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ তা ডিনাই করছেন না। এই পরিস্থিতিকে আমি বলব ‘উপায়হীন’ পরিস্থিতি। এর মানে হলো, আশির দশকের তারুণ্যের যে দ্রোহ তা নব্বইয়ে এসে আর থাকেনি। তা সমর্পণে বিসর্জিত হয়েছে। এই সমর্পণ অবধারিত ছিল। তাই অভিযোগ নেই। কিন্তু আমরা যে বিচারহীনভাবে তাদের চলচ্চিত্রকর্মগুলোকে ‘বিকল্পধারা’র বলে গেছি, তারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এখানে চলচ্চিত্র গবেষক, সমালোচকদের ব্যর্থতাই প্রকট। আর প্রকট হয়ে ওঠে ‘কপি-পেস্ট’ সাংবাদিকতার মান।


বাস্তবে
এখন বাংলাদেশে
কোনো বিকল্পধারার
চলচ্চিত্র
হয়
না

নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে বিকল্পধারার আর কোনো চলচ্চিত্র হয়নি। বিকল্পধারার সর্বশেষ চলচ্চিত্রিক নজির তারেক মাসুদের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র মুক্তির কথানারীর কথা। এর আগে আলোচিত চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করতে পারি মোরশেদুল ইসলামের চাকা এবং তারেক মাসুদের মুক্তির গান-এর নাম। চাকামুক্তির গান বিকল্পধারার শেষ আলোচিত অর্জন।

তাহলে ইয়াসমিন কবিরের স্বাধীনতাপরবাসি মন আমার প্রামাণ্যচলচ্চিত্র দুটিকে আমরা কি নামে ডাকব? আমার মতে এ দুটি প্রামাণ্যচলচ্চিত্র সত্যিকারের ‘স্বাধীন’ চলচ্চিত্র এবং ইয়াসমিন কবিরকে একজন প্রকৃত ‘স্বাধীন চলচ্চিত্রকার’ বলে আমি স্বীকার করতে চাই।

এই যে ‘বিকল্পধারা’র চলচ্চিত্র আর নেই অথবা আমাদের দেশে বহু আগেই শুরু হয়ে গেছে ‘স্বাধীন’ চলচ্চিত্রের নির্মাণধারা– এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা একেবারেই অবগত ছিলাম না বা এই আলোচনাগুলো হয়নি বা এমন বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা আলোচনায় না হওয়ার কারণ আমাদের খুঁজতে হবে।

মুক্তির গান
ফিল্মমেকার । তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ

৩.

আমাদের বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসবকে ‘পহেলা বৈশাখ’ বলে সবাই ভুল করেন। আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসবের দিনটি হলো পহেলা বৈশাখের আগের দিনটি। চৈত্র মাসের শেষদিন। যাকে আমরা ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ বলি। কেন এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ?

এই দিনটিকে ঘিরে আমাদের গ্রামে কিছু লোকাচার হাজির ছিল, যা সামাজিকভাবে পালিত হতো। তার একটি হলো, চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রামের সকল নারীরা শাক তুলতে বের হতেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা, ধানের জমি, ডোবার আশপাশ এমন সব জায়গা তন্য তন্য করে খুঁজে তারা তুলে আনতেন সব রকম শাকপাতা। সংগৃহীত শাক-পাতাগুলো তারা একত্র করে বাড়ির উঠোনে বসে সব শাক আলাদা করতেন। তারপর দেখতেন ঠিক কত প্রজাতির শাক পাওয়া গেল। দেখতেন কোন কোন শাক আর পাওয়া যাচ্ছে না, বা কোন শাক কম পাওয়া গেছে। এভাবে তারা চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রামের প্রাণ-পরিবেশের শুমারি করতেন। যে যে শাক-পাতা ঝুঁকির মুখে আছে বলে মনে করতেন, তা তারা চাষ করে বা যত্ন করে আবার ফিরিয়ে আনায় মনোযোগ দিতেন। এভাবে চৈত্র সংক্রান্তি আমাদের আনন্দ আয়োজনের পাশাপাশি আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির একটি স্পষ্ট চেহারা আমাদের সামনে হাজির করত। এই আয়োজন হতো সামাজিকভাবে, গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এবং তা আমাদের জীবন ও প্রাণকে সুরক্ষিত করত।


যদি
বাংলাদেশে
চলচ্চিত্রের ‘সংস্কৃতি’
গড়ে উঠত, তবে আমরা
বুঝতে পারতাম আমাদের
দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আমাদের
দেশের গল্প বলছে
না

আফসোসের বিষয় যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ অবধি ‘সংস্কৃতি’ হয়ে উঠতে না পারায় আমাদের চলচ্চিত্রের কোনো সামাজিক সুরক্ষা তৈরি হয়নি। বরং চলচ্চিত্র বাংলাদেশের বহুমানুষের কাছে একটি ‘অসামাজিক’ বিষয়। যদি বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের ‘সংস্কৃতি’ গড়ে উঠত, তবে আমরা বুঝতে পারতাম আমাদের দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আমাদের দেশের গল্প বলছে না; আমরা বুঝতে পারতাম আমাদের চলচ্চিত্র তার ‘বিকল্প’ চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। আমরা হয়তো খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারতাম– আমাদের চলচ্চিত্রের ‘স্বাধীন’ অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে হাঁটিহাঁটি পা-পা করে।

সূর্যকন্যা
ফিল্মমেকার । আলমগীর কবির

৪.

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে যদি ‘সংস্কৃতি’ হয়ে উঠতে হয়, তবে এ দেশে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রয়োজন। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হবে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ‘সংস্কৃতি’রূপে ধারণ করবে। চলচ্চিত্রকে ‘বিনোদন’-এর পসরা হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রকে ‘আয়কর’ লাভের কোনো উৎস হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রকে ‘নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সর’ করার কোনো মাধ্যম হিসেবে নয়; ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ চলচ্চিত্রকে দেখবে বিশ্বসংস্কৃতির জীবন্ত ও বৈচিত্রপূর্ণ এক উপাদানরূপে। দেখবে বাংলাদেশের মানুষের মনন ও মণীষা জাগ্রত করার এক অনুপম উপাদানরূপে। চলচ্চিত্র পৃথিবীর সমগ্র মানুষের চিন্তা ও মননকে বাংলাদেশের মানুষের দোরগোড়ায় হাজির করবে। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হবে চলচ্চিত্রকে সামাজিকভাবে ‘সংস্কৃতি’ করে তুলবার দায়গ্রস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

এমন একটি প্রতিষ্ঠান কেন দরকার যা ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ দিতে পারবে না, যা দিতে পারেনি এফডিসি বা চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা আছে। এই প্রতিষ্ঠান তার বিশেষায়িত চরিত্রের কারণেই কখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত হতে পারবে না। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে– এমন কোনো প্রতিষ্ঠান কখনও ‘সংস্কৃতি’চর্চার আধার হতে পারে না।


এফডিসি
সমাজের
একশ্রেণির
মানুষের কাছে
কল্পনার এক ‘মায়াপুরি’
হয়ে নিজেকে আড়াল করেছে
অথবা
হয়েছে
সামাজিকভাবে
নিন্দিত ‘অসামাজিক’ খেতাবের ধারক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ কারখানা বা স্টুডিও। নির্মাণের যাবতীয় সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে। চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত বিকাশের কারণে বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান অনেকখানি কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম ইতিহাস ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান তার এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো দায় গ্রহণ করেনি। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এফডিসি কখনও সামাজিক চরিত্র ধারণ করতে পারেনি। বরং এফডিসি সমাজের একশ্রেণির মানুষের কাছে কল্পনার এক ‘মায়াপুরি’ হয়ে নিজেকে আড়াল করেছে অথবা হয়েছে সামাজিকভাবে নিন্দিত ‘অসামাজিক’ খেতাবের ধারক। ফলে এফডিসি ঢাকার কেন্দ্রে অবস্থান করেও এই প্রতিষ্ঠান সর্ব অর্থেই সমাজ বহির্ভূত স্পেস হিসেবে নিজের চরিত্র তৈরি করেছে। সমাজ বহির্ভূত স্পেস নিয়ে সমাজের তেমন একটা মাথাব্যথা থাকে না। এফডিসির বাঁচা-মরার এখনকার আর্তিতেও তাই সমাজকে খুব একটা আন্দোলিত হতে দেখা যায় না।

সূর্য দীঘল বাড়ী
সূর্য দীঘল বাড়ী
ফিল্মমেকার । ‎মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী

৫.

চলচ্চিত্রের যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্র তৈরি করেছে তা দিয়ে সমাজে চলচ্চিত্রের মতো এত শক্তিশালী একটি শৈল্পিক মাধ্যমের মাধ্যমগত বিকাশ লাভ হতে পারলেও সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখার জন্য এক সময় বহুমানুষ পাগল হয়ে উঠত। সেই জনপ্রিয়তার মাঝে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সুখের সন্ধান করলেও সেই ‘সুখ’ সামাজিকভাবে চলচ্চিত্রকে ঘরে তোলেনি। যেমন তাকে করেনি পরিবারের হিস্যা। চলচ্চিত্র কেবলমাত্র বিনোদনের ‘হাওয়াই মিঠাই’ হয়ে মানুষকে ভুলিয়েছে; কিন্তু মানুষের অন্তরে সে নিজের জন্য মর্যাদার আসন তৈরি করতে পারেনি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির এই সামাজিক ব্যর্থতা নিয়ে আমরা কখনও সরব হইনি। সন্দেহ নেই, এও আমাদের এক প্রকার দৃষ্টিহীনতার উদাহরণ।

ঘুড্ডি
ঘুড্ডি
ফিল্মমেকার । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

৬.

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের শিল্পচর্চার মাধ্যমগত যতটুকু অর্জন আজ অবধি হয়েছে, চলচ্চিত্রকে যতটুকু সামাজিকভাবে গ্রহণ করানো গেছে, তার প্রায় সবটুকু কৃতিত্ব অবশ্যই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের। দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, এই ক্ষেত্রে আর কারো তেমন কোনো ভূমিকা আমরা দেখতে পাইনি। কিন্তু এই আন্দোলনেরও তো সীমাবদ্ধতা আছে। সামর্থ্য ও সক্ষমতার একটি অবয়ব আছে। সেই দিকটির দিকেও তো আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে।

সামাজিকভাবে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন চলচ্চিত্র শিল্পের বিশ্বব্যাপি যে বিপুল বৈচিত্র্য ও তাৎপর্যপূর্ণ শিল্পসম্ভার তা নিয়ে নিজস্ব পরিসরে কাজ করে চলেছে। এই ‘নিজস্ব পরিসর’টুকু খুব বড় কিছু নয়। একটি চলচ্চিত্র সংসদ এক বছরে কতজন মানুষকে চলচ্চিত্রের শিল্পবোধ অর্জনে সহযোগিতা করতে পারে? খুব বেশি হলে ২০০ মানুষ, আরও বেশি করে ধরলে সংখ্যাটি ৫০০’র অধিক হবে না।


সংসদ আন্দোলনের ধারাবাহিকতার
ফলে সমাজে চলচ্চিত্রকে
‘চটুলতার’ উর্ধ্বে উঠে
‘শিল্পরূপে’ দেখবার
একটি সচেতন
প্রয়াস
তৈরি হয়েছে

এই সংখ্যায় কাজে সক্ষম এমন চলচ্চিত্র সংসদ বর্তমানে দেশে ২ বা ৩টির বেশি নেই। ফলে এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে চলচ্চিত্রকে সামাজিক স্তরে শিল্পমাধ্যমরূপে ‘সংস্কৃতি’র মর্যাদায় হাজির করাটা একা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সামর্থ্যের বাইরের বিষয়। গত ৫৬ বছর ধরে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন হচ্ছে। কখনও সরব, কখনও চুপচাপ গতিতে এই আন্দোলন চালু আছে। সংসদ আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফলে সমাজে চলচ্চিত্রকে ‘চটুলতার’ উর্ধ্বে উঠে ‘শিল্পরূপে’ দেখবার একটি সচেতন প্রয়াস তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাঠ্য হয়েছে। চলচ্চিত্র একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম– এটি কম-বেশি সবাই বুঝতে ও স্বীকার করতে শুরু করেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি এতই ধীর যে, এতে খুব আশান্বিত হওয়ার কারণ দেখি না।

জয়া আহসান
গেরিলা
ফিল্মমেকার : নাসির উদ্দীন ইউসুফ

৭.

অপরদিকে সমাজে ধর্মীয় উগ্রতা, সামাজিক অনাচার, নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চার প্রতি উদাসিনতা দ্রুতই বাড়ছে। বাংলাদেশের মাটি ভীষণ উর্বর। এখানে ফসল যেমন দ্রুত বাড়ে, তেমনি বাড়ে আগাছা। ফলে সমাজে প্রয়োজনীয় জ্ঞানচর্চা, শিল্পচর্চা যত সীমিত হবে, ততই দ্রুতহারে বাড়বে ধর্মীয় উগ্রতা, সামাজিক অনাচার, অপ-চর্চার আবাদ।

এর বাইরেও কথা আছে। বিগত সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কিছু চরিত্রেরও বদল হয়েছে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর এবং আশির দশকে দেশের সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, গানে, নৃত্যে, নাটকে যত কমিটেড তরুণের আর্বিভাব হয়েছে, তা গত ৩০ বছরে হয়নি। বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজির ক্ষমতাগ্রহণ শুধু দেশ পরিচালনার চরিত্র বদলায়নি, বদলেছে সমাজ ও সংস্কৃতিতে মানুষের অগ্রাধিকারকেও। যে পরিবার গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ‘কবিতা করা’ ছেলেটিকে লালন করত, সেই পরিবারই এখন কবিতা করা তরুণকে তাচ্ছিল্য করে। যে পরিবার থিয়েটারচর্চাকে একটি অগ্রসর শৈল্পিক কাজ হিসেবে গুরুত্ব দিত, সেই পরিবারই এখন তাদের ছেলেটি বা মেয়েটিকে চাপ দেয় যেন তারা আগে তাদের ক্যারিয়ারের সুরক্ষা তৈরি করে।

সংস্কৃতির যেকোনো শাখায় নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক মানুষটিকেও এই সময়ে বাজার করতে হয়, ঘরভাড়া দিতে হয় এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আর দ্রব্যমূল্য, জীবনমানের যে খরচ বেড়েছে তাতে সমাজে মোটামুটি ভদ্র জীবনযাপনের জন্য হলেও ছুটতে হয় অর্থ রোজগারের ইঁদুর-দৌড়ে। প্রতিদিন সেই দৌড় শেষ করে না থাকে সময়, আর না থাকে শক্তি। ফলে গত ৩০ বছরে গুণ ও মানের দিক থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতিটি মাধ্যমে এক ভয়াবহ ধ্বস নেমেছে। এই ধ্বসের সাথে শুধু মেধাহীনতার যোগ আছে– তা নয়; বরং সত্য হলো, মেধাবী মানুষগুলো আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো সময় ও সুযোগ তৈরি করতে পারছেন না। এমন অসহায় অবস্থাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। এইসব বাস্তবতাকে আমরা যতই এড়িয়ে যেতে চাই না কেন, ততটা এড়িয়ে যেতে পারব না। এইসব পরিস্থিতির সঠিক বিচার করে, এইসব পরিস্থিতিকে সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য কতটা সহনীয় করা যায় তা ভাবতে না পারলে দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতিচর্চার কোনো বিকাশ সম্ভব নয়।

চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের যে বিস্তৃত চেহারা সত্তরের ও আশির দশকের মাঝ পর্যন্ত তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখতে না পারার মধ্যে উপরের কারণগুলোর অবদান আছে। এখনকার পরিস্থিতি তো আরও সঙ্কটময়। এখন সারাদেশে খুঁজলেও ১০ জন নিষ্ঠাবান চলচ্চিত্র সংসদ সংগঠক খুঁজে পাওয়া যাবে– এমন গ্যারান্টি দিতে পারব না। একজন সংগঠকের যে মান ও গুণ থাকতে হয়, তা মেধাহীন মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়ার আশা বোকামি। ফলে সারাদেশে চলচ্চিত্রচর্চার দায় চলচ্চিত্র সংসদগুলোর থাকলেও তা পূরণের সক্ষমতা তাদের ততটা নেই। আর বাজারমুখি অর্থনৈতিক অবস্থায় আর সবার মতো একজন চলচ্চিত্র সংসদকর্মীকেও খেতে হয়, ঘরভাড়া দিতে হয়, অসুখে ব্যয়বহুল চিকিৎসাগ্রহণ করতে হয়। ফলে সংস্কৃতিকর্মীদের মানুষ ভাবলে কেবলমাত্র তাদের মাথায় দেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অমানুষিক দায়ের ভার চাপিয়ে দেওয়াটা অন্যায় তো বটেই।

ডুবসাঁতার
ফিল্মমেকার : নূরুল আলম আতিক

৮.

বাজারমুখি এই অর্থনীতির যুগে রাষ্ট্রকে নিতে হয় অনেক সামাজিক গুরুদায়িত্ব। কারণ একা মানুষ যা পারে না, রাষ্ট্র তা পারে। কোনো প্রকার দায়হীনভাবে চলচ্চিত্রচর্চার পুরো ক্ষেত্রটি বাংলাদেশ সরকার অবহেলা করে গেছে। হয়তো এখন সময় এসেছে দায়গ্রহণের। তাই আমরা আজ তীব্রভাবেই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার দাবি করছি। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। যদি এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ার প্রক্রিয়ায় আন্তরিকতা ও দূরদৃষ্টি থাকে, তবে এই প্রতিষ্ঠান হবে আমাদের সবচেয়ে অগ্রসর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।


বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চায়
সবচেয়ে বড় বাধা
হলো
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়। চলচ্চিত্র এই মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত দপ্তর। যেকোনো সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ সরকারের প্রচারকার্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। আর দ্বিতীয় কাজ সরকারের বিরোধী পক্ষ বা মতামতসমূহ দমন করবার কৌশল তৈরি করা। তাই এই মন্ত্রণালয় অনেকখানি ‘পুলিশি’ মন্ত্রণালয়। চলচ্চিত্রকে এই মন্ত্রণালয়ে ন্যাস্ত করার কারণও কিন্তু চলচ্চিত্রকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার অভিপ্রায়। সেই অভিপ্রায়ে চলচ্চিত্রবিষয়ক যে আইনকানুনগুলো প্রণীত হয়েছে, তা সবই বলে– ‘এই করা যাবে না’, ‘ঐ করা যাবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ আজকে ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যদি বিবেচনা করি চলচ্চিত্রকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করবার কথা, তাহলে আমরা নেহায়াৎ বোকার স্বর্গে বাস করি। কারণ সমগ্র পৃথিবী আজ মানুষের মত ও চিন্তার মুক্তির হাজারো পথ তৈরি করে রেখেছে। আজ কেউ আফ্রিকা মহাদেশের কোনো দেশে বসে বাংলাদেশের নীলফামারি জেলার কোনো এক গ্রামের কোনো তরুণের সাথে কথা বলতে পারে, চলচ্চিত্র আদান-প্রদান করতে পারে, ভাবনা বিনিময় করতে পারে যেকোনো সময়। তাই চলচ্চিত্রকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করবার ভাবনার মতো প্রাচীনপন্থি ঔপনিবেশিক চিন্তা আমাদের দ্রুত পরিত্যাগ করা উচিত। যত দ্রুত অনুভব করবেন যে চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে বেঁধে না রেখে যদি মাধ্যমটির বিকাশে আমরা তৎপর হই, তাহলে সমগ্র বিশ্বের কাছে আমরা আমাদের ভাষা, আমাদের সাহিত্য, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে যেভাবে হাজির হতে পারব, তা আর কোনো মাধ্যম দিয়ে সম্ভব নয়।

পুরো বিশ্ব আজ অডিও-ভিজ্যুয়াল দুনিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই প্রবাহ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, তবে এর চেয়ে বড় বোকা সিদ্ধান্ত আর হয় না। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটি তরুণ। আর তারুণ্যের এই উদ্যমকে আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে কাজে লাগাতে হলে তাদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিতে হবে। কোনো দ্বিধা নেই এই কথা বলতে যে, চলচ্চিত্রচর্চার মুক্ত একটি পরিসর গড়ে দিতে পারলে এই বিপুল তারুণ্য নিজেই নিজের পথ তৈরি করে নেবে।

গোলাপী এখন ট্রেনে
ফিল্মমেকার । আমজাদ হোসেন

৯.

‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হতে হবে একটি অবাধ ও মুক্ত পরিসর। এমন একটি স্পেস যেখানে চলচ্চিত্রচর্চা কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হবে না। এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ যা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টার সরকারি ঘড়িতে চলবে না। কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সরকারের রুটিন প্রতিষ্ঠান নয়। এমন রুটিনে চলে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ। তাই বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ কখনও প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাংস্কৃতিক চরিত্র অর্জন করতে পারবে বলে মনে করি না। চলচ্চিত্রের যে কয়টি প্রতিষ্ঠান দেশে আছে তার সবকয়টি প্রতিষ্ঠান এখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ভীষণ আমলানির্ভর রুটিন প্রতিষ্ঠান– যা অপর যেকোনো সরকারি দপ্তরের রুটিনে নিজের কাজ করে। যে কাজে এইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের না আছে আগ্রহ, আর না আছে কোনো প্রেম। তাদের আজ যদি বদলি করে মৎস বা কৃষি মন্ত্রণালয়ে ন্যাস্ত করা হয়, তবে তাতেও কোনো সমস্যা তারা বোধ করবেন না। তারা কেবল চাকরি করতে এসেছেন। রুটিনে বাঁধা সরকারি চাকরি। তাদের এই মনোভাব বদলের কোনো প্রয়াস আজ পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয় হাতে নিয়েছে– এমন নজির আমাদের জানা নেই। আর এইসব কারণেই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’কে অবশ্যই তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই না।

তথ্য মন্ত্রণালয় যেহেতু একটি ‘নিয়ন্ত্রণ’মূলক মন্ত্রণালয়, তাই এই মন্ত্রণালয় থেকে সংস্তৃতি ঋদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে না। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে না চাওয়ার আরও একটি কারণ হলো এই প্রতিষ্ঠানটি চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিচর্চায় জাতির মননশীল প্রতিষ্ঠান হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে হতে হবে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি প্রতিষ্ঠান। দেশের সংস্কৃতিচর্চায় যতগুলো এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার প্রায় সবই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত। যেমনঃ বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

চরিত্রের দিক থেকে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের দশটা-পাঁচটা নিয়মের মধ্যে থাকে না। সম্ভবত এই প্রতিষ্ঠানটি বছরের অল্পকিছু ছুটির দিন বাদে প্রায় প্রতিটি দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দাপ্তরিক কাজ অবশ্যই দশটা-পাঁচটা পর্যন্তই হয়, তবে এর সকল মিলনায়তন, মাঠসহ সকল অবকাঠামো জনসাধারণের জন্য প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বাংলাদেশে সম্ভবত আর কোনো রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এমন অবাধ ও মুক্ত পরিসর জনসাধরণকে দেয় না। চরিত্র ও সুযোগ সুবিধার দিক থেকে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতোই হতে হবে।


‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’
পরিচালনার জন্য
যে পর্ষদ গঠন
করা হবে, তা
অবশ্যই
আমলাদের থেকে মুক্ত রাখতে হবে

মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতিচর্চার পরিসর আমলানির্ভর কোনো কাজ নয়। তাই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ অবশ্যই আমলানির্ভর প্রতিষ্ঠান হলে চলবে না। যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে তা আমলাদের দিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় পর্ষদ গঠন করতে হবে। এই পর্ষদে অবশ্যই চলচ্চিত্রের গুণী, অভিজ্ঞ ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের রাখতে হবে। সরকারের সকল অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের জন্য যেসব কমিটি হয়, সেইসব কমিটিতে গাণিতিক হারে আমলাদের সংখ্যা বেশি হয়। ‘পদাধিকার বল’ বলে একটি ‘বল’ আছে আমাদের আমলাতন্ত্রে। সেই বলে তারা সকল কমিটির মাঝে ‘বলপ্রয়োগের’ সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেন না। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ পরিচালনার জন্য যে পর্ষদ গঠন করা হবে, তা অবশ্যই আমলাদের থেকে মুক্ত রাখতে হবে। যদি তা সম্ভব হয়, তবে এই প্রতিষ্ঠান অবশ্যই চলচ্চিত্রের জন্য উপকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

সুতরাং
ফিল্মমেকার । সুভাষ দত্ত

১০.

‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন প্রাণপ্রবাহ তৈরিতে সহায়ক হবে। লেখার শুরুতেই যা বলেছি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো চলচ্চিত্র বাংলাদেশে সংস্কৃতি হিসেবে গৃহীত হয়নি। এটি এমন নয় যে, দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্রকে ‘সংস্কৃতি’ বলে মর্যাদা দেয়নি। অবশ্য এ কথাও সত্য যে, আমরা বেশ কয়েকবার আবেদন করার পরেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আমাদের আবেদনে আজ পর্যন্ত তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চাকে প্রথমে ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। চলচ্চিত্রকে সামাজিকভাবে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবেই দেশে চলচ্চিত্রের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্রকারদের একটি আস্থার স্পেস দিতে হবে। যে স্পেসে তারা তাদের সৃষ্টি, তাদের চিন্তা, তাদের মতামত নিয়ে অপরের সাথে আলোচনায়-তর্কে মশগুল হতে পারে। দ্বিধাহীন চিত্তে যেন বাংলাদেশের তরুণরা চলচ্চিত্রকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস পায় তার জন্য তাদের একটি মুক্ত, অবাধ পরিবেশ দিতে হবে। তাদের দেখতে দিতে হবে দুনিয়ার সকল সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র। যদিও দেখার পরিসর ও সুযোগ এখন খুব সহজ একটি ব্যাপার। তবুও এই সহজ পরিবেশেও যা অনুপস্থিত তা হলো, চলচ্চিত্র নিয়ে সামাজিকভাবে তৎপর হওয়ার সুযোগ। সেই সুযোগটি বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। ভাবুন তো, একজন তরুণ তার নির্মিত ছোট-বড়-নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রটি নিয়ে ঢাকায় বা অন্য কোনো জেলা শহরের কোথায় হাজির হবে? কোথায় সেই স্পেস যা তাকে দেবে সমমনা মানুষ, সহযোদ্ধা এবং আরও বহু মানুষের সাথে সামাজিক সংযোগের সুযোগ?

সত্যি বলতে কি এমন কোনো পরিসর আমাদের রাজধানীতে অথবা অপর কোনো জেলা শহরে নেই। ফলে চলচ্চিত্র নিয়ে বর্তমান তরুণ্য খুবই আশান্বিত হয়ে ছুটতে চেয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, হতাশ হচ্ছে এবং শেষমেষ খুঁজে নিচ্ছে অন্য কোনো পথ– যা আদতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য শুধু নয়, সামগ্রিক শিল্পচর্চার জন্য ভীষণ আশঙ্কার ব্যাপার। আমরা গত ৩০ বছরে শূন্যতার পথে ধাবিত হয়েছি। আমরা কি তাহলে আগামীতেও আরও শূন্যতার পথে, চিত্তহীনতার পথে ধাবিত হব?

শুনতে কি পাও
ফিল্মমেকার । কামার আহমাদ সাইমন

১১.

ভাবুন আমাদের একজন সত্তর বছর বয়স্ক অগ্রজ চলচ্চিত্রকার, অভিনয়শিল্পী, সুরকার, গায়ক, গীতিকার, চলচ্চিত্র সমালোচক, লেখক, গবেষকের কথা। ভাবুন এই মানুষগুলো চলচ্চিত্রের সাথে সারাটা জীবন যুক্ততার পরেও তাদের অবসর সময়ে দিনে বা রাতে তাদের যাওয়ার কোনো স্থান নেই– যেখানে তারা যেতে পারেন, আড্ডা দিতে পারেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন নতুনতর প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের সাথে। আমাদের নেই বিশ্বের সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্রগুলো নিয়মিত দেখবার কোনো অবারিত স্থান। যেখানে সারাবছর প্রতিটি দিন চলচ্চিত্রের উৎসব হবে, রেট্রোস্পেক্টিভ হবে, বিশেষ বিশেষ অধিবেশন হবে। প্রতিটি সন্ধ্যায় আমরা এমন কোথাও যেতে পারি না যেখানে গেলেই পেয়ে যাব প্রিয়জন, বন্ধু ও চলচ্চিত্র-স্বজনদের। না, নেই আমাদের এমন কোনো স্থান।

বলছিলাম কেন চাই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’। চাই কারণ এই কাজগুলো ছোট পরিসরে চলচ্চিত্র সংসদগুলো করে এসেছে গত ৫৬ বছর ধরে। সরকার বা রাষ্ট্রের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই চলচ্চিত্র সংসদ বা ফিল্ম সোসাইটিগুলো তাদের এই কাজ ৫৬ বছর ধরে করে চলেছে, হয়তো ক্ষুদ্র পরিসরে আগামীতেও করে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পরে আমরা আমাদের রাষ্ট্রের কাছে আশা তো করতেই পারি যে এই কাজটি আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়মিত করার জন্য সরকার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ গঠন করবে।

‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হবে চলচ্চিত্র সংসদগুলোর সহায়ক শক্তি ও আশ্রয়। যেমন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নাট্যচর্চাকে, চিত্রকলাচর্চাকে, সঙ্গীত ও নৃত্যচর্চাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চালু রেখেছে শিল্পচর্চার বহমানধারাকে; ঠিক তেমনি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হবে সকল চলচ্চিত্রচর্চাকারী, চলচ্চিত্রপ্রেমী, চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য নিবেদিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে থাকবে একাধিক মিলনায়তন– যা শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শন উপযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের প্রায় সকল মিলনায়তন নির্মাণের একটি খিচুরি ডিজাইন আছে। যে ডিজাইনে মিলনায়তনগুলো গান-নাচ-নাটক সবকিছুর জন্য নির্মিত হয়। আমরা এমন ‘খিচুরিমার্কা’ ডিজাইন চাই না।

‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ হবে চলচ্চিত্রের কেন্দ্র। সেখানকার মিলনায়তন হবে চলচ্চিত্র প্রদর্শন উপযোগী আধুনিক মিলনায়তন। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রে’ সেমিনার হল থাকবে, থাকবে বই ও অডিও-ভিজ্যুয়াল লাইব্রেরি, থাকবে বসার, আড্ডা দেওয়ার বড় পরিসরের ক্যাফেটেরিয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের সুবিধার জন্য ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রে’ থাকবে নিজস্ব অতিথিশালা। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চলচ্চিত্র কেন্দ্র হতে হলে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রে’ আন্তর্জাতিকমানের সকল সুবিধার সমাবেশ থাকতে হবে। এমন একটি কেন্দ্র তৈরি হলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুধু যে বিকশিত হবে– তাই নয়; সে হয়ে উঠবে অন্যদের জন্য অনুকরণীয়।

নন্দন
চলচ্চিত্র কেন্দ্র । কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

১২.

‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার দাবিটি আমাদের অনেকদিনের। একজন চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে এই দাবিটি আমাদের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে চলচ্চিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় অপর সব কয়টি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ স্টুডিও এফডিসি আছে, আছে জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ, গড়ে উঠছে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই গড়ে তুলেছে। আমরা বিশ্বাস করি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ও আমরা পাবো। কারণ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই আন্তর্জাতিকমানের চলচ্চিত্র কেন্দ্র রয়েছে। এমনকি আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে প্রাদেশিকভাবেই চলচ্চিত্র কেন্দ্র রয়েছে। যেমন আমাদের সকলের অতি পরিচিত প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবাংলার চলচ্চিত্র কেন্দ্র ‘নন্দন’ আমাদের উৎসাহিত করে। আমরা চলচ্চিত্র কেন্দ্র হিসেবে কাউকে যখন কোনো উদাহরণ দিতে চাই, তখন কিন্তু চট করে ‘নন্দন’-এর উদাহরণ দেই। ‘নন্দন’-এর নাম, লোগো এবং এর উদ্বোধক ছিলেন ভুবনবিখ্যাত সত্যজিৎ রায়। এই ‘নন্দন’ পশ্চিমবাংলায় প্রাদেশিক চলচ্চিত্র কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা করেছে ১৯৮৫ সালে। অথচ আমরা এখনও যাত্রা আরম্ভই করতে পারিনি।


স্বাধীনতার
এত বছর পরেও
আমরা আমাদের জাতীয়
স্তরে একটি চলচ্চিত্র কেন্দ্র
গড়ে তুলতে পারিনি– এটা
তো আমাদের নিজস্ব বড় ব্যর্থতা

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা আমাদের জাতীয় স্তরে একটি চলচ্চিত্র কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারিনি– এটা তো আমাদের নিজস্ব বড় ব্যর্থতা রূপেই আমি বিচার করতে চাই। এই ব্যর্থতার ভার আরও বহুকাল বইতে হবে– এমনটা মনে করতে চাই না।

আমরা আশা করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে আমরা ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ গড়ে উঠবার উদ্যোগ ও প্রয়াস দেখতে পাবো। আমরা আশা করি বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে চলচ্চিত্রকে ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে মর্যাদা দিয়ে চলচ্চিত্রচর্চার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আমরা চলচ্চিত্র অনুরাগিরা এমন দিনটির প্রত্যাশায় আছি, যেদিন আমরা ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রে’র চত্বর থেকে গেয়ে উঠব– ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’!

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; চলচ্চিত্র নির্মাতা; চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি। নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র : অনিবার্য [ পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; ২০১১]; পথিকৃৎ [চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক; ২০১২ (যৌথ নির্মাণ)]; সময়ের মুখ [জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবন অবলম্বনে; ২০১৮]। সম্পাদিত ফিল্ম-ম্যাগাজিন : ম্যুভিয়ানা; চিত্ররূপ। সিনে-গ্রান্থ : চলচ্চিত্রপাঠ [সম্পাদনা]; চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া। পরিকল্পক ও উৎসব পরিচালক : নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র উৎসব

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন