চান্তাল আকেরমানের সঙ্গে আলাপ । কিস্তি-৩ [৭]

2
81
চান্তাল আকেরমান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ । নিকোল ব্রেনেজ
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
চান্তাল আকেরমান [৬ জুন ১৯৫০-৫ অক্টোবর ২০১৫]। বেলজিয়ান ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম স্বতন্ত্র বিপ্লবী অ্যাকটর-ডিরেক্টর। ২০১১ সালের গ্রীষ্মকালে, সদ্যনির্মিত সিনেমা “আলমেয়ার’স ফলি”র সূত্রধরে, নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারটির তৃতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো এখানে…
আগের কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন এই বাক্যে


সা ক্ষা ৎ কা র

প্রসঙ্গ : এনার্জি

নিকোল ব্রেনেজ •
অতুলনীয় এনার্জি আপনি দেখিয়েছেন। নিজের আরও অনেক কাজের মতো, অনন্যসাধারণ প্রোডাকশন প্রবলেমের একটি ব্ল্যাক-হোল থেকে আলমায়ার’স ফলিকে আপনি উদ্ধার করেছেন।

চান্তাল আকেরমান •
আমি যথাযুক্তভাবেই এনার্জি পাই। জীবনের অর্ধেকটা সময় আমি বিছানাতেই কাটাই। ভাগ্য ভালো, আমার সামনে একটা জানালা আছে এখন; তাই বাইরে তাকাতে পারি। সেখানে আগে একটা দেয়াল ছিল। আমার জীবনের প্রথম ম্যানিক এপিসোড ঘটেছে ৩৪ বছর বয়সে। আমার জীবন বদলে গেছে, কিছু একটা ভেঙে পড়েছে : অল্প বয়সে আমাকে পরিপূর্ণ করে রাখত– এমন কোনো এক এনার্জি সেটি।

চান্তাল আকেরমান
আই, ইউ, হি, শি
ফিল্মমেকার ও অভিনেত্রী । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
এই বদলের ধরনটি কী ছিল?

চান্তাল আকেরমান •
আগে, জীবনে বিষাদের মুহূর্তগুলো সহকারেই, এক ধরনের এনার্জি আমি অনুভব করতাম; তাতে ভর দিয়ে অবিরাম পড়তে থাকতাম, নোট লিখতাম, সবকিছুর প্রতিই ছিল কৌতূহল। একসময় সেই এনার্জি চলে গেল। আর ভাঙন এসে আমাকে বিধ্বস্ত করে দিলো। আগে, রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতাম, গরিব লোকজনকে বাড়ি নিয়ে আসতাম; গোটা পৃথিবীটাকে আমি সুরক্ষা দিতে চেয়েছিলাম। ভাবুন তো, একবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে [আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা] ফোন করে আমি বলেছিলাম, তারা যেন দুনিয়ার অপরপ্রান্তের দেশ সাইবেরিয়া পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ খুড়ে দিয়ে, সেদেশের বন্দিশিবিরে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধার পাবার পথ করে দেয়! তাদের বলেছিলাম, যেন ১০ হাজার সমাজতান্ত্রিক ইহুদিকে ইসরাইলে নিয়ে আসে দেশটির সরকার বদল ও শান্তি আনার জন্য।… অথচ আমি তো সেদেশের বাসিন্দা নই, এবং দেশটির আসলে কী করা উচিত– সে কথা তো ইসরাইলিদেরই জানার কথা। আমরা যারা এখানে নিরাপদ সময় কাটাচ্ছি, আমাদের জানার কথা নয়।


গোটা
পৃথিবীটাকে
আমি
সুরক্ষা
দিতে
চেয়েছিলাম

আমি চাই দিন যেন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ৫টা থেকে ৮টার মধ্যে, ঘুমের বড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ি। কোনো অভিযোগ নেই আমার। এভাবেই জীবন কাটছে। নিজের অসুখের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। এ তো অন্য যেকারও অসুখের মতোই।

নিকোল ব্রেনেজ •
তাহলে কী আপনাকে জ্বালানি দেয়? নিজেকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

চান্তাল আকেরমান •
কীভাবে নিজেকেই ব্যাখ্যা করব? এ ক্ষেত্রে প্রথম কথাটি হবে, ‘আমি একজন ইহুদি মেয়ে’। যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘ইহুদি বলতে কী বোঝাচ্ছেন?’ সেটির জবাব আমি দিতে পারব না। ইহুদি সম্প্রদায়কে আমার ছেড়ে যেতে হতোই; এবং মাঝে মধ্যে আমি এসব মিস করি। যখন বাড়ির পাশে কোনো অর্থোডক্স ইহুদিকে হেঁটে যেতে দেখি– সিনাগগ [ইহুদিদের প্রার্থনালয়] থেকে যাচ্ছে, মাথায় কালো হ্যাট– তাদের বলি, ‘সাহ-বাত, সা-লোম’ [‘আপনার ওপর শান্তিবর্ষিত হোক’]; আমার খুব ভালোলাগে। জানি, এ নির্বোধ কাণ্ড; কিন্তু এটা এমনই। তারা আমার দিকে উদ্ভটভাবে তাকায় ঠিকই, তবে সাড়া দিয়ে নিচু গলায় বলে, ‘সাহ-বাত, সা-লোম’। সেই মুহূর্তটিতে মনে হয়, আমি তো ইহুদিই, কিংবা ঠিক এর উল্টোটা– আমি ইহুদিই হতে চাচ্ছি, হোক তা এক সেকেন্ডের জন্য হলেও। হাস্যকর ব্যাপার হলো, ইসরাইলকে আমি ভালোবাসি– এমনকি এটি নির্বাসনের নিজস্ব ফর্মে, আরেকটা ধরনে রইলেও। সরকারের সঙ্গে একমত যদি না-ও হই, সাধারণত, সেখানে আমার ভালোলাগে। এমনকি যদি আমি জানিও, টিকে থাকতে হলে অন্য জাতিগুলোর মতো ইসরাইলকেও রক্তপাত ঝরাতে ও জমি দখল করতে হবে; তবু।

আপনি যখন ইহুদির সঙ্গে থাকবেন, যদি তাদের ঘৃণাও করেন, তবু কিছু একটা সেখানে পাবেনই, কিছু না বলা কথার দেখা [আত্ম-ঘৃণাকারী ইহুদিদের কথা আলাদা]। ফলে ইহুদিবিদ্বেষের কিছু নেই আসলে।

তবু, আমার মাকে অপদস্থ করা মানুষটি ছিল ইহুদি। সে ছিল নাইটক্লাবের এক দারোয়ান। সে আমার পরিবারকে লুকিয়ে রেখেছিল তাদের কাছ থেকে টাকা পাবার আশায়; যখন টাকা ফুরিয়ে গেল, তাদেরকে অপদস্থ করল। ‘রেসিসটেন্স’ [ইহুদি মুভমেন্ট] তাকে প্রতিহত করেছিল; সে ছিল একজন ‘উন্টারমেন্স’ [নাৎসি টার্ম : নিকৃষ্ট মানুষ অর্থে]। কোনোকিছুই সরল নয়; যখনই আমি কোনো কিছু নিয়ে কথা বলি, সঙ্গে সঙ্গে সেটির বিপরীত দিকটি নিয়েও বলতে চাই।

নিকোল ব্রেনেজ •
এ রকম একটা নাৎসি টার্ম ব্যবহার করতে অস্বস্তি হয় না আপনার?

চান্তাল আকেরমান •
না; সেই মানুষটির বেলায় হয় না। আমার হয়তো তাদের শব্দভাণ্ডার তাদের জন্যই ছেড়ে দেওয়া উচিত; তবে এটির একটি নিজস্ব ওজন রয়েছে।

আমার বাবা কোনোদিনই ইয়েলো স্টার [নাৎসিদের হাতে বন্দি ইহুদিদের পরতে বাধ্য করা ব্যাজ] পরেননি। ফুফু তাকে একটা মঠে লুকিয়ে রেখেছিলেন; নান’রা তাকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ইহুদিদের কিন্তু ক্যাথলিক ও মুসলমানদের মতো কাউকে ধর্মান্তরিত করার অধিকার নেই। আমার দাদা-দাদী ছিলেন একেবারেই সাদাসিধা মানুষ; তাদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে– তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি; তারা ধরেই নিয়েছিলেন, তাদেরকে কাজ করানোর জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার দাদীর পেইন্টিংগুলো তখন চুরি হয়ে গিয়েছিল।

চান্তাল আকেরমান
লা মিনিস্তারা দু লার্ত
অভিনেত্রী । চান্তাল আকেরমান
ফিল্মমেকার । ফিলিপ গ্যারেল

প্রসঙ্গ : ফিলিপ গ্যারেল

নিকোল ব্রেনেজ •
ফিলিপ গ্যারেলের শি স্পেন্ট সো ম্যানি আওয়ারস আন্ডার দ্য সান ল্যাম্পস [Elle a passé tant d’heures sous les sunlights; ১৯৮৫] লা মিনিস্তারা দু লার্ত [Les Ministères de l’art ;১৯৮৮] সিনেমায় আপনাকে অভিনয় করতেও দেখা গেছে। বয়সে ফিলিপ আপনার চেয়ে মাত্র দুই বছরের বড়; এবং র‍্যাঁবো, গোদার, ও একই মিনিমালিস্ট ও অ্যানার্কিস্ট প্রবণতা… সব মিলিয়ে আগ্রহের দিক থেকে আপনাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে…

চান্তাল আকেরমান •
আগ্রহের দিক থেকে আমাদের দুজনের মধ্যে মিল রয়েছে কি না– জানি না। তবে তরুণীরা নয়, বরং তরুণরা র‍্যাঁবো হওয়ার স্বপ্ন দেখে। অ্যানার্কিস্ট? নিজেকে আমি এই শব্দটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করি না। তবে নিশ্চিতভাবেই ১৯৬৮ সালে, হ্যাঁ, আমি হাজির ছিলাম, এবং সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম। হ্যাঁ, গোদার নিঃসন্দেহে মিনিমালিস্ট। মনে আছে, ফিলিপ যখন শি স্পেন্ট সো ম্যানি আওয়ারস আন্ডার দ্য সান ল্যাম্পস-এর শুটিং করতে বাড়িতে এলেন, তার আগের রাতে আমার ঘুম হয়নি। তার কাছে ছিল একটা পুরনো, অনেকটাই ভাঙা ক্যামেরা। নিজের হাতে লেন্সটার নিরাপত্তা নিশ্চিত তাকে করতেই হয়েছিল।

নিকোল ব্রেনেজ •
এ কারণেই এই সিনেমাটি এমন দুর্দান্ত।

চান্তাল আকেরমান •
হয়তো।

চান্তাল আকেরমান
পোর্ট্রেট অব অ্যা ইয়ং গার্ল ইন দ্য লেট সিক্সটিজ, ইন ব্রাসেলস
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

প্রসঙ্গ : বালিকা

নিকোল ব্রেনেজ •
নিজেকে সবসময়ই একজন ‘ফিইয়্যা’, বালিকা, কন্যা অভিধায় অভিহীত করে কথা বলেন আপনি; আপনার আত্মপ্রতিকৃতিমূলক সিনেমা পোর্ট্রেট অব অ্যা ইয়ং গার্ল ইন দ্য লেট সিক্সটিজ, ইন ব্রাসেলস, এবং আলমায়ার’স ফলির কেন্দ্রীয় নারীচরিত্রটির নাম নিনা– ‘পেতিত ফিইয়্যা’ বা বাচ্চা মেয়ে। ‘ফিইয়্যা’ বলতে তারুণ্যকে বোঝালেও, এর বেশিরভাগই আসলে একটি শাখা, একটি ঐতিহ্যের কথা বলে। আপনার কাছে ‘ফিইয়্যা; মানে নিশ্চয়ই কোনো ‘ফ্যেমা’ বা নারী হয়ে ওঠা নয়?

চান্তাল আকেরমান •
হয়তো। সম্ভবত। আমি ঠিক জানি না। আমি কোনোদিনই বড় হইনি। সবসময়ই রয়ে গেছি একজন বুড়িয়ে যাওয়া শিশু। আলমায়ার এমনই এক বাবা, নিজের কন্যাকে নিয়ে যার একটা স্বপ্ন আছে, এবং কন্যার ওপর দিয়ে নিজের স্বপ্নকেই বোধ হয় সে বয়ে বেড়ায়। একটা সংসার হোক– নিজের বাবার এরকম স্বপ্নকে আমি কখনোই অনুসরণ করিনি। আমি একটা বালিকাই থেকে গেছি– আমার মায়ের কন্যা। শেষে কী আছে, জানি না।

আমার বোন, হ্যাঁ, সে সংসার শুরু করেছে মেক্সিকোতে। দুটি সুন্দরী ও বুদ্ধিমতি সন্তান আছে তার। আমার ভাগ্নির বিয়ে হতে যাচ্ছে শিগগিরই, তার মানে এই রক্তের ধারাটি অব্যাহত থাকবে। নিজের কোনো সন্তান নেই বলে কখনো কখনো আমার অনুতাপ হয়। আমি হয়তো কন্যা থেকে নারী হয়ে ওঠতে পারতাম, কিন্তু সেটি আমার পক্ষে আদৌ সম্ভবত হতো কি না– জানি না। হয়তো হতো না।

নিকোল ব্রেনেজ •
ফলে আপনি বালিকা থেকে যাওয়ার ব্যাপারেই বদ্ধপরিকর ছিলেন।

চান্তাল আকেরমান
চান্তাল আকেরমান
কৈশোরে

চান্তাল আকেরমান •
বদ্ধপরিকর ছিলাম– বলব না। তবে এমনটাই হয়ে গেছে। আমি ছিলাম পরিবারের প্রথম সন্তান। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করতাম না বলে মা সবসময়ই চেঁচামেচি করতেন; খাবারের প্রতি তার আচ্ছন্নতা ছিল। আমার যখন তিন মাস বয়স, তখন আমাকে সুইজারল্যান্ডের বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল জাউ খাওয়ানোর জন্য; সবসময় একই জাউ; না খেলে তারা আমার থুতনি ধরে জোর করে খাওয়াতেন। আমার বোনটির জন্মের পর এসব ঠিক হয়ে গেল। কিশোর বয়সে আমি পেটুকের মতো খেতাম– ব্যাপারটি বাবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠল; কেননা, তখনকার দিনে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য চিকন-চাকন রাখতে হতো। বাবা ছিলেন একজন ইহুদি-বাবা; বয়সে আমার মায়ের চেয়ে নয় বছরের বড়; আমার তিন ফুফুর দায়িত্বভারও ছিল তারই কাঁধে; আর আমার দাদা-দাদী আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। আমাদের কী করা উচিত আর কী উচিত নয়– সেটি দেখাতে গিয়ে বাবা তার হাতের তালু দিয়ে টেবিলের ওপর চাপড় মারতেন।

নিকোল ব্রেনেজ •
এ কাজটি আপনি নিজেও প্রায়শই করেন।

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ, সম্ভবত। ১৯৫০ দশকের বাবা-মায়েরা নিজেদের নিজস্ব কর্তৃত্বের দাবী করতেন; নিজ সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুবৎসল হয়ে ওঠতে চাইতেন না তারা।

নিকোল ব্রেনেজ •
তারা ছিলেন একটি আইনের ট্রাস্টি ও জামিনদার। কোন মূল্যবোধটি আপনার বাবা-মা জাহির করতে চাইতেন?

চান্তাল আকেরমান •
হ্যাঁ, বাবারা চাইতেন। আপনাকে একজন ভালো মানুষ হতেই হবে। আপনাকে ন্যায্য আচরণ করতে হবে : এ জিনিসটিই কেউ করত এবং কেউ করত না; এমনকি আপনি এটির সঙ্গে একমত না হলেও শেষ পর্যন্ত এটি কিন্তু খুবই সহজ কাজ।


মাসের
পর মাস
আমি স্কুলে
যাইনি। বিছানায়
আধাঘুমে আমার
রিপোর্ট কার্ডে
স্বাক্ষর করে
দিতেন
মা

তবে, অন্যদিকে, কাজ করতে আমাকে মোটেও কোনো উৎসাহ দিতেন না তারা। স্কুলের ব্যাপারে বাবার কোনো আগ্রহই ছিল না; মাসের পর মাস আমি স্কুলে যাইনি। বিছানায় আধাঘুমে আমার রিপোর্ট কার্ডে স্বাক্ষর করে দিতেন মা। পড়াশোনায় যথেষ্ট ভালো হলেও, এ ব্যাপারে কখনোই তারা আমাকে তাড়া দেননি। তবে পরে, হাইস্কুল জীবনে পড়াশোনার ব্যাপারটি ছিল যাচ্ছেতাই। যেহেতু আমি ভালো ছাত্রী ছিলাম, বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত শ্রেণির, বেলজিয়ান ফ্রিম্যাসন ধরনের একটি ভীষণ ঐশ্বর্যশালী ও নিয়মনিষ্ঠ হাইস্কুলে আমাকে পাঠিয়েছিলেন তারা। সেখানে ডাক্তার, শিক্ষাবিদ, ও ইন্ডাস্ট্রি ক্যাপ্টেনদের কন্যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমার। আমি ছিলাম একজন নির্বান্ধব ছাত্রী।

১২ বছর বয়সেই শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে হয়েছিল বাবাকে। বাবার দিক থেকে, আমাদের পরিবারটি সমাজের নিচু শ্রেণি থেকে আসা। পোল্যান্ডে আমাদের পরিবারটি ছিল ধনি। দাদী এক জমকালো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তার তিন কন্যা পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন। তবে পরে যখন তারা খালিহাতে পোল্যান্ড থেকে পালিয়ে এলেন, পরিবারের ভরণপোষণ সামলাতে আমার বাবা হয়ে ওঠলেন একজন শ্রমিক, একজন দস্তানা-প্রস্তুতকারী।

আমার বদলে যদি তার একটা ছেলে সন্তান হতো, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি খুশি হতেন, তার নামটা হয়তো টিকে থাকত। একদিন তাকে বলেছিলাম, ‘দেখেছো, তোমার নামটাকে আমি কোথায় নিয়ে গেছি?’ আমাকে নিয়ে লেখা অল্প কিছু আর্টিক্যাল তিনি পড়েছিলেন ঠিকই, তবে সেগুলোই যথেষ্ট ছিল না; আমি কোনোভাবেই তার নামটি টিকিয়ে রাখতে পারব না– এ কথা আগে থেকেই ধরে নিয়ে তিনি খুব মনমরা হয়ে থাকতেন।

চান্তাল আকেরমান
মা নাতালিয়া আকেরমানের সঙ্গে চান্তাল
ফিল্ম । নো হোম মুভি
ফিল্মমেকার । চান্তাল আকেরমান

নিকোল ব্রেনেজ •
আপনার মায়ের নাম কী ছিল?

চান্তাল আকেরমান •
লেইবেল [Leibel]

নিকোল ব্রেনেজ •
‘লাইবে’ [Liebe] শব্দটির বর্ণগুলোরই এদিক-সেদিক; জার্মান ভাষায় এ শব্দের অর্থ ‘ভালোবাসা’ [লাভ]। [ইদিস ভাষায় লেইবেল মানে হলো– ‘সিংহশাবক’।]

চান্তাল আকেরমান •
মায়ের পরিবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি ছিলেন আমার নানী। নানা ছিলেন সিনাগগের একজন ক্যান্টর [যার নেতৃত্বে প্রার্থনাগীত গাওয়া হয়]। নানা-নানীর বিয়েটি নিশ্চিতভাবেই ছিল অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। আমার নানী [বিয়ের] আগে থেকেই ছিলেন নারীবাদী; চেয়েছিলেন পেইন্টার হতে, এবং বিয়েটি নিজের ইচ্ছেতেই করেছেন। তিনি জন্মেছেন ১৯০৫ সালে; আর তার মা ছিলেন ভীষণ ধার্মিক। নিজের চাওয়ামতো জীবন নানী পাননি; সেই বিচারে আমার মা তা পেয়েছিলেন, অন্তত বাবার মৃত্যুর পর থেকে। তা ছিল এক ধরনের উন্মত্ততা। এ বেলা, আমি বিষয়টি একদমই বুঝতে পারিনি। আমিই কি এই সকল কিছুর খনি?

এ বিষয়ে ও অন্যান্য বিষয়েও এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

নিকোল ব্রেনেজ •
নিজের জীবন, নিজের স্বাধীনতা, নিজের সৃজনশীলতার দিকে ফিরে তাকালে আপনার মনে কি এক ধরনের প্রায়শ্চিত্যের অনুভ‚তি কাজ করে না?

চান্তাল আকেরমান •
না, মোটেও না। কীসের প্রায়শ্চিত্য? প্রথমত ভেবেছিলাম, আমার মা যে কথাগুলো কোনোদিনই বলতে পারেননি, আমি সেগুলো বলছি; কিন্তু আমি বুঝি, ব্যাপারটি তা না। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। একদমই ছিল না। দেখুন, জানি না আমি!

নিজের ভাবনাগুলোকে কাজের মধ্যে নিরন্তরভাবে রূপান্তরিত করবে– এমন ধরনের তাড়নার ঘাটতি আমার ছিল।… তবে সবকিছুরই উৎপত্তি ঘটেছে নানীর জার্নাল থেকে। যখন আমি প্রথমবারের মতো অসুস্থ হলাম, মা আমাকে ফেলে চলে গেলেও, তার মায়ের ডায়েরিটি আমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। নানী ছিলেন একটি ভীষণ রকম অর্থোডক্স পরিবারের সন্তান। ১৯১৯ সালে, ১৫ বছর বয়সে তিনি লিখেছেন : ‘প্রিয় ডায়েরি, যেহেতু আমি নারী, তাই একমাত্র তোমার কাছেই নিজের অনুভূতি ও বেদনার কথাগুলো নির্ভার করতে পারি!’ প্রতি শনিবারে, গোপনে ছবি আঁকতেন তিনি। মা’র ধারণা, আমি আমার নানীর উত্তরাধিকারী; আমার সবকিছু তার কাছ থেকেই পাওয়া। আমার নানী পোশাক বানাতেন, এবং নকশাগুলোর ড্রয়িং নিজেই করতেন। বিশ্বযুদ্ধের আগে মায়ের স্বপ্ন ছিল ড্রয়িং শিখে নিজের মাকে নিয়ে একটা ফ্যাশন হাউস খুলবেন। কিন্তু বন্দিশিবিরের দিনগুলোতে আরো অনেক স্বপ্নের মতো সেটিও মরে গেছে; আর কিছু করা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে।

যখন আমি সিনেমা বানাতে চাইলাম, বাবা আমাকে এ কাজ করতে দিতে চাননি। তার ভয় ছিল, আমি এতটাই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ব, সেটির ফল খুব খারাপ হবে। কিন্তু মা বলেছিলেন, ‘ওকে ওর কাজ করতে দাও’।


পুরুষত্ব
শ্রেষ্ঠতর–
ভাগ্যিস এমনটা
মা কোনোদিনই বিশ্বাস
করতেন
না

ডায়েরিটি ছিল নানীর রেখে যাওয়া একমাত্র চিহ্ন। আমি এটি কতবার যে পড়েছি! এটিতে আমার মা-ও কয়েক লাইন লিখেছিলেন, আমিও লিখেছি, পরে আমার ছোটবোনও লিখেছে। এটি একটি সম্পূর্ণ মেয়েলি রেওয়াজ। পুরুষত্ব শ্রেষ্ঠতর– ভাগ্যিস এমনটা মা কোনোদিনই বিশ্বাস করতেন না। বাবার সেবা তিনি অবশ্যই করতেন, খাবারের টেবিলে বাবার পাতেই সেরা খাদ্যটি তুলে দিতেন, কিন্তু মন থেকে তিনি এমনটা ভাবতেন না। দাদীর প্রতি বাবার ভীষণ অনুরাগ ছিল; এ কথা তিনি কোনোদিনই মুখ ফুটে না বললেও আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম। দাদী ছিলেন বদ্ধউন্মাদ– তার সম্পর্কে শুধু এটুকুই আমি জানতাম। যুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি এটিকে নিরোধ করলেও, পরে ফেটে পড়েছিলেন।

এক রাতে, বাবাকে খুশি করার জন্য, অ্যা কোচ ইন নিউইয়র্ক-এর স্ক্রিপ্ট লিখছিলাম আমি; ভেবেছিলাম, লিখলে কিছু টাকা আসবে, আর সেই টাকা শেষ পর্যন্ত তাকে সন্তুষ্টি দেবে। নিজের বাবার তুলনায় বরং মায়ের [যদিও তাকে আমি কেবল উন্মাদ হয়ে যাওয়ার পরই পেয়েছি] প্রতি আমার বাবা কতটুকু অনুরক্ত ছিলেন– সে কথা আমাকে জানিয়েছিলেন আমার উকিল চাচা। এটি আমাকে দম নেওয়ার একটু সুযোগ দিলো; একটু স্বস্তির অনুভূতি এনে দিলো। তবে নিজেকে যে আমার বাঁচাতে হবে– সেটিও বুঝে গিয়েছিলাম। তা না হলে মেয়ে হওয়ায় সবসময়ই অবহেলিত আমার পক্ষে কী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল? এক ফুফুর মতো, সারাজীবন ক্লিনিকেই কাটাতে হতো আমাকে।

চান্তাল আকেরমান
বোন সিলভিয়া আকেরমানের সঙ্গে চান্তাল
মেক্সিকো, ২০১৪
সাক্ষাৎকার গ্রহণকাল । ১৫ জুলাই ও ৬ আগস্ট ২০১১; প্যারিস, ফ্রান্স 
সূত্র । লোলা জার্নাল

পরের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]