মুক্ত চলচ্চিত্রকার ও ভাবনার বিশ্ববাজার/ হাসনাত কাদীর

0
146
HASNAT KADIR

লিখেছেন । হাসনাত কাদীর

বিশ্বে এখন ক্যামেরার কাল চলছে। আপনি ঘুম থেকে উঠে এখন আয়নার সামনে দাঁড়ান না। মুখের সামনে ফ্রন্ট ক্যামেরা ধরে চুল ঠিক করে নেন। বাড়ি থেকে বেরুনোর কালে সিসি ক্যামেরা আপনাকে দেখে নেয়। অফিসে ঢুকার আগেই ক্যামেরা আপনার ছবি পৌঁছে দিচ্ছে অফিস ঘরে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, আপনি প্রিয়জনের কাছে আছেন ক্যামেরার কল্যাণেই। ফলে ক্যামেরার এই কালে ক্যামেরাকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। ক্যামেরাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না মানে চলচ্চিত্রকে গ্রাহ্য করতেই হবে আপনাকে।

চলচ্চিত্রকে গ্রাহ্য করতেই হবে– এই কথাটা বলতে ক্যামেরা ও ক্যামেরার কাল নিয়ে এত কথা কেন বললাম? বললাম, কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল প্রযুক্তির নাম ক্যামেরা। যে ক্যামেরা দিনকে দিন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কলমের থেকেও নিত্য ব্যবহৃত। কলমের থেকে সংখ্যায় অধিক ও শক্তিশালী। আপনি রাস্তায় বেরুলে খুব কম লোকের পকেটে কলম পাবেন। কিন্তু সাথে একটি ক্যামেরা নেই– এমন লোক খুব বেশি পাবেন না। মানুষ যেমন হরদম মোবাইল ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করছে, তেমনি মোবাইল ফোনের ডিসপ্লেও ব্যবহার করছে। একটি চিত্রধারণে, অপরটি চিত্র দেখার কাজে। ফলে জোর গলায় এখন বলতে পারি, আমরা সকলেই চলচ্চিত্র উৎপাদন ও প্রদর্শনের একেকটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানের মতো। আমরা প্রত্যেকেই যেন একটি চলচ্চিত্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠান পকেটে নিয়ে ঘুরছি। আমরা প্রত্যেকেই যেন পকেটে নিয়ে ঘুরছি এক একটি সিনেমা হল। কী আশ্চর্য না?!


আমরা
প্রত্যেকেই
যেন পকেটে
নিয়ে ঘুরছি এক
একটি সিনেমা হল

আপনাকে বলছি প্রিয়, আমরা বয়সে তরুণ, আবেগে কাঁচা। ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে হয়তো অজ্ঞ। তবে আমাদের কিছু বলার আছে। আমাদের কিছু দেখানোর আছে। আর আছে চলচ্চিত্রের শক্তিতে অগাধ বিশ্বাস। আপনি হয়তো জানতে চাইবেন, চলচ্চিত্র বলতে আমরা কী বুঝি? চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা কী?

hasnat kadir
গরল-অমৃত
ফিল্মমেকার । হাসনাত কাদীর

আপনি বলবেন, সিনেমা ইজ অ্যা বিগ ক্যানভাস। বিস্তৃত পর্দা। সুবিশাল থিয়েটার। নিড অ্যা বিগ বাজেট, স্টার, মার্কেটিং অ্যান্ড প্রমোশন। কোটি কোটি দর্শক, চাহিদা, যোগান। কোটি কোটি টাকার বাজার, ঝুঁকি, মুনাফা। চলচ্চিত্র একটি প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পমাধ্যম। একটি সিনেমা নির্মাণে শত শত মানুষের কায়িক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম থাকে। ফলে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের যে খরচ, তা আর কোনো শিল্পে প্রয়োজন হয় না। এই খরচের পরিমাণ শত বা হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা। ফলে সিনেমা নির্মাণের সময় আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে– সিনেমাটা আপনি কাদের জন্য বানাচ্ছেন? জানতে হবে তাদের রুচি ও চাহিদা কেমন? অর্থাৎ, কী ধরনের সিনেমা বানালে তারা আপনার সিনেমাটা পয়সা খরচ করে দেখবেন? কতজন দর্শক এটি দেখবেন? জানতে হবে আপনার সিনেমার বাজার কত বড়? এইবার এই মোতাবেক বাজেট ঠিক করেন। সেই মোতাবেক বানান প্রোডাকশন।

আপনি বলবেন, বানাবেন এমন সিনেমা যাতে ‘এই এই’ ব্যাপারগুলি থাকবে। গল্প বলবেন আপনিই। কিন্তু আপনার গল্প হবে ‘এই এই’ বিষয় নিয়ে। আপনার গল্পের স্ট্রাকচার হবে ঠিক ‘এই রকম’। বুঝতে পারছেন তো? এইবার ঠিক এই রেসিপিতে বানান একখানা সিনেমা। আপনার বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, নারী-পুরুষ তালি দেবে। ব্যবসা হবে। প্রডিউসার জুটে যাবে পরের সিনেমার। আপনি আবার অ্যাকশন বলবেন, বলবেন কাট।

বাট, সেটা আমার সিনেমা হবে না– উত্তরে এই আমার বলার থাকে। আমার আরও জানার থাকে, দর্শক কি এই রেসিপিতে বানানো সিনেমাই শুধু দেখতে চায়? আপনি হয়তো হাসবেন– এর বাইরে যা, তারে কি সিনেমা কয়? সিনেমার একটা ল্যাঙ্গুয়েজ আছে, জানেন মশায়?


চিৎকার
করে করা
বকাবাজি
যেমন ভাষা,
তেমনি কোনো
মূকের নিস্পলক
নিরবতারও আছে ভাষা

আমারও হাসার আছে– নিশ্চয়, নিশ্চয়! আমার ও আপনার সিনেমার ভাষা ভিন্ন নিশ্চয়। জানেন তো, ল্যাঙ্গুয়েজের কোনো ঘর-বাড়ি নাই। সে খালি হাঁটে আর দৌড়ায়। মিনিটে মিনিটে গায়ের চামড়া পাল্টায়। তারে তাই চেনা দায়। তারে তাই ধরা দায়। তাই আপনি যারে ভাষা বলেন, আমার কাছে তার উপযোগিতা নাও থাকতে পারে। আপনার মানার বাইরেও অনেক জানা ভাষা থাকতে পারে। ধরেন, কবিতার ভাষা আছে, ভাষা আছে গল্পের, উপন্যাসের। আবার প্রবন্ধের ভাষাও কিন্তু ভাষা। চিৎকার করে করা বকাবাজি যেমন ভাষা, তেমনি কোনো মূকের নিস্পলক নিরবতারও আছে ভাষা। তারা সুরে, ব্যঞ্জনায় ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু ভিন্ন ভিন্নভাবে তারা প্রত্যেকেই ভাষা। আপনি কাউকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে কাউকে বাতিল করতে পারেন না। কেননা, ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, স্থানে স্থানে পরিবর্তনশীল, জনে জনে পরিবর্তনশীল।

গরল-অমৃত

তাই সিনেমার ভাষা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নাই। ভাষার জন্য আমি সিনেমা সৃষ্টি করি না। সিনেমার জন্য আমার ভাষা সৃষ্টি হয়। আমার সিনেমার ভাষা আমার মতো, আপনার সিনেমার ভাষা আপনার মতো। ভাষার একক শব্দ। আমি বড়জোর বলতে পারি সিনেমা ভাষার একক সম্বন্ধে। আমি বড়জোর বলতে পারি, আমার সিনেমা ভাষার একক– চিত্র, আলো, রঙ, কম্পোজিশন, শট, সঙ্গীত, শব্দ, নৈঃশব্দ, অভিনয় বা অভিনয়-নয়… এইসব উপাদানের কথা। যাদের ঠোঁটে বাঁশি রেখে আমি ফুঁ দিয়ে জানাই আমার বক্তব্য। এমনভাবে জানাই যেন আপনি জানতে না পারেন আপনাকে কিছু বলছি আমি। আপনি যেন সবকিছু ভুলে আমার সিনেমার সাথে মিশে যান। আর সিনেমা শেষ করে আবিষ্কার করেন– মানুষ হিসেবে আপনি আরও একধাপ উপরে উঠে গেছেন।

আমি চাই আমার সৃষ্ট চলচ্চিত্র হোক এমন, যা আপনার অজান্তে আপনার হৃদয় প্রশস্ত করে দেবে। আপনার মানবিকতাকে আরও ধারালো করবে। এমন সিনেমা, যা আপনাকে প্রতিবাদী করে তুলবে। আপনাকে বলবে, ক্ষমার চেয়ে শান্তি কিছুতে নাই। ভালোবাসার চেয়ে মহান কিছু নাই। সততা ও ন্যায়ের অধিক কিছু নাই মর্যাদার। আমি চাই আমার সিনেমা মানুষকে আরও মানবিক করে তুলুক। ভালোবাসতে বলুক। আমার সিনেমা দেখে মানুষ মানুষের পাশে চলুক।

এই উদ্দেশ্যে আমি যে সিনেমা সৃষ্টি করতে চাই, তা আমার নিয়মে আমার মতো করে। কারও বেঁধে দেওয়া ফর্মূলাতে নয়।

আপনি বলবেন, এই সিনেমা তো চলবে না। 
–কেন চলবে না?
–হল পাবে না তো।


দর্শক
সিনেমার
কাছে আসার
সুযোগ না পেলে
সিনেমা চলে যাবে তার কাছে

আমি বলব, যেহেতু আপনার সংজ্ঞানুসারে আমার সিনেমা সিনেমার মধ্যে পড়ে না, সেহেতু আপনার হল না পেলে আমি অবাক হব না। কিন্তু আপনাকে বলা দরকার– সকল সিনেমারই দর্শক আছে। আমার সিনেমারও দর্শক আছে, বাজার আছে। আমার সিনেমার বাজার কাঁটাতারে বন্দী নাই। আমার দর্শক একটা নির্দিষ্ট সপ্তাহে সীমাবদ্ধ নাই। আর এই ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটের যুগে আমার সিনেমা শুধু সিনেমা হলের পর্দায় আটকে থাকবে না। ফলে দর্শক সিনেমার কাছে আসার সুযোগ না পেলে সিনেমা চলে যাবে তার কাছে। চলে যাবে তার পকেটে রাখা সিনেমা হলে। দর্শক দেখে নেবে তার সময়-সুযোগমতো।

গরল-অমৃত

আমরা, তরুণেরা যেহেতু এই বিশ্বাস রাখি, সেহেতু আপনি আমাদের থেকে পাবেন হরেক রঙের, হরেক ঢঙের চলচ্চিত্র। হরেক তার ভাব, ভাষা, মাধুর্য। হরেক দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার… হরেক সিনেমা। আমরা সকলেই সেইসব সিনেমার সকল ধারায় বিশ্বাসী নই বটে। কিন্তু মেনে নিই। স্বীকার করে নিই। এইখানেই আপনার সাথে আমাদের পার্থক্য। সিনেমার যে সংজ্ঞা আমাকে আপনি মানাতে চান, সেটা আপনার সিনেমা। আমি সেই সিনেমায় বিশ্বাস নাও করতে পারি। তবে আপনার সিনেমাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু আমার সিনেমাকে আপনি অস্বীকার করেন। কেন করেন?

আপনি আমার সিনেমাকে বলেন– তৃতীয় সিনেমা, দ্বিতীয় সিনেমা, বিকল্প সিনেমা। কিন্তু আমি আপনাকে বলি, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা বিকল্প– যে নামেই ডাকুন, শেষ বিচারে তা সিনেমাই। যখন এই তথাকথিত বিকল্প সিনেমার সংখ্যা বেড়ে যাবে, দর্শকের সংখ্যা বেড়ে যাবে, তখন আমরাই হয়ে উঠব তখাকথিত মূলধারা। তখন কি নিজেকে ‘বিকল্প’ বলে ডাকবেন আপনি? আমি বলি, তার প্রয়োজন নাই। কেননা, আপনাকে আমরা আমাদেরই একজন বলে জানি। আমরা সাতটি রঙে একটি রঙধনু– এই কথা আমি মানি।


স্বাধীনতা আসে তখন,
যখন
আমরা
যন্ত্র

অর্থের
দাসত্ব থেকে মুক্ত হই

এতক্ষণে আপনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন, সিনেমা্র বাউন্ডারিলেস মার্কেটে আমরা বিশ্বাসী। নির্মাতার নিজস্ব কণ্ঠ, সুর ও ভাষায় আমরা বিশ্বাসী। সিনেমার ছোট ছোট পকেট পর্দা এবং ক্যামেরাতেও আমরা বিশ্বাসী। আমাদের কিছু বলার আছে, আমাদের অনেক কিছু দেখানোর আছে। সেই কাজে চলচ্চিত্রের শক্তিতে আছে অগাধ বিশ্বাস। আমরা বিশ্বাসী সিনেমা ও সিনেমা স্রষ্টার স্বাধীনতায়। আর এই স্বাধীনতা আসে তখন, যখন আমরা যন্ত্র ও অর্থের দাসত্ব থেকে মুক্ত হই।

এখন যন্ত্র ও অর্থের দাসত্ব থেকে মুক্ত চলচ্চিত্রকারের সংখ্যা এই বাংলায় চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে প্রবল বুদবুদ চলছে। চলছে দেখা-শোনা-পড়া, চর্চা। যুক্তি-তর্ক-গল্প, প্রবল বিতর্ক। ফলে অচিরেই এমন একদল চলচ্চিত্রকারের দেখা এ-পৃথিবী পাবে, যারা বিশ্বচলচ্চিত্রাঙ্গনে স্বমহিমায় আসন গড়ে দেবে বাংলা চলচ্চিত্রকে।

গরল-অমৃত

আপনি এবার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করতে পারেন, অর্থ ও যন্ত্রের দাসত্বমুক্ত চলচ্চিত্র কেন কলকে পাবে তুমুল পুঁজিবাদী পৃথিবীতে? পৃথিবীর নানা প্রান্তের দর্শক কেন আগ্রহী হবে এই ময়লা চামড়ার দরিদ্র বেশের সিনেমা দেখতে? কী তার শক্তি?

আমি হেসে উত্তর দিতে পারি, চলচ্চিত্রের শক্তি তার বিষয়ে, বক্তব্যে, দর্শনে ও প্রয়োজনীয়তায়। আমরা কতিপয় চলচ্চিত্রস্রষ্টা সেই প্রয়োজনীয় কথামালা নিয়ে বিশ্ব দরবারে হাজির হতে চাই। আমাদের সিনেমার বিষয়, বক্তব্য, দর্শন একান্তই আমাদের। এই বাংলার জল-হাওয়া-রৌদ্রের। আর তাকে আমরা পর্দায় আনি একান্ত নিজস্ব ঢঙে আর রঙে। ফলে আমাদের সিনেমা একান্তই আমাদের। আর একান্ত আমাদের সিনেমাটা আমরা বানালে, তা শুধুই আমাদের থাকে না। হয়ে ওঠে সার্বজনীন ও বৈশ্বিক সিনেমা। বিশ্বদর্শক এই সিনেমার জন্য বসে আছেন অধীর হয়ে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক, ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ ।। শর্টফিল্ম : গরল অমৃত

মন্তব্য লিখুন