আমার ভুবন, আমার মৃণাল/ নন্দিতা দাস

1
184
mrinal sen nandita das

লিখেছেন । নন্দিতা দাস

মৃণাল সেনের সর্বশেষ সিনেমা আমার ভুবন-এ অভিনয় করেছেন নন্দিতা দাসআমার ভুবন : মৃণাল সেন-এর ছবি– ছবি ঘিরে নানা কথা গ্রন্থে আমার ভুবন : আমার অনুভূতি শিরোনামে একটি স্মৃতিকথা আছে তার। অন্যদিকে স্ক্রল ডট ইন নিউজপোর্টালে ৩ জানুয়ারি ২০১৮ প্রকাশ পেয়েছে তার ট্রিবিউট– My friend, philosopher and guide, in a way few have been। সেটির অনুবাদ-সহ দুটি লেখা পরপর জুড়ে দেওয়া হলো এখানে…





আমার ভুবন : আমার অনুভূতি

আমার ভুবন : মৃণাল সেন-এর ছবি : ছবি ঘিরে নানা কথা
সম্পাদনা । বিশ্ব রায়
প্রথম প্রকাশ । জানুয়ারি ২০০৪
প্রকাশক । দে’জ পাবলিশিং; কলকাতা, ভারত
প্রচ্ছদ । সুভাষ নন্দী
পৃষ্ঠা । ২৮৮
মূল্য । ২৫০ রুপি

কেরালা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। ফায়ার-এর [দীপা মেহতা; ১৯৯৬] স্ক্রিনিং ছিল। গিয়ে খবর পেলাম মৃণাল সেন এসেছেন। সেখানেই প্রথম আলাপ। আগে যে একেবারে চিনতাম না– তা নয়। একদিন প্রতিদিন, একদিন আচানক, ভুবন সোম কী খণ্ডহর-এর মতো ছবি দেখতে দেখতে একটু একটু করে মৃণাল সেনকে চিনছিলাম। অন্যদিকে, বাবার সঙ্গে ওনার যেহেতু পরিচয়টা ছিল, সেই সূত্রে শিল্পী যতীন দাসের মেয়ে হিসেবে ওনাকে দেখলে দূর থেকে নমস্কার-নমস্কার করেই কেটেছে বেশ কিছু সময়। এইভাবে চলতে চলতে একটা অভিমান বাসা বাঁধছিল আমার মধ্যে। একদিন কথার ফাঁকে বলেই ফেললাম– ‘এতগুলো বছর হয়ে গেল আপনি ছবি করছেন না।’ ভরসা দিয়ে বললেন– ‘আমি ছবি করব, তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই আমি ছবি করব। তবে একটা শর্ত আছে, এর মধ্যে চুল ছোটো করা চলবে না, ভ্রু প্লাক তো নয়ই।’ সুতরাং গুরু আজ্ঞা শিরধার্য। কিন্তু চুলটা যখন একটা সিনেমার জন্য গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে হলো, মজা করে বললাম– ‘মৃণালদা, আপনি তো ছবি করলেন না, দেখুন আমি দুঃখে একেবারে ন্যাড়া হয়ে গেছি।’

এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন ফোন করলেন– ‘আমি ছবি করব, তুমি কি করতে চাও?’ আমি বললাম– ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে গল্পটা শুনতে বিশেষ আগ্রহী।’ ফোনেই কথা চলতে লাগল। ই-মেল পাঠালেন। তা পড়ে কতগুলো ব্যাপারে পরিষ্কার হলাম। একবার ভুবনেশ্বরে যাবার পথে কলকাতায় নেমেই পড়লাম। উনি পুরো স্ক্রিপ্টটা পড়ে শোনালেন। আমি মুগ্ধ। আমার ভালো লাগা-জিজ্ঞাসা সব মিলিয়ে আমার প্রতিক্রিয়াটা জানালাম। প্রত্যুত্তরে বিস্মিত ছাড়া আর কিছুই হইনি।

আমার ভুবন
ফিল্মমেকার । মৃণাল সেন

প্রথম যখন উনি এই গল্পটা নিয়ে ছবি করার কথা ভাবছিলেন, প্রযোজকের একটু দোটানা ছিল। বাজেট নিয়ে প্রথমে একটা সমস্যা থাকলেও ওঁদের বক্তব্য অন্য জায়গায়। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১, আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ঘটনায় ওঁরা একটু ভীতও বটে। কেননা, মুসলমান সমাজের গ্রাম্য পরিবেশের গল্প এই সময় মানুষ যদি না নেয়। কথাটা শুনে আমার একটু রাগ যে হলো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি বললাম– ‘আপনি এত ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তমনের মানুষ, আপনার ছবি নিয়ে এই রকম ভাববার কোনও মানেই হয় না। তাছাড়া, এই গল্পে সম্প্রদায় নিয়ে কোনও কথা নেই, এটা একটা সম্পর্ক নিয়ে গল্প। একটা ভালোবাসার গল্প। এটা যেকোনও জায়গার গল্প হতে পারে। এটা একটা ইউনিভার্সাল স্টোরি। যে কারণটা ওঁরা বলছে, এটা কোনও কারণই নয়। আমাদের সমাজে যে কত রকমের ধর্ম আছে, সম্প্রদায় আছে, শ্রেণী আছে– আর সেটা নিয়ে যদি কেউ কখনো-বা ছবি করেন, অসুবিধাটা কোথায়? আপনি প্রযোজকের কথায় ছবিটা বন্ধ করবেন না। দরকার হলে অন্য প্রযোজক নিন। কম টাকার প্রযোজক। কম টাকায় আমরা সবাই করব।’ তো যাই হোক, অবশেষে ছবিটা হলো।

আমি এখনও পর্যন্ত কমার্শিয়াল ছবিতে সেভাবে নিজেকে জড়াইনি। যে ধরনের ছবিতে, ছোটো ছবিতে, অভিনয় করতে ভালোবাসি, তাতে একটা প্রত্যয় জন্মে বা ভালো গল্পে মোহিত হওয়া যায়। যদিও বাজেট নিয়ে, টাইম-সিডিউল নিয়ে প্রতিনিয়ত একটা চাপ থাকে। কিন্তু এ ছবির ক্ষেত্রে এসব কিছুর আঁচ লাগেনি। অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্নরকম– যা নিয়ে গল্পটা বলা যেতেই পারে।

খাওয়া-দাওয়ার
সময় টেকনিশিয়ান
স্টুডিয়োতেও লক্ষ করেছি
কেউ যদি ওনাকে একটু বেশি
দিয়ে দিত, আলাদা বাটিতে
দিয়ে দিত উনি
গিলটি ফিল
করতেন

টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো ছাড়া সিরাজপুর, তালপুকুর আর টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে কুঁদঘাট অঞ্চলে আমরা শুটিং করেছিলাম। আমার প্রথম শুটিং সিডিউলটা ছিল টাকীর কাছে। ওই জায়গাটার একটা মজা হলো রোজ চারটের মধ্যে অন্ধকার নেমে আসে। ফলে প্যাকআপও তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। তারপর আর কী, অবসর আর অবসর। ইছামতী নদীতে বোট ড্রাইভ করতে যেতাম, পাড়ে হাঁটতে যেতাম। যে গেস্ট হাউসটায় ছিলাম, সেখানে খাওয়াটাও মনে রাখার মতো। বড়ো বড়ো মাছ ছিল। আমরা সবাই মিলে রোজ মেনু ঠিক করতাম। আমরা মানে আমি, ক্যামেরাম্যান, দুজন মেন অ্যাকটর– যারা সবাই ইয়ং। অথচ মৃণালদা কত সহজেই অ্যাকটিভলি পার্টিসিপেট করতেন। কী খাবেন ডিসকাস করতেন। একটা ব্যাপার খাওয়া-দাওয়ার সময় টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতেও লক্ষ করেছি কেউ যদি ওনাকে একটু বেশি দিয়ে দিত, আলাদা বাটিতে দিয়ে দিত উনি গিলটি ফিল করতেন। বলতেন– ‘এই, আমাকে কেন একা দিচ্ছ, সবাইকে দাও।’ এই একই কোয়ালিটিতে থাকার প্রবণতার কারণেই কখনো ভাবতেই পারিনি উনি আমার থেকে মোর দ্যান ডবল এজ : সেভেনটি প্লাস। শুটিং অবসরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল আড্ডা। বেশিরভাগ সময় মৃণালদা বলতেন, আমরা শুনতাম। উনি বলতে খুব ভালোবাসেন। ওনার জীবনের এত অভিজ্ঞতা যে ওনার মাধ্যমে একটা বিশাল জগৎকে দেখার সুযোগ ঘটে যায়। বড়ো ফিল্ম ডিরেক্টরদের সঙ্গে দেখা করা, এই সময়ের কিছু ডিরেক্টরদের নিয়ে গল্প, ওনার সঙ্গে ওনার ছেলের সম্পর্ক… আরও কত কী!

মৃণাল সেন নন্দিতা দাস
‘আমার ভুবন’-এর শুটিংয়ে

যেকোনও সম্পর্ক টিকে থাকে উভয় পক্ষের বোঝাপড়ার মধ্যে। মৃণালদা আমার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করলেন, তা দেখে মানুষটার সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা করা যায় না। ওনার ইউনিট মেম্বারদের সঙ্গে ব্যবহার, বউদির সঙ্গে মানে ওনার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যবহার, ছেলের সঙ্গে ব্যবহার– এইসব সম্পর্কগুলো দেখে পরিষ্কার চিত্রটা ধরা পড়ে।

মৃণালদার ছেলে কুনালদার সঙ্গে আমার শিকাগোতে আলাপ হয়েছিল। উনিও খুব ভালো মানুষ। মৃণালদা বোধহয় কখনো নিজের ছেলেকে মারেননি। ওনার ছেলে ওনাকে কেন বন্ধু ডাকেন, ওঁদের সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্প বললে নিশ্চয়ই তা বোঝা যাবে। বহুদিন আগের কথা। ওনার ছেলে তখন খুবই ছোটো। সবার মা-বাবা একটু কিছু হলে বলে ‘একটা মারব’, কী গালিগালাজ করে। মৃণালদা, ছেলে কথা না শুনলে ধমকের বদলে একটা ফন্দি আঁটলেন। একবার দুর্গোপুজো না লক্ষ্মীপুজো কী একটা হচ্ছে তো ছেলে কথা শুনছে না দেখে বললেন– ‘তুই যদি না আসিস, আমি স্টেজে গিয়ে নাচব।’ ছেলে শুনে– ‘এ বাবা! তাহলে সবাই বলবে তোর বাবা পাগল, ছিঃ ছিঃ।’ ‘হ্যাঁ, আমি স্টেজে গিয়ে নাচব।’ এভাবেই বাগে আনতেন।

মৃণাল সেননন্দিতা দাস
‘আমার ভুবন’-এর সেটে

নিজেকে হাসির বিষয় করে তোলা– সেটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এখন ইগো রোগে বড্ড বেশি মানুষ ভোগে। মৃণালদা নিজেকে নিয়ে যখন জোকস করেন, অবাক হতে হয়। এ বিষয়ে দুটো গল্প বলি। একবার বিখ্যাত আর্টিস্ট খালেদ চৌধুরী হঠাৎই ওনার চারদিকে ঘুরতে শুরু করলেন। বললেন– ‘আহা কী চেহারা! দেবে তোমার মাথাটা?’ মৃণালদা বললেন– ‘মাথাটা দেবো মানে?’ ‘আমি একটা স্কাল্পচার বানাব। ক্রিমিনাল [কী মৃণাল] মাথা!’ আরেকবার, এটাও অনেকদিন আগের কথা। মৃণালদাদের তখন যৌবন। ওনার বন্ধু ছিলেন [এখনও আছেন] ঋষিকেশ মুখার্জি। মৃণালদা প্রায়ই ঋষিদার বাড়ি যান। আর গেলেই, ঋষিদার বাচ্চা মেয়ের যত আবদার মৃণালদার কাছে। তো একদিন মৃণালদার কোলে উঠে ‘মৃণাল কাকু, মৃণাল কাকু’ করে দুষ্টুমি চালিয়ে যাচ্ছে। জ্বালাতন করতে দেখে ঋষিদা বললেন– ‘এই, কাকুকে ছেড়ে দে, একদম মাথায় চড়ে বসেছে।’ মৃণালদা বললেন– ‘না, না, ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ মেয়েটাও ছাড়ে না, ‘না, না, মৃণাল কাকুকে আমি খুব ভালোবাসি।’ এ-কথা সে-কথা বলার পর হঠাৎই বলে– ‘মৃণাল কাকু তোমার মুখটা বাঁদরের মতো কেন?’ গল্পগুলো বলার পর মৃণালদা বলছেন– ‘আমার কী ভাগ্য দেখ। একজন বলছে বাঁদরের মতো, একজন বলছে ক্রিমিনাল।’ শুধু অবসর সময়েই নয়, শট নেওয়ার মধ্যেও উনি গল্প বলেন। সেটা কখনোই বিচ্ছিন্ন কথাবার্তা মনে হয় না। মনে হয় একটা বিরাট জীবনকে আলাদা আলাদাভাবে দেখা।

মৃণালদা
তো আমায়
দেখে অবাক।
বলেন– ‘তোমার
বয়স কত?’ আমি
বলি– ‘বারো থেকে ষাট।
মানে যতটা আপনি ধরবেন।
সিচুয়েশন অনুযায়ী সেটা চেঞ্জ হয়ে যায়।’

আমিও আমার জীবন ও আমার কাজকে প্রথম থেকেই আলাদা কখনোই ভাবিনি। এই ফিল্মটা শেষ, এই জীবন শুরু– সেরকম কখনোই হয়নি। সাধারণত যে ছবিগুলো করেছি, সেগুলো জীবনের সঙ্গে কোথাও না কোথাও খুব বেশি জুড়ে গেছে। ওই ছবি নিয়ে প্রশ্ন, ওই ছবি নিয়ে ভাবা, ওই ছবি নিয়ে কথা, ওই ছবিটা আমায় কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছে বা আমাকে স্পর্শকাতর বানিয়েছে। সেটা একটা চলতি প্রক্রিয়ার মতো। আমার যেটা আছে তা চরিত্রকে দেয়া, আর চরিত্রও আমায় দেয়। আমি অনেক বাসার ছবিতে কাজ করেছি। কানাড়া ছবি– দেভিড়ি, তামিল ছবি– আলাগি, মালায়ালম– পুনরাবিবাসম, কান্নেগিতে করেছি। বাভান্ডার-এ একজন রাজস্থানী মহিলার চরিত্র– যে মাথার উপর অনেকগুলো জলের ঘড়া নিয়ে যায়, এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে। আর আমার ভুবন-এ সখিনার চরিত্রে যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে, তা হলো তার সরলতা। যেটা শহরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়; একেবারে গ্রামীণ মেয়ের সরলতা। জীবনে অনেক কিছু করে, অনেক কিছু দেখে, অনেক কিছু শুনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিশুসুলভ মানসিকতা, সরলতা হারাতে থাকে। আমরা যারা শহরে বড়ো হয়েছি তাদের জীবনটা একটু জটিল হয়ে গেছে। তার মধ্যে আমি চেষ্টা করি সরলতাকে ধরে রাখার। এই বৈশিষ্ট্য যেন নব্বই বছর বয়সেও হারিয়ে না যায়। মহানতার অনুভূতি, অনুসন্ধান অনুভূতি, সরলতার অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারলে জীবনটা সত্যিই সুন্দর। সখিনাও খুব সিরিয়াস কথা বলে। ওর ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া-পাওয়া আছে, ওর হাসিতে একটা মিষ্টি ব্যাপার আছে, ক্ষ্যাপামোও আছে অথচ কত সহজ-সরল, শিশুর মতো পবিত্র– আমি এটা অনুভব করেছি। আর অভিনেত্রী হিসেবে সেই নির্যাসটা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলেই ফেলি, আমারও নাকি ছেলেমানুষি ভাবটা আছে। আমার বন্ধুরা তা নিয়ে খুব মজা করে। মৃণালদা তো আমায় দেখে অবাক। বলেন– ‘তোমার বয়স কত?’ আমি বলি– ‘বারো থেকে ষাট। মানে যতটা আপনি ধরবেন। সিচুয়েশন অনুযায়ী সেটা চেঞ্জ হয়ে যায়।’

সখিনা চরিত্রে নন্দিতা দাস

তো, যাই হোক। তালপুকুরই আমার বেশি মনে আছে, ওখানে বেশিরভাগ শুটিংটা হয়েছিল দেখে। কাকতালীয় মিল হলো, যে বাড়িতে আমাদের শুটিং হয়েছিল সেই বাড়ির মহিলার নামও সখিনা। সাধারণত ছোটো জায়গায় পুরো ইউনিটটা আরও বেশি ক্লোজ হয়ে যায়। ওখানে অন্য কোনও পিছুটান নেই। আর জায়গাটাও খুব শান্তিপূর্ণ। সব মিলিয়ে সত্যি মনে রাখার মতো। আর তালপুকুরের লোকজনও খুব ভালো। ওদের ভুলতে পারি না। একবার ওদের জন্য মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম। যেদিন আমার ফেরার কথা আমায় বলছে– ‘আবার আসবে, আবার আসবে’। যেন আমি অভিনেত্রী নন্দিতা নই, ওদের গাঁয়ের মেয়ে। দু’তিনজন মহিলা তো কেঁদেই ফেলেছে। একজন বলেছে– ‘তোমার ওপর মায়া পড়ে গেছে।’ এ ছবির দরুন আমার এসব পাওয়া। অনেক ঘটনা হয়তো পরবর্তী সময়ে ভুলে যাব, কিন্তু এই সম্পর্কগুলো কি সহজে ভোলার?

মৃণালদার সঙ্গে কাজের মজা হলো, ওনার কোনও টেনশন নেই, কাজের তাড়া নেই। এর আগে মণিরত্নমের সঙ্গে একটা ছবিতে কাজ করলাম। ওনার কাজের ভঙ্গিটা একেবারে আলাদা। উনি ঘড়ি ধরে কাজ করেন। মণিরত্নমের ক্যামেরা এই শুটিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। তো ক্যামেরা অ্যাটেনডেন্টরা আমার সঙ্গে ওখানেও কাজ করেছে। ওরা ভাবছে এখানে কী মজা, পিকনিকের মতো ব্যাপার। মানে এতই আলাদা স্টাইল অফ ওয়ার্কিং। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যেমন স্বাধীনতা দেন, তেমন অদ্ভুত সুন্দর একটা নিয়ন্ত্রণ আছে ওনার কাজে। সম্পূর্ণ অভিনয়টা হয়তো দেখাচ্ছেন না, কিন্তু এ রকম করলে কী রকম হবে, না এটা একটু কম করে দাও, এটা একটু বাড়িয়ে দাও– এইভাবে অভিনেত্রীকে পথটা দেখান। এই ধরনটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় বটে। তবে এই ভারসাম্যটা মৃণালদা কীভাবে বজায় রাখেন সেটাই আশ্চর্যের।

আমি কত পরিচালককে দেখেছি এত স্বাধীনতা দেন, নিজে কিছুই বলেন না, যার ফলে অভিনেত্রীর অনুভূতিতে কোনও নাড়া দেয় না। আবার অনেক পরিচালক আছেন, সব সময় কিছু না কিছু একটা বলতে থাকবেন, যাতে অভিনেত্রীর স্বাচ্ছন্দ্যটা হারিয়ে যায়। আর একটা ব্যাপার, সময় বা অর্থের কথা ভেবে মৃণালদাকে কখনও আপস করতে দেখিনি। ছবিতে একটা সিন আছে, কৌশিক আমায় কোলে তুলবে। পুরো সিনটা টেক করা হয়ে গেল। উনি ভাবলেন, না, ওই যে তুলেছে, সোজা না তুলে যদি আনুভূমিক তোলে– বেশি ভালো লাগবে। আমি বললাম– ‘আরে, আমরা তো পুরোটা করলাম, তখন লাগল না।’ ‘না, আমি ভাবলাম ওইভাবে তুললে তোমরা যেমন দুজন দুজনকে ভালোভাবে চোখাচুখি দেখতে পারবে, আমরাও একটা পরিষ্কার ছবি পাব। আর কেমিস্ট্রিটাও এই দৃশ্যে সঠিক হবে।’ আবার টেক করলেন।

আমি মাঝে মাঝে স্বতস্ফুর্তভাবে
মতামত দিয়ে দেখেছি,
উনি খুব মুক্তমনে
তা শোনেন

মৃণালদা খুবই কল্পনাপ্রবণ, যেটা ওনার স্ক্রিপ্টকে সমৃদ্ধ করে; আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেক কিছু গ্রহণও করেন, বর্জনও করেন। আদিবাসীরা গ্রামে, উঁচু-নিচু জমিতে হাঁটার সময় হাতে একটা লাঠি ব্যবহার করে– এটা মৃণালদা দেখেছিলেন। এটা আমার চরিত্রে এসেছে। তবে উনি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো খুব দরদ দিয়ে বোঝেন। কোথাও যদি শিল্পী অসুবিধা অনুভব করেন বা তাঁকে সাবলীল না লাগে, উনি ভেবেচিন্তে কিছু একটা করেন। নিজের স্ক্রিপ্টের পরিবর্তনও ঘটাতে পারেন। ছবিতে একটা বাচ্চা আছে। কিন্তু যে বাচ্চাটাকে আনা হয়েছে সে খুব কাঁদে। তো উনি বললেন– ‘এক জায়গায় ডায়লগ ঢুকিয়ে দাও– কী ছিঁচকাঁদুনে হয়েছে!’ আবার ওই বাচ্চাটার জন্য কতগুলো দৃশ্য-বদল হয়েছে, কতগুলোতে ওকে বাদ দিয়ে করেছেন। আমি মাঝে মাঝে স্বতস্ফুর্তভাবে মতামত দিয়ে দেখেছি, উনি খুব মুক্তমনে তা শোনেন। শুধু অভিনয় নয়, পরিচালনা সংক্রান্তও। ক্যামেরার পজিশন, অ্যাঙ্গেল। উনি যদি পছন্দ না করতেন, ক্লিয়ারলি বলে দিতেন– কোন কারণে চাইছেন না। খুব ইনভল্বড্ হয়ে কাজটা করেন। খুব ভালোবাসা নিয়ে।

সখিনা ও শিশু
ফিল্ম । আমার ভুবন

মৃণালদা এমনি সময় গল্প করেন, কিন্তু যখন সিন টেক চলছে, সিনের মুডটা ওনার মুখেও ফুটে ওঠে। যাঁরা শুটিংস্পটে থেকেছেন, লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই। হাসির সিনে ওনার মুখে একটা হাসি থাকছে। একটা সিরিয়াস সিনে নরমালি কাজ করছেন; কিন্তু একটা ইন-টেন্সড মুখ নিয়ে ঘুরবেন। আমি মজা করে বলতাম– ‘মৃণালদা, সিনটা শেষ হয়ে গেছে। আপনি হাসতে পারেন।’ কেউ কখনো পুরো গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে চললেও মৃণালদা তার সঙ্গে মজা করেন। তাকে চটান। আমাকে বকা যেটা বলে, তা করেননি। তবে জোরে কথা বললেও পরক্ষণেই বলেছেন– ‘এই আমি তোমাকে বললাম, তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?’ আমারও কোনও কিছু খারাপ লাগলে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছি। এটা দুদিক থেকে হয়েছে।

আমায় নিয়ে কাজ করার আগে মৃণালদার একটা ভয় ছিল যে, আমি বড়ো হয়েছি দিল্লিতে। গ্রামের মেয়েদের যে নিজস্বতা আছে, গ্রামের বাড়ির যেসব কাজ থাকে, যেমন– গোবর দিয়ে ঘর মোছা বা রান্নাঘরের কাজ, বাচ্চা নিয়ে, কী চুল ঝাড়া– সেগুলো ঠিকঠাক করতে পারব কি না। যদিও করতে তেমন অসুবিধা হয়নি। আমি আমার সোসাল ওয়ার্কারদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে কাজ করেছি। আমার মা বোম্বেতে থাকলেও বাবার বাড়ি ওড়িশার বারিপদায়। সেখানে ছেলেবেলায় স্কুলের গরমের ছুটিতে থেকেছি। যদিও বারিপদা গ্রাম নয়, মফস্বল বলা যায়। যেসব মানুষজন থাকে, তাদের মধ্যে একটা গ্রাম্যভাব আছে। এছাড়া কিছু ছোটো ছোটো জায়গায় ঘুরতে গিয়ে, মানে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে– সব মিলিয়ে চরিত্রটা গড়ে তুলেছি। আর যে গ্রামে শুটিং করেছিলাম ওখানে কীভাবে শাড়িটা পরে তা দেখে, যে বাড়িতে শুটিং করেছিলাম ওই বাড়ির ভদ্রমহিলার থেকে প্রথমদিন পরাটা শিখে নিয়েছি। পরদিন থেকে নিজেই পরেছি। রোজ রোজ তো বলা যায় না– শাড়িটা পরিয়ে দাও। তাছাড়া শিখলে নিজের প্রতি আস্থা বেড়ে যায়। জামা-কাপড়ের সঙ্গে একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধও জন্মে। ঘর মোছার সময় জিজ্ঞাসা করতাম, কাপড়টা বড়ো রাখব না ছোটো। পা-টা রেখে দেখাতাম ঠিক আছে কিনা। কিছু না জানলে দেখে দেখে শিখলে দোষটা কোথায়?

নন্দিতা ও সহশিল্পীকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন মৃণাল সেন

ভাষা নিয়ে আমি একটু সতর্ক ছিলাম। এমনি সংলাপ বলতে পারি, মুখস্থ করতে পারি। কিন্তু কতগুলো জায়গায় লিখিত সংলাপ নেই, মানে নিজে বানিয়ে ঠোঁটের সঙ্গে মেলাতে হয়। কোথায় ‘কখন’, কোথায় ‘কবে’ বলব! এই রকম অসুবিধা। ডাবিং থাকাতে সেটা উতরে দেওয়া গেছে। ডাবিংয়ে একদিন আমি বাঙালি নই বলে সবাই মিলে আমাকে শেখাতে শুরু করেছে– ‘এটা ছ’, ‘এটা এ রকম’, ‘ওটা ও রকম’– চারজন একসঙ্গে বলছে। তাতে আমি একটু বিরক্ত। কিন্তু মৃণালদার চোখে সেটা ফাঁকি দিতে পারিনি। বললেন– ‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি তুমি অ্যানয়েড হয়ে গেছ। একটু ক্ষেপে আছ।’ সে কথায় আমি একটু লজ্জিত হয়ে বললাম– ‘না, না, আপনারা সবাই কাজটা যেন ভালো হয় সেজন্যই তো করছেন।’

এই ডাবিং করার সময় দর্শক হিসেবে সিনগুলো আবার দেখেছি। যদিও আমার সঙ্গে ছবির পর্দার নন্দিতা এত ক্লোজ। অন্য দর্শক যখন আমার অভিনয়ে পাঁচটা দোষ খুঁজে পাবেন, বাকি পাঁচজন আরও পাঁচটা, তখন আমি দশটা দোষ খুঁজে পাব। যতবার দেখেছি ততবার মনে হয়েছে, আরে, এটা কেন করলাম, এটা কেন করিনি। কতগুলো অভিব্যক্তি, কতগুলো চলাফেরা, কতগুলো জায়গায় হাতটা মাথায় দিয়েছি– একটু শহুরে হয়ে গেছে। সেটা বোধহয় ভালোও লাগবে। দর্শকরা দেখে আরও ভালো বুঝবেন। জানি এটা সব ছবির ক্ষেত্রেই ঘটে, আর এটা করতে করতে যেকোনও শিল্পী নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। আমার তো সবে শুরু। ভালো অভিনেত্রী বলে দাবীও করি না। কিন্তু দেখা গেছে শ-দুশো ছবির পরও মানুষ ভুল করে।

কায়রো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল
‘আমার ভুবন’-এর জন্য ‘বেস্ট অ্যাকট্রেস’ অ্যাওয়ার্ড হাতে নন্দিতা; পাশে মৃণাল

কিন্তু যে ভালোবাসা নিয়ে সবাই কাজ করেছেন, তার ছাপ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে ছবিতে। যেহেতু এখনও পুরোটা কেউ দেখে উঠতে পারিনি, তাই এই মুহূর্তে ভবিষ্যৎবাণী করা ঠিক নয়। তবে ছবিটায় সেভাবে কোনও গল্প না থাকলেও এতে একটা দ্বন্দ্ব আছে। দ্বন্দ্বের একটা পরিণামও আছে– তা বলতে পারি। একটা সম্পর্ক, কতগুলো মুহূর্তকে একজায়গায় বাঁধা হয়েছে ছবিতে। ফুলগুলো এক সুঁতোয় যেমন গাঁথা থাকে।

যাই হোক, শেষ কথা তো বলবেন দর্শক। মৃণালদার ছবি নিয়ে সকলের মধ্যে একটা অন্য অনুভূতি থাকে, তা জানি। সব ছবিতে মজে যাওয়ার ব্যাপার নাও থাকতে পারে। কিন্তু ছবিটা দেখে একটা অন্যরকম, সৎ অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফেরাটাই বড়ো কথা। বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা থেকে ছোটো মুখে একটা বড়ো কথা বলেই ফেলি– বড়ো পরিচালক হয়তো অনেকেই আছেন, কিন্তু বড়ো মনের মানুষ হওয়া প্রয়োজন। বড়ো মনের মানুষের ছাপ তাঁর ছবিতে পড়তে বাধ্য। এ ছবি নিশ্চয়ই আমায় তাই শিখিয়েছে।





নন্দিতার ছেলে, নন্দিতা, মৃণাল
কলকাতা, ১১ নভেম্বর ২০১৮

আমার বন্ধু, দার্শনিক, পথপ্রদর্শক

ভয় ছিল, মৃণালদার জন্য আমাকে একদিন শোকগাথা লিখতে হতে পারে। গত নভেম্বরে যখন তার একেবারেই ভেঙে পড়া চেহারা দেখলাম, বুঝে ফেলেছিলাম, এই প্রাণবন্ত মায়েস্ত্রো আমাদের শিগগিরই ছেড়ে যাবেন। কিন্তু এমন একটা দিন আসছেই– জানার পরও, সেই দিনটির জন্য আপনি নিজেকে কখনোই প্রস্তুত করতে পারবেন না। ‘প্রতিক্রিয়া’ জানার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা এক সাংবাদিকের কাছ থেকে খবরটি প্রথম যখন শুনলাম, আমার জন্য তা এক ধাক্কা হয়ে এলো। কী করে কারও পক্ষে বিশ বছরের কোনো সম্পর্ককে এক কথায় বলে দেওয়া সম্ভব, যেখানে খবরটি এখনো সামলে উঠতেই পারছি না? এ রকম একটি মুহূর্তে অনধিকারপ্রবেশের জন্য একজন সাংবাদিক যখন বারবার মার্জনা চাইতে থাকলেন, দিনটি রোববার হলেও ‘ব্রেকিং নিউজ’ দেওয়ার জন্য এটি নিয়ে তাকে কাজ করতে হয়েছিল বলে তাতে নালিশও ছিল তার! ঘনিষ্ঠ কারও মৃত্যু যখন ‘নিউ সার্কেলে’র অংশ হয়ে ওঠে, তখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন আমাদের বেঁচে থাকার ধরনটি কী রকম বিচ্ছিন্নতাবোধক হয়ে উঠেছে।

তার স্বাস্থ্য
একেবারেই ভেঙে
পড়েছিল, তবু যতক্ষণ
একসঙ্গে ছিলাম, পুরোটা
সময় আমার হাত
শক্ত করে ধরে
রেখেছিলেন
তিনি

মৃণালদার সঙ্গে দেখা না করলে আমার কোনো কলকাতা ট্রিপই পরিপূর্ণ হতো না। সেই প্রত্যেকটি ট্রিপ আমার জন্য ছিল আনন্দের; আর ট্রিপের সংখ্যাও ছিল অনেক। তার সঙ্গে আমি শেষ দেখা করি ১১ নভেম্বর ২০১৮, সঙ্গে ছিল আমার ছেলে, আমি তখন কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলাম। তার স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙে পড়েছিল, তবু যতক্ষণ একসঙ্গে ছিলাম, পুরোটা সময় আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন তিনি। এক সুদীর্ঘ উষ্ণ নীরবতা বিরাজ করছিল তখন, তিনি আমাদের সঙ্গে সামান্য কিছু কথা বলে মাঝে মধ্যে সেটি ভেঙে দিচ্ছিলেন। আমার মান্টো সিনেমাটির কথা, আমার ছেলের স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন তিনি; আর এমনকি বিদ্রূপের সঙ্গে বিলাপ করে বলছিলেন, ফেস্টিভ্যালটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে নিমন্ত্রণ না জানানোর কথা। যখন জানতে পারলেন, ফেস্টিভ্যালটিতে তাকে যেতে হবে না, সেই অসম্মান স্পষ্টতই তাকে ভীষণ ব্যথিত করেছিল।

মৃণাল-নন্দিতার শেষ দেখা
১১ নভেম্বর ২০১৮

তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমরা কিছু ছবি তুললাম। এ দেখাই যে আমাদের শেষ দেখা হবে, তা হয়তো একটু হলেও বুঝতে পেরেছিলাম। বিদায় বলাটা সবসময়ই মর্মবেদনার বিষয়, তবু নীরবতার মধ্যে এমন একটি মানুষকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে দেখাটা আরও বেশি বেদনার– যে মানুষটি প্রচুর কথা, প্রচুর আইডিয়া, এবং এমনকি তারও বেশি কর্মচাঞ্চল্যের ছিলেন, তিনি যখন নিজের ডাইনিং টেবিলে বসা আছেন একা।

মৃণালদা আমার বিশ বছরেরও বেশিকাল ধরে চেনা। নিজের আপসহীন সত্তার প্রতি তিনি ছিলেন সবসময়ই সৎ, তবে তাতে একটা তীক্ষ্ণ হাস্যরস জুড়ে দিতে ছাড়তেন না। তার স্ত্রী ও সত্যিকারের জীবনসঙ্গী– গীতাদি সবসময়ই তার পাশে থেকেছেন, তার শক্তি হয়ে। বহু সন্ধ্যা তাদের সঙ্গে কাটিয়েছি; তিনি গল্প শুনিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। প্রায় সময়ই তারা একে অন্যকে খেপাতে থাকতেন; আর মৃণালদা নিজের চেয়ে গীতাদিকেই রাখতেন বেশি চাঙ্গা। মৃণালদার স্তুতিকে ‘নাই’ করে দিতে, গীতাদি মুচকি হেসে, পাল্টা কোনো গল্প ছুড়তেন। তাদের পরিহাস, শর্তহীন টান আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আমার মনে সত্যিকারের ভালোবাসার প্রতি আস্থা জাগিয়ে তুলত। আমাদের বহু বছরের লিভিংরুমের আড্ডাটি পরে ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত গড়িয়ে, অবশেষে গিয়ে ঠেকল তাদের বিছানা পর্যন্ত– যখন তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। বছর দুয়েক আগে গীতাদি যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, সবসময় যেমন মানুষ ছিলেন– সে রকমটিই থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেললেন মৃণালদা।

মৃণাল সেনের শবযাত্রায় অন্যদের সঙ্গে নন্দিতা দাস

মৃণালদার সঙ্গে যখন আমার পরিচয়, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে নিয়ে আমি একটা সিনেমা বানাব। তোমাকে দেখে স্মিতার [স্মিতা পাতিল] কথা মনে পড়ে গেল– তা স্রেফ অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, বরং ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও।’ ২০০২ সালে অবশেষে আমি তার সঙ্গে কাজ করতে পারলাম, তার সর্বশেষ সিনেমা– ভুবন সোম-এ। পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামের এক মুসলিম পরিবারের প্রেক্ষাপটে এটি। এক ধরনের ত্রিমুখী প্রেমের মতো– যেখানে দুই ভাই ও আমার অভিনীত চরিত্র সাকিনার মধ্যে কোনো বিদ্বেষ ছিল না। দ্বন্দ্বটি সূক্ষ্ম হলেও সমাধানটি আমাদের প্রকৃত মূল্যবোধের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো। শুটিং শুরুর ১৫ দিন আগে মৃণালদা আমাকে ফোন করে জানালেন, তার ফান্ডিং বন্ধ হয়ে গেছে; কেননা মুসলিম পরিবারকে নিয়ে কাহিনি– এমন কোনো সিনেমায় প্রডিউসাররা টাকা ঢালতে রাজি নন! কাহিনিটিকে চরিত্রগুলোর ধর্ম কোনো প্রভাবিত করতে পারে বলে আপাতদৃষ্টে মনে হলো না। কিন্তু এটি ছিল গুজরাটের দাঙ্গার পরপরের কথা; সাম্প্রদায়িক আতঙ্ক ও কুসংস্কারে বাতাস ছিল ভারি। তাকে আমি বললাম, মুসলিম প্রেক্ষাপট– এটি এই প্রজেক্টটিকে বাতিল করে দেওয়ার কোনো কারণ হতে পারে না।‘আচ্ছা, আমাদের কাছে সামান্য যা টাকা আছে, তা দিয়েই সিনেমাটি আমরা বানাব, কিন্তু তোমাকে মনে হয় তোমার সম্মানিটা দিতে পারব না।’–তার কাছ থেকে এ কথা শুনে অবাক হলাম না।

মৃণালদা
বলতেন, সূর্যটা
বাংলাদেশে উঠে
ভারতে অস্ত যায় !

এরপর চব্বিশ পরগনা জেলার টাকী নামের একটি ছোট্ট গ্রামে আমরা গেলাম। মনিরত্নমের কান্নাথিল মুথামিত্তাল শেষ করামাত্রই আমার ভুবন-এ শুট করতে গিয়েছিলাম আমি। যে কাজ করাকে আমরা “রিজিওনাল ফিল্মস” বলে ডাকি, তা করতে গিয়ে আমাকে এমন সব জায়গায় যেতে হয়েছে– যেগুলো আগে কখনো দেখিনি। নানা রকমের খাবার খেতে, নানা রকমের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু এ দুজন ফিল্মমেকার সবদিক থেকেই দুই রকম। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত, কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে শুটিং করার পর আমি এমন একটি কাজ করতে গেলাম, যেটির সিডিউল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি রিল্যাক্সড। যখন পৌঁছলাম, মনে হলো, পুরো গ্রামটিই যেন কোনো না কোনোভাবে ফিল্মটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে! আমরা পাঁচজন– মৃণালদা ও মেইন কাস্ট আর ক্রু– ছিলাম ছোট্ট একটি গেস্টহাউসে। সেটির সামনে ইছামতি নদী, আর অপর পারে বাংলাদেশ। মৃণালদা বলতেন, সূর্যটা বাংলাদেশে উঠে ভারতে অস্ত যায়! তার জন্ম ফরিদপুরে, যেটি এখন নদীটির ওপারে– ফলে এ নিয়ে তার মধ্যে বিশেষ এক অনুরণন ছিল।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার, অ্যাকট্রেস; ভারত ।। ফিল্ম [ফিল্মমেকার] : ফিরাক; মান্টো ।। ফিল্ম [অ্যাকট্রেস] : আমার ভুবন; ফায়ার; আর্থ; কামলি; বিফোর দ্য রেইনস; বিশ্বপ্রকাশ; পিতা প্রভৃতি

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন