ফেস টু ফেস : বারিমনসঙ্গ অথবা শুটিংয়ের দিনলিপি/ লিভ উলমন [কিস্তি : ১]

0
95
filmfree

মূল । লিভ উলমন
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

লিভ উলমন [১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮–]। নরওয়েজিয়ান অভিনেত্রী। ইংমার বারিমনের [ওরফে, ইঙ্গমার বার্গম্যান] ১০টি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে হাজির থেকেছেন। আর একান্ত বিষয়– স্ত্রী না হলেও সুইডিশ এই মাস্টার ফিল্মমেকারের এক কন্যাসন্তানের জননী তিনি। ফলে একইসঙ্গে ব্যক্তিমানুষ ও সিনেঅলা– ইংমারের উভয়জীবনেরই তিনি এক ঋদ্ধ পর্যবেক্ষক। ১৯৭৬ সালের সিনেমা, ফেস টু ফেস-এর শুটিংয়ের দিনগুলো তিনি টুকে রেখেছিলেন নিজের মতো। তাঁর আত্মজীবনী– চেঞ্জিং-এর সূত্র ধরে, ইংমার-দুনিয়ার অতলে ডুব দেওয়ার এই দুর্লভ সুযোগটি লুফে নেওয়া মন্দ হবে না নিশ্চয়!
পূর্ণাঙ্গ টেক্সটটি বাংলায় প্রথম মুদ্রিত হয় ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক কৃত্তিবাস-এর কৃত্তিবাসি শারদীয়া ১৪২৫ সংখ্যার [অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৮] বার্গম্যান/বারিমন ক্রোড়পত্রে। এখানে সেখান থেকেই প্রথমাংশ পুনঃমুদ্রিত হলো…

কিস্তি । ১ [৬]

পোস্টার । ফেস টু ফেস

দিন-১

সুইডিশ ফিল্ম স্টুডিতে দুটি স্টুডিও ভাড়া নিয়েছি আমরা। একটিতে তারা [ফিল্ম ক্রু] বানিয়ে নিয়েছে জেনির [ফেস টু ফেস ফিল্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র] শৈশবের বাসা– যেখানে এখন তার দাদা-দাদীই শুধু বসবাস করে।

আমি জেনি।

এই সেটটিতে সবকিছুই সবুজ রঙের। এই জায়গাটিতে টুকিটাকি ও অ্যান্টিক জিনিসপত্রের ছড়ানো-ছিটানো; সবকিছু এত নিশ্চিত ও ঠাসাঠাসি রেখে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে, যেন দেখতে বাসার মতোই লাগে। জেনির স্বপ্নগুলো যখন তাকে অতীতে নিয়ে যায়, অ্যাপার্টমেন্টটির বৈশিষ্ট্যটি বদলে যায়– লাইটিং, রঙের অনুজ্জ্বলতা, এবং আসবাবপত্রগুলোর অনেকটাই অতিন্দ্রীয় এক পুনর্বিন্যাসের ভেতর দিয়ে।

দ্বিতীয় স্টুডিওতে রয়েছে একটি ছোট্ট, সাদা, কৌতুহলশূন্য কক্ষের ভেতর জেনির রোগশয্যা। এখানে তার অফিসও। আর, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার সীমান্তরেখার অঞ্চলটির ভেতর দিয়ে ছুটে যাওয়ার সেই করিডোরগুলোও এখানেই।

একটি বাদামী রঙের লেদারের
সোফার ওপর হেলান দিয়ে
শুয়ে থাকেন ইংমার;
পরনে সেই একই
শার্ট, একই
সুয়েটার

প্যান্ট, একই
চটিজুতো– যতদিন
ধরে তাকে চিনি, এই
এতগুলো বছরে নিজের এই
স্টাইল তিনি একদমই বদলাননি

যখন শুটিং থাকে না, আমরা দাদার লাইব্রেরিটিতে বসে থাকতেই পছন্দ করি : একটি বাদামী রঙের লেদারের সোফার ওপর হেলান দিয়ে শুয়ে থাকেন ইংমার; পরনে সেই একই শার্ট, একই সুয়েটার ও প্যান্ট, একই চটিজুতো– যতদিন ধরে তাকে চিনি, এই এতগুলো বছরে নিজের এই স্টাইল তিনি একদমই বদলাননি। পুরনোগুলো ছিড়ে গেলে সে জায়গায় অবিকল একই জিনিসকে জায়গা করে দিয়েছেন।

সচরাচর অতিকায় এক ইজি চেয়ারে বসে থাকি আমি, কুণ্ডুলি পাকিয়ে; সঙ্গে নিজের টেপ রেকর্ডার। এটিকে রেখে স্টুডিওতে আমি বলতে গেলে যাই-ই না। ছোট্ট একটি কোনা বেছে নিয়ে, শান্ত ও একদম নিরিবিলি বসে মিউজিক শুনতে ভালোবাসি আমি। এই ফিল্মটির বেলায় বেশির ভাগ সময়ই শুনছি– আলবিনোনি [তমাসো আলবিনোনি; মিউজিক কম্পোজার, ইতালি]

আমরা নিজেদের সম্পর্কে কথা বলছি। ইংমারের কাছে জানতে চাইলাম, এমন কোনো মানুষ তিনি চেনেন কি-না– যারা যেমন, সত্যিকারঅর্থেই তেমন জীবনই কাটাচ্ছে। এক মুহূর্তও ইতস্তত না করে তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ; চিনি।’ এই নিশ্চিত অত্যুক্তিটি আমাকে নির্বাক করে দিলো।

আচমকা দৃশ্যমান হয়ে ওঠল একটি ইমেজ। অনেক দিন আগে আমি আর ইংমার ছিলাম কোপেনহেগেন বিমানবন্দরে। ভ্রমণ পছন্দ করেন না তিনি, এবং স্বভাবতই– এতসব সোরগোলও। তিনি আতঙ্কগ্রস্ত; বাড়ি ফেরার, ফারোর [দ্বীপ, সুইডেন] নিরাপত্তাবেষ্টনির কাছে ফেরার এক প্রবল তাড়না অনুভব করছেন। ফ্লাইট দেরি হচ্ছে; লিফট ধরে নিচে, পুরুষদের কক্ষটিতে চলে গেলেন তিনি। কাছাকাছির একটি টেবিলে বসে আমি অপেক্ষারত। খানিক বাদে লিফটের দরজাটি খুলে গেল; বেরিয়ে এলেন ইংমার। মাথায় ছোট্ট একটি ক্যাপ পরা; আর মুখে অহংকারের এক অস্পষ্ট হাসি। অচেনা কোনো লিফটে ঢুকে পড়া, অচেনা কোনো টয়লেট ব্যবহার করার ফোবিয়া কাটিয়ে, নিজেকে নিজের মধ্যে ফিরে পাবার এক মানুষ এ যে! আমার সামনে হাজির হলেন তিনি; তার কোমর খানিকটা ঝুঁকে গেল। অস্পষ্ট হাসিটি উবে গেছে ঠিকই, তবে তার চোখে উদ্বেগের অভিব্যক্তিটি এখন অতটা প্রবল নয়; ফলে বুঝে গেলাম, ভ্রমণটি আগ বাড়বে।

filmfree
শুটিংয়ের ফাকেঁ কন্যা লিন উলমনের সঙ্গে লিভ উলমন ও ইংমার বারিমন

***

লিন [লিন উলমন; ইংমার-লিভের সন্তান] ও ওর সৎভাই– দানিয়েল [দানিয়েল বারিমন; ইংমার-কাবির সন্তান] প্রায় প্রতিদিনই শুটিংয়ে এসে হাজির হয়। একজন বাবা ও একজন ফিল্মমেকার হিসেবে নিজের ভূমিকা দুটির মধ্যে একটি দ্বন্দ্বে পড়ে থাকেন ইংমার। এ দুটি ভূমিকার একটিকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই হতভম্ব হয়ে পড়েন; কেননা, তার মনে হতে থাকে, অন্যটিকে তিনি ঠিক সামলাতে পারছেন না।

সিভান– আমাদের নতুন কুকুর; শুয়ে আছে আমার ড্রেসিংরুমে। ও হলো গোল্ডেন রিট্রিভার জাতের কুকুর; বুনো ও উচ্ছৃঙ্খল; জুতো-মোজা– হাতের কাছে যা পায়, সব কামড়াতে থাকে। আমার কস্টিউমের খানিকটা কামড়ে ছিড়ে নেয়; ইংমারকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে ফ্লোর ভিজিয়ে ফেলে, এবং আমার চিঠিপত্র ছিড়ে টুকরো টুকরো করে।

ফিল্মমেকার । অ্যাকট্রেস
ইংমার বারিমন । লিভ উলমন

দিন-২

শুটিংয়ের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডিরেক্টর যদি অভিনেতার ওপর আস্থাশীল হন– সেই ডিরেক্টরের সঙ্গে অভিনেতাটি যদি নিশ্চয়তাবোধ করেন, তাহলে এই ওয়ার্কিং পার্টনারশিপটি এ রকম কোনো সম্পর্কের অস্তিত্বহীনতার তুলনায় অধিক ফলবান হয়ে ওঠে।

একজন ফিল্মমেকার হিসেবে এই নিশ্চয়তাবোধটি অনুভব করা নিজের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ– এ নিয়ে আলাপ করেন ইংমার। যখন তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ থাকে না, কোনো বোঝাপড়া থাকে না, তখন অভিনেতার সঙ্গে সংযোগ হারানোর অনুভূতিটি তাকে খুব দ্রুতই শঙ্কিত করে তোলে। তখন নানাবিষয় সামনে চলে আসে। এমনতর মুহূর্তে নিজের বিখ্যাত ক্রোধের সঙ্গে মানিয়ে ওঠার স্বাক্ষ্য হতে ওঠতে পারে সেই মানুষটি।

এখন আমি যে চরিত্রটিতে অভিনয় করছি, এটি আমার জন্যই লেখা। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে আমার নিশ্চয়তাবোধ; এবং ইংমারেরও। আমরা দুজনেই অনুভব করি, জেনির মধ্যে নিজেকে খুঁজে নিতে পারব আমি। পারব জেনিকে লিভের মধ্যে রূপান্তরিত করতে।

যখন
সবকিছুই
বাস্তব বলে মনে
হয়, এমনতর আবহে
ইংমারের সঙ্গে শুটিং
করা মানে আনন্দের
সুবিস্তার
ঘটতে
থাকা

আমার নিজেরই অভিজ্ঞতা, এবং ৩৬ বছরে আমার শোনা ও দেখা অন্যদের সবকিছুর অভিজ্ঞতার ওপর তৈরি হয়েছে চরিত্রটি।

ইংমার যেদিন আমাকে এই পাণ্ডুলিপিটি দিয়েছিলেন, একইসঙ্গে তিনি দিয়েছেন এই অনুভবের অধিকারটুকুও– যেন চরিত্রটিকে সর্বাত্মকভাবে বুঝে নিতে পারি আমি। সে [জেনি] যতটা আমার বাস্তবতা হয়ে ওঠেছে, ততটাই হয়ে উঠেছে ইংমারের। তার [ইংমারের] সহযোগিতা, প্রতিভা, তার শোনার ও দেখার সংবেদনশীলতার বিচারে আমি জানি, ওর [জেনির] সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যবন্দি করা হবে ক্যামেরায়।

যখন সবকিছুই বাস্তব বলে মনে হয়, এমনতর আবহে ইংমারের সঙ্গে শুটিং করা মানে আনন্দের সুবিস্তার ঘটতে থাকা।

ক্যারেক্টার । জেনি, দাদী, দাদা
কাস্ট । লিভ উলমন, আইনো তুবা, গুন্নার বিয়োর্নস্ত্রান্দ

দিন-৩

কক্ষগুলো সবুজ। চেয়ার, দেয়াল, গাছপালা, জিনিসপত্র– এখানে থাকা সবকিছুতেই সবুজের ছোঁয়া। মৃদু আলো দেওয়া ও ছায়ার কনট্রাস্ট তৈরি করা অল্প কয়েকটি প্রদীপ দিয়ে সিনেমাটোগ্রাফার সভেন নিকভিস্ত আসলে অতীত দিনগুলোর একটি আবহ প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন।

আমার দাদা-দাদীর চরিত্রে অভিনয় করছেন গুন্নার বিয়োর্নস্ত্রান্দ [অভিনেতা, সুইডেন] ও আইনো তুবা [অভিনেত্রী, সুইডেন]। তাদেরকে একটি দৃশ্যে অভিনয় করতে দেখছি আমি।

অনেক বড় চটিজুতো পায়ে, পা টেনে টেনে যাচ্ছেন গুন্নার। আইনোর পরনে মোজা। এখন রাত; ঘড়িতে দম দেওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন দাদা। তিনি উদ্বিগ্ন। মৃত্যুর ভয়ে ভীত। তিনি জানেন, নিশ্চয়ই শিগগিরই মারা যাবেন; ঘড়িটির থেমে যাওয়াকে এক অশুভ লক্ষণ হিসেবে দেখেন তিনি। আইনো তাকে সান্ত্বনা দেন, তাকে জড়িয়ে ধরেন, তাকে সামান্য ভর্ৎসনা করেন, আর করেন ইয়ার্কি– তার সঙ্গে।

নিজের দাদীর কথা মনে পড়ে যায় আমার– যিনি মরে গেছেন অনেক-অনেক বছর আগে, তবু যাকে এখনো আমি মিস করি।

মৃত্যুভীতি
আমাকে সীমাবদ্ধ
করে রাখে

নিজের মৃত্যুর কথাও মাথায় আসে আমার। এটিকে মাত্র কয়েক বছর আগের চেয়েও অনেক বেশি নিকটবর্তী বলে মনে হয় এখন।

আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী; জানি, যদি সত্যিকারঅর্থেই অনন্ত জীবনের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারতাম, তাহলে কোনো মৃত্যু থাকত না, থাকত না কোনো ভয়। কিন্তু এ এমনই এক আত্মিক অভিজ্ঞতা– যেটি এখনো হয়নি আমার। নিজের চারপাশে আমি চিহ্ন দেখি– কোনো মৃত্যু নেই এখানে। শীতের পর আসে বসন্ত; কিন্তু যদি আমি এটির অংশ হয়ে থাকি, তাহলে জীবনে এ অভিজ্ঞতা লাভ করতে আমি অক্ষম।

মৃত্যুভীতি আমাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। আমাকে এটির প্রতি করে রাখে উন্মুক্ত।

জেনি
লিভ উলমন

দিন-৪

আজ রোববার। যে চাদরটির ওপর শুয়ে আছি, আমেরিকা থেকে কিনেছিলাম এটি– গোলাপ ফুল আর আপেলের ছবিতে ভরা, আর কোণায় কোণায় জরি বসানো। নিচের বাগানে লিন ওর কুকুরটির সঙ্গে খেলা করছে। মাত্র সকাল আটটা এখন। খুব হাসাহাসি আর চেচাঁমেচি করছে সে। আমি জানি, প্রতিবেশিরা এখন ঘুমোনোর চেষ্টায়। অথচ আমি ওকে বারণ করছি না। রাতে যখন আমি ঘুমোতে গিয়েছিলাম, তারা [প্রতিবেশিরা] তখন নিজেদের রেডিও ও টেলিভিশন বাজিয়েছেন।

কণ্টকবিহীন গোলাপগুলোর ওপর শুয়ে আছি আমি; আর কাজ করছি : নিজ জীবন কেড়ে নেওয়ার কথা ভাবছে– স্বামীকে এ কথা শোনানোর সময় জেনি যে সুদীর্ঘ স্বগতোক্তিটি করবে, সেটি শিখছি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই
শত শত ঘুমের
বড়ি খেয়ে
মরে
যাবে
সে

লিন রুমে এলো। আমাকে জানাল, কুকুরছানাটি কী শিখেছে। ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি; বলছে– এইমাত্র জীবনের প্রথমবার এটি [কুকুরছানা] নিজে নিজে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করেছে; অথচ আমার ভেতরে এক ক্লান্তিকর কণ্ঠস্বর নিয়ে জেনি বলে চলেছে– কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত ঘুমের বড়ি খেয়ে মরে যাবে সে।

জানি, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই যখন ক্যামেরার সামনে এই কথাগুলো বলব, তখন চোখে অশ্রু থাকবে আমার; কেননা, আচমকাই আমার মনে পড়ে যাবে, লিন এখন যা কিছু করছে : ব্যায়ামের পোশাক পরে, ঠোঁটের ওপর দুধের গোঁফ ফুটিয়ে, একাগ্রচিত্তে আমার সঙ্গে বলতে চাচ্ছে কথা, অথচ ওর কথা যে বলতে গেলে শুনছি না আমি– সেদিকে একদমই খেয়াল নেই বেচারির।

জেনি
লিভ উলমন

দিন-৫

মাঝে মধ্যে একটা নীল আর একটা হলুদ মোজা পরেন ইংমার– সাধারণত শুটিংয়ের প্রথমদিন। আমরা সবাই মনে করি, এটি আমাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।

ইংমার একা একা খান। তার লাঞ্চে থাকে একটা কড়া সিদ্ধ ডিম, স্ট্রবেরির আচারে মাখানো এক টুকরো টোস্ট, আর এক বাটি সাওয়ার-ক্রিম। স্টুডিওটির একটি ছোট্ট টেবিলের ওপর বিস্কুট, চকলেট ও সোডা রাখা হয়েছে জমিয়ে।

তিনি আর আমি করিডোরটিতে পায়চারী করতে করতে, জেনির বিষণ্নতা নিয়ে আলাপ করছি। যথেষ্ট দেরি হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওর [জেনির] আশপাশের কেউ ধরতে পারবে না বিষয়টি। ওর অভিজ্ঞতাগ্রহণের সক্ষমতা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে; অতীতে মিউজিক, সৌন্দর্য, অন্য লোকজনের মুখোমুখি হলে সেসবের প্রতি ওর ব্যাকুলতার যে স্তরটি ছিল এবং এখন যা সে অনুভব করে– এর মধ্যকার বৈপরীত্যটি হয়ে উঠেছে প্রবল।

একা একা
জীবন কাটানো,
মুখোশের আড়ালে
জীবন কাটানো, এবং বেদনা
লুকিয়ে ফেলা শিখে গেছে সে

জেনি চালাক-চতুর। একা একা জীবন কাটানো, মুখোশের আড়ালে জীবন কাটানো, এবং বেদনা লুকিয়ে ফেলা শিখে গেছে সে। কখনো কখনো এ বিষয়টি একটি শারীরিক কাঠামো ধারণ করে; যে কারণে সে ফার্মেসি থেকে ওষুধ ও মলম কিনে। তবে বেশির ভাগ সময়ই সবকিছুর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে ওর। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলার চেষ্টা চালায় সে, আর সফলও হয় ঠিক সেই মুহূর্তটির আগ পর্যন্ত– যখন না নিজ শৈশবের ঘটনাবলির মুখোমুখি হয়ে যায় সে।

এখানে ভেঙে পড়ার একটি স্ট্রাকচার রয়েছে; এ বেলা ওর কোনো প্রতিরোধক্ষমতাই কাজ করে না আর। শৈশবের এই নিরাপদ কক্ষগুলোতে, আতঙ্ক তাড়া করলে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যাই কাজ করে না। ভীতিপ্রদর্শনটি এমন জোরালোভাবে জাহির হয়, যেখানে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার তাৎপর্য থাকে না কোনো।

আমার ধারণা, বাড়িতে নিজের দাদা-দাদীর কাছে চলে আসার আগে সে যে মরতে চেয়েছিল– এ সম্পর্কে জেনির বস্তুত কোনো ধারণা না থাকাটি আসলে যৌক্তিক।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন