আনোয়ার হোসেনের শিল্পযাপনের বিপুল বৈভব, আমাদের রিক্ততা/ বেলায়াত হোসেন মামুন

0
204
anwar hossain

লিখেছেন । বেলায়াত হোসেন মামুন

বর্ষাকাল। বিকেল। ভেজা চারিদিক। সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছে মৃদু মন্থর। একতলার বারান্দা দিয়ে তিনি তাকিয়ে আছেন পাশে ছোট্ট ডোবার দিকে। ডোবার চারপাশে কলাগাছের সারি। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তিনি দেখছেন গভীর মনোযোগে। হঠাৎ মুখে স্মিত হাসি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘একরত্তি ব্যাঙটা লাফিয়ে পানিতে পড়ার দৃশ্যটা দেখো, ঠিক লাফ দেয়ার মুহূর্তে ওর চোখে যেন খুশি খেলে যায়!’ বলেছিলেন সদ্যপ্রয়াত বিশ্ববরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন। ডোবার পারে বসে থাকা ‘একরত্তি ব্যাঙ’ ডোবার জলে লাফিয়ে পড়ার মুহূর্তে ব্যাঙের চোখে খুশি আমি দেখিনি। হয়তো আমার দেখার কথাও নয়। আমি বরং তখন দেখছিলাম আনোয়ার হোসেনকে। তাঁর মনোযোগ, তাঁর দরদ, তাঁর মুগ্ধ চোখ-মুখ!

এই বিকেলের ঘটনাটি যখন ঘটছে তখন আমরা শরিয়তপুরের একটি গ্রামে। আনোয়ার ভাইয়ের ওপর আমার প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্মাণযাত্রার একদিন। গত বছর তিনেক ধরে আনোয়ার ভাই ফ্রান্স থেকে এসে থাকতেন শরিয়তপুরের পালং গ্রামে। সেখানে আনোয়ার ভাই থাকতেন তাঁর কলাপাতার বন্ধুরা সিরিজের ছবি তোলার আশায়। কলাপাতার বন্ধুরা সিরিজ শুরু হয়েছে ৫০ বছর আগে। সেই সাদাকালো যুগে। প্রতি দশ বছর পর পর আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে গিয়ে মাটি এবং মানুষের ছবি তোলেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন শরিয়তপুরকে।

আনোয়ার হোসেন । ৬ অক্টোবর ১৯৪৮–১ ডিসেম্বর ২০১৮

গত ১ ডিসেম্বর ঢাকার পান্থপথের একটি আবাসিক হোটেলে যখন তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তখন আনোয়ার হোসেন জীবনের ৭০ বছর একমাস বয়স পাড়ি দিয়েছেন। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি স্থায়ী হয়েছিলেন শিল্পের তীর্থভূমি প্যারিসে। ১৯৯৫ সালের পর থেকে চেষ্টা করতেন প্রতি বছর কমপক্ষে একটা মাস দেশে এসে থাকার। শিল্পী আনোয়ার হোসেনের জীবনের অনেক সংগ্রামের মত নিজ মাতৃভূমিতে এই আসা যাওয়ার পথটাও সংগ্রামের ছিল। ডিসেম্বরের ১ তারিখ সেই সংগ্রামের সমাপ্তি হয়েছে। ডিসেম্বরের ৩ তারিখ তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে রোপিত হয়েছেন। আমরা তাঁকে রোপণ করেছি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমির গর্ভে!

বাংলাদেশের প্রায় নাবালক আলোকচিত্রশিল্পকে তিনি একটানে শুধু সাবালকত্ব দান করেননি, করে তুলেছেন ভুবনের অপরাপর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রশিল্পের সমগোত্রীয়

ক্লিক ২

বাংলাদেশের কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পী তিনি। সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার তিনি। বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্প আধুনিকতার যুগে প্রবেশ করেছে আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে। বাংলাদেশের প্রায় নাবালক আলোকচিত্রশিল্পকে তিনি একটানে শুধু সাবালকত্ব দান করেননি, করে তুলেছেন ভুবনের অপরাপর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রশিল্পের সমগোত্রীয়। বাংলাদেশের আধুনিক আলোকচিত্রশিল্পের জনক আনোয়ার হোসেন সবচেয়ে অবহেলিত হয়েছেন নিজ মাতৃভূমিতে, নিজ দেশের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নীতিনির্ধারকদের অন্তরশূন্যতায়। এ আমাদের এক গভীর মনস্তাপ।

চাকা

ক্লিক ৩

গত ১৪ বা ১৫ বছরের খননে আনোয়ার হোসেনকে কতটুকুই বা জানা গেছে। এ নিয়ে সংশয় আমার রয়েই গেছে। তিনি তো ছিলেন স্পষ্টতায়, সরলতায় বর্ণাঢ্য এক আলোকশিল্পী। এমন প্রাণবান ‘তরুণ’ বয়সে তরুণদের মধ্যে দুর্লভ। আর বয়সে প্রবীণদের মাঝে আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, মূর্তিমান ব্যতিক্রম। আনোয়ার হোসেনের সদ্যতরুণের মত ছুটন্ত সেই সৃষ্টিশীল গতি সম্ভবত তাঁর জীবনের ভাঁড়ারগুলোকে শূন্য করে দেয়ার অফুরাণ প্রয়াস। কাশফুলের মতো শুভ্র দাড়ি-গোঁফ- চুলের এই তরুণ তাঁর সৃষ্টিশীলতার মতোই প্রাণবান ছিলেন সর্বক্ষণ। কেউ তাঁকে কখনও দেখেনি হতাশাগ্রস্থ হতোদ্যম এক প্রবীণ বৃদ্ধের ন্যূব্জতায়।


ক্লিক ৪

আনোয়ার হোসেন মোট পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। এটা একটি তথ্য। এই তথ্য
হয়তো গড়পড়তা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই তথ্য আনোয়ার হোসেনের জন্য কোনো বাড়তি কিছু ছিল না। তিনি সৃষ্টিশীলতার পথে এইসব অর্জনকে পেছনে ফেলে কেবল এগিয়ে গেছেন আরও সৃষ্টির পথে। সৃষ্টিশীলতায় অতৃপ্তি তাঁর চালিকাশক্তির মত তাঁকে ছুটয়েছে জীবনভর। হয়তো প্রত্যেক মহান শিল্পীর জীবনই এই গল্পের বিস্তৃত বিবরণমাত্র। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র স্পষ্টতই দুটি পৃথক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। একটি হলো আনোয়ার হোসেনের পূর্বের চলচ্চিত্র আর অন্যটি আনোয়ার হোসেনের পরের চলচ্চিত্র। আনোয়ার হোসেন যে চলচ্চিত্রসৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেন তা হলো শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের নির্মিত সূর্য দীঘল বাড়ীসূর্য দীঘল বাড়ী’র সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনের স্বাক্ষর সূর্য দীঘলে কতটা তা নিরুপণ করতে হলে আপনাদের দেখতে হবে আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় চিত্রায়িত তাঁর অপর চলচ্চিত্রগুলোকে। এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, দহন, পুরস্কার, হুলিয়া, চাকা, চিত্রা নদীর পারে, অন্য জীবন, লালন, লালসালু, শ্যামল ছায়া। পাশাপাশি দেখতে হবে তাঁর প্রায় ৩০টির অধিক প্রামাণ্যচলচ্চিত্রকে।

এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী

এই চলচ্চিত্রগুলোর নির্মাতা একই ব্যক্তি নন। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফার একজন। আনোয়ার হোসেন। এই চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে সৃষ্টিশীল একটি উপাদান প্রবলভাবে উপস্থিত। আর তা হলো আনোয়ার হোসেনের দেখবার ও দেখাবার গভীর অন্তরদৃষ্টি। যদিও চলচ্চিত্র ভীষণভাবে চলচ্চিত্রকারের একান্ত ইশতেহার। সেই ‘একান্ত ইশতেহারে’ যখন নির্মাতা ছাড়াও আর কারো সৃষ্টির নিজস্ব স্বাক্ষর চলচ্চিত্র ধারণ করে তখন প্রকারন্তরে চলচ্চিত্র বিপদসীমায় উপস্থিত হয়। হতে পারে তা নির্মাতা- সিনেমাটোগ্রাফার দ্বন্ধে ‘শিব গড়তে বাঁদর’ গড়া অথবা হতে পারে নির্মাতা- সিনেমাটোগ্রাফার যুগলবন্দিতে অপূর্ব কোনো মহৎ সৃষ্টি। যা কালোৎকীর্ণ হয়ে সমগ্র মানুষের অন্তরের সুর বাজিয়ে যাবে অনন্তকাল।

চলচ্চিত্রের আমরা এমন মহৎ কয়েকজন নির্মাতা- সিনেমাটোগ্রাফার যুগলবন্দি দেখেছি। সত্যজিৎ রায় এবং সুব্রত মিত্রইঙ্গমার বার্গম্যান এবং নিকভিস্ট। অরসন ওয়েলস এবং গ্রেগ টোলান্ড। আমরা হয়তো সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আনোয়ার হোসেনকে পেয়েছিলাম। আনোয়ার হোসেনের সক্ষমতাকে পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে পারেন এমন সামর্থ্যবান চলচ্চিত্রকার কি আমরা পেয়েছি? এই প্রশ্ন আজ আমরা কেবল উচ্চারণ করতে পারি; উত্তর আমরা হয়ত পাবো না। আমরা আনোয়ার হোসেনের সাথে যুগল হতে পারেন এমন চলচ্চিত্রকার না পেলেও যা পেয়েছি তাতেই কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে উদাহরণ হতে পারে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি আমরা পেয়েছি। এটুকু যদি না পেতাম তবে হয়ত আরও না পাওয়ার আমাদের আক্ষেপটুকু আজ তৈরিই হত না।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আনোয়ার হোসেনের অতৃপ্তি ছিল

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আনোয়ার হোসেনের অতৃপ্তি ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি তাঁর সক্ষমতার সামান্যও দেখাতে পারেন নি। তিনি মনে করতেন এবং বলতেন বাংলাদেশে তিনি তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ’ কাজটি করার সুযোগই পান নি। বাংলাদেশে তাঁর ক্যামেরায় চিত্রায়িত প্রাতস্মরণীয় চলচ্চিত্রগুলোকে তিনি বলতেন ‘মন্দের ভালো’। বলতেন, ‘এগুলো তাঁর ভালো কাজের সংগ্রাম।’


ক্লিক ৫

আনোয়ার হোসেন হলেন আমাদের প্রিয় ‘আনোয়ার ভাই’। অনেক তর্ক হত, সেই তর্কে প্রশ্ন থাকতো, থাকতো জানবার ইচ্ছে। আর আনোয়ার ভাইও যদি ‘মুড’ ভালো থাকতো তবে বলতেন অবিরাম। আবার কখনও কখনও যখন ‘মুড’ ভালো থাকতো না তখন একদম চুপচাপ। তখন কথা বলতেন না। একা থাকতে চাইতেন। আনোয়ার ভাইয়ের এই ‘মুড’ খুব অদ্ভূত এক বিষন্নতার দৃষ্টি তৈরি করতো। কেমন যেন মনখারাপ করে চেয়ে থাকতেন। চেয়ে থাকতেন তবুও মনে হত কিছু দেখছেন না।
তাঁর এই বিষন্নতার রূপ খুব বিরল ছিল। অধিকাংশ মানুষ এই রূপ দেখেন নি। কারণ বিষন্নতা আনোয়ার ভাইয়ের ভাষায় আনোয়ার ভাইকে ‘স্ট্রাইক’ করতো। আর তা ছিল তাঁর জন্য বিরল কোনো ক্ষণ। এছাড়া অন্য সময়ে শিশু-কিশোরদের সরল উচ্ছলতায় তিনি ভেসে বেড়াতেন, হাসতেন প্রাণখোলা উজ্জ্বলতায়।

৫ ডিসেম্বর ২০১৮ । আনোয়ার হোসেন স্মরণসভার এক ফাঁকে, ‘ছবি হয়ে যাওয়া’ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আছেন হাশেম সুফি


ক্লিক ৬

আনোয়ার ভাই বাংলাদেশের আলোকচিত্রকে কতটা দিয়েছেন। যতটা দিয়েছেন চিত্রকলায় এসএম সুলতান। এ তুলনায় বিতর্ক হতে পারে, তবে এ আমার মত। আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যেমন করে চিত্রকলাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারায় রূপ দিয়েছেন, ঠিক তেমনটা আনোয়ার ভাই করেন নি। হয়তো আলোকচিত্রে তা শ্রদ্ধেয় মনজুর আলম বেগ করেছেন। এসএম সুলতান যেমন করে আমাদের চিত্রকলাকে ‘আমাদের’ স্বাক্ষরে-দর্শনে পরিপূর্ণ করেছেন ঠিক তেমনটি আনোয়ার হোসেন করেছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রে। বাংলাদেশের আজকে আলোকচিত্রশিল্পী হওয়ার যে বহুল প্রণোদনা তা শিল্পীত রূপে প্রথম জনমানুষে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আনোয়ার হোসেন। শিল্পী সুলতানের মতোই আনোয়ার হোসেন এক প্রবল বাউলাঙ্গের জীবন যাপন করেছেন। ছুটে বেড়িয়েছেন সারাটা জীবন। বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্পদশালী শিল্পী হিসেবে ফ্রান্সে বসবাস করতে পারতেন, যদি হতেন একটু স্থির আর বৈষয়িক। কিন্তু বাউলদের মতো কোনো এক গভীর টানে তিনি মাটির আর মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে তিনি ক্রমাগত ধরতে চেয়েছেন মানুষের যাপনের অলৌকিক মুহূর্তগুলোকে। যে একটি মুহূর্তের একটি দৃশ্য হয়ে ওঠে সমগ্রের সম্পূর্ণরূপ।

মুক্তিযুদ্ধে– ক্যামেরা, বন্দুক ও বন্ধু এবং আনোয়ার হোসেন


ক্লিক ৭

আনোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়, আমার ধারণকৃত সাক্ষাৎকারের জবানীতে জানি তিনি ২৬ মার্চ সকালে ধারণ করেছেন ঢাকার ২৫ মার্চের গণহত্যার আলোকচিত্র। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল কারফিউয়ের মাঝে ক্যামেরা হাতে আলোকচিত্র ধরে রাখা বন্দুক হাতে যুদ্ধের চেয়ে কতটা কম?

২৫ মার্চের পর থেকে যুদ্ধের পরবর্তী নয় মাস তিনি তুলে গেছেন পুরোনো ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, দোহার, নবাবগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর যুদ্ধদিনের চিত্র। সেই সব আজ বাংলাদেশের জন্মক্ষণের দলিল। অথচ মৃত্যুর পর এই মহানশিল্পীকে জাতির পক্ষ থেকে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে গার্ড অব ওনার দেয়ার জন্য খুঁজতে হয়েছে তাঁর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধসনদ আছে কি-না?

একজন শিল্পী কতটা খামখেয়ালী হতে পারেন তা রাষ্ট্রযন্ত্র জানেন না

একজন শিল্পী কতটা খামখেয়ালী হতে পারেন তা রাষ্ট্রযন্ত্র জানেন না। সরকারের মন্ত্রী জানেন না। শিল্পীর যুদ্ধ কোনো সনদ দিয়ে অথবা কোনো আইন দিয়ে তৈরি হয় না। শিল্পীকে রাষ্ট্র তৈরি করে না। শিল্পী রাষ্ট্র তৈরি করে। শিল্পীর মানসে জাতির ধারণা তৈরি হয়। আনোয়ার হোসেনের মতো আর একজন আলোকশিল্পী এই হতভাগা বাংলাদেশ আর কখনও পাবে না। কারণ একজন আনোয়ার হোসেনের সাথে বাংলাদেশ ন্যায় করতে পারে নি।

শহীদ মিনারে, আনোয়ার হোসেনের মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

আমি ভাবি শহীদ মিনারে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া না-দেয়া নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আনোয়ার হোসেনকে আগামীতে আরও মহান করে তুলবে। আনোয়ার হোসেনের সাথে ঘটে যাওয়া সকল অন্যায় একসময় বহুগুণে ফিরে আসবে অনেক অনেক তরুণের কাজে, চিন্তায় প্রতিবাদরূপে। আমি এ নিয়ে অতটা নিরাসক্ত হতে পারি নি। পারবো না। আমাদের বহু মানুষের অনেক প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে যখন সরকারের একজন মন্ত্রী মহোদয় সিদ্ধান্ত দিলেন যে ‘সনদ’ না থাকায় আনোয়ার হোসেনকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে না। তখন ঠিক সেই ক্ষণে মনে হয়েছে এই একটি মানুষের জন্য আমাদের এত মানুষের সকল প্রয়াস, আনোয়ার হোসেনের জীবনভর করা সাধনা, আনোয়ার হোসেনের মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হয়ে যাবে!

আমরা দিয়েছি স্যালুট যখন আমাদের অন্তরশূন্য আমলাতন্ত্র তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে

আমরা তা মানতে পারি নি তাই আনোয়ার হোসেনকে আমাদের শ্রদ্ধায় জাতীয় পতাকায় তাঁকে আচ্ছাদিত করে গেয়েছি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। আমরা দিয়েছি স্যালুট যখন আমাদের অন্তরশূন্য আমলাতন্ত্র তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতীকী শিল্পীত শিল্পের এক মহান কারিগরকে নিয়ে এই ঘটনাটি একটি ব্যর্থতার ট্রাজেডি। এই ট্রাজেডি আনোয়ার হোসেনকে আরও বৃহৎ, আরও মহৎ করে তোলে। আর এই ট্রাজেডি প্রতীকী বিচারে আনোয়ার হোসেনের সাথে সারাজীবন ধরে ঘটে যাওয়া আমাদের সামগ্রিক অন্যায়ের প্রতীক চিহ্নরূপে আমাদের দাহ করবে। যাকে এই অন্যায় দাহ করবে না সেও তো এই অন্যায়ের ভাগিদার।


ক্লিক ৮

আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের এমন একজন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রশিল্পী যাঁর পরিচয়ের জন্য আর কোনো অভিধার প্রয়োজন ছিল না। অথচ আনোয়ার হোসেন কেবলমাত্র আলোকচিত্রশিল্পী নন। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার, তিনি স্থপতি, তিনি লেখক এবং তিনি শিক্ষকও।

সূর্য দীঘল বাড়ী
সূর্য দীঘল বাড়ী

আনোয়ার হোসেন অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিক্ষাকে শিক্ষাপ্রদানের দার্শনিকতাসহ বুঝতেন বলে আমি বিশ্বাস করি। আনোয়ার হোসেন আমারও শিক্ষক ছিলেন। চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব তিনি আমাকে যেমন করে অনুভব করাতে পেরেছিলেন তা আমার দৃষ্টিকে চিরকালের মতো উন্মোচন করিয়েছিল। অথচ আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে এই আলোকপ্রাপ্তির পূর্বে এই ‘জ্ঞান’ প্রাপ্তির জন্য কত চেষ্টাই না করেছি! যা বুঝতে অনেক বই, অনেকের অনেক লেকচার কেবল আচ্ছন্নতা বৃদ্ধি করেছে তা দূর করতে আনোয়ার হোসেনের লেগেছিল মাত্র কয়েক মুহূর্ত!

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিক্ষায় আনোয়ার হোসেনের অবদান অশেষ। এ নিয়ে আমাদের আক্ষেপও পাহাড়সম। আনোয়ার হোসেনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আমরা আমাদের বিকাশে খুব সামান্য কাজে লাগাতে পেরেছি। আনোয়ার হোসেন দিতে পারতেন কারণ তিনি জন্মস্বভাবা দাতা। দিতে, দান করার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর দান গ্রহণ করবার মতো আমাদের মন তৈরি ছিল না। আমাদের মানসিক সঙ্কীর্ণতা, ক্ষুদ্রতা, নীচতা আমাদের ছোটই করে রেখেছে। আমরা একজন মহত্তম শিল্পীকে আমাদের আটপৌড়ে গৃহস্থ বাস্তবতায় ধরবার চেষ্টা করতাম। আমরা আমাদের মফস্বলিপনা দিয়ে একজন সংস্কারমুক্ত মানুষকে ‘বিচার’ করতাম। আমরা মানসিকভাবে বামন হয়ে একজন সত্যিকারের আলোকপ্রাপ্ত শিল্পীর মানসকে স্পর্শ করবার স্পর্ধা দেখাতাম!

আনোয়ার হোসেন স্মরণসভায় বেলায়াত হোসেন মামুন

আমাদের এইসব বিকারের অনেক উর্ধ্বে আনোয়ার হোসেন বিরাজ করতেন। তাই তিনি সদাহাস্যময়, সদাপ্রাণবান মানুষ ছিলেন। যত দিন বেঁচে ছিলেন, ছিলেন জলের মতো প্রবাহমান। এই-ই তাঁর শক্তির উৎস। যা তাঁকে বারবার সজীব রাখতো তা হলো তাঁর কলাপাতার বন্ধুরা, ‘গুইসাপ ও ব্যাঙের’ রোদ পোহানো আলস্য, পথের ধারের কোনো গ্রামীণ নারীর চিতই পিঠার গরম ভাপ, দেশীয় ছোট্ট কলা আর চিঁড়েগুড়, দক্ষিণা বাতাস আর গ্রাম বাংলার শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ!

আনোয়ার হোসেন গত ৩ ডিসেম্বর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত হয়েছেন। কেবল তাঁর দেহখানা সেই ছোট্ট কবরের মাটিতে রোপিত হয়েছে। আনোয়ার হোসেনের সমগ্র জীবনকর্ম ছড়িয়ে আছে সমগ্র বাংলায়, সমগ্র দুনিয়ায়!

যে রাষ্ট্র তাঁর জীবনকালে তাঁকে সম্মান করতে ব্যর্থ হলো, যে মানুষেরা তাঁকে সম্মান দিতে বাঁধা হলো, তাঁরা কেউই ততদিন বেঁচে থাকবেন না, যতকাল আনোয়ার হোসেন এই দুনিয়ায় বেঁচে রইবেন। আনোয়ার হোসেন হলেন সেই সব অমর মানুষের মত আলোকশিখা যাঁরা প্রজ্জ্বলিত হন আরও গভীরভাবে যখন তাদের দেহ সমাহিত হয়।

আনোয়ার ভাইয়ের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার ভালোবাসা, আমার শ্রদ্ধা!

৫ ডিসেম্বর ২০১৮
প্রথম [আংশিক] প্রকাশ । কালের খেয়া; সমকাল; ৭ ডিসেম্বর ২০১৮
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; চলচ্চিত্র নির্মাতা; চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি। নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র : অনিবার্য [ পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; ২০১১]; পথিকৃৎ [চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক; ২০১২ (যৌথ নির্মাণ)]। সম্পাদিত ফিল্ম-ম্যাগাজিন : ম্যুভিয়ানা; চিত্ররূপ। সিনে-গ্রান্থ : চলচ্চিত্রপাঠ [সম্পাদনা]; চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া। পরিকল্পক ও উৎসব পরিচালক : নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র উৎসব

মন্তব্য লিখুন