চ্যাপলিনের সিটি লাইটস : সিনেমায় হাসি ও কান্না/ আসকার ইকবাল

0
161
চার্লি চ্যাপলিন
সিটি লাইটস
ফিল্মমেকার, প্রডিউসার, স্ক্রিনরাইটার • চার্লি চ্যাপলিন
অভিনয় • চার্লি চ্যাপলিন, ভার্জিনিয়া শেরিল, ফ্লোরেন্স লি, হ্যারি মেয়ার্স, আল আর্নেস্ট গার্সিয়া
মিউজিক • চার্লি চ্যাপলিন, জোসে প্যাডিলা, আর্থার জনস্টন, আলফ্রেড নিউম্যান
সিনেমাটোগ্রাফি • রোল্যান্ড টোথারো, গর্ডন পোলক
ফিল্ম এডিটর • চার্লি চ্যাপলিন, উইলার্ড নিকো
ডিস্ট্রিবিউটর • ইউনাইটেড আর্টিস্টস
রানিংটাইম • ৮৭ মিনিট
ভাষা • নির্বাক
দেশ • যুক্তরাষ্ট্র
রিলিজ • ৩০ জানুয়ারি ১৯৩১
চার্লি চ্যাপলিন

লিখেছেন আসকার ইকবাল


পৃথিবীর যে কয়জন বিখ্যাত ও সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন তাদের মাঝে চ্যাপলিন একজন। চ্যাপলিন এমন একজন নির্মাতা, যিনি তার চলচ্চিত্রকে বাণিজ্যিক ও দার্শনিক– উভয় দিক থেকেই সফলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এমন কয়জন নির্মাতা আছেন, যারা তার সিনেমার ভাষায় হাসতে হাসতে সমাজ ও যাপিত জীবনের জাগতিক সমস্যাকে পর্দায় চিত্রায়ণ করতে পেরেছেন?

চার্লি চ্যাপলিন
সিটি লাইটস

“নিষ্ঠুরতা হচ্ছে কমেডির মূল উপাদান– যা সাধারণত স্বাভাবিক বলে দৃশ্যমান হয়।”– চ্যাপলিনের এই বাণী যেন তার চলচ্চিত্রেই গভীর দৃষ্টিতে বসবাস করছে। এ ক্ষেত্রে একটা বড় উদাহরণ তার নির্মিত ছবি সিটি লাইটস। সিনেমা হিসেবে এটাকে কমেডি রোমাঞ্চ ছবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে এই ছবির অনেক দিকেই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ভেসে উঠেছে। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ছবিটির শুটিং শুরু হয় এবং ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শেষ হয়। ১৯২৮ সালে সবাক চলচ্চিত্র মুক্তির সময় চ্যাপলিন এই ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেন। তিনি তখনও নির্বাক সিনেমা নির্মাণের প্রতি অটল ছিলেন। ১৯৩১ সালের ৩০ জানুয়ারি ছবিটির মুক্তির পর প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে। আর্থার জনস্টন ও হোসে পাদিয়া-সহ চ্যাপলিন প্রথমবারের মতো সিটি লাইটস ছবির মিউজিক করেন।


ভবঘুরে ফুল
কিনতে গিয়ে
আবিষ্কার
করে
মেয়েটি অন্ধ

সিনেমার মূল গল্পে দেখা যায়, একটি ভাস্কর্যের আবরণ উন্মোচন করতে গিয়ে আবরণ উন্মোচনকারীগণ দেখতে পায় এক ভবঘুরে ভাস্কর্যটির কোলে শুয়ে আছে। পরবর্তীকালে পুলিশের তাড়া খেয়ে ভবঘুরেটি পালিয়ে যায়। এরপর দেখা যায়, একজন অপূর্ব সুন্দরী ফুল বিক্রেতা রাস্তার পাশে ফুল বিক্রি করছে। ভবঘুরে ফুল কিনতে গিয়ে আবিষ্কার করে মেয়েটি অন্ধ। মেয়েটির ফুল বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভবঘুরে তার পাশে বসে থাকে, আর সন্ধ্যা হলে কেনা ফুলটি নিয়ে সে একটি নদীর ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। সেখানে দেখা মেলে এক মাতালের সঙ্গে। মাতালটি পাথর ও দড়ি নিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করলে ভবঘুরে তাকে বাঁচায়।

চার্লি চ্যাপলিন
সিটি লাইটস

মাতাল লোকটি খুশি হয়ে ভবঘুরেকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে যায়। লোকটি খুব বিত্তবান। মাতাল ও ভবঘুরের মাঝে বন্ধুত্ব হয় এবং এই বন্ধুত্ব তারা মদ পান করে সেলিব্রেট করে। এরপর তারা একটা নাইট ক্লাবে গিয়ে তাদের বন্ধুত্বকে আরও বড় করে সেলিব্রেট করে। সকালে আবার তার বন্ধুকে নিয়ে আসে। ভবঘুরে এবার মেয়েটিকে পথে ফুল বিক্রি করতে দেখে এবং মেয়েটিকে তার বড়োলোক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে মেয়েটির সব ফুল কিনে নেয়, এমনকি মেয়েটিকে বন্ধুর গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। অন্ধত্বের কারণে মেয়েটি ভবঘুরের হত-দরিদ্র চেহারা দেখতে পায় না। কিন্তু ধারণা করতে থাকে, কোনো বড়লোক ব্যক্তি নিশ্চয় তাকে সাহায্য করেছে। আর ভবঘুরে আবার বড়লোক বন্ধুর কাছে ফিরে গেলে নেশা কেটে যাওয়ায় বড়লোক বন্ধুটি তাকে চিনতে পারে না। ফলে বন্ধুটির বাড়ির লোক তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। পথে বন্ধুটির সঙ্গে আবারও দেখা হয় ভবঘুরের। বন্ধুটি তখন আবারও নেশাগ্রস্ত। এবং একই রকম ঘটনা আবার ঘটে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ‘বন্ধু’ বলে জড়িয়ে ধরলেও পরের দিন নেশা কেটে যাবার পর আর চিনতে পারে না।

মেয়েটির বাড়ি গিয়ে ভবঘুরে দেখতে পায়, মেয়েটি অসুস্থ। ভবঘুরে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ নেয়। উপার্জিত টাকা দিয়ে মেয়েটির জন্য খাবার ও উপহার নিয়ে যায়। একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে, চিকিৎসার মাধ্যমে মেয়েটিকে সুস্থ করা সম্ভব। মেয়েটিকে সে আশ্বাস দেয়, চিকিৎসার মাধ্যমে চোখ ভালো করার। এবং মেয়েটির বাড়ি ভাড়া পরিশোধের আশ্বাসটিও দেয়। ঠিক তার পরের দিন কাজে দেরি করে গেলে ভবঘুরের চাকরি চলে যায়। এরপর সে এক ধান্ধাবাজের পাল্লায় পড়ে বক্সিং খেলায় অংশ নেয়। কিন্তু ধান্ধাবাজের নির্দিষ্ট প্রতিযোগী পরিবর্তন হয়ে যায় এবং ভবঘুরে হেরে যায়।

চার্লি চ্যাপলিন
সিটি লাইটস

রাস্তায় আবার দেখা হয় তার মাতাল বড়লোক বন্ধুর সঙ্গে। মাতাল তাকে আবার বাড়ি নিয়ে যায় এবং বন্ধুর মন খারাপ দেখে মেয়েটির চিকিৎসার জন্য টাকা দেয়। এদিকে ঐ বাড়িতে দুইজন চোর আগেই লুকিয়ে ছিল। মাতালকে মেরে অজ্ঞান করে তারা পালিয়ে যায়। পুলিশ এসে ভবঘুরের কাছে টাকা দেখে তাকে আটক করে। যদিও সে জানায়, তার বন্ধুই তাকে টাকা দিয়েছে; কিন্তু মাতালের জ্ঞান ফেরার পর তাকে আর চিনতে পারে না। পুলিশ তাকে নিয়ে যেতে চাইলে ভবঘুরে তাৎক্ষণিক পালিয়ে যায় এবং মেয়েটিকে তার বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও দোকান করার জন্য সমস্ত টাকা দিয়ে দেয়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর ভবঘুরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ও জেলে যায়।


ভবঘুরের হাতে ফুল দিতে
গেলে হাতের স্পর্শে সে
বুঝতে পারে, এর
জন্যই তার
এতদিনের
অপেক্ষা

মেয়েটি ঐ টাকা দিয়ে নিহের চোখের চিকিৎসা করে এবং সুস্থ হয়ে একটি বড় ফুলের দোকান দেয়। তাকে সাহায্য করা মানুষটির জন্য শুরু হয় মেয়েটির প্রতিদিনের অপেক্ষা। কোনো গাড়ি থামলেই তার ধারণা হয়, এই বুঝি সে এলো। তারপর একদিন ভবঘুরের জেলজীবনের সমাপ্তি ঘটে। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর সে আবার পথের ধারে হাঁটতে থাকে, যেখানে মেয়েটি ফুল বিক্রি করত। কয়েকটি ছেলে তাকে পাগল ভেবে ঢিল ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে ভবঘুরেটি মেয়েটির দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় মনের অজান্তে। মেয়েটি ও তার দাদী ছেলেদের ঢিল ছোড়া দেখে হাসতে থাকে। ভবঘুরে মেয়েটিকে চিনতে পেরে থমকে দাড়ায়। জীর্ণ পোশাক ও হতদরিদ্র পোশাকে তাকে ভিখারি ভেবে মেয়েটি একটি কয়েন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে সরে যায়। ফুল নিয়ে আবার এগিয়ে আসে মেয়েটি। ভবঘুরের হাতে ফুল দিতে গেলে হাতের স্পর্শে সে বুঝতে পারে, এর জন্যই তার এতদিনের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে একটা সুন্দর মুহূর্তের মাঝে সিনেমা শেষ হয়।

চার্লি চ্যাপলিন
সিটি লাইটস

সিনেমায় নির্মাতা কমেডিভাব ঠিক রেখে অদ্ভুতভাবে দেখিয়েছেন হাসি ও কান্নার একটা স্পষ্ট রূপরেখা। কারও কারও কাছে ছবিটি স্রেফ কমেডি রোমাঞ্চ ধাচের হলেও, নির্মাতা এখানে অনেক দার্শনিক দিক ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন, মাতাল বড়লোক বন্ধুর চরিত্রটি– যে মাতাল অবস্থায় ভবঘুরেকে বন্ধুভাবে, কিন্তু নেশার ঘোর কেটে গেলে আর চিনতে পারে না। এ যেন বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই প্রতিরূপ। উচ্চমহল, পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যম দরিদ্র সমাজকে নিয়ে যতই মাতামাতি করুক, তারও একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকে। ঠিক নেশাগ্রস্ত মাতাল অবস্থায় যখন বড়লোক বন্ধু জীর্ণ-শীর্ণ পোশাকে ভবঘুরেকে বন্ধু ভাবতে থাকে, তারপর অন্ধ মেয়েটির প্রতি ভবঘুরের প্রেম– এসব দর্শকের মনে অনেকটা নাড়া দেওয়ার মতো। সব মিলিয়ে একটি কৌতুকনির্ভর প্রেমের ছবিতে একজন সাধারণ ভবঘুরের জমে থাকা ভালোবাসা ও ধনী-গরিব দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলাই ছিল নির্মাতার সাফল্য। ছবির ভাষা ও চিন্তার গুণে সিটি লাইটস হয়ে আছে চ্যাপলিনের সেরা সিনেমাগুলোর একটি।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক, চলচ্চিত্রকর্মী; বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন