সাক্ষাৎকারে সার্জো লিওনি : মৃত্যু ঘটছে, হায়, স্বয়ং সিনেমার!

0
110
sergio leone

সাক্ষাৎকার • পিট হ্যামিল ।। অনুবাদ  রুদ্র আরিফ


সার্জো লিওনি [৩ জানুয়ারি ১৯২৯–৩০ এপ্রিল ১৯৮৯]। ইতালিয়ান মাস্টার ফিল্মমেকার। ‘স্পাগেত্তি ওয়েস্টার্ন’ ফিল্মধারার প্রবর্তক। ডলারস ট্রিলজি– ‘অ্যা ফিস্টফুল ডলারস’ [১৯৬৪], ‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড, দ্য আগলি’ [১৯৬৬], ‘ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’-এর [১৯৬৮] এই নির্মাতার সঙ্গে, তাঁর সর্বশেষ সিনেমা– ‘ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকা’ [১৯৮৪] নির্মাণের পরপরই এই আলাপটি করেছেন আমেরিকান সাংবাদিক পিট হ্যামিল [১৯৩৫–]

sergio leone
ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকা

পিট হ্যামিল
আপনি যখন ছোট ছিলেন, আপনার মাথায় আমেরিকান কোনো ছবি ছিল কি?

সার্জো লিওনি
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ছিল। শিশু বয়সে আমাদের কল্পরাজ্যে রোমাঞ্চের সঞ্চার ঘটাত আমেরিকা। আমার ধারণা, যে সমস্ত শিশু কমিকস বই কিনত, জেমস ফেনিমোর কুপার ও লুইজা মে অ্যালকটের বই পড়ত ও সিনেমা দেখত– আমেরিকা তাদের সবার কল্পরাজ্যেই রোমাঞ্চের সঞ্চার ঘটিয়েছে। পুরনো পৃথিবী, বুড়োদের পৃথিবীকে অস্বীকারের মন্ত্র হলো আমেরিকা। আমি থাকতাম রোমে [ইতালি]; ১৯২৯ সালে সেখানেই আমার জন্ম; তখন এ শহরটি ছিল মুসোলিনি সাম্রাজ্যের মেলোড্রামার রাজধানী : চারপাশে সংবাদপত্রের ছড়াছড়ি, টোকিও বার্লিনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, এবং একের পর এক মিলিটারি প্যারেড। তবে আমার আবাস ছিল একটি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী পরিবারে– যেটির ছিল সিনেমার প্রতিও অনুরাগ; ফলে কোনো রকম অজ্ঞতার ভোগান্তি আমাকে পোহাতে হয়নি। সিনেমা দেখেছি গণ্ডায় গণ্ডায়।


মুখের ওপর দুর্দান্ত
এক সাংস্কৃতিক
চটকানা
পড়েছিল
তখন
আমার

যাহোক, মূলত বিশ্বযুদ্ধের পরই আমি হলিউডের এইসব জাদুমন্ত্রের প্রতি সন্দেহাতীতভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠি। ইয়াঙ্কি আর্মি আমাদের জন্য শুধু সিগারেট, চকোলেট-বারই বয়ে আনেনি; নানা মুদ্রা, পিচ ফলের আচারের সঙ্গে ভিত্তোরিও দে সিকার শ্যুশাইন উপভোগের পাশাপাশি, তারা ইতালিতে নিয়ে এসেছিল লাখ লাখ সিনেমা– যেগুলো কোনোদিনই ইতালিয়ান ভাষায় ডাবিং করা হয়নি। টানা দুই-তিন বছর আমি প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টি করে সিনেমা দেখেছি। ওয়েস্টার্ন, কমেডি, গ্যাংস্টার ফিল্ম, যুদ্ধের কাহিনি– সব ধরনেরই সিনেমার সমাহার ছিল সেটি। প্রকাশনাসংস্থাগুলো [আর্নেস্ট] হেমিংওয়ে, [উইলিয়াম] ফকনার, [ডেশিল] হ্যামেট, ও জেমস কেইনের সাহিত্যকর্মগুলোর অনুবাদ ছাপতে থাকল। মুখের ওপর দুর্দান্ত এক সাংস্কৃতিক চটকানা পড়েছিল তখন আমার।

sergio leone
অ্যা ফিস্টফুল অব ডলারস

আর এ বিষয়টিই আমাকে বুঝিয়েছিল– আমেরিকা সত্যিকারঅর্থেই দুনিয়ার সম্পদ; এবং তা শুধু আমেরিকানদের জন্যই নয়, বরং তাদের জন্যও, যারা– আরও অনেক কিছুর সঙ্গে, আমেরিকান জীবনযাপন পদ্ধতির জলে নিজেদের পৌরাণিক আইডিয়াগুলোর ওয়াইনকে মিশিয়ে দিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেছে। স্প্যানিশ জাহাজগুলোর মাধ্যমে আবিষ্কৃত হওয়ার এবং সারাদুনিয়ার উপনিবেশ থেকে জনসংখ্যা জড়ো হওয়ার আগে থেকেই, আমেরিকা ছিল জগতের কিছু দার্শনিক, ভবঘুরে ও হতভাগ্য মানুষের স্বপ্নের জায়গা। আমেরিকানরা এটিকে ভাড়া দিয়েছে কেবল সাময়িকভাবেই। তারা যদি ভালো আচরণ না করত, পৌরাণিক স্তরটি যদি নেমে যেত, যদি তাদের সিনেমা আর কোনো কাজেই না লাগত এবং যদি তাদের ইতিহাস হয়ে পড়ত একেবারেই সাদামাটা ও রুটিনবদ্ধ মানের– তাহলে তাদেরকে আমরা উচ্ছেদ করে দিতে পারতাম। কিংবা আবিষ্কার করতে পারতাম অন্য কোনো আমেরিকা। চুক্তি তো যেকোনো সময়ই বাতিল হয়ে যেতে পারে।

পিট হ্যামিল
আপনার বাবা, ভিনসেঞ্জো লিওনি ছিলেন ফিল্মমেকার। সিনেমার প্রতি আপনার প্রথমদিকের মনোভাবে সেটি কতটা প্রভাব ফেলেছিল?

সার্জো লিওনি
ছোটবেলায় তো বিশ্বাসই করতাম, আমার বাবাই সিনেমা আবিষ্কারক। আমি জানতাম, বাবা ছিলেন সান্তাক্লজ; আর সিনেমার ময়দানের অন্য দিকটিতে, সিনেমার পর্দার জ্যামিতিক রেখাগুলোর পেছনে টেকনিশিয়ান, মেকআপ আর্টিস্ট, সিন-শিফটার ও হেয়ারড্রেসার-সহ বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। বৈদ্যুতিক তার, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, রিফ্লেক্টর– এ সবকিছু সম্পর্কেই জানা ছিল আমার। সম্ভবত এ কারণেও আমার ফিল্মমেকিংয়ের ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল দিকটির গুরুত্ব এত বেশি। আমি ডাবিংরুমে এমন মনোভাব নিয়ে ঢুকি, যেন যাচ্ছি কোনো জনসমাগমে; এবং আমার কাছে মিক্সেজটিই হলো সবচেয়ে পবিত্র সংস্কার। আমি মনে করি, ফিল্মমেকিং নিজেই একটি মজার ব্যাপার; বিশেষ করে ডেথভ্যালিতে ও ব্রুকলিন ব্রিজের নিচে– যেখানে নেকড়েগুলো কাঁদে আর ভেড়াগুলো নিজেদের শিং দিয়ে বাঁশি বাজায়।

তবে মুভিওলা [ফিল্ম এডিটিং ডিভাইস] একটি কালোজাদুবিদ্যার পূজাবেদি। এখানে কেউ [ফিল্মমেকার] পর্দার সামনে বসে থাকে, আর নিজের হাত দিয়ে স্বর্গের মহিমার সঙ্গে খেলা করে।

sergio leone
দ্য গুড, দ্য ব্যাড, দ্য আগলি

পিট হ্যামিল
আপনার ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকার চিত্রনাট্যের শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়াটির কথা একটু বলবেন?

সার্জো লিওনি
দ্য গুড, দ্য ব্যাড, অ্যান্ড দ্য আগলি
 বানানোর পরপরই, ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকার বিষয়বস্তুটি আমার কানে গুঞ্জরণ করতে শুরু করে। যে বইটি অবলম্বনে এটি নির্মিত, হ্যারি গ্রের সেই দ্য হুডস [১৯৫৩] আমি পেয়েছিলাম রোমের একটি বইয়ের দোকানে। অন্য যেকোনোকিছুর চেয়ে এটির মধ্যে সিনেমায় একটি নিখুঁত ও আদুরে বন্দনা হয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিল। ইহুদি গ্যাংস্টারদের এই কাহিনিটি, দুর্ভাগ্যক্রমে দেবতাদের তিনবারের বেশি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল এবং চেয়েছিল পাঁচবারেরও বেশি জানাতে; এটির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল যেন পুরনো সিনেমা দ্য মামিতে [কার্ল ফ্রিয়ান্ড; ১৯৩২] বরিস কার্লোফের [কার্লোফ অভিনীত চরিত্র দ্য মামি চরিত্রটির] মতো অভিশাপগ্রস্ত। আমি এটি ছাড়া অন্য কোনো সিনেমা বানাতে চাইনি।

এটির সিনেমাটোগ্রাফিক অ্যাডাপটেশনের স্বত্ব ইতোমধ্যেই সিনে-দুনিয়ার অন্য হোমড়া-চোমড়াদের হাতে চলে গেলেও, আমরা তা অর্জনের চেষ্টা শুরু করি। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না; তবে শেষ পর্যন্ত চাতুর্য ও প্রচুর ডলারের বিনিময়ে আমরা সেটি পেয়ে যাই : আইনসঙ্গত স্বত্বাধিকারীদের কাছ থেকে এটির স্বত্ব ছিনিয়ে আনি। বিষয়গুলো কোনদিকে গড়াচ্ছে– সেটির প্রথম সঙ্কেত ইতোমধ্যেই পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। তারপর চিত্রনাট্য লেখার সেই নারকীয় পর্বটির সূচনা ঘটে। প্রথমদিকে নরম্যান মেইলার এ নিয়ে কাজ করেছেন। এক বাক্স সিগারেট, নিজের টাইপরাইটার ও এক বোতল হুইস্কি নিয়ে, রোমের একটি হোটেলে নিজেকে বন্দি করে ফেলেন তিনি। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে আমাকে জানাতে হচ্ছে, তিনি কেবল একটি মিকি-মাউস ভার্সনেরই জন্ম দিতে পেরেছিলেন; অন্তত আমার চোখে, সিনেমার কোনো লেখক নয়, বরং পুরনো এক অনুরাগীর চোখে এমনটাই ধরা পড়েছে।


একেবারেই
টানা দুই বছর কাজ
করে, অবশেষে পৌঁছতে পারলাম
বন্দরে; আমার মনে হলো, বাতাসে
যেন নিশানা উড়ছে, আর ক্রুরাও রয়েছেন অক্ষত

রহস্যময় সব তর্ক-বিতর্কে প্রোডাকশনটি ছিন্নভিন্ন হতে থাকে : বাস্তব সমস্যা ও অতিপ্রাকৃত সমস্যা, সব ধরনের মেটাফিজিক্যাল সমস্যার এ ছিল এক জগাখিচুরি। আর প্রতিটি চিত্রনাট্য ধারাবাহিকভাবে হয়ে ওঠতে থাকে কনসেপ্টটির একেকটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। তারপর, দীর্ঘদিন কেটে যাওয়ার পর আমি স্বেচ্ছায় গিয়ে হাজির হলাম এই শত্রুটির কাছে– প্রোডাকশনের লক্ষ্য নিয়ে; সেই আরনন মিলচানের সঙ্গে করলাম মিটিং– যিনি সিনেমাটোগ্রাফিক প্রোডাকশনে নিজেকে উৎসর্গ করার আগে, নিশ্চয়ই কোনো গথিক ক্যাথিড্রলে কোনো এক্সরসিস্টের ভূমিকায় কর্মরত ছিলেন! ঘটনা হলো, এরপর থেকেই প্রতিটি মুহূর্তে সবকিছু ঠিকঠাক জায়গা পেতে শুরু করল। গোয়েন্দাকাহিনির লেখক ও সিনেমার অনুরাগী– লিও বেনভেনুতি ও স্টুয়ার্ট ক্যামিন্সকি অলৌকিকভাবে চিত্রনাট্যটির উপসংহার টানলেন। আকাশে আবার জ্বলে ওঠল সূর্য; আর আমরা সবাই সেই তুখোড় অভিযানটিতে নেমে পড়লাম। আমরা একেবারেই টানা দুই বছর কাজ করে, অবশেষে পৌঁছতে পারলাম বন্দরে; আমার মনে হলো, বাতাসে যেন নিশানা উড়ছে, আর ক্রুরাও রয়েছেন অক্ষত।

sergio leone
ফর অ্যা ফিউ ডলারস মোর

পিট হ্যামিল
আমেরিকান মিথ আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে বলেই মনে হয়; প্রথমে ওয়েস্ট মিথ, আর এখন গ্যাংস্টার। এর কারণ কী?

সার্জো লিওনি
আপনি বললেন যদিও, তবে আমি কিন্তু ওয়েস্ট মিথ কিংবা গ্যাংস্টার মিথের মন্ত্রমুগ্ধ নই। আমেরিকার মিথিক্যাল বিশ্বাসগুলোতে নিউইয়র্কের পূর্বের ও লস অ্যাঞ্জেলেসের পশ্চিমের সবার মতো আমি কিন্তু সম্মোহিত নই। আমি ব্যক্তিমানুষের কথা, এবং অনন্ত দিগন্তের কথা– এল ডোরাডোর [মিথিক্যাল চরিত্র] কথা বলছি। আমার বিশ্বাস, একেবারেই দুর্লভ ও অনন্যসাধারণ ঘটনাগুলোর কথা যদি বাদ দিই, সিনেমা আসলে এইসব আইডিয়ার সঙ্গে কখনোই একাকার হয়ে ওঠতে পারেনি। আপনি যদি এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেন, আমেরিকা স্বয়ং এই ডিরেকশনটির প্রতি খুব একটা প্রচেষ্টা চালায়নি কখনোই। তবে সিনেমা যে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মতো নয়, বরং এ বিষয়টি নিয়ে নিজের সাধ্যমতো কাজ করেছে– সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই কোনো। স্রেফ ইজি রাইডার [ডেনিস হোপার; ১৯৬৯], ট্যাক্সি ড্রাইভার [মার্টিন স্করসেজি; ১৯৭৬], স্ক্যারফেস [ব্রায়ান ডি পালমা; ১৯৮৩] কিংবা রিও ব্র্যাভোর [হাওয়ার্ড হকস; ১৯৫৯] কথাই ধরুন। জন ফোর্ডের সুবিস্তৃত স্পেস ও মার্টিন স্করসেজির মেট্রোপলিটান ক্লজট্রোফোবিয়া [বা, মহানগরীয় অবরোধাতঙ্ক], আর আমেরিকান ডেইজিফুলের পরিবর্তনশীল পাঁপড়ি আমি ভালোবাসি। রূপকথার পরীদের মতো করে কথা বলে আমেরিকা : যদি নিঃশর্ত আকাঙ্ক্ষা করতে পারো, তবে তোমার ইচ্ছেগুলো মঞ্জুর হবে। কিন্তু কোনো কাঠামোতে তুমি সণাক্তযোগ্য হবে না কখনোই। আমার ফিল্মমেকিংটি আসলে এইসব নীতিগল্পের সঙ্গে খেলা করে। সমাজতত্ত্বকে আমি তারিফ করি ঠিকই, তবু উপকথাগুলো– বিশেষত সেগুলোর অন্ধকার দিকটি আমাকে পুলকিত করে। আমি মনে করি, কোনোভাবেই আমার পরবর্তী সিনেমাটি আরেকটি আমেরিকান উপকথা হতে যাচ্ছে না। তবু এখানে এ কথাটি আমি বলি, এবং এখানেই এটিকে করি অস্বীকার।

পিট হ্যামিল
ওয়েস্টার্ন ধারাটিকে ফিল্মিধারা হিসেবে মৃত মনে হয় কেন? এটির জায়গা কি গ্যাংস্টার ফিল্ম দখল করে নিয়েছে?


সমাজতাত্ত্বিক সত্যের অধ্যাপকদের মাধ্যমে,
বিরক্তিকর একঘেয়েমিকে স্পষ্ট
করে তোলা স্কুলশিক্ষকদের
মাধ্যমে নিজের
হাড়গুলোর
ক্ষয়ে যাওয়া
থেকে বেঁচে যাওয়ার
বিপজ্জনক সুবিধাটি সম্ভবত ওয়েস্টার্ন
ধারার তুলনায় গ্যাংস্টার ধারাটিই বেশি উপভোগ করে

সার্জো লিওনি
ওয়েস্টার্ন ধারাটি মৃত নয়; অতীতেও ছিল না, এখনো নয়। বরং মৃত্যু ঘটছে, হায়, স্বয়ং সিনেমারই! সমাজতাত্ত্বিক সত্যের অধ্যাপকদের মাধ্যমে, বিরক্তিকর একঘেয়েমিতাকে স্পষ্ট করে তোলা স্কুলশিক্ষকদের মাধ্যমে নিজের হাড়গুলোর ক্ষয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যাওয়ার বিপজ্জনক সুবিধাটি সম্ভবত ওয়েস্টার্ন ধারার তুলনায় গ্যাংস্টার ধারাটিই বেশি উপভোগ করে। ভালো সিনেমা বানাতে প্রচুর সময়, প্রচুর অর্থ, এবং প্রচুর মঙ্গলকামনা থাকা চাই। তা গতকাল আপনার যতটুকু প্রয়োজন ছিল, আজকে থাকা চাই তার দ্বিগুণ। যেখানে এইসব ঐশ্বর্য একবার পৃষ্ঠতলের খুব নিকটে চকচক করে উঠেছিল– ক্যালিফোর্নিয়ার সেই মুভিল্যান্ডে [হলিউড], এই বুড়ো সোনালী ধমনীটি দুর্ভাগ্যক্রমে এখন প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে বলেই মনে হয়। সামান্য কয়েকজন দুঃসাহসী খনিশ্রমিক এখনো খননের গোঁ ধরে আছেন, তারা ঘ্যানঘ্যান করছেন আর অভিশাপ দিচ্ছেন টেলিভিশন, নিয়তি ও দুনিয়ার যত স্টুডিওগুলোকে, হতদরিদ্র করে তোলা দর্শনযোগ্যতার এই যুগটিকে। কিন্তু তারা তো ডাইনোসর; তাদেরকে তো বিলুপ্তির পথে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

sergio leone
১৯৬৬ । সার্জো লিওনি, তার দুই কন্যা, এবং ক্লিন্ট ইস্টউড

পিট হ্যামিল
ক্লিন্ট ইস্টউডের মধ্যে কী এমন খুঁজে পেয়েছিলেন, যেটি সে সময়ের আমেরিকায় অন্য কেউই দেখতে পায়নি?

সার্জো লিওনি
গল্পে আছে, মিকেলাঞ্জেলোকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মার্বেলের সেই সবিশেষ ব্লকটির মধ্যে তিনি কী খুঁজে পেয়েছিলেন– যেটিকে এমনও হাজারটির মধ্য থেকে বেছে নিয়েছেন; জবাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি মুসাকে [নবী] দেখেছিলেন। আপনার প্রশ্নটির একই উত্তর আমি দিতে চাই, তবে কেবল একটু পিছু-হটে। যখন জানতে চাওয়া হয়, ক্লিন্ট ইস্টউডের মধ্যে কী এমন দেখেছিলাম– যিনি ১৯৬৪ সালে এক ওয়েস্টার্ন টিভি সিরিজের দ্বিতীয় সারির কী ধরনের চরিত্রটি অভিনয় করছিলেন– তা না জেনেই; জবাবে বলি, যা দেখেছিলাম, তা হলো স্রেফ– মার্বেলের একটি ব্লক।

পিট হ্যামিল
অভিনেতা হিসেবে বরার্ট ডি নিরোর সঙ্গে ইস্টউডের তুলনা আপনি কীভাবে করবেন?


বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের
ভেতর দিয়ে ইস্টউড যেন
কোনো স্লিপওয়াকারের
মতো হাঁটেন

সার্জো লিওনি
ইস্টউড ও ডি নিরোর মধ্যে তুলনা টানা কঠিন। প্রথমটি মোমের একটি মুখোশ। বাস্তবে, আপনি যদি এ নিয়ে ভাবেন, দেখবেন– তারা দুজনে আসলে একই পেশার লোক হওয়ার কথাই নয়। রবার্ট ডি নিরো নিজেকে এটা-ওটা চরিত্রে ছুড়ে দিয়েছেন এতই সহজাত ও সাবলীলভাবে, এমন এক ব্যক্তিত্বের ভেতর ঢুকে গেছেন– যেখানে অন্য কেউ হলে হয়তো তার কোটের ভেতর ঢুকে যেত; অন্যদিকে ক্লিন্ট ইস্টউড নিজেকে ছুড়ে দিয়েছেন একটি বর্ম-পোশাকের ভেতর, এবং ভয়াবহ ঝনঝনে শব্দ সহকারে ক্রুদ্ধ চাহনি দিয়েছেন শিরস্ত্রাণের মুখাবরণটির দিকে। এটি ঠিক সেই বিষণ্ন শিরস্ত্রাণ– যা কিনা তার চরিত্রটির সঙ্গে মানিয়ে গেছে। আর এই ক্যাচক্যাচে-ঝনঝনে আওয়াজ– এটি যেন ভেনিসের হ্যারি’স বারের [পানশালা] কোনো মার্তিনির [মদবিশেষ] মতোই ক্রমাগত শুষ্ক হয়ে ওঠা– এও কিন্তু তারই বৈশিষ্ট্য। তাকে খেয়াল করে দেখুন। বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ভেতর দিয়ে ইস্টউড যেন কোনো স্লিপওয়াকারের মতো হাঁটেন; সবসময়ই এমন তিনি– মার্বেলের কোনো ব্লক যেন। ববি [রবার্ট ডি নিরোর ডাকনাম] প্রথমত একজন অভিনেতা। ক্লিন্ট প্রথমত একজন তারকা। ববি সহনশীল থাকেন, ক্লিন্ট তোলেন হাই।

পিট হ্যামিল
একজন অভিনেতার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে যাওয়া সম্ভব– এ বিষয়টি আপনাকে অবাক করে? এটি কি কোনো ফিল্মমেকারের হওয়ার ছিল?

সার্জো লিওনি
আপনাকে খোলাখুলি বলি, কোনোকিছুই এখন আর আমাকে অবাক করে না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট, বৈচিত্র্যের জন্য, একজন অভিনেতা হয়ে উঠেছেন– এমন খবর সংবাদপত্রে পড়লেও আমি চমকাব না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা সেই সুনির্দিষ্ট অভিনেতাদের করা সিনেমাগুলোর চেয়ে তিনি বাজে সিনেমাগুলোতেই কাজ করেছেন– এমনটা ঘটলে নিজের অবাক হওয়াকে লুকোতে পারব না আমি। যাহোক, খুব বেশি প্রেসিডেন্টকে আমি চিনি না; তবে অনেক অভিনেতাকে ঠিকই চিনি। ফলে নিশ্চিতভাবেই জানি, অভিনেতারা হলেন শিশুদের মতো– বিশ্বাসপ্রবণ, আত্মপ্রেমী, খামখেয়ালি। অতএব, সামঞ্জস্যের বিবেচনায় আমি কল্পনা করে নিতেই পারি, প্রেসিডেন্টরাও শিশুদের মতোই। উদাহরণ হিসেবে বলি, কেবল একজন শিশুই– যিনি প্রথমে অভিনেতা ও পরে প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠেছিলেন, তিনি গুরুতরভাবে বিশ্বাস করতে পারেন দ্য ডে আফটার-এর [নিকোলাস মায়ার; ১৯৮৩] সেই গুপ্তরহস্য– নতুন হলদেটে বিপদ-আশঙ্কাটি যার জানা।

sergio leone
১৯৮৪ । সার্জো লিওনি ও রবার্ট ডি নিরো

একজন ফিল্মমেকারের পক্ষে কোনো প্রেসিডেন্টের রূপে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটি একেবারেই কম। তাকে বরং সিক্রেট সার্ভিসের প্রধানকর্তার চরিত্রে আমি ফুটিয়ে তুলতে পারি। তিনি বন্ধকি দোকানগুলোতে আসবেন-যাবেন, আর লোকজন নাচবে, শেষ পর্যন্ত তা আর কিছু না হোক, ভালো একটি শো অন্তত হয়ে ওঠবে। দৃশ্যটি যদি কাজের হয়, তবে তো বেশ। অন্যথায়, সেটি আরেকবার করাতে হবে আপনাকে। বুড়ো ইউরি আন্দ্রোপভ [সোভিয়েত রাজনীতিক] যদি পুলিশ না হয়ে ফিল্মমেকার হতেন, তাহলে হয়তো অতি ব্যাপকমাত্রায় পেশাগত সন্তুষ্টিকে করতে পারতেন উপভোগ; আর কে জানে, হয়তো আরও বেশিদিন আয়ু পেতেন তিনি।


আপনি
কি
কোনোভাবে
নারীবিদ্বেষী?

পিট হ্যামিল
আপনার বেশির ভাগ সিনেমাই ভীষণ রকম পুরুষ-কেন্দ্রিক। আপনি কি কোনোভাবে নারীবিদ্বেষী?

সার্জো লিওনি
আমার মধ্যে কোনো ধরনের নারীবিদ্বেষ নেই; বরং ঘটনা হলো, নারীরাই আমার সেরা বন্ধু। আপনি কী ভাবছেন? সংখ্যালঘুত্ব আমি সহ্য করি। সংখ্যাগুরুদের হাতে চুমু খাই ও তাদের শ্রদ্ধা করি আমি; ফলে আপনি স্রেফ ভাবতেই পারেন, স্বর্গের অন্য অর্ধের প্রতিমার সামনে কীভাবে দিনে তিন-চারবার নতজানু হই। ভাবুন তো, আমি কিন্তু এক নারীকে বিয়েও করেছি; একটি হতচ্ছাড়া পুত্রের পাশাপাশি, দুই নারীও রয়েছে সংসারে– যারা আমার কন্যা। যদি এখনো পর্যন্ত আমার সিনেমায় নারীরা উপেক্ষিত থেকে থাকে, তার মানে এই নয়– আমি নারীবিদ্বেষী কিংবা উগ্র পুরুষবাদী। এর কারণ এগুলো মোটেও নয়। আসলে আমি সবসময় এপিক সিনেমা বানাই, এবং এপিক সিনেমা উৎপত্তিগত দিক থেকেই একটি পুরুষালি দুনিয়া।

ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট-এ ক্লাউদিয়া কার্দিনালে যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন, সেটি আমার কাছে একটি যথাযোগ্য নারী চরিত্র। ফলে বলতে পারি, সে যথার্থই একটি অনভ্যস্ত ও সহিংস চরিত্র। যেকোনো বিচারেই অনেক বছর ধরে আমি মনে মনে এক নারীকে ঘিরে একটি সিনেমা বানানোর স্বপ্ন বুনছি। প্রতি রাতে ঘুমুতে যাবার আগে এটিকে ঘিরে যে আইডিয়াগুলো আমার মাথায় গুঞ্জরণ করতে থাকে, সেগুলো মোটেও খারাপ কিছু নয়। কিন্তু হয় দূরদর্শিতা, নয়তো কুসংস্কারের ফলে, কেবলমাত্র মানুষ হওয়ার কারণে, এবং হয়তো অতি-মানুষ হবার কারণেই এটি নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে চাই না। মনে পড়ে, ১৯৬৬ কিংবা ৬৭ সালের দিকে একবার আমেরিকান গ্যাংস্টারদের নিয়ে বানাতে চাওয়া একটি সিনেমার প্রজেক্ট নিয়ে আলাপ করেছিলাম ওয়ারেন বেটির সঙ্গে; এর অল্প কয়েক সপ্তাহ পরই তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন, বনি অ্যান্ড ক্লাইড [আর্থার পেন; ১৯৬৭] সিনেমাটি তিনি প্রডিউস ও সেটিতে অভিনয় করতে যাচ্ছেন! এইসব ঘটনাচক্র ও দূরদৃষ্টি আমাকে জ্বালাতন করে।

sergio leone
ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট

পিট হ্যামিল
ইতালিয়ান ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান ফিল্মমেকারদের সঙ্গে নিজেকে কতটা মানানসই মনে হয় আপনার? কোন ফিল্মমেকারদের কাজ আপনার ভালোলাগে? কাদের মনে হয় অতিমূল্যায়িত?

সার্জো লিওনি
হ্যাঁ, নির্দ্বিধায়ই, আমিও সিনেমার ইতিহাসে একটি জায়গা করে নিতে পেরেছি। ফিল্মমেকারদের সূচিপত্রে আমার নামটি ‘এল’ অক্ষরের শুরুতেই চলে আসে; আসলে আমার বন্ধু মারিও মনিচেল্লির নামের পরে এবং আলেক্সান্দার কোর্দা, স্ট্যানলি কুব্রিকআকিরা কুরোসাওয়ার নামের আগে আমি ছাড়া আর অল্প ক’টি নামই বসে। একটি আমেরিকান গোয়েন্দা উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইয়োজিম্বো নামের এক দুর্দান্ত সিনেমার মাধ্যমে নিজের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন যে লোকটি [কুরোসাওয়া], আমি অ্যা ফিস্টফুল অব ডলারস বানানোর সময় তার সেই সিনেমাটি থেকে প্রেরণা নিয়েছি। আমার [এই সিনেমার] প্রডিউসার খুব একটা বুদ্ধিমান ছিলেন না। কুরোসাওয়ার মেধাসত্ব দিতে ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। কুরোসাওয়াকে খুব সামান্য টাকাতেই তৃপ্ত করা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব ছিল; অথচ সেই এ ভুলের কারণে পরে আমার প্রডিউসার বাধ্য হয়েছিলেন তাকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা দিয়ে ধনী করে তুলতে! তবে দুনিয়া এভাবেই চলে। যেকোনো মূল্যেই সিনেমার ইতিহাসে জায়গা হয়ে গেছে আমার। ভালো ফিল্মমেকারদের যেকোনো তথ্যপুঞ্জিতে, ২৫০ থেকে ৩২০ পৃষ্ঠার মধ্যে, ‘কে’ ও ‘এম’ অক্ষরের মাঝামাঝি কোথাও না কোথাও আমার নামটি আপনি পেয়েই যাবেন। আমার নাম যদি লিওনি না হয়ে আন্তেলোপি হতো, তাহলে হয়তো তালিকার এক নম্বরেই থাকতাম! তবে লিওনি নামটিই আমার পছন্দ; স্বভাবগতভাবেই আমি কোনো শিকার নই, বরং শিকারী।
[ইতালিয়ান ‘আন্তেলোপি’র অর্থ– কৃষ্ণসারমৃগ বা হরিণবিশেষ; ‘লিওনি’র ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘লায়ন’, মানে সিংহ।
অনুবাদক]।


স্বভাবগতভাবেই
আমি কোনো
শিকার
নই,
বরং শিকারী

প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশটির জবাবে বলি, তরুণ আমেরিকান ও ব্রিটিশ ফিল্মমেকারদের প্রতি আমার ব্যাপক ভালোবাসা রয়েছে। [ফেদেরিকো] ফেল্লিনি[ফ্রাঁসোয়া] ত্রুফোকে আমার ভালোলাগে। আর, অতিমূল্যায়নের ব্যাপারে আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই। এ প্রশ্নটি আপনি কোনো সমালোচককে করতে পারেন; অতিমূল্যায়ন কিংবা অবমূল্যায়ন– এ ব্যাপারে বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরাই কেবল বলতে পারবেন। তবে সমালোচক হলেন সরকারি কর্মচারীর মতো; তিনি জানেনই না ঠিক কার জন্য কাজ করছেন।

পিট হ্যামিল
লেখক নাকি ফিল্মমেকার– কার অবস্থান আগে?

সার্জো লিওনি
ফিল্মমেকার। এ ব্যাপারে লেখককের কোনো বিভ্রম থাকতে নেই। তবে এরপরের জায়গাটি লেখকেরই। আর, ফিল্মমেকারদেরও এ ব্যাপারে কোনো বিভ্রম থাকা উচিত নয়।

পিট হ্যামিল
তরুণ ফিল্মমেকারদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

সার্জো লিওনি
আমি বলব, প্রচুর পরিমাণ কমিকবুক পড়ুন, সময় পেলেই টিভি দেখুন, এবং সবচেয়ে বড় কথা, আপনাকে মনে রাখতে হবে– সিনেমা স্রেফ অন্য ফিল্মমেকারদের, ও বাচাল সমালোকদের জননীর মতো উন্নাসিক কোনো জিনিস নয়। একটি সফল সিনেমা অতিজ্ঞানী থেকে শুরু করে নির্জ্ঞান লোকের সঙ্গেও যোগাযোগস্থাপনে সক্ষম। অন্যথায়, এটি হয়ে ওঠবে চারপাশে ডোনাট-বিহীন কোনো ফুটোর মতো।

sergio leone
ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকা

পিট হ্যামিল
এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড একবার বলেছিলেন, ‘অ্যাকশনই ক্যারেকটার’। আপনি এ কথার সঙ্গে একমত?

সার্জো লিওনি
সত্য হলো, আমি কোনো অ্যাকশনের ডিরেক্টর নই; আমার মতে, জন ফোর্ডও তা ছিলেন না। আমি বরং ইশারা ও নৈশব্দের ডিরেক্টর; এবং ইমেজের একজন বক্তা। যাহোক, আপনি যদি সত্যিই আমার জবাব জানতে চান, সেক্ষেত্রে ঘোষণা করছি, হ্যাঁ, বুড়ো এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে আমি একমত। আমিও নিজেকে মাঝেমধ্যে বলি, অ্যাকশনই ক্যারেকটার। কিন্তু সত্য হলো, আরো পরিষ্কার করে বললে, আমি আসলে বলি, ‘সিয়াক [ক্লেপারবোর্ড]! অ্যাকশন অ্যান্ড ক্যারেক্টার, প্লিজ।’ তার মানে, আমরা আসলে একই কথা বোঝাচ্ছি। অন্যদিকে, যেমন ধরুন, যখন আমি কোনো ডিনার টেবিলে থাকি, কখনো কখনো বলি, ‘সিয়াক! খাওয়া শুরু করা যাক। লবণের বাটিটা এগিয়ে দিন তো!’

পিট হ্যামিল
যখন সিনেমা বানান না, তখন কী করেন?

সার্জো লিওনি
স্বীকার করে নিচ্ছি, যখন শিশু ছিলাম, যখন আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করার স্বপ্ন কেউ দেখেনি, আমি সবসময়ই কল্পনা করতাম, বিচারকদের মতো খুব শুষ্ক ও দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিচ্ছি– এখানেই থামো! কিচ্ছু করতে হবে না। আমি আরকিছু শুনতেই চাই না। আমার গোপনীয়তা পুতপবিত্র; তোমার মতো গোলমালবাজ সাংবাদিকদের বিনোদন যোগাতে, খোলা ময়দানে সেটিকে মেলে ধরার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।” প্রতিবারই এমনটা বলার চেষ্টা করি, কিন্তু তারপর তারা [প্রশ্নকর্তারা] আমাকে কোনো কুকুরের মতো লজ্জায় ফেলে দেন, আর শেষ পর্যন্ত আমি ভয়ঙ্কর সত্যটি স্বীকার করে নিই। [আপনার প্রশ্নের] জবাব এ রকম : আমি সানবাথ নিই, সিনেমা দেখতে যাই, স্টেডিয়ামে যাই, নিজের পরবর্তী সিনেমাগুলো নিয়ে ভাবি, বই ও চিত্রনাট্য পড়ি, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করি, কখনো কখনো বেড়াতে যাই, দাবা খেলি, এবং বাজে ব্যাপার হলো– মাত্রাতিরিক্ত খুতখুতানি নিয়ে বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াই আর পরিবারের সদস্যদের জ্বালাতন করতে থাকি। লাকি লুকিয়ানো ও ডন ভিতো কর্লিওনি-সহ সব ইতালিয়ানের মতোই আমিও নিজের পরিবারের প্রতি ভীষণ অনুরাগী ঠিকই; তবে তাদের সঙ্গে ঠিক কীভাবে কথা বলা উচিত, আমি তা জানি না। তারা বলে, তারা আমার সঙ্গে জুড়ে আছে; কিন্তু সত্যি হলো, আমিই তাদের সঙ্গে জুড়ে আছি।

পিট হ্যামিল
ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকার কাজ তো শেষ করলেন, পেছন ফিরে তাকিয়ে এই ফিল্মটির মূল্যায়ন করতে পারবেন?

সার্জো লিওনি
ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আমেরিকা আমার শ্রেষ্ঠতম সিনেমা– এ কথা শপথ করে বলছি; এবং হ্যারি গ্রের বইটি যখনই হাতে নিয়েছিলাম, সেই মুহূর্তটিতেই এ কথা আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। এটি বানাতে পেরেছি বলে আমি আনন্দিত; যদিও শুটিংয়ের সময় ডিক ট্রেসির চোয়ালের মতো দুশ্চিন্তা আমার ভেতর ফুটে উঠেছিল। অবশ্য এটা তো সবসময়ই ঘটে। সিনেমার শুটিং সবসময়ই আতঙ্কের ব্যাপার হলেও, সিনেমাটিকে সুস্বাদু করে বানিয়ে তোলা লাগেই।


সূত্র • আমেরিকান ফিল্ম । ফিল্ম ম্যাগাজিন, যুক্তরাষ্ট্র । জুন ১৯৮৪
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন