কাঙাল মালসাট : জনগণের বাসনা ও দাঁড়কাকেদের নুনুকামান/ বিধান রিবেরু

0
336
Kangal Malsat
কাঙাল মালসাট
উৎস-উপন্যাস • কাঙাল মালসাট/ নবারুণ ভট্টাচার্য
স্ক্রিনরাইটার ও ফিল্মমেকার • সুমন মুখোপাধ্যায়
প্রডিউসার • পবন কানোরিয়া
সিনেমাটোগ্রাফার • অভীক মুখোপাধ্যায়
এডিটর • অর্ঘ্যকমল মিত্র
প্রোডাকশন ডিজাইন • সঞ্চয়ন ঘোষ
মেকআপ আর্টিস্ট • মোহাম্মদ আলী
কাস্ট [ক্যারেক্টার] • কবীর সুমন [দণ্ডবায়স], কৌশিক গাঙ্গুলী [মার্শেল ভদি], শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় [মদন], কমলিকা বন্দোপাধ্যায় [বেচামণি], দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য [ডিএস], মিস জোজো [বেগম জনসন], ঊষসী চক্রবর্তী [কালি], জয়রাজ ভট্টাচার্য [পুরন্দর ভাট]
ভাষা • বাংলা
দেশ • ভারত
রানিং টাইম • ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট
রিলিজ • ২ আগস্ট ২০১৩
Kangal Malsat 

লিখেছেন বিধান রিবেরু


আমরা সবাই আদর্শ সমাজকে ছুঁতে চাই। যদিও তার বাস্তবতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। মানুষ আদর্শ সমাজ গড়তে কিঞ্চিত হলেও অসফল হবে। তবুও আশাবাদী যে, সমাজ হবে মুখোশহীন আর সেই অভিযান নিয়েই আবার ফিরে আসবে ফ্যাতাড়ুরা, উড়ে বেড়াবে মুখোশহীন সমাজের বুকে। আর এবার তারা প্রবেশ করবে high thinking world দিয়েই। অপেক্ষায় থাকুন।
নবারুণ ভট্টাচার্য [ভট্টাচার্য ২০১৫: ১২৯]

 

দর্শ সমাজের ধারণায় কল্পনা ওরফে ইউটোপিয়া থাকে বলেই তাকে পুরোপুরি সফল করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার থাকা সত্ত্বেও তাই প্রকৃত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। উল্টো তাদের সাড়ে তিন দশকের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে নবারুণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে কাঙাল মালসাট-এর মতো উপন্যাস। সেখানে তিনি কল্পনার দুনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন ষোল আনা, তবে বাস্তবের সমালোচনা করতে ছাড়েননি এক আনাও। অতিপ্রাকৃত শক্তির জোড়ে যারা বাম সরকারকে আপস করতে বাধ্য করল, তারা আদতে কারা– সেটা মোটামুটি বোঝা গেলেও বেগম জনসন নামের এক চরিত্রকে নিয়ে অবশ্য অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েন, তৃণমূলের দিদি নয় তো! নাকি বিদেশি কোনো শক্তি?

যাহোক, উপন্যাসে সকল কিছুর ইঙ্গিত যেমন থাকবে, আবার ইঙ্গিতকে ছাড়িয়ে রূপকও থাকবে। আর তেমনি এক রূপক উঠে এসেছে কাঙাল মালসাট উপন্যাসে– সেটি হলো ‘নুনুকামান’। এই নুনুকামানের সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ যে আছে, তা তো স্পষ্টই; তবে এর সঙ্গে যে ক্ষমতার অর্থে ‘ফ্যালাসে’র [Phallus] যোগ নেই, সেটা কে অস্বীকার করবে? পুরুষাঙ্গের কল্পনাকে সঙ্গী করেই কামানের প্রতীকে রূপ নেয় ক্ষমতা, নাম হয় নুনুকামান। এখন এই কামান যাদের হাতে, তারাই ক্ষমতাবান। অন্তত কামান দাগার পর সেটাই প্রমাণিত হয়। এই নিবন্ধে আমরা বলার চেষ্টা করবো একটি কামানকে ঘিরে লেখক ও নির্মাতা কি করে নকল বিপ্লবীর মুখোশ আঁটা ক্ষমতাসীনদল ও মুক্তিকামী কিন্তু অসহায় জনগণের সমালোচনা করেছে।

 

Kangal Malsat
কাঙাল মালসাট । নবারুণ ভট্টাচার্য

২.

ক্ষমতার লড়াইটা শুরু হয় চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুদের মিলিত ষড়যন্ত্রে। তারা দুই সম্প্রদায়। চোক্তাররা কালো জাদুতে পারদর্শী, আর ফ্যাতাড়ুরা মন্ত্রবলে আকাশে উড়তে পারে। তাদের গুরুস্থানীয় দণ্ডবায়স, এক দাঁড়কাক, যাকে দুই দলই ‘বাবা’ সম্বোধন করে। আর আছে বেগম জনসন। দণ্ডবায়স এই বেগম জনসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট করে। উপন্যাসের কাহিনি খুব সোজা। বেগম জনসন ও দাঁড়কাকের হুকুমে সরকার উচ্ছেদে রক্তহীন এক বিপ্লব ঘটায় চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুরা। একবাক্যে এটাই কাহিনি। তবে ভেতরে ভেতরে জনগণ তথা বাঙালির কঠোর সমালোচনা করেছেন নবারুণ। আর বিদ্যমান সমাজের অসাড়তার কথাও বলেছেন সমান তালে। শুধু বলেই ক্ষান্ত হন না তিনি, মন খুলে গালাগালও করেছেন। ব্যাঙ্গ করেছেন। এই উপন্যাস থেকে, একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সুমন মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নে আমি বলব, বক্তব্যে খুব একটা উনিশ-বিশ হয়নি। বরং বলা যায় চালচ্চৈত্রিক রূপান্তরে কাঙাল মালসাট পেয়েছে ভিন্ন এক রূপ, যা বেশ উপভোগ্য।


ম্যালেরিয়া ও চলচ্চিত্র উৎসব
শেষ হতে না হতেই বাস চাপা
আর বাস জ্বালানোর দামামা
বেজে ওঠে এদের সমাজে
..
.

উপন্যাসে আমরা দেখি শাসক ও শোষিতের মাঝখানে একদল লোক, যারা মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাসী, তারাই বিপ্লব ঘটানোর ফন্দি আটে। এখন এই শোষিত কারা? বাঙালিরা! এই বাঙালি জনগণের প্রতি নবারুণের বেজায় গোসসা। এর কারণ, এরা নিজেরা ‘অসহায়’ শুধু নয়, হুজ্জত আর হাঙ্গামা পাকাতেও ওস্তাদ। এরা পড়ে পড়ে মার খাবে, তবু মাঝে মাঝে নানা উছিলায় ভুলে যাবে অন্যায় ও অবিচারের কথা। ম্যালেরিয়া ও চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হতে না হতেই বাস চাপা আর বাস জ্বালানোর দামামা বেজে ওঠে এদের সমাজে। ফাঁকফোঁকরে অপহরণ, কবিতা উৎসব, খুন, তহবিল তছরুপের টুকটাক ঘটনা ঘটতেই থাকে। এসব যেন বাঙালির গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে তাদের কোনো উত্তেজনা নেই। বাঙালি যেন জ্যান্ত মরা। তাই তো নবারুণ উপন্যাসে গুঁজে দেন দুটি লাইন : গু মাখিয়া মারি ঝাঁটা যত মনে লয়!/ বাঙ্গালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?

নবারুণ ভট্টাচার্য
নবারুণ ভট্টাচার্য

উপন্যাসের আরেকটি জায়গায় নবারুণ লিখছেন, …বাঙালি পাব্লিক আজকাল এত আমোদগেঁড়ে হয়ে পড়েছে যে কোনো কিছুই টিভিতে না হলে তাদের নজরে পড়ে না। আসলেই তো তাই! কোনো ঘটনার খবর পেলে আমরা প্রথমেই টিভি খুলি। এরপর টিভিতেই সিরিয়াল বা সিনেমা দেখার মতো করে ঘটনাটি দেখতে লেগে যাই। এতটাই প্রতিক্রিয়াহীন, নির্বিকার ও নিষ্পৃহ হয়ে উঠেছি আমরা। এই স্বভাব দেখেই নবারুণ চটে গিয়ে তার এই উপন্যাসে বলছেন,এই বাঙালি ভবিষ্যতে ল্যাকটোজেন দিয়ে ভাত মেখে খাবে আর যৌবনে বগলে পাউডার দিয়ে সরকারি নন্দন চত্বরে গিয়ে ঝোপেঝাড়ে ঠেক খুঁজবে। অথচ এই বাঙালিই হেভি মারাকু টাইপের ছিল।

মারকুটে বাঙালির ভেতো ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ায় সুবিধাই হয়েছে শাসকদের। কোন শাসক? পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন শাসক। এই শাসক নিজেদের পুরোদস্তুর বিপ্লবী ঘোষণা দিয়ে মসনদে চেপেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে বিপ্লব তো নেইই, ভাবনাতে জনগণও নেই, আছে শুধু ভোট গণনা। তাই তো উপন্যাসের এক চরিত্র কমরেড আচার্য ঘোরের ভেতর কমরেড স্তালিনের ঝাড়ি খায়। বিপ্লব কাকে বলে জানে কি-না, জিজ্ঞেস করাতে কমরেড আচার্য মাথা চুলকাচ্ছিল, তখন কাল্পনিক স্তালিন আবারো ঝাড়ি দিয়ে বলে,করিস তো শালা ভোট। আর কিছু করতে পারবি বলেও তো মনে হয় না। বোঝার অপেক্ষা রাখে না– এই শাসক পশ্চিমবঙ্গের সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে ক্ষমতায় বসে থাকা বাম সরকার। তাদের হাত থেকে এই ভেতো বাঙালি রেহাই চায়, সে তো আর আলাদা করে বলতে হয় না। কিন্তু কে তাদের পথ দেখাবে? কে তাদের দেবে আশা ও ভরসা? তারা নিজেরা তো ‘অসহায়’, ‘ভীরু’। এখানটাতেই নবারুণ আমদানি করেন চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুদের। আর আমদানি করেন নুনুকামান।

Kangal Malsat
কাঙাল মালসাট

উপন্যাসের মতো চলচ্চিত্রেও নুনুকামান এসেছে ঘুরেফিরে। উপন্যাসে আমরা দেখি, দাঁড়কাক নুনুকামান সম্পর্কে সরখেল ও ভদিকে বলছে, মালটা পোর্তুগীজ জলদস্যুদের। তখন তো আদিগঙ্গা ওখান দিয়ে বইত না। বিস্তর নৌকাও চলত। পোর্তুগীজ হার্মাদদের বোটে এই কামানগুলো থাকত। বজরা-ফজরা হলে এক গোলাতেই কুপোকাত। যে সে কামান নয়। খোদ লিসবনে বানানো। চলচ্চিত্রেও দণ্ডবায়স ওরফে দাঁড়কাকের মুখে সংক্ষিপ্তাকারে এই সংলাপ আমরা শুনি।

পর্তুগিজদের ব্যবহৃত লিসবনে তৈরি নুনুকামান কল্পনার মিশ্রিত বস্তু হলেও, চোক্তার-ফ্যাতাড়ুদের হাতে মাটিখোড়া নুনুকামানটি কিন্তু প্রতীকে পরিণত হয়। এই প্রতীক ক্ষমতা ধারণের প্রতীক। এই প্রতীক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার প্রতীক। উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে বারবারই বলা হতে থাকে, এই কামান ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে কেল্লাফতে। এমনকি ঘটেও সেটা। কামানের ব্যবহারের পরপরই গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হয় ক্ষমতাসীনরা।


কামানকে নুনুর সঙ্গে তুলনা, কিম্বা নুনুকে
কামানের সঙ্গে তুলনার ভেতর দিয়ে
নতুন সিগনিফায়ার বা পদ দাঁড়
করিয়েছে দাঁড়কাক, সেই পদের
বস্তুগত অর্থে কোনো সিগনিফায়েড
বা পদার্থ নেই, সোনার পাথরবাটির
মতোই, আছে শুধু কাল্পনিক আকার ও সাকার

ফরাসি দার্শনিক জাক লাকাঁর ভাষায় বললে, এই প্রতীকায়িত নুনুকামানটিই সিম্বলিক ফ্যালাস। একে নুনু বা পুরুষাঙ্গ অথবা পেনিস ভাবলে ভুল হবে। কামানকে নুনুর সঙ্গে তুলনা, কিম্বা নুনুকে কামানের সঙ্গে তুলনার ভেতর দিয়ে নতুন সিগনিফায়ার বা পদ দাঁড় করিয়েছে দাঁড়কাক, সেই পদের বস্তুগত অর্থে কোনো সিগনিফায়েড বা পদার্থ নেই, সোনার পাথরবাটির মতোই, আছে শুধু কাল্পনিক আকার ও সাকার। দাঁড়কাকের এই নুনুকামান ওরফে সিগনিফায়ার আদতে পরমেরই বাসনাকে চিহ্নিত করে। কাঙাল মালসাট-এ পরম হলো বাঙালি জনগণ, আর বেগম জনসন ও দাঁড়কাকেরা নিমিত্তমাত্র। জনগণ সাথে না থাকলে শুধু নুনুকামান দিয়ে কিছু হতো না। জনগণ দীর্ঘদিনের অপশাসন থেকে মুক্তি চায়, তাদের এই বাসনা চিহ্ন আকারে ধরা দিয়েছে নুনুকামানে। এই নুনুকামান জনগণের বাসনার সিগনিফায়ার। সেজন্যই এই কামান বগলদাবা করে জনগণের বাসনার পূরণ করতে চায় চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুরা। কারণ তারা জনগণের ভালোবাসা চায়, বলতে পারেন খ্যাতির লোভও আছে তাদের।

Kangal Malsat
কাঙাল মালসাট

এই যে চোক্তার-ফ্যাতাড়ুদের জনগণ তথা পরমের ভালোবাসা চাওয়া, আর সেটা চাইতে গিয়ে পরমের বাসনা যে পদে, যে সিগনিফায়ারে ধরা পড়েছে, সেটার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন, একই রকম কথা পাওয়া যাবে লাকাঁর ব্যাখ্যায়– ফ্যালাসের সঙ্গে সাবজেক্টের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি সেখানে। ১৯৫৮ সালের ৯ মে মিউনিখে এক বক্তৃতা দেন লাকাঁ, শিরোনাম দ্য সিগনিফিকেশন অব দ্য ফ্যালাস। সেখানে তিনি বলছেন, ঘটনা হলো ফ্যালাস একটি সিগনিফায়ার অর্থাৎ এই ফ্যালাস অবস্থান করে বিগ আদার বা পরমের প্রাঙ্গনে, আর এই প্রাঙ্গনে সাবজেক্টের প্রবেশাধিকার আছে। কিন্তু এই সিগনিফায়ার লুকায়িত অবস্থায় থাকে, তাই একে চিনে নিতে হয় সাবজেক্টকে। চোক্তাররা কি এই কারণেই মাটির ভেতর থেকে খুঁজেটুজে চিনে নিয়েছিল পর্তুগিজ কামানটিকে? এই চিনে নেওয়ার পেছনের চালিকা শক্তির নাম ভালোবাসা। ভালোবাসার জনগণ বা যদি বলি ভালোবাসার মুক্তি, তার যে বাসনা, সেই বাসনার সিগনিফায়ার কিন্তু এলিয়েন বা পর থাকে সাবজেক্টের কাছে। এমনটাই বলেন লাকাঁ। [লাকাঁ ২০০৮ :৩২০]

এজন্যই কি জনগণের মুক্তির বাসনা যেখানে পদ আকারে হাজিরা দেয়, সেই নুনুকামান সুদূর লিসবনে তৈরি? দেশের মাটিতে নয়? এই কারণেই কি জনগণ নয়, নুনুকামান আবিষ্কার করে সাবজেক্ট অর্থাৎ দাঁড়কাক গংরা? সেই একই বক্তৃতায় মায়ের সঙ্গে সন্তানের তুলনা টেনে লাকাঁ আরো ব্যাখ্যা করছেন বিষয়টিকে। বলছেন, মায়ের বাসনার বস্তু যদি হয় ফ্যালাস, তাহলে মায়ের ভালোবাসা পেতে, মায়ের বাসনাকে পরিতৃপ্ত করতে সন্তান নিজেই ফ্যালাস হয়ে উঠতে চায়। তবে সেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় না পিতার কারণে। কিন্তু তাই বলে কি ফ্যালাস হয়ে উঠতে চাওয়ার প্রচেষ্টা ভালোবাসার কাঙালদের বন্ধ থাকে? চোক্তার-ফ্যাতাড়ুরাও নুনুকামান নিজেদের কব্জায় রেখে ক্ষমতা বাগাতে চায়, নিজেরাই হয়ে উঠতে চায় ‘ফ্যালাস’, কিন্তু সেখানে বাধ সাধে বুদ্ধিজীবী সমাজ। এরাই যেন পিতার মতো এগিয়ে এসে বাগড়া দেয় সন্তানদের, মানে চোক্তার-ফ্যাতাড়ুদের।

নবারুণ লিখছেন, এ কথা কে না জানে যে কোথাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা কালবিলম্ব না করেই সদলবলে একটি ঘোষণাপত্র বা আবেদন বা ফাঁকা থ্রেট প্রকাশ করে থাকেন যাতে বড় থেকে ছোট, শুডঢা থেকে কেঁচকি, লেখক, শিল্পী, গায়ক, নৃত্যশিল্পী, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্র শিল্পী থেকে শুরু করে সই দিয়ে নিজেরাও বাঁচেন, অন্যদের বারটা বাজাবার রসদ যোগান।

Kangal Malsat
কাঙাল মালসাট

তো, চলচ্চিত্রেও আমরা দেখি এই বুদ্ধিজীবীদের দৌড়ঝাঁপ ও ঘোষণাপত্রের তোপের মুখে নুনুকামান কমজোড়ি হয়ে যায়। এর ফলে দাঁড়কাক বলতে বাধ্য হয়, সবই আত্মারামের খেলা। দেড়শো বছর পরপর চাকতি নাচবে। এবার তো ভালোই নাচনকোঁদন হলো। এবার গুটিয়ে নে। চোক্তারদের সর্দার মার্শাল ভদি ঠিক রাজি হচ্ছিল না এই গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবে; কিন্তু কিছু করার নেই। বুদ্ধিজীবী যেন পিতা, আর এই ফ্যাতাড়ু-চোক্তাররা যেন সেই শিশু– মা তথা জনগণের মুক্তির বাসনার সিগনিফায়ার অর্থাৎ ফ্যালাস আর হয়ে উঠতে পারে না তারা, পিতার হস্তক্ষেপে।

নবারুণের এই উপন্যাসে প্রচুর ফ্যান্টাসির উপাদান আছে, কোনো কিছুর সাথে হুবহু এর মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না, এমনকি কিছুক্ষণ আগে যে মনোবিশ্লেষ করা হলো, সেটা দিয়েও এই ফ্যান্টাসির পুরোটা ধরা সম্ভব নয়; তবে গোটা কাজটিতে যা ধরা পড়ে, সেটা হলো রাজনীতি। ভীষণরকমভাবে রাজনৈতিক এই উপন্যাসটি। ফ্যাতাড়ুরা যে ‘পলিটিকাল মেসেজের বাহক’ [ভট্টাচার্য ২০১৫: ১২৪]– সেটা ঘোষণা দিয়েই নবারুণ বলছেন, এরা নৈরাজ্যবাদী ঠিকই, তবে এদের ভিতর উইশ ফুলফিলমেন্টের একটা বিরাট জায়গা আছে। [ভট্টাচার্য ২০১৫ : ১৫০] চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুদের এই ‘উইশ ফুলফিলমেন্ট’ আসলে জনগণের [পরমের] বাসনা পূরণের নামান্তর মাত্র; আর সেটা করতে গিয়েই তারা এমন এক অস্ত্রকে সামনে এনেছে, যা ওই বাসনার সিগনিফায়ার রূপে আবির্ভূত, তার নামই ফ্যালাস, তার নামই নুনুকামান।

 

সুমন মুখোপাধ্যায়
সুমন মুখোপাধ্যায়

৩.

নবারুণের কলমের খোঁচার চেয়ে সুমনের ক্যামেরার খোঁচা কোনো অংশেই কম নয়। ভাষার শৈলীর সঙ্গে বলতে গেলে চিত্রভাষা পাল্লা দিয়েছে বেশ জোড়েসোরে। আধুনিক সম্পাদনা রীতি ব্যবহার করে চলচ্চিত্রায়িত কাঙাল মালসাট-এ অভিনয় করেছেন কৌশিক গাঙ্গুলী [মার্শেল ভদি], কমলিকা ব্যানার্জি [বেচামণি], শান্তি মুখোপাধ্যায় [মদন], দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য [ডিএস], জয়রাজ ভট্টাচার্য [পুরন্দর ভাট] প্রমুখ। কবীর সুমনের নাম আলাদা করেই বলতে হয়, তিনি অভিনয় করেছেন দণ্ডবায়সের ভূমিকায়। শুধু অভিনয় নয়, ঝিনচ্যাক ছাড়া কিছু চলবে না শিরোনামে একখানা জ্বালাময়ী গানও লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেন। গানটি অনেকাংশেই নবারুণময়। ছবির মেজাজ রক্ষার্থেই এমনটা হয়েছে। এবং রক্ষা করতে পেরেছেন গীতিকার সুমন।


সাব-অলটার্নরা এমন খিস্তি ও অশ্লীল ভাষাতেই
কথা বলে থাকে– সুমন এমন ‘ভুলভাল’
কথার চাইতে বরং বলতে পারতেন,
সিনেমার আগে তো উপন্যাস
লেখা হয়েছে এবং ওরকম
অশ্লীল ভাষাতেই
লেখা হয়েছে

পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় মূলত নাটকের মানুষ। তিনি প্রথম যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ২০০৬ সালে, সেটিও নবারুণের উপন্যাস হারবার্টকে কেন্দ্র করে। প্রথম ছবিতে খুব একটা ঝক্কি না হলেও, কাঙাল মালসাট ছবির বেলায় বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে পরিচালককে। সংলাপে খিস্তি, গালিগালাজ ইত্যাদি নাকি অতিরিক্ত মাত্রায়! তাই ওটা ভদ্র সমাজে দেখার অযোগ্য। অতএব কেন্দ্রীয় সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড়া পেলেও রাজ্যের সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিতে নারাজ। পরে অবশ্য ছাড়পত্র পেয়েছে, অনেকটুকু কাটছাটের পর। তখন নবারুণ ও সুমন দুজনই যুক্তি করেছেন এই বলে যে, এই সাহিত্য বা চলচ্চিত্র হলো সাব-অলটার্নদের নিয়ে করা একটা ফ্যান্টাসি, কাজেই তাদের মুখের ভাষা ওরকম ‘অশ্লীল’ই হবে। তবে চিত্রশাসনের বিপরীতে নবারুণ ও সুমনের এই সাব-অলটার্ন তত্ত্বকে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানোকে ভালোভাবে নেননি পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়। তিনি বলছেন, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের সাব-অলটার্ন আর সাহিত্যের, এখানে উপন্যাস-সিনেমা-নাটকের, উত্থাপিত সমাজ এক বস্তুই নয়। [রায় ২০১৮: ৩২৫] তিনি বলতে চাইছেন, সাব-অলটার্ন হলো ইতিহাস সম্পর্কিত একটি দর্শন। তো কাঙাল মালসাট-এর মতো নিখাদ উপন্যাসকে বুঝতে এই সাব-অলটার্ন তত্ত্বের প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেন দেবেশ রায়। তাছাড়া সাব-অলটার্নরা এমন খিস্তি ও অশ্লীল ভাষাতেই কথা বলে থাকে– সুমন এমন ‘ভুলভাল’ কথার চাইতে বরং বলতে পারতেন, সিনেমার আগে তো উপন্যাস লেখা হয়েছে এবং ওরকম অশ্লীল ভাষাতেই লেখা হয়েছে। ছবি করার স্বার্থে উপন্যাস থেকে তিনি সংলাপ নিয়েছেন, তাতে দোষের কি হলো? দেবেশ রায় এই যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করেন ছবিশাসকদের, এবার তা হলে সেন্সর বোর্ডকে বা তার রাজ্য কর্তাদের এই ঝামেলা মেটাতে হবে উপন্যাসের সংলাপ কি সিনেমায় বদলাতে বলা যায়? বা, পাঠ্য অশ্লীলতায় আপত্তি নেই, শ্রাব্য অশ্লীলতায় আছে। [রায় ২০১৮: ৩২৮]

কাঙাল মালসাট
কাঙাল মালসাট

দেবেশ রায়ের কথা হলো, বলার মতো এত কথা থাকতে নবারুণ ও সুমন কেন ‘সাব-অলটার্নের গেরোতে’ ফেঁসে গেলেন? সাব-অলটার্ন মানেই যে অশ্লীল, খিস্তিবহুল, যৌনগন্ধমাখা কথাবার্তা– তা কিন্তু মোটেও নয়। যারা অ-প্রান্তিক বা ধনী, তাদের বিশেষ ভাষা শুনলেও সাব-অলটার্নরা কানে আঙুল দেবে বলে মন্তব্য দেবেশ রায়ের।

এ কথা সত্যি, খিস্তি বলি বা মা সম্পর্কিত চ-বর্গীয় গালি, এগুলোর পেছনে ইদিপাস কূটের হাত আছে বলেই রাষ্ট্র করেছিলেন জিগমুন্ট ফ্রয়েড। কাজেই এই কূট ধনী বা গরিব দেখে কার্যকর হয় না। নির্বিশেষেই তাই গালিগালাজের চর্চা হয়ে থাকে। সাব-অলটার্ন সংক্রান্ত এই তর্কের বাইরে গিয়ে যদি দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে– মানুষের ভাষাই তার অচেতনের খোঁজ দেয়। নবারুণের অচেতনের যে পরিচয় এই উপন্যাসে ভেসে ওঠে, তা নিখাদ ঘৃণা– বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার প্রতি। এই ঘৃণা প্রদর্শনে সাব-অলটার্নের ফ্যান্টাসি হয়তো প্রয়োজন ছিল না, হয়তো ছিল, কিন্তু আসল কথা যেটি, তা হলো– নবারুণ ভীষণরকমভাবে রাজনৈতিক লেখক। আর এই সময়ে নবারুণের মতো ফ্যান্টাসি লেখককে আমাদের গভীরভাবে প্রয়োজন। একটি সাক্ষাৎকার থেকে নবারুণের কিছু কথা উদ্ধার করি এই বেলা। তিনি বলছেন–

রাজনৈতিক সচেতনতাকে আমার লেখার একটা মূল জায়গা বলে মনে করি। এটা না থাকলে আমি লিখবই না। আমার মধ্যে তখন সেভাবে সাড়া দেবে না, জাগবে না; কারণ আমি আজকে মনে করি রাজনীতির দরকারটা আরও বেশি। কারণ, আজকের সমস্ত পৃথিবীজুড়ে প্রকৃত রাজনীতি বলতে যা বোঝায়, তার বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত চলছে। আজকে অনেক কিছুই মিথ্যে। জালি, দু-নম্বরী একটা সময়ের মধ্যে আমরা বাস করছি– যেখানে গণতন্ত্রের নামে হাজার হাজার মানুষকে বোমা ফেলে মেরে ফেলা যায়। যেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নামে লুটপাট চালানো হয়। আমরা প্রত্যেকটা জিনিস দেখছি– যা হওয়া উচিত তার উল্টোটা হচ্ছে। এই সময়েই তো আমি আমরা রাজনীতিকে আঁকড়ে থাকব। দুঃসময়ে যারা রাজনীতির কথা ভুলে যায়, তাদের কি সত্যিই কোনো দায়বদ্ধতা ছিল?
[ভট্টাচার্য ২০১৫: ৮১]

সবশেষে আমিও গোটা কয়েক প্রশ্ন তুলে শেষ করি এই রচনা। দুঃসময়কে সুপথে চালিত করতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনো বিকল্প আছে কি? সেই কথাই কি নবারুণ বলেননি উপন্যাসে? আর এই পরিবর্তন কি আপনা-আপনিই ধরা দেয়? এতটাই কি সহজ?

সকলের পরিবর্তন হোক।

কাঙাল মালসাট
কাঙাল মালসাট

পুঁজি
১. নবারুণ ভট্টাচার্য, কাঙাল মালসাট, উপন্যাস সমগ্র [কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০১০]
২. সুমন মুখোপাধ্যায় [পরিচালিত], কাঙাল মালসাট [কলকাতা: ২০১৩]। লিংক: https://bit.ly/2uSguTC
৩. নবারুণ ভট্টাচার্য, কথাবার্তা: নবারুণ ভট্টাচার্যের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার আর আত্মকথন [কলকাতা: ভাষাবন্ধন প্রকাশনী, ২০১৫]
৪. দেবেশ রায়, শোনা যায়, সাব অলটার্ন কে?, প্রবন্ধসংগ্রহ, সমরেশ রায় ও স্বপন পাণ্ডা সম্পাদিত [কলকাতা : এবং মুশায়েরা, ২০১৮]
৫. Jacques Lacan, Écrits: a selection, translated by Alan Sheridan [Nodia: Routledge, 2008]
৬. Dylan Evans, An Introductory Dictionary of Lacanian Psychoanalysis [London: Routledge, 1996]
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক, সাংবাদিক, সিনে-সমালোচক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সিনে-গ্রন্থ : চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা; চলচ্চিত্র বিচার; বলিউড বাহাস; উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা

মন্তব্য লিখুন