হীরালালের জন্মসার্ধশতবর্ষ : কোথাও কোনো স্পন্দন নাই!/ স্বজন মাঝি

0
104
Hiralal Sen
হীরালাল সেন
জন্ম • ২ আগস্ট ১৮৬৮; মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ
মৃত্যু • ২৬ অক্টোবর ১৯১৭; কলকাতা; ভারত

লিখেছেন  স্বজন মাঝি


 

দুনিয়ার চলচ্চিত্র মানচিত্রে বাংলা যে এক প্রাচীনতম চলচ্চিত্রদেশ– সে খবর কয়জন রাখে, বলুন! বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ১৮৮৯ সালে কিনেটোস্কোপ আবিষ্কার করার পর, মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ-এ প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বাংলা ভূ-খণ্ডে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর প্রথম খবর। প্রকাশিত সংবাদ মতে, কলকাতার ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিটের এক সাহেবি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে ১ রুপিতে চলচ্চিত্র দেখানো হয়।

কলকাতা হাইকোর্টের অখ্যাত আইনজীবী চন্দ্রমোহন সেনের পুত্র হীরালাল সেন তখন সর্বভারতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদকজয়ী আলোকচিত্র শিল্পী। হীরালাল সেন যে সময় আলোকচিত্রে মুন্সিয়ানা অর্জন করছেন, ঠিক একই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মহাদেশজুড়ে চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে কিনেটোস্কোপ যন্ত্র প্রবর্তিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্র প্রযুক্তি ছড়িয়ে পরে ইউরোপময়। ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে জার্মানিতে প্রদর্শিত হয় বায়োস্কোপ এবং ডিসেম্বরে ফ্রান্সে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটোস্কোপ

Hiralal Sen
হীরালাল সেন

কিনেটোস্কোপ-এর প্রদর্শনীর পর কলকাতায় প্রথমে বায়োস্কোপ আসে, পরে সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্র। হীরালালপুত্র বৈদ্যনাথ সেন বলেছেন, “হীরালাল সেন ১৮৯৬ সালে প্রথম চলচ্চিত্র করেছেন”– যা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কোনো স্বদেশির চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস। হীরালাল সেন শুধু প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, ১৮৯৮ সালে ভারতীয় ইতিহাসে প্রথম চলচ্চিত্রসংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সে বছর হীরালাল সেন প্রতিষ্ঠিত রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী বর্তমান বাংলাদেশের ভোলা জেলায় প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে।

…প্রাপ্ত তথ্যমতে হীরালাল সেন হচ্ছেন,
চলচ্চিত্রের জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্র ও
ইউরোপের বাইরে বাদবাকি
দুনিয়ার প্রথম কোনো
স্বদেশি চলচ্চিত্র
নির্মাতা…

হীরালাল সেন যখন ১৮৯৬ সালে বাংলায় বসে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের স্বদেশি নির্মাতাদের বাইরে অন্যান্য জায়গায় : দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ১৮৯৬ সালে, তবে অজ্ঞাতনামা নির্মাতা কোনো আফ্রিকান নন। এরপর জাপানে– শিরো আসানো ১৮৯৮, ম্যাক্সিকোতে– সালভাদোর তাসচেনো ১৮৯৮, চীনে– রেনে কিংতাই ১৯০৫, মিশরে– নাম না জানা একজন ১৯০৭ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে হীরালাল সেন হচ্ছেন, চলচ্চিত্রের জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে বাদবাকি দুনিয়ার প্রথম কোনো স্বদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা।

হীরালাল সেনের জন্ম ২ আগস্ট ১৮৬৮ বর্তমান বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলায় বগজুরি গ্রামে। সাত বছর বয়সে পিসতুতো ভাই দীনেশচন্দ্র সেনের সাথে ছায়াবাজি খেলার মাধ্যমে সাদাপর্দায় হীরালাল রাম-রাবণের গল্প প্রক্ষেপণ করেছেন। হীরালালের পিতামহ গোকুলকৃষ্ণ সেন মুন্সী ছিলেন ঢাকা জজকোর্টের বিখ্যাত আইনজীবী। পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে ছিল তার বাড়ি। মানিকগঞ্জে মাইনর শিক্ষা শেষে হীরালাল সেন ভর্তি হন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে। সেখান থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন। এন্ট্রান্স পাশের পর, ১৮৮৬ সালে বিয়ে করেন হেমাঙ্গিনী দেবীকে।

…১৮৯৬ সালে চলচ্চিত্র
নির্মাণ শুরু
করেন
তিনি…

কলকাতায় এসে হীরালাল সেন ভর্তি হন ডাফ কলেজে [স্কটিশ চার্চ কলেজ]। আইএসসি দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর চূড়ান্তভাবে মেতে ওঠেন প্রথমে আলোকচিত্র এবং পরে চলচ্চিত্র নিয়ে। ঢাকায় থাকাকালীন ফটোগ্রাফি চর্চার হাতেখড়ি। কলকাতায় গিয়ে ১৮৮৭ সালে রামপাট থেকে হুগলীতে সূর্যাস্ত শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশ হয় তৎকালীন টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকায়। ১৮৯৬ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন তিনি।

Hiralal Sen
এ ধরনের মুভি-ক্যামেরা ব্যবহার করতেন তিনি

১৮৯৮ সালের পর তিনি বাংলা এবং বাংলার বাইরে নানা জায়গায় বায়োস্কোপ নিয়ে চষে বেড়ান। এর মধ্যে তিনি অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সহযোগিতায় ক্লাসিক থিয়েটারেও নিয়মিত বায়োস্কোপ প্রদর্শন করেন। হীরালাল সেন তার চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু থেকেই কাজে সহযোগিতার জন্য তার ভাগিনা কুমার শংকর গুপ্ত ও সেজোভাই দেবকীলাল সেনকে সঙ্গী করেন। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট কর্তৃক সংরক্ষিত ওয়ার উইক ট্রেডিং কোম্পানীক্যালকাটা প্যানোরামা [১৮৯৭-৯৯] চলচ্চিত্রটি আমাদের ধারণা হীরালাল সেনের ধারণকৃত।

১৯০০ সালে হীরালাল সেন মানিকগঞ্জের বগজুড়ি গ্রামে দুটি ট্রিকি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং গ্রামবাসীর মাঝে তা প্রদর্শন করেন। এই চলচ্চিত্র দুটি বাণিজ্যিক প্রদর্শনের আগে ২১ নভেম্বর স্কটিশ চার্চে তার নিজ কলেজে প্রদর্শন করেন। ১৯০১ সালে হীরালাল সর্বভারতীয় শ্রমশিল্প উৎসব– মোহন মেলায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। পদকপ্রাপ্তির পর হীরালাল সেনের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পরে। তিনি পাটিয়ালা, নাভা, কাশ্মীর রাজসভাসহ নানা জায়গায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আমন্ত্রণ পেতে থাকেন।

…১৯০২ বগজুড়ি গ্রামে আবারও
ক্যামেরা নিয়ে যান এবং ধারণ
করেন গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী
বিবাহ উৎসব, ধলেশ্বরী
নদীতে পূণ্যার্থীদের
স্নানযাত্রাসহ
নানা ধরনের
লোকদৃশ্য…

সে বছর ক্যাসিক থিয়েটারের ভ্রমর, আলীবাবা, হরিরাজ, দোললীলা, সরলা, বুদ্ধ ও সীতারামের নাট্যাংশ সংকলিত সাত রিলের এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় এক ঘণ্টা [প্রতিটি রিল ৮ মিনিট দৈর্ঘ্যের হলে, ৭টি মোট ৫৬ মিনিট]। এরপর তিনি কার্বাইডজনিত কম্পনমুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শন উদ্ভাবন করেন। ১৯০২ বগজুড়ি গ্রামে আবারও ক্যামেরা নিয়ে যান এবং ধারণ করেন গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী বিবাহ উৎসব, ধলেশ্বরী নদীতে পূণ্যার্থীদের স্নানযাত্রাসহ নানা ধরনের লোকদৃশ্য। এ বছর তিনি ছবির সাথে বাংলা টাইটেল কার্ড প্রবর্তন করেন।

১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে হীরালালের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র আলীবাবা ও চল্লিশচোর মুক্তি পায়, এতে চলচ্চিত্রে ক্লোজআপ শট ব্যবহৃত হয়। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে এটি ছিল তখনকার সময় পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম চলচ্চিত্র। শরতের দূর্গা উৎসবে কলকাতার বাইরে প্রদর্শনের লক্ষ্যে চলচ্চিত্রটি কলকাতার থিয়েটারে বর্ষা মৌসুমে মুক্তি দেওয়া হয়। ব্যবসায়িকভাবেও আলীবাবা দারুণ সফলতার মুখ দেখে। একই বছর করোনেশন দরবার তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তিনি। মনের মতন ও সোনার স্বপন কাহিনি-চলচ্চিত্র দুটি একই বছর মুক্তি পায়।

…১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী
স্বদেশি আন্দোলনের ওপর
হীরালাল সেন তথ্যচিত্র
নির্মাণ করেন…

১৯০৪ সালে লর্ড কার্জনের ঢাকা আগমন উপলক্ষে রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী ঢাকার নওয়াব বাড়ির আমন্ত্রণ লাভ করে। এই বছরে তার দুটি কাহিনি-চলচ্চিত্র নির্মাণের খবর মেলে– বাঙালী ধীবর ও জেলের ছেলে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের ওপর হীরালাল সেন তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তথ্যচিত্রে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যটি সেখানে সবাক প্রদর্শিত হয়েছিল। এ তথ্যচিত্র তিনি প্যাথে কোম্পানির হয়ে নির্মাণ করেন। এ সময় তিনি নানা রকম সংকটের সম্মুখিন হন।

Hiralal Sen
হীরালাল সেন । ১৯১৭ সালে, কলকাতায়

লোকমান্য তিলকের ওপর তার তথ্যচিত্র ১৯০৬ সালে স্টার থিয়েটারে প্রদর্শিত হয়। কিছুকাল তিনি গিরিশ চন্দ্র ঘোষের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র করেন। ১৯০৯ সালে শরৎচন্দ্রের গল্প অবলম্বনে হীরালাল নির্মাণ করেন ভ্যাগাবন্ড চলচ্চিত্র– যা তার নির্মিত কিছু ছোট চলচ্চিত্রের সাথে ১৯১০ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারে ও কোহিনুর থিয়েটারে প্রদর্শিত হয়। ১৯১০ সালে রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী ভেঙ্গে ফেলা হলে, মতিলাল পান রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানীর সমস্ত ফিল্ম ও প্রক্ষেপণ যন্ত্র এবং হীরালাল পান সমস্ত ক্যামেরা ও লাইট। এ সময় তিনি শো হাউজ নামে প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা করেন।

…১৯১৭ সালের ১৯ মে আগুন
লেগে হীরালাল সেনের
সমস্ত চলচ্চিত্রের
প্রিন্ট ধ্বংস হয়ে
যায়…

১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতে ব্রিটিশ সম্রাটের আগমনের ওপর তিনি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ১৯১৩ সালে হীরালাল সেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অসুস্থতার মধ্যেই সে বছর তিনি ঘরে বসে আলীবাবা চলচ্চিত্রের প্রিন্টকে তুলি টেনে রঙিনে রূপান্তর করেন। এই চলচ্চিত্রস্রষ্টা মানুষটির জীবনের শেষদিনগুলো কেটেছে চরম সংকটের ভেতর। ১৯১৭ সালের ১৯ মে আগুন লেগে হীরালাল সেনের সমস্ত চলচ্চিত্রের প্রিন্ট ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি ১৯১৭ সালের ২৬ অক্টোবর কলকাতায় দেহত্যাগ করেন।

হীরালাল সেনের ইতিহাস হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্মের ইতিহাস। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে বাদবাকি দুনিয়ার প্রথম স্বদেশি চলচ্চিত্রকার। অথচ মানুষটির বিষয়ে বিগত একশ বছরে আমরা শুধু অবহেলাই করেছি! রোমান দার্শনিক সিসেরো বলেছেন, “জন্মের সময় কি ঘটেছিল সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা মানে সকল সময়ের জন্য শিশু হয়ে বেঁচে থাকা।” আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আসলে এই ঘটনাটিই ঘটেছে। এ বছর হীরালাল সেনের জন্মসার্ধশতবর্ষ অথচ কোথাও কোনো স্পন্দন নাই!

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন