ডিজিটাল সিনেমার পথচলা : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ/ শৈবাল সারোয়ার

0
137
নতুন সিনেমা, সময়ের প্রয়োজন
গ্রন্থনা । নূরুল আলম আতিক
প্রচ্ছদ । লিটন কর
প্রকাশক । ঐতিহ্য
প্রথম প্রকাশ । ফেব্রুয়ারি ২০০৯
পৃষ্ঠাসংখ্যা । ৮০
মূল্য । ৩০ টাকা

লিখেছেন শৈবাল সারোয়ার


 

প্রথমেই যেটা বলে নেয়াটা অবশ্য কর্তব্য, তা হলো, বইটি সরাসরি না হলেও বেশ তীর্যকভাবেই গতানুগতিকতাকে প্রশ্ন করে। এস্টাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে গ্রন্থিকের অবস্থান। তিনি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন–
“আগামীর সিনেমা নির্মাতাদের উদ্দেশে…”

শুরুর কথা শিরোনামে যে ছোট্ট করে তথাকথিত মুখবন্ধ বা ভূমিকা দেখে আমরা অভ্যস্ত; তার গঠনে আঘাত করে সরাসরি পাঠককে উদ্দেশ্য করে বলা কথাগুলো যেকোনো প্রতিক্রিয়াশীল চলচ্চিত্রকর্মী তথা চলচ্চিত্রপ্রেমীর হৃদয় স্পর্শ করে যায়। তার বইয়ের শুরুতেই তিনি নির্মাতা, দর্শকের আপাত বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিষ্কার করে তুলে ধরেন। যা আমাদের পাঠকদের বইটির সাথে পক্ষান্তরে যেন গ্রন্থিকের সাথে একাত্ম করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। গ্রন্থিক শুরুতেই দাবি করেন, এটা শুধুই তার নিজের চলচ্চিত্রিক বোঝাপড়া না হয়ে বরং পাঠকের ডিজিটাল সিনেমায় ব্যক্তিগত যাত্রা। এমন সম্ভাষণের মোড়কেই বইটির পট উন্মোচিত।

পুরো বইটিকে গ্রন্থিক সাজিয়েছেন কিছু শিরোনামের সাহায্য নিয়ে, আবার প্রতিটি শিরোনামকে সহজপাঠ্য করে তুলতে ব্যবহার করেছেন কিছু জেন কবিতার অংশবিশেষ; যা বইটির শ্রী ও মানগত দিকের বিচারে অনন্য হয়ে উঠাতে ভূমিকা পালন করেছে।

 

ছানি কাটবে তেমন ডাক্তার কোথায়?

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে, দৈনিক সমকাল-এ।

চাষা
পথ দেখায়
মুলো উঁচিয়ে
–[ঈসা, জেন কবিতা]

সিনেমা শিল্পের দৈন্য আর অভাবের বিস্তার ঘটেছে গ্রন্থিকের ‘চালশে’ রোগাক্রান্ত সিনেমার পরিচয়লিখনেই। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না বলে বরং সত্যাশ্রয়ী লেখনীর ভীত এখানেই পরিলক্ষিত। মোটা দাগে তুলে এনেছেন ‘৬৩কে; চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের জন্মবৎসরকে। স্মরণ করেছেন মুহম্মদ খসরুকে [চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি]। বলেছেন, তাদের কথা, যারা ‘শিল্পের জন্যে’ না হয়ে ‘শিল্পের শরীরে’ স্থান করে নিতে ভুলপথে পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু, মুদ্রার উলটো পিঠটাও পালটে দেখেছেন গ্রন্থিক। বলেছেন, ধ্রুপদী চলচ্চিত্র সংকলন গ্রন্থের কথা, মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত সূর্যদীঘল বাড়ী, মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত চাকা ও আগামী, তারেক মাসুদ পরিচালিত আদম সুরত ও মুক্তির গানকে তিনি উল্লেখ করেছেন সংসদ আন্দোলনের ঝিনুকে জন্মানো মুক্তা সমুদয় বলে।

স্তুতি গেয়েছেন, টেলিভিশনের ভীষণ উন্নয়নের। সেইটাও আবার অশিক্ষিতের হাত ধরে। তিনি [গ্রন্থিক] আশাবাদী, এই ডিজিটাল যুগের তরুণরাই এদেশের সিনেমার হাল ধরবেন। কিন্তু, সে জন্য তাদের হতে হবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও কাজের প্রতি নিষ্ঠাশীল।

ফিল্ম : ডুবসাঁতার । ফিল্মমেকার : নূরুল আলম আতিক

নতুন সিনেমা : অগনন কুসুমের দেশে নীল গোলাপ

লেখাটি দৈনিক সমকাল-এ ২০০৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

এই অধ্যায়ে গ্রন্থিক আরও স্পষ্ট করে কটাক্ষ করেছেন, নব্যবাস্তবতার পরাধীনতার সরূপ; যা ইলেক্ট্রনিক দানবের পদতলে পিষ্ট বাস্তবতা। প্রযুক্তির উৎকর্ষে যুক্তির হারিয়ে যাওয়া, কিংবা যুক্তির সাম্রাজ্যে প্রযুক্তির অনুপ্রবেশের ফলাফল বিচারে গ্রন্থিক আগ্রহী হয়েছেন এই অধ্যায়জুড়ে।

প্রসঙ্গত এসেছে, বিজ্ঞাপনী সংস্থার চাটুক আর চাকচিক্যের বিস্তারের বর্ণন। উঠে এসেছে, টেলিভিশনে সিনেমা মুক্তি, টেলিফিল্ম ইত্যাদি প্রসঙ্গ। বলেছেন, নিজের করা টেলিভিশন প্রোডাকশনের কথাও [চতুর্থমাত্রা, সাইকেলের ডানা]।

বিনয় মজুমদারের পঙ্কক্তির সাহায্য নিয়ে জোরালো বক্তব্যের সমারোহ এই অধ্যায়ে। ডিজিটাল চলচ্চিত্রেই যে আগামীর সিনেমার পট উন্মোচিত হবে– এ কথা বলা হয়েছে জোরালোভাবেই। দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, ছোট-ছোট হল করে সিনেমা প্রজেকশনের মাধ্যম হয়ে ওঠবে। তাতে নির্মাতা যেমন বাঁচবে, বাঁচবে সিনেমাও। এভাবেই হয়তো বিকল্প প্রদর্শন ব্যবস্থা একসময়ে হয়ে উঠবে চলচ্চিত্রের প্রকৃত স্থান। এমন আশাজাগানিয়া বক্তব্য দিয়ে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানেন গ্রন্থিক।

 

অন্তরের নীলাভ আলো দিয়ে মুদ্রিত হোক নবীন ছবিমালা

ফ্ল্যাশব্যাক-এর ২০০৭ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় এই লেখাটি।

গ্রন্থিক বেশ সচকিতভাবেই ‘ফিল্ম’ শব্দটি ব্যাবহার করা থেকে বিরত থেকেছেন, যাতে ফরম্যাটের প্রসঙ্গে শুধুমাত্র ৩৫ মিমি কিংবা ১৬ মিমি’র বাইরে চলচিত্রের যে বিশাল বিস্তার, তাকে নাগালে পাওয়া যায়।

এক শ্রেণির তরুণ নির্মাতার কথা বলেছেন– যাদের মতে দর্শক কিছুই বুঝে না, আমরা যা করব তাই চলচ্চিত্র! এমন আচরণের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে গ্রন্থিক বলেন, এও বুঝি তাদের বার্থ রাইট!’

…যারা অলটারনেটিভ
আর বিদেশে অ্যাওয়ার্ডের জন্য
কাজ করছেন, তাদের
উদ্দেশে বলা হয়, এই
প্রবণতা অশ্লীলতার চেয়েও
ক্ষতিকারক…

যারা অলটারনেটিভ আর বিদেশে অ্যাওয়ার্ডের জন্য কাজ করছেন, তাদের উদ্দেশে বলা হয়, এই প্রবণতা অশ্লীলতার চেয়েও ক্ষতিকারক। এই প্রতিযোগিতার অসুস্থ পরিবেশ তরুণ নির্মাতাদের চোরাস্রোতের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আগামীর চলচ্চিত্র নির্মাণের বিকল্পে যেখানে এই পুরস্কার লাভের কারণে নানান অসঙ্গতি জন্মলাভের সুযোগ পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আরেক শ্রেণির নির্মাতা, যারা টাকার স্বল্পতার অজুহাতে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহ হারিয়ে বসে পড়েছেন, তাদের গ্রন্থিক প্রশ্ন রাখছেন, যেটুকু সম্বল তাতেই কি ছবি করা যায় না? তাই যেন ওরা কাজটা করেন, কারণ কাজটা করাটাই জরুরি; সিনেমার ক্ষুধা থাকাটা একজন তরুণ নির্মাতার অবশ্য গুন বলে মনে করেন তিনি।

কটাক্ষ করেছেন, তথাকথিত শিক্ষিত বিকল্পধারার নির্মাতাদের, যাদের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু শুধু মুক্তিযুদ্ধ আর দারিদ্রের বাইরে আজ অব্দি গল্পই বলতে শেখেনি। পক্ষান্তরে, ডিজিটাল মিডিয়া এসে আমাদের কাজকে অনেকখানি সহজ ও হাতের নাগালে এনে দিয়েছে। ফলে দরকার কেবল সিনেমাকে, দেশকে ভালোবেসে এগিয়ে আসার। এই কাজটাও করতে হবে তরুণ নির্মাতাদেরই।

নবীন পরিচালকের কাছে দর্শক কী চান? নতুন ছবির দর্শক কারা হবেন? দর্শকরাই বা কোথায় দেখতে পাবেন এইসব ছবিমালা– এমনতর প্রশ্নের জবাব অন্বেষণ এই অধ্যায়ের আধার। গ্রন্থিক বলেছেন, উদ্দেশ্যহাসিলকারী পরিচালকের লেজুড়বৃত্তি পরিত্যাগ করে আগামীর নির্মাতাদের নিজ-নিজ ছবির কাজে নিকটতম টেকনোলজির দারস্থ হতে।

ডুবসাঁতার । ফিল্মমেকার : নূরুল আলম আতিক

 

নতুন সিনেমা : নির্মাণ ও প্রদর্শন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা

নতুন সিনেমা কী ও কেন? নতুন সিনেমায় কী দেখতে চাই? কে বানাবেন নতুন সিনেমা? এর গুণবিচার কে করবেন? প্রযোজকের নাম গৌরীসেন? নতুনের চিত্রভাষা : টেকনিক ও টেকনোলজি, কে দেখবে, কেন দেখবে? কে দেখাবে? প্রদর্শন ব্যবস্থা কী হবে? কোথায় প্রদর্শিত হবে? নতুনের দায়, ডিজিটাল যুগে এই বাংলায়– ইত্যাকার শিরোনামের আড়ালে মূলত গ্রন্থিক নিজ চলচ্চিত্রিক বোঝাপড়া দিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্রের সামগ্রিক উন্নয়নকল্পে করণীয়ের রূপরেখা অঙ্কন করেছেন। ফলে এই গ্রন্থের অন্যান্য অধ্যায়ের দিক থেকে দেখলে, মূলত তাত্ত্বিক কথায় নিরুৎসাহী কিন্ত সিনেমার প্রাণভ্রমরা বাঁচিয়ে রাখতে করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভে এটি দারুণ এক দিকনির্দেশস্বরূপ।

 

তারুণ্যের ভাবনা : একটি সমীক্ষা/ ইমরান ফিরদাউস

বিএফডিসি’র সিনেমা সংখ্যা, মান ও দর্শক অভিরুচির ভিত্তিতে, সাধারণ মানুষের মতামত ও উত্তরের নিমিত্তে পরিসংখ্যান করা হয়েছে। গ্রন্থে সমীক্ষার বিবরণ, গবেষণার উদ্দেশ্য, গবেষণা পদ্ধতি, গবেষণার ফল উপস্থাপনা ও পর্যালোচনা, সিনেমা দেখার অভিরুচি, কাঙ্ক্ষিত স্থান, প্রচলিত ধারার বাইরে সিনেমা নির্মাণ, নতুন সিনেমা কেমন হবে, ডিজিটাল ছবিতে আমাদের পরিচিত মুখ ইত্যাদি বিষয় সন্নিবেশিত হয়ে ইমরান ফিরদাউসের হাজির কথা এ নিবন্ধটি একটি মূর্তিমান সমীক্ষা আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলে। বলে রাখা ভালো, এই অধ্যায়টি ছাড়া বাকি অধ্যায়গুলোর রচয়িতা স্বয়ং এ গ্রন্থের গ্রন্থিক– নূরুল আলম আতিক।

…চলচ্চিত্র উৎসাহীর
সংগ্রহে রাখার এবং
বারবার পড়বার মতন
অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থের তালিকাভুক্ত
হবার যোগ্য
গ্রন্থ এটি…

সবশেষে, তথ্য নির্দেশ ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী’র উল্লেখ আগ্রহী/সন্ধিৎসু পাঠকের মনচাঞ্চল্য নিরসনে উপকারী প্রতিপন্ন হবে বলে বলেই আমার বিশ্বাস। গ্রন্থটি পাঠকের মনক্রিয়ায় জমে থাকা নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে চিন্তার অপার দুয়ার উন্মোচন করবে– এমনটাই অভিপ্রেত। চলচ্চিত্র উৎসাহীর সংগ্রহে রাখার এবং বারবার পড়বার মতন অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থের তালিকাভুক্ত হবার যোগ্য গ্রন্থ এটি।

“নূরুল আলম আতিক” নামটার সাথে এ দেশের মিডিয়াপাড়ার যোগাযোগ বহুদিনের। বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক, টেলিফিল্ম, ডিজিটাল চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ডিজিটাল সিনেমা মুভমেন্ট এবং পাশাপাশি ডিজিটাল মিডিয়াবিষয়ক বই লেখার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ব্যক্তিত্বরুপে গণ্য। একাধারে চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার এবং চিত্রনাট্যকারের ভূমিকাতে বিভিন্ন সময়ে নিজ প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে চলেছেন এই গুণী ব্যক্তি। আবু সাইয়ীদ পরিচালিত কীত্তনখোলা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে অর্জন করে নেন বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। তার এবং একই সাথে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র ডুবসাঁতার-এর জন্যে অর্জন করে নেন মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরষ্কার [শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার– উভয় বিভাগে]।

এ দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান ও মিথোলজীবিষয়ক বই নৃ সম্পাদনা করেছেন তিনি, লিখেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে প্রবন্ধ, সাময়িকী, কলাম। মগের মুল্লুকে ফিরিঙ্গীর বেসাতি এবং নতুন সিনেমা, সময়ের প্রয়োজন তার লিখিত/গ্রন্থিত দুটি উল্লেখযোগ্য বই।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনেমার শিক্ষার্থী; সিনে-সমালোচক; ফিল্মমেকার । বাংলাদেশ ।। বর্তমানে, মুহম্মদ খসরু পরিচালিত "নামহীন গোত্রহীন” চলচ্চিত্রে অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত

মন্তব্য লিখুন